হুলিও কোর্তাসারের বক্তৃতা : একজন লেখকের পথ


অনুবাদ : সৌম্য কৌস্তভ

পর্ব-১
হুলিও কোর্তাসার (১৯১৪–১৯৮৪) ছিলেন আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, এবং লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বুম আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি জন্মেছিলেন ব্রাসেলসে, শৈশব কাটে আর্জেন্টিনায়, আর জীবনের বড় অংশ বাস করেছেন প্যারিসে। কোর্তাসার বিশেষভাবে পরিচিত তাঁর ছোটগল্পের জন্য, যেখানে বাস্তব ও অবাস্তব, দৈনন্দিন জীবন ও অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা অদ্ভুতভাবে মিলেমিশে যায়। তাঁর গল্পে সময়, পরিচয়, বাস্তবতার সীমা—সবই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ভাষা ও গঠনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিরীক্ষাধর্মী, খেলাধুলাপ্রবণ এবং গভীরভাবে আধুনিক।

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস Hopscotch (Rayuela) তাঁকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। উপন্যাসটি পাঠককে একাধিকভাবে পড়ার সুযোগ দেয়, ফলে পাঠ নিজেই হয়ে ওঠে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা। ছোটগল্প সংকলন Bestiary, Blow-Up and Other Stories, এবং পরীক্ষামূলক গ্রন্থ Cronopios and Famas তাঁর সৃজনশীল বৈচিত্র্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সাহিত্যিক কাজের পাশাপাশি কোর্তাসার ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয়। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার স্বৈরতন্ত্র, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে তিনি কখনোই সাহিত্যকে কেবল প্রচারের হাতিয়ার বানাতে চাননি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল একই সঙ্গে স্বাধীন খেলা, মানবিক অনুসন্ধান এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র। হুলিও কোর্তাসার এমন একজন লেখক, যিনি ছোটগল্পকে শিল্পের সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গিয়েছেন এবং আধুনিক সাহিত্যে পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন—পাঠ মানে শুধু পড়া নয়, অংশগ্রহণ।

১৯৮০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলিতে (UC Berkeley) কোর্তাসার যে সাহিত্য-ক্লাসগুলো নিয়েছিলেন, এ বইটি তারই লেকচার ও প্রশ্নোত্তরের সংকলন। এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক তাত্ত্বিক প্রবন্ধ নয়; বরং জীবন্ত ক্লাসরুমের কথোপকথন, যেখানে শিক্ষক হিসেবে কোর্তাসার গল্প, অভিজ্ঞতা, আত্মসমালোচনা আর রসিকতা মিলিয়ে সাহিত্য নিয়ে ভাবেন। গল্পপাঠে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হবে বইটির অনুবাদ। এ সংখ্যায় ছাপা হলো প্রথম পর্ব।
····························

মি একেবারে পরিষ্কার করে বলতে চাই—আমি যদিও বলছি আমরা ছোটগল্প দিয়ে শুরু করব, তারপর উপন্যাসে যাব, তার মানে এই নয় যে আমি কোনো রকম পক্ষপাত করছি বা কোনো মূল্যবিচার দিচ্ছি। আমি ছোটগল্প আর উপন্যাস দুটোই সমান মনোযোগ ও ভালোবাসা নিয়ে পড়ি এবং লিখি। এই দুই রূপ যে একেবারেই আলাদা, তা আপনি জানেন। কোন দিক থেকে আলাদা, সেটা আমরা পরে বোঝার চেষ্টা করব। তবু আমি প্রথমে ছোটগল্প নিয়ে কথা বলতে চাইছি একটি সহজ কারণে। বিষয় হিসেবে ছোটগল্প ধরা সহজ। উপন্যাসের তুলনায় তাকে বোঝা, তাকে ঘিরে দেখা অনেক সহজ। কেন সহজ, তার কারণ খুবই স্বাভাবিক। সে জন্য আলাদা করে কিছু বলার দরকার নেই।

আমি আপনাদের জানাতে চাই, আপনারা আসার ঠিক কিছু আগে আমি এই ক্লাসগুলো তৈরি করেছি। আমি খুব গোছানো মানুষ নই। আমি কোনো সমালোচক নই, কোনো তাত্ত্বিকও নই। আমার কাজের ধরন খুব সহজ—সমস্যা যখন সামনে আসে, তখনই আমি তার সমাধান খুঁজি। এখন যেহেতু আমি ছোটগল্প নিয়ে কথা বলব, তারপর আমার নিজের ছোটগল্প নিয়ে, এবং লাতিন আমেরিকার ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা করতে চাই, তাই আগে একটি ছোট ভূমিকা দরকার। একবার আমি একটি বক্তৃতায় একটি কথার নাম দিয়েছিলাম—“একজন লেখকের পথ”। আজ আমি সেটারই একটি সংক্ষিপ্ত সারাংশ দিতে চাই।

সহজ করে বললে—সাহিত্যের ভেতর দিয়ে আমি যে পথে চলেছি, সেই পথের কথা বলছি। বলতে আমার একটু অস্বস্তি হয়, তবু বলছি—এই পথ প্রায় ত্রিশ বছরের। একজন লেখক যখন এই পথে হাঁটে, তখন সে বুঝতে পারে না সে ঠিক কোন পথে চলছে। কারণ সে বর্তমানের ভেতরেই থাকে—আমাদের সবার মতো। কিন্তু অনেক বছর পরে, যখন সে তার লেখা বইগুলো আর সেগুলো নিয়ে লেখা সমালোচনার দিকে ফিরে তাকায়, তখন সে এক ধরনের দূরত্ব পায়। সেই দূরত্ব থেকে সে নিজেকে একটু স্পষ্টভাবে দেখতে পারে।

কয়েক বছর আগে আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—সাহিত্যের ভেতর দিয়ে আমার পথগুলো কী কী ছিল? আমার কাছে ‘জীবন’ আর ‘সাহিত্য’ সব সময়ই প্রায় একই জিনিস। কিন্তু এখানে আমরা শুধু সাহিত্য নিয়েই কথা বলছি। আমার মনে হয়েছে, এই লেখকের পথগুলো সংক্ষেপে বললে উপকার হবে। কারণ তখন আমরা কিছু স্থায়ী বৈশিষ্ট্য দেখতে পাব। কিছু প্রবণতা দেখতে পাব। আর সেগুলো আজকের গুরুত্বপূর্ণ লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের গায়েও স্পষ্ট ছাপ রেখে চলেছে।

এখন আমি তিনটি শব্দ ব্যবহার করব। শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি কেন এই শব্দগুলো ব্যবহার করছি, সেটা বোঝা গেলে দেখবেন, এগুলো খুবই সহজ। একজন লেখক হিসেবে আমার জীবনে আমি মোটামুটি তিনটি স্পষ্ট পর্যায়ের ভেতর দিয়ে গিয়েছি। প্রথমটাকে আমি বলব নান্দনিক পর্যায়। দ্বিতীয়টি অধিবিদ্যামূলক। আর তৃতীয়টি—যার মধ্যে আমি এখনো আছি—ঐতিহাসিক পর্যায়। আমি এই শব্দগুলো ব্যবহার করছি শুধু বোঝার সুবিধার জন্য। এগুলোকে খুব ভারী দার্শনিক অর্থে নেওয়ার দরকার নেই। কোনো দার্শনিক যেভাবে অধিবিদ্যা নিয়ে কথা বলেন, সেভাবে নয়।

আমি যে প্রজন্মের মানুষ, তারা প্রায় সবাই আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেসের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। খুব অল্প বয়স থেকেই—শিক্ষা, পরিবেশ আর ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে—এই প্রজন্ম সাহিত্যকে কেন্দ্র করেই বাঁচত। আমি আজও মনে করতে পারি আমার সহপাঠীদের সঙ্গে কথা। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর যারা বন্ধু হয়ে রয়ে গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে আড্ডা। আমরা সবাই তখন লেখা শুরু করেছি। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশিতও হতে শুরু করেছে।

আমরা—আমি আর আমার বন্ধুরা—ছিলাম প্রবলভাবে নান্দনিক মানুষ। আমরা সাহিত্যের সৌন্দর্য, তার কাব্যিক শক্তি, তার আধ্যাত্মিক আবেদন—এই সব কিছুর দিকেই তাকিয়ে থাকতাম। তখন আমরা এই শব্দগুলো ব্যবহার করতাম না। আসলে আমরা জানতামও না, এগুলোর নাম কী। কিন্তু এখন বুঝি, পাঠক আর লেখক হিসেবে আমার শুরুর বছরগুলো কেটেছিল একেবারে নান্দনিক পর্যায়ে।

সেই সময়ে ‘সাহিত্যিক হওয়া’ মানে ছিল আমাদের হাতের কাছে থাকা সেরা বইগুলো পড়া। আর লেখা—কখনো বিখ্যাত লেখকদের আদর্শ সামনে রেখে, কখনো একেবারে নিখুঁত শৈলীর স্বপ্ন নিয়ে। আমরা বুঝতেই পারিনি যে ইতিহাসের এক ভীষণ নাটকীয় সময় আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে। আমরা তার খুব কাছেই ছিলাম, অথচ ভেতরে ছিলাম না। কারণ ইতিহাসকে আমরা দেখতাম দূর থেকে, এক ধরনের মানসিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে।

বুয়েনোস আইরেসে বসে আমি স্পেনের গৃহযুদ্ধ দেখেছি—অবশ্যই অনেক দূর থেকে। সেখানে স্পেনের মানুষ ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে লড়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়। একইভাবে আমি ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও দূর থেকে দেখেছি। আমরা কীভাবে এই যুদ্ধগুলো অনুভব করতাম? স্পেনের ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্টভাবে প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ছিলাম। আমরা ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে ছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমরা মিত্রশক্তির পক্ষে, নাৎসিদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু এই অবস্থানগুলো আমাদের জীবনে কীভাবে প্রকাশ পেত? আমরা খবরের কাগজ পড়তাম। যুদ্ধক্ষেত্রের খবর জানতাম। ক্যাফেতে বসে তর্ক করতাম। বিরোধী মতের লোকদের সঙ্গে কথা বলতাম। কিন্তু আমাদের মাথায় একবারও আসেনি যে স্পেনের যুদ্ধ আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কোনোভাবে জড়িত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়েও আমরা তাই ভাবিনি। আর্জেন্টিনা তখন নিরপেক্ষ দেশ।

