প্যাম্পোরে এইসব ঝামেলা ছিল না। সিকিমের এই বৃষ্টির চোটে কাশ্মীরের মতো জিনা হারাম করে দেওয়া জায়গাকেও মাঝে মাঝে মিস করে ও। আর সত্যি বলতে তিস্তার চেয়ে ঝিলমকে দেখতে ভালো লাগতো অনেক বেশি। কাশ্মীরে যত ফ্রিলি ঘুরে বেড়াতো, এখানে সেইটা নাই। কাশ্মীরে একটা আলাদাই মেজাজ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। এইখানে ওই মেজাজটা আসেই না। একটা ইনস্যাস নিয়ে সারাদিন দাপিয়ে বেড়ানো অনেক সহজ ঠেকে সারাদিন বসে বসে এই নদীর আওয়াজ শোনার চেয়ে। বৃষ্টি শুরু হলে তো আর কথাই নাই। আর এমন টানা বৃষ্টি হতে থাকলে মনে হয় ভাই রে, মরে গেলে যদি এই বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচা যায়! তখন ওইদিনের আকাশটার কথা মনে পড়ে। মামা টু থেকে বেরিয়ে ওই দিনের ডাউনটাউনের আকাশে উড়তে থাকা ঘুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ভিজে যাচ্ছিল ও। অথচ টেরই পাচ্ছিল না যে ভিজছে। অস্বস্তিটা কিছুতেই ছেড়ে যায় না এত দূরের পরও। এখানে বাকিদের দেখে মনেই হয় না এদের কোনো সমস্যা আছে। সবকয়টা একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন সবসময় ।
—তো ফির আপ বোলিয়ে...
—আপনি বাঙালি...স্যার?
—ধরে ফেললেন?
—আমিও বাঙালি...স্যার।
—তাহলে সেশনটা বাংলাতেই হোক । আমাদের দু’জনেরই সুবিধা।
—হ্যাঁ , স্যার ।
—নিন শুরু করুন ।
এই বৃষ্টি নিশ্চিত হাতিয়ার বৃষ্টি। মাঈ ছোটোবেলায় বলতো হিন্দুদের দুর্গাপূজা যেবার আগে আগে পড়ে সেইসব বার হাতিয়ার বৃষ্টি হবেই। এই বৃষ্টিকে কেন হাতিয়ার বৃষ্টি বলে ও কোনোদিন জানতেও চায়নি। শুধু দেখত হাতির পালের মতো কালো কালো মেঘ দল বেঁধে তিন-চারদিন ধরে পানি ঝরাচ্ছে তো ঝরাচ্ছেই। হাতিয়ার বৃষ্টি সপ্তমী-অষ্টমী অব্ধি চললে কিছু মনে হতো না। কিন্তু নবমীতেও পানি না কমলে পেট গুড়গুড় করতে থাকে। এবার কি তাহলে দশমীর মেলায় গিয়ে বকরা-বকরি কেনা হবে না? এগরোলের দোকান তো খালি দশমীর মেলাতেই আসে। পাতলা ফিনফিনা রুটির ওপর ডিম ফেটিয়ে ঢেলে দিচ্ছে। তাওয়ার তেলে পড়ে ডিম মাখা সেই রুটি দুনিয়াকে বেহেশতি সুবাসে ভরিয়ে তুলছে। তার ভিতর এখন পড়ছে ফালি ফালি পেঁয়াজ। তার ওপর কমলা রঙের একটা সস। তারপর কাঁচা মরিচ কুচিয়ে লেবু চিপে একটা ফিনফিনা কাগজে মুড়ে দিল। চোখ বন্ধ হয়ে আসে খেতে এত ভালো। তাহলে কি এইবছর এগরোল খেতে পাবে না? যে বছর দশমীতেও হাতিয়ার বৃষ্টি চলতেই থাকত চোখ ফেড়ে পানি আসত। আব্বা বেঁচে থাকলে এই বৃষ্টির মধ্যে গিয়েও এগরোল নিয়ে আসত। মাঈকে আর দুই বড় দিদিকে ও নিজেই বলতে পারবে না যে খুব ইচ্ছা করছে মেলার এগরোল খেতে। বেটি মানুষরা কী আর যেতে পারে এই বৃষ্টিতে! এই দুঃখ নিজের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। এগরোলের দুঃখে কলিজা ধড়পড়াতে থাকলে নিরুপায় হয়ে ভাবতে শুরু করত। আগের বছরের এগরোলটার টমেটো সসটা ঠিক কেমন ছিল। তার আগের বছরের রোলটার রুটি এত চিকন ছিল যে রোলের গায়ে জড়ানো কাগজ রুটি ভেবে চিবাচ্ছিল চোখ বুঁজে। কাগজটাও এগরোলের মতোই টেস্টি ছিল যতক্ষণ না চোখ খুলেছিল। চোখ খুলতেই কাগজের স্বাদে ভরেছিল জিভ। গা একটু গুলিয়েছিলো ওর।
—কবে প্রথম ফিরে এলো জিনিসটা ?
—মামা টু বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ওই দিনের পর থেকেই। প্যাম্পোরে ফিরে এসে একদিন আমি ঝিলমে ফেলে দি ওইটা। কিছুদিন পর কী যেন একটা কাজে শ্রীনগর আসতে হলো। ঝিলমের ধারে দাঁড়াতে হয়েছিল মোতার জন্য। দেখি জলের ভিতরে দুটো পাথরের ফাঁকে কী একটা খাড়া হয়ে আছে আটকে আছে। দেখি ওইটা। আমারই দিকে তাকিয়ে আছে যেন। কী যে হল বুঝতে পারলাম না! আমি তুলে নিলাম।
—তারপর আবার ফেললেন কেন?
—সেবার ইদে অনেক বছর পর অনেক দিনের জন্য ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছিলাম স্যার। আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো রোজার মাস ওটাই। আমার বেটি যে কিনা একটার বেশি রোজা কোনোবার রাখে না, সেবার চারটা রোজা রেখে দিল! বেচারি ইদের আগের দিন থেকেই পেট ব্যথায় কাবু হয়ে গেল। ওর মা জানাল এই নিয়ে তিন মাস হল ওর শরীর খারাপ শুরু হওয়ার। শুনেই গা’টা গুলিয়ে উঠল। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। জিনিসটা নিয়ে হাঁটা দিলাম। গ্রাম পেরিয়ে দুইটা আমবাগান পার করে বড়কা জোলার বাগান। তারপর রাধিকার পুকুর। ভর দুপুরে কেউ নাই। চারপাশ দেখে রাধিকার পুকুরে ফেলে দিলাম।
—ফিরল কীভাবে ফের?
