জার্মান-ব্রিটিশ লেখক ডব্লু. জি. সেবাল্ডের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার


সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : জেমস উড 
অনুবাদ : আহমেদ নাজিব

স্মৃতি ও ইতিহাসের পরিসর সেখানেই বিস্তৃত হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর সামাজিক বেদনার মিলন ঘটেছে―মনই এক দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন ডব্লু. জি. সেবাল্ড। পুরো নাম উইনফ্রিড জর্জ সেবাল্ড। তাঁর সাহিত্য আজও সমকালীন বিশ্বের স্মৃতি সাহিত্যের মানচিত্রে অমলিন ছাপ ফেলে রেখেছে। ১৯৪৪ সালের ১৮ মে জার্মানির বাভারিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান সাহিত্যে অধ্যয়নের পর ১৯৬৬-৬৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন এবং পরে ১৯৭০ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়াতে ইউরোপিয়ান সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে তিন দশকেরও অধিক সময় অধ্যাপনা করেন। তার লেখনীর নীরবতা ও ছবি-বয়ানের অম্লান মিশ্রণ ‘প্রোস-বুক উইথ পিকচারস’-এর এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আছে।

সেবাল্ডের চারটি উপন্যাস রয়েছে বা যাকে বলা চলে গদ্যকাব্য―ভার্টিগো, দ্যা ইমিগ্রেন্টস, দ্যা রিংস অব স্যাটার্ন, এবং অস্টারলিটজ। এই সবকটিতেই তিনি স্মৃতি, নির্বাসন, আইডেন্টিটি, ইতিহাস, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, এবং হলোকাস্টকে এক অদ্ভুত বিন্যাসে গেঁথেছেন। এছাড়াও তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধের সংকলন রয়েছে যেমন আফটার নেচার, অন দ্যা ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ডেস্ট্রাকশন, ক্যাম্পো স্যান্টো ইত্যাদি। মানুষের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মহাকালের ভ্রুক্ষেপহীন অবিচার তাঁর লেখায় এসেছে এক অদ্ভুত করুণ মায়া ও বিষণ্নতা নিয়ে। সেবাল্ডের লেখাকে বলা হয় পেরিপ্যাটেটিক রাইটিং, যেখানে উপন্যাসের নায়কেরা হাঁটছে, সফরে আছে, এবং হাঁটতে হাঁটতে দেখতে দেখতে গল্প বলে যাচ্ছে নির্লিপ্তভাবে। সমালোচক মাইকেল হ্যামবার্গার তাঁর রচনাশৈলীকে ‘প্রবন্ধমূলক অর্ধ-কল্পকাহিনি’ বলে অভিহিত করেন। কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন তাঁকে বলেছেন, ‘শেষ পঞ্চাশ বছরের সবচাইতে বড় কথাশিল্পী।’ তিনি সাহিত্যে এত দ্রুত বিশ্ব জয় করেন যে, এখন ‘সেবাল্ডিয়ানা’ নামে একটা শব্দ পর্যন্ত আছে।

ডব্লু. জি. সেবাল্ডের এই সাক্ষাৎকারটি নেন সাহিত্য সমালচক জেমস উড এবং তা প্রকাশ পায় ১৯৯৮ সালে, ‘ব্রিক : অ্যা লিটারারি জার্নাল’-এর ৫৯ নম্বর ভলিউমে। তখন সেবাল্ডের শুধু একটি বই, দ্যা ইমিগ্রেন্টস ইংরেজিতে অনূদিত হয়। এই বই নিয়ে আলাপ করতে করতে নিজের উপন্যাসে ছবির ব্যবহার, ছবি-স্মৃতির বয়ান, লেখার ফর্ম ও ভাষাশৈলী থেকে শুরু করে সাহিত্যের অনেক দিক নিয়ে কথা বলেছেন সেবাল্ড। ২০০১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর গাড়ি চালানোর সময়ে অকস্মাৎ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে নরউইচে গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রয়াত হন।

জেমস উড:
আমি কি আপনাকে পূর্বসূরিদের প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে পারি? আপনার এই বইয়ের মৌলিকতা এতটাই স্পষ্ট যে, পূর্বসূরিদের সন্ধান করাটা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, এমনকি অর্থহীনও। কিন্তু তবুও জানতে চাচ্ছি, আপনার লেখার স্ট্রাকচার, বিশেষ করে আপনার লেখায় ছবিগুলোর ব্যবহার এবং কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার এই সম্পর্ক, কীভাবে গড়ে উঠল?

ডব্লু. জি. সেবাল্ড
লেখালেখির প্রক্রিয়ার সাথেই ছবিগুলোর সংযুক্তি জড়িত, যার শুরুটা হয়েছিল আমার কর্মজীবনের অনেক পরে। আপনি হয়তো জানেন, আমি অনেকদিন পর্যন্ত কেবল একজন সাধারণ একাডেমিকই ছিলাম। ধীরে ধীরে, যখন আমার বয়স চল্লিশের মাঝামাঝিতে, তখন আমি, যাকে বলা হয় সৃজনশীল লেখালেখি, তাতে ঝুঁকে পড়ি। আমার ধারণা, একাডেমিক পেশা নিয়ে একধরনের হতাশা থেকে এটা শুরু হয়েছিল। মূলত একটা পালানোর পথ খুঁজছিলাম, এমন কিছু যা আমি গাছপালায় ঘেরা এক ঝোপড়াঘরে করতে পারি, কেউ টের পাবে না এমনভাবে।