আমরা বুঝতে পারিনি যে একজন লেখকের—যিনি একই সঙ্গে একজন মানুষ—দায়িত্ব শুধু মতামত দেওয়া বা দূর থেকে সহানুভূতি দেখানোতেই শেষ হয় না। এখন এই কথা বলতে গেলে নিজের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করতে হয়। শুধু নিজের নয়, আমার পুরো সামাজিক শ্রেণির বিরুদ্ধেই। কিন্তু সত্যি কথা হলো, এই মনোভাবই সেই সময়ের আমাদের সাহিত্যিক জীবনকে গড়ে তুলেছিল।

আমরা এমন এক জগতে থাকতাম, যেখানে কোনো ইউরোপীয় বা আর্জেন্টাইন লেখকের একটি বড় উপন্যাস বা গল্পের বই প্রকাশ পাওয়া আমাদের কাছে বিশাল ঘটনা ছিল। আমাদের কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করতাম সর্বোচ্চ সাহিত্যিক মানে পৌঁছতে হলে নিজের সব জ্ঞান, সব শক্তি উজাড় করে দিতে হবে।

এটা ছিল একেবারে নান্দনিক সমস্যা। তার সমাধানও ছিল নান্দনিক। আমরা সাহিত্যকে ভালোবাসতাম শুধু সাহিত্যের জন্য। আমরা তাকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতাম না। মানুষের জীবনের সামগ্রিক পরিস্থিতির সঙ্গে তার সম্পর্ক—এটা আমাদের চিন্তায় আসেনি। লেখক হোক বা সাধারণ মানুষ—এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের ছিল না।

তবু সেই সময়েও—যখন ইতিহাসে আমার সরাসরি অংশগ্রহণ প্রায় ছিল না, ইতিহাস নিয়ে আমার অনুভূতিও খুব দুর্বল—খুব অল্প বয়স থেকেই ভেতরে ভেতরে আমি একটা কথা বুঝতে শুরু করেছিলাম। সাহিত্য শুধু বইয়ের ভেতরে থাকে না। শুধু লাইব্রেরির তাক বা ক্যাফের আড্ডায়ও তার সীমা শেষ হয় না। এমনকি সবচেয়ে কল্পনাপ্রবণ ফ্যান্টাসি বা ফ্যান্টাস্টিক সাহিত্যও বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

খুব ছোটবেলা থেকেই আমি অনুভব করতাম—আমি জিনিসপত্রের সঙ্গে যুক্ত, রাস্তাঘাটের সঙ্গে যুক্ত, শহরের প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে যুক্ত। এই সবকিছু মিলেই বুয়েনোস আইরেসকে আমার কাছে একজন লেখকের জন্য এক ধরনের চলমান, বদলাতে থাকা, জাদুকরী পরিসরে পরিণত করেছিল।

সে সময়ে হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো লেখকের বই আমার আর আমার বন্ধুদের কাছে ছিল এক ধরনের সাহিত্যিক স্বর্গ। মনে হতো—আমাদের ভাষা এই পর্যন্তই উঠতে পারে, এর চেয়ে ওপরে নয়। কিন্তু একই সঙ্গে আমি আরও কিছু লেখকের উপস্থিতি টের পাচ্ছিলাম। তাদের মধ্যে একজনের নামই শুধু বলছি—রোবের্তো আরল্ট। বোর্হেসের তুলনায় তিনি অনেক কম পরিচিত। কারণ তিনি খুব অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর লেখা অনুবাদ করাও কঠিন। আর তাঁর জগত প্রায় পুরোপুরি বুয়েনোস আইরেসের সীমার মধ্যেই আবদ্ধ।

আমার নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে যেমন বোর্হেসের সাহিত্যকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল, তেমনি আরল্ট আমাকে সাধারণ মানুষের ভাষার দিকে চোখ খুলতে শিখিয়েছিলেন। রাস্তার ভাষা। কথ্য শব্দ। লুনফার্দো। এই ভাষাতেই আরল্ট তাঁর গল্প আর উপন্যাস ভরিয়ে তুলেছিলেন।

এই কারণেই আমি যখন আমার লেখকজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা বলি, তখন চাই না কেউ সেগুলোকে আলাদা আলাদা খোপে বন্দি করে দেখুক। হ্যাঁ, সে সময় আমি নান্দনিক এক জগতে বাস করছিলাম। কিন্তু একই সঙ্গে আমার কল্পনায় অন্য উৎস থেকেও কিছু উপাদান ঢুকছিল। সেগুলোর পূর্ণ বিকাশ তখনও হয়নি। তার জন্য সময় দরকার ছিল। ইউরোপে বসবাস শুরু করার পর ধীরে ধীরে আমি সেগুলোকে নিজের ভেতরে স্পষ্টভাবে অনুভব করতে শুরু করি।

আমি সব সময়ই লিখেছি—আসলে কেন লিখি, সেটা পুরোপুরি না জেনেই। কাকতালীয় ঘটনা আমাকে সব সময় টেনেছে। লেখা আমার কাছে এসেছে জানালার পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখির মতো। ইউরোপে থাকাকালীন আমি খুব নান্দনিক, খুব কল্পনাপ্রবণ গল্প লিখতে থাকি। প্রায় সবই ছিল ফ্যান্টাস্টিক। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি—নিজের অজান্তেই আমি এমন সব বিষয়ের মুখোমুখি হচ্ছি, যা আমাকে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সেই সময়েই আমি একটি খুব দীর্ঘ গল্প লিখেছিলাম। সম্ভবত আমার লেখা সবচেয়ে দীর্ঘ গল্প। তার নাম The Pursuer। পরে আমরা সেটি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলব। এই গল্পটি ফ্যান্টাস্টিক নয়। কিন্তু এতে এমন কিছু ছিল, যা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এখানে প্রথমবার আমি একটি পূর্ণ মানবিক উপস্থিতি আনতে পেরেছিলাম। একজন মাংস-মজ্জার মানুষ। একজন জ্যাজ সংগীতশিল্পী। সে কষ্ট পায়। সে স্বপ্ন দেখে। সে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। শেষ পর্যন্ত সে এমন এক নিয়তির হাতে চূর্ণ হয়, যা তাকে সারা জীবন তাড়া করে বেড়ায়।

যাঁরা গল্পটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন—আমি আসলে চার্লি পার্কারের কথাই বলছি। গল্পে তাঁর নাম জনি কার্টার। এই গল্প লেখা শেষ করে যখন আমি নিজেই তার প্রথম পাঠক হলাম, তখন বুঝতে পারলাম—আমি যেন এক কক্ষপথ ছেড়ে আরেক কক্ষপথে ঢোকার চেষ্টা করছি। এবার চরিত্রই আমার আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠল। বুয়েনোস আইরেসে লেখা আগের গল্পগুলোতে চরিত্ররা ছিল ফ্যান্টাস্টিকের সেবায় নিয়োজিত। তারা ছিল প্রায় পুতুলের মতো। ফ্যান্টাস্টিককে প্রকাশ করাই ছিল তাদের কাজ।

আমি হয়তো কিছু চরিত্রের প্রতি স্নেহ অনুভব করতাম। কিন্তু সেটা ছিল গৌণ। আসলে আমাকে বেশি টানত গল্পের কাঠামো, তার নান্দনিক হিসাব, তার কৌশল। সবকিছু যেন সুন্দর, জাদুকরী, ইতিবাচক হয়—এই ছিল লক্ষ্য।

প্যারিসের সেই গভীর নিঃসঙ্গতার মধ্যে বসে হঠাৎ করেই জনি কার্টারের ভেতর দিয়ে আমি আমার সহমানুষকে আবিষ্কার করতে শুরু করি। একজন কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতশিল্পী। দুর্ভাগ্যের দ্বারা তাড়িত। যার বকুনি, একক সংলাপ, সংগ্রাম—সবকিছু আমি কল্পনা করে গল্পের মধ্যে বসিয়ে দিই।

এই প্রথম সহমানুষের সঙ্গে আমার সত্যিকারের সাক্ষাৎ ঘটে। আমি মনে করি, এই শব্দ ব্যবহার করার অধিকার আমার আছে। একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষের দিকে সেতু তৈরি হয়। একজন মানুষ থেকে বহু চরিত্রের দিকে। এর ফলেই আমি ছোটগল্প আর উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোর প্রতি ক্রমশ বেশি আকৃষ্ট হতে থাকি।

এই অঞ্চলটাই শেষ পর্যন্ত সাহিত্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এলাকা। এখানে বুদ্ধি আর অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করে। এখান থেকেই মানুষের আচরণ তৈরি হয়। তার সম্পর্ক। তার দ্বন্দ্ব। তার ভালোবাসা। তার মৃত্যু। তার নিয়তি। এক কথায়—তার গল্প।

আমি যখন চরিত্রদের মানসিক জগতে আরও গভীরে ঢুকতে চাইলাম, তখন একের পর এক প্রশ্ন উঠে এল। সেই প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত আমাকে দুটি উপন্যাস লিখতে বাধ্য করল। ছোটগল্পে সাধারণত এই ধরনের সমস্যা থাকে না। এসব প্রশ্নের জন্য উপন্যাসই দরকার। উপন্যাস সমস্যা তুলে ধরে। কখনো কখনো সমাধানের দিকেও ইঙ্গিত দেয়।

উপন্যাস হলো লেখকের নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ। কারণ উপন্যাসের ভেতরে থাকে একটি সম্পূর্ণ জগৎ। একটি সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। এখানে মানব নিয়তির বড় খেলাগুলো মঞ্চস্থ হয়। আমি যখন “মানব নিয়তি” বলছি, তার কারণ হলো—খুব দ্রুতই আমি বুঝে ফেলেছিলাম, আমি কেবল মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বা গল্প লেখার জন্য জন্মাইনি। এমন লেখা অনেক আছে। অনেক ভালো লেখাও আছে। কিন্তু শুধু চরিত্রের জীবনের টুকরো টুকরো দিক নাড়াচাড়া করা আমাকে আর তৃপ্ত করছিল না।