—সে এক গজবীয়া ব্যপার স্যার। রাধিকার পুকুরে এখনো বছরে এক আধটা মিঠা জলের কাছিম জালে উঠে আসে। কোথা থেকে আসে কে জানে! তবে একসময় গঙ্গা নাকি প্রতি বছর রাধিকার পুকুরে এসে ঢুকতো। তারপর তিন মাস নড়তোই না। এখন আর আসেটাসে না। বাঁধ হয়ে গেছে তো। কিন্তু এখনো আমাদের ওদিকের পুকুর, জোলা, এমনকি ইঁদারার সাথেও তলে তলে গঙ্গার কানেকশন আছে মনে হয়। ইঁদারাতেও রিঠা, বোয়াল উঠে যেত আগে বছরে দু-একবার। এখন আর ওঠে না। কানেকশন কেটে গেছে মনে হয়। তা ইদের দু’দিন পর তলে তলে খবর এল । রাধিকার পুকুরে একটা ছোটো কাছিম তুলেছে কেউ। কাছিমের মাংস সেই কবে খেয়েছিলাম! জিভ কিছুতেই তার স্বাদ ভুলতে পারে না। পুরা কাছিমটাই কিনলাম। জমিয়ে খাব চার-পাঁচদিন ধরে। বেটিটা খাবে চেটেপুটে। মন ভরে দেখব। কিন্তু কাছিম তো আর বাইরে কাটা যাবে না স্যার। কাটতে হলো আমারই বাড়ির ভিতর। দু’শো টাকা নিয়েছিল কাছিম জবাই করতে। জবাইটবাই মিটে যাওয়ার পর দেখি কী একটা খাড়া হয়ে আছি কাছিমের নাড়িভুঁড়িতে। দেখি ওইটা। আর আমার দিকেই তাকিয়ে আছে যেন। কী যে হল বুঝতে পারলাম না! আমি নাড়িভুঁড়ি ছাড়িয়ে ওটা তুলে নিলাম।
—আচ্ছা। খুবই স্ট্রেঞ্জ! একটা ব্যাপার বলুন তো। এই ধরণের টুলের হিসাব তো আপনাকে তো ডিউটি শেষে বুঝিয়ে দিতে হতো, তাই না? টুলটা তো আপনার ওখানকার কম্যান্ড্যান্টের ফেরত নিয়ে নেওয়ারও কথা।
—কোন টুলটা ফেরত নিয়ে নেওয়ার কথা স্যার?
—আই মিন যেটা আপনাকে মামা টু’তে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আপনিই তো বললেন।
—আমাদের সবকিছু কি এত অফিসিয়ালি আর প্রফেশনালি হয় ? স্যার...
একদম বোরিং একটা সকালে তারা শুনছিল যে মন খুলে কথা বলতে হবে। বোরিং ভাবে একজায়গায় রোজ দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের গা দিয়ে মেঘ নামছে। পাহাড়গুলোকে ঠিক ছোটোবেলার সিনারির মতো ঠেকছে যে সিনারিতে থাকতে পারলে কোনো কোনো অপাহাড়ী মানুষের মনে হয় জীবন কী সুন্দর! কী বোরিং! সেই বোরিং সকাল শুনছে তাদের মন খুলতে হবে। সপ্তাহে দুইদিন আইন মেনে মিলেট খেতে ভালো লাগে না, কিন্তু তবুও খেতেই হবে; এই নিয়মটা তুলে নেওয়া দরকার—মন খুলেছিল কেউ কেউ। কম্যান্ড্যান্ট হাসি চাপতে পারেনি আর। হাসতে হাসতেই বলেছিল খাওয়া, হাগা, জুতা, কম্বল, বর্ষাতি, জোঁক এইসব নিয়ে মন খুলতে বলা হয়নি। সত্যিকারের মন খুলতে হবে। দিলওয়ালা মন খুলতে হবে। কারা নাকি সার্ভে করে বলেছে আর্মির নিচুতলার লোকজনের মধ্যে ডিপ্রেশন চরমে। এদের কাজের স্কিল, মনোযোগ সবই নাকি পড়তির দিকে। ফলত আর্মি সাফার করছে। দেশের পক্ষে তো এইটা ভালো ব্যাপার না। তাই নিয়মিত কাউন্সেলিং দরকার। দরকার তো বোঝা গেল, কিন্তু এখনই তো আর ক্যাম্পে ক্যাম্পে প্রফেশনাল সাইকোলজিস্ট নিয়োগ করা সম্ভব নয়। কম্যান্ড্যান্টদের ভালো করে ট্রেনিং দেবে সত্যিকারের কাউন্সেলররা আর কাছাকাছি ক্যাম্পের কম্যান্ড্যান্টরা একে অপরের ক্যাম্পে গিয়ে কাউন্সেলিং টাউন্সেলিং করে দিয়ে আসবে। খানিক রিফ্রেশমেন্ট হবে সবারই কিছুদিন। এটাই যথেষ্ট তাদের জন্য। আরে জানাই তো আছে বেশিরভাগেরই সমস্যা হবে কতদিন ফ্যামিলিকে দেখিনি, কতদিন বউ-এর সাথে শুতে পারিনি, বুড়া মায়ের কথা কি বাচ্চা মেয়ের কথা খুব মনে পড়ে— এগুলোই। খুব বেশি হলে টানা ডিউটির সময় কেউ কেউ মেয়েলি হাসি বা বাচ্চার কান্না শুনতে পায়। কিংবা ম্যাক্সিমাম লিমিট ধরো...একদম ফাঁকা জায়গায় ডিউটির সময় কোনো সহকর্মী খৈনি ডলতে ডলতে এসে বসল; দেশের বাড়িতে মাখনা বেচে লাখ পাঁচেকের মতো টাকা পেয়েছে এই বছর বলল; এরপর, খানিক সুখ দুঃখের গল্প করল; তারপর, আসছি বলে হাঁটা দিয়ে যখন ছ্যাতড়ানো চাঁদের আলো হয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই প্রতিবার মনে পড়বে এই মাল তো শ্রীনগরের ডাউনটাউনের এক গলিতে মুখ হাঁ করে আকাশের দিকে শুয়েছিলো; চোখ এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল না জানি কোন দিক থেকে আসা গুলিতে; লাখ পাঁচেকের মতো টাকা পাবে এই বছর দেশের বাড়িতে মাখনা বেচে; খৈনি ডলতে ডলতে জানিয়েছিল কাল রাতে।
—আপকে সাথ কিতনি বার এ হুয়া হ্যায়?
