কায়েস আহমেদের গল্প : মহাকালের খাঁড়া



রত কোলে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে।
খবরটা অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই। প্রথম প্রথম খবরের কাগজে, তারপর হোটেলে বাজারে, রেলে বাসে।

আলের ধারে ফ্ল্যাগ পুঁতে ধান কেটে নিয়ে যাওযা, রাস্তার ধারে গলা কেটে ফেলে রাখা, পুলিশের সঙ্গে পাইপগান নিয়ে সামনা-সামনি লড়াই—এ সবই শোনা কথা, খবরের কাগজে পড়া খবর। বর্ধমানের সা‘বাড়ীর ঘটানাটা তো রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলো। কিন্তু এমন করে তার দোরগোড়ায় এসে যাবে ভাবতে পারেনি।

মাসখানেক আগে গরলগাছায় রাস্তার ধারে এক বাড়ীর গায়ে আলকাতরা দিয়ে বড় বড় হরফে লেখা: 'শ্রেণী শত্রু খতম চলছে চলবে' দেখে ভরতের বুকের ভেতর কলজে লাফিয়ে উঠেছিলো, তার বাড়ীর চার মাইলের মধ্যে এমন ছোরা-ওঁ চানো ব্যাপার চলে এসেছে, আর সে কিনা দূরের ঘটনা, খবরের কাগজের খবর মনে করে দিব্যি সুখে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভেতরে ভেতরে সিটিয়ে যায় ভরত, আশপাশের লোকজনের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারে না, কী জানি কার ভেতর কি আছে।

বাড়ীতে ফিরেও স্বস্তি পায়নি, স্টেশনে গিয়ে ছেলেকে আড়ালে ডেকে খুব গম্ভীর মুখে সাবধান করে দিয়েছিলো: 'খবরদার, কোন ঝুট-ঝামেলায় যাবি না, খদ্দেরের সঙ্গে রাগ-ঝাল করবি না, আর আড্ডা বসাবি না দোকানে, রাজনীতি ফাজনীতির আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক করবি না।'

সুরেন মাথা হেঁট করে বাপের কথাগুলো শোনে। এতোগুলো 'না' চব্বিশ বছরের জোয়ান তাগড়া ছেলেটা কিভাবে নিচ্ছে বুঝতে পারে না ভরত, ছেলের মাথা নীচু করা মোটা টান টান ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে ভারি অস্থির হতে থাকে সে। জোয়ান ছেলের বাপ হওয়া যে কী বিড়ম্বনার।

ইলেভেন ক্লাশ পর্যন্ত পড়ে পড়াশোনা ছেড়েছুড়ে দিয়ে ছেলেটা ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে আডডা আর যাত্রা থিয়েটার করে বেড়াচ্ছিলো। একমাত্র ছেলে, তার ওপর মা’র আদুরে গোপাল, ভরত কী করতে পারে। সে তার নিজের শতেক ঝামেলা নিয়েই ঝালাপালা। একলা মানুষ ক’দিক সামলাবে। আর মাথা-ঝাড়া দেওয়া উঠতি বয়েসের ছেলেকে চোখে চোখে রাখা ভরতের কম্মো নয়।

গোপী দত্ত এসে কেঁদে পড়লো একদিন: ‘ভরত আমার মান বাঁচা।’
খোঁজ খবর নিয়ে ভরত সব বুঝলো, ছেলেকে কিছু বললো না, উত্তর পাড়ায় ডাক্তারের ক্লিনিক থেকে গোপী দত্তকে দিয়ে তার মেয়েকে শুদ্ধ করে আনলো। সমস্ত খরচ দিলো ভরত। ছেলেকে রেডিও মেকানিজমে ভর্তি করে দিলো। ছেলে বুঝলো সবই, মাথা হেঁট করে বাপের ব্যবস্থা মেনে নিয়ে রেডিও মেকানিজম শিখতে গেলো। 

বেগমপুর স্টেশনে ছেলেকে রেডিও ট্রানজিস্টার মেরামতের দোকান করে দিয়েছে ভরত। সুরেন ঘাড় গুঁজে ট্রানজিস্টার মেরামত করে। ব্যবসা সে বেশ ভালোই জমিয়েছে। গত বছর ভরত বিয়ে দিয়েছে ছেলের, গোপী দত্তর মেয়ের সঙ্গে নয়, জয়কেষ্টপুরের হারুঘোষ তার ছেলের শ্বশুর। 

তবু ভয় যায় না ভরতের, জোয়ান বয়েসটাকে ভয়, তাগড়াই শরীরটার ভেতরে যে গরম রক্ত, তাকে ভয়, মুখের টানটান রেখাগুলোকে বড় ভয় পায় ভরত। গোপী দত্তর মেয়ের ব্যাপারটা ভুলতে পারে না সে। 
—'বুড়ো বয়েসে আমাকে একটু শান্তিতে মরতে দে বাবা।' ভরত ভেতরে ভেতরে নুয়ে পড়ে একেবারে।
—'আহ্ বাবা, আমাকে নিয়ে তোমার এতো ভয়?' 
গোপী দত্তর মেয়ের কথা ভরতের মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তবু সে বড় অসহায় কণ্ঠে বলে, 'ছেলের বাবা হ, তখন বুঝবি বাপ হাওয়া কি।' 

ভরতের চোলাই মদের কারবার। শোনকা, বারুইপাড়া, বাকসা, মণিরামপুর, আদান, জনাই, বেগমপুর, চণ্ডিতলা, গরলগাছা, হাটপুকুর, কুমিরমাড়া জুড়ে তার গোপন কারবার আজ কুড়ি বছর ধরে চলে আসছে। এই কুড়ি বছরে হ্যাপা তাকে কম পোয়াতে হয়নি। পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, সমাজতন্ত্রওলারা পিটিয়েছে। কিন্তু ভরতকে দমাতে পারেনি। কারবার তার ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়েছে দিনে দিনে। আগে আদানের মদন সাহা আর সে ছিলো চণ্ডিতলা থানার ভেতর একচেটিয়া। ছুটকো-ছাটকা দু'একজন যে ছিলো না তা নয়, তবু তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। 

কিন্তু এই পাঁচ সাত বছরে যা হয়েছে, ভাবা যায় না, সাতআট মাইলের মধ্যে এমন গ্রাম খুব কমই আছে যেখানে দু'চারটে গোপন ভাঁটি নেই। 
এতেও ভরত ঘাবড়ায়নি। বেগমপুরের পটলার সঙ্গে মিলে সে নতুন ব্যবসা ফেঁদেছে। 