The Pursuer–এই গল্পেই জনি কার্টার এমন সব প্রশ্ন তোলে, যেগুলোকে আমরা চরম বলতে পারি। সে জীবন বোঝে না। মৃত্যু বোঝে না। সে বোঝে না কেন সে সংগীতশিল্পী। সে জানতে চায়—কেন সে এইভাবে বাজায়, কেন তার জীবনে ঘটনাগুলো এইভাবেই ঘটে।

এই জায়গা থেকেই আমি যে পর্যায়কে—হয়তো একটু ভারী শব্দে—অধিবিদ্যামূলক পর্যায় বলি, তার শুরু। এটি ছিল এক ধীর, কঠিন, মৌলিক অনুসন্ধান। আমি দার্শনিক নই। দর্শনের জন্য আমার কোনো বিশেষ প্রতিভাও নেই। তবু আমি মানুষকে জানতে চেয়েছি—শুধু জীবিত ও কাজ করা সত্তা হিসেবে নয়, বরং দার্শনিক অর্থে একজন মানুষ হিসেবে। একজন নিয়তি। এক রহস্যময় যাত্রার ভেতর একটি নির্দিষ্ট পথ।

এই অধিবিদ্যামূলক পর্যায় মূলত দুটি উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমটি The Winners। এটিকে চাইলে এক ধরনের খেলাধুলাপূর্ণ রচনা বলা যায়। দ্বিতীয়টি আরও দূরে যেতে চেয়েছিল। সেটির নাম Hopscotch।

The Winners–এ আমি একটি বড় এবং খুব বৈচিত্র্যময় চরিত্রগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করেছি। এখানে আমার বড় কারিগরি সমস্যা ছিল। কারণ ছোটগল্পকাররা—লেখক হোক বা পাঠক—অল্প চরিত্র নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত। আট পৃষ্ঠার গল্পে সাতজন মানুষ রাখা যায় না। আট পৃষ্ঠা শেষ হলেও কাউকেই ভালোভাবে জানা যায় না। তাই ছোটগল্পে সবকিছুই সীমিত থাকে।

উপন্যাস ঠিক তার উল্টো। উপন্যাস একটি খোলা খেলা। The Winners–এ আমি দেখতে চেয়েছিলাম—স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের একটি উপন্যাসে আমি কতজন চরিত্রকে মানসিক ও আবেগগতভাবে সামলাতে পারি। শেষে গুনে দেখলাম—সংখ্যা আঠারো। কম নয়!

এটিকে চাইলে শৈলীর অনুশীলন বলা যায়। নিজেকে যাচাই করার চেষ্টা। আমি নিজেকে পাশ নম্বর দিয়েছিলাম। খুব ভালো নয়। কিন্তু পাশ। উপন্যাসটি যথেষ্ট আকর্ষণীয় ও বোধগম্য বলে আমার মনে হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় কথা—এই উপন্যাসে, খুব ছোট পরিসরে হলেও, আমি আমার নতুন তৃষ্ণাকে মেটাতে পেরেছিলাম। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বাইরের স্তরে আটকে না থেকে, চরিত্রকে মানুষ হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে, নিয়তি হিসেবে গভীরে অনুসন্ধান করার তৃষ্ণা। The Winners–এ এক-দুটি চরিত্রের চিন্তায় শুধু তার আভাস পাওয়া যায়।

আমি Hopscotch লিখতে কয়েক বছর সময় নিয়েছিলাম। সেই সময়ে আমি যেসব প্রশ্ন নিয়ে ভাবছিলাম, যেসব অনুসন্ধান চালাচ্ছিলাম—তার সবকিছুই আমি সরাসরি এই উপন্যাসের ভেতরে ঢেলে দিয়েছি। উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র হোরাসিও অলিভেইরা আমাদের যে কারও মতোই একজন মানুষ। সে একেবারেই সাধারণ। সে না অসাধারণ, না মধ্যম মানের। এমন কোনো গুণ তার নেই, যা তাকে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো করে তোলে।

কিন্তু এই মানুষটি—The Pursuer–এর জনি কার্টারের মতোই—এক ধরনের স্থায়ী যন্ত্রণার ভেতর বাস করে। এই যন্ত্রণা তাকে বাধ্য করে দৈনন্দিন জীবনের বাইরে তাকাতে। নিজের রোজকার সমস্যা ছাড়িয়ে বড় প্রশ্ন করতে। হোরাসিও তার সময় সম্পর্কে সচেতন। সে জানে চারপাশে কী ঘটছে—রাজনৈতিক লড়াই, যুদ্ধ, অবিচার, নিপীড়ন। সে এসব দেখে। বোঝে।

এই সবকিছুর মাঝেই সে এমন কিছুর খোঁজ করে, যাকে সে কখনো কখনো “কেন্দ্রীয় চাবিকাঠি” বলে। এমন এক কেন্দ্র, যা শুধু ঐতিহাসিক নয়। একই সঙ্গে দার্শনিক ও অধিবিদ্যামূলক। এমন একটি কেন্দ্র, যা মানবজাতিকে ইতিহাসের পথে এতদিন চালিত করে এনেছে। আর যে ইতিহাসের বর্তমান ও শেষ পর্যায়ে আমরা নিজেরাই দাঁড়িয়ে আছি।

হোরাসিওর কোনো দার্শনিক শিক্ষা নেই। তার বাবারও ছিল না। সে কোনো তত্ত্ব জানে না। সে শুধু নিজের ভেতরের যন্ত্রণা থেকে উঠে আসা প্রশ্নগুলো নিজেকে করে। সে বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করে—কীভাবে মানুষ একটি প্রজাতি হিসেবে, একটি সভ্যতার সমষ্টি হিসেবে, এমন একটি পথে চলতে চলতে আজকের দিনে এসে পৌঁছাল, যে পথ কোনোভাবেই নিশ্চিত করে না শান্তি, ন্যায়বিচার বা সুখ?

এই পথ দুর্ঘটনায় ভরা। অবিচারে ভরা। বিপর্যয়ে ভরা। এখানে মানুষ মানুষের নেকড়ে হয়ে ওঠে। মানুষ মানুষকে আক্রমণ করে, ধ্বংস করে। ন্যায় আর অন্যায় এখানে প্রায় পোকার খেলায় তাস বণ্টনের মতো ভাগ হয়ে যায়।

হোরাসিও এমন একজন মানুষ, যাকে অস্তিত্বগত প্রশ্ন তাড়া করে বেড়ায়। এসব প্রশ্ন মানবতার গভীরে ঢুকে পড়ে। সে জানতে চায়—কেন মানুষ, যার হাতে বুদ্ধি আছে, ক্ষমতা আছে, ইতিবাচক গুণ আছে, তবু শেষ পর্যন্ত একটি ভালো সমাজ গড়ে তুলতে পারে না? অথবা কেন সে তা কেবল আংশিকভাবে পারে? কিছুটা এগোয়, তারপর আবার পিছিয়ে যায়?

ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে। সভ্যতা এগিয়েছে। তারপর হঠাৎ ভেঙে পড়েছে। ইতিহাসের বই উল্টালেই দেখা যায়—প্রাচীন যুগের কত বিস্ময়কর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে।

হোরাসিও তার সামনে তুলে দেওয়া তৈরি করা, আগে থেকেই সাজানো জগতকে মেনে নেয় না। সে সবকিছু প্রশ্ন করে। সমাজ ‘এক্স’ বা সমাজ ‘ওয়াই’ যা বলে, সে তা অন্ধভাবে মানে না। মতাদর্শ ‘এ’ বা মতাদর্শ ‘বি’ যে চেনা উত্তর দেয়, সে সেগুলো গ্রহণ করে না।

এই জায়গাতেই ঐতিহাসিক পর্যায়টি হাজির হয়। এই পর্যায়টি চেষ্টা করে অলিভেইরার অনুসন্ধানের ভেতরে থাকা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আর আত্মকেন্দ্রিকতার সীমা ভাঙতে। কারণ হোরাসিও নিজের নিয়তি নিয়ে ভাবে মানবজাতির নিয়তি হিসেবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আটকে থাকে নিজের সুখ-দুঃখেই।

পরবর্তী ধাপটি ছিল আরও বড়। সহমানুষকে শুধু পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে দেখা নয়। বরং একটি সমাজের অংশ হিসেবে দেখা। একটি জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে দেখা। একটি সভ্যতার অংশ হিসেবে দেখা। সমগ্র মানবজাতি হিসেবে দেখা।

আমাকে স্বীকার করতেই হবে—এই পর্যায়ে আমি পৌঁছেছিলাম এক অদ্ভুত, কৌতূহলোদ্দীপক, কিন্তু কিছুটা অনুমেয় পথে। তখন আমি আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলাম। আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ফ্রান্সে ছিলাম। সেই ঘটনাগুলো আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেটি ছিল এক ধরনের ট্র্যাজেডি—আলজেরীয়দের জন্য একরকম, ফরাসিদের জন্য আরেক রকম।

এরপর ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে, কিউবা দ্বীপের পাহাড়ে যা ঘটছিল, তা আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করতে শুরু করে। একদল মানুষ সেখানে একটি স্বৈরতন্ত্র উৎখাত করার জন্য লড়াই করছিল। তখনো এসবের জন্য আমার মাথায় কোনো নাম ছিল না। ওই মানুষগুলোকে বলা হতো los barbudos—দাড়িওয়ালা লোকজন। আর বাতিস্তা ছিল আরেক স্বৈরশাসকের নাম—যে ধরনের শাসকের অভাব এই মহাদেশে কোনোদিনই ছিল না, আজও নেই।

ধীরে ধীরে এসব ঘটনার অর্থ আমার কাছে বদলাতে শুরু করে। আমি যেসব সাক্ষ্য শুনছিলাম, যেসব লেখা পড়ছিলাম—সবকিছুই আমাকে সেই প্রক্রিয়ার দিকে আরও টেনে নিচ্ছিল। ১৯৫৯ সালের শেষে কিউবান বিপ্লব সফল হলে, সেখানে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা আমার ভেতরে জন্ম নেয়।

শুরুতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময় পরে, ১৯৬১ সালে, সদ্য প্রতিষ্ঠিত Casa de las Americas–এর জুরি সদস্য হিসেবে আমি কিউবায় যেতে পারি। আমি সেখানে গিয়েছিলাম আমার একমাত্র সম্ভব অবদান নিয়ে—একটি বৌদ্ধিক অবদান। আমি সেখানে দুই মাস ছিলাম। দেখেছি। বেঁচেছি। শুনেছি। পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনো সমর্থন করেছি, কখনো দ্বিমত পোষণ করেছি।