আমি প্রথম যে গদ্যকাজটি করি, সেটি চারটি পৃথক অংশ নিয়ে গঠিত একটি লেখা, নাম ভার্টিগো, কিন্তু এটা ‘লেজেডেমেইন’, অর্থাৎ ভোজবাজি, এই অর্থও বহন করতে পারে। এই বইয়ে একটি অধ্যায় আছে, খুব সম্ভবত বইয়ের প্রথমে যদি ঠিক মনে থাকে, পুরোপুরি স্তাঁদালকে নিয়ে, এবং তাতে লা ভি দ’অঁরি ব্রুলার (অঁরি ব্রুলারের জীবন) এর থেকে কিছু আঁকা ছবি আছে, যা আপনি উল্লেখ করেছেন। লেখার এই প্রক্রিয়ায়, যাতে আমি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছিলাম, অনেক সময়েই কিছু ছবি একটা প্রাথমিক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ছবিগুলো হঠাৎ আমার সামনে এসেছিল, আমি দীর্ঘ সময় ধরে সেগুলো দেখেছিলাম, এবং সেখানে এমন কিছু রহস্যময় উপাদান খুঁজে পেয়েছিলাম যেগুলো আমি চেয়েছিলাম উন্মোচন করতে। এই কারণেই ছবিগুলো লেখার প্ররোচনা হিসেবে কাজ করেছে এবং লেখার অংশ হিসেবে থেকে গিয়েছে। এক সময় এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়―ছবি সংযোজন করার অভ্যাস। আমার মনে হয়, ছবিগুলো নিজের মতো করে গল্প বলে যায় গদ্যের ভেতর, ফলে গদ্যের ভেতর নতুন এক নীরব স্তরের সংযোজন হয়। সব সময় আমার ইচ্ছা থাকে এমন এক গদ্য রচনা করি যেখানে এক ধরনের নীরবতা বা অস্পষ্টতা থাকে। ছবিগুলো একভাবে সেই পথে আমাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।

  জেমস উড:
খুব সাধারণ অথচ অনিবার্য এক প্রশ্ন শুরুতেই জিজ্ঞেস করে নেই, আপনার বইয়ে থাকা ছবিগুলোর আনুমানিক কত শতাংশ আসলেই তাঁদের বর্ণিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত?

ডব্লু. জি. সেবাল্ড:
প্রশ্নটা আমাকে প্রায়ই করা হয়। ছবিগুলোর একটা বড় অংশই ‘আসল’। অর্থাৎ, সেগুলো সত্যিই সেইসব মানুষের ফটো অ্যালবাম থেকে এসেছে যাদের নিয়ে গদ্যগুলো লেখা, এবং এদের অস্তিত্ব, তাঁদের নির্দিষ্ট রূপ ও কাঠামো, সে বিষয়ে সরাসরি সাক্ষ্য দেয়। তবে কিছু সংখ্যক, আমার ধারণা, মোটামুটি দশ শতাংশের মতো―ছবি, ফটোগ্রাফ, পোস্টকার্ড, ভ্রমণের নথিপত্র বা এরকম কিছু, আমি অন্য উৎস থেকে ব্যবহার করেছি। তবুও আমার মনে হয়, সেগুলোও অনেকটাই প্রামাণ্য উপাদান।

জেমস উড:
একটি গল্পকে কেন্দ্র করে আলোচনাটা ঘনীভূত করতে, এবং আপনি কীভাবে উপাদানগুলো খুঁজে পেলেন, এগুলো নিয়ে কাজ করলেন, গড়ে-পিটে রচনার রূপ দিলেন―এই প্রক্রিয়ার একটা ধারণা দিতে চাইলে, আমি যদি খানিকটা খোলামেলাভাবে জিজ্ঞেস করি : প্রথম গল্পটা, ড. হেনরি সেলউইন-এর, কীভাবে আপনার সামনে এলো? আপনি কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করলেন? তারপর কীভাবে আপনি সেটা রূপ দিলেন গল্পে?
ডব্লু. জি. সেবাল্ড:
হেনরি সেলউইন–এর গল্পটি বইয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে ছোটো গল্প। এই ছোটো পরিসরটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ওই ব্যক্তি যখন আত্মহত্যা করলেন, তারপর তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করা আমার পক্ষে কতটা কঠিন ছিল। বিষয়টা আরও জটিল ছিল এই কারণে যে, হেনরি সেলউইন ও তাঁর স্ত্রী অনেকটাই আলাদা জীবনযাপন করতেন। ফলে তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন কাটানো স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে তাঁর স্বামীর এমন সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়াটা অত্যন্ত কঠিন হতো।

এই গল্পে যেটুকু তথ্য রয়েছে, তা আসলে খুবই সামান্য। আর সেটা আমি যতটুকু তাঁর জীবিত অবস্থায় তাঁর কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম, ঠিক ততটাই। সে যদি তাঁর জীবনের একেবারে শেষদিকে, আমাদের তাদের বাড়ি ছেড়ে আসার পর, এক অতি সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতার মাঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার লিথুয়ানিয়ায় কাটানো শৈশব ও ইংল্যান্ডে পাড়ি জমানোর কথা না বলতেন, তাহলে হয়তো আমি তার আত্মহত্যার পেছনের সত্যিটা কখনোই আঁচ করতে পারতাম না। শুধু ওই খানিকটা টুকরো-টুকরো স্মৃতিই আমাকে অনুমাননির্ভরভাবে বিশাল ফাঁকফোকরগুলো নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করেছে―যে ফাঁকগুলো এই মানুষটার জীবনের গতিপথে ছিল। তবে গল্পটা যেভাবে লেখা হয়েছে, অর্থাৎ তাঁর ফাঁকফোকর, অপূর্ণতা, বাদ যাওয়া অংশগুলোসহ, সেটাই আসলে আমি যেভাবে এই অভিজ্ঞতাটা অর্জন করেছি, ঠিক সেই রকমই।

জেমস উড:
কিছু কিছু দিক থেকে তথ্যের এই খণ্ডতা আপনার লেখায় কল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে উপকারী হয়ে দাঁড়ায়। বইটির এক ধরনের রহস্যময়তা এখানেই―একদিকে যেমন এই বিষণ্নতা ও অন্তর্গত ক্ষয়ের পিছনে কিছু স্পষ্ট কারণ আছে বলে মনে হয়, অন্যদিকে ঠিক কী জিনিস এটা ঘটায়, সেটা একটা গভীর রহস্যের মতো রয়ে যায়।

