ঘাটটার নাম মিলিটারি ঘাট। এলাকার লোকজন মিলিটারি ঘাট বলে না। বলে, মেলেটেরি ঘাট। এই মিলিটারি ঘাটের কাছেই গোমতীর বাড়তি চরে হাল দিচ্ছিল রইসুদ্দিনের বাপ। এক ধরণের নরম বাতাস চারদিকে। সূর্যটা সবে উঠছিল। গরু দুটো ও রইসুদ্দিনের বাপের ছায়া পুব থেকে পশ্চিমে খানিকটা আড়াআড়ি হেলে পড়েছিল দিঘল হয়ে। ছায়া সমেত ওরা হাঁটছিল উত্তর থেকে দক্ষিণে, কখনও পেছনে। কখনও-বা সামনে। ওদের ছায়ার সঙ্গে লাঙলের বাড়তি ছায়া।
লাঙলের ফলায় ফালি ভেজা মাটি ক্রমাগত লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছিল গরু দুটোর টানে। রইসুদ্দিনের বাপের একটা হাত লাঙলের হাতলে, অন্য হাতে সে বাঁশের কঞ্চির তৈরি একটি পাঁচনি ধরে রেখেছে। তার হাতের পাঁচনিটা অযথাই গরু দুটোর পিঠে পড়ছে—ঝপাৎ-ঝপাৎ। একটু পরপর সে শব্দ করছে—এ্যাই হেঁট-হেঁট, এ্যাই হেঁট-হেঁট।
চিৎকারটা তখনই এল। চিৎকারটা বিলাপের মতোই রইসুদ্দিনের বাপের কানে এসে পৌঁছল, ‘খাইছে রে, খাইছে। ঘাটে এইবার নিজু মাস্টাররে খাইছে!’
কথাটা শুনেই রইসুদ্দিনের পাঁচনি তোলা হাত থেমে গেল। পা দুটোও থেমে গেল। গরু দুটো দাঁড়িয়ে গেল। তখনই ডানের ধামড়ি গরুটা পাছা সামান্য নামিয়ে চোনা ছাড়ল—চিড়িৎ-চিড়িৎ-ফিস-ইস-স-স। চোনার ছিটা এসে পড়ল রইসুদ্দিনের বাপের পা ও গুটানো লুঙ্গিতে। অন্য সময় হলে সে কষে ধামড়ির পাছায় কয়েক গা পাঁচনি বসিয়ে দিত। কিন্তু সে আজ সেদিকে খেয়াল করল না। তার দৃষ্টি স্থির মিলিটারি ঘাটের দিকে। তার মুখ থেকে আপনা-আপনিই অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল, ‘গেল বছরের আগের বছর আমার পোলাডারে এ্যাই ঘাডে খাইছে। আইজকা খাইল নিজু মাস্টাররে...?’
মিলিটারি ঘাটের দিকের হা করা মুখে গোমতীর আজকাল প্রতি বছরই মানুষের খিদে পায়। আগে নাকি ছয়-সাত বছরে একজন-দুজন করে খেত। কিন্তু আজ আট-নয় বছর ধরে বছরের বিরাম নেই।
মিলিটারি ঘাট ধরে গোমতী নদী কখন কোন সাল থেকে মানুষ খেতে শুরু করে তার সঠিক ইতিহাসটা কেউই বলতে পারে না। অশীতিপর বৃদ্ধের কেউ কেউ বলে, প্রায় দেড় শ বছর আগে খাঁ-বাড়ির কলিম খাঁকে দিয়ে এই ঘাটে নদীর মানুষ খাওয়া শুরু হয়। এই ঘাটটার নামও নাকি ‘মিলিটারি ঘাট’ হয় ঠিক সেই সময় থেকে।
বিশেষত্বহীন এই ঘাটের ভাঙন হয়েছে অনেক। আবার চরও বেড়েছে অনেক। আগে ঘাটের পথ ধরে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল অনেকগুলো। এখন আর সেই পথে কৃষ্ণচূড়া গাছ নেই, পথটাও কেমন বিলীন হয়ে গেছে প্রায়। নদী আইল থেকে নেমে যাওয়া সরু একটা সাদা রেখা শুধু ঘাটের দিকে এগিয়ে গেছে।
তখন ব্রিটিশ আমলের কথা। সবে ব্রিটিশ কোম্পানির হাত থেকে রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে তখন জমিদারদের দাপট। এই ঘাট থেকে দুই গ্রাম ভেতরে অনন্তপুরের জমিদার ছিলেন মুরাদ উদ্দিন ভুঁইয়া। খুব বড় জমিদারি তাঁর ছিল না, তবে দাপট ছিল বেশ। আর স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এই মুরাদ উদ্দিন ভুঁইয়ার ছিল ইংরেজ-বিদ্বেষী মনোভাব। তিনি একবার গোঁ ধরলেন, তিনি আর ইংরেজদের খাজনা দেবেন না। পরপর তিন বছর তিনি খাজনা আটকে রাখলেন। যার ফলশ্রুতিতে বর্ষার এক দুপুরে দেখা গেল, দুই বজরায় লাল পোশাকের কুড়িজন সৈন্য সমেত এক লালমুখো ইংরেজ অফিসার গোমতীর এই ঘাটে হাজির। পূর্বের যোগাযোগ সূত্রে সেই অফিসার গিয়ে ওঠেন ঘাট-পাড়ের গ্রাম দিলালপুরের জোতদার কলিম খাঁর বাড়িতে। কলিম খাঁ তখন জমিদার না হলেও তাঁর দাপট ছিল। আর জমিদারকে টেক্কা দেওয়ার মতো ছিল এক বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী।
