‘বিউটি ইজ আ উন্ড’ উপন্যাস নিয়ে উইলিয়াম হ্যারিসের আলোচনা


অনুবাদ : ঝরা সৈয়দ

কবিংশ শতকে উপন্যাসের ঘরানাগুলোর স্থায়িত্ব কত দিনের? আমার কাছে মনে হয়, এই ফলগুলো খুব তাড়াতাড়ি পচে যায়, কিংবা পচবার আগেই ছুঁড়ে ফেলা হয়। নতুন এবং দীর্ঘস্থায়ী কোনো রূপ কেমন হতে পারে—তা কল্পনা করাই কঠিন। সাহিত্য-ইতিহাস যেন আমাদের সময়-সংক্রান্ত এক জলাভূমিতে ফেলে রেখেছে। উচ্চস্বরে প্রচারিত ক্ষণস্থায়ী জিনিসপত্র মিছিল করে যায়, কয়েক দশকই যুগ হয়ে ওঠে, নামকরণগুলো কৌতুকের মতো শোনায়, আর সবচেয়ে মৃত প্রশ্ন—কারণ প্রশ্নটি ভীষণ একঘেয়ে—হলো: উপন্যাস কেমন হওয়া উচিত? এই সব ঝলমলে কর্মকাণ্ডের ভিড়ে আমরা সহজেই ভুলে যাই যে আজ, সাহিত্য-ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, আমরা হয়তো সত্যিকারের বৈশ্বিক ও স্থায়ী কিছু অর্জনের কাছাকাছি—মার্ক্সের ‘বিশ্ব সাহিত্য’ নয়, বরং ভিন্ন কিছু: “অক্ষরের এক বিশ্বব্যবস্থা।”

আমি এখানে ফ্রেডেরিক জেমসনের কথা উদ্ধৃত করছি। তিনি মার্ক ম্যাকগার্লের The Program Era–র রিভিউতে লিখেছিলেন এই কথাগুলো। সেই রিভিউয়ের শেষে তিনি প্রথম বৈশ্বিক ঘরানা হিসেবে ম্যাজিক রিয়ালিজমের উত্থানের কথা উল্লেখ করেন। ম্যাজিক রিয়ালিজমের জন্ম ও বিস্তার লাতিন আমেরিকায়। সেখানে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নানা প্রভাব সংগ্রহ করে—বিশেষ করে ফকনার, জয়েস, কাফকা ও উলফের কাছ থেকে। তারপর এটি ছড়িয়ে পড়ে—ভারত (রুশদি), জার্মানি (গ্রাস), ইংল্যান্ড (কার্টার), পর্তুগাল (সারামাগো), যুক্তরাষ্ট্র (মরিসন), জাপান (মুরাকামি), চীন (মো ইয়ান), নাইজেরিয়া (বেন ওকরি), সোমালিয়া (নুরুদ্দিন ফারাহ), মোজাম্বিক (মিয়া কুতু)—এমন আরও বহু দেশে। এটি তথাকথিত প্রান্ত থেকে তথাকথিত কেন্দ্রে যায়, এবং তারপর দু’জায়গাকেই সমানভাবে আচ্ছন্ন করে। আজ ম্যাজিক রিয়ালিজম এত বৈচিত্র্যময় ও সর্বব্যাপী যে একাডেমিক পরিসরে এই নামটির ব্যবহার ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে। যাঁদের লেখা এই ধারার অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়—উপরের অনেক লেখকই—তাঁরা এই শব্দটিকে হ্রাসকারী বলে আপত্তি তোলেন। এই উদ্বেগ আমাদের আবার সেই প্রথম প্রশ্নে ফিরিয়ে আনে: ঘরানা-ভিত্তিক বিপণনের লেবেল কি বইয়ের স্বাতন্ত্র্যকে খাটো করে দেয় না, সেগুলোকে কিটশে পরিণত করে না?

