কথাসাহিত্যিক ও গবেষক আবুল কাসেম ১৯৫৫ সালের ১ জুলাই কুমিল্লা জেলার সদর উপজেলার ঝাঁকুনি-পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন শেষে সরকারি কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীকালে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে প্রবেশ করেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। তখন থেকে দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণাপ্রবন্ধ, ছোটগল্প, সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়ে আসছে। কথাসাহিত্যে তাঁর বিচরণ বেশি। সেখানে তিনি অতীত ইতিহাসের অমীয় উপাদানের সন্ধান করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন ইতিহাস-আশ্রয়ী বাংলা সাহিত্যকে। ক্যাপ্টেন কক্স, অজেয় এবং সরহপা সেই ধরনের উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কিছু বই রয়েছে তাঁর। মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা, মুক্তিযুদ্ধে জয়পুরহাট ছাড়াও রয়েছে মুক্তির মন্দির সোপানতলের মতো হৃদয়স্পর্শীর মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বই। ইতিহাস বইগুলো আঞ্চলিক ও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে। তাঁর গবেষণাপ্রবন্ধে সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের একটি বিশেষ ধারার গভীরতর চিন্তাধর্মী বিষয়গুলো যেমন—অস্তিত্ববাদ, পরাবাস্তববাদ, চেতনাপ্রবাহরীতি, অ্যাবসার্ডিটি প্রাধান্য পেয়েছে। চা শিল্পের ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। বাংলা ভাষায় তা শুধু ব্যতিক্রমই নয়, অনন্য সাধারণও। তাঁর চা শিল্পের ইতিহাস কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশটিরও বেশি। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে তাঁকে এই সাক্ষাৎকারের প্রশ্নগুলো পাঠানো হয়। তিনি লিখিত উত্তর দিয়েছেন।
গল্পপাঠ :
শুরুতেই জানতে চাই, আপনি কেমন আছেন?
আবুল কাসেম :
পাঁচ-ছয় রকমের বনেদী রোগ নিয়ে ভালোই আছি।
গল্পপাঠ :
লেখালেখিটা কীভাবে শুরু হয়েছিল? কীসে আপনাকে লেখালেখির প্রতি অনুপ্রাণিত করেছিল?
আবুল কাসেম :
সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল ছোটবেলা থেকেই। স্কুলে সাহিত্যের অলংকরণযুক্ত কথা বলতাম আমি। তাই ছাত্র-শিক্ষকরা আমাকে ‘সাহিত্যিক’ বলতেন। বাংলার শিক্ষক শিশুরঞ্জন সিংহ এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি এসএসসির টেস্টের পর বিনে পয়সায় আমাকে তাঁর কোচিং সেন্টারে যেতে ‘বাধ্য’ করেছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত আমি কোনো লেখালেখি করিনি। তবে প্রচুর বই পড়েছি। বনফুলের ‘মধুসূদন’ নাটক পড়ে কেঁদেছি। মশারফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধ’ পড়ে দুঃখবোধের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার উচ্ছ্বাসে প্রাণিত বোধ করেছি।
লেখালেখিটা শুরু করেছিলাম প্রবন্ধ এবং গবেষণা দিয়ে। আর তা ছিল অ্যাবসার্ড নাটক, অস্তিত্ববাদী দর্শনভিত্তিক দেশ-বিদেশের সাহিত্য, যাতে সংশ্লেষ ছিল পরাবাস্তববাদ, চেতনাপ্রবাহ রীতি প্রভৃতির। আশি-নব্বই দশকের কবি-সাহিত্যিকেরা এসব লেখা পছন্দ করতেন। বিশেষ করে কবি আহসান হাবীব আমাকে তাঁর সম্পাদিত দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় লিখতে উৎসাহিত করতেন। দাউদ হায়দার আমার লেখা খুব পছন্দ করতেন। জার্মানি থেকে দৈনিক বাংলায় আমার প্রকাশিত লেখার ওপর উৎসাহ-ব্যঞ্জক মতামত দিতেন। সবচেয়ে বেশি উৎসাহ পেয়েছি নাট্যকার সাঈদ আহমেদের কাছ থেকে। তিনি নানাভাবে আমার লেখার, বিশেষ করে অ্যাবসার্ড নাটক নিয়ে লেখাগুলো যেমন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যসমালোচনায় তুলে ধরেছেন, তেমনি তাঁর ভাই নাজির আহমদের কল্যাণে বিবিসতে পর্যন্ত প্রচার পেয়েছে।
আরেকজনকে আমার সমালোচনামূলক লেখাগুলো নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে শুনেছি, তিনি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ। আমি যখন সরকারি কলেজের শিক্ষকতা ছেড়ে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে যাচ্ছি, আজিজ সুপার মার্কেটে বলেছিলেন, কাসেম ভাই, আপনি সিভিল সার্ভিসে যাবেন না, আমাদের সমালোচনা সাহিত্যের জন্য আপনাকে খুব প্রয়োজন। আরো অনেকে নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছেন।
গল্পপাঠ :
পড়ালেখা করছেন বাংলা সাহিত্যে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি আপনার ঝোঁক। এই ঝোঁক কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
আবুল কাসেম :