বৃদ্ধ জমিদার মুরাদ উদ্দিন ভুঁইয়া অবশ্য অবস্থার বেগতিক দেখে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ইংরেজ অফিসারদের সঙ্গে মীমাংসায় গিয়েছিলেন। তিন বছরের বকেয়া খাজনাসহ তিনি আরও দু’বছরের অগ্রিম খাজনা দিয়ে জমিদারি রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এর মাস কয়েক পর শুকনো মরসুমের এক হিম হিম শীতের সকালে দিলালপুরের লোকজন দেখে, জমিদারের লাঠিয়ালরা গোমতীর বাড়তি চরের এই ঘাটে কলিম খাঁকে মেরে মলদ্বারে বাঁশ ঢুকিয়ে খাড়া করে পুঁতে রেখে দিয়ে গেছে।
উনিশ শ সাতচল্লিশের দেশভাগের পর প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত নাকি হিন্দু ব্যবসায়ী জোতদারদের লাশ এই ঘাটে ভাসত। এরা বেশিরভাগই ছিল অনন্তপুর-বিষ্ণুপুর ও দিলালপুরের লোক। এদের মৃত্যুর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা যেত এদের আড়ত, ব্যবসা, জমিজমা দিলালপুরের খাঁ বা অনন্তপুরের ভূঁইয়াদের দখলে চলে গেছে। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় খাঁ বাড়ির আমির খাঁর দাপট ছিল তখন একচ্ছত্র।
উনিশ শ একাত্তরে এই মিলিটারি ঘাটে মানুষ মরে সবচেয়ে বেশি। আমির খাঁর দুই ছেলে মন্তাজ খাঁ ও জগলুল খাঁ রাজাকার আর শান্তিবাহিনীর প্রধান হয়ে একবার পাকিস্তানি এক মেজরকে নিজ বাড়িতে ডেকে আনে। সেই মেজরের সঙ্গে ছিল জনা বিশেক পাকসেনা।
তখন বর্ষাকাল ছিল। গোমতী নদীতে ছিল ভরাট বান। যদিও সেদিনের আকাশে সূর্যটা মেঘের ফাঁক গলে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। সেদিন দিলালপুরে বিশাল জিয়াফৎ হয় পুরো গ্রাম জুড়ে। তিনটা আস্ত গরু জবাই হয়। মন্তাজ খাঁ ও জগলুল খাঁ পাকিস্তানি মেজরকে খুশি করানোর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সারিবদ্ধ করে কুচকাওয়াজ করে। পরে বিকেলে এই মিলিটারি ঘাটে আটাশজন হিন্দু নারীপুরুষ ধরে এনে উদ্যত রাইফেলে গুলি করে মেরে রক্তাক্ত দেহগুলো গোমতীর ভরাট জলে ভাসিয়ে দেয়।
দেশ স্বাধীনের পর বাহাত্তর সালে শীতের এক সকালে সেই গ্রামবাসীরাই মন্তাজ খাঁকে পিটিয়ে মেরে তার মলদ্বারে বাঁশ ঢুকিয়ে এই মিলিটারি ঘাটে পুঁতে রেখে যায়। তিনদিন পর্যন্ত তাকে কেউ কবরটা দিতে আসেনি। পরে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে মলদ্বারে ঢোকানো বাঁশটা ঠেলে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। জগলুল খাঁ অবশ্য পালিয়ে বেঁচে যায়।
দুই.
আড়ঙ পেরিয়ে গোমতী আইলে উঠতেই অন্য কষ্টগুলোর সঙ্গে আড়ঙের কষ্টটা যেন নিজু মাস্টারকে আরও ঝেঁকে ধরল। ঢ্যাঙা রফিকের কী বাজে ব্যবহার! বলে কী, ‘মাস্টার, তুমি আইজকা ট্যাকা দিবা, নইলে দোকানের পালার লগে বাইন্ধ্যা রাখমুনে...।’
নিজু মাস্টার মাথা ঝাঁকিয়ে একটা গালি দিলেন, ‘বান্ধির পুত, সামান্য কয়টা টাকার লাগি...!’ গালি দিয়েই তিনি থেমে গেলেন। গালিটা তিনি ঢ্যাঙা রফিককেই দিয়েছেন এটা ঠিক। ঢ্যাঙা রফিকের মা একসময় নিজু মাস্টারদের সরকার বাড়িতে কাজ করত। ঢ্যাঙা রফিকও সময়-অসময় গরুর ঘাস কেটে দিত ও জমিতে চুক্তিতে কামলা দিত। কিন্তু তাতে কী? এখন তো ঢ্যাঙা রফিক সৌদি আরব সাত বছর থেকে এসে পয়সাওয়ালা হয়েছে। গ্রামে ফিরে বাজারে জামাকাপড়ের দোকান দিয়েছে। দোকান চলছেও বেশ।
নিজু মাস্টার নিজে নিজে আবার মাথা ঝাঁকালেন। ভাবলেন, টাকা সামান্য কোথায়? কুড়ি হাজার টাকা। বছর ঘুরে গেছে বেশ আগেই। টাকা তো দিতে পারেননি। এদিকে খাঁ বাড়ির মইনুল খাঁ মহাজনী ব্যবসা করে। সুদে টাকা দেয়। তিনি চকের আর খাল পাড়ের জমি দুটো বন্ধক রেখে দুই লাখ টাকা নিয়েছিলেন। জমি দুটো বুঝি মইনুল খাঁর কাছ থেকে রক্ষা করা যাবে না। এই জমি দুটোই তাঁর সম্বল। তিনি সহ ঘরের চারটা মানুষের পেট চলে। এই জমি দুটো গেলে তিনি ঘরের মানুষের পেট চালাবেন কীভাবে?
