ইসমাইল কাদারে বিশ এবং একুশ শতকের বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি। তাঁকে বলা হয় আধুনিক হোমার। জন্ম আলবেনিয়ার জিরোকাস্তারে, ১৯৩৬ সালে। তিরানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শেষে চলে যান মস্কোর ম্যাক্সিম গোর্কি ইনস্টিটিউটে, এরপর দেশে ফিরে আসেন। প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। মূলত ঔপন্যাসিক হলেও কবি হিসেবেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, সেই সঙ্গে গল্প, প্রবন্ধ আর নাটকও লিখেছেন প্রচুর। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক।
কাদারেকে টোটালিটারিয়ানিজমের বিরুদ্ধে একজন সর্বজনীন কণ্ঠস্বর হিসেবে গণ্য করা হয়। আলবেনিয়ায় তখন ছিল কমিউনিস্ট স্বৈরশাসন, ফলে বারবার তাঁর বই নিষিদ্ধ হয়েছে। এই কারণে নিজের লেখায়, মূলত উপন্যাসে, পৌরাণিক কাহিনি, উপকথা, লোককাহিনি, রূপকথা, কিংবদন্তি থেকে শুরু করে নানান রকমের উপমা, রূপক এবং আকার-ইঙ্গিতের সাহায্যে টোটালিটারিয়ানিজমের বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক বিদ্রোহ করে এসেছেন। ব্যক্তিগত গল্প এবং রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যটি সফলভাবে বজায় রাখতে পারতেন তিনি। ২০২০ সালে নয়স্ট্যাট আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার লাভের পর, সেই জুরি বোর্ডের একজন কাদারে সম্পর্কে লেখেন, ‘কাদারে ফ্রানৎস কাফকার উত্তরসূরি। কাফকার পর একমাত্র তিনিই টোটালিটারিয়ানিজমের নারকীয় ক্ষমতা কাঠামোর এতটা গভীরে গিয়ে মানুষের উপর এর চরম সম্মোহনী প্রভাব নিয়ে এভাবে কাজ করেছেন।’
ইসমাইল কাদারের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নেন ইরানি কবি ও সম্পাদক শুশা গাপ্পি। প্রকাশিত হয় প্যারিস রিভিউ পত্রিকার ১৮৭তম সংখ্যায়, ১৯৯৮ সালে। সাক্ষাৎকারটিতে আলবেনীয় ভাষা, সাহিত্য, কমিউনিস্ট স্বৈরশাসন চলাকালীন আলবেনিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে কাদারের বেড়ে উঠা, সাহিত্যদর্শন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে ফুটে উঠেছে; খোলাখুলিভাবে সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি। ১লা জুলাই, ২০২৪ সালে, ৮৮ বছর বয়সে আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় ইসমাইল কাদারে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
প্যারিস রিভিউ :
আপনিই প্রথম আলবেনীয় লেখক যিনি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি লাভ করেন। বেশিরভাগ মানুষের কাছেই আলবেনিয়া ইউরোপের এক প্রান্তে পঁয়ত্রিশ লক্ষ মানুষের একটি ছোট দেশ। তাই, আমার প্রথম প্রশ্ন আলবেনিয়ার ভাষা প্রসঙ্গে। কী সেটা?
ইসমাইল কাদারে :
আলবেনিয়ার অর্ধেক জনসংখ্যা থাকে তার প্রতিবেশী দেশ ইউগোস্লাভিয়ার কসোভো অঞ্চলে। সব মিলিয়ে পৃথিবীতে এক কোটি মানুষ আলবেনীয় ভাষায় কথা বলে। এটি ইউরোপের মৌলিক ভাষাগুলোর একটি। কথাটি শুধুমাত্র এক ধরনের জাতীয় গর্ববোধের জায়গা থেকে বলছি না আমি, এর সত্যতা রয়েছে। ভাষাগতভাবে বললে, ইউরোপে ছয়টি কি সাতটি ভাষার মৌলিক পরিবার রয়েছে, যেমনÑ ল্যাটিন, জার্মানিক, স্লাভিক, বাল্টিক (লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়াতে যে ভাষায় কথা বলা হয়), আর পরিবার ছাড়া তিনটি ভাষা, যা হলো গ্রীক, আর্মেনীয়, এবং আলবেনীয়। অতএব, আলবেনীয় ভাষা স্রেফ ছোট একটি দেশের মানুষের মুখের ভাষার চেয়েও অনেক বেশি মনোযোগের দাবি রাখে, যেহেতু এটি ইউরোপের ভাষাগত মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হাঙ্গেরিয়ান আর ফিনিশ কিন্তু ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা নয়। আবার, আলবেনীয় ভাষা প্রাচীন ইলিরিয় ভাষার একমাত্র জীবিত রূপ হওয়ার কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকালে দক্ষিণ ইউরোপে তিনটি অঞ্চল ছিল গ্রীস, রোম, এবং ইলিরিয়া। আলবেনীয়ই হলো সেই ইলিরিয় ভাষার একমাত্র জীবিত রূপ। সেই জন্যই এই ভাষাটি অতীতের বড় বড় ভাষাবিদদের কৌতূহলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলবেনিয়ান সম্পর্কে সর্বপ্রথম যিনি গুরুতর গবেষণা করেছেন তিনি হলেন জার্মান দার্শনিক গটফ্রিড লিবনিজ, ১৬৯৫ সালে।
প্যারিস রিভিউ :
ভলতেয়ার যাকে প্যারোডি করে তাঁর উপন্যাস ক্যান্ডিড-এর একটি চরিত্র হিসেবে রেখেছিলেন, ডা. প্যাংলোস নামে, যিনি বলতেন, ‘অল ইজ ওয়েল ইন দিজ দ্যা বেস্ট পসিবল অব ওয়ার্ল্ডস।’
ইসমাইল কাদারে :
ঠিক। আলবেনিয়ার তখনো আলাদা কোনো অস্তিত্ব কিন্তু ছিল না, ছিল গ্রীকসহ বালকানের বাকি অংশগুলোর মতোই অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ। এরপরেও ওই প্রতিভাবান জার্মান মানুষটির কাছে ভাষাটি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। তাঁর পরবর্তী সময় অনেক জার্মান পণ্ডিত এই ভাষা নিয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন ও গবেষণা করেছেন, যেমনÑ ফ্রাঞ্জ বপ। আলবেনীয় ভাষা নিয়ে তাঁর লেখা বইটি খুবই ডিটেইল্ড, বিশদ।
প্যারিস রিভিউ :
এবার আলবেনিয়ান সাহিত্য নিয়ে কিছু বলুন। এর উৎস কোথায়? আলবেনীয় দান্তে, শেক্সপিয়ার বা গ্যেটে কি আছেন?
ইসমাইল কাদারে :
এই সাহিত্যের উৎস মূলত মৌখিক। আলবেনীয় ভাষায় প্রথম সাহিত্যের বই প্রকাশ পায় ষোড়শ শতাব্দীতে, যা ছিল বাইবেলের অনুবাদ। দেশটি তখন ক্যাথোলিক। এরপর লেখকদের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। উনিশ শতকের নাইম ফ্রাশেরি হলেন আলবেনীয় সাহিত্যের জনক, যদিও তিনি দান্তে কিংবা শেক্সপিয়ারের মতো এতটা বড় মাপের লেখক ছিলেন না। আলবেনিয়ার জাতীয় চেতনা জাগ্রত করার জন্য তিনি দেশাত্মবোধক দীর্ঘ মহাকাব্যের পাশাপাশি গীতিকবিতাও লিখেছেন। তাঁর পরেই আসেন গ্যের্জ ফিস্তা। আমরা এই দুইজনকে বলতে পারি আলবেনীয় সাহিত্যের মূল স্তম্ভ, যাদেরকে শিশুরা স্কুলে পাঠ করে থাকে। এদের পর আরো অনেক কবি-লেখকেরা আসেন যারা হয়তো এই দুইজনের চাইতেও ভালো সাহিত্য রচনা করেছেন, কিন্তু জাতির স্মৃতিতে, চেতনায় তারা স্থান করে নিতে পারেননি।
প্যারিস রিভিউ :
১৪৫৪ সালে তুর্কিরা কনস্টান্টিনোপল দখল করে নেয়, আর তারপর বালকান অঞ্চলের বাকি অংশ এবং গ্রীস। আলবেনীয় ভাষার উপর তুর্কির প্রভাব কেমন?