কাজ এমন কিছু নয়, মানুষ এসে জিনিস দিয়ে যাবে, সেই জিনিস জায়গা মতো পৌঁছে দিতে পারলেই করকরে নোটের তাড়া। 
ঝুঁকি অবশ্য বডডো বেশি। তা ঝুঁকি নেই কিসে? তার মদের কারবারে ঝুঁকি নেই? 
ভরত বলেছে: 'আমি রাজি, পটলা তুই লাইন কর। পটলা লাইন করেছে রেলের ওয়াগন ভাঙা দলটার সঙ্গে।

ঠাকুরের কৃপায় ধরা ভরত এই পর্যন্ত পড়েনি। মদের কারবারও বন্ধ করেনি। লোক দেখানো গম কলটাও ঠিক রেখেছে তাজপুর বাজারে। জমি কিনেছে এন্তার। দখিনজলা, কোচের জলা, কাঁকড়াকূলের জলা। চারটে পেল্লায় গোলা ভরা টাবুটুবু ধান। বাঁশ বাগান, ফল-পাকুড়ের বাগান। পাঁচ পাঁচটা পুকুর লীজ নিয়ে মাছের চাষ করছে। শ্রীরামপুর-চণ্ডিতলা রুটে বাস চালু হতে ঝোঁক চেপে ছিলো, বাস কিনবে। 

সুরেনের মা বারণ করেছে, 'কি হবে, কমতিটা কিসে তোমার, ঠাকুরের ইচ্ছায় লক্ষ্মী বাঁধা পড়েচে তোমার ঘরে, একটা ছেলে, ভগোবান বাঁচিয়ে রাখলে ফেলে-ঝেলে খেলেও ফুরোবে না। বাস কেনা ঝামেলা বৈ তো নয়।' 

তা ঠিক, কমতিটা কি তার। 
তিনতলা বাড়ী, সামনে সান বাঁধানো পুকুর, গোয়ালে গরু, চাকর-বাকর, আশ্রিত—পুস্যি, ঝি দাসী নিয়ে তার ভর-ভরন্ত সংসার।
 
কী থেকে কিসে এসে দাঁড়িয়েছে। ছিলো দু'কামরা মাটির ঘর। খোড়ো চাল। শ্রীরামপুরে জুতোর দোকানে মাস মাইনে চাকরী করতো। আকালের বছর বাপ মারা গেলো। ভগিরথ সাহার কাছে ঋণ করেছিলো বাপ। চক্রবৃদ্ধি সুদের সেই দেনা শোধ করতে গিয়ে মালিকের চোখ ফাঁকি দিয়ে তার মালই হাত সাফাই করেছে।

আনোখীলার বলেছে, ‘এসব আবার খারাপ কি। গরিব হওয়াটাই পাপ।’
আকাশের দিকে আঙুল উচিয়ে বলেছে, 'উ সালা যো ভগোয়ান মাথার উপরে বইসিয়ে রইয়েছে, উ সালা ভি বোড়ো লোকের দলে।' আনোখীলালের সঙ্গে গোপন কারবার করে বাপের ঋণ শোধ করেছে, কিন্তু নিজে রক্ষা পেলো না, মালিক ধরে ফেললো তাকে, জেলেই যেতে হতো, অনেক কষ্টে জেলের হাত থেকে রক্ষা পেলো বটে, কিন্তু চাকরিটা গেলো। শ্রীরামপুর ছাড়তে হলো। তা ভালোই হলো শ্রীরামপুর ছেড়ে। যুদ্ধের বাজার তখন। সুতোর বড়ো টানাটানি। গুডুপ, বর্ধমান থেকে গোপনে সুতো পাচার চলছে। গ্রামে ফিরে ভরত ভিড়ে গেলো তাদের সঙ্গে। সেই থেকে শুরু।
কখন চুলে পাক ধরলো, কখন মাথায় টাক পড়লো, পঞ্চাশটা বছর পার করে দিলো ভরত, নিজের দিকে ফিরেও তাকায়নি। 

নিজের মদের কারবার। মদ বিক্রি করে হাজারো লোককে মাতাল করে, নিজে মাতাল হয়নি কোনদিন। মদ ভরত স্পর্শ করেনি কখনো। মেয়ে মানুষের নেশাও নেই তার। নেশার কথাই যদি বলো, তাহলে মানুষের সবচেয়ে বড় নেশাটাই আছে ভরতের, টাকা করা, সম্পত্তি করা। পরিশ্রম করে, ফন্দি ফিকির করে, কৌশল করে ভরত টাকা করেছে, সম্পত্তি করেছে।
সেই টাকা আর সম্পত্তি এখন শতমুখী রাক্ষস হয়ে তাকে গিলতে আসছে,। একমাত্র ছেলেও তার বুকের কাঁটা। 

চলা ফেরায় ভরত বড় সতর্ক এখন। রাতের বেলা সদর দরোজা বন্ধ হয়েছে কিনা নিজে এসে পরখ করে যায়, ওপরের তলায় ওঠার সিড়ির মুখে কোলাপসিবল গেট বসিয়েছে, তবু রাতে ঘুম হয় না ভরতের। 
স্ত্রী বলে, 'তুমি পাগল হয়ে যাবে এবার, ভরত ক্ষেপে যায়, ‘তোমাদের কি, ঘরে বসে বসে খাও আর ঘুমোও, দিনকালের খরব তোমরা কি বুঝবে।' 

ছেলেকে সাবধান করেও স্বস্তি পায়নি ভরত। পুত্রবধূকে সাবধান করেছে, সে যেনো স্বামীকে আগলে রাখে। অল্প বয়সী নতুন বউ তাতে আরো ঘাবড়ে যায়। রাতের বেলা স্বামীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, 'তুমি আরো সকাল সকাল আসতে পারো না, আমার খুব ভয় লাগে।' 
সুরেনের অসহ্য মনে হয়, কী আরম্ভ করেছে মানুষটা, বুড়ো হলে কি ভিমরতি ধরে। একটা মানুষ এতোগুলো লোককে পাগল করে তুলেছে। 

কারা যে এইসব লিখছে কিছুতেই বুঝতে পারে না ভরত, এই মাসের মধ্যে তার চারপাশের দেওয়াল ভরে গেলো। ভরত এখন মানুষের মুখ লক্ষ্য করে, মানুষের কথা লক্ষ্য করে, জটলা দেখলে তটস্থ হয়ে যায়।