ফ্রান্সে ফিরে আসার সময় আমি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরি। প্রায় দুই মাস আমি আমার নিজের বন্ধুসমাজ বা সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখিনি। প্রতিদিন আমি এমন মানুষের সঙ্গে ছিলাম, যারা চরম কষ্টের মধ্যে লড়াই করছিল। তাদের সবকিছুর অভাব ছিল। তারা ছিল নির্মম অবরোধে বন্দী। তবু তারা নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। এই কাজ তারা নিজেরাই শুরু করেছিল—বিপ্লবের মাধ্যমে।

প্যারিসে ফিরে এসে, এই অভিজ্ঞতা আমার ভেতরে একটি ধীর কিন্তু দৃঢ় পথ তৈরি করতে শুরু করে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম—এটা নিছক একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ। শুধু আমার জাতীয়তার কারণে। শুধু আমার জীবনবৃত্তান্তের কারণে।

তারপর হঠাৎ করেই আমার ভেতরে এক ধরনের উদ্ভাসন ঘটে। এই শব্দ ব্যবহার করাটা বাড়াবাড়ি নয়। আমি বুঝতে পারি—আমি শুধু আর্জেন্টাইন নই। আমি লাতিন আমেরিকান। আমি যে মুক্তির সংগ্রাম আর সার্বভৌমত্বের লড়াই দেখেছি, সেটাই ছিল সেই উপলব্ধির চাবিকাঠি।

আমি বুঝলাম—আমি শুধু এসব দেখছি না। আমার একটি দায়িত্ব আছে। একটি কর্তব্য আছে। লাতিন আমেরিকা থেকে একজন লেখক হওয়ার মানে এই নয় যে আমি শুধু সেখানে জন্মেছি। তার মানে হলো—আমাকে লাতিন আমেরিকান লেখক হতে হবে। আমাকে লাতিন আমেরিকান হওয়ার অভিজ্ঞতাকে আমার লেখার কেন্দ্রে আনতে হবে। সেই দায়িত্বের সঙ্গে যা কিছু আসে, সবকিছু গ্রহণ করতে হবে।

এবং এটিকে আমাকে আমার সাহিত্যিক কাজের সঙ্গেও জুড়ে দিতে হবে। এই কারণেই আমি মনে করি, একজন লেখক হিসেবে আমার পথের এই শেষ পর্যায়কে “ঐতিহাসিক” বলা যায়। এটি ছিল ইতিহাসে আমার প্রবেশ।

আপনি যদি সেই সময়কার আমার কিছু বই পড়ে থাকেন, তাহলে আমি এখানে যা বলছি তার প্রতিফলন সেখানে স্পষ্ট দেখতে পাবেন। আপনি দেখবেন—কীভাবে সাহিত্য কেবল নিজের জন্য সাহিত্য থাকা থেকে সরে এসে মানব-নিয়তির অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছে। তারপর সাহিত্য হয়ে উঠেছে এমন এক পথ, যার মাধ্যমে আমরা প্রত্যেকে—নিজ নিজ দেশে—আমাদের জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিই।

আমি এসব বলছি—এবং জানি, এই আত্মজীবনীমূলক ভঙ্গি আমাকে সব সময়ই একটু অস্বস্তিতে ফেলে—কারণ আমি মনে করি, আমার এই পথ শুধু আমার একার নয়। এটি সমকালীন লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকেও ব্যাখ্যা করে।

গত তিন দশক ধরে ব্যক্তিগত সাহিত্য টিকে আছে। টিকেও থাকবে। এবং তা সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ কাজও সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ‘শিল্পের জন্য শিল্প’—এই ধারণা নতুন প্রজন্মের কাছে ধীরে ধীরে জায়গা হারিয়েছে। নতুন লেখকেরা অনেক বেশি জড়িয়ে পড়েছেন নিজেদের জনগণের লড়াই, সংঘর্ষ, বিতর্ক আর সংকটের সঙ্গে।

যে সাহিত্য একসময় অভিজাতদের কাজ বলে ধরা হতো, যাকে বিশেষাধিকার হিসেবে দেখা হতো—সেই সাহিত্য আজ সরে এসেছে। তার জায়গায় এসেছে এমন লেখালেখি, যা মান কমায়নি, জনপ্রিয় হওয়ার লোভেও পড়েনি। কারণ তার বিষয়বস্তু জন্ম নিচ্ছে সেই জনগণের জীবনপ্রক্রিয়া থেকে, যাদের অংশ লেখক নিজেই।

আমি এখানে আমাদের সময়ের সেরা সাহিত্যিক অভিব্যক্তির কথা বলছি—আস্তুরিয়াস, ভার্গাস ইয়োসা, গার্সিয়া মার্কেস। তাঁদের লেখা আর নিঃসঙ্গ আনন্দের জন্য লেখা নয়। তাঁদের কাজ গভীরভাবে অনুসন্ধান করে নিজেদের জনগণের বাস্তবতা, ভাগ্য আর নিয়তিকে।

এই কারণেই আমি মনে করি—আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আসলে একটি সাধারণ প্রক্রিয়ার অংশ। সবচেয়ে পরিশীলিত, সবচেয়ে বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে এমন এক সাহিত্যের দিকে এগোনো, যা তার মান বজায় রেখেও অনেক বড় পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছেছে। সেই প্রথম প্রজন্মের পাঠকদের ছাড়িয়ে গেছে—যারা একই শ্রেণির ছিল, একই কোড জানত, সেই সাহিত্যের গোপন দরজার চাবি হাতে রাখত। সেই সাহিত্য ছিল প্রশংসনীয়, কিন্তু প্রায়ই অতিরিক্ত দুর্লভ।

আমি এখন যা বলছি, তা কাজে লাগবে পরে—যখন আমরা ছোটগল্প আর উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করব। আমার লেখা হোক বা অন্যদের। তখন আমরা আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারব—আমি আসলে কী বোঝাতে চাইছি।
∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗

আজ আমরা যে অর্থে “ছোটগল্প” বলি, সেই অর্থে ছোটগল্পের জন্ম উনিশ শতকে। তবে ইতিহাসে তার আগেও দারুণ অনেক গল্প আছে। শুধু The Thousand and One Nights–এর কথাই ধরুন। এটি ছোটগল্পের এক বিশাল সংকলন। এর বেশির ভাগ গল্পই বেনামে লেখা। পরে একজন পারস্য লেখক সেগুলো জড়ো করে লিখে ফেলেন। তিনি সেগুলোকে কিছুটা নান্দনিক রূপও দেন। ওই সংকলনের কিছু গল্পে এমন জটিল কৌশল আছে, যা আজকের চোখেও খুব আধুনিক লাগে।

স্পেনের মধ্যযুগেও একটি বিখ্যাত বই আছে—Count Lucanor। এর লেখক ইনফান্তে হুয়ান মানুয়েল। এই বইয়ে কয়েকটি সত্যিই অসাধারণ গল্প আছে।

তারপর অষ্টাদশ শতকে এসে ছোটগল্প অনেক সময় খুব লম্বা হয়ে যায়। অনেক গল্প আর ছোটগল্পের সীমায় থাকে না। তারা উপন্যাসের দিকে ঢলে পড়ে। যেমন ভলতেয়ারের Zadig আর Candide। এগুলোকে আমরা কী বলব—ছোটগল্প, না ছোট উপন্যাস? এগুলোর ভেতরে অনেক ঘটনা ঘটে। কাহিনি ধাপে ধাপে এগোয়। চাইলে প্রায় অধ্যায়ে ভাগও করা যায়। শেষ পর্যন্ত এগুলো দীর্ঘ ছোটগল্পের চেয়ে “নভেলা” বলাই বেশি ঠিক।

উনিশ শতকে এসে ছোটগল্প হঠাৎ করে তার ‘নাগরিকত্বের কাগজপত্র’ পেয়ে যায়। অর্থাৎ, সে নিজেকে একটি স্বতন্ত্র ঘরানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ইংরেজিভাষী জগতে এবং ফরাসিভাষী জগতে প্রায় একই সময়ে এটা ঘটে।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজিতে এমন অনেক লেখক আছেন, যাঁদের প্রধান হাতিয়ারই ছোটগল্প। তাঁরা ছোটগল্পকে খুব কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মের সঙ্গে গ্রহণ করেন। ফ্রান্সে শুধু মেরিমে, ভিলিয়ে দ্য লিল-আদাম, আর সব চেয়ে বেশি মোপাসাঁর দিকে তাকালেই বোঝা যায়—গল্প কীভাবে আধুনিক ঘরানায় বদলে গেল।

এইভাবে ছোটগল্প আমাদের শতকে ঢুকে পড়ে একগুচ্ছ শর্ত আর দাবি নিয়ে। লেখকের জন্যও। পাঠকের জন্যও। আমরা এখন এমন সময়ে বাস করছি, যখন আমরা “একই পুরোনো গল্প” শুনতে চাই না—আর্জেন্টিনায় যেমন বলে। আমরা ভালো গল্পকে স্বাগত জানাই। আর ভালো গল্প মানে শুধু গল্প বললেই হলো না—এটা আলাদা ব্যাপার।

এই দ্রুত পর্যালোচনায় যদি আমরা সংজ্ঞা না খুঁজে, বরং ছোটগল্পের একটা আন্দাজি ধারণা খুঁজি, তাহলে আমরা একটি জিনিস দেখতে পাই। ছোটগল্পে এক ধরনের “সংকোচন” কাজ করে। ছোটগল্প অনেক সময় ধোঁয়াটে। ঝাপসা। এর ভেতর এমন কিছু বিকাশ থাকতে পারে, যা সব সময় শক্ত করে বাঁধা নয়। তবু উনিশ শতক থেকে আমাদের সময় পর্যন্ত ছোটগল্প কিছু বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এগুলোকে আমরা প্রায় নির্ধারক বলে ধরতে পারি—যতটা সাহিত্যে “নির্ধারক” কথাটা সত্য হতে পারে।