সিভিল সার্ভিসে এসে সত্যিই সাহিত্য হারিয়ে গেল। ইউএনও পর্যায়ে একবার আমি ওএসডি হয়ে গেলাম। তখন মনে হলো পিএইচডিটা করে ফেলি। তখন কক্সবাজারে ছিলাম। বিষয় বেছে নিলাম ‘ম্যান মেইড ডিজাস্টার : অ্যাডমিনি স্ট্রেটিভ আসপ্যাক্ট।’ ক্ষেত্রটা ছিল ক্যাপ্টেন কক্সের রাখাইন পুনর্বাসন। একটি সারাংশ তৈরি করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্টেশন ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের কাছে লেখাটি দিয়ে অপেক্ষা করি। তিনি কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে বললেন, আপনি সাহিত্যের ছাত্র, সাহিত্যের গবেষণা না করে কেন আমাদের এখানে এসেছেন? আমি বললাম, দেখুন, আমি এখন জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা। আমার উচ্চতর গবেষণা এখানেই হওয়া উচিত। আমি এখানে চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছি। তিনি কোনোভাবেই রাজি হলেন না রেজিস্ট্রেশন দিতে। আমি মন খারাপ করে রাইটআপটা নিয়ে চলে এলাম। আসার সময় বললাম আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হলে দিতেন, তার নজিরও আছে। বৈষম্যটা দুর্ভাগ্যজনক।
গবেষণাটি করার জন্য যে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলাম, স্থির করলাম তা দিয়ে ‘ক্যাপ্টেন কক্স’ নামে একটি উপন্যাস লিখব। সত্যিই আমার সৃজনশীল সাহিত্যের সূচনা হলো এই উপন্যাস দিয়ে। সাঈদ আহমেদ ‘ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি, লন্ডন’ থেকে পেন্সিল দিয়ে হার্ডসনের ‘বেঙ্গল আর্মির’ ক্যাপ্টেন কক্স’ অংশটি লিখে নিয়ে এসেছিলেন দুদিন ওভারস্টে করে। উপন্যাসটি পাঠক পছন্দ করেছিলেন। দুটি প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। এর ইংরেজি অনুবাদ পড়ে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী চমৎকার মতামত দিয়েছিলেন।
পরে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার প্রবণতা তৈরি হয় একটি অনভিপ্রেত ঘটনা থেকে। কবি আবু করিম প্রশাসনের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি যখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, তখন তাঁর চাকরি চলে যায়। আমার সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বরখাস্ত হয়ে যাওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। একটি শিক্ষাও হয়েছিল। আমলা তো, ল্যাং মারার মানুষের অভাব নেই। তাই মৃত মানুষের কাহিনি নিয়ে উপন্যাস লেখায় মনোযোগী হই। তারই ফল হিসেবে নেতিজিকে নিয়ে ‘অজেয়’, চর্যাপদের কবি সরহপাকে নিয়ে ‘সরহপা’, অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে ‘অতীশ’, মহাভারতের কাহিনি নিয়ে ‘অনার্যজন’, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘পূর্ব দিগন্তে’ এবং ‘সেদিন সেই আমেরিকায়’ প্রভৃতি উপন্যাস লিখি।
গল্পপাঠ :
আপনার লেখা মৌর্য বড় কলেবরের ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস। ইতিহাসের এই বিষয়টিকে নিয়ে উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা কীভাবে মাথায় এসেছিল?
আবুল কাসেম :
প্রাচীন বঙ্গে শিক্ষা নিয়ে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তিন পর্বের একটি বক্তৃতা করি। প্রাচীন বঙ্গ এবং প্রাচীন ভারত নিয়ে আমার বেশ কিছু লেখালেখি আছে। জৈন পর্বের ওপর প্রবন্ধটা পড়ি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখাটি তৈরি করতে গিয়ে আচার্য ভদ্রবাহু সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়। তিনি ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আধ্যাত্মিক গুরু এবং জৈন ধর্মের শ্রুতকেবলী। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘কল্পসূত্র’ পড়ে অভিভূত হই। আজকে টেস্টটিউব বেবির কথা আমার সবাই জানি। এরকম ভাবে জন্ম নেওয়া জৈন মহাবীরের কথা এই কাব্যগ্রন্থে আছে। ভাবা যায়? মহাকাশ বিজ্ঞান এবং সময় সম্পর্কে যেসব কথা আছে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের তাঁর লেখায়, তা আমাদের না ভাবিয়ে পারে না। এরকম একজন কালোত্তীর্ণ চিন্তাশীল ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল পুণ্ড্রবর্ধনে। মৌর্য উপন্যাসটি লেখার প্রাথমিক প্রেরণা ছিলেন তিনি। ইতিহাসটা এসেছে তাঁর সময়ের অন্যান্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের হাত ধরে। এক্ষেত্রে উপন্যাস ইতিহাসের ঘটনা-কাহিনির চাইতে বিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর শিল্পিক নির্মাণ বেশি আশা করে।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি লেখার আগে কি আপনি উপন্যাসের পটভূমি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, নাকি শুধু ইতিাসের বইপত্রের ওপর ভিত্তি করে সব ঘটনা ও চরিত্র কল্পনায় সাজিয়েছেন?