—দো-তিনবার, স্যারজী।
—পূর্ণিমা থা হরবার?
—পূর্ণ চন্দ্রমা হি থা স্যারজী।
—ফিকর মত কিজিয়ে। আগলেবার উয়ো যব বাত করনে আয়েগা, উনকে বাত শুরু করনে সে পহেলে আপ কোই ভি গানা স্টার্ট কর দেনা।
—কউন সা গানা স্যারজী?
—কোই ভি
—‘জনগনমন অধিনায়ক জয় হে’?
—হাঁ চালেগা
—লেকিন স্যারজী জাতীয় সংগীত শুনকে ভূত একহি জাগা খাড়া রাহা তো?
—হুম...দ্যটস প্রবলেম্যাটিক। আচ্ছা...ফির ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা’ গা দিজিয়েগা।
—গুলসিতা হামারা কে বাদ কেয়া আতা হ্যায় মালুম নাহি স্যারজী। ‘হর হর শম্ভু, শম্ভু...শিবা মহাদেবা...‘গা সাকতা হু স্যারজী?
—আরে অফকোর্স ভাই । যো গানা উস ওয়াক্ত দিমাগমে আয়েগা, ওহি গা দেনা। ‘সারকাইলো খাটিয়া জাড়া লাগে’, ‘রিঙ্কিয়া কে পাপা’, ‘তু লাগাইলু যব লিপইস্টিক…হিলেলা পুরা ডিস্ট্রিক’। এনি সং ।
—ওকে স্যারজী।
—স্রেফ এক বাত ইয়াদ রাখিয়ে। কোই ভি দুখভরি সং নহি, জাস্ট লাইক ‘ অ্যা মেরে বাতেন কে লোগো’, ‘সন্দেশে আতে হ্যায়’। ইস টাইপ কা সং নেহি চলেগা।
—ওকে স্যারজী।
—আচ্ছা প্রসাদজী । এক বাত বাতাইয়ে...
—জরুর স্যারজী।
—এ যো মহামেডান লাড়কা হ্যায় না ইস ক্যাম্পমে...
— কউন স্যারজী?
—আরে কেয়া নাম হ্যায়...মালদা ইয়া মুর্শিদাবাদ সে হ্যায় যো।
—আচ্ছা আচ্ছা স্যারজী হাঁ। বহুত টেস্টি গোপালভোগ খিলায়ে ইস সাল। উসকা খুদকা বাগিচা কা আম থা।
—হাঁ। ও ক্যায়সা ইনসান হ্যায়?
—সচ্চা হিন্দুস্থানী হ্যায় স্যারজী। একদম সাচ্চা হিন্দুস্থানী।
—আরে...ম্যানে পুঁছা ইনসান ক্যায়সা হ্যায়?
—ওহি তো বোল রাহা হু স্যারজী। সাচ্চা হিন্দুস্থানী। একদম সাচ্চা হিন্দুস্থানী। কাশ্মীরমে মুসলমানোকে আঁখো মে আঁখে ডালকে পেলেটসে আঁখ লেনেওয়ালা সাচ্চা হিন্দুস্থানী।
—ছোড়িয়ে। ঝুট বোলনে কি আদত হ্যায় ক্যায়া উসকো?
—কেয়া বলু...ইনসানিয়াৎ তো খুদ হি এক ঝুট হ্যায় স্যারজী। মামুলি আদমি ঝুট বোলতা হ্যায় জিন্দা রহেনে কে লিয়ে।
—আপকো সাচ মে কাউন্সেলিংকা জরুরত হ্যায় প্রসাদজী !