কারণ ছোটগল্পের একটা স্থিতিস্থাপকতা আছে। উপন্যাসের মতোই, কিছুটা নমনীয়। আজ যে লেখকেরা ছোটগল্প লিখছেন, তাঁদের হাতে এটি নতুন পথে যেতে পারে। নতুন দিক দেখাতে পারে। নতুন সম্ভাবনা খুলে দিতে পারে। তবু একটা ভিত্তিগত চরিত্র সে ধরে রেখেছে।

এখন সারা পৃথিবীতে অসংখ্য ছোটগল্পকার আছেন। আর যে ক্ষেত্র আমাদের বেশি আগ্রহের—লাতিন আমেরিকা—সেখানে তো ছোটগল্পকারের সংখ্যা এবং গুরুত্ব দুটোই খুব বড়।

তাহলে ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য কী? আমরা আগেই বলেছি—একে একেবারে ঠিকঠাক সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। তাই আমরা বরং মূল জায়গায় যাই। তার ভিত্তি দেখি। তার কেন্দ্র দেখি। তার অস্তিত্বের কারণ দেখি। তার বিষয়বস্তু আর গঠন দেখি।

বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে আধুনিক ছোটগল্পে অসীম বৈচিত্র্য। কিছু গল্প পুরো বাস্তবানুগ। কিছু মনস্তাত্ত্বিক। কিছু ঐতিহাসিক। কিছু লোকজ জীবনের রীতি-রেওয়াজ ঘেঁষা (কস্তুমব্রিস্তা)। কিছু সামাজিক। ছোটগল্প এসব সবকিছুর জন্যই উপযুক্ত।

আর যখন আমরা খাঁটি কল্পনার জগতে ঢুকি, ছোটগল্প তখন আরও স্বাধীন। তখন আসে ফ্যান্টাসি বা ফ্যান্টাস্টিক। অতিপ্রাকৃত গল্প। সেখানে কল্পনা প্রাকৃতিক নিয়ম বদলে দেয়। সেগুলোকে রূপান্তরিত করে। আর পৃথিবীকে অন্য আলোয় দেখায়।

শুধু ধ্রুপদি বাস্তবানুগ গল্পের কথাই ধরি। সেখানেও পরিসর বিশাল। একদিকে আছে ডি. এইচ. লরেন্স বা ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড। তাঁরা চরিত্রের ভেতরে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান করেন। অন্যদিকে উরুগুয়ের হুয়ান কার্লোস অনেত্তি। তিনি জীবনের একেবারে বাস্তব একটি মুহূর্ত দেখান—কিন্তু তার ভঙ্গি, তার স্বাদ, তার দুনিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। যদিও গভীর বিষয়ে কিছু মিল থাকতে পারে, তবু গল্প একেবারে অন্যরকম হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সম্ভাবনার পাখা অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।

তাই বিষয়বস্তু দিয়ে আমরা ছোটগল্পকে “লেজ ধরে” ধরতে পারব না। কারণ ছোটগল্পে সব বিষয়ই ঢুকতে পারে। ছোটগল্পের জন্য আলাদা করে ভালো বা খারাপ বিষয় বলে কিছু নেই। আসলে কোনো সাহিত্যেই ভালো বা খারাপ বিষয় নেই। সব নির্ভর করে কে লিখছে, আর কীভাবে লিখছে তার ওপর। কেউ একবার বলেছিল—আপনি চাইলে একটা পাথর নিয়েও দারুণ কিছু লিখতে পারেন। শর্ত একটাই—আপনার নাম যদি কা্ফকা হয়।

তাই বিষয়বস্তুর দিক থেকে মানদণ্ড দাঁড় করানো কঠিন। তবে আমি মনে করি—পরে যে আলোচনায় আমরা যাব, তার দিকে একটু আগেই এগিয়ে—আমরা ছোটগল্পকে ধরতে পারি “রূপ” দিয়ে। যদিও আমি “রূপ” না বলে “গঠন” বলতে পছন্দ করি।

আমি এখানে “গঠন” শব্দটি কাঠামোবাদের অর্থে বলছি না। আজকাল অনেকেই যে সমালোচনাপদ্ধতি চালাচ্ছেন, সেটাও নয়। আমি কাঠামোবাদের ব্যাপারে আসলে কিছুই জানি না। আমি “গঠন” বলছি খুব সোজা অর্থে। যেমন আমরা বলি—এই টেবিলের গঠন। এই কাপের গঠন। আমার কাছে “গঠন” শব্দটা “রূপ” শব্দটার চেয়ে একটু বেশি সমৃদ্ধ। কারণ গঠন মানে উদ্দেশ্য আছে। রূপ প্রকৃতি থেকে নিজে নিজে হতে পারে। কিন্তু গঠন মানে বুদ্ধি আর ইচ্ছা কাজ করেছে। কিছু সাজানো হয়েছে। কিছু সংগঠিত হয়েছে। যাতে সেটি দাঁড়ায়। কথা বলে। অর্থ তৈরি করে।

গঠন নিয়ে ভাবলে আমরা গল্পের কাছাকাছি যেতে পারি। এখানে আমি একটি সহজ তুলনা দিই—খুব অসাধারণ নয়, কিন্তু কাজের। একদিকে উপন্যাস। আরেকদিকে ছোটগল্প। দুটোকে পাশাপাশি রেখে দেখি।

উপন্যাস হলো এক ধরনের খোলা খেলা। সে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিষয়ের প্রয়োজন আর লেখকের ইচ্ছা অনুযায়ী সে কোথাও গিয়ে থামে। কিন্তু তার সীমানা নির্দিষ্ট নয়। উপন্যাস খুব ছোট হতে পারে। আবার প্রায় অসীমও হতে পারে। অনেক উপন্যাস শেষ হয়, কিন্তু পাঠকের মনে হয়—লেখক চাইলে আরও চালিয়ে যেতে পারতেন। আবার অনেক উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডও লেখা হয়।

উপন্যাসকে উমবের্তো একো “উন্মুক্ত রচনা” বলেছেন। কথাটা যথেষ্ট মানানসই। উপন্যাস সবকিছুকে ঢুকতে দেয়। সবকিছু গ্রহণ করে। সবকিছুকে ডেকে আনে। ফলে সে খোলা থেকেই যায়। বিষয়বস্তু আর লেখার জন্য এটি এক বিশাল উন্মুক্ত পরিসর।

ছোটগল্প ঠিক তার উল্টো। ছোটগল্প একটি বন্ধ ব্যবস্থা। আমরা যদি চাই—একটি গল্প পড়ে উঠে যেন মনে থাকে, যেন ভুলতে না পারি, যেন মনে হয় ‘এটা পড়া সার্থক’—তাহলে গল্পটি অবশ্যই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। তাকে বন্ধ হতে হবে। যেন তার বন্ধ হওয়া এক ধরনের নিয়তি।

একবার আমি ছোটগল্পকে গোলকের সঙ্গে তুলনা করেছিলাম। গোলক হলো সবচেয়ে নিখুঁত জ্যামিতিক রূপ। কারণ সে পুরোপুরি বন্ধ। আর তার পৃষ্ঠের অসংখ্য বিন্দু তার অদৃশ্য কেন্দ্র থেকে সমদূরত্বে থাকে। পরিপূর্ণ ছোটগল্প ভাবলে আমার মাথায় এই গোলকের ছবিটাই আসে।

উপন্যাস আমাকে গোলকের কথা মনে করায় না। সে বরং একটা বহু-পৃষ্ঠের বিশাল কাঠামোর মতো। গল্প নিজের স্বভাবেই ‘বন্ধ’ হতে চায়। গোলাকার হতে চায়।

এখানে আমরা আরেকটি তুলনা করতে পারি। চলচ্চিত্র আর আলোকচিত্র। চলচ্চিত্র হলো উপন্যাসের মতো। আলোকচিত্র হলো ছোটগল্পের মতো। একটি সিনেমা উপন্যাসের মতোই খোলা। ঘটনাপ্রবাহ বাড়ানো যায়। কমানো যায়। পরিচালক আরও ঘটনা যোগ করলেও সিনেমা ভেঙে পড়ে না।

কিন্তু আলোকচিত্র? আলোকচিত্র একেবারেই ছোটগল্পের মতো। আমি যখন পেশাদার আলোকচিত্রীদের সঙ্গে কথা বলি, তখন বুঝি এই তুলনা কতটা সত্যি। স্টিগলিট্‌জ বা কার্তিয়ের-ব্রেসোঁর কিছু স্মরণীয় ছবিতে ফ্রেমিং যেন ‘নিয়তির’ মতো। আলোকচিত্রী ফ্রেমের ভেতর এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ছবি ধরেছেন, যা যথেষ্ট। সম্পূর্ণ। স্বয়ংসম্পূর্ণ। যেন আর কিছু দরকার নেই।

কিন্তু এখানেই বিস্ময়। ছবিটি একই সঙ্গে নিজের বাইরে একটি আভাও ছড়ায়। দর্শকের মনে ফ্রেমের বাইরের কিছুর জন্য টান তৈরি করে। ডানে কী আছে? বামে কী আছে?

আমার কাছে সবচেয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি সেগুলো, যেখানে ঘরের ভেতর দুজন মানুষ আছে। আর ছবির বাঁদিকে, যেখানে ফ্রেম শেষ, সেখানে হয়তো কারও পা বা পায়ের ছায়া পড়ে আছে। সেই ছায়া কার? সে তো ছবিতে নেই। কিন্তু ওই ছায়া আমাদের কল্পনাকে উসকে দেয়। মনে প্রশ্ন তোলে—এর পরে কী ঘটল?