আবুল কাসেম :
প্রচুর বই পড়েছি উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, গ্রিক ও ভারতীয় ইতিহাস, মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’সহ নানা সমকালীন বই। পুণ্ড্রবর্ধনে গেছি আমি, ইউটিউবে দেখেছি পটভূমির দর্শনীয় স্থানগুলো। বার বার দেখেছি।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি লিখতে কত দিন লেগেছিল?
আবুল কাসেম :
আমি ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস লেখার আগে গবেষণা করি। তারপর পরিকল্পনা মতো লেখা শুরু করি। এই উপন্যাস লিখতে প্রায় আড়াই বছর সময় লেগেছে। তবে ভারত থেকে প্রকাশিত ‘মসনদ’ উপন্যাসটি লিখতে সময় লেগেছে তিন বছর। বইটি প্রায় সাড়ে আট শ পৃষ্ঠার রয়েল সাইজের।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি কি একবারেই লিখেছিলেন, নাকি লেখার পর বারবার এডিট করেছিলেন?
আবুল কাসেম :
না, আমার বইগুলো গবেষণালব্ধ বলে একবারেই লেখা সম্ভব হয়। সময় ও পরিকল্পনা সংযোগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি প্রকাশের পর পাঠকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? কেমন সাড়া পেয়েছিলেন?
আবুল কাসেম :
বাংলাদেশে এবং ভারতে বইটির পাঁচটি প্রকাশনা উৎসব হয়েছে। বইটির প্রকাশক ‘অন্যপ্রকাশ’ শুধু ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের উদ্যোগে, বঙ্গবভনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এবং ভারতে রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রমঞ্চে ভারতীয় প্রকাশকের উদ্যোগে প্রকাশন উৎসব অনুষ্টিত হয়। অনুষ্ঠানে শঙ্খ ঘোষসহ ভারতের খ্যাতিমান লেখকরা উপস্থিত ছিলেন। শঙ্খ ঘোষ তখন কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু বইটি পড়ে এসেছিলেন। অতিথিদের বসার জায়গায় আমার হাত চেপে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। কেন কেঁদেছেন তা আমি জানি না।
ভারত এবং বাংলাদেশ মিলে তখন বইটির দুই বছরে এগারোটি মুদ্রণ হয়েছিল। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ফোনে কথা বলে ‘মতামত ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ভারত এবং রাজশাহীতে দেয়া সম্মাননা কখনো ভোলা সম্ভব নয়। প্রচুর লেখালেখিও হয়েছে বইটি নিয়ে। হাসান আজিজুল হক এবং আরও অনেকে লিখেছেন বড় বড় আর্টিক্যাল। বইটির প্রকাশনা সংস্থার সত্ত্বাধিকারী ত্রিদিব চক্রবর্তী বইটির বিক্রয় সাফল্যে এতটাই উচ্ছ্বসিত হন যে, ঢাকায় এসে আমাকে এরকম আরেকটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার অনুরোধ করেন। তাঁর অনুরোধে বৃহৎ কলেবরের উপন্যাস ‘মসনদ’ লেখা হয়।
গল্পপাঠ :
দীর্ঘ দিন সরকারি চাকরি করেছেন। চাকরি করতে গিয়ে লেখালেখিতে কি কোনো সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল? হলে কী ধরনের সংকট?
আবুল কাসেম :
না, হয়নি। আমি আগেই সতর্ক ছিলাম। ‘গেঞ্জি’ উপন্যাস লেখার জন্য সম্রাট নাজেহাল করেছিলেন মুরাসাকিকে, সেকথা আমি জানতাম।
গল্পপাঠ :
একাদশ শতকের প্রথম দশকে জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির যুগে মূল অবদান রাখা চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে আপনি লিখেছেন উপন্যাস ‘শিকিবু।’ এই উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা কীভাবে মাথায় এসেছিল? আর বিশ্বসাহিত্যের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি।’ এর লেখিকা মুরাসাকি শিকিবু আছেন ‘শিকিবু’উপন্যাসের কেন্দ্রে। আরও আছেন-কবি আকাঝুমি ইমন, যুগের শ্রেষ্ঠ কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত ‘দ্য পিলুবুক’ রচয়িতা সেইশোনাগণের। এসব চরিত্র সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত আপনি কীভাবে সংগ্রহ করেছিলেন?