পটলা বলে, 'দিনকাল ঝড়ো খারাপ পড়েছে ভরতদা, এই যে তোমার সঙ্গে আজ কথা বলছি, কাল যে তোমাকে আবার দেখতে পাবো তার কোন গ্যারান্টি নেই, কি আমাকেই যে তুমি দেখতে পাবে তা-ই বা জোর দিয়ে বলি কি করে।'

ভরতের বুকে রক্ত হিম হয়ে আসে। পটলা তার দিকে তাকিয়ে বলে, 'কাউকে আর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, কার মনে যে কি আচে কিছু বলতে পারো না তুমি। শম্ভু, কলেরা কি বলে জানো? বলে, আমরা শালা জান হাতে করে ওয়াগান ভাঙি, আমাদের ঘরে অভাব যায় না, আর তোমাদের তিনতলা বাড়ী ওঠে, জমি হয়, দোকান হয়,...
কথা বলতে বলতে পটলা থেমে যায়, ‘তোমার শরীর খারাপ নাকি, অতো ঘামচো কেনো?' 

সামনে কালী পূজো, তার কারবারের মৌসুমে, কিন্তু ভরত যেনো ঝিমিয়ে পড়ছে, সংসার তার ছোট্ট, অথচ হাজারো গণ্ডা পুস্যি, তাদের সকলের দায়িত্ব ভরতের একার। কোনো কোনো দিন কারণে অকারণে ক্ষেপে যায় সে, স্ত্রীকে বলে, চলে যেতে বলো সবাইকে, এতো ঝামেলা আমি আর টানতে পারবো না।'
সরোজিনী বিমূঢ় হয়ে স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে থাকে, বাইরের কেউ নয়, হট বলতে এতোগুলো মানুষকে ঘর থেকে নামিয়ে দেবে। পাগল হলো নাকি লোকটা। 

দুপুরবেলা সুরেনই খবরটা নিয়ে এলো। ভরত খেয়ে দেয়ে শুয়েছে তখন। ও ঘরে চাপা উত্তেজনা আর ফিসফাস তাকে উৎকর্ণ করে।
—'কি হয়েচে রে সুরেন?' ভরত চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে। কথাবার্তা ও ঘরে থেমে যায়। ভরত উঠে বসে, তার বুক ধড়ফড় করে, 'কিরে কি হয়েচে?' 

এবার স্ত্রীর গলা শোনা যায়, 'কি আবার হবে, কিছু হয়নি, তুমি ঘুমোও।'
—'কি আবার হবে? আমাকে বলা যায় না? সুরেন শোন।' 
অগত্যা সুরেনকে আসতে হয়, সুরেনের সঙ্গে সুরেনের মা-ও আসে, তার পেছনে পেছনে পুত্রবধূ। 

সুরেন মহা ফাঁপরে পড়ে, এমন একটা ব্যাপার, রেখে-ঢেকে বলাও যায় না, যেমন করেই বলো, কথাটার বীভৎসতা বেরিয়ে আসবেই। অতএব সমস্ত ব্যাপারটাকেই খুলে বলতে হয় তাকে: 

লালবেহারী ডাক্তারের ভাই পরিমল বাজারে গিয়েছিলো সকালে, বেলা বারোটা সাড়ে বারোটা বেজে যায় তখনো সে বাড়ীতে ফেরে না দেখে বাড়ীর লোকজন চিন্তিত হয়, এমন সময় বিভূতি লাহার নাতিটা, বছর দশেক বয়েস, পরিমলের বাজারের ব্যাগ নিয়ে তার বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত। আঠারো বিশ বছরের তিনটি অচেনা ছেলে ব্যাগটি পরিমলের বউকে দেবার জন্যে তাকে দেয়, ছেলে মানুষ অতোশত বোঝেনি, ব্যাগ নিয়ে পরিমলের বাড়ীতে যায়। বাড়ীর লোকজন শাক তরিতরকারী ভরা বাজারের ব্যাগটা উপুড় করে ঢালতেই খবরের কাগজে জড়ানো পরিমলের মাথা বেরিয়ে আসে। 

সুরেনের বর্ণনা শেষ হতে না হতেই জল আনু, পাখা আন, দৌড়ো-দৌড়ি পড়ে যায় ভরতের ঘরে।
সেই থেকে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে ভরত। বাড়ীতে কেউ কারুর সঙ্গে নীচুগলায় কথা বললে ভরতের বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি শুরু হয়। ডাক্তার বলেছে, দুশ্চিন্তা করা যাবে না, রেস্টে থাকতে হবে। 

ছেলে বলে, 'এতো চিন্তার কি আচে তাতো বুঝি না। পরিমল পার্টি করতো, আমরা তো কোনো পার্টি করি না'...
ভরত খেঁকিয়ে ওঠে, 'এই তোর বুদ্ধি। পার্টি করিস আর না করিস, তুই ভরত কোলের ছেলে, ভরত কোলে ওদের চোখে শ্রেণী শত্রু, এখন বুঝলি রে গাড়োল। রাস্তা চলিস কি চোখ বন্ধ করে।’

অতএব ডাক্তারের প্রথম নির্দেশ মানার কথাই ওঠে না, আর রেষ্ট, ভরতের মতো মানুষের রেষ্ট কোথায়?

ভরতের বুক ধড়ফড় করে, মাথা শূন্য মনে হয়, বাইরে বেরুলেই গলা শুকিয়ে আসে, রাস্তায় হাঁটতে গেলেই মনে হয় কারা যেনো তাকে অনুসরণ করছে পেছনে পেছনে, ঘাড় পিঠ শির শির করে। বাস কিংবা টেনে উঠলে কোনো মানুষ তার দিকে একবার ছেড়ে দুবার তাকালেই বুকের ভেতর ধড়াস করে ওঠে। কিন্তু উপায় কি, বাইরে ভরতকে বেরুতেই হয়। 

প্রত্যেক বছরেই ভরতের বাড়ীতে কালী পূজো হয়। বেশ ধুমধাম করেই হয়। এ বছরে তায় একদম ইচ্ছা ছিল না। দেবীর ওপর ভক্তি উঠে গেছে নয়, পুজো মানেই উৎসব, উৎসব মানেই হৈ চৈ আর হৈ চৈ মানেই মানুষের দৃষ্টি পড়া। ভরত কোলে মানুষের আলোচনার বিষয়বস্তু হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা, এসব কথা বুঝবেটা কে? স্ত্রী বলবে, পাগল। ছেলে বলবে, ভিমরতি। আড়ালে হয়তো বা হাসাহাসিও করবে। এমনিই সেদিন ছেলেকে গাড়োল বলাতে ছেলে রেগে আছে মনে মনে, সামনে কিছু বলেনি, মাকে বলেছে, 'কেনো ধনী কি উনি একা, আর ধনী মানুষ নেই এ তল্লাটে?' 