ইসমাইল কাদারে :
নেই-ই বলতে গেলে। শুধু কিছু প্রশাসনিক শব্দ এবং রান্নাবান্নার কিছু শব্দ, যেমন-- কেবাব, ক্যাফে, বাজারের মতো কিছু শব্দ ঢুকে গেছে। কিন্তু ভাষার কাঠামোর উপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি। কারণটা খুব সহজ। দুটি ভাষার গঠনপ্রকৃতি একদমই আলাদা, একদম ভিন্ন গঠনের দুটি যন্ত্রের মতো, ফলে চাইলেও এক যন্ত্রের খুচরো যন্ত্রাংশ অন্য আরেক যন্ত্র ব্যবহার করতে পারে না। আর তাছাড়া তুরস্কের বাইরে তেমন কোনো পরিচিতি ছিল না তুর্কি ভাষার। আধুনিক তুর্কি ভাষাটি নির্মাণ করেন ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর তুর্কি লেখকেরা, অথচ প্রশাসনিকভাবে তুর্কি কোনো জীবন্ত ভাষাই ছিল না। ফলে অটোমান সাম্রাজের অন্যান্য ভাষার উপর এর কোনো প্রভাব ছিল না। আমি যেসকল তুর্কি লেখকদের সাথে কথা বলেছি, তাঁরা বলেছেন যে তাঁদের ভাষায় সমস্যা রয়েছে।
প্যারিস রিভিউ :
আবার অন্যদিকে প্রচুর বিদেশি শব্দ কিন্তু তুর্কি ভাষায় ঢুকে পড়েছে, যেমন-- ফার্সি, আরবি, ফরাসি ইত্যাদি। আধুনিককালের আগে, ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে তুর্কি লেখকেরা ফার্সি অথবা আরবি ভাষাই ব্যবহার করতেন।
ইসমাইল কাদারে :
আমার কাছে, একজন লেখক হিসেবে, আলবেনীয় ভাষা হলো অভিব্যক্তি প্রকাশের এক অসাধারণ মাধ্যম। ভাষাটি সমৃদ্ধ, কোমল ও অভিযোজ্য। যেমনটা আমি আমার সর্বশেষ উপন্যাস স্পিরিটাস-এ বলেছি, এই ভাষার এমন কিছু রূপ আছে, যেগুলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র ধ্রুপদি গ্রীক ভাষায়, ফলে এতে রয়েছে এক প্রকার প্রাচীনত্বের ছোঁয়া। যেমন-- আলবেনীয় ভাষায় এমন কিছু ক্রিয়াপদ আছে যা শুভ বা অশুভ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে, ঠিক যেমনটা রয়েছে প্রাচীন গ্রীক ভাষায়। তাই গ্রিক ট্র্যাজেডি কিংবা শেক্সপিয়ার ও পরবর্তী ইউরোপীয় লেখাগুলো এই ভাষায় নিখুঁতভাবে অনুবাদ করা সহজ। নিৎসে যখন বলেছিলেন, গ্রীক ট্রাজেডি খুব তরুণ বয়সে আত্মহত্যা করেছে কারণ তা মাত্র একশ বছর বেঁচে ছিল, তখন ঠিকই বলেছিলেন। কিন্তু বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, গ্রীক ট্রাজেডি কিন্তু শেক্সপিয়ারের সময় পর্যন্ত টিকে ছিল এবং আজও বেঁচে আছে। বরং আমি মনে করি মহাকাব্যের যুগ শেষ হয়েছে। আর উপন্যাস তো এখনো নতুন ধারা, প্রায় শুরুই হয়নি বলতে গেলে।
প্যারিস রিভিউ :
তবু গত পঞ্চাশ বছর ধরে উপন্যাসের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে!
ইসমাইল কাদারে :
বাজে কথা বলার মানুষের তো অভাব নেই। কিন্তু বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, উপন্যাস যদি মহাকাব্যের দুটি প্রধান ধারাকে প্রতিস্থাপন করতে চায়, যার মধ্যে একটি হারিয়ে গেলেও ট্রাজেডি এখনো টিকে আছে, তবে বলা চলে উপন্যাসের মৃত্যু হতে আরও দুই হাজার বছর অন্তত লাগবে।
প্যারিস রিভিউ :
আপনার রচনাসমগ্রের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছে আপনি গ্রীক ট্রাজেডিকে আধুনিক উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
ইসমাইল কাদারে :
ঠিক ধরেছেন। আমি মহাকাব্যিক ধারা ও হাস্যরসাত্মক অদ্ভুতুড়ে ধারার সমন্বয় করতে চেষ্টা করছি। সেরা উদাহরণ হলো ডন কিহোতে, বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি।
প্যারিস রিভিউ :
এরপর উপন্যাস ভিন্ন অনেক ধারায় বিভক্ত হয়েছে।
ইসমাইল কাদারে :
একদমই না! আমার কাছে এইসব ধারা বিভাজনের অস্তিত্ব নেই। সাহিত্য সৃষ্টির নিয়মগুলো স্বতন্ত্র; সেগুলোর পরিবর্তন হয় না, এবং তা সর্বত্র, সকলের জন্য একই। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি তা হলো, আপনি মানব জীবনের তিন ঘণ্টার গল্প বলেন কি তিন শতাব্দীর, দিন শেষে তা ওই একই জিনিসেই দাঁড়ায়। যেই লেখক ন্যাচারালি খাঁটি জিনিস তৈরি করতে জানেন, সেই লেখক সহজাতভাবে নিজের জন্য উপযুক্ত কৌশলও তৈরি করে নেন। তাই সব রূপ বা ধারাই হলো ন্যাচারাল।
শুনুন, আমি মনে করি সাহিত্যের ইতিহাসে শুধু একটাই মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে, সেটা হলো, মৌখিক থেকে লিখিত মাধ্যমে আসা। সাহিত্যচর্চা বহুকাল ছিল মুখে মুখে, এরপর হঠাৎ ব্যাবিলনিয়ান ও গ্রীকরা লিখিত আকার আনলো। এতেই সব বদলে গেল। এর আগে কবিরা নিজেদের কবিতা আবৃত্তি করতেন বা গাইতেন। ফলে, প্রতিবার নিজের মতো করে কবিতা সম্পাদনা ও পরিবর্তন করার স্বাধীনতা তাঁদের ছিল। একইসাথে সেগুলো ছিল ক্ষণস্থায়ী, কারণ, কবিতা মুখে মুখে ঘুরে পরের প্রজন্মগুলোয় এসে বদলে যেত। কিন্তু লিখিত মাধ্যমে একবার লেখা হয়ে গেলে সেটা ওইখানেই থিতু। লেখকদের তখন পাঠ করা শুরু হয়, ফলে এতে তিনি লাভবান হন ঠিকই, কিন্তু একই সাথে যেটা হারান সেটা হলো স্বাধীনতা। সাহিত্যের ইতিহাসে এটা সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। এর বাইরে, ছোট ছোট অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে ভাগ, বিরামচিহ্নের ব্যবহার ইত্যাদি সেই অর্থে গৌণ পরিবর্তন।
উদাহরণস্বরূপ, তাঁরা বলেন, সমসাময়িক সাহিত্য খুব গতিশীল কারণ এটি সিনেমা, টেলিভিশন ও যোগাযোগের গতির দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু এর উল্টো দিকও সত্য! আপনি যদি প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের সাথে আজকের সাহিত্যের তুলনা করেন তাহলে খেয়াল করবেন যে, ক্লাসিকগুলো অনেক বড় ভূখণ্ডে পরিচালিত হতো, অনেক বিস্তৃত ক্যানভাসে আঁকা হতো, এবং এর এক প্রায় অসীম মাত্রা ছিল এক চরিত্র স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে আসতো, দেবতা থেকে নশ্বরে রূপ নিতো, আবার সাথে সাথেই নশ্বর থেকে দেবতা, মর্ত্য থেকে স্বর্গ, সব হতো একেবারে চোখের পলকে! ইলিয়াডের প্রথম দেড় পৃষ্ঠায় যে গতি, যে মহাজাগতিক দৃষ্টি, সেটা কোনো আধুনিক লেখকের লেখায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। গল্পটা কিন্তু সরল : আগামেমনন এমন কিছু একটা করেছেন যার কারণে দেবতা জিউস অসন্তুষ্ট। তাই, তিনি আগামেমননকে শাস্তি প্রদান করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। জিউস এক বার্তাবাহককে ডেকে বলেন, সে যেন পৃথিবীতে গিয়ে গ্রীক জেনারেল আগামেমননকে খুঁজে বের করে তাঁর মাথায় এক মিথ্যা স্বপ্ন ঢুকিয়ে দেয়। বার্তাবাহক ট্রয় নগরীতে প্রবেশ করে ঘুমন্ত আগামেমননকে খুঁজে পেয়ে তাঁর মাথার ভেতর পানীয়ের মতো করে এক মিথ্যা স্বপ্ন ঢেলে দিয়ে জিউসের কাছে ফিরে আসে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আগামেমনন তাঁর অফিসারদের ডেকে এনে বলেন যে, তিনি আজ খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখেছেন, তাই তাঁদের এখন ট্রোজানদের আক্রমণ করা উচিত। ওই যুদ্ধে আগামেমনন এক শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হন। এই সকল কিছুর উপস্থাপন থাকে মাত্র দেড় পৃষ্ঠায়! একজন দেবতা জিউসের কাছ থেকে এক স্বপ্ন নিয়ে, একেবারে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে এসে, সেটা আগামেমননের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়। আজকের কোন লেখক কি এমনটা করতে পারবে? ব্যালিস্টিক মিসাইলও তো এত গতিশীল না!
