মেয়ে দুটোর দিকে না তাকিয়ে পকেটে হাত দিয়ে বুঝে নিই কাজের জিনিসটা পকেটে আছে কি না। যদিও ওটা আমি ভুলি না। ছেলে মাঝমধ্যেই ওটা যে খোঁজে সেটা আমি বুঝি। জানি খুঁজে পেলেই ছেলে ওটা লুকিয়ে রাখবে। কত লোকের কত নেশা আছে। আরে তোর বাপ কি নেশা-ভাঙ করে নাকি রেললাইনের বস্তিপাড়ায় যায়! যত্তোসব। আমি তোর জন্মদাতা বাপ রে। তাও তো এখন একগাদা নিয়ম করে দিয়েছে, এত দিনের পরে আসুন। অমুক করুন, তমুক করুন।
এই যে এদিকে আসুন–এই যে।
জানি আমাকেই ডাকছে, তবু তাকালাম না। এবার অন্য গলা।
—জেঠু একটু শুনুন তো!
‘জেঠু’—কোন শালা তাকাবে? দাদা না, নিদেন পক্ষে আঙ্কেল তা-ও না, সোজা জ়েঠু। এইসব এসিওয়ালা চেম্বারগুলোর রিসেপশনে মেয়েগুলো বেশি ন্যাকা। কাঁচের দেওয়ালে ওই তো আমি বসে। দড়ি-পাকানো ফিগার বিলকুল ফিট। চিমড়েপানা বডি কাঁচে দেখাচ্ছে এখন, অ্যাকশনের পর দেখবে এই শুঁটকে ছাতির কদর বেড়ে বিলকুল পঞ্চাশ ইনচ্।
—এই যে কী ব্যাপার? আপনাকে ডাকা হচ্ছে শুনতে পাচ্ছেন না? ম্যাডামরা তখন থেকে ডাকছেন, চলুন।
ষন্ডামার্কা একটা ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে, গলায় ঝাঁঝ। এই জোড়ডাঙায় নিজের ছেলে ছাড়া আর কোনো ছেলেকে আমি তোয়াক্কা করি না। একেও বলি, তুমি যাও–একটু জিরিয়েই আমি যাচ্ছি, আমার কোনো তাড়া নেই।
ততক্ষণে দরজা ঠেলে হুইলচেয়ারে এক রুগিকে বসিয়ে কেউ একজন ঢোকায় আমার সামনের ছেলেটা তাড়াতাড়ি ওদিকে চলে গেল। সঙ্গে বেশ কিছু লোক, মনে হয় এক্সিডেন্ট কেস। আমার পেটের খিদেটাও আরও চাগিয়ে উঠল। রিসেপশনের মেয়ে দুটোও আর আমার দিকে তাকিয়ে নেই। ওদের সামনে বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে। সামনের সিটগুলোও ভরে গেছে। এবার লোক এলে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নয়তো বাইরে ফুটপাথে অপেক্ষা করতে হবে। বাবা, নতুন হয়েছে এই ‘ঠিকানা’ আর লোক উপচে পড়ছে। এমন ঝাঁ-চকচকে ডাক্তারদের ঠেকে তো ফীজ’ও তেমনই হবে। দূর দূর, আমি আদার ব্যাপারী, আমার জাহাজের খোঁজে কী দরকার?
সামনে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিই। নাহ আজ আর তাকাব না। কিন্তু ঠিক সামনেই বসা, না দেখে যাব কোথায়! সেই পিঠকাটা ব্লাউজ পরে সামনে এক বউ বসে। না বাপু, চোখ বন্ধ করে থাকব। তবু ওই পিঠের দিকে তাকাব নাকো। আরে যার পিঠ তার ব্যাপার, আমার কী! যার যেমন কাটা পিঠ তার তেমন কাটবে। হে হে। আমি আর এসবের সাতে-পাঁচে নেই। কী কেলোই না হয়েছিল। ভাবলেই আমার হাত পা সেঁধিয়ে আসে।
সেবারেও আরোগ্য–তে বসে, সামনে এসে বসল এক মাঝবয়েসি বউ। ওর তো ডাকই পড়ে না, বসে আছে তো আছেই। আমার ডাক পড়তেও পারে, না-ও পড়তে পারে। আর রাজ্যের মশা। মশার ব্যাপারে আমাকে খুব সাবধানে থাকতে হয়। ফুল-হাতা জামা পরি সবসময়। খোলা জায়গাও তো কম নয়। পায়ের পাতা, হাতের তালু থেকে কান, নাক, কপাল। পা নাচাই, হাত ঘোরাই, নাক-কান কচলাতে থাকি বারবার। ডেঙ্গু-মেঙ্গু হলে আর দেখতে হবে না। এককথায় সবাই ভাগিয়ে দেবে। আরোগ্য-তে সেই মাঝবয়েসী মহিলাটা বসে থাকতে থাকতে দেখি ঢুলতে শুরু করেছে। আমি অবশ্য ঢোলার পাবলিক নই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি সজাগ। দেখি সামনে বসা মহিলার পিঠে এক বড়কা সাইজের মশা এসে বসল। আরও পিঠ কাটা পরো। মোটাসোটা মহিলা। পিঠের মাঝামাঝি এমন মোক্ষম জায়গায় বসেছে মশা-বাবাজি যে মহিলাটা হাত পাবে না ওখানে। তবের ঘুমের বারোটা তো বেজে গেল বলে!
