সুচিত্রা সেনের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল মাসুদের আব্বার। তখনও সে মাসুদের আব্বা হয়নি। ছোকরা ছিলো, বিয়ে করেনি। কাটাকাটি চেহারা মাসুদের আব্বার, বড়বড় কথা-বলা চোখ, ঝাঁকড়া চুল। কলকাতায় গিয়েছিলো খালার বাড়িতে বেড়াতে। খালাতো ভাই সিনেমাপাড়ায় কাজ করে, প্রোডাকশন ম্যানেজার। সেই সূত্র ধরে সুচিত্রা সেনের বাসায় একবার গিয়েছিলো ভাইয়ের সাথে, পরের দিনের শুটিংয়ের শাড়ি পৌঁছে দিতে। তারপর খুব গল্প জমে গিয়েছিল। সুচিত্রা সেনের সাথে মাসুদের আব্বার সেটাই প্রথম দেখা নয়, আগেও দেখা হয়েছিল। সে কথা সুচিত্রা সেনের মনে ছিল, মাসুদের আব্বার তো অবশ্যই। সুচিত্রা সেন পাবনার কথা জানতে চেয়েছিলেন। আর মাসুদের আব্বা বলেছিলো পুরানঢাকার বাকরখানির গল্প। সে নিয়ে অনেক গল্প হয়েছিল সেদিন। পরেরদিন শুটিংয়ে খালার জন্য নিয়ে আসা পুরানঢাকার বাকরখানি থেকে কয়েকটা টিনের কৌটো ভরে নিয়ে গিয়েছি সুচিত্রা সেনের জন্য শুটিংয়ে। তারপর এই থেকে সেই, হালকা একটা প্রেম হয়েছিল। যতদিন শুটিং ছিল, ততদিন, প্রতিদিন দেখা হতো, আড়ালে আড়ালে কথা। তারপর মাসুদের আব্বা ফিরে এসেছিলো ঢাকায়। ফিরে আসতে হয়েছিলো। সুচিত্রা সেন বলেছিলেন, "আরো অনেক বছর আগে দেখা হলে বলতাম, থেকে যাও।"
ফিরে এসেছিলো মাসুদের আব্বা। কেমন করে ফিরে এসেছিলো কে জানে? সুচিত্রা সেনকে ভালোবাসলে কেউ কি ফিরে আসতে পারে? জিজ্ঞেস করার উপায় নেই। গেলো পাঁচ বছর ধরে বিছানায় মাসুদের আব্বা, প্রায় প্রতিদিনই মরে মরে যায়। স্মৃতিও প্রায় ভুলছে। প্রায় আশির কাছাকাছি বয়স। মাসুদের বড় ভাই তার চেয়ে ২৫ বছরের বড়, বোন ১৮ বছরের বড়, আর শেষ বয়সের সন্তান মাসুদ। এই সেদিন সুচিত্রা সেন চলে গেল, তারপরই এই সব গল্প সামনে এলো। টিফিন পিরিয়ডে।
ওই বললো, "আব্বা যে কান্না দিসে, সুচিত্রা সেন মারা যাওয়ার খবর শুনে।"
রফিকুল কখনো ছেড়ে কথা বলে না, খচাৎ করে ঠিক প্রশ্ন করে, "তোর বাপের লগে সুচিত্রার প্রেম ছিল এইটা তুই জানস কেমনে?"