প্যারিস রিভিউ :
তথাপি, সাহিত্যে আধুনিকতাবাদও তো এসেছে জয়েস, কাফকা।
ইসমাইল কাদারে :
কাফকা খুব ধ্রুপদি ছিলেন, জয়েসও। জয়েস তাঁর ফিনেগানস ওয়েক-এ খুব আধুনিকতাবাদী হতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। কেউই সেই বই পছন্দ করেনি। এমনকি নভোকভের মতো জয়েস-প্রেমিকও এটিকে বাজে বলেছেন। কিছু উদ্ভাবন আছে যা আসলে গ্রহণযোগ্য নয়। চাইলেও একজন মানুষের কিছু প্রকৃতিগত বিষয়কে কেটে সরিয়ে ফেলতে পারেন না। ধরা যাক, এক পুরুষের সাথে এক নারীর সাক্ষাৎ হলো। তাঁরা একে অপরের প্রেমে পড়লো। সেই প্রেমে তখন সব রকমের সম্ভাবনা থাকতে পারে, সব রকমের বৈচিত্র থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে তো কেউ সেই নারীর শরীরকে অন্য আরেক প্রাণীর শরীর হিসেবে কল্পনা করতে পারবে না। যদি কেউ বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে সে সরাসরি ঢুকে পড়ে প্রতীকের রাজ্যে।
প্যারিস রিভিউ :
আপনি কি বলতে চাচ্ছেন মানুষের সৃজনশীলতার একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে?
ইসমাইল কাদারে :
হ্যাঁ। একভাবে আমরা মানবজাতির অতীত দ্বারা আবদ্ধ; আমাদের, যেমন ধরুন, কুমির বা জিরাফের মনস্তত্ত্ব জানার দরকার নেই। অতীতকে একটি বোঝা মনে হতে পারে, কিন্তু এই ব্যাপারে আমাদের কিছুই করার নেই। এই যে উদ্ভাবন, নতুন নতুন ঘরানা নিয়ে আমাদের এইসব হইচই, সব আসলে অর্থহীন। প্রথমে আসে প্রকৃত সাহিত্য, এরপর বাকি সব।
প্যারিস রিভিউ :
আপনি ‘নেতিবাচক সৃষ্টি’ সম্পর্কেও কথা বলেছেন। এটি বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন?
ইসমাইল কাদারে :
একজন লেখকের নেতিবাচক সৃষ্টি সেটাই যা সে লিখে না। কী লেখা উচিত আর কী লেখা উচিত নয় এটি বুঝার জন্য আপনার বড় প্রতিভার প্রয়োজন। একজন লেখকের চেতনায় অলিখিত কাজগুলো লিখিত কাজগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। নির্বাচনটা আপনাকে করতে হবে। আর, এই নির্বাচনটাই গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে, একজনকে সেইসব মরা লেখাগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে, একেবারে দাফন করে দিতে হবে সেগুলোকে, যেমনটি নির্মাণের জন্য জায়গা প্রস্তুত করার আগে ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কারণ সেইসব একজনকে তাঁর প্রকৃত লেখা লিখতে বাধা দেয়।
প্যারিস রিভিউ :
সিরিল কনোলির কথা মনে পড়ে গেল, যেমনটা তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যেই বইগুলো লিখিনি তা আমার বন্ধুদের লেখা বইগুলোর চেয়ে ঢের ভালো।’ যাইহোক, আপনার শুরুর দিনগুলো নিয়ে কথা বলা যাক। আপনার শৈশব দিয়েই শুরু করি। আপনি যখন অনেক ছোট তখনই তো যুদ্ধ শুরু হয়, যার ফলে পরবর্তী সময়ে আলবেনিয়ার সবকিছু বদলে যায় পুরোপুরি।
ইসমাইল কাদারে :
আমার শৈশব খুবই সমৃদ্ধ ছিল, কারণ আমি ছিলাম অনেক ঘটনার সাক্ষী। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমার বয়স পাঁচ। আমি থাকতাম জিরোকাস্তারে। খুব সুন্দর এক শহর। এই শহরের মধ্যে দিয়েই বিদেশি সৈন্যবাহিনী যেমন ইতালিয়রা, গ্রীকরা চলাচল করতো, যা ছিল নিরন্তর চমকের এক দৃশ্য। জার্মানরা, ইংরেজরা এই শহরে বোমাবর্ষণ করেছিল। একজন শিশুর কাছে এইসবই খুব উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। আমরা বিশাল বড় এক বাড়িতে থাকতাম। এর ভেতর ছিল প্রচুর ফাঁকা কক্ষ। আমরা সেইসব কক্ষে খেলাধুলা করে বেড়াতাম। এটা আমার শৈশবের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ। আমার দাদাবাড়ির লোকেরা সাধারণ সচ্ছল ছিল। বাবা ছিলেন কোর্টের বার্তাবাহক, যারা ট্রাইব্যুনালের চিঠিগুলো আনা-নেয়ার কাজ করে। কিন্তু আমার নানাবাড়ির লোকেরা ছিল বেশ সম্পদশালী। অথচ, মজার ব্যাপার হলো, আমার নানাবাড়ির মানুষেরা কমিউনিস্ট ছিলেন আর দাদাবাড়ির লোকেরা রক্ষণশীল এবং বিশুদ্ধতাবাদী। নিজেদের বাসায় অনাড়ম্বরভাবে থাকলেও যখন আমি নানাবাড়ি যেতাম তখনই আমি এক বড়লোক পরিবারের ছেলে হয়ে যেতাম। আমার বাবা ছিলেন কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে; আমার মা এবং তার পরিবার ছিলেন এর পক্ষে। তাঁরা এইসব নিয়ে কখনো ঝগড়া করতেন না, শুধু একে অপরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে খুনশুটি করতেন। স্কুলে আমি কমিউনিস্টপন্থী দরিদ্র ব্যাকগ্রাউন্ডের বাচ্চাদের মধ্যেরও কেউ ছিলাম না, না ছিলাম সেই ধনী পরিবারের বাচ্চাদের কেউ যারা রেজিমকে ভয় করতো। কিন্তু আমি দুই পক্ষকেই ভালো মতন চিনতাম। এই ব্যাপারটা আমাকে অনেক স্বাধীন করেছে, শৈশবের যে জটিলতাগুলো থাকে সেসব থেকে মুক্ত রেখেছে।
প্যারিস রিভিউ :
স্কুল-জীবন শেষে আপনি রাজধানী তিরানায় চলে যান এবং সেইখানের বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর আপনি যান মস্কোর গোর্কি ইনস্টিটিউটে। ক্রুশ্চেভের সময় ছিল সেটা, স্তালিনের শাসনামলের পর, যখন এক ধরনের মুক্ত পরিবেশ ছিল, আগের স্তালিন শাসনামলের ওই জমাট ব্যাপারটা তখন গলছে। ওই সময়ের মস্কোর সাহিত্য চর্চাটা কেমন ছিল?