নিজের হাতকে নিজেরই কামড়াতে ইচ্ছা করে ভরতের। 
সে যে চোলাই মদের কারবারী, সে যে বেআইনী ব্যবসা করে টাকা করেছে, সমাজতন্ত্রওলারা এক সময় যে পিটিয়েছে তাকে, আর পাঁচজন বড়ো লোকের চেয়ে মানুষের আক্রোশটা যে তার ওপরই বেশি, এসব কথাও কি ভরতকে নিজের মুখে বলতে হবে বউ ছেলেকে? যাক, যা খুশী করুক ওরা। 

অতএব ভরতের বাড়ীতে কালী পূজো হচ্ছে। 
পূজোর দিন দুপুরে ছেলে খেতে এলে মা বলে, ‘এ বেলা দোকান না-ই বা খুললি, তোর বাবার শরীর ভালো নেই, পরকে দিয়ে কি এসব কাজ হয়।'
সুরেনের ভেতর তখন আসন্ন ফুর্তি বুজকুড়ি মারছে। আজ সন্ধ্যায় বহু দিন পর বন্ধুদের সঙ্গে একটু গা এলোনো মৌতাত করা হবে। 
সুরেন তাড়াতাড়ি বলে, 'না না, দোকানে যেতেই হবে, ক'টা জরুরী অর্ডার ডেলিভারী দিতে হবে, দোকান বন্ধ রাখলে খদ্দের বিগড়ে যাবে।' 
এরপর সরোজিনীর কিছু বলার থাকে না। 
ছেলে দোকানে যাওয়ার সময় সরোজিনী বলে, 'তাড়াতাড়ি ফিরিস, যাবার সময় ভক্তি করে প্রণাম করে যাস্, কি যে সব হইচিস তোরা আজকালকার ছেলেরা, ঠাকুর দেবতার ওপর এক ফোঁটা ভক্তি নেই।'

ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেলো সুরেনের। অনেকদিন পর বড় আনন্দে কাটছিলো আজ। অনেক দিনের স্মৃতি জড়ানো চিনের চালের ক্লাব ঘরটায়গান, হাসি, গল্প গুজোব, তার ওপর নিপু খাঁটি স্বচ জোগাড় করে এনেছিলো, কষা মাংসের সঙ্গে বড়ো জমেছিলো। যাত্রা থিয়েটার করে বেড়ানো সময়গুলোতে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এক আধ চুমুক খেয়েছে সুরেন, তা-ও দিশি। ভালো লাগেনি। দোকানের ঘানিতে বাঁধা পড়ার পর একদিনও হয়নি। বিয়ের পর তো একেবারে জাবরকাটা গরু। আজ বিলিতি মাল পেটে পড়ায় ভারী চনমনে হয়ে উঠলো মেজাজটা। সেই পুরোনো নির্ভার ফুরফুরে সময়টার বাতাস বইতে শুরু করেছিলো। আর তখন হঠাৎ করে সবিতার কথা মনে হতেই বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। বন্ধুদের কথাবার্তায় সে মনোযোগ রাখতে পারছিলো না, নিজেকে খুব হেরে যাওয়া মনে হতে থাকে, মনে হতে থাকে তার জীবনটা একেবারে বরবাদ হয়ে গেলো। মনে হলো, বড়ো ঠকিয়েছে তাকে সবাই। বাপ মা তার দুর্বলতার সুযে সুযোগ নিয়ে একেবারে ফিনিশ করে দিয়েছে তাকে।

সবিতার জন্যে তার প্রচণ্ড রকমের মায়া হতে থাকে। সবিতার ওপর সে জুলুম করেছে, বড়ো অবিচার করেছে সে। নিজের কাপুরুষতার জন্যে সবিতার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে।
—'কি রে, উঠে পড়চিস যে বড়ো?' বন্ধুরা সমস্বরে হৈ হৈ করে ওঠে। 
—'না চলি, ভাললাগচেনা।' একটু একটু জড়ানো ভারী গলায় সুরেন বলে। 
—'লে বাবা, অমন খাঁটি স্কচ খাওয়ালুম, তাও ভাল লাগচে না, কেনো ভরতেশ্বরী ছাড়া রোচেনা বুঝি আজকাল?'

বন্ধুরা হো হো করে হেসে ওঠে। সুরেন লাল হয়ে যায়। নিপু স্পষ্ট তার বাপের চোলাই মদের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। মাখন বলে, 'আরে না না, মনে মনে হৃদয়েশ্বরীর ডাক শুনতে পেয়েছে। তাই নয় রে সুরেন?’ 
আবার হো হো হাসি। সুরেন প্রায় ছিটকে বেরিয়ে আসে বাইরে। কেমন আচ্ছন্নের মতো হাঁটতে থাকে সে।

নোনা পোতার রেলগেটের পাশে পূজো হচ্ছে। ভিড় তেমন নেই, তবু মেয়ে-দেখা মাস্তান দু'চারজন এখনও বড় জমিয়ে আছে। চালচিত্রের পেছনে রেলে পুকুরপাড়ে হয়তো বোতল চলছে। কাঁকী করে লাউড স্পীকার বাজছে 'এপ্রিল ফুল' বানায়া'...। পাতলা ভিড়ের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে ঘড়ির দিকে চেয়ে চমকে ওঠে, সাড়ে দশটা। 

মা সকাল সকাল ফিরতে বলেছিলো। বাবা হয়তো অস্থির হয়ে পড়েছে। বিনু ছটফট করেছে নিশ্চয়ই। সুরেন জোরে জোরে পা চালায়। একবার ভাবে রিক্সা নিই, তারপর হঠাৎ মনে হয়: কেনো, তার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম নেই? আমার খুশী, আমি দেরী করবো। প্রায় ছেলে মানুষের মতো গোঁ ধরে হঠাৎ রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর আবার হাঁটতে থাকে ধীরে ধীরে। সবিতার সঙ্গে সে মনে মনে কথা বলতে থাকে, 'সবিতা, আমি খুব অন্যায় করেছি, আমায় ক্ষমা করে দাও সবিতা।' বলতে বলতে সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবিতার পা জড়িয়ে ধরার জন্যে রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে যাচ্ছিলো। পেছনের চলন্ত সাইকেল থেকে কে যেনো ডেকে ওঠে, 'কে, সুরেনদা নাকি?' 

