নির্ঝর নৈঃশব্দ্য'র ধারাবাহিক গদ্য : ফুকোর ইশকুল

ত্তর কাঠামোবাদী তাত্ত্বিক চিন্তকদের মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয় শিক্ষক হলেন মিশেল ফুকো। আমার বিবেচনায় এখন পর্যন্ত তিনিই পৃথিবীর শেষ জ্ঞানী। তার বইগুলির মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয় বই ‘দ্য আর্কেওলজি অব নলেজ’। এই বই আমাকে বলেছে কেমন করে জ্ঞান তৈরি হয় আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কেমন করে পরিবর্তিত হয় সেই কথা।

মিশেল ফুকো নির্দিষ্ট কোনো দার্শনিক সিদ্ধান্ত দেন না, তিনি শুধু দেখবার নিজস্ব ভঙ্গি তৈরির পথ নির্মাণ করে দেন। তার কাজকে কোনো নির্দিষ্ট, সুনির্ধারিত সিদ্ধান্ত বা মতবাদ হিসেবে গণ্য করা যায় না, বরং একে বিশ্লেষণ ও দেখবার এক বিশেষ জানালা হিসেবে দেখা উচিত।

তিনি শাশ্বত সত্য, চিরন্তন ন্যায়বিচার বা মনুষ্য স্বভাবের মতো সার্বজনীন ধারণার সন্ধানে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি দেখান যে আমার পরিচিত জ্ঞান, নীতি-নৈতিকতা ও স্বাভাবিকতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এবং তা ক্ষমতার সূক্ষ্ম খেলার মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে। তিনি কোনো উত্তরের বই লেখেননি যেখানে সমাজের সব সমস্যার সমাধান দেওয়া আছে বা একটা আদর্শ সমাজ কেমন হবে তার নকশা আঁকা আছে। বরং তিনি বর্তমানকে প্রশ্ন করার উপকরণ দিয়েছেন।

ফুকোর প্রধান অবদান হল তিনি আমাকে প্রশ্ন করবার এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখবার একটা পথের সন্ধান দেন। এই পথ নির্মাণের কতিপয় মূল দিক আছে। প্রথম হল ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্ক। তিনি দেখিয়েছেন যে জ্ঞান ক্ষমতার বাইরের কোনো শুদ্ধ বিষয় নয়, বরং ক্ষমতা নিজেই জ্ঞান উৎপাদন করে এবং কোনো জ্ঞানকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা সমাজের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানসিক অসুস্থতা, অপরাধ বা যৌনতা সম্পর্কে আমার বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আসলে এক সময় ক্ষমতা কাঠামো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।

দ্বিতীয় পর্যায়ে বংশলতিকা ও প্রত্নতত্ত্ব। তিনি এইসব কৌশল ব্যবহার করে দেখান যে কীভাবে পাগলামি, শাস্তি, বা যৌনতার মতো বিষয়গুলি ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে এবং কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যেমন কারাগার, হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। তিনি তাদের উৎপত্তির ইতিহাস উন্মোচন করেন।

তৃতীয় বিপজ্জনকতা ও অতি-সক্রিয়তা। ফুকো বলেন, ‘আমার বলার বিষয় এ নয় যে সবকিছুই খারাপ, বরং আমার বলার বিষয় হল যে সবকিছুই বিপজ্জনক। আর যখন সবকিছুই বিপজ্জনক, তখন আমাদের আশু অর্থেই কিছু করবার থাকে।’ অর্থাৎ তার চিন্তা হতাশাবোধ জাগায় না, বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে গভীরভাবে বুঝে নতুন ধরনের প্রতিরোধের বা প্রতিক্রিয়ার পথ খুঁজতে উৎসাহিত করে।

ফুকো আমাকে বলেন না যে কী করতে হবে বা কী বিশ্বাস করতে হবে, কিন্তু তিনি আমাকে শেখান, প্রশ্ন করো, সমাজে কোনো বিষয়কে স্বাভাবিক বা সত্য বলে মেনে নেবার আগে প্রশ্ন করো, এর পেছনের ক্ষমতা কাঠামো কী? ইতিহাস জানো, যেকোনো ধারণা অতীতে কেমন ছিল এবং কেমন করে এটা আজকের অবস্থায় এল?