নিজু মাস্টার ভাবতে ভাবতে একটা ভারি নিঃশ্বাস ফেললেন। কষ্টের সঙ্গে তার ভেতরে ও বাইরে এক ধরণের ক্লান্তি। তিনি হাঁটছেন একটু ধীর গতিতেই। মাথার উপর আস্ত একটা চাঁদ। কিন্তু ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরম চাঁদটার যন্ত্রণা হয়েই ঝরে পড়ছে চারদিকে। পেছনের আড়ঙটা ক্রমাগত আরও পেছনে যাচ্ছে। কারও বৈঠক ঘরের পেছন, কারও পিছ দুয়ারের উঠোন, কারও গোয়াল ঘরের চোনার নালা। এমন ভ্যাপসা গরমেও কারও বাড়ির বাসক পাতার বেড়া ফড়ফড় শব্দ করছে। বাঁশঝাড় থেকে শব্দ হচ্ছে—সড় সড়, সড় সড়। ডুম্বুর গাছ, মান্ধার গাছ আর মুরতা গাছের জঙ্গলে ডাহুক ডাকছে মুখের কষ খসিয়ে।
মনসুর মোল্লার বাড়িটা পেরোতেই দিলালপুরের পুব পাড়ার শেষ। তারপর গোমতী নদীর আইলের গা ঘেঁষে ধানি জমির শুরু। সবুজ বেড়ে ওঠা ধানের জমি সমান্তরালে একটা পথ পশ্চিম দিকে হেঁটে গেছে পশ্চিমপাড়া অবধি। সেই পথ শুধু পশ্চিম পাড়াই নয়, দিলালপুরের উত্তর পাড়ার দিকেও হেঁটে গেছে বিরামহীন, বৈদ্যার বিল পর্যন্ত।
নিজু মাস্টার দিলালপুরের পুব পাড়ার বসতি ছেড়ে ধানি জমিগুলোর খোলা জায়গায় পা ফেলে আবারও একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। এবার তাঁর হাঁটার গতি আরও মন্থর হলো। তিনি প্রায় দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতোই ভাবলেন, আড়ঙের এতগুলো মানুষের সামনে ঢ্যাঙা রফিক যেভাবে অপমান করা শুরু করেছিল, চেয়ারম্যান জগলুল খাঁ হঠাৎ করে সেখানে উপস্থিত না হলে তো অবস্থা আরও বেগতিক হতো। ঢ্যাঙা রফিক দোকানের পালার সঙ্গে সত্যি তাঁকে বাঁধত।
অবশ্য চেয়ারম্যান জগলুল খাঁ কম কিসে যায়? ঢ্যাঙা রফিককে কিছু না বলে তাকেই কিনা বলে, ‘মাস্টার, ট্যাকা দাও না কেন? অপমান তো একটু হজম করতেই হইবো...!’
নিজু মাস্টার আবার নিজে নিজে বিড় বিড় করতে শুরু করলেন, ‘আরে জগলুল, তোর জীবনটা বাঁচাইছি আমি। মন্তাজরে তো বাঁশ ঢুকাইয়া মেলেটারি ঘাটে পুঁইতে রাখছিল। তুই দেশ স্বাধীনের মাস ছয়েক পর আইস্যা আমার পায়ে ধরলি। কান্নাকাটি করলি। ছোটবেলায় দোস্ত আছিলি, তাই আমি বাঁচাইয়া দিছিলাম। আইজ চেয়ারম্যান হইছস। সেইদিন না বাঁচাইয়া দিলে কি আইজ চেয়ারম্যান হতে পারতি?’
একসময় খাঁ বাড়ির পাশাপাশি নিজু মাস্টারদের সরকার বাড়িকে দিলালপুরের মানুষ একসময় গোনায় ধরত। সেটা লাঠি বা জৌলুষে নয়, সম্মানে। নিজু মাস্টারের দাদা লালন সরকার ছিলেন শহরের এক ইংরেজ অফিসারের খাস পিয়ন। বাপ আজমল সরকার ছিলেন তহসিল অফিসের মুহুরি। নিজু মাস্টার নিজেও ম্যাট্রিক পাশ করেছেন। কিন্তু জৌলুস আর লাঠির জোর না থাকলে গ্রামের মানুষ আজকাল কে কাকে গোনায় ধরে? জগলুল খাঁ তো সপ্তম শ্রেণিতে উঠে আর স্কুলমুখোই হয়নি। কিন্তু সে আজ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। দেশে এখন সরকার বদল হয়েছে, কিন্তু তার কোনো বদল হয়নি। আর এদিকে তিনি, জগলুল খাঁর চেয়ে বেশি লেখাপড়া করেও হতচ্ছাড়ার মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন।
নিজু মাস্টার কী ভেবে এবার একটু পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। ধানি জমির স্থানে স্থানে ডোবা। আইলের ধারে মাঝেমধ্যে ছোট্ট হোগলার জঙ্গল। প্রায়ই এসব হোগলার জঙ্গল থেকে সাপ বের হয়। রাতের বেলায় সাপগুলো আইলে উঠে শরীর টান টান করে শুয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে ফানক সাপ আছে, জিংলা পোড়া সাপও আছে। ঢোঁড়া সাপ তো ডোবার জলে সারাদিনই কিলিবিলি সিঁথি কেটে চলে। এ গ্রামের মানুষ বছরে একজন-দুইজন যে সাপের কামড়ে মারা যায় না, সেটা নয়। সাপের কামড়ে মানুষ মরলে গ্রামের মানুষ বলে অভিশাপে মরেছে।
আইলের ধারে এমনই একটি ডোবায় চেরাগ হাতে একজন মানুষকে নিজু মাস্টারের চোখে পড়ল। জিওল বড়শি পাতছে মানুষটা। মাথায় গামছা, লুঙ্গি কোচড় দেওয়া। হাঁটুর খানিকটা উপর অবধি জল। উত্তরের নেমে আসা জোয়ারের জল ঠেলে ঠেলে এই ধানি জমি ও ডোবাগুলোতে বেশ ভরে উঠেছে।
মানুষটাকে নিজু মাস্টার চেনেন। উত্তর পাড়ার দেলু মিয়া। জিওল বড়শি পাতা বাপ-দাদার অভ্যাস। আগরাতে এসে জিওল বড়শি পেতে যায়, শেষ রাতে এসে তোলে।
দেলু মিয়া ডেকে উঠল, ‘কেডা যায়?’