ইসমাইল কাদারে :
আমাকে গোর্কি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছিল আমাদের রেজিমের একজন সরকারি লেখক হওয়ার জন্য। এই পুরো ব্যাবস্থাটাই ছিল সমাজতান্ত্রিক-বাস্তববাদ স্কুলের গোড়ামি তৈরি করার কারখানা। এমনকি তাঁদের মাত্র তিন বছর লাগতো আপনার ভেতরের সকল সৃজনশীলতা, সকল মৌলিকত্বকে হত্যা করতে। সৌভাগ্যবশত আমি ততদিনে যা যা পড়েছিলাম তা দিয়ে নিজের ভেতর এক প্রকার প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছিলাম। মাত্র এগারো বছর বয়সে আমি ম্যাকবেথ পড়েছিলাম, যা আমাকে বজ্রপাতের মতো আঘাত করেছিল এবং একইসাথে পড়েছিলাম গ্রীক ক্লাসিকগুলো। ফলে এমন কোনো শক্তি ছিল না যা আমার মননকে ধ্বংস করে, হত্যা করে। এলসিনোরে বা ট্রয়ের প্রাচীরে যা ঘটছিল তা আমার কাছে সমাজতান্ত্রিক-বাস্তববাদী উপন্যাসের সমস্ত জঘন্য বানোয়াট ব্যাপারগুলোর চেয়ে বেশি বাস্তব বলে মনে হয়েছিল।
ইনস্টিটিউটে আমি ওই মতদীক্ষাদানের দ্বারা চরম বিরক্ত ছিলাম, যা আমাকে একভাবে বাঁচিয়েছিল। নিজেকে বলতে থাকতাম যে, যাই হোক না কেন তাঁরা যেটা বলে সেটা আমি কোনোদিন তো করবোই না, বরং উল্টোটা করবো। তাঁদের সরকারি লেখকেরা সকলে ছিল পার্টির গোলাম, কয়েকজন বাদে, যেমন, কনস্ট্যান্টিন পাস্তভস্কি, চুকভস্কি, ইয়েভতুশেঙ্কো।
ওই ইনস্টিটিউটে থাকার সময় আমি একটা উপন্যাস লিখি যেটার নাম ‘দ্যা টাউন উইদআউট পাব্লিসিটি’ বা ‘প্রচারবিহীন শহর।’ আলবেনিয়ায় ফেরার পর একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম উপন্যাসটি কাউকে দেখাবো কি না। আমি ‘এ ডে অ্যাট দ্যা ক্যাফে’ শিরোনামে একটি ম্যাগাজিনে উপন্যাসটির ছোট এক অংশ প্রকাশ করেছিলাম, যা সাথে সাথে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বই বের করার তো প্রশ্নই ছিল না। এমনকি, কমিউনিস্ট যুবক সংঘের প্রধান, যিনি এটি প্রকাশের সুপারিশ করেছিলেন, পরে উদারতাবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পনেরো বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এর ফলে আমি সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল সমস্যা ধরতে পেরেছিলাম মিথ্যাবাদ। এই উপন্যাসটি আমার রচনাসমগ্রের ষষ্ঠ খণ্ডে প্রকাশিত হবে। আমার ফরাসি প্রকাশকরা সেগুলো এখন প্রস্তুত করছেন। উপন্যাসটি থেকে একটি শব্দও কিন্তু বদলানো হবে না।
প্যারিস রিভিউ :
তবুও, কৈশোরে আপনি কমিউনিজম দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তাই না?
ইসমাইল কাদারে :
এর একটা আদর্শবাদী দিক ছিল; কমিউনিজমের কিছু কিছু দিক খাতা-কলমে ভালো হলেও বাস্তবে এর চর্চাটি ছিল ভয়ঙ্কর। খুব জলদি আমি বুঝতে পারি, এই পুরো ব্যাপারটা খুব নিপীড়নমূলক, বিপর্যয়কর।
প্যারিস রিভিউ :
ইনস্টিটিউটে, আপনাকে কি নিষিদ্ধ বা ভিন্নমতাবলম্বী লেখক যেমন পাস্তেরনাক, আখমাতোভা, স্বেতায়েভা, মান্দালেস্তাম পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল?
ইসমাইল কাদারে :
আমি তখন গোগোল এবং পুশকিন পড়েছিলাম এবং দস্তয়েভস্কির কিছু উপন্যাস, বিশেষ করে দ্য হাউস অফ দ্যা ডেড এবং দ্যা ব্রাদার্স কারামাজভ পড়েছিলাম।
প্যারিস রিভিউ :
আর আলবেনিয়াতে?
ইসমাইল কাদারে :
আলবেনিয়াতে এইসব লেখক নিষিদ্ধ ছিলেন। বিদেশ ভ্রমণে গেলে কখনো কখনো এক-দুই খণ্ড জোগাড় করতে পারতাম। আমি অরওয়েল এবং কাফকা পাঠ করেছিলাম যাদের মধ্যে আমার কাফকাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। ১৯৮৪ ভালো লেগেছিল কিন্ত এনিমেল ফার্ম ভালো লাগেনি, কারণ ওই প্রাণীজগতের রূপকগুলো আমাকে কেন যেন ছুঁতে পারেনি। টোটালিটেরিয়ান দেশগুলোতে আসলে যা যা ঘটে, যা যা নোংরামি দেখতে পাওয়া যায় তার সঠিক উপস্থাপন সাহিত্য আজও আবিষ্কার করতে পারেনি।
প্যারিস রিভিউ :
ইংল্যান্ডে অরওয়েল ছিলেন অনন্য। যে সময়ে বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সহযোগী কিংবা সহযাত্রী ছিলেন, সেই সময় তিনি টোটালিটেরিয়ানিজমের প্রকৃতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা প্রকাশ করেছিলেন।
ইসমাইল কাদারে :
আমি বুঝতে পারি না সার্ত্রে কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ডিফেন্ড করতে পারেন। চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাঁকে বলা হয়েছিল যে, সেখানে হাজার হাজার লেখক, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীকে নির্যাতন করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। এরপরও তিনি একজন মাওবাদী হয়ে উঠলেন!
প্যারিস রিভিউ :
মৃত্যুর পর তো কাম্যু জিতে গেলেন তাহলে দেখা যাচ্ছে, তাঁর খ্যাতি তো সম্প্রতি সময়ে বেড়ে গিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, তিনি প্রতিটি রাজনৈতিক ইস্যুতে সঠিক ছিলেন, আর সার্ত্রে ছিলেন ভুল। নানান ধরনের চাপের পরও কাম্যু সেই সময় কিন্তু নিজের অবস্থানে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, ওই সময়ে ব্যাপারটা কিন্তু সহজ ছিল না মোটে।
ইসমাইল কাদারে :
কাম্যুর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে তিনি অনুকরণীয়। বেশিরভাগ পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী যারা এখানে মুক্তভাবে বসবাস করতে পারতেন, সর্বগ্রাসী একনায়কত্ব দ্বারা কোনো ভয় যাদের ছিল না, তারা আশা করেছিলেন যে আমরা সাহস দেখাব এবং আমাদের জীবনের ঝুঁকি নেব। চীনে এটি আলবেনিয়ার চেয়েও খারাপ ছিল। পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা তখন কেন প্রতিবাদ করলেন না?
প্যারিস রিভিউ :
১৯৬০ সালে আলবেনিয়ায় ফিরে এসে বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্যা জেনারেল অব দ্যা ডেড আর্মি’ প্রকাশ করেন আপনি। গল্পটি কি কোনো সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা?