আবুল কাসেম :
২০১৩ সালে আমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (এখন এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান একজন প্রতিমন্ত্রী) ছিলাম। এ সময় জাপান সরকারের অর্থায়নে আড়াই মাসের জন্য জাপানে যাই। উদ্দেশ্য, ‘ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টম্যান্টে’ ধারনা লাভ। প্রথমেই আমাদের নিয়ে যাওযা হয় কিয়োটোতে। কিয়োটো জাপানের খুবই প্রাচীন নগরী। কালিদাস এবং রবীন্দ্রনাথের সে উজ্জ্বয়নীর মতো। এখনো বাড়িঘরগুলো প্রাচীন জাপানকে ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে জাপানকে ধ্বংস করে দেওয়া হলোও জাপানের এই আধ্যাত্মিক নগরীতে মিত্রশক্তি একটি বোমাও ফেলেনি। জানা যায়, মিত্রশক্তির একটি দেশের সামরিক সচিব যুদ্ধের আগে পবিত্র নগরীটি ভ্রমণ করে গেছেন। তার প্রভাবের কারণেই তা অক্ষত ছিল এবং এখনও আছে। এই কিয়োটায় গিয়েই জানতে পারি খুব কাছেই ‘গেঞ্জি মিউজিয়াম’ রয়েছে এবং গাইড বললেন আজ বিকেলেই আমাদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি ছাত্রাবস্থায় মুরাসাকি শিকিবুর ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ উপন্যাসের কথা জানতাম। বলা হয় এটি বিশ্বসাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। বেশ আগ্রহ নিয়ে আমরা বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০/২২জন সিনিয়র কর্মকর্তা মিউজিয়াম দেখতে যাই। বলাদরকার আমরা সবাই একই উদ্দেশ্যে জাপানে যাই। এসব কর্মকর্তাকে জাপানের বিখ্যাত জায়গাগুলো ঘুরিয়ে দেখানোর রেওয়াজ রয়েছে।
জাপানিরা ঐতিহ্য-সচেতন। উজিন নদীর অপর পাড়ে গেঞ্জি মিউজিয়াম অবস্থিত। মুরাসাকি উপন্যাসটির শেষ দশ অধ্যায় লিখেছেন উজি সিটির পটভূমিতে। তাই এখানে গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম। শুধু শেষের দশ অধ্যায় নয়, এগার শ পৃষ্ঠার পুরো উপন্যাসটি মিউজিয়াম-শিল্পে রূপায়িত করেছে আধুনিক বিশ্বের অর্থ ও শিল্প-প্রযুক্তিতে অগ্রসর জাপানিরা। হেইয়ান সাম্রাজ্যের আভিজাত্য ফুটে আছে সর্বত্র। মিউজিয়াম থেকে ফিরে উপন্যাসটি পাঠের সুযোগ হয়। মূলটি পড়বার উপায় নেই। একাদশ শতকের ভাষা আধুনিক জাপানিদের কাছেও দুর্বোধ্য বলে উনিশ শতকে এক জাপানি মহিলা আধুনিক জাপানিতে তা অনুবাদ করেন। এই ভাষার উপন্যাসই ইংরেজি ভাষায় অনূদিত, যা বিদেশিদের পড়তে হয়। উপন্যাসটি সম্পর্কে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া কাওয়াবাতা তাঁর নোবেল বক্তৃতায় বলেন, ‘গেঞ্জি উপন্যাস জাপানি সাহিত্যের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করেছে আছে। আমাদের আজকের দিনেও এমন কোনো উপন্যাস নেই, যার সঙ্গে এর তুলনা চলে। আমার কাছে খুবই অলৌকিক মনে হয়। একাদশ শতকে এমন একটি আধুনিক সাহিত্য রচিত হয়েছে।’
যে কোনো বিচারেই জাপানি উপন্যাস বিশ্বমানের। তাই জাপান থেকে ফিরে এসেও আমার জাপানি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত থাকে। প্রথমে মুরাসাকিকে নিয়ে একটি গল্প লিখি, পরে একটি গবেষণা প্রবন্ধ। কাওয়াবাতা, মিশিমা, আবেকোবো, ক্যানজাব্যুরো ওয়ে, ইশিগুরু এবং হারুকি মুরাকামিকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছি আমি। প্রবন্ধগুলো নিয়ে বই বের করেছে ‘বেঙ্গল পাবলিকেশন্স।’ মিশিমাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছি, নাম ‘মিশিমার সুইসাইড নোট।’
এবারে আসি একাদশ শতকের গৌরবোজ্জ্বল হেইয়ান সম্রাটদের আমলের চার কবি ও ঔপন্যাসিক প্রসঙ্গে, যাদের নিয়ে আমি ‘শিকিবু’ উপন্যাস লিখেছি। মুরাসাকি সম্পর্কে আগেই ধারণা ছিল। তিনি নিজে ডায়েরি লিখতেন। তার সম্পর্কে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে এত লেখালেখি হয়েছে এবং এখনো এত লেখালেখি হচ্ছে যে, শুধু তাকে নিয়েই বিশাল উপন্যাস লেখা সম্ভব। চারজনের মধ্যে ইজোমি শিকিবুও ডায়েরি লিখতেন। মুরাসাকির ডায়েরিতে অপর তিনজনের কথা আছে। এরা একে অন্যের সমসাময়িক। সম্রাজ্ঞীর দরবারে লেডি-ইন ওয়েটিং ছিলেন। তাদের সাহিত্য-কবিতা নিয়ে পাশ্চাত্যে সব বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ-সিলেবাস রয়েছে। তাই এঁদের সম্পর্কে পাওয়া যাবে অজস্র তথ্য। তাদের একের অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের পারদটা ওঠানামা