ডব্লু. জি. সেবাল্ড
যে চারজনের জীবন ওই লেখাগুলিতে তুলে ধরা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে নিপীড়নের শিকার হননি―তাঁদেরকে আপনি সেই শ্রেণির মানুষ হিসেবে ধরতে পারেন, যাদের প্রিমো লেভি ই সালভাতি বা ‘উদ্ধারপ্রাপ্তরা’ বলেছিলেন, ই সোম্মেরসি বা ‘নিমজ্জিতরা’ এর বিপরীতে। যখন আমি এই জীবনগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করি, আমার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল একটা নির্দিষ্ট বিষয়। আর সেটা হলো, দুই সময়ের মাঝের এক পার্থক্য। এক ধরনের বিপর্যয় যা তাঁরা সরাসরি না-হলেও পরোক্ষভাবে অনুভব করেছিলেন অনেকদিন আগে, কিন্তু তা তাঁদের জীবনের অনেক পরে, বার্ধক্যে এসে ধীরে ধীরে পুরোপুরি গ্রাস করে যখন ফেলে, সেই দুই সময়ের পার্থক্য। এই দেরিতে ধরা দেওয়া মানসিক বিপর্যয়―আত্মহত্যা, বার্ধক্যের নির্জনতা, এবং ওই ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো যে প্রাচীন, বহু আগেকার ঘটনা থেকে উৎপন্ন হতে পারে, এটা আমার কাছে দারুণ তাৎপর্যপূর্ণ লেগেছে। বার্ধক্যে পা রাখা মানুষের মন এমন থাকে যে, যতই বয়স বাড়তে থেকে তাঁর, ততই তাঁর বর্তমান বয়স আর শৈশব বা যৌবনের মধ্যকার সময়টা যেন ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে, এমনটা আমি যেমন মনে করি, তেমন বেশিরভাগ মানুষও কোনো না কোনোভাবে অনুভব করেন। বহু দূরের জিনিসগুলো হঠাৎ করেই দারুণ স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়, যেন আলোর নিচে একেবারে উন্মুক্ত, অথচ মাত্র দুই-তিন মাস আগের ঘটনাগুলো হঠাৎ করে গায়েব হয়ে যায়। এই যে অতীতকে বার্ধক্যে এসে নতুন করে মনে করা―এই স্মৃতির পুনর্গঠন―এটাই ছিল আমার আসল আগ্রহের জায়গা, সেই তাৎক্ষণিক কারণগুলোর চেয়েও বেশি, যেগুলো হয়তো তাদের আত্মহননের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

জেমস উড
এই স্মৃতির পুনর্গঠন, যেমনটা আপনার বই বারবার ইঙ্গিত দেয়, সেটা একদিকে স্মৃতির কাজ হলেও, আরেকদিকে অনেকটাই কল্পনার মতো―যেমন ফিকশন লেখা। এতে কল্পনা জড়িত থাকে, এতে ভুলভ্রান্তি, অদ্ভুত রকমের ব্যাখ্যা বা গ্রহণ-প্রক্রিয়ার সুযোগ থাকে। এই বিশেষ ধরনের কথাসাহিত্যিক রূপ―এমনকি যদি ছবিগুলো না-ও থাকে, তবুও মনে হয় এমন একটা প্রশ্ন উঠবেই : কোনটা আসলে কল্পনা করা, আর কোনটা সত্যিই স্মৃতিচারণ? যেমন, যখন পল বেরেইটার তাঁর এক বন্ধুর দৃষ্টিশক্তি হারানোর কথা বলছেন, তখন আপনি লেখেন : ‘সে সামনে তাকিয়ে দেখছিল (তাঁর কথায়) ধূসর ইঁদুরের রঙের জগৎ।’ এখন, এটা পড়তে গিয়ে মনে হয়, সম্ভবত পঞ্চাশ-পঞ্চাশ সম্ভাবনা―এই ‘ধূসর ইঁদুরের রঙের জগৎ’ কথাটা আসলেই তার বলা, না আপনার সৃষ্টি? আমার আগ্রহ আসলে এটা জানার নয় যে ঠিক কার শব্দ এটা, বরং এই কথাসাহিত্যিক রূপ, এই আংশিক প্রামাণ্য ফর্মটাই এমন যে, এমন প্রশ্ন আপনা থেকেই জেগে ওঠে।

ডব্লু. জি. সেবাল্ড:
আমি মনে করি, যেকোনো ধরনের কথাসাহিত্যই একভাবে এই বিভ্রান্তি তৈরি করে। এতে সব সময়ই একটা অস্পষ্টতা রয়ে যায়―কতটুকু কল্পনা করা হয়েছে, আর কতটা বাস্তব মানুষের বা সত্যিকারের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা, সেটা পুরোপুরি বোঝা যায় না। এই ব্যাপারটার এক ধ্রুপদি উদাহরণ হলো টমাস মানের উপন্যাসগুলো, যা সেইসব লোকদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করত যারা ভাবতেন তাঁর লেখায় তাঁদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, অমার্জিতভাবে। আমি মনে করি এই ধরনের বিভ্রান্তি সব সময়ই থেকে যায়।

কিন্তু আমি একটু বেশি সচেতনভাবেই আসলে চাই এই বাস্তব আর কল্পনার মাঝের অনিশ্চয়তাটুকু যেন প্রকট হয়ে ওঠে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আমরা আমাদের নিজেদের জানাশোনার বিষয়ে প্রায়ই প্রতারিত হই। আমরা অনেক কিছু নিজের মতো করে সাজাই, আমাদের কামনা বা উদ্বেগ অনুযায়ী তথ্যকে খাপ খাওয়াই, আর নিজেকে শান্ত রাখার জন্য একটানা সোজা গল্প বানিয়ে ফেলি। এই যে ‘শান্তিদায়ক গল্প বলার প্রক্রিয়া’, সেটাকেই আমি প্রশ্নের মুখে ফেলতে চাই। এই অনিশ্চয়তা―ন্যারেটর যে নিজের বয়ানের সত্যতা নিয়েও সন্দিহান―আমি আশা করি সেটা পাঠকের মধ্যেও যেন ছড়িয়ে পড়ে। পাঠকও যেন একটু অস্বস্তি বোধ করে, প্রশ্ন তোলে। আমি বিশ্বাস করি, সেই ধরনের ফিকশন যা এই অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করে না, সেটা এক ধরনের প্রতারণা এবং আমার এই ধরনের লেখাকে সহ্য করতে খুবই কষ্ট হয়। কোনো লেখায় যদি লেখক নিজেকে মঞ্চসজ্জাকারী, পরিচালক, বিচারক আর কার্যকরকারী হিসেবে দাঁড় করিয়ে নেয়, আমি সে লেখাকে একেবারেই গ্রহণ করতে পারি না। এমন বই পড়তে আমার সত্যিই খুব অসহ্য বোধ হয়।