ইসমাইল কাদারে :
ক্রুশ্চেভের সংশোধনবাদের জন্য আনোয়ার হোজ্জা সবেমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেশটিকে পশ্চিমমুখী হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন সাংস্কৃতিক উদারতাবাদের ভান করে সোভিয়েত ইউনিয়ন নাকি পশ্চিমাদের আকৃষ্ট করছে। এমনই এক সময় আমার উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর থেকেই সরকারি সমালোচকেরা এর বিরোধিতা করে এসেছে। তারা আমাকে আশাবাদী না থাকার জন্য, ইতালীয় জেনারেলের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ না করার জন্য, সর্বজনীন হওয়ার জন্য এবং আরও অনেক কিছুর জন্য দোষারোপ করেছিলেন।
প্যারিস রিভিউ :
আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মনস্টার’-এ আপনি রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করেছেন। বইটি কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল?
ইসমাইল কাদারে :
মনস্টার-এর কাহিনি এমন ছিল, এক শহরে সুন্দর সকালবেলায় হঠাৎ ট্রয়ের ঘোড়ার উদয় হয়। ঘোড়ার ভেতর ইউলিসিসের মতোই চরিত্রগুলো বসেছিল, দিনের পর দিন অপেক্ষা করছিল নগরের দরজা পতনের। কিন্তু এখানে ঘটে অন্য ঘটনা। ট্রয়ের পতন হয় না; তাই ঘোড়াটাও চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষগুলো স্থায়ী এক অস্থিরতার ভেতর বসবাস করতে থাকে। তাঁরা বলে, এখন আমরা বাঁচবো কেমন করে? তিন হাজার বছর ধরে এভাবেই ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। সে অমর। আমরা কি-ই বা করতে পারি? তারা ষড়যন্ত্র নিয়ে, হুমকি নিয়ে একে অপরের সাথে ফিসফিস করে কথা বলতে থাকে, বলতে থাকে যে, জীবনটা আর স্বাভাবিক নেই। যেহেতু টোটালিটেরিয়ান রেজিম বহির্হুমকি সম্পর্কিত এক মিথ্যা সন্দেহের উপর প্রতিষ্ঠিত, ফলে রেজিমের দমন-নিপীড়নকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য একটি শত্রুর তাই প্রয়োজন।
প্যারিস রিভিউ :
এই উপন্যাসটিও তো নিষিদ্ধ হলো। আপনার উপার্জন তাহলে হতো কেমন করে? কারণ কেউ যদি সরকারি লেখক না হয়ে থাকে, লেখক সংঘের সদস্য না হয়ে থাকে, তাহলে তো উপার্জনের কোনো পথ আর নেই।
ইসমাইল কাদারে :
যদিও তারা আমার লেখা প্রকাশ করেছিল আবার পালাক্রমে নিষিদ্ধও করেছিল, একবার আপনি একজন লেখক হিসেবে প্রকাশিত এবং স্বীকৃত হয়ে গেলে, আপনি লেখক ইউনিয়নের সদস্য হয়ে যান এবং একটি মাসিক বেতন পেতে থাকেন, যা প্রত্যেকের জন্য সমান ছিল, হোক সে মেধাবী অথবা বদমাশ। কিন্তু এই টাকা আদতে আমার আগের বিক্রীত বইয়ের রয়্যালটির এক হাজার ভাগের এক ভাগের সমান ছিল।
প্যারিস রিভিউ :
এমন দমন-পীড়নমূলক পরিবেশ থেকে আপনি কীভাবে দ্য জেনারেলকে ফ্রান্সে অনুবাদ করে প্রকাশ করতে পারলেন?
ইসমাইল কাদারে :
আলবেনিয়াতে, সমস্ত পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির মতো, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী ভাষায় বেশ কয়েকটি বই অনুবাদ করার জন্য একটি সংস্থা কাজ করত। তাঁরাই আমার বই ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে। ঘটনাক্রমে সাংবাদিক পিয়ের প্যারাফ এটি পড়ে পছন্দ করেন এবং একজন ফরাসি প্রকাশকের কাছে এটি সুপারিশ করেন।
প্যারিস রিভিউ :
পশ্চিমে এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিলাভের পর কি নিজেকে নিরাপদ মনে হতো?
ইসমাইল কাদারে :
হ্যাঁ, কিন্তু তাতে আমার উপর নজরদারি বেড়ে যায়, কারণ আমাকে হুমকি হিসেবে দেখা হতো।
প্যারিস রিভিউ :
এবার আপনার উপর যাদের প্রভাব রয়েছে তাদের নিয়ে আলাপ করা যাক। প্রথমত, গ্রীক ট্রাজেডি যারা লিখেছিলেন তাঁদের প্রতি আপনার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে, বিশেষ করে এসকাইলাসের উপর, যাকে নিয়ে আপনি এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন ‘এসকাইলাস অর ইটার্নাল লুজার’ শিরোনামে। তাঁকে নিয়েই কেন?
ইসমাইল কাদারে :
আমি গ্রীক ট্রাজেডির সাথে টোটালিটারিয়ান দেশের ঘটনাগুলোর মাঝে মিল খুঁজে পেয়েছি, বিশেষ করে অপরাধের পরিবেশ এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের দিকটির সাথে। হাউস অফ অ্যাট্রিয়াসের কথাই ধরুন, যেখানে এক অপরাধ আরেক অপরাধের জন্ম দেয় ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন না সকলে খুন হয়। হোজ্জার দল কি ভয়ানক সব অপরাধই না করেছে। যেমন, ১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী মেহমেত শেহু ‘আত্মহত্যা’ করেন, যা আসলে ছিল খুন। হোজ্জা খুনটি করিয়েছিল। আমার ক্ষেত্রে আমার আন্তর্জাতিক খ্যাতি আমাকে গ্রেফতার হওয়া থেকে বাঁচালেও ধারাল ছোরা থেকে তো বাঁচাতে পারতো না। তাঁরা আমাকে হত্যা করে সেই মৃত্যুকে অনায়াসে আত্মহত্যা কিংবা গাড়ি দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিতো।
প্যারিস রিভিউ :
আচ্ছা, এবার তর্কের খাতিরে একটা সমাজ ধরে নেই, যেমন স্তালিনের রাশিয়া, যেখানে বেঁচে থাকাটাই একটা বড় ব্যাপার। সেই সমাজের এমন লোকদের কথা আমরা বলতে পারি যারা মান্দালেস্তামের মতো খুন হয়েছেন, বা আত্মহত্যা করেছেন স্তেতায়েভার মতো কিংবা লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন পাস্তেরনাকের মতো যিনি পরবর্তী জীবন শুধু শেক্সপিয়ারই অনুবাদ করে গেছেন। এমন আরও উদাহরণ দেয়া যায়। ১৯৭০ সালে আপনি ছয়শ পৃষ্ঠার উপন্যাস দ্যা লং উইন্টার লেখেন, যা কোনো পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক ঘটনার উপর নয় বরং একেবারে ওই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে লেখা। আপনার বইটি সংশোধনবাদের সমালোচনা এবং হোজ্জাকে সমর্থন করে বলে মনে হয়েছে। বইটি কেন লিখলেন? আপনি বরং অন্য কোনো রূপকাশ্রয়ী কাহিনি লিখতে পারতেন এর বদলে।
ইসমাইল কাদারে :
১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আমি স্বৈরশাসকের সরাসরি নজরদারিতে ছিলাম। মনে রাখতে হবে, হোজ্জা নিজেকে একজন লেখক-কবি বলে মনে করতেন এবং তাই লেখকদের নিজের ‘বন্ধু’ বলে বিবেচনা করতেন। বুদ্ধিজীবীদের জন্য যা বড় দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। যেহেতু আমি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক, তাই তিনি আমার প্রতি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে আমার কাছে তিনটা পথ খোলা ছিল : নিজের বিশ্বাস মেনে চলা, যার ফলাফল মৃত্যু; পূর্ণ নীরবতা, যার ফলাফল হলো আরেক ধরনের মৃত্যু; অথবা তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো, অর্থাৎ সহজ ভাষায় বললে এক প্রকার ঘুষ দেয়া। আমি তৃতীয় পথটি বেছে নেই এবং ‘দ্যা লং উইন্টার’ লিখি। আলবেনিয়া তখন চীনের মিত্র হয়ে উঠেছিল, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে কিছু বিরোধ দেখা দেয়ায় সেই বন্ধুত্ব পরে ভেঙে যায়। ডন কিহোতে-এর মতো আমার মনে হয়েছিল আমার বই হোজ্জাকে অনুপ্রেরণা দিবে যার ফলে সেই ভাঙন আরও ত্বরান্বিত হবে। পরিষ্কার করে বললে, আমি আসলে ভেবেছিলাম সাহিত্য সেই অসাধ্য সাধন করবে-একনায়ককে পরিবর্তন করবে।
প্যারিস রিভিউ :
আমার জানামতে এই বইটিই একমাত্র বই, যেখানে আপনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। অন্যথায় আপনি বিভিন্ন ছদ্মবেশ ব্যবহার করেনমিথ, রূপক, হাস্যরস। আমি ভাবছি দ্যা পিরামিড এবং দ্যা প্যালেস অব ড্রিমস-এর কথা, যা যথাক্রমে প্রাচীন মিশর এবং অটোমানদের সময়ের উপর ভিত্তি করে লেখা। দ্যা পিরামিড বইয়ে ফেরাইউন চিওপস এমন একটি পিরামিড তৈরি করতে চায় যা অন্য যেকোনো পিরামিডের চেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে আসলে এতে এমন একটি উদ্যোগকে দেখানো হচ্ছে যা প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি নিপীড়নকে ন্যায্যতা এবং বৈধতা দিবে। দ্যা প্যালেস অব ড্রিমস বইতে স্বপ্নকে ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ভাগ করা হয়। আপনার আলবেনীয় পাঠক কি সোভিয়েত সাম্রাজ্য এবং ফেরাউন হোজ্জার দিকে করা ইঙ্গিতটি ধরতে পেরেছে?