—জরুরত হ্যায় স্যারজী। বিলকুল জরুরত হ্যায়। বরনা ও মুহ মে খইনি ডালকে একবার ফির শ্রীনগরকে ডাউনটাউন সে সিধা ইঁহা, নর্থ সিকিমকে তিস্তাকি পাশ বাতচিত করনে আ যায়েগা । অউর বাত করতে করতে একবার জরুর পুছেগা, ‘প্রসাদজী আপ কিউ উস কান্ড কা পাঁচ মিনিট পহেলে মুঝে আপকে বাঁয়ে তরফ আনেকো বোলা?’ । মাদারচোদ। সরি...সরি স্যারজী আপকে সামনে গালি দে দিয়া...সরি।
কিছু কিছু জিনিস মানুষকে বলতে হয় না, চারপাশ দেখে আস্তে আস্তে নিজেরাই শিখে নেয়। আর বুদ্ধিমানরা খুব দ্রুত শিখে নেয়। ক্লাস ফোর অব্ধি ভবানীপুরের মোমিনটোলা প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় পিপাসা লাগলে ও স্যারকে বলে পানি খেতে যেত স্কুলের নলকূপ থেকে। ক্লাস ফাইভে ভর্তি হতে হল আনন্দপাড়ার ভগবানচন্দ্র হাই স্কুলে। সাথে মোমিনটোলা থেকে আর যেগুলো এসেছিল সেইগুলো মোটামুটি ক্লাস সেভেন অব্ধি পানি খেতে চেয়ে অল্পস্বল্প বকাঝকা খেয়েছে। স্কুলে ভর্তি হয়েই ও একটা চমৎকার গান শিখেছিল। ক্লাস টুয়েলভের দাদারা ভারত-পাকিস্তানের ব্যাটবল খেলার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই মাঝে মাঝেই গাইত, ‘আও বচ্চে তুমহে দিখায়েঁ/ ম্যাচ হিন্দুস্থান কী/ কপিল দেব নে ছক্কা মারা/ খুল গই প্যান্ট ইমরান কী…।’ ওরা, ক্লাস ফাইভরা গানটা নিজেদের মতো পালটে নিয়েছিল, ‘আও বচ্চে তুমহে দিখায়েঁ/ ম্যাচ হিন্দুস্থান কী/ তেন্ডুলকারনে নে সিক্সার মারা/ খুল গই প্যান্ট আক্রাম কী...’।
গানের এরপরের অংশটি গাওয়ার আগে ওরই গ্রাম থেকে পড়তে আসা কোনো দুবলা-পাতলা ছেলেকে ধরে ও গায়ের জোরে প্যান্ট খুলিয়ে নিতো। ওরা সকলে জামা পরা প্যান্টহীন ছেলেটিকে ঘিরে কুচকাওয়াজ করতে করতে গানের শেষ অংশটিতে ঢুকতো, ‘নাঙ্গা বেশরম… নাঙ্গা বেশরম।’ কোনো কোনোদিন পি.টি. স্যার এদিকে আসছে খবর এলে, দ্রুত হাতে ছেলেটিকে প্যান্ট পরাতে হতো ওকে। তারপর ওরা কুচকাওয়াজের ভঙ্গিতে ওই একই সুরে ‘বন্দেমাতরম...বন্দেমাতরম’ গাইতে থাকত। দুইমাসের ভিতর জল খেতে খেতে আর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে এইসব বাচ্চামি করতে করতে ও সবার প্রিয় হয়ে উঠছিল। স্বাধীনতা দিবসে স্কুলের মার্চ-পাস্টে প্রতিবার জাতীয় পতাকা নিয়ে হাঁটার দায়িত্ব ছিল ওর।
একবার অনিমেষকে দায়িত্ব দিয়ে দিল পি.টি.স্যার। তেরোই অগস্ট ফুটবল খেলার সময় অনিমেষকে এমন ট্যাকেল করল, পূজা অব্ধি অনিমেষের পায়ে প্লাস্টার। প্রতি বছর স্কুলের সরস্বতী পূজার শিশির, দূর্বা, শস্যের শিষ, আমের পল্লব ফজরের আযানেরও আগে জোগাড় করে আনত। অঞ্জলি দেওয়ার আগে কিছু খেত না। অঞ্জলির পর সবার সাথে সাইকেল নিয়ে আশেপাশের সরস্বতী আর মেয়ে দেখতে বার হতো। বৃষ্টিতে নাকি মানুষের ফেলে আসা সব ভালোবাসার মেয়েদের কথা মনে পড়ে। ও নিশ্চিত যারা এইসব কথা বলে তারা কোনোদিন সিকিমের পাহাড়ে টানা বৃষ্টি কাটায়নি। মনে হচ্ছে ধরে জুতাতে হয় চামারুয়া বৃষ্টিকে। কাল নাকি একটু উপরে একটা লেকের কাছে ধস নেমেছে। পোয়াতি মহিষের বাচ্চা আদ্ধেক বার হয়ে আটকে গেলে যেমন আওয়াজ করে মাদী মহিষ তেমন একটা আওয়াজ চারপাশে এখন। হাজার হাজার মাদী মহিষের বাচ্চা আদ্ধেক বার হয়ে আটকে গেছে যেন। আর সেই আধা-জন্ম দিতে পারা মায়ের চিৎকার আর আধা-জন্ম নিতে না পারা বাচ্চার ভি তরে ঘুরপাক খাওয়া চিৎকার শরীরে নিয়ে বৃষ্টিকে কাঁধে চাপিয়ে ছুট লাগিয়েছে তিস্তা। ক্যাম্পের পাশ দিয়ে।
—ঝিলমের পাশে মামা টু বলে কোনো সেন্টার ছিল না শ্রীনগরে কোনোদিন। আমি ইন্টারন্যালিও ভালো করে খোঁজ নিয়েছি।
—তাহলে আমি যে গল্পগুলো আপনাকে আগের দিন বললাম, সেগুলো কি মিথ্যা?