মাসুদ মোটেও তার বাপের মতন কাটাকাটা চেহারার মানুষ না। ইয়া লম্বা শরীর আর গোল মুখ। হাত দুটো শরীরের তুলনায় বড্ড চিকন আর লম্বা। সেই লম্বা হাত দুটো কথা বলার সময় সর্বক্ষণ এলোপাতাড়ি নাড়তে থাকে। অমন হাত ঘুরাতে ঘুরাতেই উত্তর দিলো, "জানি, আমি শুনসি।"
টিফিনের পরের পিরিয়ডে অংক পরীক্ষা। ক্লাস পরীক্ষার নম্বর নাকি ফাইনালে যোগ হবে। টিফিন পিরিয়ড শেষ হবার আগেই সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়, খাতা বই খুলে পরীক্ষার শেষ প্রস্তুতি নেয়। আড্ডা তাই আর জমে না।
কিন্তু পরদিন মুকিত টিফিন পিরিয়ডে আবার কথা তোলে। আজ কোনো পরীক্ষা নেই। মন ফুরফুরে। বারান্দার রেলিঙে ঝুঁকে দুলছে, কেউ বারান্দার মেঝেতে শুয়ে, কেউ হাত মাখিয়ে আইসক্রিম খেয়ে টিফিন পিরিয়ডের আনন্দ লুটেপুটে নিচ্ছে। তখনই মুকিত প্রশ্ন তোলে, "এই মাসুদ, তোদের বাড়ির নাম কি সুচিত্রা ভিলা?"
টিকাটুলি এলাকায় উঁচু দালানের ভিড়ে যে কয়টা একতলা বাড়ি বেঁচে আছে কোনমতে, মাসুদদের বাড়ি তাদের একটা। শেরেবাংলা গার্লস স্কুলটা থেকে সামনে গেলে গলির শেষ মাথায়। কিন্তু সেই বাড়ি সবাই চেনে হাসান মিয়ার বাড়ি বলে। "সুচিত্রা ভিলা নাকি নাম?"
মাসুদ মাথা নাড়ে, "হু। সুচিত্রা সেনের নামে আব্বা রাখসে।"
"তোর আম্মা কিছু বলে নাই! "
"আব্বা বিয়ের সময়ই আম্মারে বলে দিসিলো, আমারে বিয়ে করলে সুচিত্রা সেন সহই বিয়ে করতে হবে।"
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাসুদ। মায়ের কথা মনে হলো বোধহয়। সেই ক্লাস টুতে থাকতেই তো ওর মা মরলো। হয়তো ওর মন কেমন করে। হয়তো। আর ক্লাসের ছেলেরা স্কুল শেষ ফাঁকতালে ভাগে ভাগে ওর বাসার বাইরে যেয়ে দেখে আসে ঘটনা সত্যিই, ওদের বাড়ির নাম সুচিত্রা ভিলা। পুরোনো হলদে ঝলসে যাওয়া কোনমতে ঝুলে থাকা নেমপ্লেটে, কাঁঠাল গাছের আড়ালে চাপা, ঠিক লেখা আছে সুচিত্রা ভিলা। খুব কসরত করে গাছের পাতা সরিয়ে ঝাপসা নেমপ্লেট দেখতে হয়, এতদিন কারো চোখেই পড়েনি। বাকিরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেমন মন খচখচ করে। সুচিত্রা সেনের সাথে মাসুদের এক সম্পর্ক আছে, আহা, দূরসম্পর্ক, দূর অতীতের, তবুও সম্পর্ক তো।
সবাই আঁতিপাতি খোঁজে, এমন কোন এক সম্পর্ক খোঁজে, যাতে সবার তাকে লেগে যায়। অমন ঝলমলে গল্পের পর, আর সবার জীবন কেমন পানসে লাগে। লতিফুর অনেক খুঁজে পেতে গল্প খুঁজে আনে যে ওর ছোট চাচার সাথে গায়িকা নূরজাহানের নাকি একটু বিশেষ পরিচয় ছিল। গল্পের বুনোট কেমন হালকা। ভাসাভাসা, জমেনি। সবাই ওই সুচিত্রা সেনের গল্পের ঘোরে দিন কাটাচ্ছে।
সেদিন ভূগোল আপা আসেনি, ক্লাসে সবাই বেকার বসে আছে। তখন আবার গল্প উঠলো। রফিকুল ওই খচাৎ প্রশ্নই করলো, "ওয়ে মাসুদ, চাচার সাথে কি সুচিত্রার শুধু ওই ইটিশপিটিস প্রেম ছিল, নাকি চুমুটুমু খেয়েছিলো?"