ফুকো বলেন, সচেতন হও। তুমি যে নিয়মের অধীনে আছ, সেই নিয়ম তোমার ভালোর জন্যে তৈরি হয়েছে, নাকি অন্য কারো ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখবার জন্যে?

যেই শিক্ষক এমন করে আমাকে পথের সন্ধান দিতে পারেন, কেন তবে তিনি আমার প্রিয় শিক্ষক হবেন না। এই শিক্ষকের প্রতি আমার কোনো ভক্তি নেই, কিন্তু প্রেম আছে। কেননা ভক্তির সঙ্গে সম্পর্ক অন্ধত্বের, আর প্রেমের সঙ্গে সম্পর্ক দৃষ্টির, যা স্বকীয় দৃষ্টি ভঙ্গিকে অবিনির্মাণ করে দেয়।

মিশেল ফুকোর ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত L'archéologie du savoir’ বইটা তার চিন্তার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও পদ্ধতিগত একটা কাজ। এটা তার আগের ঐতিহাসিক কাজগুলি বুঝবার জন্যে একটা তত্ত্বগত কাঠামো তৈরি করে।

ফুকো তার এই পদ্ধতিতে জ্ঞানের পুরোনো তত্ত্বের সন্ধান করেন। ঐতিহাসিকরা সাধারণত সময় অনুসারে চিন্তার ধারাবাহিকতা বা বিবর্তন খোঁজেন, কিন্তু ফুকো এই ধারাবাহিকতাকে সামনা করেন। তিনি ইতিহাসকে ধারাবাহিক অগ্রগতি নয়, বরং জ্ঞান পদ্ধতির মধ্যকার ফাটল ও ভিন্নতার একটা ক্রম হিসেবে দেখেন।

ফুকোর জ্ঞানের প্রত্নবিদ্যা হল সেই নিয়ম, যা একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ে কোনো কিছুকে বলা, জানা বা সত্য হিসেবে গণ্য করতে সাহায্য করে। এটা তার একটা কেন্দ্রীয় ধারণা। এটা এমন একটা পদ্ধতি, যা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটা বিষয়ের চারপাশে থাকা সমস্ত বক্তব্য, ধারণা, প্রতিষ্ঠান ও অভ্যাসকে সংগঠিত করে।

এই বিদ্যা নির্ধারণ করে যে, সেই সময়কালে কোনো বিষয়, যেমন পাগলামি, চিকিৎসা, যৌনতা বা অর্থনীতি সম্পর্কে কী বলা যাবে, কীভাবে বলা যাবে এবং কে বলতে পারবে।

ফুকো এই বইতে একাধিক মৌলিক ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বিবৃতির কথা বলেন, যা কেবল একটা প্রস্তাবনা নয়। এটা হল সেই মৌলিক একক যা কোনো বক্তব্যকে কার্যকর করে তোলে। এটা একটা বক্তব্যকে অর্থপূর্ণ করার নিয়মের সমষ্টি। তারপর বলেন আর্কাইর্ভের কথা, যা কোনো সমাজে বক্তব্যের সেই সমস্ত নিয়মের সমষ্টি, যা নির্ধারণ করে দেয় একটা নির্দিষ্ট সময়ে কী বলা সম্ভব এবং কী সম্ভব নয়। এটা সব বলা কথার সমষ্টি নয়, বরং কথা বলবার নিয়মের ব্যবস্থা। তিনি ঐতিহাসিক পূর্বধারণার কথা বলেন, যা সেই অদৃশ্য শর্ত বা কাঠামো, যা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জ্ঞানকে সম্ভব করে তোলে।

ফুকো চিরাচরিত লেখকের ধারণাকে অস্বীকার করেন। তার মতে, কোনো জ্ঞান বা বক্তব্যের কর্তা একক কেউ নন, বরং সেই নির্দিষ্ট সময়ের সন্দর্ভগত বিন্যাস। তিনি ধারাবাহিক ও সমন্বিত ইতিহাসের ধারণাকে বাতিল করেন এবং দেখান যে জ্ঞান সবসময় বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত। যদিও এই বইয়ে ক্ষমতা নিয়ে সরাসরি আলোচনা কম, তবু এটা এই ধারণার জন্ম দেয় যে, জ্ঞান নিরপেক্ষ নয়। সন্দর্ভগত বিন্যাসের মধ্যেই ক্ষমতার সম্পর্ক নিহিত থাকে, যা সত্য নির্ধারণ করে।