এভাবে ছবির ভেতরে একটি আবহ তৈরি হয়। সেই আবহ ফ্রেমের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। আমার মনে হয়, এই কারণেই কিছু ছবি—কারিগরি দিক থেকে অত ভালো না হলেও—অসাধারণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আবার কিছু ছবি চোখ ধাঁধানো হলেও সেই রহস্যের আভা নেই। তারা ততটা গভীরে ঢোকে না। ছোটগল্পের মতোই, আলোকচিত্রের এই বন্ধ বিন্যাস আমাদের কল্পনার কাছে সংকেত পাঠায়। কল্পনা সেই সংকেত ধরেই ছবিটাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

ছোটগল্পের একটি ভেতরের “স্থাপত্যগত” দায় আছে। সে খোলা থাকতে পারে না। তাকে গোলকের মতো নিজের ভেতরে বন্ধ হতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে নিজের বাইরে পর্যন্ত একটা কম্পন ছড়াতে হয়। ফ্রেমের বাইরের দিকে। গল্পের বাইরের দিকে। এই কারণেই আমি একে “আলোকচিত্রধর্মী” বলি।

এই শক্তি আসে কিছু গুণ থেকে। একটি গল্পকে স্মরণীয়, দীর্ঘস্থায়ী করতে এগুলো জরুরি। কিন্তু এগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা খুব কঠিন। আমি আগে বলেছি—আর শিগগিরই আপনারা একটি লেখায়ও তা পাবেন—এই দুটি শব্দ : ‘তীব্রতা’ আর ‘টান’।

ভালো ছোটগল্পকারের লেখায় এই তীব্রতা আর টান থাকে। আর এই কারণেই কিছু গল্প একেবারে ভুলে যাওয়া যায় না। যেমন এডগার অ্যালান পো–এর সেরা গল্পগুলো। উদাহরণ হিসেবে “The Cask of Amontillado” ধরুন। গল্পটা খুব ছোট। চার পৃষ্ঠারও কম। কোনো ভূমিকা নেই। কোনো বিচ্যুতি নেই। প্রথম বাক্য থেকেই আমরা প্রতিশোধের নাটকে ঢুকে পড়ি। প্রতিশোধটা অবশ্যম্ভাবী। নিয়তির মতোই ঘটবে।

এখানে টান আছে, কারণ পো-এর ভাষা ধনুকের মতো টানটান। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য পরীক্ষা করা। কোথাও বাড়তি কিছু নেই। কেবল প্রয়োজনীয়টুকু আছে। আবার তীব্রতাও আছে। কারণ গল্পটি আমাদের মনোজগতে গভীরভাবে আঘাত করে। শুধু বুদ্ধিতে নয়। অবচেতনেও। অচেতনে। লিবিডোতেও। আজকের ভাষায় যাকে ‘সাবলিমিনাল’ বলা হয়—মানুষের ব্যক্তিত্বের সেই গভীর কেন্দ্রে।

যদি আমরা ‘গোলক’, ‘বন্ধ বিন্যাস’, ‘টান’, ‘তীব্রতা’—এই ধারণাগুলো মাথায় রাখি, তাহলে লাতিন আমেরিকান ছোটগল্পে আরও নিশ্চিন্তভাবে ঢোকা যাবে। সত্যি বলতে, আমরা এখনো ছোটগল্পকে সংজ্ঞায়িত করতে পারিনি। আমি নিজে তা করতে পারব না। কারও কাছে সংজ্ঞা থাকলে আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

চাইলে আমরা কিছু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে সংজ্ঞা দিতে পারি। যেমন—স্বল্প দৈর্ঘ্যের সাহিত্যিক রচনা ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ভেতরের স্থাপত্য। তার গতি। তার ডায়নামিক।

কারণ একটি ছোটগল্পে শুধু গল্পই থাকে না। তার সঙ্গে থাকে একটা সম্ভাবনা। একটা প্রক্ষেপণ। যেমন আলোকচিত্রে থাকে ফ্রেমের বাইরের ইঙ্গিত। এই সম্ভাবনাই কনরাডের বা অনেত্তির বা আপনার প্রিয় যেকোনো লেখকের মহান গল্পকে শুধু মনে গেঁথে রাখে না—বরং নানা ইঙ্গিত জাগায়। নানা অর্থ খুলে দেয়। মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক নতুন দরজা খুলে দেয়।

এই সব কথা বলার পর আমাদের আসলে সরাসরি লাতিন আমেরিকার ছোটগল্পে ঢুকে পড়া উচিত। কারণ কোনো এক সময়ে আমাদের আমার নিজের গল্প আর আমার সহকর্মীদের গল্প নিয়েও কথা বলতে হবে। তবে আমি মনে করি না, এই শুরুতে এত কথা বলে সময় নষ্ট হয়েছে। আপনাদেরও মনে হয় না—আর আমার তো একেবারেই মনে হয় না—এতে অনুশোচনা করার কিছু আছে। এই ভূমিকার উদ্দেশ্য ছিল একটাই। শুরুটা সহজ করা। আর যে বিষয়গুলো আমরা পরে আলোচনা করব, তার কাছাকাছি এসে দাঁড়ানো—অল্প হোক, বা অনেকটাই।

এখন আমাদের সামনে দুটো পথ।
একটা হলো—আমি এখনই লাতিন আমেরিকার ছোটগল্প নিয়ে কথা শুরু করি।
আরেকটা হলো—আমাদের হাতে যে সময় আছে, সেটা কাজে লাগাই। যেমনটা আমরা ঠিক করেছিলাম। আপনারা আমাকে প্রশ্ন করবেন। আমি চেষ্টা করব উত্তর দিতে। আমি দেখছি, এখন প্রায় সাড়ে তিনটা। আমার মনে হয়, প্রশ্নের জন্য যদি আধঘণ্টা সময় রাখা যায়, সেটা মন্দ হবে না।†

∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗ ∗

আমি একবার বলেছিলাম—এই তিনটি পর্যায় আলাদা আলাদা করে কেটে নেওয়া যায় না। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন খোপ নয়। এগুলো একে অন্যের ভেতরে মিশে গেছে। এমন নয় যে আমি এক ধরনের মানুষ ছিলাম, তারপর আরেক ধরনের হলাম, তারপর তৃতীয় ধরনের। আমি একই মানুষই আছি। শুধু আমি তিনটি পর্যায়ের ভেতর দিয়ে গিয়েছি। আর সেই পর্যায়গুলো বারবার একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

আমি এখন যা লিখছি, আমার সাম্প্রতিক কয়েকটি গল্পের বইয়ে, সত্যিই এমন গল্প আছে—যেগুলোর উদ্দেশ্য হলো আমাদের জনগণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া। আপনারা যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন, সেই কারণে চাইলে আমি ‘বিপ্লবী’ বলতে পারি, যদিও শব্দটা ঠিক ঠিক মেলে না। ওই গল্পগুলোর বিষয়বস্তু সেই ধরনের পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

কিন্তু সেই একই বইগুলোতে আবার অন্য ধরনের গল্পও আছে। সেগুলো পুরোপুরি সাহিত্যিক। শতভাগ কল্পনাপ্রসূত। আমাদের সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

এই প্রশ্নটির জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কারণ এর মাধ্যমে আমি একটা কথা এখনই বলে ফেলতে পারি—যেটা পরে না বলে আগে বলা ভালো। আমি নিজের জন্য, লেখা ও সাহিত্যের জন্য, সব লেখক ও পাঠকের জন্য একটি জিনিসকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। সেটি হলো লেখকের সার্বভৌম স্বাধীনতা। লেখক তার বিবেক যা বলে, তার ব্যক্তিগত মর্যাদা যা বলে, সেটাই লিখবেন—এই স্বাধীনতা।

যদি কোনো লেখক আদর্শগত বা রাজনৈতিকভাবে কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত হন, আর সে বিষয়ে লেখেন, তাহলে তিনি তার লেখক-দায়িত্বই পালন করছেন। আবার যদি একই সঙ্গে তিনি ‘সাহিত্যের জন্য সাহিত্য’ লিখতে চান—যেমন আমার প্রথম পর্যায়—তাহলেও সেটি তাঁর পূর্ণ অধিকার। এ নিয়ে কেউ তাঁকে বিচার করতে পারে না।

আপনারা জানেন, এখানেই এসে পড়ে সেই বিতর্কিত বিষয়—‘প্রতিশ্রুত সাহিত্য’, ‘সামাজিকভাবে যুক্ত সাহিত্য’। এ নিয়ে এত লেখা হয়েছে যে কালি শেষ হয়ে গেছে, কাগজ শেষ হয়ে গেছে—তবু কেউ একমত হয়নি।

আমার মনে পড়ে, একবার একজন একটু নৈরাশ্যবাদী রসিক বলেছিল: “প্রতিশ্রুত লেখকদের বিয়ে করাই ভালো।” বাক্যটা আমি লিখিনি। আমার কাছে একটু প্রতিক্রিয়াশীলও লাগে। কিন্তু মজার, সেটাও সত্যি।

তবু আপনার প্রশ্ন আমাকে আরেকবার বলতে দেয়—যে লেখক নিজেকে ‘প্রতিশ্রুত’ ভাবেন, মানে যিনি শুধু নিজের রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়েই লেখেন—তিনি হয় খারাপ লেখক, নয়তো এমন ভালো লেখক, যিনি ভালো লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেন? কারণ তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। বাস্তবতার বিশাল জগত থেকে নিজেকে কেটে ফেলছেন। অথচ সেই বাস্তবতার ভূখণ্ডই হলো লেখা ও সাহিত্যের আসল ভূখণ্ড। তিনি এমন একটা কাজেই আটকে থাকছেন, যা প্রবন্ধকার, সমালোচক বা সাংবাদিকেরা অনেক সময় আরও ভালোভাবে করতে পারেন।

এ সব বলার পরও আমি খুব আশাবাদী একটা জিনিস দেখি। লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যিকেরা—যাঁদের সামনে পৃথিবী সব সময় বিষয়ের দিক থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার দরজা খুলে দেয়—তাঁদের অনেকেই ক্রমশ এমন পথে যাচ্ছেন, যেখানে সাহিত্যিক গুণ অক্ষুণ্ন রেখে তাঁরা জনগণের সংগ্রাম আর জনগণের নিয়তির সঙ্গে যুক্ত বিষয় লিখছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো সেই কাজে সাহায্য করা, যেটার কথা আমরা সেদিন হালকাভাবে বলেছিলাম ‘ভেতর থেকে বিপ্লব’। বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকা বিপ্লব নয়। ভেতর থেকে মানুষের ভেতর বদল আনা—সেই বিপ্লব।

আমি মনে করি, লেখক হিসেবে আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকে, তাহলে সেটাই। ভেতর থেকে বিপ্লবের কাজে যতটা পারি অবদান রাখা। পাঠকদের এমন সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা তাদের জ্ঞান বাড়াতে পারে। শুধু বুদ্ধির জ্ঞান নয়। মানসিক জ্ঞানও। যাতে তারা তাদের চারপাশে যা আছে, তার মুখোমুখি হতে পারে। কারণ খারাপ তথ্য বা নানা অভাবের কারণে মানুষ প্রায়ই চারপাশ দেখতেই পায় না।