তবে আমি একটু দ্বিধার সঙ্গে পাল্টা যুক্তি দিতে চাই—এই কথাটা কি কেবল তখনই সত্য নয়, যদি আমরা ম্যাজিক রিয়ালিজমকে কোনো জমাটবদ্ধ, স্থির বস্তু হিসেবে ভাবি? যদি আমরা একে নির্দিষ্ট সময়, স্থান আর বৈশিষ্ট্যে আটকে থাকা কোনো প্যাস্টিশ হিসেবে দেখি? আর যদি না দেখি, বরং উপন্যাসের ইতিহাসে এক চলমান বৈশ্বিক বিকাশ হিসেবে ধরি—তাহলে কী হয়? এই বিতর্কের মধ্যেই এসে পড়ে ‘বিউটি ইজ আ উন্ড’ একা কুর্নিয়াওয়ানের প্রথম উপন্যাস, যা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।

কুর্নিয়াওয়ান একজন তরুণ লেখক—বয়স ৩৯—জন্ম পশ্চিম জাভায়। তিনি দুটি উপন্যাস লিখেছেন (দ্বিতীয়টি Man Tiger, সদ্য ভার্সো থেকে অনুবাদে প্রকাশিত), দুটি গল্পসংকলন, আর ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক প্রামোদ্য অনন্ত তোরকে নিয়ে একটি বই। প্রামোদ্যও জাভারই মানুষ।

২০১৩ সালে, মো ইয়ান নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর, বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন New Left Review–তে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি প্রশ্ন করেন—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো লেখক কেন কখনো নোবেল পাননি? ইন্দোনেশিয়ান সাহিত্যের স্বল্প আধুনিক ইতিহাস জুড়ে—ইন্দোনেশিয়ান ভাষা ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ভাষা হয়—প্রামোদ্যই ছিলেন দেশের চিরস্থায়ী প্রার্থী। আর এখন, সমালোচক, প্রচারলেখক ও অনুবাদকদের (অ্যান্ডারসনসহ) মতে প্রামোদ্যের একজন সাহিত্যিক উত্তরসূরি এসে গেছে—এই দাবিটাই কুর্নিয়াওয়ানের ইংরেজি অভিষেকের সঙ্গে জুড়ে থাকা প্রায় সর্বব্যাপী শিরোনাম হয়ে উঠেছে।

এইভাবেই কুর্নিয়াওয়ানের উপন্যাসের ওপর ভাসছে বৈশ্বিক যুগের দুটি দ্বিমাত্রিক রেজিস্টার—বিশ্বজনীন ও জাতীয়। উপন্যাসের কিছু বৈশিষ্ট্য একদিকে ঝোঁকে, কিছু অন্যদিকে; কিন্তু সুর দু’টোকেই উড়িয়ে নিয়ে যায়। অনুবাদটি চমৎকার—অথবা অন্তত তাই মনে হয়, যেমন ভালো অনুবাদগুলো রহস্যময়ভাবে মনে হয়। আমি ইন্দোনেশিয়ান পড়ি না। তবু অনুবাদটি সামান্য এক বিদেশি গন্ধ ধরে রাখে—যা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে উপন্যাসের অদ্ভুত, প্রায়ই অশ্লীল শারীরিকতায়। এক চরিত্র মৃত থেকে ফিরে এসে বিশাল এক ভোজ খায় এবং “তার পাছা থেকে গম্ভীর শব্দ” বের হয়। বর্ষাকালে যৌনতার ঘনত্ব তৈরি করে “অনেক ছোট ছোট ভ্রূণ।” আর এমন উপমাও সম্ভব হয়—“সে ছিল একেবারে নাভির মতো।”

গল্পগুলো জুড়তে জুড়তে এমন মনে হয়, যেন উপন্যাসটি কোনো একক লেখকের দ্বারা চালিত নয়, বরং ভ্রমণরত গল্পকথকদের এক বহুস্বরিক দল দ্বারা—মঞ্চের পেছনে শব্দ-প্রভাবের লোকজন, যারা বারবার বিশাল পাদ-লিভার টেনে নামাচ্ছে।

এ কারণে প্রধান সুরটি হলো হালকাভাব। এই হালকাভাব স্থানীয় লোকরসের প্রতি যেমন বিশ্বস্ত, তেমনি বোকাচ্চোর ডেকামেরন বা আরব্য রজনী–র মতো মহাকাব্যিক কল্পজগতের প্রতিও। এখানেও, সেই পুরনো বিশ্ব-ঐতিহাসিক কাহিনিগুলোর মতো, গল্পের ভেতরে গল্প ঢুকে যায়, একে অন্যের ভেতর থেকে জন্ম নেয়। কাহিনি হয়ে ওঠে চাকার ভেতর চাকা—যেগুলো একে অপরের পাশ দিয়ে যায়, একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলে, গ্রাস করে।