নিজু মাস্টার প্রথমে কথা বলবেন না বলে ভাবলেন। পরে কী ভেবে জবাব দিলেন, ‘আমি’।
‘কেডা, মাস্টার নি?’
‘হ, আমি’।
‘কই থাইক্কা আইলা?’
নিজু মাস্টার জবাব দিলেন না। এমনিই।
দেলু মিয়া নিজ থেকেই আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আড়ঙ থাইক্যা বুঝি?’
নিজু মাস্টার এবারও জবাব দিলেন না। আড়ংয়ের কথা শুনতেই তার ভেতরে কষ্টটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। আজ হাটবার না হলেও আশেপাশে লোকজন কম ছিল না। শুধু দিলালপুরেরই নয়, হীরারকান্দা, বিষ্ণুপুর ও অনুতপুরের অনেকেই ছিল। পাশেই আমীন মিয়ার চা-স্টল। ওখানে বসে সবাই দেখছিল। ঢ্যাঙা রফিক যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে খিস্তিখেউড় করছিল!
চেয়ারম্যান জগলুল খাঁর শেষ বাক্যটা এখনও নিজু মাস্টারের কানে বাজছে, ‘সামলাইয়া চইল, মাস্টার। সামলাইয়া চইল…’।
নিজু মাস্টার ভাবলেন, চেয়ারম্যান জগলুল খাঁ কোন ভুল কি বলেছে? নাহ, একদম নাহ। তাকে তো সামলিয়ে চলতেই হবে। নিজেকে আর কতটুকু, ঘরে যে আরও তিন-তিনটা মুখ আছে! ভোরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ঘুমঘুম চোখে বড় নাতিটা বলেছিল, ‘দাদা, আমার লাগি ঢাকা থাইক্যা দম দেওয়া গাড়ি আইননো। লাফাইয়া লাফাইয়া চলে যে হেই গাড়ি। আর এত্তগুলা লাঠি চকলেট। আব্বারে কইবা কিন্যা দিতে…।’
নাতির জন্য গাড়ি তিনি কিনে আনতে পারেননি। নাতি যে গাড়ি চেয়েছে, ব্যাটারিতে দম দেওয়া গাড়ি, সেই গাড়ির দাম এক থেকে দেড় হাজার টাকা। অত টাকা তিনি পাবেন কোথায়? দুইবেলা ঘরের তিনটা মানুষের মুখে ভাতই তুলে দিতে পারেন না! তবে তিনি ঢাকা সায়দাবাদ স্ট্যান্ডে কোম্পানীগঞ্জের বাস ধরতে এসে কয়েকটা লাঠি চকলেট কিনে নিয়ে এসেছেন। সেইগুলো এখন তাঁর চল্লিশ বছরের ব্যবহারে পুরোনো মাস্টারি ব্যাগটার ভেতর একটা কোনায় এলোমেলোভাবে পড়ে আছে।
নিজু মাস্টার একটি আহা-নিঃশ্বাস ছাড়লেন। ভাবলেন, কাকে তিনি বিশ্বাস করবেন? নিজের মেয়ের জামাই, যাকে তিনি আপন ছেলের মতো ভাবতেন! তার এত অধঃপতন! মানুষের এমন অধঃপতন হয়!
দেলু মিয়াকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নিজু মাস্টার একটু দ্রুত পায়েই হাঁটতে শুরু করলেন। মাথার উপর আস্ত একটা চাঁদ। আইল উপর এখন থেমে থেমে জ্যোৎস্নার বিধ্বস্ত ধূসর ছায়া। আইলের দু’পাড়ে কলা গাছই বেশি। কলার থোড়, বেড়ে ওঠা কলার কাদি। মাঝে মাঝে একটা-দুটো শিমুল গাছ। ছোট কাশবন, দু-একটা বাসক পাতার গাছ। জ্যোৎস্নার ছায়াটা একটু বেশি কাঁঠাল গাছের নিচে।
দিলালপুর গ্রামটা পুব-পশ্চিমে অনেকটা দিঘালো। হাটবার না থাকলে দিলালপুর গ্রামটা উঠতি রাতেই কেমন ঝিমিয়ে পড়ে। আজও হাটবার নয় বলে গ্রামটা ঝিমিয়ে পড়েছে। গোমতীর আইলে মানুষজনের আনাগোনা খুব কম। খানিকটা দূরে দূরে বাড়ির বাইরের বিদ্যুতের বাতিগুলো জ্বলছে বাড়িটাকে জানান দিয়ে।
কাঁঠাল গাছের ছায়া পেরোতেই একটা পথ গোমতীর নদী আইল থেকে নেমে গেছে উত্তরে, ধানি জমিগুলোর বুক চিরে মধ্যপাড়ায় দিকে। আসলে রসুলপুর গ্রামে মধ্য পাড়া বলতে কিছু নেই। মধ্যপাড়াটা খাঁ বাড়িরই একটা অংশ। গ্রামের মানুষজন বলে, খাঁ পাড়া।
পুরো মধ্য পাড়া ও উত্তর পাড়ার অনেকটা অংশ নিয়ে খাঁ বাড়ি। একটা সময় খাঁ বাড়িতে কয়েক শ বছরের একটা পুরোনো দালান বাদে বড় বড় আটচালা ঘর ছিল। দালানের একেকটা ইট খসে পড়লেও খাঁ বাড়ির লোকজন ঐতিহ্য আর নিদর্শন হিসেবে দালানটা দীর্ঘদিন রেখে দিয়েছিল। কিন্তু বছর দশেক আগে সাপখোপের ভয়ে সেই দালানটা ভেঙে ফেলে। এখন অবশ্য খাঁ বাড়ির প্রতি ইশায় একটা করে দালান উঠেছে। খাঁ বাড়ির লোকজন একজন আরেকজনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যেন দালানগুলো তুলেছে। চেয়ারম্যান জগলুল খাঁর বাড়িতে তো এখন চারতলা দালান।
কেউ একজন খাঁ বাড়ির আইল গোমতী আইলের দিকে আসছে। কাছাকাছি হতেই জিজ্ঞেস করল, ‘কেডা ওই?’