— দেখো, তোমার কিছু কথা আমি মানছি। ঠিকই বললে তুমি...কুনান পোশপোরার পর আমরা কখনোই রেপকে অমন ভাবে আর ওয়েপন হিসাবে ব্যবহার করতে পারি নি। যতই আফস্পা থাকুক, মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে রেপের মতো ব্যাপার চেপেচুপে রাখা যায় না শেষ অব্ধি। আর একবার খবর হলেই তারপর গাদাগুচ্ছেক ঝামেলা। তদন্ত কমিশন + তদন্ত + কয়েক বছর ধরে নিয়ম করে হাজিরা দিতে যাওয়া + সব মাইনিউটস নতুন ভাবে তৈরি করা + ডিপার্টমেন্টের ইন্টারনাল ইগোর লড়াইয়ে সেই মাইনিউটসের লুপহোল বার হয়ে আসা + ফাইনাল রিপোর্টের আগে কখনো কখনো ঘুষ অফার করা + ফাইনাল রিপোর্টের আগের এক মাস রাত্রে ঘুম না আসা + ফাইনাল রিপোর্ট = অবশেষে প্রমাণিত নো হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন...শান্তি । চক্করটা ভেবেছো! তাই উই শিফট টু এফেক্টিভ অল্টারনেটিভস।
—ঠিকই বলেছেন স্যার। কুনান পোশপোরার কথাটাই আমাদের বারবার বলা হতো কাশ্মীরে পোস্টিং-এর পর। আমার কাশ্মীর-পোস্টিং-এর প্রায় বিশ-বাইশ বছর আগের ঘটনা ওটা। তবু এমন ভাবে আমাদের সাবধান করা হতো যেন গতকাল রাতের ব্যাপার। এইসব শোনার আগে অব্দি ভাবতাম কাশ্মীরে পোস্টিং হলেই কম করে মাসে এক-আধটা রেপ করার সুযোগ পাব। ওটাই কাশ্মীরের মতো জান হারাম করে দেওয়া জায়গার পোস্টিং-এর একমাত্র ভালো দিক বলে ভাবতাম আমরা। তারপর আপনার মতো অফিসাররা আমাদের বলল রেপ নাকি রেপিস্টের পক্ষেও ভালো না। রেপিস্টেরও নাকি শরীরের ক্ষতি হয়! বুঝতে পারিনি আজ অব্ধি কেন এই কথা শেখানো হচ্ছিলো আমাদের। বিশ্বাস করুন স্যার, নিজের কষ্ট হলেও রেপ করার মজাই আলাদা। জামাকাপড় ছিঁড়ছি, পা ফাঁক করতে চাইছে না জোর করে পা ফাঁক করাচ্ছি, কামড়াচ্ছে যখন চিৎকার করেই মুখে কষে লাথি মারছি, চুল ধরে ছিঁচড়ে আনছি, মুখে থুতু ফেলছি, সবকিছু মিটে গেলে যখন শান্ত হয়ে চোখ খুলে বসে থাকে রেপড হওয়া মালটা, তখন ওই চোখ দেখে রেপের আসল মজা পাওয়া যায়। কিন্তু ওপরওয়ালা বলছে যখন রেপ কমিয়ে আনতে হবে, তখন মেনে তো নিতেই হবে। তারপর একটা ওয়ার্কশপ করে আমাদের শেখানো হলো ওদের যখন টর্চার করতে হবে তখন কোথায় কোথায় কীভাবে ডিলডো ব্যবহার করতে হবে। রেপের মতোই পাওয়ারফুল, রেপের মতোই ইজ্জত লোটা যায়, অথচ ডি-এন-এ টেস্টের চিন্তা মাথায় রাখতেই হয় না টর্চারের সময়। আর্মির পক্ষে এইটা অনেক কাজের। ইনফেকশনও নাকি এটাতেই বেশি করে ছড়ানো যায়। ওদের মেয়েদের ভিতর বেশি করে ইনফেকশন ছড়ালে নাকি টেররিজমও কমবে এমন একটা পিরামিড মডেলও দেখানো হয়েছিল। বারবার আমাদের শেখানো হচ্ছিলো সেন্টারের ভিতর চোখের সামনে ন্যাংটো শরীর দেখলেও লাগানো যাবে না। লাগাবার ইচ্ছাকে কীভাবে কমাতে হবে সেটারও এক চার্ট ছিল। কিছু ওষুধও খেতাম আমরা মামা টু’তে ডিউটির এক সপ্তাহ আগে থেকে। মোদ্দা কথা আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল লাগিয়ে মজা নেওয়ার চেয়ে ওদের ঠিকঠাক টর্চার করাটা বেশি জরুরি। তাই মামা টু’তে খুব বাছাই করে ডিউটি দেওয়া হতো।
—বানিয়ে বলছো। সাবজেক্টের জেনিট্যালে ইলেকট্রিক শক দেওয়া অনেক এফেক্টিভ জেরার ক্ষেত্রে। এই অলিখিত প্রোটোকল পুরো দেশে ফলো করা হয়।
—আমাদেরও প্রোটোকল মানত হোত। মামা টু’তে ডিলডো ব্যবহার করা হোত যতক্ষণ না সাবজেক্ট অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে কিংবা পেচ্ছাপ করে ফেলছে কিংবা পায়খানা করে ফেলছে, কিংবা তিনটাই।
—‘আমাদের’ মানে? একজনের সাথেও কথা বলাতে পারলে আজ অব্ধি?
—আগের দিনই তো বললাম আমি ছাড়া বাকিরা প্যাম্পোরের রাস্তায় আরডিএক্সে উড়ে গিয়েছিল।
—তুমি সেই সময় মামা-টু’তে ডিলডোগিরি করার ছাড় পেয়েছিলে নাকি!
—ইয়েস স্যার। খুবই ঢিঁঢ একটা সাবজেক্ট ছিল।
—শুধু তোমাকেই কেন এই টাফ কেসগুলো দেওয়া হতো? বাকিদের চেয়ে তুমি কী এমন আলাদা হে!
—আসলে স্যার...আমি অনেক অনেক বছর আগে থেকেই জানি কোথায় কতটা ঢোকালে, কতটা চাপ দিলে, চোখ ঠিকরে কথা বেরিয়ে আসে। আর্মিতে জয়েনের বহু আগে থেকেই জানি আসলে।
—আবার আরেকটা মামা টু-এর মতো গল্প বানাচ্ছো! তুমি কি আর্মিতে জয়েন করবে বলে রেপ প্র্যাকটিস করে বেড়াতে!