ঐতিহ্যগতভাবে ইতিহাসবিদরা মনোযোগ দিতেন রাজনৈতিক ঘটনা, যেমন রাজা, যুদ্ধ, দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনা এবং এর কারণ ও ফলের ওপর। কিন্তু এখন অনেক ইতিহাসবিদ সেই দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনার পুরু স্তর ভেদ করে ভেতরের স্থিতিশীল কাঠামো খুঁজে বের করতে পছন্দ করেন। যেমন এক বছর বা এক দশকের পরিবর্তে কয়েক শতক ধরে চলে আসা প্রবণতা। যা সহজে ভাঙে না, প্রায় অমর। যা শতকের পর শতক ধরে চলতে থাকে, যেমন: আবহাওয়ার পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস, খাদ্যের যোগান। সরকার, যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষের দ্রুত পরিবর্তনের নিচে থাকা সমুদ্রপথের ইতিহাস, শস্যের ইতিহাস, খরা বা সেচের ইতিহাস, যা খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।

ইতিহাসবিদরা এখন অর্থনৈতিক মডেল, জনসংখ্যার হিসাব, জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বা প্রযুক্তির বিস্তারের মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করেন। যেমন আগের ইতিহাসবিদরা প্রশ্ন করত, ‘কোন যুদ্ধে অমুক রাজা হারলেন?’ নতুন ইতিহাস প্রশ্ন করে, ‘গত পাঁচ শতাব্দী ধরে একটা অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে? এই অঞ্চলের কৃষকরা কেন একটা নির্দিষ্ট শস্যের চাষ শুরু করল এবং কেন তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হঠাৎ করে কয়েক শতাব্দী পরে কমে গেল?’ অর্থাৎ ইতিহাসবিদরা বাইরের ঘটনার পরিবর্তে ভেতরের গভীর স্তরের কাঠামো বের করে আনতে চাইছেন।

ইতিহাসবিদদের নতুন প্রশ্ন হল কোন স্তরগুলিকে আলাদা করে দেখা উচিত, অর্থনীতি, জলবায়ু, প্রযুক্তি? এই স্তরগুলির মধ্যে সম্পর্ক কেমন, কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করছে? কীভাবে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াগুলির সময়কাল নির্ধারণ করা উচিত?

একটা ধারণা বা জ্ঞান এক কাল থেকে অন্য কালে মসৃণভাবে এগিয়ে যায়নি, বরং হঠাৎ ভেঙে গেছে বা পথ পরিবর্তন করেছে। যখন কোনো তত্ত্ব তার পুরোনো অভিজ্ঞতা বা আবেগগত জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে হঠাৎ নতুন ধরনের যুক্তিতে প্রবেশ করে, তখনই এমন ব্যাপার ঘটে। একটা ধারণা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত আরও উন্নত হয় না, বরং ভিন্ন ভিন্ন তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে তার অর্থ এবং ব্যবহারের নিয়ম সম্পূর্ণ বদলে যায়।

এখন লেখকদের জীবন বা একটা সময়ের সাধারণ অনুভূতির দিকে না তাকিয়ে একটা নির্দিষ্ট সাহিত্যকর্মের নিজস্ব কাঠামোর দিকে নজর দেওয়া হয়। প্রথাগত তত্ত্ব প্রশ্ন করত, ‘রেনেসাঁস যুগে ইউরোপের ধারণাগুলি কীভাবে ধ্রুপদী যুগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল?’ নতুন তত্ত্ব প্রশ্ন করে, ‘নিউটনের পদার্থবিজ্ঞান কোপার্নিকাসের ধারণার সঙ্গে কেমন করে মসৃণভাবে যুক্ত নয়, বরং কোপার্নিকাসীয় ধারণার কোন অংশকে হঠাৎ ভেঙে দিয়ে একটা সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরি করল? অর্থাৎ কোপার্নিকাসের ধারণার সঙ্গে নিউটনের বিচ্ছেদের জায়গাটা কোথায়?’