করত সম্রাটের দুই সম্রাজ্ঞী, প্রধান উজির এবং সম্রাটের মাতার এবং সম্রাটের ভূমিকার ওপর। সম্পর্কের স্বাভাবিক দিক : ঈর্ষা, বন্ধুত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব প্রভৃতি নারীর স্বভাব সুলভ ব্যাপারগুলো সম্রাজ্ঞী এবং সম্রাটের দরবারে কিংবা মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব চরিত্রগুলোয় নানা মাত্রা যুক্ত করেছে, যা শাশ্বত এবং সর্বকালের। তবে মুরাসাকির কবি-প্রতিভা ও উপন্যাসের পূর্বধারনা না থাকা সত্ত্বেও কালোত্তীর্ণ উপন্যাস লেখা, ইজোমির সমসাময়িক কালে সেরা কবি হয়ে ওঠা, কবি আকাঝুমি ইমনের ফরমায়েশি ঐতিহাসিক হয়ে যাওয়া এবং সেই সেইশোনাগণ আটপৌড়ে ‘দ্য পিলুবুক’ লেখা তাদের ব্যক্তিগত প্রতিভারই পরিচায়ক। মুরাসাকি এবং ইজোমির প্রেম বাস্তব ক্ষেত্রেই স্বীকৃত এবং তাদের ডায়েরিতেও প্রতিফলিত। তাঁদের জীবন, পেশা, কর্মস্থল, সাহিত্য একসাথে গাঁথা বলেই তাদের আলোচনায় এবং তাঁদের নিয়ে লেখা উপন্যাসে বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। দুই প্রশ্নের জবাব কিন্তু একসাথে দিলাম।
গল্পপাঠ :
বাঙালি লেখক আপনি, লিখেছেন বাংলা ভাষায়। ‘শিকিবু’ লিখতে গিয়ে সেই নয় শ বছর আগের জাপানকে লেখায় ধরতে গিয়ে আপনি কি সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন? কীভাবে ধরেছেন সেই সময়ের মানুষ, সেদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে? প্রক্রিয়াটা কী ছিল?
আবুল কাসেম :
কাজটা কঠিন ছিল সন্দেহ নেই। আমি যখন অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন জাপানি এক ভদ্রলোক অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাব্যতা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) যাচাইয়ের কাজ করতেন আমাদের সঙ্গে। জাপানি সাহিত্য এবং শিল্পের প্রতি আমার আগ্রহ ও জ্ঞান দেখে তিনি আমাকে নানাভাবে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। জাপানি একটি মেয়ে জাইকায় কাজ করত এবং বাংলা জানত। আমি তার সহযোগিতা পেয়েছি। দেখুন, তাদেরকে যখন জাপানি নাটক কাবুকি কিংবা মুরাসাকির গল্প বলেছি, তখনই আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। জাপানে অবস্থানকালে জাপানি টেলিভিশন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছে জাপানসহ বৈশ্বিক সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে। এরা জেনে গেছিল যে, সাঈদ আহমদের মতো এসব বিষয়ে আমার কিছু ধারণা আছে। এছাড়া অন্য ঔপন্যাসিকদের নিয়ে লেখার জন্য তো আমাকে জাপানের গভীরে প্রবেশ করতে হয়েছে।
গল্পপাঠ :
আপনার ‘অজেয়’ উপন্যাসটিও ইতিহাস-ভিত্তিক। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর কর্ম এবং অন্তর্ধানের বিশাল এক পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাস। বলা যায় এও এক বিশাল যজ্ঞ করলেন আপনি। কীভাবে সংগ্রহ করেছিলেন উপন্যাসটির রসদ?
আবুল কাসেম :
উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য সিঙ্গাপুর স্টাফ কলেজে যেতে হয় একবার। ব্রিটিশ অর্থায়নে এই প্রশিক্ষণ। সুযোগ পাওয়া বেশ কষ্টকর। আইএল টেস্টে কমপক্ষে আট নম্বর পেতে হয়। বাংলার ছাত্র আমি, বেশ কজন ইংরেজি ও অর্থনীতির ছাত্রকে ডিঙিয়ে সুযোগটা মিলল।
এক বিকেলে সিলোসো ফোর্টে বেড়াতে গিয়ে নেতাজিকে তাদের মিউজিয়ামে অবহেলায় রেখেছে দেখে মনটা হাহাকার করে উঠল। দেশপ্রেমিক নেতাজি অক্ষশক্তির সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য। ইংরেজদের এখান থেকে উৎখাত করতে হবে, সেজন্যই গঠন করা হয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি।
আমি প্রশিক্ষণের ফাঁকে ফাঁকে সিঙ্গাপুরের যুদ্ধ স্পটগুলো ভিজিট করি। সিঙ্গাপুরে পাওয়া বিশ্বযুদ্ধের সকল তথ্য-উপাত্ত, নেতাজির ভাষণ, হিটলার, তোজোসহ মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তির প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড সম্পর্কে ব্যাপক লেখাপড়া করি এবং উপন্যাসটির একটা খসড়া দাঁড় করিয়ে ফেলি। কিছুদিনের মধ্যেই কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার তৎপরতায় অ্যাডর্ন থেকে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়ে যায়।