জেমস উড:
এই বিতৃষ্ণাটার কি কোনো সম্পর্ক আছে এই যুগের সেই ধারণাটার সঙ্গে, যেটা বলে যে এই রকম সর্বজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গি, জেন অস্টিনের লেখার মতো, এখন আর সম্ভব নয়? কারণ যেটাই হোক, আমাদের এই ধর্মনিরপেক্ষ, টুকরো-টুকরো হয়ে যাওয়া দুনিয়ায় সেটা আর টেকে না। আমি ভাবছি, এটা আপনি তাত্ত্বিক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে বলছেন না―এটা আসলে এক ধরনের প্রকৃত অস্বস্তি, একেবারে বাস্তব বিতৃষ্ণা, যা আপনি এই ধরনের বর্ণনাশৈলীর প্রতি অনুভব করেন, তাই তো?

ডব্লু. জি. সেবাল্ড
হ্যাঁ, এটা সত্যিই একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি, আর আমি মনে করি এটা অনেকটাই ভব্যতার প্রশ্ন। আপনি যখন জেন অস্টিনের কথা বলেন, তখন আপনি এমন এক জগৎকে ইঙ্গিত করছেন যেখানে শালীনতার, শিষ্টাচারের নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছিল, যা সবাই মেনে চলত। সে রকম একটা দুনিয়ায়, যেখানে নিয়মগুলো স্পষ্ট, আর আপনি জানেন ঠিক কোথা থেকে সীমালঙ্ঘন শুরু হয়, তখন সেখানে একজন সর্বজ্ঞ কথক হওয়া―যে সব নিয়ম জানে, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানে, তা কিছুটা বৈধ। কিন্তু ইতিহাসের ধাক্কায় আজকের পৃথিবীতে এসব নিশ্চয়তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের এখন স্বীকার করতে হয় যে আমরা অজানা, অপূর্ণ, এবং সেই অনুযায়ী আমাদের লিখতেও হবে একটা ভিন্ন বোধ নিয়ে।

আপনি যেটা বললেন, সেটা একদম ঠিক। আমি সত্যিই এই ধরনের ‘সব জানি এমন’ কথকের লেখা পড়লে বিরক্ত হই। বরং আমি অনেক বেশি পছন্দ করি আত্মজীবনীমূলক লেখা―শাতোব্রিয়ঁ, বা স্তাঁদালের লেখাগুলো। উদাহরণ হিসেবে বলি, আমি লা ভি দ’অঁরি ব্রুলার-কে (অঁরি ব্রুলারের জীবন) অনেক বেশি পছন্দ করি লা শার্ত্র্যােজ দ্য পার্ম-এর (পার্মের শার্ত্র্যােজ) তুলনায়। কারণ, সেখানে এমন এক রকম বাস্তবতার মাত্রা আছে, যেটার সঙ্গে আমি নিজের চিন্তা মেলাতে পারি। অন্যদিকে, উপন্যাসগুলোতে আমরা একটা কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়ি―ফিকশনের নিজস্ব নিয়ম-কানুনে। আর সেটা আমার কাছে ক্লান্তিকর লাগে―একঘেয়ে, যেন ইচ্ছের বাইরে একটা ছাঁচে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছি।

জেমস উড :
এই প্রশ্নটাই আসলে আপনার ব্যবহৃত ছবিগুলোই আমাদের সামনে জোরালোভাবে তোলে, আরও বড়ো করে তোলে। কারণ এই ছবিগুলো আমাদের বাধ্য করে ভাবতে, কোনটা কল্পনা আর কোনটা স্মৃতি। কিন্তু এর বাইরেও ছবিগুলোর এক বাড়তি ব্যাপার আছে, একটা আলাদা করুণ রস আছে। ওগুলো অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো কিছুর দলিলই শুধু নয়, সেইসব ছবি একইসাথে ইশারা করে সামনে কি হতে যাচ্ছে, যেটা ছবির ফ্রেমের বাইরের এক ধরনের ব্যাপার। তাই প্রতিটা ছবিই একধরনের অগ্রসরণ বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে নির্দেশ করে। আপনার কি মনে হয়, এই ধারণাটার সঙ্গে নস্টালজিয়ার কোনো সম্পর্ক আছে? কারণ নস্টালজিয়াও একধরনের দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি―একদিকে সে অতীতে ডুবে থাকে, আবার অন্যদিকে একটা আকাক্সিক্ষত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে থাকে। এক অর্থে নস্টালজিয়া হচ্ছে এক প্রকার ইউটোপিয়া, একদিকে মুক্তির স্বপ্ন, অন্যদিকে নিঃশেষতার দণ্ড।