সুরেন ফিরে তাকাবার আগেই সাইকেল তাকে অতিক্রম করে যায়। হাত কয়েক দূবে গিয়ে সাইকেল আরোহী পেছন ফিরলে সুরেন চিনতে পারে, ‘কে ঝন্টু?’ 
—হাঁ, চলি।'

ঝন্টু চলে যায়। সুরেন পেনো বাজারের মোড় পেরোয়। রাস্তাটার এখানে আবছা। অন্ধকার। এখান থেকে বাড়ী ঘর ফাঁকা ফাঁকা। দু'পাশের গাছপালা নুয়ে আছে। সুরেন আর একটা বাঁক পেরোয়। পানু স্যাকরার ভাঙা বাড়ীর ধার ঘেঁয়ে, নন্দীদের পুকুরপাড়ের নীচে দিয়ে রাস্তাটা ক্রমে সুরু হয়ে গেছে। তারপর দুপাশে ব্রজ তাঁতির বিশাল বাঁশ বাগান। সুরেন রাস্তায় কোন মানুষ দেখে না, বাঁশ বাগানের খুব ভেতর থেকে শিয়াল ডেকে ওঠে, ঝিরি'-র একটানা মন্ত্রোচ্চারণ চলে চারপাশে। সুরেনের কেমন গা ছমছম করতে থাকে। পা ভারী হয়ে এসেছে। হাত দু'টোও তার অন্য কারো হাত হয়ে গেছে। 

হঠাৎ দেখে, সামনের বাঁশ ঝাড়ের গোড়ায় সবিতা দাঁড়িয়ে আছে। সুবেন আকুল হযে ডাকে: 'সবিতা।' 
সবিতা তার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েই সামনে ঝুঁকে দু'হাতে মুখ ঢাকে। সুরেন দ্রুত হাঁটতে যায়, পা জড়িয়ে আসে। সবিতা পিঠে চুল এলো করে দৌড়োতে থাকে। 
'সবিতা, শোনো সবিতা।' 
তার মোটা খসখসে ভারী হয়ে যাওয়া জিভে শব্দ ফোটে কি ফোটেনা, সুরেন গোঙানীর মতো করে গোপী দত্তর মেয়েকে ডাকে। 

মেয়েটি হঠাৎ কোথায় যে লুকোয় সুরেন ঠাহর করতে পারে না। ঝিঝির ডাক আর বাঁশ বনের শোঁ শোঁ কট কট শব্দ, শুকনো বাঁশ পাতার ওপর পোকামাকড় হেঁটে যাওয়ার কি তার পায়ের নীচে ভেঙে যাওয়া পাতার শব্দ-বাকীটা সুনসান নির্জনতা। সবিতা কি শ্বশুর বাড়ী থেকে পালিয়ে এলো। সুরেন হাঁটতে হাঁটতে খোঁজে। স্বামীটা লিলুয়া ওয়ার্কশপে ওয়ার্কশপে চাকরী করে। শ্বশুর বাড়ীতে হয়তো কষ্ট দেয় সবিতাকে। হয়তো স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। সুরেনের মাথার ভেতর মেঘ আর চাঁদের খেলা চলে। একবার আলো হয় একবার ঝাপসা হয়। অক্টোবরের কুয়াশাময় রাত্রিতে আকাশের চাঁদটি কোথায় আছে মাথার ওপর বাঁশ বাগানের ছাউনীর নীচে থেকে দেখা যায় না, শুধু একটু ময়লা ময়লা আলো অন্ধকারের সঙ্গে মিশে নষ্ট ডিমের মতো ঘোলা হয়ে আছে চারপাশে। 

কী যে ঝামেলায় পড়লো সুরেন। একটাও কি মানুষ আসতে নেই। সবিতা যদি এখন এই বাশ বাগানের ভেতরে কোথাও একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসে। 

ঐ, ঐ তো সবিতার আচল দেখা যাচ্ছে। সুরেন দৌড়োতে শুরু করে। এঁকে বেঁকে টাল খেতে খেতে দৌড়োয়; 'সবিতা, দাঁড়াও, সবিতা প্লিজ!' তার জিভ কৈ মাছের মতো ছটফট করে মুখের ভেতর। চোখে জল এসে যায়। মাটির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় সুরেন, নিজের শরীর নিজের কাছেই প্রকাণ্ডভারী বোঝার মতো ঠেকে, কিছুতেই তুলতেপারে না, হাঁটু দুটির ভেতরকার টানটান বাঁধনগুলো সব আলগা হয়ে গেছে। তার ওপর ভর দিয়ে কোনো মতেই ওঠা যায় না। সুরেন দামাল শিশুর মতো হামা দেয়। হাত কয়েক দূরে গিয়ে উবু হয়ে বসে। মাটির ওপর দু'হাতের ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে বার দুই দোল খেয়ে উঠতে গেলে তার মাথা চক্কর দেয়, পেটে কষা মাংস আর নিপুর খটি স্কচ ডিগবাজি খেলা দেখায়। বুক বেয়ে নোনতা ঝাঁঝালো স্বাদের ঢেঁকুর এবং জল উঠে আসে মুখে। সুরেন ওয়াক ওয়াক করে, বমি হয় না, থু থু করে থুতু ফেলে, মুখ হা করে ঠাণ্ডা বাতাস টানে। খানিক্ষণ থম ধ'রে চোখ বন্ধ করে বসে থেকে, তেমনি দু'হাতের ওপর ভর দিয়ে প্রবল হ্যাঁচকা টানে নিজেকে উপড়ে নেওয়ার মতো ক'রে দাঁড় করিয়ে দেয়। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জেগেছে। সুরেন প্রাণভরে শ্বাস টানে, তারপর আবার হাঁটতে থাকে।