ইসমাইল কাদারে :
হ্যাঁ পেরেছে। তারা স্পষ্ট ধরতে পেরেছে যে আমি কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যের প্রতি ইঙ্গিত করছি, সেই জন্য তো দ্যা প্যালেস অব ড্রিমস-কে নিষিদ্ধ করা হয়।
প্যারিস রিভিউ :
আপনি কি সেইসব লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন যারা একই রকম কৌশল ব্যবহার করেছিলেন নিজেদের লেখায়-যেমন, বুলগাকভ তাঁর দ্য মাস্টার এবং মার্গারিটা তে, জামায়াতিন তাঁর জেড এ, যা অরওয়েলের ১৯৮৪ কে অনুপ্রাণিত করেছিল, সেইসাথে হরাবাল এবং কুন্ডেরা, বা কাফকার দ্য ক্যাসেল এবং দ্য ট্রায়াল-একটি নিপীড়নমূলক ও বদ্ধ সিস্টেমের প্রোটোটাইপ নির্মাণে?
ইসমাইল কাদারে :
আমি সেইগুলো পড়েছিলাম এবং এই মিলের ব্যাপারে সচেতন ছিলাম। একই সাথে আমি যেন কোনো ক্লিশে জিনিস ব্যবহার না করি এই ব্যাপারে উদ্বিগ্নও ছিলাম। আসল ব্যাপারটা হলো লেখাটি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে কিনা, সাথে তো এক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই হবে। এই দিক থেকে দেখলে দ্যা প্যালেস অব ড্রিমস সফল।
প্যারিস রিভিউ :
সোভিয়েত গুলাগ থেকে সোলঝেনিটসিন, নাটালিয়ো গিনজবার্গ, নাদেজ্দা মান্দালেস্তাম এবং অন্যান্য লেখকদের হাত ধরে একটি সমৃদ্ধ সাক্ষী সাহিত্য তৈরি হয়েছে। আলবেনিয়াতে কি গুলাগ ছিল?
ইসমাইল কাদারে :
হ্যাঁ, কিন্তু খুবই কম, যেহেতু দেশটি ছোট। পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হবার ভয়ে হোজ্জা বেশ কিছু অ্যান্টিনিউক্লিয়ার বাঙ্কার তৈরি করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো একবারেই অকেজো ছিল, কারণ সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল এক প্রকার ভয়ের মনোব্যাধি তৈরি করা মানুষের মধ্যে।
প্যারিস রিভিউ :
আপনার প্রতি সন্দেহজনক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও হোজ্জা আপনাকে সংসদ সদস্য করেছিলেন। কেন?
ইসমাইল কাদারে :
এমনই। তিনি নিজেই সংসদ সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করতেন, আর যদি কেউ এতে আপত্তি জানাতো, তাঁকে মেরে ফেলতেন। তাই কেউ কখনো এটাকে প্রত্যাখ্যান করেনি। সংসদ সদস্যদের কাজও তেমন কিছু ছিল না। বছরে একবার সংসদ ডাকা হতো, সেখানে হোজ্জা যা চাইতেন তা-ই হতো কোনো আলোচনা, কোনো ডিবেট কিছুই হতো না। শ্রমিক, বিজ্ঞানী, লেখকদের মধ্য থেকে সংসদ সদস্যদের বেছে নেওয়া হতো, যাতে এটা মনে হয় সংসদ সত্যি সত্যি বুঝি দেশের জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে।
প্যারিস রিভিউ :
পশ্চিমে আপনার বইয়ের সাফল্যের পর চাইলে আপনি দেশ ছেড়ে যেতে পারতেন। আপনি কি কখনো তাতে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন? ১৯৯২ সালে প্রকাশিত আপনার বই দ্য আলবেনিয়ান স্প্রিং-এ বলেছেন যে আপনি বেশ কয়েকবার নাকি ফ্রান্সে প্রায় থেকেই গিয়েছিলেন।
ইসমাইল কাদারে :
ছেড়ে যাইনি, কারণ এর ফলে আমাকে না পেয়ে আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এমনকি পরিচিতদের উপর প্রতিশোধ ও নেয়া হতো। ১৯৮৩ সালে আমি থাকার উদ্দেশ্য নিয়েই ফ্রান্সে আসি। এরপর বুঝি যে, সেটা সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার দেশ, আমার ভাষা, আমি যাদের ভালোবাসতাম তাদের সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের ঝুঁকি ছিল। আমার ফরাসি বন্ধুরা আমাকে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল এবং আমি তেমনটাই করেছিলাম।
প্যারিস রিভিউ :
পরে দ্যা শ্যাডো নামের যে দুঃখের উপন্যাস আপনি লিখেছিলেন, তাতে এই ছিঁড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা হয় একদিকে নির্বাসন এবং স্বাধীনতা, অন্যদিকে নিপীড়ন এবং স্বৈরশাসন। আপনি কি নির্বাসনে ভয় পেয়েছিলেন?
ইসমাইল কাদারে :
না। একজন লেখক সর্বদাই কোনো না কোনোভাবে নির্বাসনে থাকেন, যেখানেই থাকুন না কেন, কারণ তিনি কোনো না কোনোভাবে সবকিছুর বাইরে থাকেন, থাকেন অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন; সবসময় একটি দূরত্ব কিন্তু থেকে যায়।
প্যারিস রিভিউ :
তাহলে কমিউনিজমের পতনের পর চলে গেলেন কেন?
ইসমাইল কাদারে :
আমি ১৯৯০ সালে চলে গিয়েছিলাম, যখন আলবেনিয়া গণতন্ত্র এবং একনায়কত্বের মধ্যে দোদুল্যমান ছিল। আমি ভেবেছিলাম আমার প্রস্থান গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হবে। আমি বলেছিলাম যে, দেশ স্বৈরাচার বেছে নিলে আমি আর ফিরব না, এবং সেই হুমকি গণতন্ত্রের সংগ্রামকে উদ্দীপিত করেছিল। আমি দ্যা প্যালেস অব ড্রিমস-এর প্রকাশনার জন্য ফ্রান্সে এসেছিলাম তখন, এবং আমি একটি প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়েছিলাম। সংবাদমাধ্যম সেটি রিপোর্ট করে, ফলে সেটা গণতন্ত্রের বিজয়ের পক্ষে একটি নির্ধারকের ভূমিকা পালন করে।
প্যারিস রিভিউ :
জনগণ আপনাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একপর্যায়ে চেয়েছিল, চেকোস্লোভাকিয়ার হ্যাভেলের মতো। কিন্তু আপনি তা প্রত্যাখ্যান করে দেন। কেন?