আশ্চর্য! মহিলা ঘুমিয়ে কাদা। উঠছে না। মশা এদিকে ক্রমাগত ছুঁচ ভেতরে ঢোকাচ্ছে। পেছনে বসে সহ্য করা যাচ্ছে না। চোখ সরিয়ে নিই। পাশের লোকটা সামনে হাঁ করে তাকিয়ে কখন ডাকবে তার আশায়। আবার চোখ পড়ে মশার ওপর। পেট ফুলে লাল। আর সহ্য হয় না। জোর একটা ফুঁ মারি। প্রথমে মশাটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পিঠ থেকে হুল না বার করেই বাঁয়ে ডাঁয়ে বডি মোচড়ায়। আবার ব্যাটা সেট হচ্ছে। মহিলাও একটু যেন নড়ে ওঠে। আমি তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করি। আবার চোখ খুলে দেখি মহিলা আর মশা দুটোই ফিক্স। ঠিক আগের পজিশনে ফিরে গেছে। মহিলা ঘুমোচ্ছে আর মশা নিজের লাল পেট ফোলাচ্ছে। ওকে মনে হলো আমার রাইভ্যাল। শয়তানের ব্যাটা, মেয়েছেলের পিঠ পেয়ে মরণচোষা চুষছো, খুব মিষ্টি না? যদিও শুনেছি মাদি মশাগুলোই নাকি কামড়ায়। মশা ফ্যামিলিতে মদ্দাগুলো হয় ভেড়ুয়া। তবে আমার ওসব মনে পড়ে না এ মশা নিগঘাত একটা ক্যারেক্টারলেস দামড়া।
এই কথাটা আমি নতুন শিখেছি...ক্যরেক্টারলেস দামড়া।
সেদিন এক কাণ্ড! ছেলে যে ঘুমোয়নি সেটা আমি বুঝতে পারিনি। ওর নাইট ডিউটি থাকলে দুপুরে ভাত খেয়ে সেই যে ঘুমোয় ওঠে আশপাশের বাড়িতে সন্ধ্যে দেওয়ার প্যাঁ পোঁ শাঁখ বাজলে তবে। আমার বাড়িতে ওসবের বালাই নেই। ছেলের মা মরতে ওসবের পালাও ঘুচেছে। তুলসিতলা একটা আছে, ছেলে চান করে এক মগ জল ঢেলে দেয়। আর তখন বিড়বিড় করে কীসব বলেও। সন্দেহ হয়, এই বয়েসেই ছেলে কি মন্তর নিল? মা-মরা ছেলেকে আমি কোনোদিনই ঘাঁটাই না। তবে একদিন কান করে শুনতে যাই ওর মন্তর। ওং জবাকুসুম-এর বদলে কানে আসে—বাউন্ডুলে, বউ-খাকি, হাড়-জ্বালানে।
সোয়াস্তির দম ছাড়ি। ছেলে তার লাইনেই আছে। বিগড়োয়নি।
সেদিন সে তার রোজকার মতোই ঘরে। দুপুরে নেয়ে-খেয়ে ঘুমোচ্ছে। আর আমি বেড়ার গায়ে রোদে পোহাচ্ছি। আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে একটু ঢাল মতো। সামনে দিয়ে সাইকেল, বাইক যখন পেরোয় তখন ডগবগ করে ব্যালেন্স করে এগোয়। ভোট আসছে, তাই দুদিন আগে রাস্তায় ভাঙা ইট ফেলে গেছে। এতে আরও চিত্তির। হাঁটাও মুশকিল। দাঁড়িয়ে আছি, সামনে সাইকেল চালিয়ে একটা মেয়ে যেতে যেতে ডগমগ করতে করতে শেষ পর্যন্ত ধপাস করে পড়ল।
তাড়াতাড়ি ছুটে আমি মেয়েটাকে তুলতে যাই, সাইকেল দাঁড় করিয়ে দিই। এতক্ষণ সব ঠিক ছিল। দেখি মেয়েটার জামায় ভাঙা ইটের ধুলো বিচ্ছিরি ভাবে লেগে। কাঁধের গামছাটা দিয়ে আমি সেটা যেই ঝেড়ে দিতে শুরু করেছি ওমনি মেয়েটা আমায় চমকাতে শুরু করল।
—আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন? বহুত অসভ্য লোক তো!
পেছনে তাকিয়ে দেখি ছেলে ছুটে আসছে। মেয়েটার সামনে এসে সেকী মাপ চাওয়া!
—দিদি ভুল হয়ে গেছে, কিছু মনে করবেন না আপনি যান।
আমি তো থ। দিন-দুপুরে নখড়াবাজি। ছেলে আমার হাত ধরে ভেতরে টেনে আনে। বলে, ক্যারেকটারলেস দামড়া!