নতুন প্রশ্ন, বিচ্ছেদ বা পরিবর্তনকে বোঝানোর জন্যে কী কী ধারণা ব্যবহার করা যায়, সীমা, ছেদ, রূপান্তর? বিজ্ঞান, তত্ত্ব, বা পাঠ্যের মতো প্রতিটা এককের নিজস্ব সীমা কী? কীভাবে এই পরিবর্তনের স্তরগুলিকে বিশ্লেষণ করা যায়?

ইতিহাস নিজেই এখন স্থিতিশীল কাঠামোর পক্ষে ঘটনার আচমকা উত্থানকে পরিত্যাগ করছে। কিন্তু চিন্তার ইতিহাস ঠিক তার উলটো পথে, বিচ্ছিন্নতা, ছেদ ও পরিবর্তন খুঁজে পাচ্ছে। একদল ইতিহাসবিদ দেখছেন সবকিছুই ধীরে চলে ও দীর্ঘস্থায়ী, আর একদল ইতিহাসবিদ দেখছেন সবকিছুই হঠাৎ ভেঙে যায় ও পরিবর্তিত হয়।

আগেই বলেছি ফুকোর প্রত্মবিদ্যা হল কীভাবে জ্ঞান তৈরি হয় এবং কালের বিবর্তনে তা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেই প্রক্রিয়া বুঝবার একটা কঠোর পদ্ধতিগত অনুসন্ধান।

আমি বইটার ইংরেজি অনুবাদ ‘The Archaeology of Knowledge’ পড়ছি। এটা অনুবাদ করেছেন এ. এম. শেরিডান স্মিথ (A. M. Sheridan Smith), যেটা ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়। বইটা পড়ে পড়ে যতটুকু বুঝতে পারছি নিজের মতো করে লিখতে চেষ্টা নিচ্ছি এইখানে।

দুই.
ফুকোর মতে, আগেকার ইতিহাসবিদরা নথিপত্র বা দলিল-দস্তাবেজকে দেখতেন অতীতের একটা আয়না হিসেবে, যা কেবল নিঃশব্দে অতীতের ঘটনাকে তুলে ধরে। ইতিহাসবিদরা সেই দলিল পড়ে আসলে কী ঘটেছিল, তা ব্যাখ্যা করতেন

ফুকো বলছেন, দলিল আর শুধু প্রমাণ নয়, এটা নিজেই ইতিহাসের একটা সৃষ্টি। দলিল এখন নিছক তথ্য সরবরাহ করে না, বরং ইতিহাসবিদ এই দলিলকে সাজান, ভাগ করেন, এবং এর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করেন। এর ফলে দলিল নিজেই ইতিহাসের ব্যাখ্যার একটা নির্মিত কাঠামো হয়ে ওঠে। ধরুন, আপনার হাতে একটা পুরোনো চিঠি আছে। আপনি চিঠিটা পড়তেন, চিঠির লেখক কী বলেছিলেন এবং সেই বক্তব্য থেকে ঘটনা বা তথ্য জানতেন।

ফুকো বললেন, আপনি একই চিঠিকে আলাদা আলাদা উপাদানে বিশ্লেষণ করবেন। চিঠিটির ভাষা ও শব্দচয়ন, তখনকার চিন্তাভাবনা, কাগজ ও কালির খরচ, অর্থনৈতিক অবস্থা, চিঠি লিখবার নিয়ম ও ধরন। অর্থাৎ চিঠির বক্তব্য নয়, তার ভেতরের কাঠামো ও উপাদান ইতিহাসের নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। আপনি নির্ধারণ করছেন কোন অংশটা গুরুত্বপূর্ণ।