ইসমাইল কাদারে :
আমি তা প্রত্যাখ্যান করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করিনি। আমার পরিস্থিতি হ্যাভেলের চেয়ে ছিল আলাদা। শুধু স্বাধীন এক লেখক হয়েই থাকতে চেয়েছি আমি।
প্যারিস রিভিউ :
ভালোই একটা সংকট কিন্তু : চেকোস্লোভাকিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী কিছু লেখকের মতো হয়ে কি একনায়কত্বকে প্রতিরোধ করা উচিত, নাকি সেইসব জার্মান লেখকদের মতো পালিয়ে যাওয়া উচিত যারা হিটলার ক্ষমতায় আসার পর পালিয়ে গিয়েছিল। তাঁরা তো একেবারে দলে দলে পালিয়ে যান।
ইসমাইল কাদারে :
নির্বোধের মতো বললে তো হবে না! প্রতিটি দেশে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। আপনি চেকোস্লোভাকিয়ার সাথে হোজ্জার অধীনে থাকা আলবেনিয়ার তুলনা করতে পারেন না। আমাদের ডাবচেক বলে কেউ ছিলেন না, কিংবা চেক বসন্তের মতো কোনো কিছুও হয়নি। হ্যাভেল যদি আলবেনিয়ায় থাকতেন, তাহলে তাঁকে সাথে সাথে গুলি করে মারা হতো। এ কারণেই স্তালিনের অধীনে রাশিয়ায় কোনো ভিন্নমত ছিল না। কেউ কিছুই করতে পারেনি। রোমানিয়ার মতো আলবেনিয়াতেও স্তালিনবাদ শেষ অবধি স্থায়ী ছিল। হ্যাভেল যখন কারাগারে ছিলেন, তাঁর টাইপরাইটার ছিল, বিশ্ব মিডিয়ার অ্যাক্সেস ছিল, সবাই তাঁকে নিয়ে কথা বলতো। যারা চেকোস্লোভাকিয়ার সাথে আমাদের পরিস্থিতি তুলনা করে তাদের স্তালিনবাদী দমন-পীড়ন সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই।
প্যারিস রিভিউ :
তাহলে কি সত্যি আপনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন?
ইসমাইল কাদারে :
পুরোপুরি না। প্রতিটি শাসককে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সম্মান নিয়ে মুখ বাঁচাতে হয়, ফলে আপনি যদি একজন বিখ্যাত লেখক হন তবে শাসককে সতর্ক থাকতে হয়। হোজ্জা একজন কবি হিসেবে, সোরবোনের ছাত্র হিসেবে, একজন লেখক হিসেবে স্বীকৃত হতে চেয়েছিলেন, খুনি হিসেবে নয়। এই ধরনের স্বৈরাচারের অধীনে একজন লেখকের একমাত্র কাজ হলো প্রকৃত সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করা। এই দায়িত্বটি ঠিকমতো পালন করলে এর প্রভাব অনন্তকালের জন্য রয়ে যায়। এই বাদে অন্য কিছু আশা করা হলো হীনম্মন্যতা এবং অপরাধের প্রকাশ। আলবেনীয়রা আমাকে এমন একজন লেখক হিসেবে মনে করতেন যিনি তাদের বহির্বিশ্বের সাথে সংযুক্ত করেছিলেন। আমি আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে আধিপত্য বিস্তার করেছি এবং নিজের কাজ দিয়ে আলবেনীয় সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছি, কারণ একদিকে ছিল আমার কাজ আর অপরদিকে ছিল কমিউনিস্টদের তৈরি মূল্যহীন পণ্য। আমার একটি বই প্রকাশের পনেরো মিনিটের মাঝেই বিক্রি হয়ে যায়। প্রত্যেকটি কপিই বিক্রি হয়ে যায় সাথে সাথে। লোকেরা জানতো বইটি হয়তো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে, তাই তাঁরা তড়িঘড়ি করে বইটি সংগ্রহ করত। মাঝে মাঝে তো বইগুলো বিতরণের আগেই নিষিদ্ধ করা হতো, কিন্তু ততক্ষণে হাজার হাজার কপি ছড়িয়ে যেত সব দিকে এবং লোকেরা একে অপরের কাছে তা প্রেরণ করত।
প্যারিস রিভিউ :
প্রকাশের আগে কি আপনার পাণ্ডুলিপিটি লেখক সংঘে পরিদর্শনের জন্য জমা দেওয়ার নিয়ম ছিল কি, যেমনটা রাশিয়ায় ছিল?
ইসমাইল কাদারে :
না। আলবেনিয়াতে বই প্রকাশের আগে কোনো সেন্সরশিপ ছিল না; যেহেতু চারদিক সন্ত্রাসে ভরা ছিল, ওই সেল্ফ-সেন্সরশিপই ছিল যথেষ্ট। এটা আসলে ছিল হোজ্জার এক ধরনের চালাকি, যেহেতু সে নিজেকে একজন বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করত। তাই তখন প্রকাশকেরাই সিদ্ধান্ত নিতেন তাঁরা বই প্রকাশ করবেন কি করবেন না। যখন আমি প্রকাশকের হাতে দ্যা প্যালেস অব ড্রিমস হস্তান্তর করি তখনই জানতাম যে, এটা একটি বিপজ্জনক বই হতে চলেছে। প্রকাশক বইটি পড়েও একই কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, বইটি প্রকাশ করার ঝুঁকি তিনি নিতে পারবেন না। তাই আমি প্রকাশককে বলে এর সকল দায়দায়িত্ব নিয়ে নিলাম, বললাম, যদি তাঁরা আপনাকে এই নিয়ে হেনস্তার চেষ্টা করে তবে বলবেন যে, আপনি আমার খ্যাতির কারণে বইটি প্রকাশ করেছেন, লাগলে আরও বলবেন যে, আমি আপনাকে বকাঝকা করে বইটি প্রকাশ করিয়েছি। এমন পরিস্থিতিতে তারা সবসময় লেখককে শাস্তি দেয়, প্রকাশককে নয়। বাস্তবে তা-ই হয়েছিল। তিনি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে, আমার খ্যাতি এবং প্রতিপত্তির কথা বিবেচনা করে আমার পাণ্ডুলিপি প্রত্যাখ্যান করার সাহস পাননি।
প্যারিস রিভিউ :
তাহলে দেখা যাচ্ছে, আপনাদের মতো লেখকেরা পশ্চিমাদের ভালোই ইশারা-সংকেত দিয়েছিলেন, কিন্তু পশ্চিমারা বিশ্বাস করতে চায়নি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অবস্থা কতটা ভয়াবহ হয়ে গিয়েছিল।
ইসমাইল কাদারে :
আলবেনিয়ায় সবাই জানত যে আমি একজন শাসনবিরোধী লেখক। আর যেহেতু সত্যি সত্যিই সরকার আমাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, তাই এটি অন্যদের সাহসও জুগিয়েছিল। এটাই হলো সাহিত্যের মৌলিক কাজ : নৈতিকতার মশাল জ্বালিয়ে রাখা। ১৯৮৮ সালে ফ্রান্স আমাকে ইনস্টিটিউট ডি ফ্রান্সের একজন সম্মানিত সদস্য করেছিল। খুবই বড় এক সম্মাননা। তখন এক ফরাসি সাংবাদিক রেডিওতে আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, খোলাখুলি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমাকে যে, আমি নিজের খুশি মতো মুক্তভাবে লিখতে পারি কি না। আমি উত্তরে ‘না’ বলেছিলাম। কারণ আমাদের দেশে স্বাধীনতার সংজ্ঞাটাই তো আলাদা। ওইটুকুই বলেছিলাম। এর বেশি আর কী-ইবা বলতে পারতাম? শাসনের বিরুদ্ধে তো আর খোলামেলা কথা বলা সম্ভব ছিল না। আমি শুধু তখন আমাদের শেকল বাঁধা পরাধীন মানুষকে একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির একটু স্বাদ দেয়ার চেষ্টা করতাম, যেই স্বাদ বিশ্বের মুক্ত মানুষেরা পেয়ে থাকে হরহামেশা।
প্যারিস রিভিউ :
সত্যিকারের সাহিত্য বলতে আপনি কী বোঝাতে চান তা ব্যাখ্যা করতে পারবেন?