ডব্লু. জি. সেবাল্ড:
ছবি হচ্ছে স্মৃতির নিখুঁত রূপ, বা বলা যায়, একধরনের দৃঢ়ীকৃত স্মৃতি। যেটা আমাকে বরাবরই ভাবায়, তা আজকের দিনের ক্যামেরায় তোলা গাদা গাদা ছবিগুলো নয়, বরং পুরোনো দিনের ছবিগুলো, যেগুলো মানুষ সারা জীবনে হয়তো দুই-তিনবারই তোলার সুযোগ পেত। ওইসব ছবির মধ্যে একটা অপ্রকাশ্য ভূতুড়ে ধোঁয়াশা থাকে। যেন ছবির মানুষগুলো স্পষ্ট নয়, কিনারাগুলো ঝাপসা―ঠিক যেন কোনো ছায়ামানব, যাদের আপনি হঠাৎ করে হয়তো বাইরের রাস্তায় দেখে ফেললেও ফেলতে পারেন। এই রহস্যময় গুণটাই আমাকে ছবিগুলোর দিকে টানে। এখানে নস্টালজিয়া যতটা না আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে অজানা কোনো রহস্য। পুরোনো ছবিগুলো এমনভাবে তৈরি, যেন হারিয়ে যাওয়ার জন্যই ওরা জন্মেছে। একটা অ্যালবামে থাকে সেগুলো, সেটা আবার কোথাও চিলেকোঠায় পড়ে থাকে, একটা বাক্সে চাপা পড়ে যায়। আর যখন পুরোপুরি দুর্ঘটনাবশত তা আলোয় আসে, সেটা দেখে হঠাৎ করে হোঁচট খাই আমরা। এইভাবে যখন এরা হঠাৎ করে আমাদের জীবনে ঢুকে পড়ে, তখন সেটা হয় একদিকে পুরোপুরি কাকতালীয়, আবার অন্যদিকে যেন নিয়তিরই কোনো খেলা। আর তখনই ওদের নিয়ে মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে হাজারটা প্রশ্ন। এই ধাঁধার মধ্য থেকেই আমার লেখার ইচ্ছা জন্ম নেয়―এই অদ্ভুত পুরোনো ছবির জগৎকে ব্যাখ্যা করার একটা প্রচেষ্টা।

জেমস উড
আমারও মনে হয়, এই বইয়ে ছবিগুলোর যে ভঙ্গিতে সাজানো হয়েছে, তাতে ওগুলো এক ধরনের অদ্ভুত বেদনার ভার বয়ে আনে। কারণ ডকুমেন্টেশন বা ঘটনাকে নথিবদ্ধ করার বিষয়টা―বিশেষ করে হলোকাস্ট-এর প্রেক্ষিতে―একটা সংবেদনশীল ও জটিল বিষয়। এই ছবিগুলোর মধ্য দিয়ে একটা অতিরিক্ত বেদনা তৈরি হয়, যদি ধরে নিই যে ছবিগুলো যেন বলে দিচ্ছে―জার্মান নাৎসি রাষ্ট্র যে সাক্ষ্য ও স্মৃতি নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল, সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে, এই বই আমাদের সেটাই জানায়। কিন্তু অন্যদিকে, আরেকটা জটিল বার্তা দেয় বইটা―ছবিগুলোতে যদি আমরা সেই জীবনের খোঁজ করি, তাহলে ভুল করব। কারণ ছবিগুলোর মধ্যে সেই জীবন পুরোপুরি নেই; ওগুলো অস্বচ্ছ, এবং গভীরভাবে রহস্যময়। অর্থাৎ, ছবি সাক্ষ্য দেয় ঠিকই, কিন্তু জীবনকে পুরোটা ফিরিয়ে আনতে পারে না। তারা শুধু তার ছায়া ধরে রাখে।

ডব্লু. জি. সেবাল্ড
হ্যাঁ, আর বইয়ের মধ্যে এক-দুটি জায়গা আছে যেখানে এই উৎসগুলোর অবিশ্বাসযোগ্যতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শেষ গল্পে একটি ছবি রয়েছে, যেখানে রেজিডেনৎসপ্লাৎস-এ (রেসিডেন্স চত্বরে) বই পোড়ানোর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গল্পের এক চরিত্র বলে, এই ছবিটা আসলে বানানো, মিথ্যে। আসল ঘটনা হলো, যেদিন বই পোড়ানো হয়েছিল, সেদিন সন্ধ্যা ছিল, আর সন্ধ্যায় ঠিকঠাক ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। তখনকার ফ্যাসিস্ট পত্রিকার সাংবাদিকরা একটা ছবি নেয় যেখানে কেবল যেকোনো এক সমাবেশ দেখানো হচ্ছিল, এবং পরে সেই ছবিতে ধোঁয়ার মেঘ কৃত্রিমভাবে যোগ করে দেওয়া হয়, যেন মনে হয় বই পোড়ানো হচ্ছে। সেই চরিত্র বলে, এইভাবেই সবকিছু শুরু হয়েছিল―মিথ্যে দিয়ে। এই একটা জাল ছবি যেমন, তেমনি সবকিছুই ছিল জালিয়াতি, শুরু থেকেই। এই কথা ন্যারেটরের বয়ানের ভিত্তিটাকেই টলিয়ে দেয়। পাঠক তখন প্রশ্ন করতে পারেন, আসলে সে কী বোঝাতে চাইছে? আমাদের কেন বিশ্বাস করাতে চাইছে যে ছবিগুলো সত্য? এই ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা, বাস্তব আর কল্পনার সীমা ঝাপসা করা―এই কৌশল জেনে-বুঝেই ব্যবহার করে ন্যারেটর। কারণ তিনি চান পাঠকের মনে যেন সন্দেহ জাগে, যেন পাঠকও নিজের চোখে যা দেখছে, তা নিয়েই দ্বিধায় পড়ে।

জেমস উড:
আমি এই বিমূর্ত আলোচনার স্তর থেকে এক ধাপ নিচে নেমে এসে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই তৃতীয় গল্পটা নিয়ে, গ্রেট-আঙ্কেল অ্যাডেলভার্থ-এর গল্প। ঠিক যেমনভাবে আমি ড. সেলউইনের গল্প সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম―এই গল্পটা আপনি কতটা আগে থেকেই জানতেন, কতটুকু আপনাকে খুঁজে বের করতে হয়েছিল, আর কতটুকু আপনি নিজে থেকে তৈরি করেছেন?