অনেকে বইটির প্রশংসা করেন এবং আলোচনাও লেখেন। তবে কয়েক বছর পরে আমি নিজেই বিস্মিত হই যে, উপন্যাসটিতে নেতাজির বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অধ্যায়টি বাদ পড়ে গেছে, যার সঙ্গে কুমিল্লা অভয় আশ্রম, এমনকি আমাদের অভয় আশ্রম সংলগ্ন বাড়ির একটি ঘটনাও বাদ পড়ে যায়। সবচেয়ে বড় সর্বনাশ হয়েছে জহরলাল নেহেরুর চরিত্র চিত্রণে। উপন্যাসে তার ভিলেন হওয়ার কথা, অথচ হয়ে গেছেন মহৎ চরিত্র। সিঙ্গাপুরে বসে উপন্যাসটি লেখায় প্রোব্রিটিশ ইনফরমেশন বেশি ঢুকে গেছে। আমি লজ্জিত যে সে সময়ে বিষয়গুলো যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না।
এখন আমি নেতাজির বিপ্লবী তৎপরতা এবং নেতাজি ও ভারতবর্ষের ইতিহাসে জহরলাল নেহেরুর স্থান কোথায় হওয়া উচিত, এসব বিষয়গুলো রিরাইট করে প্রকাশককে দিয়েছি। পরিবর্ধিত সংস্করণ হিসেবে ছাপতে। বইটি এখন ছাপার জন্য প্রস্তুত। কলেবর বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বইটিও পেয়েছে পূর্ণাঙ্গ একটি রূপ। ভারত ও বাংলাদেশের পাঠকেরা নিশ্চয়ই এখন পরিতৃপ্ত বোধ করবেন আশা করি।
গল্পপাঠ :
আপনি লিখেছেন মহাভারত-কেন্দ্রিক উপন্যাস ‘অনার্যজন’। মহাভারতীয় যুগে অনার্য রাজা এবং অনার্য জনগোষ্ঠীর পরিচয় রয়েছে এই উপন্যাসে। মহাভারতে এরা পরাজিত শক্তি। তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাই পরিব্যাপ্ত সর্বত্র। আপনি প্রশ্ন তুলেছেন, এরা কি সত্যিকার অর্থেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা অবহেলার পাত্র? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই লিখেছেন এই উপন্যাস। উত্তর কি আপনি যথাযথভাবে পেয়েছিলেন? উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আপনি মহাভারতের কোন সংস্করণটি পড়েছিলেন?
আবুল কাসেম :
মহাভারতের গল্পে সন্দেহ নেই মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবের পাণ্ডবদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ছিল। কবি আর্যদের মহান করে তুলতে গিয়ে কৌরব এবং তাদের অনার্য মিত্রদের প্রতি সুবিচার করেননি। অনার্যদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, ঘৃণা মহাভারতে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ অনার্য হয়েও অনার্যদের বিরুদ্ধে পাণ্ডবদের পক্ষে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং যুদ্ধের আগেই অনার্য রাজা শিশুপালকে যুদ্ধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠানে হত্যা করেন। পুণ্ড্রবর্ধনের অনার্য রাজা পৌন্ড্রক বাসুদেবকে শ্রীকৃষ্ণ এবং পাণ্ডব মহাবীর বলে খ্যাত ভীম পুণ্ড্রাসুরের যজ্ঞাগারে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় হত্যা করেন। রামায়ণে মেঘনাদকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার মতোই। এ যেন বীরত্বে বা যুদ্ধক্ষেত্রে না গিয়ে কাপুরুষের মতো ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’র প্রতিধ্বনি। কিন্তু মহাভারতের যুদ্ধে কৌরব এবং অনার্য রাজাদের বীরত্বই ছিল মহাকাব্যিক, সে কথাটাই ‘অনার্যজন উপন্যাসে বলতে চেয়েছি আমি।
উপন্যাসটি নিয়ে ভারতে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। বিপক্ষে বয়ে গেছে হিন্দুত্ববাদীদের তুমুল সমালোচনার ঝড়। তাদের গোস্বা শ্রীকৃষ্ণ, ভীম, অর্জুনদের উপন্যাসে নায়কোচিত মহৎ আসন দেয়া হয়নি। পক্ষের লোকজন বলেছেন যে, উপন্যাসটির যথার্থতা এখানে যে, কৌরব এবং পাণ্ডব যুদ্ধে অনার্যদের অবস্থানটি সঠিক অবস্থায় বর্ণনা করা আছে এবং তাই হওয়া উচিত।
এদের সমর্থনের প্রধান যুক্তি এই যে, মহাকাব্যটির শেষ পর্বে মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে দেবলোকের স্বর্গ ও নরক দর্শনে পাঠিয়েছেন। তিনি প্রথমে নরকে গিয়ে দেখলেন দ্রৌপদী এবং পাণ্ডব ভাইয়েরা নরকযন্ত্রণা ভোগ করছেন। অপরদিকে স্বর্গ ভ্রমণে গিয়ে দেখলেন কৌরব পক্ষের দুর্য্যোধনরা সূর্যের মতো আলো ছড়িয়ে বসে আছেন। ন্যায় এবং অন্যায় কর্মের ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল চিত্র। এক কথায় ভারতীয় কর্মফলবাদ।
গল্পপাঠ :
ইতিহাস-ভিত্তিক যেসব পরিশ্রমলব্দ উপন্যাস আপনি রচনা করেছেন, এসব উপন্যাস সেই অর্থে পাঠক কি গ্রহণ করেছে? অর্থাৎ এগুলো কি সন্তোষজনকভাবে পঠিত হচ্ছে? এগুলো লেখার সময় কি পাঠকের কথা আপনার মাথায় ছিল? নাকি পাঠক নয়, মাথায় ছিল বিষয়?