এই মশা মাদি হোক বা মদ্দা, একে আমি ছাড়ব না। কিন্তু করবটা কী? মহিলার পিঠে চাঁটি মারলে ও মশা নির্বংশ হবে। কিন্তু তারপর? আমার ছেলেও যে অনাথ হবে। এই প্ল্যান বাতিল করি। মুখটা খানিক সামনে এগিয়ে ধরি। আর এবার গায়ে যত দম আছে সবটা বুকে নিয়ে মারি আরেক ফুঃ!
মশার কী হলো তা বোঝার আগেই দেখি ঘ্যাঁক করে মহিলা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে আমায় দেখছে। মুখ সরানোর সুযোগ তো পেলামই না, চোখ বন্ধ করেও আর কোনো লাভ নেই বুঝে বোকার মতো বলে ফেলি—বেয়াদপ মশা!
এরপর যা হলো তা আর মনে করতে চাই না। কিন্তু আরোগ্য-তে ঢোকা আমার বন্ধ হয়ে গেলে। পরে আমার দুটো গভীর দর্শন-চিন্তা মনে গেঁথে যায়। এক নম্বর, মেয়েদের জন্মে আর সাহায্য করব না। দু নম্বর, মশা নিজের গায়ে বসলেই শুধু তাড়াব। আরে মশা’ই আমার বন্ধু, হেল্পার। কামড়া কামড়া, আরও ডেঙ্গু বাড়া। আমারই ভালো।
নিজের মনে বকতে বকতে দেখলাম, হুইল-চেয়ারে বসা রুগীর লোককে রিসেপশনে কিছু বলছে। ‘আর্জেন্ট’ কথাটা শুধু কানে এলো। অল্পবয়েসী একটা ছেলে, মুখ কাঁদো কাঁদো করে বলল—কোথায় পাব? এসব ভ্যাবাচ্যাকা, ভ্যাবলা মুখ-চোখ আমার চেনা। পকেটে হাত ঠেকাই।
আমার ছেলে ভীষণ রগচটা। রেগে গেলে বাপের ছিরাদ্ধ করি। তবে ছেলের বকায় আমি গা করি না। লুকোচুরি করে আমার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আধার কার্ডে পঞ্চাশ পেরোয়নি। আমি কেন বুড়ো-হাবড়ার দলে নাম লেখাব?
—তোমার কী দরকার? আমি কী খাওয়াচ্ছি না? কী খাবে মুসাম্বির জুস? দুধ? না কি তুমি...
আমি রা কাড়ি না।
—তুমি পয়সা কামাও নাকি বলো তো? বাবা? তোমার চোখ নেই নাকি বাড়িতে একটাও আয়না নেই? চেহারাটা কী বানিয়েছ!
ছেলের কথায় মুখের ওপর হাত বুলিয়ে হাতের তালু দেখি। ন্যাবাটে দেখাচ্ছে না তো? জামার হাতা সরিয়ে কব্জির দিকে চোখ রাখি। নীল শিরা বডি ফুলিয়ে বলছে ‘ভেতরের লাল লিক্যুইড ফুল রেডি বস’। আমার ছেলেটা বড্ড ভীতু টাইপ, বাপকে নিয়ে ফালতু টেনশন করে।
এবারও চুপ করে থাকি। যা ভাবার ভাব। আমি তোর বাপ। আমি কম কিসে? সেবার তোর মা’র বেলায় কাউকে খুঁজে পেলাম না, ম্যালেরিয়ার জ্বর এইসা জড়িয়ে ধরল। তবে এরপর থেকে আমার দরিয়াদিলি কেউ ছাড়াতে পারবে না।
—বাবা তোমার বয়েস হচ্ছে। কিসের পিরীতে হাসপাতালে ঘুরে বেড়াও? মা গেছে এবার কী—
ছেলে কথা শেষ না করেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় কাজে। ছেলের মন রাখতে কদিন বেরোইনি। আরে আমি কি বাড়ি বসে বসে গতরের নাট-বল্টুতে জং ধরাব!
রিসেপশনের দিকে এগোই। পকেটে হাত ঢুকিয়ে কার্ড বার করে ছেলের বয়েসী পেশেন্ট পার্টিকে বলি, এই যে আমার ব্লাড-ডোনার কার্ড। আমি ব্লাড দেব। এই চেম্বারে কোনো মশা উড়ছে না তবু সেই ক্যারেকটারলেস দামড়া মশার উদ্দেশ্যে র্যালা নিয়ে বলি, আমি হচ্ছি—দরিয়াদিল। তোরা কী জানিস, আমি কেন রোজ আসি এখানে? তোরা রক্ত খাস, আর আমি? রক্ত দিই রে ভাই, রক্ত দিই। ·
লেখক পরিচিতি : সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত জন্ম বর্তমান ঝাড়খণ্ডের শিল্পনগরী সিন্দ্রিতে। আদিবাড়ি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ। তাঁর জীবনের বড়ো অংশ কেটেছে উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে। পড়াশোনা মূলত ঝাড়খণ্ড ও বাংলায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেছেন প্রায় দুই দশক। এখন পাকাপাকি কলকাতার বাসিন্দা।


0 মন্তব্যসমূহ