ব্রজ তাঁতির বাঁশ বাগানের শেষ মাথায় এসে পড়েছে। বাঁকের মুখে বটতলাটা দেখা যায়, তার পরেই জেলে পাড়া। আচ্ছা আমি এ রাস্তায় এলাম কেনো? বটতলার নীচে দিয়ে জেলে পাড়ার ওধার দিয়ে আমার সোজা চলে যাওয়ার কথা। মাইরি এ সবের কোনো মানে হয় না, সুরেন নিজেকে শোনাতে শোনাতে। হাঁটে। 

বটতলায় আশশ্যাওড়ার জঙ্গলের ভেতর চারজন অস্থির হতে থাকে, হরি বলে, 'কি হলো বলতো, ঝন্টে তুই দেকিচিস?'
—‘লে শালা, কথা বল্লুম।’
সুদীপ বলে, 'বোকাচোদাটা গেলো কোতা তা হলে?' 
—আমার মনে হয় বাঞ্চোতটা রাস্তার ধারে কোথাও পৌঁদ উল্টে পড়ে আচে।' ঝন্টু যুক্তি দেখানোর মতো করে বলে। 

উঁচু বটতলার নীচে দিয়েই পাকা রাস্তা ধরে ভরত কোলের লোকজনেরা একটু আগে আলো হাতে কথাবার্তা বলতে বলতে ষ্টেশনের দিকে গেছে। হরি কোনো কথা বলে না, গলা উচিয়ে স্টেশনমুখী রাস্তার দিকে বারবার তাকায়। 

অনাদি এতোক্ষণ কোনো কথা বলেনি, সে বলে, 'আচ্ছা হরি, এমনও তো হতে পারে, মাতাল শালা রাস্তা ভুল করে বাঁশ বাগানের ভেতর ঢুকে ঘুরপাক খাচ্ছে।' 

এবার তিনজনই এক সঙ্গে অনাদির দিকে তাকায়। তাদের মাথায় আলো চমকে ওঠে। হরি বলে, ভেরি ন্যাচারাল, অনা তোর কতাই ঠিক, নেশা করেছে, ঝন্টে নিজে দেকে এসেছে, মাতাল মানুষ। মোড়ের মাথায় এসে দিক ঠিক করতে পারেনি, পানু স্যাকরার বাড়ীর পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তায় নেমে নন্দীদের পুকুর ধার দিয়ে সোজা ব্রজ তাঁতির বাঁশ বাগানে ঢুকেছে, রাইট! ঝন্টে, তুই রাস্তার দিকে নজর রাক, আমরা বাঁশ বাগানে ঢুকি।' 

অনাদি বলে, না, ঝন্টে শুধু শুধু এখানে বসে থেকে লাভ কি, রাস্কেলটা যদি রাস্তার ওপরই পড়ে থাকে তাহলে ভরত কোলের লোকজন গেছে তারাই সঙ্গে করে নিয়ে আসবে, অতোগুলো মানুষকে ঝন্টু একা সামলাতে পারবে না, খামাখাই সব কাজ গুবলেট হবে। ঝন্টু তুইও চল। 

চারজন যুবকের একজনের হাতে চটের একটা ব্যাগ, তারা সতর্ক হয়ে রাস্তায় নামে, তারপর এক দৌড়ে পাড়উচু বাঁশ বাগানে উঠে দ্রুত নিজেদেরকে আড়াল করে ফেলে। 

হাঁটতে হাঁটতে সুরেন আবার সবিতাকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে সামনের দিকে এগোয়। 
বাঁশ পাতার ওপর খড়মড় আওয়াজ এবং ধুপধাপ পদ শব্দে চারজনই সামনের দিকে তাকালে টলমল পায়ে এগিয়ে আসা সুরেনকে দেখতে পায়; চাপা সোল্লাসে তারা সুরেনকে অভ্যর্থনা জানানোর মতো ক'রে বলে, 'আরেশ্বালা। গোলাপ তুমি এখানে।' 

যেনো মজাদার কিছু। তারা সুরেনের সামনে এসে দাঁড়ায়। চারটে ড্যাগার সুরেনের পেট থেকে বিঘত খানেক দূরে অর্ধ চন্দ্রাকারে ঝক্ ক'রে ওঠে। 
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় সুরেন। সবিতার বদলে মাটি ফুড়ে চারজন এমনভাবে ছুরি হাতে সামনে দাঁড়িয়ে, তার ওপর অতি পরিচিত। বড় বড় চোখ ক'রে মানুষ চারজনকে দেখে, কোন কথা বলতে পারে না, ব্যাপারটা বড় মেঘালাটে ঠেকে, সবিতাকে দেখতে পাওয়াটা ঠিক, না এরা ঠিক? 

তার ব্রহ্মতালু দিয়ে স্কচ হুইস্কির উত্তপ্ত ফ্লেবার বেরিয়ে যেতে থাকে হু হু করে। কী যে হয় সুরেনের ভেতরে কে জানে, কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ সে 'বাঁচাও বাঁচাও' ব'লে পেছন ফিরে দৌড়োতে যায়। 

ঝন্টুর ড্যাগারই তার পিঠদেশ বিদ্ধ করে প্রথম। সুরেন 'আ-আ-আ' ক'রে বিকট শব্দে মাটির ওপর উপুড় হয়ে হয়ে পড়ে। হরি, সুদীপ, অনাদি তাকে ঘিরে ধরে, ‘খবরদার, চোঁচাবিনি শালা।’

চটের ব্যাগের ভেতর থেকে সুদীপ পটকা বার করে ফাটায়। 
ছুরির ঘাইটা তেমন জমেনি পিঠে। সুরেন থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে কান্না-ভাঙা গলায় বলে, 'আমায় মারিস নি, প্লিজ, তোদের পায়ে পড়ি, আমার বউয়ের বাচ্চা হবে।' 
তাকে না মারার যুক্তি হিসাবে সুরেন কেনো যে তার বউয়ের বাচ্চা হওয়ার কথা নিয়ে এলো কে জানে।
হরি বলে, 'তাই নাকি? ঝন্টে, তাহলে তো শালার যন্তরটাই সাবড়াতে হয় আগে।' 