খাঁড়া চাঁদের আলোতে মুখটা ঠিক চেনা না গেলেও গলা শুনেই নিজু মাস্টার চিনতে পারলেন, মইনুল খাঁর বছর বাঁধা কামলা রহিম মিয়া। কিন্তু তার কথার জবাবে তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।
রহিম মিয়া আরও কাছাকাছি হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কেডা যায়? কথা কয় না ক্যান?’
নিজু মাস্টার একটু থেমে বললেন, ‘আমি’।
‘ও, মাস্টার নি? ঢাকা থাইক্যা কখন আইছ?’
গ্রামের মুরব্বিদের প্রতি রহিম মিয়ার তমিজ-লেহাজ অনেকটাই কম। নিজু মাস্টারকেও সে ‘তুমি’ সম্বোধনে ডাকে। নিজু মাস্টার বরাবরই মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলেন না। আর যাই হোক মইনুল খাঁর বছর বাঁধা কামলা বলে কথা। যে মইনুল খাঁর কাছ থেকে তিনি দুই-দুটো জমি বন্ধক রেখে দুই লাখ নিয়ে রেখেছেন। বছর ঘুরে গেছে। জমি ছাড়িয়ে আনার ক্ষমতা তার নেই। ওদিকে দুই লাখ টাকার সুদ-আসলে বেড়ে তিন লাখ টাকা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। মইনুল খাঁ যেভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ নেয়!
নিজু মাস্টার আস্তে করে বললেন, ‘এই তো আইলাম। বাড়িত যাইতাছি’।
রহিম মিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘এত দেরি হইল?’
‘হ, একটু দেরি হইয়া গেছে’।
‘সায়মার জামাইর লগে দেখা হইছে?’
‘হ, হইছে’।
‘হের ইতালি যাওয়ার কতদূর?
‘জানি না, রহিম মিয়া।
‘কী কও মাস্টার? তুমি জানো না মানে? তুমি এত্তগুলা টাকা ধারদেনা কইরা দিলা? হেয় তো কইছিল, এক মাসের মধ্যে যাইবো গা?
‘সেইটা তো আমিও জানতাম...!’
‘বছর ঘুইরা গেছে আগেই, অখনও খবর নাই? তাইলে তো সমস্যা। তুমি এই ধারদেনার ট্যাকা দিবা কই থাইক্যা?
নিজু মাস্টার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কিছু বললেন না।
রহিম মিয়া এ ব্যাপারে আর কথা না বাড়িয়ে বলল, ‘আমি যাই। পুব পাড়ার দেওয়ান গো বাড়িত যাইতে হইব। তুমি কাইল মহাজনের লগে কিন্তু দেখা করবা।
নিজু মাস্টার এবারও হ্যাঁ বা না কিছু বললেন না।
রহিম মিয়া হনহন করে চলে গেল।
নিজু মাস্টার রহিম মিয়ার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থেকে আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ভাবলেন, আসলেই তো সমস্যা। মহা সমস্যা।
তিন.
সায়মা নিজু মাস্টারের মেয়ে। দুটো ছেলে নিয়ে বাপের বাড়িতেই থাকে। অবশ্য বাপের বাড়িতে থাকা বাদে তার আর কোনো উপায়ও নেই। তার স্বামী আলী আকবরের না আছে নিজস্ব কোনো সংস্থান, না আছে নিজস্ব কোনো বসতভিটে। আজ সকালে সায়মা বাপকে এগিয়ে দিতে দিতে গোমতী আইল পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিল। চোখে তার প্রতীক্ষা, বাপ যদি ঢাকা থেকে স্বামীটার সঠিক কোনো খবর নিয়ে আসেন।
বছর দেড়েক আগে সব জমি-জমা শেষ করেই টাকা নিয়ে গিয়েছিল সায়মার জামাই আলী আকবর। যাবার আগে বলেছিল, ভিসা সব রেডি, লাখ পাঁচেক টাকা দিলেই হবে। আর বাড়তি হিসেবে টিকেটের ষাট হাজার টাকা। আর পাসপোর্টে এনডোচমেন্ট একহাজার ইউরো। ব্যস তারপরই ইতালি পাড়ি।
নিজু মাস্টার মেয়ের জামাই আলী আকবরকে বেশ বিশ্বাস করতেন। প্রায় দেড় দশক ধরে চেনেন। কোনো বিশ্বাস ভঙ্গ করার মতো লক্ষণ তিনি তার মধ্যে দেখেননি। বাপ-মা হারা ছেলে। আই এ পাশ করে তাঁর স্কুলে আসে মাস্টারি করতে। আদব-কায়দা ভালো দেখে বাড়িতে এনে জায়গা দেন। কিছুদিন যেতেই তিনি বুঝলেন, তার মেয়ে সায়মার সঙ্গে আকবর মিয়ার বেশ মানাবে। তারপর বিয়ে হলো। বছর ঘুরতেই নাতি, তিন বছর পর আরেক নাতি। সবকিছুই কষ্ট ও অভাব-অনটনের মধ্যে ঠিক-ঠাক চলছিল। কিন্তু স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সব এলোমেলো হয়ে যায়।
নিজু মাস্টারের চক আর খাল পাড়ের দুটো সম্পত্তিই তার সংসার চালানোর পুরো ভরসা ছিল। অন্তত সারা বছর খোরাক না চললেও কোনোমতে টেনেটুনে চালিয়ে নেওয়া যেত, না খেয়ে থাকতে হতো না। কিন্তু আলী আকবরের ইতালি যাওয়ার লক্ষ্যে জমি দুটো মন্তাজ খাঁ মহাজনের কাছে বন্ধক রাখতে হয়। কিছু জমানো টাকা আর ধারদেনা করে কোনোমতে তিন লক্ষ টাকার ব্যবস্থা করে দেয়। বাকি টাকা আলী আকবর নিজে ব্যবস্থা করে নিবে বলে ঢাকায় যায়। ঢাকা গিয়ে কিছুদিন ফোন দেওয়া ও যোগাযোগ রক্ষা করলেও এক বছরের ওপরে হয়ে গেছে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এমনকি মোবাইল নম্বরটা পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলে।
আলী আকবর খুব বিশ্বাসী একজন মানুষ ছিল। দুই-চার গ্রামের মানুষ তাই বলত। নিজু মাস্টারও তাকে খুব বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সেই বিশ্বাস করাই এমন কাল হবে কে জানত?