ফুকো মনে করেন, এখন ইতিহাসকে আর সরল একরৈখিক হিসেবে দেখা যায় না, ইতিহাস এখন নানা ধরনের সময়ের ধারার ক্রম, কিছু খুব ছোটো, কিছু মাঝারি, আর কিছু দীর্ঘ। প্রতিটা ক্রমের নিজস্ব নিয়ম আছে। খুব অল্প সময়ের পরিবর্তন বা একক ঘটনা। কয়েক মাস বা বছর ধরে চলা কোনো কৌশল বা নীতির পরিবর্তন। বহু বছর ধরে চলা জনসংখ্যার পরিবর্তন বা মানসিকতার বদল। ধরুন, একটা চা দোকানে একদিন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকান বন্ধ হয়ে গেল। আঠারো মাস ধরে ধীরে ধীরে বাজারের অন্যান্য জিনিসপত্র কমে যাওয়া এবং এর ফলে চা দোকানের ব্যবসায় প্রভাব পড়া বাজার অর্থনীতির নীতি বদলের ফল। শহরের জনসংখ্যা বা ক্রেতাদের অভ্যাস কমে যাওয়া, যা দশ-পনেরো বছর ধরে চলছে, যা একটা বড়ো, দীর্ঘকালীন কাঠামো বা জনসংখ্যার পরিবর্তন। ইতিহাসবিদেরা এখন এই স্তরগুলিকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করেন, দেখেন কোনটা কীসের ফল এবং কোন স্তরগুলিকে একসঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

ইতিহাসবিদেরা বিরতি বা বিচ্ছেদকে ইতিহাসের একটা ত্রুটি হিসেবে দেখতেন, যেন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ভুল হয়েছে। তারা চাইতেন এই ত্রুটি মুছে দিয়ে একটা মসৃণ, ধারাবাহিক ইতিহাস তৈরি করতে। আর ফুকোর মতে, বিরতি বা বিচ্ছেদ নিজেই একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কখন কোনো পুরোনো চিন্তা বা আচরণ হঠাৎ করে থামে, বা স্রোত উলটো দিকে চলে যায়, সেই বিরতি বা বিচ্ছেদ খুঁজে বের করাটাই এখনকার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের প্রধান কাজ। ধরুন, কোনো অঞ্চলে একটা বিশেষ ধরনের কৃষিকাজ বহু বছর ধরে চলে আসছিল। হঠাৎই সরকার সম্পূর্ণ নতুন একটা আইন আনল, এবং এর ফলে পুরোনো কৃষিকাজের পদ্ধতিটা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। এই হঠাৎ বন্ধ হওয়া হল বিরতি। ফুকোর মতে, এই বিরতি কেন হল, কোন আইন, নীতি বা চিন্তাভাবনার পরিবর্তন এই বিচ্ছেদের জন্ম দিল, সেটাই বিশ্লেষণ করতে হবে।

এই পদ্ধতিতে সবকিছুকে একটা মাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাখ্যায় মিলিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়, যেমন এই যুগের মানুষের সাধারণ মানসিকতা সবকিছু অর্থাৎ অর্থনীতি, রাজনীতি, শিল্প ইত্যাকার ব্যাপার নির্ধারণ করেছে। এটা একটা সরল ব্যাখ্যা খোঁজে। ফুকো এর বিপরীতে সাধারণ ইতিহাসের কথা বলেন। এই পদ্ধতিতে কোনো একটা কেন্দ্রীয় ব্যাখ্যা না খুঁজে, বিভিন্ন সময় স্তর কীভাবে একে-অপরকে সম্পর্ক করে, কোনটা কখন কী প্রভাব ফেলে, সেই জটিল আন্তঃসম্পর্ক খোঁজা হয়। কেউ যদি বলে যে, শিল্প বিপ্লবের কারণেই সমাজের সব সমস্যা ঠিক হয়ে গেছে, তবে এটা হল মোট ইতিহাস। এটা সব ঘটনাকে শিল্পবিপ্লব নামক একটা কারণের নিচে এনে ফেলেছে। আর সাধারণ ইতিহাস বলবে শিল্পায়ন, শ্রমবাজারের পরিবর্তন এবং নতুন শিক্ষানীতি ইত্যাদিকে আলাদা আলাদা সময়ের স্তর হিসেবে দেখতে হবে। তারপর প্রশ্ন করা হবে, আইন কি প্রযুক্তির আগে বদলেছে, নাকি প্রযুক্তি আইনকে বদলে দিয়েছে? তাদের মধ্যে সম্পর্ক কী ধরনের? এগুলি বিশ্লেষণ করে একটা জটিল ছবি তৈরি করা। ফুকো বলেন, নতুন ইতিহাসে মূল কাজ হল এই গবেষণা পদ্ধতিগুলির কৌশলগত প্রশ্ন ঠিক করা।