আবুল কাসেম :
কোনো উপন্যাসের পাঠকপ্রিয়তা নানা কারণে হতে পারে। আমাদের দেশের পাঠকেরা যথেষ্ঠ পরিণত নয়। এরা পছন্দ করে হালকা কিছু, সিরিয়াস বা ওজনদার সাহিত্যের প্রতি সঙ্গত কারণেই তারা বিমুখ। তাদেরকে ভারী ও ওজনদার সাহিত্যে টেনে তোলার দায়িত্ব কার? আমার উপন্যাস তো ইতিহাস নয়, ইতিহাস বোধের সঙ্গে জীবনের নানা দিকের উচ্চ পর্যায়ের উপস্থাপনা। ঋদ্ধ পাঠক তা যে পছন্দ করছে তার প্রমাণ আমার অন্য কোনো বইয়ের চাইতে ঐতিহাসিক উপন্যাসেরই কাটতি বেশ বেশি। এই উপন্যাসের জন্যই শঙ্খ ঘোষ কাঁদেন এবং হাসান আজিজুল হক লেখেন, ‘মৌর্য উপন্যাস আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ভারতের সুনীল থাকলে আমাকে কাসেম আছে।’ ভারতের পাঠকদের জন্য পাণ্ডুলিপি পেতে প্রকাশক ত্রিদিব বাবুরা ছুটে আসেন। বাংলাদেশে বড় উপন্যাসের পাঠক কম। ক্রয় ক্ষমতার ব্যাপারটি হয়তো এ জন্য দায়ী। কিন্তু তাই বলে কি বড় উপন্যাস লেখা হবে না? আমার এক প্রবাসী পাঠক বলেছেন বইগুলোর ইংরেজি ভার্সন প্রকাশ করুন। দুদিনেই আপনি বড়লোক তো হবেনই, বড় লেখকের স্বীকৃতিও পেয়ে যাবেন। পাশ্চাত্যের পাঠক যা চায়, আপনার উপন্যাসে যথেষ্ঠ পরিমাণে তা আছে। বাংলাদেশেও কেউ কেউ একথা বলেছেন। আমি চাই বাংলাদেশে পাঠকরা বড় বড় উপন্যাস পড়তে অভ্যস্ত হোক। আমি ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি ধারা তৈরি করেছি। ইতিহাসের সংশ্রব বা ফ্লেবার দিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস হয় না। তার গায়ে ইতিহাসের গন্ধ নয়, গঠন প্রক্রিয়ায়ও ইতিহাসের ঘটনা ও ঐতিহাসিক ব্যক্তির হাড়, রক্ত, মাংস, অস্থি, মজ্জার উপস্থিতি থাকতে হবে, যা শাশ্বতকালের মানুষের, যেখানে ব্যক্তিচরিত্র হয়ে ওঠে সর্বজনীন। মিথগুলো সর্বকালীন। আর আঙ্গিকের বিচারে, রূপকল্পে, শৈল্পিক মানদণ্ডে বইটি হয়ে ওঠে উপন্যাস। ‘দেয়াল’ লিখে জনপ্রিয়তা পাওয়া যাবে, উপন্যাস পাওয়া যাবে না।
গল্পপাঠ :
শুনেছি আপনি এখন ক্লিওপেট্টাকে নিয়ে উপন্যাস লিখছেন। লেখার মতো বাংলাদেশে তো বিস্তর বিষয় রয়েছে। ক্লিওপেট্টাকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কারণটা যদি বলতেন...
আবুল কাসেম :
উপন্যাসটি লেখা শেষ হয়েছে। এ বছরের বইমেলায় এটি যাবে। প্রকাশ করছে অন্যপ্রকাশ। ক্লিওপেট্টাকে নিয়ে উপন্যাস লিখব তা কখনো ভাবিনি। হঠাৎ করেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। ক্যাথেলিন মার্টিনেজ নামে এক ভদ্রমহিলা ২০০১ সাল থেকে ক্লিওপেট্টার অনাবিষ্কৃত সমাধি খুঁজছেন। তিনি ডোমেনিকান প্রজাতন্ত্রের বসিন্দা। আইন শাস্ত্রের অধ্যাপনা করতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমেরিকার উচ্চতর ডিগ্রিও রয়েছে। আইনবিদ বাবার গ্রন্থাগারে শেক্সপিয়ারের ‘অ্যান্টনি-ক্লিওপেট্টা’ নাটক পড়ে বাবার সঙ্গে তর্ক করেন শেক্সপিয়ার ক্লিওপেট্টা চরিত্রে অবমাননাকর বিষয়যুক্ত করেছেন বলে। তা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গেও তর্ক-বিতর্ক হয়। ক্লিওপেট্টার টানেই ২০০১ সালে প্রথম মিশরে আসেন। তাঁকে ক্লিওপেট্টার সমাধি ও মমি আবিষ্কারের নেশায় পেয়ে বসে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে মিশরে এসে অনুসন্ধান চানালাতে থাকেন নিজের পয়সায়। পরে নিজের দেশ থেকে প্রকল্প অর্থ নিয়ে এসে কাজের পরিধি বৃদ্ধি করেন। এক সময় মিশরে তার দেশের এম্বাসিতে প্রত্নতত্ত্ব ও সংস্কৃতি বিভাগ খুলে তার প্রধান হয়ে মিশরে চলে আসেন। এখন পর্যন্ত তার অনুসন্ধান চলছে। ক্লিওপেট্টার মমি বা সমাধি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।