মাসুদ সাধারণত এসব প্রশ্নে ক্ষেপে না, কিন্তু মজাও পায় না, আবার উত্তরও দেয় না। অবাক তাকিয়ে থাকে। কখনো বলে হু, কখনো জানি না। এমন ক্ষেত্রে সবসময় উত্তর দেয় মাসুদের আত্মার টুকরা বন্ধু রুবাই। এবারও দেয় আস্তে করে শুদ্ধ করে কেটে কেটে, "রফিকুল কারো বাপ-মাকে নিয়ে বাজে কথা বলবিনা। খবরদার।"
রফিকুল থামে। থামে না বাকিরা। "আচ্ছা মাসুদের বাপের যদি সুচিত্রা সেনের সাথে বিয়ে হতো, তবে কি মাসুদ হতো? বিজ্ঞান আপারে জিজ্ঞেস করতে হবে দাঁড়া। মাসুদ কি সুচিত্রা সেনের ছেলে হতো? কলকাতার নায়ক হতো? নাকি সুচিত্রা সেন পুরান ঢাকার টিকাটুলির ওই হলুদ ঝুরঝুরে বাড়ির হাড়ি ঠেলতো? মুসলমান হতো নাকি হিন্দু?"
মাসুদের কোন উত্তর নেই। বনবন করে শুকনো হাত দুটো ঘুরিয়ে দেয়ালে যেন শূন্যে রঙিন বল ছুড়ছে। আর সবার কথা শুনছে। খেপে ওঠে রুবাই।
"আর একটা বাজে কথা যদি বলো আমি সত্যি কিন্তু বড়স্যারকে যেয়ে নালিশ করবো।"
একে রুবাই ক্লাসের ফার্স্ট বয়, আবার ক্লাস ক্যাপ্টেন, ওকে ঘাটায় কে? অমন শুদ্ধ করে চিবিয়ে কথা বললে এমনিই বুক ঢিপঢিপ করে। আর টিচারদের যেয়ে যদি নালিশ করে, তবে আস্ত থাকতে হবে না। টিচাররা অন্ধের মতন বিশ্বাস করে রুবাইকে। এমন পরিপাটি রুবাই, যে একদিন অনেক বড় হবে, তার কেমন করে হোৎকা বেঢপ মাসুদের সাথে দোস্তি হয়, কে জানে? যখন ক্লাসে এসে টিচাররা বলে, "মাসুদ রুবাইকে দেখ, ও একদিন বড় অফিসার হবে, আর তুই ওর পেছনে চাকরি খুঁজবি। পড়াশোনা কর মন দিয়ে।" বলে মাসুদকে, কিন্তু রুবাইয়ের চোখ কেমন জল ছলছল করে ওঠে। রুবাই বলে, "স্যার মাসুদ খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করছে। সামনেরবার রেজাল্ট ভালো হবে।" এমন করেই রুবাই মাসুদকে বাঁচিয়ে দেয় সবসময়।
আর এদিকে শহীদ নবী হাই স্কুলের ক্লাস সিক্সের খ শাখার ৩০জন ছেলে কেমন সুচিত্রা সেনের মধ্যে ডুবিডুবি। চিত্তরঞ্জন স্যার বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষায় "তোমার আদর্শ মানুষ" রচনা লিখতে দিলো। আর তৌহিদ লিখলো "আমি বড় হয়ে সুচিত্রা সেনকে বিয়ে করতে চাই।" কেন বিয়ে করতে চায় বিশদে লিখলো। সুচিত্রা সেনের সৌন্দর্য্য, ঝিলিক দেয়া হাসি, সুচিত্রা সেনকে বিয়ে করতে পারলে ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্ব শক্ত হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তার দুদিন পর চিত্ত স্যার যখন খাতায় নম্বর দিয়ে নিয়ে এলেন, সেদিনটা বেশি ভালো যায়নি কারোই। যত পশু পাখি সাপখোপের বাচ্চা আছে, সবার নাম ধরে তৌহিদকে ডেকেছিলেন। শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে দু হাত ছড়িয়ে চেয়ারে বসে বলেছিলেন, "হারামজাদা এই বদ কথা লিখসস, তোর বাপ-মারে ডেকে দেখাবো? আর সুচিত্রা সেন তোর জন্য বাইচ্চা আসে? আর বাইচ্চা থাকলেও তোর মতন হারামিকে সে বিয়ে করতো? তুই তো আন্ডা থেকেও ফুটস নাই, এইসব নোংরা বুদ্ধি কই পাইসোস, বল ...."