সুদীপ তার মুখে রুমাল গুঁজে দেয়, তারপর তিনজন মিলে তাকে চিৎ করে। সুদীপ রুমাল চেপেই থাকে। হরি আর অনাদি সুরেনের দুই হাতের ওপর দাঁড়ায়। ঝন্টু বলে, 'আর একটু ওধারে নিয়ে যাই চল।' তখন তিনজন মিলে সুরেনকে চ্যাংদোলা করে তোলে। সুরেন মোড়ামুড়ি করে। তার আমড়া আমড়া চোখ দু'টি ঠেলে বেরিয়ে আসে। সুদীপ মুখের ভেতর রুমাল ঠেসে ধরে থাকে, তার ভেতর থেকে খুব ঘষা অস্পষ্ট গোঁ গোঁ শব্দ করতে থাকে সুরেন। 

যুবক চারজন ভারী হাস্যকর কায়দায় তাকে বাঁশ বাগানের পায়ে-চলা সরু রাস্তার ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে-পাশে-আরো ভেতরদিকে একটা বড়ো ঝাড়ের আড়ালে নিয়ে গিয়ে ফেলে।
হরি বলে, 'তাড়াতাড়ি কর, শালা যে জোর চেঁচিয়েচে। আবার তারা আগের পজিশন নেয়: হরি আর অনাদি সুরেনের দুই হাতের ওপর, সুদীপ মুখে রুমাল চেপে। 
ঝন্টু সুরেনের দুই হাঁটুর ওপর ব'সে ধুতি খোলে, ড্যাগার দিয়ে দড়ি কেটে আন্ডারওয়্যার নামিয়ে দেয়।

সুরেন গলার দু'পাশের শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে, কিন্তু তার টাকরা পর্যন্ত ঠাসা রুমাল, আওয়াজ বেরোয় না, খুব ক্ষীণ হাওয়া বেরোবার অদ্ভুত একটা আওয়াজ হ'তে থাকে, ক্রমাগত সে মাথা এ পাশ ওপাশ করে। হাত টানে। ওপর নীচে কোমর নাড়ে। ঝন্টু আর একটু সামনে এগিয়ে উরুর ওপর আরো চেপে চুপে বসতে বসতে বলে, 'হাঁ হাঁ, শালা চিৎ হয়ে মনে মনে বউকে ঠাপা।’

বাম হাতে সে সুরেনের কুঁকড়ে যাওয়া শিশ্ন মুঠো করে ধরে ইলাস্টিকের মতো টেনে লম্বা করে, তারপর ডান হাতের ড্যাগার দিয়ে পোঁচ দেয়। বেশি দিতে হয় না, গোটা দু'য়েক পৌঁচেই কাজ হয়। তীক্ষ্নমুখী রক্তধারা পিচকারি দিয়ে উর্ধ্বমুখী হয় কি হয় না, সুদীপ সুরেনের ধুতির খুঁট দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরে। ঝন্টুর মুঠোর ভেতর সুরেনের লিঙ্গ কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে। 

প্রধান কাজটা হরিই করে। তার জন্যে তার পজিশন চেঞ্জ করতে হয়, হরি সুরেনের বুকের ওপর চড়ে বসে। সুরেনের পুরুষাঙ্গ হাতে নিয়ে ঝন্টু হরির জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। 

সুরেন এখন আর তেমন দাপাদাপি করে না, শুধু একটানা ক্ষীণ গোঙানী আর কোমরের, মৃদু মৃদু কাঁপন, কখনো এ পা কখনো ও পা একটু আধটু টানে। চোখ স্থির। হয়তো বা সুরেনের অজ্ঞান অবস্থায়ই হরি তার গলায় ছুরি চালায়। কেননা প্রথম পোঁচ দেবার পর একটু আগে চুপচাপ পড়ে থাকা সুরেন বেশ জোরে সমস্ত শরীরে ঝাকুনী দিয়ে নড়ে ওঠে। পরের পরের পৌঁচগুলোয় পোঁচগুলে আর তেমন নড়ে না।

সুরেনের গলা দিয়ে রক্তপ্রবাহের ঘড় ঘড় শব্দ হতে থাকে; হরি কর্ম সমাধা করে উঠে দাঁড়ায়। 
হরির এ্যাকশন চলাকালে অনাদি বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদটাকে খুঁজছিল। ঝন্টু এতোক্ষণ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলো, সুরেনের হাতের ওপর দাঁড়িয়ে বার বার সেই ছবিটাই চলে আসছিলো তার মনে। রাস্তার ওপর টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সুরেন জিজ্ঞেস করছে, ‘কে, ঝন্টু?'
হরি হাঃ বলে মুখ থেকে স্বনিঃশ্বাস শব্দ করে উঠে দাঁড়ালে ঝন্টু নেমে আসে।

অনাদি একটু দূরে গিয়ে প্রস্রাব করতে বসে। সুদীপ উঠে আড়মোড়া ভাঙে। ততোক্ষণে ঝন্টু একটা শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে নিয়ে তার আগায় সুরেনের কর্তিত লিঙ্গটি গাঁথে, তারপর সুরেনের দুই উরুর মাঝখানে কঞ্চিটাকে পুঁতে দেয় মাটিতে। 

সুদীপ বলে, 'মাইরি যেনো শিবের ত্রিশূল। থাক। বেশ হয়েচে।' এবার তারা ব্যাগের ভেতর থেকেএকটি বড়ো সাইজের পটকা এবং ইঞ্চিচারেক চওড়া হাতদেড়েক লম্বা কাগজ বার করে। 'গলা কাটা চলছে চলবে' শ্লোগান সম্বলিত সেই লম্বা কাগজটি বিশ্বসুন্দরীর মতো করে সুরেনের ডান কাঁধ থেকে বুকের ওপর দিয়ে বাম কোমর পর্যন্ত প্রসারিত করে বিছিয়ে দেয়। 

এই জরুরী কাজটি শেষ করে তারা পটকা ফাটিয়ে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়। লিঙ্গহীন, জবাই করা, বাণীশোভিত উলঙ্গ সুরেন ঘড়ি হাতে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে বাঁশ বাগানের ভেতর। তার দুই উরুর মাঝখানে কঞ্চিতে গাঁথা উর্ধমুখী শিশুটিকে বড়ো নিঃসঙ্গ দেখায়। 