ডব্লু. জি. সেবাল্ড
এক অর্থে, এই গল্পটাই আমার জন্য সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিল, কারণ এটি আমার নিজের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। গল্পের শুরুতেই যেমন বলা আছে, আমি আমার এই গ্রেট-আঙ্কেলকে ছোটোবেলায় একবার মাত্র দেখেছিলাম, এবং তখনই―অন্তত পরে ভেবে―তিনি আমার কাছে একেবারে অদ্ভুত একজন মানুষ মনে হয়েছিলেন, যিনি পরিবারের স্বাভাবিক ধাঁচে ফিট করেন না। তারপর যেমনটা হয়, শৈশবের কোনো স্মৃতি মানুষ ভুলে যায় অনেক বছর ধরে। প্রায় পনেরো বছর আগে, আমি যখন এই শহরে এসেছিলাম, গোয়থে ইনস্টিটিউটে একটি বক্তৃতা দিতে, তখন আমি এই সুযোগে নিউ জার্সিতে আমার আত্মীয়দের দেখতে গিয়েছিলাম। আর সেই সময়ে, আমার স্বভাবমতো, আমার আন্টির পুরোনো অ্যালবামগুলো ঘাঁটছিলাম। তখনই একটি ছবি পাই―আমার সেই গ্রেট-আঙ্কেলের, আরব পোশাকে―১৯১৩ সালে জেরুজালেমে তোলা। এই ছবিটা আমি আগে কখনো দেখিনি, আর সেটা এমনভাবে যেন হঠাৎ করে আলোকিত করে দিলো কে এই মানুষ ছিলেন, আর কীভাবে এমন হয়ে উঠলেন।

তখনো আমি জানতাম না তিনি কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু আমি এই ছবির দিকে তাকিয়ে আর তাঁর কিছু ব্যক্তিগত ঝোঁক বুঝে নিয়ে আন্দাজ করতে পারছিলাম যে তাঁর নিজের পরিবার কখনো তাঁকে পুরোপুরি স্বীকার করে নিতে পারেনি। এখান থেকেই আমি শুরু করি তাঁর জীবনের খোঁজ নিতে। আমি আমার আন্টিকে অনুরোধ করি যতটুকু জানেন বলার জন্য, আর আমার আঙ্কেলকেও জিজ্ঞেস করি―তাঁদের বলা কথাগুলোই গল্পে উঠে এসেছে। আমি কিছু জায়গায় গিয়েও ঘুরে এসেছিলাম, যেগুলো তাঁদের বর্ণনায় এসেছিল। যেমন ডোভিল শহরে প্রায় দুই সপ্তাহ কাটিয়ে খোঁজখুঁজি করেছিলাম কিছু পাওয়ার আশায়। তবে আমি জেরুজালেম যাইনি। গ্রেট-আঙ্কেল আর কসমো সলোমন, যাকে তিনি দেখাশোনা করতেন, তাঁরা একসাথে ১৯১৩ সালে কনস্টান্টিনোপল হয়ে জেরুজালেম গিয়েছিলেন। আজকের জেরুজালেমে গেলে, আমি নিশ্চিত, ১৯১৩ সালের জেরুজালেমের কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে না। সুতরাং ওই অংশে কোনো লোকেশন খোঁজার জন্য আমি যদি সেখানে যেতাম, তবে সেটা আমাকে ভুল পথে নিয়ে যেত। এই গল্পে আমি যেসব উপাদান ব্যবহার করেছি, তার মধ্যে আছে পুরোনো ভ্রমণকাহিনি, যেমন শাতোব্রিয়ঁ-র ইতিনেরের আ জেরুজালেম (জেরুজালেমে যাত্রাপথ) থেকে উদ্ধৃতি, একজন জার্মান ভূতত্ত্ববিদের ১৯শ শতকের লেখা, ইত্যাদি। অর্থাৎ, এই লেখার গঠন হয়েছে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত উপাদানে―ঐতিহাসিক দলিল, লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আর অন্যদের বলা গল্প―যেগুলোর স্তর আলাদা, উৎস আলাদা, কিন্তু একত্রে গড়ে তুলেছে এই জীবনের একটি কল্পিত-সত্য রূপ।
জেমস উড:
এই বইয়ের ইংরেজি পাঠকদের কাছে যে জিনিসটি নিশ্চয়ই চোখে পড়ার মতো, তা হলো গদ্যের অসাধারণ যত্ন এবং অনুবাদের নিখুঁততা। এখানে একটা টানাপোড়েন আছে―প্রায় একটা বৈপরীত্য―উপাদানের অস্পষ্টতা, রহস্যময়তা, অস্বচ্ছতার সঙ্গে ভাষার বিশেষণগুলোর একরকম জেদি, প্রায় উগ্র রকমের নির্দিষ্টতা। এটা আমাকে থমাস বার্নহার্ডের কথা মনে করিয়ে দেয় এক ধরনের ভাষাগত চূড়ান্ততা, যা এই অনির্দিষ্টতা বা অস্পষ্টতার সঙ্গে পাশাপাশি চলে। যেমন ধরুন, পলের আচরণ তখন ছিল ‘অসাধারণভাবে সংযত,’ আঙ্কেল অ্যাডেলওয়ার্থ ‘প্রতিদিনকার কাজগুলো করতে নিদারুণ কষ্ট পেতেন,’ ম্যাক্স ফেরবার ম্যানচেস্টারে জাহাজ দেখেছিলেন আর সেটা মনে পড়ে তাঁর ‘একেবারে বোধগম্যহীন দৃশ্য’ হিসেবে। ভাষা যেন বারবার এক ধরনের চূড়ান্ততা চাপিয়ে দিচ্ছে, আর সেটা এমন কিছু উপাদানের সঙ্গে পাশাপাশি চলছে, যা মোটেও চূড়ান্ত নয়, বরং অস্পষ্ট, অসীমের ধারে। আমি আপনাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম। এবং এরপর আরও বড়ো একটা প্রশ্ন, আপনি অনুবাদকের সঙ্গে কীভাবে কাজ করেছেন?

ডব্লু. জি. সেবাল্ড
এই যে প্রায় প্রতিটি বাক্যে বিশেষণ বা গুণবাচক শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, এটা নিঃসন্দেহে থমাস বার্নহার্ডকে একটা শ্রদ্ধা নিবেদন বলা চলে। তিনি এমন এক ধরনের লিখনশৈলী ব্যবহার করতেন, যেটাকে আমি হয়তো ‘পেরিস্কোপিক রাইটিং’ বলব। যা কিছু বর্ণিত হয়, তার সবই যেন এক বা একাধিক মধ্যবর্তী স্তর দিয়ে ফিল্টার হয়ে আসে, ফলে বাক্যগঠন জটিল হয়ে ওঠে এবং সেটা একধরনের ধাঁধার মতো কাজ করে। আর একভাবে দেখলে এতে বর্ণনাকারী নিজেও রেহাই পেয়ে যায়। কারণ সে কখনোই দাবি করে না যে তার জানাটা পরিপূর্ণ।