তবে তিনি এমন কিছু আলামত পেয়েছেন, যেগুলো থেকে ধারণা করা হচ্ছে ক্লিওপেট্টার স্বামী অ্যান্টনি এবং তার সমাধি কোথায় থাকতে পারে। মাটির ঠিক ত্রিশ ফুট গভীরে। ঠিক যেন আমার টিবি রোগের মতো, জীবানু পাওয়া যায়নি, ডাক্তাররা আলামত দেখে আমাকে এই রোগের কষ্টকর ঔষুধ খাওয়াচ্ছেন।
আমি অবাক হয়েছি মার্টিনেজের অধ্যাবসায় দেখে। তখনই ক্লিওপেট্টা সম্পর্কে জানতে উৎসাহী হয়ে ওঠি। তাঁকে যত জানি ততই অবাক হই। তিনি শুধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী না, এগারোটি ভাষা জানতেন। দর্শন, চিকিৎসা শাস্ত্র এবং সাহিত্যে তার অবদান গর্ব করার মতো। ২২ বছরের মিশর শাসনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার ছিল তার প্রিয় স্থান। জুলিয়াস সিজার গ্রন্থাগারের এক তৃতীয়াংশ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাতে অনেক কষ্ট পান তিনি। স্বামী অ্যান্টনি টলেমীয়দের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করে দিচ্ছিলেন একে একে। ক্লিওপেট্টা একদিন বললেন, জেনারেল, আমি বেশি সন্তুষ্ট হতাম, যদি আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের পুড়ে যাওয়া বইগুলো সংগ্রহ করে দিতেন। শুনে অ্যান্টনি খুব হেসেছিলেন এবং বলেছিলেন, সুন্দরী নারীরা দামী গহনা, দামী পোশাক, দামী পারফিউম চায়, রানি আপনি চাইছেন বই। রানিকে খুশি করার জন্য অ্যান্টনি দুই লক্ষ বই সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন।
ক্লিওপেট্টাকে নিয়ে রোমান ঐতিহাসিকরা রোমান কবি ভার্জিল, ইংরেজ নাট্যকার শেক্সপিয়ার এবং কবি টি.এস.এলিয়ট যেসব কাল্পনিক কুৎসা রটিয়েছেন তাঁদের প্রিয় রোমান সাম্রাজ্যকে উচ্চকিত করার জন্য, তা সভ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এত দিনে মানুষ তা জেনে গেছে সত্যটা আসলে কী। মৃত্যুকালে অনুশোচনা থেকে ভার্জিল নাকি তাঁর উপস্থিত বন্ধুদের বলেছিলেন ‘ইনিড’ মহাকাব্য পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিতে। ক্লিওপেট্টার কুৎসা রটানোর পাপটা মৃত্যুপথযাত্রী কবি যেন আর বহন করতে পারছিলেন না। অক্টাভিয়ান, পরে (সম্রাট অগাস্টাস) তা পোড়াতে দেননি। কারণ তিনি ক্লিওপেট্টা এবং তার কপট যুদ্ধ জয়ের গৌরব লিপিবন্ধ করার জন্য কবিকে প্রতিটি পদে দশ হাজার সেস্টাস (সম্মানী) দিয়েছিলেন। সমকালীন কবি ওভিদকে চাপ দিয়েছিলেন অক্টাভিয়ান মিথ্যে ও কপটযুদ্ধের প্রশংসা করে কাব্য রচনা করতে। ওভিদ তা করেননি বলে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ষোল বছর তিনি নির্বাসনে কাটান।
ক্লিওপেট্টার সারাটা জীবনই গেছে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। মৃত্যুর পর দুই হাজার বছর ধরেই ভালোবাসাহীন নিষ্ঠুরতার শিকার তিনি। এখনও তার প্রতি কুৎসা ও নিষ্ঠুরতা ছড়াচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব। আমার মনে হলো বাংলা ভাষার পাঠকদেরও সেসব কথা জানানো দরকার। আর তার মাধ্যম হতে পারে উপন্যাস। আর বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখিনি, তা তো নয়। আমি বাংলা ভাষায়ই লিখেছি। এদেশের বিষয় নিয়ে অনেকেই লিখছেন এবং ভালো লিখছেন।
গল্পপাঠ :
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে গল্প-উপন্যাস চর্চা কেমন হচ্ছে? আপনার পর্যবেক্ষণ কী? চর্চা কি এগুচ্ছে, নাকি কোনো গিরিখাদে আটকে আছে?
আবুল কাসেম :
এটি এক বিশাল প্রশ্ন। দীর্ঘ সময় নিয়ে আলোচনার অপেক্ষা রাখে। তাই এ নিয়ে আরেক দিন বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।
গল্পপাঠ :
ভবিষ্যতে কী লেখার পরিকল্পনা?
আবুল কাসেম :
ভবিষ্যতে কিছু লেখার পরিকল্পনা এখনো নেই। তবে ইচ্ছে আছে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : জানুয়ারি, ২০২৬


0 মন্তব্যসমূহ