—না স্যার, ক্লাস এইট থেকে রোজ পাঁচ কিমি করে দৌড়াতাম সকালে। দেশকে সেবা করার জন্য খুব ছোটোবেলা থেকেই রেডি ছিলাম। আব্বাও মরে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি লাইনে আসতে হতোই।
—তোমার ছোটোবেলার গল্প শুনবো আরেকদিন। কিন্তু সিরিয়াসলি ইউ নিড প্রফেশনাল হেল্প।
— আপনার কাছে তো হেল্প চাইতেই এসেছি স্যার।
ও জানে কোনো সাহায্য পাবে না কারো কাছ থেকে। হেল্প করার মতো মন থাকলে এই বৃষ্টিতে টানা ডিউটি বরাদ্দ করে কেউ! হাঁটুর উলটো পিঠের নরম জায়গাটায় জোঁক-জোঁক লাগছে অনেকক্ষণ থেকে। এতটাই টানা এই বসে থাকা যে জোঁক-জোঁক লাগাটা সত্যিই জোঁক কিনা দেখারও ইচ্ছা হয় না। মরে যেতে পারে এভাবে ডিউটি করতে হলে। তবে এটাও তো ঠিক টানা ডিউটির জন্যই ও আজ এখানে। টানা ডিউটির সাইত ভালো। টানা ডিউটি করার পরপরই বদলির খবরগুলো এসেছে জীবনে। আর মামা টু’তে টানা ডিউটি করতে হয়েছিলো বলেই প্যাম্পোরের উড়ে যাওয়া কনভয়ে থাকা হয়নি ওর। মামা টু’তে ওইসময় ডিউটি না থাকলে, কারো বাড়ির জানলায়, বাড়ির জানলা দিয়ে ঢুকে কারুকাজ করা কার্পেটে, কারো দোকানের সাইনবোর্ডে, রাস্তার পিচে, রাস্তার ধারের নালায় খানিক পোড়া মাংস হয়ে সেঁটে থাকত। বাকি বডি ফিরে যেত বউ-বেটির কাছে। এতদিনে হয়তো বেটি ভুলেও যেত। বেটির কথা ভাবলেই কেমন করে জানি ও চলে আসে। খুবই ঢিঁঢ ছিল ও, কিংবা সত্যিই কিছু জানতো না। তাই বলারও কিছু ছিল না। কত বয়স ছিল? পনেরো-ষোলো বড়জোর। রুটিন মেনে ও ডিলডোটা চালাতে থাকে। ওর তখন শরীর খারাপ । কিছুক্ষণ পরেই ডিলডোটা রক্ত পাচ্ছিল। ছটপটাচ্ছে, অথচ একদম চুপ। একদম চুপ হয়ে ও ডিলডো চালাতে থাকে। মুখ খোলাবার দায়িত্ব ওকে দিয়ে বাকিদের প্যাম্পোরে নর্মাল ক্যাম্পে পাঠানো হলো। ডিলডোটা তখনো চালাচ্ছে। ও ছটপটাচ্ছে শুধু। রোখ চেপে গেল। মুখ খুলবি না মানে! ডিলডো চলছে। এইটা দিয়ে কত্তজনকে পোষ মানাল! পোষ মানাবার যন্ত্রে পোষ মানবি না মানে! ওর বয়স খুব বেশি হলে ওর বেটির চেয়ে তিন-চার বছর বেশি। শুধু ছটপট করছে। এত জেদ কীসের ! জেদ চেপে যায়। ডিলডোটা চলছে। মাঝে মাঝেই ডিলডোটা ফেলে দিয়ে সত্যিকারের রেপ করার ইচ্ছা মাথায় চাগাড় দিচ্ছে। আর্মির শৃঙ্খলা রাগে লাগাম টেনে রাখছে। ডিলডো চলছে। রগে টান ধরছে ওদের। ডিলডোটা চলছে। ডিসিপ্লিনকে চুদি! না থাক, করবে না রেপ। ডিসিপ্লেনারি অ্যাকশন নেওয়া হবেই হবে। ভাবলেই ভয়ে হাত পা শুকিয়ে যায়। ডিলডোটা দিয়েই টের পাওয়াবে ও কী জিনিস।
এইসব ভাবনার মাঝের সময়টুকুতে ছটপটাতে থাকা পা দিয়ে রক্ত নামছিলো অনবরত। ডিলডোটা ওকে কিছুতেই থামতে দেয়নি। জীবনের নিয়মে একটা সময়ের পর পেচ্ছাপ আর রক্ত মাখামাখি হতে থাকে ডিলডোটার গায়ে। তবু ডিলডোটা ওকে থামার পারমিশন দেয় না। পা প্রচণ্ড জোরে ছুঁড়তে থাকে । তবু ডিলডো থামতে দেয় না। পা একসময় থেমে যায়। ডিলডো তখনো ওকে চালাচ্ছে। আরো খানিক পর পা স্থির হয়ে থাকার ধরণটা চেনা চেনা ঠেকে। ডিলডো ডিউটি থেকে ছাড় দেয় এতক্ষণে। সর্বনাশ হয়ে গেছে। আর কোনো রক্ত বার করতে পারছে না। আর কোনো পেচ্ছাপ বার করতে পারছে না। ও মরে গেছে। প্রথমেই মনে পড়ল ও তো শালা কাটা। এই ধরণের কেসে একজন কাটার হয়ে জানপ্রাণ লড়িয়ে দেবে না কোনো অফিসার। ডিপার্টমেন্টাল অ্যাকশন হবেই। ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে মামা টু-এর বাইরে আসতেই দশ মিনিটের ভেতর স্যাটেলাইট ফোনে খবরটা এল। প্যাম্পোরে দশ মিনিট আগে উড়ে গেছে ক্যাম্পে ফিরতে থাকা কনভয়ের চারটা গাড়িই। একজনও বেঁচে নেই। ও বেঁচে আছে। পকেটে রাখা ডিলডোটায় হাত দেয়। কিছুক্ষণ আগে মরে যাওয়া ওর পেচ্ছাপ আর মাসিকের রক্ত মাখামাখি হয়ে আছে। এটার জন্যই বেঁচে গেছে। এটার জন্যই মরেছে।
এতক্ষণে মনে পড়ে ও তো মুসলমান। এইটা কি কুফরি? ছোটো, নাকি, বড় কুফরি? জাহান্নাম কি মামা টু-এর মতোই? মামা-টু-এর জাহান্নামে ও বেঁচে আছে। এইটা কি ওর তাবিজ? ডাউনটাউনের আকাশে কয়েকটা ঘুড়ি উড়ছে। ছোটোবেলায় ওরা ঘুড়িকে গুড্ডি বলতো। এইটা ওর তাবিজই। তাবিজটা আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করতে থাকে : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযিমুল হালিম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাববুল আরশিল আযিম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাববুস সামাওয়াতি ওয়া রাববুল আরদ্বি ও রাববুল আরশিল কারিম।’
এখন মানে জানে এই দোয়াটার। সুমহান ও অসীম ধৈর্য্যশীল আল্লাহ ছাড়া সত্যই কোনো উপাস্য নেই। মহান আরশের রব আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। আসমান ও জমিনের রব এবং মহান আরশের রব আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। দোয়া পড়তে পড়তেই ভেজা ভেজা ঠেকে প্যান্ট। কখন পেচ্ছাপ করে ফেলল প্যান্টে! আর্মির কনভয় উড়ে যাওয়ার দিনে সিভিলিয়ান লাশের গুরুত্ব সবসময় কমে যায়। পেচ্ছাপে ভিজে যাওয়া উর্দি তা ভালো করেই জানে। কনভয়টা উড়ে গিয়ে ওকে আরেক বিশাল বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। বুক ভরে স্বস্তির শ্বাস নেয়। পেচ্ছাপ করে ফেলা প্যান্টটা অত অস্বস্তি দিচ্ছে না আর। সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যাবে এবার ।
এই গল্পটা নাই নাই করে বারোজনকে বলেছে ও। সবাই পরামর্শ দেয় ডিলডোটা ফেলে দেওয়ার। হাজার হলেও এইটা কোনো সিভিলিয়ানকে তুলে নিয়ে এসে টর্চার ফর্চার করে পিটিয়ে মেরে দেওয়ার মতো নর্মাল ঘটনা না। একটু অন্যরকম ঘটনার রক্ত লেগে আছে এটায়। আর পাঁচটা সিভিলিয়ানকে যেভাবে তুলে এনে টর্চার করে খুন করা হয়, তেমন প্রোটোকল মানা ঘটনা হলে কারোরই হয়তো অস্বস্তি লাগত না। বারোবার, বারোজনের কথায় ডিলডোটা ফেলে দিয়ে আসে। প্রতিবারই কী করে যেন ডিলডোটা আবার ফেরত চলে আসে। এই গল্পটাও এগারোজনকে এগারোবার বলেছে ও। প্রত্যেকে শুনে একটাই মতামত দিয়েছে। নিশ্চিত ভাবেই ওর ভূত আছে ডিলডোটায়। ছটপটাচ্ছে, মুক্তি চাইছে। যত ইচ্ছা মুক্তি চাক, দিতে পারবে না মুক্তি। বাকিরা বুঝুক, চাই, না বুঝুক...ও নিজে মানে ডিলডোটা আসলে তাবিজ। লোকের কথায় ওর ভূতের কথা ভাবতে গিয়ে নিজেকে বিপদে ফেলতে পারবে না ।
—শুনি তোমার ছোটোবেলার গল্প। বলো...