নিজু মাস্টার একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ঢাকা থেকে ফিরতে ফিরতে তাঁর মাথায় একটা চিন্তাই সারাক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছিল, তিনি মেয়ে সায়মাকে কী জবাব দিবেন? একটা মাত্র মেয়ে। মেয়েটাকে জন্ম দিতে গিয়ে বউটা মারা যাবার পর তিনি আর বিয়ে করেননি। সৎ মা এলে মেয়েটার আবার কী হয়! মেয়ে সায়মাকে নিয়েই বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেন। কিন্তু সেই মেয়ের আজ এই দুরাবস্থা!
গোমতী আইল ধরে আরও কিছুক্ষণ হাঁটতেই ধানি জমির দীর্ঘ রেখার সমান্তরালে দিলালপুর পশ্চিম পাড়ার শুরু। ঠিক সেখান থেকেই একটা সরু পথ নেমে গেছে বাড়ির দিকে। সরু পথের প্রথমেই পড়ে সুরুজ মিয়ার ইশা। তারপর নজিব মিয়া ও সবুর মিয়ার ডেরা। এরপরই নিজু মিয়ার বাড়ি। নিজু মিয়ার বাড়ির পর উত্তর পাশটাতে খাল।
নিজু মাস্টার গোমতী আইল ও বাড়ির সরু পথটার সংযোগস্থলে এসে হঠাৎ থেমে গেলেন। সায়মার মুখটা তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বড় নাতির মুখটাও। ছোট নাতিটা এখনও বেশ ছোট। মাত্র সাড়ে তিন বছর। অতশত বোঝে না।
সায়মা ও বড় নাতি সজীবের চেহারাটা চোখের সামনে ভাসতেই নিজু মাস্টার বড্ড অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলেন। আলী আকবর নিখোঁজ ছিল এতদিন। একটা আশা-নিরাশার দোলাচাল ছিল। কিন্তু এখন তো জানেন, আলী আকবর কী বিশ্বাসঘাতকতা তাঁর সঙ্গে করেছে। তাঁর মেয়েটার সঙ্গে তো আরও বেশি করেছে। তিনি তো আলী আকবরের বিষয়ে সায়মাকে মিথ্যে বলতে পারবেন না।
নিজু মাস্টার স্তব্ধভাবে বাড়ির সরু পথটার মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর এ মুহূর্তে বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না। সামান্য দূরেই গোমতী আইল থেকে আরেকটা সরু পথ নদীর দিকে দক্ষিণে নেমে গেছে। তিনি সেদিকে পা বাড়ালেন।
এই সরু পথটার মাথাতে গোমতী নদীর মিলিটারি ঘাট।
চার.
রাত তেমন গভীর না হলেও নদীর দিকের সরু পথটায় রাতটা কেমন ভারি হয়ে উঠেছে। চারিদিকের নিস্তব্ধতা রাতের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। কাছে কোথাও শেয়াল ডাকছে। খাঁ বাড়ির কুকুরগুলো ডাকছে দূর থেকে। কুকুরের ডাক কেমন কান্নার মতো শোনাচ্ছে।
নিজু মাস্টার হাঁটতে হাঁটতে মিলিটারি ঘাটে এসে দাঁড়ালেন। আকাশের আস্ত চাঁদটা মনে হচ্ছে একটু নিচে নেমে এসেছে। ছেঁড়া মেঘগুলো দৌড়াচ্ছে যেন কোনো কারণ ছাড়াই। নদীর জল অনেকটা শান্ত বলা যায়। জলের প্রতিটি ঢেউয়ে চাঁদের আলোর প্রতিবিম্বে ঝিকিমিকি খেলা চলছে।
নিজু মাস্টার নদীর জলের দিকে কেমন আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছেন। তাঁর দৃষ্টিটা নদীর ঢেউয়ের ওপর ঠিকই, কিন্তু তাঁর দৃষ্টির ভেতর হানা দিচ্ছে আলী আকবরের চেহারাটা। তিনি ভেবে পেলেন না, একটা মানুষ এত নিচে নামতে পারে কিভাবে? তাঁর এখনও মানতে কষ্ট হচ্ছে, এই আলী আকবর কি সেই আলী আকবর? তিনি আজ দুপুরের পুরো বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বসলেন।
নিজু মাস্টার আলী আকবরের সন্ধান পান তাঁরই এক পুরোনো ছাত্র রকিবুলের মাধ্যমে। রকিবুলের বাড়ি অনুতপুর গ্রামে। তিনদিন আগে এক বিকেলে দিলালপুর আড়ঙে তার সঙ্গে দেখা। রকিবুল ঢাকায় একটা পত্রিকায় সাংবাদিকতা করে।
রকিবুলের মাধ্যমে জেনেছেন, আলী আকবর নাকি ঢাকায় এখন রাজনীতি করে। একটা নতুন গড়ে ওঠা দলের নেতা বা উপনেতা হয়েছে। বেশ ওপর শ্রেণীর লোকজনের সঙ্গে তার ওঠাবসা। এমনকি বর্তমান দেশের যে সরকার প্রধান, তাঁর সঙ্গেও নাকি অনায়েসে দেখা করতে পারে।