ক্লাস সিক্সের খ শাখার এক অলিখিত চুক্তি আছে। কেউ কাউকে একা গর্তে ফেলে দেয় না। হয় সবাই একসাথে গর্তে পরে, নইলে সবাই মিলে গর্ত ভরাট করে দেয়। কেউ মাসুদের আব্বার গল্প সামনে আনলো না। কেউ বললোনা তারা সবাই সুচিত্রা সেনে দিশেহারা। তারা আসলে মাসুদের আব্বা হতে চায়। সুচিত্রা সেনের সাথে যার প্রেম হয়েছিল। যার সাথে সুচিত্রা সেনের আরেকটু আগে দেখা হলে অন্য এক গল্পের জন্ম হতে পারতো। কেউ কিচ্ছু বললো না। সেদিন স্যার মাসুদকেও ছেড়ে দেয়নি। সে পরীক্ষার খাতায় একটা গোল্লা একটা লাঠি আর একজোড়া চোখের ছবি এঁকেছিল। কিচ্ছু লেখেনি। মাসুদকে সেদিন চিত্ত স্যার মেরেও ফেলতে পারতো। এমন রেগেছিলো স্যার। কিন্তু প্রতিবারের মতন রুবাই এসে দাঁড়ালো।
"স্যার ঐদিন মাসুদের যে জ্বর ছিলো। তাও পরীক্ষা দিতে আসছে। মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিল স্যার। ওকে আরেকটা সুযোগ দেন।"
ডাহা মিথ্যা কথা। মাসুদ ঐদিন সুচিত্রা সেনের পুরোনো হলদে পেপার কাটিং ছবি এনে সবাইকে দেখিয়েছিল, যেটা মাসুদ ওর বাপের আলমারি থেকে উদ্ধার করেছে। সেই নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়েছিলো যে, মাসুদের বাপ পুরোনো প্রেম ভুলতে পারেনি। আহারে। মাসুদ অবশ্য কখনোই সেসব আলোচনায় অংশ নেয় না। যখন এমন তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়, ওই প্রতিবারের মতন, শূন্যে কেমন অদৃশ্য বল ছুড়ে। আর বিপদে পড়লে সবাই একসাথে গর্তে পরে। রুবাই মাসুদকে টেনে তোলে। এমন করেই চলছে। সেদিন পিটি ক্লাসের পর মাঠে গড়াচ্ছিল মাসুদ।
রফিকুল প্রশ্ন করেছিল, "এই তুই যে একদিন বললি তোর বাপের সুচিত্রা সেনের সাথে কলকাতায় যাওয়ার আগেও দেখা হয়েছিলো?" রফিকুল এখন আর খচাৎ করে প্রশ্ন করেনি। সে কেমন ঘোরগ্রস্ত, তরল। সুচিত্রা সেনের গল্পে কেমন আটকে লুটোপুটি খাচ্ছে।
মাসুদ ঘাসে গড়াতে গোড়াতেই বলে, "হু"
চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্লাসের বাকি ছেলেরা জড় হয়। নিশ্বাস যেন আটকে যাচ্ছে।
মাসুদ ঘাস ছিড়ে, ডগা দিয়ে পিঠ চুলকাচ্ছে। "আমাদের বাড়ি পাবনা না? তো দেখা তো হবেই।"
পাবনায় বাড়ি হলেই সুচিত্রা সেনের সাথে দেখা হয়? বহুত কসরৎ করে ঘাসে গড়াগড়ি খেয়ে উঠে বসে মাসুদ জানায়, "আব্বা পড়তো পাবনা জিলা স্কুলে আর সুচিত্রা সেন তখন পাবনা গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে পড়ে।"
"তারপর?"
"তারপর আর কি, ওই টেকনিক্যাল এর গলি ধরে যাওয়ার সময় সুচিত্রা সেনদের বাড়ি দেখা যেতো । আব্বারা মাঝে মাঝে দেখতো যে সে স্কুলে যাচ্ছে। ওই ভাবে চিনতো আর কি।"
"কথা হয়নি?"