—ছোটোবেলা না, আসলে ছোটোবেলার একটা রাতের গল্প শুধু।
—বলো, বলো...
—গ্রামে একবার মিলিটারি ঢুকল। তখন আব্বা বেঁচে আছে । একদম ভোর রাতে ঢুকলো। মিলিটারির যা কাজ তাই করল। হিন্দুদের গ্রাম অ্যাটাক করার জন্য আমরা মেশিনফেশিন কোথায় রেখেছি জানতে চেয়ে গোটা গ্রামকে পিটাল। বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর করল রুটিন মেনেই। রুটিন মেনেই আমরা চুপ থাকলাম। কেউ উত্তর দিতে পারছে না দেখে আমরা যারা বাচ্চা ছেলে ছিলাম, তাদের ন্যাংটা করল। তারপর আমাদের পাছার ফুটায় রুলার ঢুকিয়ে ঘুরাতে লাগল। এখন বুঝি, প্রোটোকল মেনে মেনে একবার ক্লক ওয়াইজ, একবার অ্যান্টি-ক্লক ওয়াইজ ঘুরাচ্ছিল। আমরা সব কুরবানির গরুর মতো ছটপটাচ্ছি। আমি তো ছোটোবেলা থেকেই বুদ্ধিমান। বুদ্ধি করে চিল্লে উঠলাম, ‘মহরমকা সবঠো বল্লম মসজিদ্ক পিছুকা ইঁদারা মে ছাও’।
—তুমি বাঙালি না?
—হ্যাঁ আমি তো বাঙালিই। কেন?
—কিছু না, কনটিনিউ...
—দু-চারটে ভোঁতা বর্শা পেয়েছিল। সেগুলোই নিয়ে গেল। আবার কালকে আসবে বলল। আর যা যা আছে বার না করে দিলে এবার গ্রামের সব মেয়েদের ন্যাংটা করবে বলে গেল। পরদিন দুপুরের ভাত খেয়েই গোটা গ্রাম সরপট দিলাম।
—আচ্ছা তোমাদের গ্রামটা কি বাংলাদেশ বর্ডারে ?
—না, না বাংলাদেশ বর্ডার ওখান থেকে পঞ্চাশ-ষাট কিমি হবে।
—তাহলে আর্মি কেন!
—আরে স্যার, ভারতের কোথাও হিন্দু-মুসলমান হলেই আমাদের গ্রামগুলাকে একটু নজরে রাখা হয়। এইটা কাটরা মসজিদের ঘটনার পরপর বোধায়...উঁহু তখন তো আরো ছোটো ছিলাম। তখন ঢুকেছিল এটাই খালি মনে আছে। কী করেছিল মনে নাই। আর যেই রাতের কথা বলছি সেইটা কবে যেন...হ্যাঁ, হ্যাঁ...মনে পড়েছে; বাবরির পর পরই।
দুদিন আগের সেশনের শেষের দিকে এই কথাগুলো হয়েছিল। তারপর থেকেই এই টানা বৃষ্টি। লোকটাকে পরের দিন ভাবছে বলেই দিবে ডিলডোটার আসল ঘটনা। ও কাউকে আজ অব্ধি আসল ঘটনা কি বলেছে? মনে নেই ওর। সবই কি বলে দিবে? না, সব বলা ঠিক হবে না। লোকটা এমনিতেই ওকে মিথ্যুক দেখাতে চাইছে । সব বলে দিলে কী ভাববে এখন? এমনিতেই লোকটা মামা টু-এর ব্যাপারটাই মানতে চাইছে না। ডিলডোটার আসল ঘটনাটা তো আরো মানতে চাইবে না। যতই ভালো মানুষ সাজুক, কাউন্সেলিং টাউন্সেলিং করতে আসুক, দিনের শেষে এসে তো লোকটা অফিসার। যদি নোট দেয় মেন্টাল হেলথ নিয়ে...তাহলে পেছনে আরেক বাঁশ। থাক...বলবে না। থাক...বলেই দিবে। বৃষ্টির শব্দে কান ঝালপালা হয়ে যাচ্ছে। তিস্তা, পাহাড়, আর বৃষ্টিকে আলাদা করা যাচ্ছে না আর। সকালে হাজার হাজার মাদী মহিষের গোঙানি এখন আর নাই। এখন যে শব্দ হচ্ছে চারপাশে সেটার সাথে চেনা কোনো জীবজন্তুকে জুড়তে পারছে না আর। ও সিধান্তে পৌঁছায় : এখন তিস্তা ডাকছে।
চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। অনেক অনেক অনেক বছর আগের এক শেষ দুপুরের আকাশ থেকে কেটে যাওয়া একটা ঘুড়ি নামছে আমবাগানের মাথা ছুঁয়ে। ও হাঁটছে। ওরা হাঁটছে। স্কুল বন্ধ তখন। কতদিন দেখা হয় না ওর বন্ধুদের সাথে। তার উপর আগের রাতে মিলিটারি ঢুকলো। পাছার ফুটোয় রুলার ঢোকানোর পরদিন হাগতে গিয়ে জান বেরিয়ে আসছিল ওর। দুপুরবেলা ভাত খেয়ে সড়পট লাগালো মা আর দুই দিদির সাথে ফুফুর বাড়ির দিকে। আরো ভিতরের গ্রাম। পাঁচ-ছয়টা আমবাগান পেরিয়ে যেতে হয়। আব্বা মুরুব্বিদের সাথে আলাপের পর আসবে। হাঁটছে তো হাঁটছেই। মাঈ’কে একবার জিজ্ঞেসও করলো সব গ্রামেই কি