নিজু মাস্টার আজ ভোরে কোম্পানীগঞ্জ থেকে বাস ধরে ঢাকায় গিয়ে সরাসরি সেই পার্টি অফিসে যায়। সেখানে গিয়ে আলী আকবরকে না পেলেও তার মোবাইল নম্বর ও বাসার ঠিকানা পান। তিনি আলী আকবরকে তখনই ফোন দেন। কিন্তু প্রথম একবার-দুইবার পেলেও গলা শুনে সে কেটে দেয়। পরে আর নম্বরই ঢুকছিল না বলে বাধ্য হয়ে সরাসরি তার নাখাল পাড়ার বাসায় চলে যান।
আলী আকবরের বাসা খুঁজে পেতে নিজু মাস্টারের কোনো সমস্যা হয়নি। একটা আটতলা দালানের তিন তলায় আলী আকবরের ভাড়া বাসা। কিন্তু আলী আকবরের বাসায় ঢুকে তো নিজু মাস্টারের চক্ষু চড়কগাছ। একে তো বাসার শান চেহারা দেখে। নতুন সোফা, দেয়ালে চ্যাপ্টা ধরনের বড় টিভি। বেডরুমে বক্স খাট। বাসা ভাড়া নাকি বত্রিশ হাজার টাকা।
নিজু মাস্টারের চক্ষু আরও চড়কগাছ হয় আলী আকবরে বাসায় আরেকজন সুন্দরী মহিলা দেখে। সে নাকি আলী আকবরের নতুন বিয়ে করা বউ। মাত্রই তিনমাস আগে বিয়ে করেছে।
আলী আকবরের নতুন বউয়ের সঙ্গে কথা বলে নিজু মাস্টারের একেবারে খারাপ লাগেনি। মেয়েটার নাম নাজনীন। বাসায় ঢোকার পর পরিচয় জেনে আদবের সঙ্গেই সোফাতে নিয়ে বসায়। ট্যাঙ্গের শরবত বানিয়ে দেয়। নিজু মাস্টার যখন জিজ্ঞেস করেন, ‘মা, তুমি কি জানতে গ্রামে আলী আকবর আমার মেয়েরে আগে বিয়া করছে?’
নাজনীন বলে, ‘জি, জানতাম’।
‘তাদের দুইটা ছেলে আছে?
‘জি, সেটাও জানি’।
‘তুমি জাইনেও তারে বিয়ে করলা?
‘আমার উপায় ছিল না’।
‘কেন উপায় ছিল না? আমার মেয়ের কপালটা পোড়াইলা?’
‘চাচা, আমাকে দোষ দিবেন না’।
‘দোষ তাইলে কারে দিবো?
‘দোষ আলী আকবরকে দিবেন। সে আমাকে জোর করে বিয়ে করেছে’।
‘একজন জোর করলেই বিয়ে কইরা ফেলাইবা?’
‘বললাম তো, চাচা। উপায় ছিল না। আলী আকবর রাজনীতি করে। নতুন গড়ে ওঠা একটা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে। ক্ষমতা অনেক। আমাকে পছন্দ করে দুই মাস ঘুরেছে। আমি মোটেও রাজী ছিলাম না। কিন্তু পরে সে হুমকি দেয়, আমার বাবাকে মেরে টুকরো টুকরো করে বুড়ি গঙ্গায় মাছদের খাওয়াবে। আমার বাবা নাকি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। কিসের আওয়ামী লীগের রাজনীতি, কিসের কী? আমার বাবা কখনই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি চাঁদনি চকে নিজের কাপড়ের দোকান চালান’।
‘আলী আকবরের এই অধঃপতন!’
‘এ আর কী! আলী আকবর আমাকে হুমকি দেয়, সে নাকি আমাদের বাসায় আগুন দিবে। আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। দুই-দুইবার দলবল নিয়ে আমাদের বাসায় হাজির হয়। বুঝতেই পারছেন, সে যে পার্টি করে, সেই পার্টি সরকারেরই পার্টি বলা যায়। তারাই এখন দেশ চালায়। তাই বাধ্য হয়ে বিয়ে করি। আর নয়তো আমার চেয়ে সতেরো-আঠারো বছরের বড় একজনকে কেন বিয়ে করতে যাব? তাও আবার আগে একটা বিয়ে করেছে। দুটি ছেলে আছে!
‘আমার মাইয়াটার এখন কী হইব?’
‘আমি জানি না, চাচা। আমাকে ক্ষমা করে দিবেন’।
নিজু মাস্টার আর ওই ব্যাপারে কথা বাড়ান না। ওদিকে নাজনীনের কাছে জানতে পারেন, আলী আকবর নাকি নতুন দলটার হয়ে রাজশাহী গেছে জনসংযোগের কাজে। আগামী পাঁচদিন ঢাকায় ফিরবে না। নাজনীনের মোবাইলের মাধ্যমে একবার তিনি আলী আকবরের সঙ্গে কথা বলারও চেষ্টা করেন। কিন্তু ওদিকে আলী আকবর মেজাজ দেখিয়ে ও অপমান করে লাইন কেটে দেয়।
পরে নিজু মাস্টার আর সেই বাসায় থাকার প্রয়োজনবোধ করেন না। নাজনীন বেশ অনুরোধ করলেও তিনি দুপুরের খাবার না খেয়েই বের হয়ে যান।
পাঁচ.