"হু। আব্বা তো ডাকতো রমা বলে। ডাক নাম। উনি এলাকার পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নাচ করসিলো। আর আব্বা তবলা বাজাইসে। ওই সময় পরিচয়।"
"তখন প্রেম হয় নাই?"
"নাহ কেমনে হবে উনি কলকাতা চলে গেলো। তারপর তো আবার শুটিংয়ের জন্য শাড়ি দিতে যেয়ে দেখা, তখন প্রেম... ওই যে বললাম না।"
"ওহ"
"আব্বার কথা উনার নাকি মনে ছিলো, এতো সুন্দর তবলা বাজাইতো আব্বা।"
ঘোর ঘোর। সেদিন পিটি ক্লাস থেকে ফিরলো কতগুলো ঢুলুঢুলু চোখের মানুষ, মন কেমন পাতিলে ফোটা ঘন দুধের মতন ছলকে ছলকে যায়। মাসুদের আব্বার একটা পুরানো চিঠি আছে তার বন্ধুর কাছে লেখা, যেখানে সুচিত্রা সেন আর তার প্রেমের বাকি গল্পও আছে। কেমন করে প্রেম হলো, সেই কলকাতার শুটিংয়ের দিনের গল্প, কেমন করে মাসুদের আব্বা সব ছেড়ে ঢাকায় চলে আসলো। মাসুদ কথা দিয়েছে সে চিঠি খুঁজে নিয়ে আসবে ক্লাসে, "আমি মুখে বললে অতো মজা পাবিনা তোরা, চিঠিতে সব লেখা আছে। নিয়ে আসবো নে।"
সময় আর কাটেনা। মাসুদ সে চিঠি আর আনেনা, মাসুদ নিজেই তো আসেনা দুদিন হলো। রুবাই খবর আনলো মাসুদের আব্বা মারা গেছে। ক্লাসের পর সেদিন সবাই গিয়েছিল মাসুদের বাড়ি সুচিত্রা ভিলায়। বাড়ি ভর্তি মানুষ। শোবার ঘরের এক কোণায় মাসুদ একটা টুলের উপর মাথা নিচু করে বসে আছে। কুঁজো হয়ে আছে পিঠ, আর হাত দুটো চুলের মধ্যে মুঠি করে রেখেছে। দূর থেকে দেখতে কেমন উটপাখির মতন লাগছে। বিছানার পাশে একটা ট্রাঙ্ক, নিশ্চিত সেই ট্রাঙ্কে আছে মাসুদের আব্বার চিঠি। সেই চিঠিতে আছে প্রেমের বাকি গল্প, সুচিত্রা সেন। কিন্তু যার বাপ মাত্র মারা গেলো, দূর থেকে দেখতে যাকে শোকগ্রস্ত এক উটপাখির মতন লাগছে, তাকে কী বলা যায় "এই তোর বাপের প্রেমপত্র কই? দেখা তো।"
মাসুদের সাথে আর কোনদিন দেখা হলো না। ওর বড় ভাইয়ের পোস্টিং সিলেট। সেখানে চলে গেলো সে। এখানে কার কাছে থাকবে? স্কুল থেকে ট্রান্সফার নিয়ে গেছে। কারো সাথে দেখা হয়নি, রুবাই ছাড়া। চৈত্রের গরম তাপের মতন কেমন থমথম করে ক্লাস সিক্স খ শাখা। মাসুদের বাপটা মরারও আর সময় পেলোনা। কে বলবে কেমন করে প্রেম হলো সুচিত্রা সেনের সাথে মাসুদের আব্বার? সুচিত্রা সেনের তখন বিয়ে হয়েছিলো, না? আচ্ছা, সিনেমার সেটে কি উত্তমকুমারও থাকতেন? মাসুদের আব্বার সাহস হলো কেমনে সুচিত্রার সাথে...? কোনো পত্রিকায় এসব খবর ছাপা হয়নি? হিন্দু আর মুসলমান কেমনে প্রেম করলো? কত প্রশ্ন, কে উত্তর দিবে?