কাল মিলিটারি ঢুকেছে? কত্তদিন ধরে দেখা না হওয়া সব বন্ধুদেরও তো তাহলে আজ ভাগতে হচ্ছে? ওর হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ও হাঁটছে। ওরা হাঁটছে। শুধু পাছা না, পায়েও খুব ব্যথা। তিনটা বাগান পেরোনোর পর মনে হয় দুইটা ওরই মতো ছায়া যেন বড়কা জোলার বাগানের দিক থেকে এগিয়ে আসছে এদিকে। এদিকে তো এখন কেউই আসে না। আসার কথাও না। ওরা কারা? ভুল্লা? ফুফুর বাড়ির জায়গায় এখন কি ওরা ভুল পথে চক্কর কাটতে কাটতে মরবে? ছায়া দুটার খপ্পড়ে কি পড়ে গেছে ওরা? কেউ কেন দেখছে না ছায়া দুটোকে! দেখতে পাচ্ছে না নাকি ছায়া দুটাকে? তাহলে কি ভুল্লা ওকেই ধরবে খালি? ছায়া দুটো আরো দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। কেউ দেখতে পাচ্ছে না নাকি! ও দোয়া পড়তে শুরু করে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযিমুল হালিম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাববুল আরশিল আযিম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাববুস সামাওয়াতি ওয়া রাববুল আরদ্বি ও রাববুল আরশিল কারিম।’
এটার মানে ও জানে না এখনো। দোয়া পড়ার পরেও ছায়া দুটো এগোচ্ছে। ছায়া দুটো হঠাৎ ওর ছোটোবেলার নাম ধরে ডেকে উঠল।
—হ! রাফুল্লি! তুই এখানে!
—হ! তোরা ! আজ ভাগতে ভাগতেই আম্মাকে বাতিয়েছি তোদের বাড়িতেও নিশ্চয় মিলিটারি গেছে। তোদের বাড়িতেও কাল রাতে মিলিটারি ঢুকেছে, না ? চুলা, কড়াই সব ভেঙে দিয়েছে, না? তোদের মায়েরা কোথায়? তোদের প্যান্ট খুলিয়ে পাছায় লাঠি ঢুকায় নাই মিলিটারি? আরে! তোদের গুড্ডি ওটা?
—হ।
—ছিঁড়ে গেছে তো! চল, আমগাছের লাঠা লাগিয়ে লি । উড়াবো তারপর।
—হ। হ ।
—মাঈ... একটু খাড়া । মাঈ গে....একটু খাড়া। একটু গুড্ডি উড়ায়ে লি ।
ওয়াকিটকিটা ঘ্যারঘ্যার করে ওঠায় দেড় মিনিটের মিনিটের ঘুম-ঘুম ভাবটা কেটে গেল। কী যেন একটা স্বপ্ন দেখছিল। মনে পড়ছে না আর। সাইরেন বাজছে কেন? কেউ চিল্লে কিছু একটা বলল। ইলেকট্রিক টর্চ নিয়ে ক্যাম্পের লোকজন পাগলের মতো ছুটছে কেন? তিস্তার ডাকের ভিতর দিয়ে সাউণ্ড সিস্টেমে কম্যান্ড্যান্টের গলা ভেসে আসছে। অল পার্সোন্যাল, টেক কভার...হাই গ্রাউন্ড...ইভ্যাকুয়েট দ্য ক্যাম্প... সিকিউর অল ওয়েপনস অ্যান্ড ইক্যুয়েপমেন্টস...প্রায়োরিটাইজ লাইফ-সেভিং গিয়ার। কালকে ধস নেমেছিল যেখানে, সেখানকার একটা লেক বার্স্ট করেছে। পুরো লেকটাই নাকি নেমে আসছে তিস্তা দিয়ে। এমার্জেন্সি এক্সিট করতে হবে এখনই। গ্রেনেড, মাইন, রকেট লঞ্চার, গান সব বাঁচাতে হবে। তিস্তা এত কাছ থেকে ডাকছে যে মনে হচ্ছে তিস্তা কানের ভিতর দিয়ে ঢুকে শরীরের ভিতর দিয়ে বইতে শুরু করবে এখনই। তিস্তা আর ওর ভিতরের ফারাক ক্রমশ কমে আসছে। তিস্তার ডাকের ভিতর দিয়ে আবার সাউন্ড সিস্টেম ঘড়ঘড় করছে। অল পার্সোন্যাল, টেক কভার... প্রায়োরিটাইজ লাইফ-সেভিং গিয়ার। পকেটে হাত ঢোকায়। তাবিজটাকে বার করে। মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে ধরে। তিস্তা ওর শরীর হতে শুরু করে। বিড়বিড় করতে থাকে... লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল…
জান আজও বেঁচে যাবে নিশ্চিত—ও জানে—অঝোর এই অন্ধকারে ওর জ্যাক র্যাবিট ভাইব্রেটরটায় কালচে হয়ে লতিয়ে আছে ও। ·
লেখক পরিচিতি : অভিষেক ঝা গল্পকার, অনুবাদক। বসবাস করছেন জলপাইগুড়িতে।


0 মন্তব্যসমূহ