ইসমাইল কাদারে :
আপনি সেটি সাথে সাথেই, সহজাতভাবে, চিনতে পারবেন। প্রতিবার একটা বই লেখার পর আমার মনে হতো যেন স্বৈরাচারের ভেতর একটি ছোরা ঢুকিয়ে দিয়েছি আমি, আর একইসাথে জনতাকে সাহস দিয়েছি।
প্যারিস রিভিউ :
ইউগোস্লোভিয়ায় যা ঘটেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন করতে চাই, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনার পরিবারসহ আলবেনিয়ার অর্ধেক মানুষ মুসলমান। আপনি কি ধর্মীয় শিক্ষায় বেড়ে উঠেছিলেন? বর্তমানে যেহেতু স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছে, ফলে আলবেনিয়ায় এখন কি ইসলামিক মৌলবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে বলে মনে করেন?
ইসমাইল কাদারে :
তেমনটা মনে করি না আমি। আমার পরিবার নামে মাত্র মুসলমান, ইসলামের চর্চা হয়নি কখনো। আমার আশেপাশের কেউই ধার্মিক ছিলেন না। এছাড়া আলবেনিয়ার মুসলমানেরা বেকতাশি সম্প্রদায়ের। তাঁরা মডারেট, এমনকি বসনিয়ার চাইতেও বেশি। তাই আমি মনে করি না আমাদের এই নিয়ে চিন্তা করার কিছু আছে।
প্যারিস রিভিউ :
আপনার পেশার দিকে এবার ফিরে আসা যাক। আপনি কীভাবে আপনার সময়কে তিরানা এবং প্যারিসের মধ্যে ভাগ করেন? আর যেখানেই থাকেন না কেন, দিন কীভাবে কাটে আপনার?
ইসমাইল কাদারে :
তিরানার থেকে আমি প্যারিসে থাকি বেশি। কারণ সেখানে আমি কাজ ভালো করতে পারি। তিরানায় রাজনৈতিক ঝামেলা থেকে শুরু করে নানান কিছু লেগেই থাকে। একই সাথে প্রচুর আবদার রাখতে হয় সেখানে। কেউ এসে বলে, এইখানে একটি ভূমিকা লিখে দেন, এইখানে একটি নিবন্ধ লিখে দেন। সব আবদার তো আর রাখা সম্ভব হয় না।
আর দিনের বেলা কী করি, বলি। সকালবেলায় স্রেফ দুই ঘণ্টা লিখি, এরপর সব বন্ধ করে দেই। আমি একবারে বেশি লিখতে পারি না, আমার মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কাজে বিঘ্ন ঘটায় এমন সবকিছু থেকে নিজেকে দূরে রেখে একটি নিরিবিলি ক্যাফেতে লেখালেখি করি। বাকি সময়টা কাটে বই পড়ে, বন্ধুদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে। এমনটাই করে এসেছি সারাটি জীবন। এভাবেই থাকবো।
প্যারিস রিভিউ :
আপনার জন্য লেখালেখি সহজ না কঠিন? আপনি লেখার সময় আনন্দে থাকেন না চিন্তিত?
ইসমাইল কাদারে :
লেখালেখি সুখের বা দুঃখের কোনো পেশা নয়, এর মাঝামাঝি কিছু একটা। প্রায় একটি দ্বিতীয় জীবনের মতো। আমি সহজেই লিখি, কিন্তু লেখাটা ভালো হলো কি না, তা নিয়ে চিন্তিত থাকি। এখানে মেজাজ স্থির রাখাটা প্রয়োজন। সুখ বা দুঃখ দুটোই সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর। সুখে থাকাকালে লেখা হালকা ও চপল হয়ে উঠে, আর দুঃখে থাকাকালে দৃষ্টিভঙ্গি এলোমেলো হয়ে থাকে। আগে বাঁচতে হবে, জীবন থেকে অভিজ্ঞতা নিতে হবে, তারপর লিখতে হবে।
প্যারিস রিভিউ :
টাইপরাইটারে লিখেন নাকি হাতে?
ইসমাইল কাদারে :
আমি হাতে লিখি আর আমার স্ত্রী কষ্ট করে সেটা টাইপ করে দেয়।
প্যারিস রিভিউ :
আপনি কি অনেক বেশি পুনর্লিখন করেন?
ইসমাইল কাদারে :
খুব একটা না। ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন আনি, বড় কিছু না।
প্যারিস রিভিউ :
প্রথমে কোনটা আসে--প্লট, চরিত্র নাকি আইডিয়া?
ইসমাইল কাদারে :
নির্ভর করে। ব্যাপারটা একেকটা বইয়ের জন্য একেক রকম। পুরো প্রক্রিয়াটি অস্পষ্ট, রহস্যময় বলে মনে হয় আমার কাছে। দ্যা প্যালেস অব ড্রিমস-এর কথাই ধরুন। আগের এক উপন্যাসে, দ্যা কর্নার অব শেম-এর একটা পৃষ্ঠায় আমি স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করার আইডিয়াটি প্রথমবার তুলে আনি। পরে মনে হয়, এত ছোট করে, খাপছাড়াভাবে এর ব্যাপারে লেখা ঠিক না। তাই ওই বিষয়বস্তুর উপর একটা ছোট গল্প লিখে ফেলি। শুরুতে প্রকাশের ব্যাপারে না ভাবলেও একটি গল্প সংকলনে ওই গল্পটির দুটি অধ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর যেখন দেখলাম এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো দৃষ্টিপাত নেই, তখন আমার সাহস বেড়ে যায় আর সেই গল্পকে আমি একটি উপন্যাসে রূপান্তর করে ফেলি। সুতরাং দেখতেই পাচ্ছেন, একটি বই সৃষ্টির ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়।
প্যারিস রিভিউ :
যারা আপনার লেখা মূল আলবেনীয় ভাষায় পড়েন, তাঁরা সকলেই আপনার গদ্যের সৌন্দর্যের খুব প্রশংসা করেন। শৈলীর নিয়ে কি আপনি সচেতন থাকেন খুব?
ইসমাইল কাদারে :
ভাষা সম্পর্কে আমি খুবই সতর্ক থাকি সবসময়। উদাহরণস্বরূপ, আমি সবসময় কবিতা লিখি কারণ কবিতা আপনাকে ভাষা নিয়ে কাজ করতে বাধ্য করে। দুই রকমের ভাষাগত সমৃদ্ধি রয়েছে : প্রথমটা দামি পাথরের মতো অর্থাৎ রূপক, উপমা, ছোট ছোট আবিষ্কার আর বাদবাকি জিনিস মিলিয়ে হয় দ্বিতীয়টি। যখন এই দুটি নিখুঁতভাবে মিশ্রিত হয় একটি লেখায়, এমন এক লেখা যা সুন্দরভাবে লেখা এবং একইসাথে যার ভেতরের বিষয়বস্তুও যথেষ্ট শক্ত, সেটা খুব আনন্দ দেয় আমাকে। কিন্তু আমার পক্ষ থেকে কোনো সচেতন শৈলীগত চেষ্টা থাকে না।
প্যারিস রিভিউ :
আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটায় কোন জিনিস? হেমিংওয়ে বলতেন, টেলিফোন কাজের খুব ক্ষতি করে।
ইসমাইল কাদারে :
তিরানায় কেউ খুব প্রয়োজন ছাড়া ফোন ব্যবহারের সাহস পায় না। কারণ, ফোনগুলো সব নজরদারির মধ্যে থাকে, আড়ি পাতা থাকে। কিন্তু যেমনটা বলেছি, দিনে আমি লিখি মাত্র দুই ঘণ্টা। ফলে বিঘ্ন এড়িয়ে সময়টুকু বের করতে সমস্যা হয় না কোনো।
প্যারিস রিভিউ :
আপনার শেষ উপন্যাস স্পিরিটাস ফ্রান্সে বেশ সাড়া ফেলেছে। আশা করি ইংরেজিতেও অনূদিত হবে। আপনি কি নতুন কোনো উপন্যাস লেখা শুরু করেছেন?
ইসমাইল কাদারে :
না। তাড়া আছে কোনো?
অনুবাদক পরিচিতি : আহমেদ নাজিব কবি, অনুবাদক। শিক্ষার্থী, রুয়েট


0 মন্তব্যসমূহ