যদি কোনো লেখক রাজনৈতিক বা আদর্শগত অঙ্গীকার থেকে কিছু করতে পারেন, তাহলে তিনি পাঠকদের এমন সাহিত্য দেবেন যা সাহিত্যের দিক থেকে মূল্যবান। আর একই সঙ্গে—যখন সময় আসে, বা লেখক যখন চান—সেই সাহিত্য এমন একটি বার্তাও বহন করবে, যা শুধু সাহিত্যিক নয়।

যাই হোক, আমি মনে করি, এটি একটি প্রশ্নের প্রথম উত্তর মাত্র। এই ক্লাসগুলো জুড়ে আমরা বিষয়টা আরও অনেক আলোচনা করব। আমার মনে হয়, পেছনে বসে থাকা আমাদের সেই সহকর্মীটি কিছু বলতে চান…

ছাত্র : যদি ছোটগল্প একটি গোলক হয়, তাহলে ‘Blow-Up’–এর মতো একটি গল্পের গোলকত্ব আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

―ধৈর্য যদি সত্যিই একটি গুণ হয়, তাহলে আমি আপনাদের ধৈর্য ধরতে বলব। কারণ আমার মনে হয়, আগামী বৃহস্পতিবার আমরা ঠিক এই বিষয়টাই ধরব। তখন আমরা “Blow-Up” বা “After Lunch”–এর মতো গল্প নিয়ে দেখব। এবং তার তথাকথিত “গোলকত্ব” খুঁজে দেখব। তবে মনে রাখতে হবে—এটা কেবল একটা রূপক। তাই আপাতত আমরা বিষয়টা স্থগিত রাখি।

ছাত্র :  প্রথম প্রশ্নে যে মহিলা ‘Meeting’ গল্পটির কথা বলেছিলেন, সেটি নিয়ে জানতে চাই। চে কি গল্পটি পড়েছিলেন? পড়ে থাকলে তিনি কী বলেছিলেন?

―আমি এ বিষয়ে কয়েকটি আলাদা গল্প শুনেছি। তার মধ্যে একটি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, আর আমি সেটি বেশ পছন্দ করি। চে আলজেরিয়ায় একটি বৈঠক শেষে ফিরছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল আমার এক কিউবান লেখক বন্ধু। সেই বন্ধুর পকেটে গল্পটি ছিল। এক সময় আমার বন্ধু বলল, ‘আপনার দেশের একজন এই গল্প লিখেছেন। আর এই গল্পের প্রধান চরিত্র আপনি।’ চে বললেন, ‘দাও।’ তিনি পড়লেন। তারপর ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খুব ভালো। কিন্তু এতে আমার আগ্রহ নেই।’

আমি মনে করি, আমি তার প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারি। তিনি যে বললেন ‘খুব ভালো’—এটাই ছিল তাঁর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রশংসা। কারণ তিনি ছিলেন খুব সংস্কৃতিবান মানুষ। একজন কবি। তিনি ভালো গল্প আর মাঝারি গল্পের ফারাক বুঝতেন। আবার তাঁর আগ্রহ না থাকাটাও তাঁর অধিকার।

প্রথম কারণটা খুব সহজ। ওই গল্পে তিনি নিজেকে সেভাবে দেখতে পারবেন না। আমি লেখক হিসেবে চে–কে কল্পনা করে তৈরি করেছি। আমি চেষ্টা করেছি তাঁকে যতটা সম্ভব সত্যভাবে ধরতে। কিন্তু কল্পনা আর নির্ভুল চিত্রণ—দুটোর ফারাক সব সময়ই বিশাল।

আর প্রথম পুরুষে নিজেকে কথা বলতে পড়া নিশ্চয়ই তাঁর কাছে অদ্ভুত লেগেছিল। পড়তে পড়তে তিনি নিশ্চয়ই টের পেয়েছিলেন, নিজেরই একটা ছবি যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। দূরে সরে যাচ্ছে। ঠিক যেমন ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে কখনো ফোকাস আসে, কখনো যায়—সেই রকম।

স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের লেখা চে–কে কিছুটা দূরে ঠেলে দিত। কারণ একটা কথা ভুললে চলবে না—আর এটাই এক অর্থে চে–কে দেওয়া আমার উত্তরও—এই গল্পটা আমি লিখেছিলাম তখন, যখন আমি কিউবা থেকে ইউরোপে উড়ছিলাম। তখন আমি পড়ছিলাম La sierra y el llano। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ গেরিলা যোদ্ধাদের প্রবন্ধ আর স্মৃতিচারণের সংকলন।

ওই বইয়ে সবার লেখা ছিল। কামিলো সিয়েনফুয়েগোসের লেখা ছিল। ফিদেল কাস্ত্রোর লেখা ছিল। রাউল কাস্ত্রোর লেখা ছিল। আর চে–এরও প্রায় কুড়ি পৃষ্ঠার একটি লেখা ছিল।

আমি আমার গল্পের ভিত্তি হিসেবে ঠিক ওই লেখাটিই নিয়েছিলাম। অবতরণ আর প্রথম সংঘর্ষের ঘটনাগুলো আমি সেখান থেকেই নিয়েছি। এগুলো চে নিজেই লিখেছিলেন। এমনকি তিনি একটি ঘটনা খুব হাস্যরস করে লিখেছিলেন। আমিও সেটাই পুনরাবৃত্তি করেছি। যুদ্ধের মাঝখানে তিনি দেখেছিলেন—একজন খুব মোটা যোদ্ধা একটি আখের আড়ালে লুকোতে চেষ্টা করছে। শত্রুর গুলি থেকে বাঁচতে সে ওই আখের আড়ালে পাগলের মতো এদিক-ওদিক করছে। অথচ আখ দিয়ে তো কোনোভাবেই নিজেকে ঢেকে রাখা যায় না!

চে অবশ্যই এসব চিনতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সেটি আর তাঁর লেখা রইল না। কারণ আমি সেটি লিখেছিলাম আমার ভাষায়। আর সেটি আর তাঁর সেই ভয়াবহ বাস্তব অভিজ্ঞতাও রইল না—অবতরণের অভিজ্ঞতা, প্রথম সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা।

আর সবচেয়ে বড় কথা—গল্পের শেষটা পুরোপুরি আমার বানানো। আমি চে–কে পাহাড়ে উঠিয়েছি। শেষ মুহূর্তে আমি তাকে ফিদেলের সঙ্গে মিলিয়েছি। তারপর আমি দু’জনের মধ্যে একটি সংলাপ বসিয়েছি। সেখানে তারা দু’জনেই বেঁচে আছে দেখে ভিতরের আনন্দ লুকিয়ে রাখতে ঠাট্টা-তামাশা করে কথা বলে।

তারপর গল্পটি শেষ করেছি চে–এর কিছু ভাবনায়। সেই ভাবনাগুলো একটু কাব্যিক। একটু রহস্যময়। সে একটি মোৎসার্ট কোয়ার্টেটের কথা ভাবছে। আর আকাশের তারা দেখছে। স্পষ্টতই এগুলো তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার অংশ ছিল না। তাই তিনি বলেছিলেন—‘খুব ভালো।’ কিন্তু একই সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমার এতে আগ্রহ নেই।’ আমার মনে হয়, এটা একেবারে যথার্থ প্রতিক্রিয়া।

(পরের প্রশ্ন : ভবিষ্যৎ পর্যায় কী?)
ছাত্র : আপনি বলেছেন আপনার নান্দনিক, অধিবিদ্যামূলক, আর ঐতিহাসিক পর্যায় লাতিন আমেরিকার গল্পকারদের সাধারণ গতিপথের সঙ্গেও মেলে। তাহলে পরের পর্যায় কী হতে পারে? ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ কী?

―ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলেই আমি বলি—আমি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নই। আমি এমনকি ‘ফিউচারোলজিস্ট’ও নই। এখন নাকি Futurology নামে একটি বিজ্ঞান আছে। সেখানে নাকি মানুষ নানা হিসাব-নিকাশ, অনুমান, প্রক্ষেপণ দিয়ে ভবিষ্যৎ বলে দেয়। ধরুন, ২০২০ সালে আলবেনিয়ায় অমুক হবে, তমুক হবে। আশা করি ২০২০ সালে আলবেনিয়ায় সত্যিই কিছু একটা ঘটেছিল...। আমি ফিউচারোলজিস্ট নই। তাই এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার কাছে কঠিন।


(আরেক প্রশ্ন: ঐতিহাসিক পর্যায় থেকে সরে গিয়ে কি কেউ ভিন্ন পথে যাচ্ছে?)
ছাত্র : আপনার কি মনে হয়, কিছু লেখক ঐতিহাসিক পর্যায় থেকে সরে গিয়ে অন্য কিছু করছেন?

―আমার এমন মনে হয় না। নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে আমার ধারণা বরং খুব ইতিবাচক। লাতিন আমেরিকায় এখন কুড়ি-তিরিশ বছরের অনেক তরুণ গল্পকার, কবি, ঔপন্যাসিক লিখতে শুরু করেছে। আমি তাদের যা পড়েছি, তাতে মনে হয়েছে—তারা একটি জিনিস খুব পরিষ্কার বুঝে ফেলেছে।

তা হলো : শুধু ‘বার্তা’ থাকলেই উপন্যাস বা গল্প হয়ে যায় না। বার্তা যদি রাজনৈতিক বা আদর্শগত হয়, তাহলে সেটা পামফ্লেট, প্রবন্ধ বা সংবাদ রিপোর্টে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে বলা যায়। সাহিত্যের কাজ সেটা নয়। সাহিত্য সেই বার্তা অন্যভাবে বহন করে। কখনও কখনও আরও শক্তিশালীভাবে বহন করে। কিন্তু সে জন্য লেখা বড় হতে হবে। উচ্চতায় উঠতে হবে। সাহিত্য হিসেবে উৎকৃষ্ট হতে হবে।

একটা সময় ছিল—বিশেষ করে কিউবান বিপ্লবের পর—যখন একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। যেন পুরো মহাদেশে আদর্শগত ধুলা ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই উত্তেজনায় অনেকেই ভাবল—আমি যদি শিক্ষিত হই, একটু পড়ি, তাহলেই গল্প বা উপন্যাসে খুব শক্তিশালীভাবে বার্তা দিতে পারব। পরে দেখা গেল, সেটা সত্যি নয়।

খারাপ লেখা বা মাঝারি লেখা দিয়ে কিছু কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় না। আজকের তরুণরা এটা বুঝেছে। তারা শুধু “কমিটেড কর্মী” হিসেবে নয়—“লেখক” হিসেবেও নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের লেখা পড়লে এটা বেশ টের পাওয়া যায়।

(আরেক প্রশ্ন: আপনি কোন পাঠকের জন্য লেখেন? এবং পৌঁছাতে পেরেছেন কি?)
ছাত্র : আপনি লেখার সময় কোন ধরনের পাঠককে লক্ষ্য করেন? আর আপনি কি সেই পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন?