এটাই উপন্যাসের আরেক ধরনের হালকাভাব—গল্পকথকের ব্যস্ত, উদ্ভাবনী উচ্ছ্বাস। এক ধরনের অনায়াস দ্রুততা পুরো বই জুড়ে থাকে। গল্প বলা এখানে শুধু বিষয় নয়, শৈলীও: “তাই এক রাতে…”, কিংবা “এখন শোনো একটুখানি প্রেমের গল্প…”, কিংবা “এটা ছিল বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি।” এই সহজ সূচনা থেকেই ম্যাজিক রিয়ালিজমের দৃশ্যগুলো গড়িয়ে পড়ে—একটি শহর, একটি পরিবারের বংশলতিকা, একটি দেশের ইতিহাস—One Hundred Years of Solitude–এর স্বীকৃত রেসিপি এখানে ঢুকে পড়ে এক প্রসারিত-সংকুচিত, দ্বন্দ্বমূলক ম্যাজিক রিয়ালিস্ট ভঙ্গিতে।

গল্পের কাঠামো—এর সবচেয়ে বড়, সার্কাস-সাইজ চাকা—শুরু হয় পতিতা দেউই আয়ুর মৃত থেকে জেগে ওঠার মাধ্যমে : “মে মাসের এক ছুটির বিকেলে, একুশ বছর মৃত থাকার পর দেউই আয়ু তার কবর থেকে উঠে দাঁড়াল।”
সে বাড়ি হাঁটে এবং পাদ দেয়।

এরপর গল্পটি পেছনে লাফ দেয়—দেউই আয়ুর পরিবারের ইতিহাস ও ইন্দোনেশিয়ার আধুনিক ইতিহাস, দুটোই একসঙ্গে অনুসরণ করতে থাকে। এটি হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক উপন্যাস—যে ঘরানাটি, ফকনারের প্রতি দূরবর্তী এক সম্মতি জানিয়ে বলা যায়, ম্যাজিক রিয়ালিজমের জ্বরগ্রস্ত গল্প বলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ইতিহাস চরিত্রদের ঢেকে ফেলে, কিংবা চরিত্ররাই ইতিহাসকে ঢেকে ফেলে—এখানে এমন নয় যে, অনেক ঐতিহাসিক উপন্যাসের মতো, একটিকে অন্যটির উদ্দেশ্যে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

উপন্যাসটি ইতিহাসকে অঙ্কন করে ডাচ উপনিবেশবাদ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি দখল, এক সংক্ষিপ্ত কমিউনিস্ট মুহূর্ত, কমিউনিজমের নিষ্ঠুর দমন, এবং উত্তর-আধুনিক পর্যটন শিল্পের বিকাশের মধ্য দিয়ে।

‘বিউটি ইজ আ উন্ড’–এর জন্য ট্রিগার ওয়ার্নিংয়ের পুরো এক বহর দরকার—এতে আছে অসংখ্য গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, মৃত্যু আর আত্মহত্যা। তবু সবকিছুই বহন করা হয় একই কৌতূহলোদ্দীপক, দ্রুতগতির হালকাভাবের সঙ্গে। কাহিনি ছুটে চলে; ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি কোথাও থিতু হয় না, কখনো ভারী হয়ে ওঠে না। বইটির পিছনের মলাটে গোগোলের উল্লেখ একেবারে যথার্থ। এই হালকাভাবই এর সবচেয়ে গোগোলীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। চরিত্ররা গভীর যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়, কিন্তু লেখক যেন ইতিমধ্যেই সামনে এগিয়ে গেছেন—উপরে বসে পরের গল্প সাজাতে।