সব দলিল সংগ্রহ করব, নাকি একটা নমুনা নেব? দেশের সব খবরের কাগজ নেব, নাকি কেবল সবথেকে প্রভাবশালী প্রধান তিনটা নেব? কোন দলিলকে প্রতিনিধিত্বমূলক বা গুরুত্বপূর্ণ ধরা হবে? একটা শহরের ইতিহাস লিখতে গেলে শুধু প্রশাসনের নথিপত্র নিলে, সাধারণ মানুষের ভোক্তা জীবন বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানার সুযোগ থাকবে না।

কী ধরনের বিশ্লেষণ করবো? রেজিস্টারের কেবল সংখ্যাগুলি বিশ্লেষণ করলে অর্থনৈতিক ধারা বোঝা যায়। কিন্তু রেজিস্টারের বাক্যের ভাষা ও ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করলে তখনকার চিন্তাভাবনার ধরন বোঝা যায়।

দোকানে কত বিক্রি হয় তার হিসেব লেখা থাকলে পরিসংখ্যান কাজে লাগবে। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রেমের চিঠি হলে ব্যাখ্যামূলক পদ্ধতিই ভালো। এই পদ্ধতিগত সমস্যাগুলি গবেষককে আগেই পরিষ্কার করে নিতে হয়, কারণ এই সিদ্ধান্তগুলিই গবেষণার ফলাফল নির্ধারণ করে।

ফুকো বলতে চাইছেন, ইতিহাস এখন কেবল কে কী বলেছে তা নয়, বরং দলিলকে ভেতর থেকে সাজিয়ে, কাঠামোকে দেখা, বিভিন্ন সময়ের স্তর, ছোটো ঘটনা, মাঝারি প্রবণতা, দীর্ঘ কাঠামো তৈরি করা, বিরতি ও বিচ্ছেদকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে মেনে নেওয়া, কোন বিষয়গুলির মধ্যে কী সম্পর্ক আছে সেটা বিশ্লেষণ করা।

কোনো দলিল হাতে পেলে প্রথমে দেখুন, তা থেকে কী ধরনের উপাত্ত নেওয়া যাবে, শব্দভিত্তিক নাকি সংখ্যাভিত্তিক? ঘটনা বা প্রবণতা কোন সময় স্তরের, তা চিহ্নিত করুন। হঠাৎ কোনো ছেদ দেখলে, সেটা কেন হল, কোন নীতি, আইন বা কৌশল বদলেছে, তা খুঁজে বের করুন।

মিশেল ফুকো তার ইতিহাস-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনার মাধ্যমে ইতিহাস রচনার পদ্ধতি ও ঐতিহাসিক উপাদানের প্রকৃতিতে একটা মৌলিক বিপ্লব এনেছেন। তার মতে, দলিল আর অতীতের নিছক আয়না বা সরল প্রমাণ নয়, বরং এটা নিজেই ইতিহাসের ব্যাখ্যার একটা নির্মিত কাঠামো। ইতিহাসবিদ এখন দলিলকে নিছক বক্তব্য হিসেবে না দেখে, এর ভেতরের ভাষা, কাঠামো, শব্দচয়ন ও উৎপাদনপদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করেন। ফুকো ইতিহাসের সরলরৈখিক ধারাবাহিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে একে বিভিন্ন মাত্রার সময় স্তরের একটা জটিল ক্রম হিসেবে দেখেন। আগের ইতিহাসবিদেরা যেখানে ধারাবাহিকতায় বিরতি বা ছেদকে ত্রুটি মনে করতেন, ফুকো সেখানে এই বিচ্ছিন্নতাকেই বিশ্লেষণের প্রধান উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেন, অর্থাৎ কেন একটা চিন্তা বা প্রথা হঠাৎ করে থেমে গেল, সেই কারণ অনুসন্ধান করাই মুখ্য কাজ মনে করেন। সার্বজনীন মোট ইতিহাসের বিপরীতে তিনি সাধারণ ইতিহাসের কথা বলেন, যা কোনো একক কেন্দ্রীয় কারণ না খুঁজে বিভিন্ন ক্রমের জটিল আন্তঃসম্পর্ক ও কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে।