―আমি দ্বিতীয় প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারছি না।
ছাত্র : মানে, আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট ধরনের পাঠকের কথা ভেবে লেখেন? আর আপনি কি তাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন?

―আমি মনে করি, আমি কখনোই কোনো নির্দিষ্ট ধরনের পাঠককে লক্ষ্য করে লিখিনি। প্রথম পর্যায়ে—যে পর্যায়ের কথা আমরা আজ বলেছি—তখন আমার পাঠক ছিল আমার চারপাশের মানুষ। আমার সময়ের মানুষ। আমার মতো “স্তরের” মানুষ। (আমি “স্তর” বলে শ্রেণিবিভাগ বোঝাতে চাইছি না।) আমি ভাবতাম, আমি যাদের জন্য লিখছি, তারাও আবার আমার মতো মানুষদের জন্য লিখছে। যেন এক ধরনের আদান-প্রদান। এক ধরনের দ্বান্দ্বিকতা।

১৯৪৬ বা ১৯৪৭ সালের দিকে, যখন আমি আমার প্রথম গল্প লিখি এবং Bestiary বইটি প্রকাশ করি, তখন আমি খুব চাইতাম আমার খুব শ্রদ্ধেয় একজন মানুষ—যেমন বোর্হেস—আমার কোনো গল্প পড়ে বলুন: ‘ভালো।’ সেটাই হতো আমার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কিন্তু পরে আমি যখন একা থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম—শব্দটির সবচেয়ে বড় অর্থে—নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে কাজ করা পর্যন্ত—তখন ‘পাঠক’ ধারণাটা আমার কাছে বাস্তবতা হারিয়ে ফেলল।

অনেক বছর আমি লিখেছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে আমাকে পড়া হবে। (‘নিঃসন্দেহ’—এই বিশ্বাসের ভেতরে আছে অহংকারও, আবার আশা-ও। সফল হতে চাওয়া সব লেখকেরই এটা থাকে।) আমি আশা করতাম আমাকে পড়া হবে। কিন্তু কে পড়বে? আমার কোনো নির্দিষ্ট ধারণা ছিল না। আজও নেই।

আমার মনে হয়, একজন সাহিত্যিক লেখক যদি একটি নির্দিষ্ট পাঠক-গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে লেখেন, তাহলে তাঁর লেখার শক্তি কমে যায়। তিনি লেখা শর্তসাপেক্ষ করে ফেলেন। লেখার ওপর চাপিয়ে দেন নানা বিধিনিষেধ। এটা বলা যাবে, ওটা বলা যাবে না। এটা ভালো, ওটা ভালো নয়। এই ধরনের আত্মসমালোচনা শেষ পর্যন্ত আত্ম-সেন্সরশিপে গিয়ে দাঁড়ায়—এটাই ঠিক শব্দ। কারণ লেখক তখন ভাবতে শুরু করেন—আমি অমুক ধরনের পাঠকের জন্য লিখছি, তাই আমি তাকে এটা দেব, ওটা দেব না। আমি মনে করি না, এই মনোভাব নিয়ে কোনো মহান লেখক তৈরি হয়েছেন।

ছাত্র : সংজ্ঞা খোঁজার অসুবিধা আর মতবাদবিরোধিতার এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় আমি আপনার লেখার আরেকটি দিক নিয়ে জানতে চাই। আপনার কিছু লেখা ছোটগল্প নয়, গোলকও নয়—পারমেনিদেসের গোলকও নয়, কোনো গোলকই নয়। এগুলো এক ধরনের খেলা, যেখানে বহু ঘরানা মিশে যায়—রসিক খেলা, কাব্যিক খেলা, গদ্যে লেখা কবিতা। যেমন Cronopios and Famas—যেটি অনেক দেরিতে প্রকাশিত হয়েছিল, কারণ প্রকাশক প্রথমে তা ছাপতে চায়নি। এই বইগুলোই, যদি শব্দটি মাফ করেন, সবচেয়ে খাঁটি কোর্তাসারীয়। এই ধরনের লেখালেখি সম্পর্কে আপনি কী বলবেন? এগুলো তো ছোটগল্প নয়, গল্প-গোলকও নয়—তবু কি এগুলো আপনার সবচেয়ে বৈধ কাজ নয়?

―আমি খুব খুশি যে আপনি এগুলোকে বৈধ মনে করেন। আর আরও খুশি যে আপনি এগুলো পছন্দ করেন। কারণ আমি আপনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত—এগুলো নিঃসন্দেহে বৈধ। এ বইগুলো আমার লেখার তিনটি প্রধান পর্যায়ের কোনো একটিতে ঠিকঠাকভাবে বসে না। Cronopios and Famas–এর ভাবনা আর লেখা তৈরি হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে এবং ষাটের দশকের শুরুতে। তারপর আছে A Certain Lucas নামে একটি ছোট বই—এর লেখাগুলোও সংক্ষিপ্ত, এবং আরও পরের সময়ের। আর আছে আরও কিছু ছোট লেখা, যেগুলো আমি “অ্যালমানাক বই” বলি—Around the Day in Eighty Worlds আর The Last Round।

এসব ছোট লেখাই আসলে আমার ব্যক্তিগত খেলাধুলা। আমি যেন একসঙ্গে শিশু-লেখক আর প্রাপ্তবয়স্ক লেখক। অথবা উল্টো করে বললে—একজন প্রাপ্তবয়স্ক লেখক, যার ভেতরে শিশুটি এখনো বেঁচে আছে।আমার ভেতরের শিশুটি কখনোই মারা যায়নি। আমি মনে করি, কোনো কবি বা লেখকের ভেতরেই সে সত্যিকারের মরে না।

খেলার প্রতি—লুডিকের প্রতি—আমার সব সময়ই গভীর টান ছিল। এমনকি “খেলার গাম্ভীর্য” নিয়ে আমার একটি গোটা তত্ত্বও আছে। আমি এখন সেটা ব্যাখ্যা করব না। শুধু এটুকু বলি—খেলা খুব গুরুতর হতে পারে, খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এমনকি কিছু পরিস্থিতিতে খুব নাটকীয়ও হতে পারে। এই কারণেই এই লেখাগুলো—যেহেতু সবই ছোট, কিংবা ক্রোনোপিওসের মতো চরিত্রে ভরা—বিভিন্ন সময়ের ওপর ভেসে বেড়ায়। এদিক-ওদিক যায়। গল্প আর উপন্যাসের মাঝখানে ঢুকে পড়ে।

আমরা এগুলো নিয়ে আলোচনা করব কি না, জানি না। কিন্তু হয়তো একদম শেষে—যখন আমরা গল্প আর উপন্যাসে ক্লান্ত হয়ে যাব—তখন এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টা ক্রোনোপিওস নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। কারণ সত্যি বলতে কী—এগুলো ভীষণ মজার। আর আমি এগুলো খুব ভালোবাসি।

ছাত্র : আপনি বাস্তবতাকে কতটা উপন্যাসের মতো করে পড়েন? আর আপনার লেখালেখি আর আপনার লাতিন আমেরিকান সহকর্মীদের লেখালেখির মধ্যে আপনি কোনো পার্থক্য দেখেন কি না? অনেকেই তো ওই মহাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। আপনি নিজেকে লাতিন আমেরিকান লেখক বলেন, কিন্তু আমার মনে হয় আপনার সঙ্গে অন্যদের গভীর পার্থক্য আছে।

―সৌভাগ্যক্রমে, হ্যাঁ।
কল্পনা করতে পারেন, যদি লাতিন আমেরিকান হওয়ার মানে হতো—আমরা সবাই একই বিষয় লিখব, আর আরও ভয়ংকরভাবে—একইভাবে লিখব? তাহলে সেটা হতো সর্বজনীন বিরক্তির এক নিখুঁত সূত্র। আমি মনে করি, আমরা এত ভিন্ন বলেই আমরা সৌভাগ্যবান। তবু গত কয়েক দশকে আমাদের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ তৈরি হয়েছে। যোগাযোগের পথ। এক ধরনের অসমোসিস।

এগুলো আমাদের কাছাকাছি এনেছে। অসাধারণভাবে একত্র করেছে। Mario Vargas Llosa আর আমি একেবারেই আলাদা ভাবে লিখি। কিন্তু যদি তুলনার জন্য আমি তৃতীয় একজন লেখক নিই—ধরা যাক, ভিন্ন সংস্কৃতির একজন, যেমন Somerset Maugham—তাহলে যে কেউই বুঝবে, ভার্গাস ইয়োসা আর আমার মধ্যে মিল আছে। কারণ আমরা শুধু একই ভাষায় লিখছি না। আমরা একই ভূখণ্ডের ভেতরেও চলাফেরা করছি।


সূত্র
* হোসে “পেপে” দুরাঁ—ইউসি বার্কলির অধ্যাপক, যিনি কোর্তাসারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। 
† প্রথম প্রশ্নটির রেকর্ডিংয়ের মান খুব খারাপ হওয়ায় তা পুনর্গঠন করা যায়নি। পরবর্তী অংশ থেকে বোঝা যায়, প্রশ্নটি কোর্তাসারের লেখাজীবনের তিনটি পর্যায় এবং তার গল্প “Meeting” নিয়ে ছিল। 
‡ তিনি সম্ভবত একটি সূচনামূলক ক্লাস বা উপস্থাপনার কথা বলছেন, যার কোনো নথি আমাদের কাছে নেই। 
§ রোবের্তো ফের্নান্দেস রেতামার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