জেলে পাড়ার লোকগুলো ঘরের ভেতর উঠে বসে কান খাড়া করে। তারপর দরজা খুলে বাইরে রকের ওপর বেরিয়ে আসে। এ রক ও রক থেকে মানুষ কথা বলে: 'ব্রজ তাঁতির বাঁশ বাগান থেকে নয়?' আর একজন বলে, 'তাইতো মনে হলো? 
নিতাই জেলের যুবক ছেলেটি বলে, 'কেষ্টো কাকা, ব্যাপারটা একটু দেখতে হয় না? 
বৃদ্ধ নিতাই ধমকে ওঠে: 'হাঁ দেখতে হবে বৈকি?' হারিকেনের আলোয় তার মুখের চামড়ার কোঁচকানো ভাঁজগুলো কেঁচোর মতো কিলবিল করে ওঠে: 'রাত দুপুরে প্রাণটা হারাও আর কি!’
বৃদ্ধের এ কথায় মানুষগুলোর মাথার ভেতর লালবেহারী ডাক্তারের ভাই পরিমলের গলাকাটা লাশটি ধপাস করে এসে পড়ে। 

রাত সাড়েবারোটার দিকে নতুন বাঁশের খাটিয়ায় শুয়ে মানুষের কাঁধে চড়ে সুরেন বাড়ী ফেরে। পুকুর পাড়ে মণ্ডপের সামনে ছোটখাটো মাঠের মতো জায়গাটা খালি হয়ে গিয়েছিলো, ঢাকীরা বসে বসে বিড়ি টানছিলো, দূর থেকে মানুষের কলরব ও বাঁশের খাটিয়া দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে দাড়িয়ে পড়ে, মুহূর্তের মধ্যে কোথা থেকে লোকজনে ভরে যায় জায়গাটা। সুরেনের অনুসন্ধানকারীরা স্বেচ্ছাসেবকের মতো খাটিয়ার চারপাশে দাঁড়িয়ে ভিড় ঠেকাতে থাকে। চিৎকার করে, হাত নেড়ে, স্থির হতে বলে। কিন্তু কেউ কারুর কথা শোনে না। মেলার মতো ক্রমাগত বিপুল জনসমাগমের ভিড়, হৈ চৈ, চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ির মধ্যে সুরেনকে মণ্ডপের এক পাশে নামালে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। স্বেচ্ছাসেবকের প্রতিরোধ ভেঙ্গে যায়। মানুষজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে, নেপাল ইদিকে আয়', মাথাটা একটু সরাও না' ইস' ইত্যাকার ধ্বনি শোনা যেতে থাকে, কেউ কেউ এক পলক দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে, মানুষজন ফেলে বেরুবার জন্যে ছটফট করে—এই সবের মধ্যেও ভিড়ের চাপ বাড়তে থাকে। 

জেলে পাড়ার দু'একজন একধারে দাঁড়িয়ে তাদের বীরত্ব কাহিনী বর্ণনার তোড়জোড় করছিলো, তাদেরকে থেমে যেতে হয়। সামনে এমন তাজা বীভৎসতা ফেলে কে তাদের শুকনো বর্ণনা শোনে। 
ফলে মানুষ ক'জনের কিছুই করার থাকে না। ভূমিকাহীন অসহায় হয়ে তারা এদিক ওদিক তাকায়। ওদিকে মণ্ডপের ভেতর টিনের খাঁড়া হাতে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা দেবীকে সঙের মতো মনে হয়। 

ভরত কোলের বাড়ীর ভেতর ততোক্ষণে বিলাপ আর হৈ চৈয়ের মধ্যে সুরেনের মা ও তার পোয়াতি বউয়ের অজ্ঞান মাথায় জল ঢালা শুরু হয়ে গেছে। 
সদর দরোজার সামনে সুরেনের অনুসন্ধানকারী দলটির একাংশ ও পাড়া প্রতিবেশীরা ভরত কোলেকে ঘিরে ধরেছে। সেই ভিড়ের ভেতর ভরত কোলের ভাঙা গলার কান্না এবং ধস্তাধস্তিরত তার মাথা, হাত, খালি গা এবং যুতির কিছু অংশ চমকে ওঠে।

হঠাৎ দেখা যায় শিকল ছেঁড়া উন্মাদের মতো হা হা রবে ভরত কোলে দৌড়ে আসছে। তার পেছনে পেছনে আরো কিছু মানুষ। 
সুরেনের লাশকে ঘিরে ভিড়, ঠেলাধাক্কা এবং হৈ চৈ-রত কয়েকশ' মানুষ ঘরে দাঁড়িয়ে যায়। জায়গাটায় হঠাৎ করে নিঃশ্বাসরুদ্ধ স্তব্ধতা নেমে আসে। মধ্যরাত্রির উন্মুক্ত আকাশতলে সেই স্তব্ধতার মধ্যে শোকোন্মত্ত পিতার 'বা বা সু রে ন রে' এই ত্রিভুবন ভাসানো সর্বভেদ্য হাহাকার, ও তার বিপুল বেগে ধেয়ে আসা—খালি গায়ের ছোটখাটো গোলগাল মানুষটিকে অবর্ণনীয় বিশালত্ব এনে দেয়। 

ভরত কোলে মণ্ডপ অভিমুখে আসতে থাকে। কাছাকাছি এলে হ্যাজাকের আলোয়। তার ধ্বসে যাওয়া অশ্রুময় মুখমণ্ডল চকচক করে। 
বুলন্ত হ্যাজাক দুলিয়ে, বিশাল দিগম্বরী নৃমুণ্ড মালিনী কালী মূর্তির সামনে ভরত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেওয়ার মতো করে আছড়ে পড়ে: 'আমায় কেনো নিলি না মা. আমায় কেনো নিলি না।' কোষাকুষি ছিটকে পড়ে, মাটির ঘট ভেঙে জল গড়াতে থাকে, ফুল বেলপাতা পিষ্ট হয়, প্রৌঢ় ভরত দেবীর পদপ্রান্তে মাথা ঠোঁকে: 'আমি মহাপাপী আমিমহাপাপী-ই-ই... 

ভরত কোলে মাথা দোলায়: আমিই রক্তবীজ মা. আমিই অসুর...ও হো হো হো হো... আমায় কেনো... তার কণ্ঠস্বর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, 'বাবা সু রে ন-এ-এ-এ.... ও হো হো হো হো'...

মানুষ নিসর্গ, রাত্রিকাল—সমস্ত চরাচরকে ছিন্নভিন্ন করে এই লবণাক্ত চিৎকার মহাশূন্যতায় মিশে যেতে থাকে। ·


[গল্পটি ‘লাশকাটাঘর' গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। গল্পটি নেওয়া হয়েছে ‘কায়েস আহমেদ সমগ্র’ বই থেকে।]


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