ফুকো ইতিহাসকে নিছক ঘটনার বিবরণ হিসেবে না দেখে, একে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটা প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যার মাধ্যমে ইতিহাসের সম্পূর্ণ ভিন্ন, জটিল আর অভ্যন্তরীণভাবে গঠিত একটা চিত্র উদ্ভাসিত হয়।

ইতিহাসের চিরায়ত পদ্ধতি, বিশেষ করে চিন্তাধারা বা জ্ঞানের ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটা বড়ো ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফুকো যাকে জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপান্তর বলছেন। তিনি বলছেন, এই পরিবর্তনকে সবাই মেনে নিচ্ছে না, বিশেষত যারা চিন্তার ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন।

ফুকো লক্ষ্য করছেন যে, ঐতিহাসিকভাবে মানুষ তাদের নিজেদের চিন্তা, জ্ঞান আর ধারণার ইতিহাসকে একটা অবিচ্ছিন্ন ধারা বা নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।

আমরা মনে করি যে আজকের বিজ্ঞান বা দর্শন বা সমাজ সব সময়ই ধীরে ধীরে, মসৃণভাবে, একটা পূর্ব-নির্ধারিত লক্ষ্যে, যেমন আরও ভালো বা আরও যুক্তিসঙ্গত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। আজকের যেকোনো ধারণা গতকালের ধারণার সরাসরি ফলাফল, সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা। একে ফুকো বলছেন নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস।

আমরা সাধারণত ভাবি যে, আধুনিক মনোবিদ্যা শুরু হয়েছিল একেবারে আদিম মানুষের মনের অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে, তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বিকশিত হয়েছে, যেন একটা চারাগাছ থেকে ধীরে ধীরে বিরাটাকার গাছে পরিণত হয়েছে। ফুকোর মতে, এই নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাসের ধারণাটির পেছনে একটা গভীর উদ্দেশ্য রয়েছে, আর তা হল ব্যক্তির চেতনার কর্তৃত্বকে রক্ষা করা।

যদি ইতিহাস অবিচ্ছিন্ন হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়ায় যে একজন সচেতন মানুষ সবকিছুকে আবার নিজের আয়ত্তে আনতে পারে, সমস্ত বিচ্ছিন্নতা বা পার্থক্যকে একটা পুনর্গঠিত একতার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারে। মানুষ ভাবতে পারে, আমিই সব কিছুর উৎস, এবং আমিই সব কিছুকে বুঝতে পারি, কারণ সব কিছুই আমার চেতনা বা আমার পূর্বপুরুষদের চেতনার ধারাবাহিক ফসল। এই ধারণাটা মানবতাবাদ ও নৃতত্ত্বের ভিত্তি।

ফুকো বলছেন, এই নিরবচ্ছিন্নতার ধারণা ভুল। জ্ঞান ও ইতিহাস আসলে বিচ্ছিন্ন ও অবিচ্ছিন্ন নয়। এটা হবে আসলে বিচ্ছিন্নতা, শৃঙ্খল, সীমা ও রূপান্তরের ইতিহাস। এটা অতীতের সঙ্গে বর্তমানের মিল খুঁজে বের করবার চেষ্টা না করে, বরং তাদের মধ্যেকার পার্থক্য, বিচ্ছেদ ও বিস্তৃতিকে বর্ণনা করবে।