কুর্নিয়াওয়ান রূপান্তর নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন। তিনি এক সুতো টেনে নিয়ে যাওয়ার ভান করেন, তারপর হঠাৎ উপন্যাসকে নতুন ভূখণ্ডে ঘুরিয়ে দেন। বইয়ের শুরু অনেক সময় জোরালো হয়, শেষও অতিরিক্ত গুছানো। এই উপন্যাস হয়তো দু’দিকেই কিছুটা দোষী। কিন্তু বই আসলে তাদের মাঝখানের অংশেই বেশি করে বাঁচে। আর ‘বিউটি ইজ আ উন্ড’ তার মাঝখানটা এমন চমৎকার, উদ্ভাবনী আর পূর্ণভাবে গড়ে তোলে যে, শেষটা ঠিকঠাক গাঁটছড়া বাঁধল কি না—সে বিষয়ে আগ্রহই হারিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত—উপসংহার পর্যন্ত। শেষ পর্বটি গোয়েন্দা কাহিনি বা হিচকক সিনেমার ঐক্যবদ্ধ আকাঙ্ক্ষায় স্পন্দিত হয়। হঠাৎ করেই সবকিছু জোড়া লাগতে শুরু করে। আলগা সুতো থেকে জন্ম নেয় পেছনের গল্প। বইয়ের শুরুতে থাকা এক পার্শ্বচরিত্র ভূত হয়ে ফিরে আসে, যে প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেছে (আবারও গোগোল)। বইটি তার দুইটি শাসক ভাবনা স্বীকার করে—সৌন্দর্য এক অভিশাপ, আর উপনিবেশবাদও এক অভিশাপ। হয়তো খুব গুছানো। কিন্তু স্তরবহুলও। ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক বিষয় এক হয়ে যায়, আর পুরো উপন্যাসের ওপর একটি ছায়া ফিরে পড়ে—এমন এক শেষ, যা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।

ম্যাজিক রিয়ালিজম থেকে কুর্নিয়াওয়ানের বই কী পায়? অথবা বইটি ম্যাজিক রিয়ালিজমকে কী দেয়? অন্তত ইংরেজি পাঠকের কাছে এটি এক নতুন স্থানীয় সংকর রূপ—ইন্দোনেশিয়ান লোকশিল্পের সঙ্গে এক বৈশ্বিক শৈলীর মিশ্রণ। মানচিত্রে আরেকটি দাগ। এটি আমাদের আরও স্পষ্টভাবে দেখায়—বিশ্বজোড়া এক নক্ষত্রমণ্ডল কীভাবে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে; সাহিত্যরূপগুলো কীভাবে ভ্রমণ করে, আমদানি-রপ্তানি হয়, ভিড়ে যায়, আত্মস্থ হয়, আর জটিলতা অর্জন করে—এক এমন সময়ে, যখন পুঁজির জন্য সীমান্ত খুলে যায়, মানুষের জন্য বন্ধ হয়, আর ধারণার ক্ষেত্রে আরও অস্পষ্ট কিছু ঘটে।

বইটির ক্ষেত্রে এই রূপ রাজনৈতিক রূপককে সম্ভব করে তোলে—ইতিহাসের আক্ষরিক ভূতুড়ে উপস্থিতি। আমি বলতে চাই, এটি বইটিকে রূপ দেয়। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এটি ম্যাজিক রিয়ালিজমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাজটি করে: সাহিত্য-ইতিহাসের সর্বত্র থেকে প্রভাব নিয়ে দেখায়, কীভাবে সেই প্রভাবগুলোর মধ্যেই ছিল লেখার ও ভাবনার এক নতুন পথের সম্ভাবনা।
বোর্হেস তাঁর “Kafka and His Precursors” প্রবন্ধে লিখেছেন—লেখকেরা নিজেদের ঐতিহ্য নিজেরাই নির্মাণ করেন। এর ফলে এক দ্বিমুখী দর্পণ তৈরি হয়—অতীতের লেখকেরা বর্তমানের লেখায় মিশে যান, আবার বর্তমানের লেখকেরা অতীতকে পড়ার নতুন উপায় তৈরি করেন।

এখানে আমরা কুর্নিয়াওয়ানকে পাই—ইংরেজি অনুবাদে খুব কম দেখা যায় এমন এক স্থান থেকে উঠে আসা এক নতুন নক্ষত্র—যিনি শুধু তাঁর প্রধান চরিত্রকেই নয়, গোগোল, বোকাচ্চো, চসার, গার্সিয়া মার্কেস, মেলভিলকেও যেন পুনর্জীবিত করেন।
“মে মাসের এক ছুটির বিকেলে…”

---------------------------
উইলিয়াম হ্যারিস Full Stop–এর কলাম লেখেন। তিনি Los Angeles Review of Books, 3:AM এবং The Point–এও লিখেছেন। তিনি মিনিয়াপোলিসে থাকেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