আপনি যে উগ্রতা বা চূড়ান্ততার কথা বললেন, তা বার্নহার্ডের লেখায় আরও তীব্রভাবে আছে। তিনি হাইপারবোল বা অতিরঞ্জনের আনন্দে মেতে থাকতেন। আমি কিছুটা ধরে রাখতে চেয়েছি ওটা, কারণ বার্নহার্ড আমার ওপর অনেক দিক থেকে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। আমার কাছে এই চূড়ান্ততা এমন কিছু নির্দেশ করে যা আমাদের মনে গেঁথে যায়―সব সময়ই অতিরঞ্জিত কিছু, সুপারলেটিভ। গল্প বলা নিজেই একধরনের অতিরঞ্জন। আমরা সবাই জানি, ডিনার পার্টিতে গল্প বললে সেই গল্পটা বারবার বলার সময় আরও রঙিন, আরও উদ্ভট, কখনো আরও হাস্যকর বা বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। আপনার স্ত্রী তো হয়তো কান পেতে থাকে কখন শেষ হবে, কারণ তিনি জানেন আপনি প্রতিবার গল্পটা বাড়ান! এটা গল্প বলার স্বভাবগত ধর্ম বলেই আমি মনে করি একধরনের ‘এক্সট্রিম’-এর দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া। আর তখনই তো প্রশ্ন ওঠে আসল সত্যটা কী? কারণ আগেরবার কিন্তু আপনি এতটা বাড়াননি। আর যদি সেই বাড়িয়ে বলা মিথ্যা গল্পটা শ্রোতাদের থেকে দারুণ রেসপন্স পায়, আর পাশে যদি কেউ থাকে যে জানে এটা সত্যি নয়―তাহলে আপনি হঠাৎ করে আর গল্পকার থাকেন না, আপনি তখন প্রতারক।

এই জিনিসটাই আসলে কথাসাহিত্যের কেন্দ্রে রয়েছে। এবং এই বোধটা লেখার মধ্যেও থেকে যায়। আমি চেষ্টা করি, এই নির্ভরযোগ্যতার ঘাটতিটা অন্যভাবে পুষিয়ে দিতেÑযতটা সম্ভব, যত জায়গায় খুঁটিনাটিতে নির্ভুল থাকা যায়, সেখানে। এবং সেটা সাধারণত ঘটে জিনিসপত্র নিয়ে, মানুষ নিয়ে নয়। আমরা তো কখনো জানি না মানুষ কী অনুভব করেছিল, তবে আমরা হয়তো কল্পনা করতে পারি ওই তুঁতগাছটা তাঁর কাছে কী অর্থ বহন করত, অথবা কী অর্থ বহন করত তাঁর ঘরের এক বিশেষ বিন্যাস। এই স্তরেই আপনি চেষ্টা করেন ওই অস্থির নির্ভরযোগ্যতাকে সমতা দেওয়ার।

অনুবাদ নিয়ে কিছু বলব? শুনেন, জার্মান টেক্সটগুলো কেন ইংরেজিভাষী দুনিয়ায় খুব একটা দাগ কাটে না, এর পেছনে অনেক কারণ আছে। ইংরেজি এমন একটা আধিপত্যকারী ভাষা, যেখান থেকে একটা প্রাকৃতিক ঢাল বেয়ে সবকিছু অন্যান্য তথাকথিত ‘ছোটো’ ভাষার দিকে গড়িয়ে যায়। জার্মান দ্রুত সেই ছোটো ভাষাগুলোর কাতারে নেমে আসছে―ইতালিয়ান, ফরাসির মতো। ফরাসিরা তো নিজেদের ভাষার বৈশ্বিক উপস্থিতি কমে যাওয়া নিয়ে প্রবল চিন্তিত। যেখানে ইংরেজদের এক সময় দারুণ অনুবাদ সংস্কৃতি ছিল―ঊনবিংশ শতকে কোলরিজদের সময়, যাঁরা জার্মান সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন―সেই ধারা ইতিহাসের ধাক্কায় প্রায় হারিয়ে গেছে। জার্মান দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের উদ্ধতপনা, নাৎসিবাদ―সব মিলে ব্রিটিশরা আরও কূপমণ্ডূক হয়ে ওঠে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও, যদি না উদ্বাস্তু লেখকেরা থাকতেন, কিছুই হয়তো অনুবাদ হতো না। হাইনরিখ বোল, গুন্টার গ্রাস, পিটার হ্যান্ডকের প্রারম্ভিক লেখা―সবই মূলত একজন অনুবাদক অনুবাদ করেছেন, রালফ মানহেইম।

জেমস উড:
 একটা ভিন্ন দিক থেকে জানতে চাচ্ছিলাম―আর হ্যাঁ, খুব একটা জোর না দিয়েই―আপনার নিজের দেশ ত্যাগ আর নিজ দেশের প্রতি আপনার নিজের সম্পর্কটা নিয়ে।

ডব্লু. জি. সেবাল্ড
এই অধ্যায়টা অবশ্যই একটু কঠিন। আমি ইংল্যান্ডে এসেছিলাম একধরনের ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার ফলে। আমি জার্মানি ছেড়ে যাই একুশ বছর বয়সে, একেবারে সোজাসাপ্টা কারণে―তখনকার সময়ের ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমি যা নিয়ে পড়তে চাচ্ছিলাম সেটা পড়া একরকম অসম্ভব ছিল।

এখনকার সময়ে এটা বুঝে ওঠা মুশকিল, কিন্তু ষাটের দশকের শুরুতে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জার্মান বিভাগে যারা সিনিয়র পদে ছিলেন, তারা সবাই ছিলেন সেই লোকেরা যারা ৩০-এর দশকে তাদের ডিগ্রি অর্জন করেছেন, এবং যাঁদের অনেকে শুধু শাসকের কথামতো চলেননি, বরং নিজের লেখার মধ্য দিয়ে সরাসরি অবদান রেখেছেন সেই জেনোফোবিয়া―বিদেশবিদ্বেষ―সংস্কৃতিতে, যা বিশ শতকের শুরু থেকেই গড়ে উঠছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যদিও তাদের ‘পুনর্গঠন’ করা হয়েছিল, তবুও তাদের অতীতটা রয়ে গিয়েছিল। আজও মাঝেমধ্যে এমন সব ঘটনা সামনে আসে যা এতটাই অদ্ভুত যে বিশ্বাস করাই কঠিন। এক-দুই বছর আগেই একটা ব্যাপার ফাঁস হয়―আমি জানি না এটা এখানে পত্রিকায় এসেছে কি না, যেখানে দেখা যায় জার্মানির একটি নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক যুদ্ধের পর নিজের জন্য পুরোপুরি নতুন একটা জীবনকাহিনি বানিয়েছিলেন, এমনকি দ্বিতীয় একটা পিএইচডিও করেছিলেন, যেন প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি অন্য একজন মানুষ!