ফুকো যখন পাগলামির ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন, তিনি দেখান যে ১৮ শতকের পাগলরা আজকের মানসিক রোগীর মতো নয়। পাগলামি নামক ধারণাটা হঠাৎ করেই, এক নির্দিষ্ট সীমায় গিয়ে আমূল রূপান্তর লাভ করেছে। এটা কোনো মসৃণ পরিবর্তন ছিল না, যেন একটা যুগ থেকে আরেক যুগে লাফ দেওয়া হয়েছে। এক যুগের পাগলামিকে অন্যযুগে একই অর্থে বা একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিচার করা সম্ভব নয়, কারণ তাদের নির্দিষ্ট বিন্যাস ও স্বায়ত্তশাসন ভিন্ন।ঐতিহাসিকরা এই নতুন পদ্ধতি, যা মার্ক্স এবং বিশেষ করে নিৎসের মতো চিন্তকদের হাত ধরে এসেছে তা গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন। কারণ এই বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস মানুষের চেতনাকে তার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়। যদি জ্ঞান বিচ্ছিন্ন শৃঙ্খলে বিভক্ত হয়, তবে কোনো একক মানবচেতনা বা আর দাবি করতে পারে না যে সে সব কিছুকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

যখন মনোবিদ্যা বলে যে মানুষের কাজ তার অচেতন নিয়ম দ্বারা চালিত, অথবা ভাষাবিদ্যা বলে যে তার ভাষা কিছু অজ্ঞাত নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তখন মানুষ আর নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে পারে না। এই নতুন ধরনের ইতিহাসের জন্ম হয়েছে ঠিক এই বিচ্যুতির যুগে, এবং তাই পুরাতন ধারার ঐতিহাসিকরা আতঙ্কিত হন।

ফুকো বলছেন যে তার আগের রচনাগুলি ছিল এই নতুন ধরনের ইতিহাস রচনার এক পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা। আর তার জ্ঞানের প্রত্নবিদ্যা সেই প্রচেষ্টার পদ্ধতিগত ভিত্তি তৈরি করার একটা চেষ্টা। তার লক্ষ্য হল এমন এক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের পদ্ধতি তৈরি করা, যা মানবতাবাদী ধারণা থেকে মুক্ত। তিনি চান এই নতুন পদ্ধতি দিয়ে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে, যা মানুষের চেতনার বাইরে গিয়ে ইতিহাসের বাস্তব নিয়ম ও কাঠামো আবিষ্কার করবে।

ফুকো বলছেন যে, ইতিহাসকে মানুষের দীর্ঘ, নিরবচ্ছিন্ন গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই গল্প বলা হয় শুধু এই কারণে যে আমরা মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে সবকিছুর কেন্দ্রে রাখতে চাই। ইতিহাস একটা ভাঙা, খণ্ড খণ্ড, এবং হঠাৎ পরিবর্তিত হওয়া ঘটনার শৃঙ্খল। আমাদের সেই ভাঙা টুকরোগুলিকে তাদের নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী বুঝতে শিখতে হবে, এবং মানবচেতনার অহংকে বিসর্জন দিতে হবে।

মিশেল ফুকো ইতিহাসের প্রচলিত, নিরবচ্ছিন্ন ও মানবকেন্দ্রিক ধারণাকে মৌলিকভাবে সামনা করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, ইতিহাসকে একটা মসৃণ ও ধারাবাহিক অগ্রগতি হিসেবে দেখার প্রবণতা মূলত ব্যক্তির চেতনার কর্তৃত্ব বা মানবতাবাদকে রক্ষা করবার এক আদর্শিক প্রচেষ্টা মাত্র। এর বিপরীতে তিনি ইতিহাসের বিচ্ছিন্নতা, আকস্মিক রূপান্তর ও বিচ্ছেদগুলিকে গুরুত্ব দেন, যেমনটি তিনি পাগলামির ধারণার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হল এমন একটা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি তৈরি করা, যা মানবচেতনার সার্বভৌমত্বকে বিসর্জন দিয়ে, জ্ঞানের নিজস্ব বাস্তব নিয়ম ও কাঠামো উন্মোচন করতে সক্ষম হবে, যদিও এই পদ্ধতি ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিকদের আতঙ্কিত করে, কারণ এটা মানুষকে তার কল্পিত কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়। ·


লেখক পরিচিতি : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য কবি, চিত্রী ও গল্পকার। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৭টি। ঢাকায় বসবাস করছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