এর মাঝে নাফিস খবর আনলো যে, "মাসুদের সব গল্প কিন্তু চাপা। ওর বাপ জীবনেও কলকাতা যায়নি। আব্বাকে জিজ্ঞেস করসিলাম, আব্বা এইসব কিছুই জানে না। ওদের পরিবারের নাড়িভুঁড়ির খবর আব্বা জানে। এতদিন ধরে এক পাড়ায় থাকি, এইসব ঘটলে সবাই জানতো। চাপা। "
হইহই করে ওঠে অনেক। বাকিরা ভেঙে পরে। এতবড় গল্প কেউ মিথ্যা বলে? কিন্তু এতো সত্য যে মাসুদরা আগে পাবনা থাকতো। ওদের পাবনায় বাড়ি। সবাই মিলে কাগজে কলমে সময়ের হিসাব মিলায়। পুরোনো খবরের কাগজে সুচিত্রা সেনের জীবন আতিপাতি খুঁজে বের করে। মাসুদের আব্বা যখন পাবনা জিলা স্কুলে পড়ে, তখন সুচিত্রা সেন আসলেও তো পাবনা গার্লস স্কুলেই পড়তো, এক সময়েই। রুবাই জানে, বিশ্বাস করে, জোর গলায় বলে, "মাসুদ মিথ্যা বলে না। মাসুদের আব্বা নিশ্চয়ই কলকাতায় গিয়েছিল। নাফিসের আব্বা কি দুনিয়ার সব খবর রাখে নাকি? আন্দাজে।"
রুবাইকে সবাই ছেঁকে ধরে, প্রেমটা কেমন করে হয়েছিলো তবে? রুবাই নিজেও জানেনা। কিন্তু রুবাই এটা জানে যে, মাসুদ একটা উপন্যাস লিখছে, সুচিত্রা সেনের সাথে প্রেমের গল্প। সেখানে সব কিছু লেখা থাকবে। সুচিত্রা সেন যখন নাচতো, সেই ছেলেটা তবলায় তাধিন তাল তুলতো। আর কয়েকবছর পরে, শুটিংয়ের ফাঁকে বাংলাদেশের সেই গোবেচারা ছেলের সাথে কেমন করে সুচিত্রা সেনের প্রেম হয়েছিলো। কেমন ছিল সেই প্রেমে ভরা গুনগুন দিনগুলো। সব থাকবে সেই বইতে।
"কবে হবে সেই বই?"
"আরে বই লিখতে হবে, ছাপাতে হবে। ছাপানোর টাকা লাগবেনা? মাসুদের যখন টাকা হবে, নিশ্চয়ই ও বইটা ছাপাবে। ও আমাকে বলেছিলো।" রুবাইয়ের চোখ কেমন টুকরো নেশা। ও নিশ্চিত গল্পের বাকিটুকু একদিন সেই বইয়ে লেখা হবে।
ক্লাস সিক্স খ শাখা থেকে আজকাল অহেতুক কোলাহল শোনা যায় না। সবাই থেমে আছে, অপেক্ষা করছে। ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চটা ফাঁকা। বেঞ্চের এক কোণ ভাঙা। কেমন করে এই ভাঙা কোণে বসতো ঢ্যাঙা গোল মুখের উটপাখির মতন মাসুদ? যার হাত দুটো ইয়া লম্বা!
সবাই বলে, ক্লাস সিক্সের খ শাখার ছেলেদের অসুখ করেছে। তাদের আর কোনো গল্প নেই। ·
লেখক পরিচিতি : কিযী তাহ্নিন কথাসাহিত্যিক। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে : ইতি হেকমালন্তি, ইচ্ছের মানচিত্র, দেড় নম্বরি, চনর্কি, বুধ গ্রহে চাঁদ উঠেছে, আছে এবং নাই। অর্জন করেছেন ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার’। পেশাগতভাবে ইউনেস্কো ঢাকার সংস্কৃতি প্রধান। বসবাস ঢাকায়।


0 মন্তব্যসমূহ