রাত বাড়ছে। একটা রাত পাখি ডেকে যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। শেয়ালের ডাক থেমে গেছে। খাঁ বাড়ির কুকুরের ডাকও আর আসছে না। এখন দূর থেকে ঢোলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দিলালপুরের খাঁ বাড়ির পেছনে, উত্তর পাড়ায় এখনও কয়েক ঘর হিন্দু বসবাস করে। ব্রিটিশ আমলে এই হিন্দু বাড়ির বেশ জৌলুস ছিল। জমি-জিরাত ছিল বেশ। ব্যবসাপাতিও ছিল। শুধু উত্তর পাড়ার একটা অংশই নয়, মধ্য পাড়ায় অনেকটা অংশ তাদের ছিল। সেই মধ্য পাড়াটা এখন খাঁ পাড়া হয়ে গেছে।
উত্তর পাড়ার সেই হিন্দুঘরের মানুষজন এখন খাঁ বাড়ির লোকদের জমিতে বর্গায় খাটে। গ্রামে গ্রামে গিয়ে ঢোল বাঁজায়। কার্তিকের পুজো এখনও বেশ দূরে। কিন্তু ওরা এখনই ঢোল বাজাতে শুরু করেছে—টাক ডুমা ডুম টাক, টাক ডুমা ডুম টাক।
নিজু মাস্টার ভাবলেন, গ্রামে তাদের সরকার বাড়ির জৌলুসও কি কম ছিল? নিজে ম্যাট্রিক পাশ করে একটা স্কুল দিয়েছিলেন সেই কবে, দেশ স্বাধীনের পরপরই। ভেবেছিলেন, গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তুলবেন। একদিন তাঁর স্কুলের নাম হবে। মানুষজন তাঁর নাম নিবে।
দেশ স্বাধীনের বছর দেড়েক পর সরকার যখন দেশের সব বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোকে সরকারি করার ঘোষণা দেয়, তখন কিন্তু সব প্রাইমারি স্কুল সরকারি হয়নি। কিছু স্কুল বাদ পড়ে যায়। সেগুলোর মধ্যে নিজু মাস্টারের স্কুলটাও ছিল। তিনি পরে স্কুলটা সরকারি করার ব্যাপারে সচিবালয়ে ধর্ণা দিতে গিয়ে দেখেন, সচিবালয়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক উঁচু চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আছেন খাঁ বাড়ির মন্তাজ খাঁ ও জগলুল খাঁর চাচাতো ভাই মোয়াজ্জেম খাঁ। আর মোয়াজ্জেম খাঁ-ই তখন দেশের বড় মুক্তিযোদ্ধা।
তারপর যে স্কুল সেই স্কুলই রয়ে যায়। দিনে দিনে স্কুলটার দৈন্যদশা আরও বেশি করে ফুটে উঠতে থাকে। দু’একজন মাস্টার আসে, কিন্তু টেকে না। নব্বই সালের পর থেকে নিজু মাস্টার নিজেই স্কুলটার মাস্টার, নিজেই ঘণ্টা হাতে দপ্তরি। এভাবে পঞ্চাশ বছর। এই স্কুলটার জন্য তিনি বিয়ে করেন অনেক দেরি করে। কিন্তু বউটা মারা যায় সায়মাকে জন্ম দিতে গিয়ে। স্কুল আর সায়মার কথা চিন্তা করে আর নতুন করে বিয়ের কথা ভাবেননি। সায়মা ডাঙর হয়। মাঝখানে দেড় দশক আগে আলী আকবর তাঁর সঙ্গে স্কুলটার হাল ধরলেও বছর তিনেক আগে স্কুলটা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এখন স্কুলটার স্থানে ভিটের অস্তিত্বটুকু আছে।
নিজু মাস্টার একটি ভারি নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাবলেন, হায়রে স্কুল! এই স্কুলটার জন্য সব দিয়েও তিনি সব হারিয়েছেন...!
রাত বাড়ছে। আকাশটা যেন একদম চুপ। চাঁদটাও। শুধু জ্যোৎস্নাটা গলে গলে পড়ছে হিল হিল বাতাসের গা বেয়ে হাহাকার ও কষ্টের আকার হয়ে। নদীতে তখন জোয়ারের টান। নদীর ওপারে ভুবনপুর গ্রাম। সেই গ্রামের পথ ধরে কোনো অল্পবয়েসী গলায় কেউ গান গেয়ে যাচ্ছে—
‘আজনমই জনম আমার, মা জননী কাইন্দা মরে
বাইন্ধা পিছে পরাণ।
ও আমার জীবন।
ঘরের ভিতর অন্যঘরে, মরার ঘরে ধবল আলো
বাইন্ধা অইছে বিরাণ।
ও আমার মরণ...!’
গানটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল যেন কোথাও। বাতাস খানিকটা ভারি হয়ে এলো হঠাৎ করেই। স্তব্ধতা ভর করল চারিদিক। নিজু মাস্টার কী ভেবে জলের কাছাকাছি বসলেন। পায়ের কাছে ঢেউয়ের শব্দ- ছলাৎ ছলাৎ, ছলাৎ ছলাৎ। ঘাটের ধারে কিছু ভাঙা ঝিনুকের খোসা চিক চিক করছে জ্যোৎস্নার আলোতে। একটা বাদুড় আবার উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। একটা রাতপাখিও।
রাত বেড়ে গিয়ে ধবল জ্যোৎস্না আরও ধবল হয়ে এল। চারিদিকের নিস্তব্ধতা বেড়ে গেল ততোধিক। নিজু মাস্টার মিলিটারি ঘাটে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তাঁর মধ্যে কোনো ওঠার আগ্রহ নেই, আছে এক অনন্তের অপেক্ষা। এই অপেক্ষা কার জন্য তিনি ঠিক জানেন না। তিনি শুধু এটুকু বুঝতে পারছেন, এই অনন্তের অপেক্ষাকে তিনি উপেক্ষা করতে পারছেন না। ·
লেখক পরিচিতি : মহিবুল আলম কথাসাহিত্যিক। উপন্যাসের পাশাপাশি গল্পও লেখেন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লার মুরাদনগরে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে বসবাস করছেন।


0 মন্তব্যসমূহ