আমি যে শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টারে গিয়ে উঠি, সেটাও ছিল একরকম দৈবক্রম। তখন আমি প্রায় কোনো ইংরেজিই জানতাম না, আর ইংল্যান্ড সম্পর্কে ধারণা তো ছিলই না। আমি জানতাম না দেশটা এমনভাবে ভাগ করা―একটা সবুজ আর একটা কালো অংশে। আমি কল্পনাতেও ছিল না ম্যানচেস্টার আসলে কেমন শহর।

ম্যানচেস্টারে এসে আমি একপ্রকার বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যাই। যদিও পুরো এক বছর নয়, তবুও তিন-চার মাস লেগে গিয়েছিল নিজেকে কিছুটা মানিয়ে নিতে। অনেকটা ছোটো বয়সে উইটজেনস্টাইনের মতোই, যিনি ম্যানচেস্টারে এসেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। এটা আমি জানতাম না, ধীরে ধীরে জানতে পারি।

আপনি জানেনই, জীবনের কথা ভাবতে গিয়ে যখন হঠাৎ বুঝতে পারেন আপনার চলার পথ কারো সঙ্গে কোথাও মিলে গিয়েছে, সেটা জীবনের এক অদ্ভুত ও অমূল্য মাত্রা এনে দেয়। ইলিয়াস ক্যানেটির আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড প্রথমবারের মতো যখন পড়ি, যেখানে তাঁর বুলগেরিয়া থেকে ম্যানচেস্টারে আসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা আছে, আর দেখি তিনি প্যালাটাইন রোডে থেকেছেন, যেখানে আমিও কিছুদিন ছিলাম, তখন সেটা আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। যদিও জানি, এতে বাস্তবিক অর্থে তেমন কোনো তাৎপর্য হয়তো নেই, তবুও সেটা কিছু একটা মনে হয়। উইটজেনস্টাইনের বিষয়েও তাই। বইয়ের মধ্যে তাঁর একটা অতি ক্ষীণ উপস্থিতি আছে, একরকম অস্পষ্ট অনুরণন। প্রথমে, সম্ভবত, বিষয়টা ছিল শুধু এটুকু―উনিও আমার মতো কমবয়সে ম্যানচেস্টারে ছিলেন। আর যখন আমি আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, পল বেরেইটারের জীবন নিয়ে ভাবি, তখন সেটাও আশ্চর্যরকমভাবে মিল খায় উইটজেনস্টাইনের জীবনের এক পর্যায়ের সঙ্গে―যখন তিনি, তাঁর একধরনের বিভ্রান্ত আদর্শবাদ থেকে, অস্ট্রিয়ার এক দূরবর্তী গ্রামে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। ওখানে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে―তিনি এক সাধুর মতো জীবনযাপন করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ওইখানের নির্বোধ কৃষকদের শিশুদের সহ্য করতে না পেরে, প্রায়ই মাথার ওপর হাত চালিয়ে দিতেন, কান মলে দিতেন। এই ধরনের কাকতালীয় মিল, আমার সেই শিক্ষকচরিত্রের কাহিনির মধ্যে এমনভাবে বোনা ছিল যেন উইটজেনস্টাইনের একটা অনুজ্জ্বল ছায়া রয়ে গেছে। আমরা অনেকেই উইটজেনস্টাইনের দার্শনিক চিন্তাধারার সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না, কারণ আমরা প্রায় সবাই সেখানে গিয়ে হাবুডুবু খাই। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিজীবনে এমন কিছু আছে, যা অসীমভাবে আকর্ষণ করে। এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলোর ব্যাপারে জানার খিদে মেটেই না, যেন তুমি তা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারো না। আমি এক সময় ভেবেছিলাম উইটজেনস্টাইনের ওপর একটা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখব, একটা খসড়া ড্রাফটও লিখেছিলাম। হতে পারে, সেটা এখনো কোনো একদিন বাস্তব হবে। তবুও, ইংল্যান্ডে আমি নিজেকে ‘বাড়ির মানুষ’ ভাবতে পারি না। আমি নিজেকে সেখানে একজন অতিথি মনে করি। তবে, যেটা আমি খুবই প্রশংসা করি, সেটা হলো ওদেশে প্রায় সম্পূর্ণরূপে কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর অনুপস্থিতি।

ইংল্যান্ডে মানুষ ব্যক্তিগত পরিসরকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে। তুমি চাইলে সকালে শুধু আন্ডারওয়্যারে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারো, কেউ কিচ্ছু বলবে না! আমার এক বন্ধু একবার সমুদ্রসৈকতে পা ভেঙে ফেলেছিল। কাছেই একটা বৃদ্ধ ইংরেজ দম্পতি গাড়িতে বসে চা খাচ্ছিলেন। আমার বন্ধু অনেক কাকুতি-মিনতি করে সাহায্য চাইলেও তাঁরা ভাবলেন, ‘লোকটা এভাবেই হাঁটতে ভালোবাসে, তা তার ব্যাপার!’ এই ব্যাপারটা কিছুটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যেতেও পারে, কিন্তু সেটা প্রায় সব সময়েই বেশ আরামদায়ক। আমি খুশি যে আমাকে ওখানে সহ্য করা হচ্ছে। ·

অনুবাদক পরিচিতি : আহমেদ নাজিব কবি, অনুবাদক। শিক্ষার্থী, রুয়েট

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