তুতুন বিশ্বাস
ফরাসি দার্শনিক গ্যাব্রিয়েল মার্সেল দ্য ফিলোসফি অব এক্সিস্টেনশিয়ালিজম গ্রন্থে লিখেছিলেন, জঁ-পল সার্ত্রের পৃথিবী হলো “ক্যাফের খোলা বারান্দা থেকে দেখা পৃথিবী।” সে সময়ে অন্য যে বড় ফরাসি অস্তিত্ববাদী লেখক ছিলেন তিনি হলেন আলবেয়ার কাম্যু (১৯১৩–১৯৬০)। এবং তিনি ছিলেন একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। সার্ত্র যদি ক্যাফে থেকে দেখা জীবনের কথা লিখে থাকেন, কাম্যু লিখেছেন গরম রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সমুদ্রতট থেকে দেখা জীবনের কথা—যে সমুদ্রতটের ওপর পাহাড়ের ঢালে একটি বাড়ি আছে, সেখানে একদল বন্ধু থাকে। অন্য কথায়, সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্রে রেখেছে; আর কাম্যুর অস্তিত্ববাদ প্রকৃতি এবং মানুষের প্রতি তার উদাসীনতাকে কেন্দ্রে রেখেছে।
সার্ত্র ও কাম্যু—দুজনেই দর্শন ও উপন্যাস লিখেছেন। সাধারণভাবে সবাই মনে করতেন—এবং দুজনেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও তা স্বীকার করেছিলেন-- সার্ত্র ছিলেন ভালো দার্শনিক, আর কাম্যু ছিলেন ভালো ঔপন্যাসিক। কেন এমন হলো এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে কাম্যুর ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার রহস্যে। তবে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো-- দুজনেরই পারিবারিক জীবন ছিল টানাপোড়েনের। বাবার মৃত্যুর পর সার্ত্র বড় হয়েছেন তাঁর মা ও মাতামহের কাছে। ঈশ্বরের দৃষ্টি ও অন্য মানুষের দৃষ্টিকে ভয় করতে করতেই তিনি বড় হয়েছেন। আর কাম্যুর বাবা কাম্যুর জন্মের আগেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত হন। কাম্যুর মা ছিলেন বধির। তাঁর শব্দভাণ্ডার ছিল মাত্র চারশো শব্দের। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি সাহিত্যের অধ্যাপক অ্যালিস কাপলান লিখেছেন, “একটি মৃত্যুদণ্ড লুসিয়েন কাম্যুকে অসুস্থ করে ফেলেছিল—তিনি গিলোটিনে একজন মানুষকে শাস্তি পেতে দেখতে গিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য তাঁকে এতটাই আতঙ্কিত করেছিল যে তিনি কথা বলতে পারেননি। আলবেয়ার কাম্যু তাঁর বাবার সম্পর্কে যা শিখেছিলেন, সেটাই ছিল একমাত্র বিষয়।”
কাপলান কাম্যুর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনার জীবনের গল্প বলেছেন। দ্য স্ট্রেঞ্জার উপন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবনীমূলক সত্য হলো—কাম্যুর মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। কারণ, বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত সূচনাগুলোর একটি এই উপন্যাসের শুরুতেই আছে : “আজ মা মারা গেছেন। অথবা হয়তো গতকাল, আমি জানি না। বৃদ্ধাশ্রম থেকে একটি টেলিগ্রাম পেয়েছি: ‘মা প্রয়াত। আগামীকাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। বিশ্বস্তভাবে।’ এতে কিছুই বোঝা যায় না। হয়তো গতকালই হয়েছিল।”
কাপলান লিখছেন—
“১৯৩৫ সালের মে মাসে,”
সিমোন হিয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ের অল্পদিন পরেই কাম্যু নোটবুকে তাঁর ভাবনা লিখতে শুরু করেন। এ ভাবনাগুলো তার ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রকল্পকে পুষ্ট করবে। প্রথম একটি নোটে তিনি তাঁর উৎস নিয়ে ভাবেন। তিনি যে দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মেছিলেন, তার প্রতি তিনি কি রোমান্টিকতায় না গিয়ে সৎ থাকতে পারবেন? এবং তিনি কি কখনো তাঁর মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অদ্ভুতত্ব প্রকাশ করতে পারবেন? তিনি লেখেন, “কয়েক বছর দুঃখ-কষ্টে কাটালেই একটি সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। এই বিশেষ ক্ষেত্রে, মায়ের প্রতি এক পুত্রের যে বিচিত্র অনুভূতি—সেটাই তার সম্পূর্ণ সংবেদনশীলতা গড়ে দেয়।”
তবে দ্য স্ট্রেঞ্জার কোনো আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস নয়। কাম্যু তাঁর কথক মেরসোর তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও আনন্দপ্রিয় মানুষ ছিলেন। উপন্যাসের শুরুতে মেরসো প্রায় অনুভূতিহীন এক চরিত্র। কিন্তু উপন্যাস এগোতে থাকলে তিনি এক প্রতিবেশীর নির্যাতনমূলক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন—যার পরিণতি হয় প্রচণ্ড রোদের নিচে সমুদ্রতটে এক নামহীন আরবকে হত্যা, তারপর বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মেরসোর আবেগ জাগ্রত হয়। আর তাঁর এই অ্যান্টি-হিরো সম্পর্কে কাম্যু লেখেন—যাকে বহু রক্ষণশীল মানুষ নিন্দা করেছিলেন—“তার মধ্যে আমি একটি ইতিবাচক গুণ দেখি, আর তা হলো: মৃত্যুর মুখেও সে মিথ্যা বলতে অস্বীকার করে।”
কাপলান দেখিয়েছেন, দ্য স্ট্রেঞ্জার কীভাবে ধীরে ধীরে, বহু বছরের মধ্যে, কাম্যুর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর আগে তিনি খুব অল্প সংখ্যায় ছাপা হওয়া দুটি বই প্রকাশ করেছিলেন। তারপর তিনি আ হ্যাপি ডেথ নামে একটি উপন্যাস লেখেন। এ উপন্যাসেদ্য স্ট্রেঞ্জার-এর অনেক উপাদানই ছিল। তিনি সেখানে নিজের পুরো জীবন ঢোকাতে চেয়েছিলেন। ফলে বইটি উপাদানে অতিরিক্ত ভারী হয়ে পড়ে এবং পছন্দসই হয়নি। কিন্তু সেই সময় তিনি যখন এটি লিখছিলেন, এবং একই সঙ্গে আলজিয়ার্সে সাংবাদিকতাও শিখছিলেন, তখন তাঁর নোটবুকে বিচ্ছিন্নভাবে আরেকটি গল্পের টুকরো টুকরো অংশ উঠে আসছিল। তিনি তাঁর প্রথম গুরু জঁ গ্রেনিয়ের তত্ত্বাবধানে দর্শন পড়েছিলেন। এবার তিনি তাঁর দ্বিতীয় গুরু পাস্কাল পিয়ার তত্ত্বাবধানে সাংবাদিকতার কাজ শিখছিলেন।
নিঃস্বার্থ ও কর্মচঞ্চল পিয়া কাজের জন্য প্যারিসে গেলে শিগগিরই কাম্যুকে তিনি সেখানে ডেকে নেন। এরপর কাম্যু একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার চতুর্থ পাতার লে-আউটের কাজ করেন। আলজিয়ার্সে তিনি আদালত প্রতিবেদক ছিলেন—ঔপনিবেশিক সরকারের জন্য তিনি ছিলেন কাঁটার মতো। সেই অভিজ্ঞতা, তার সঙ্গে প্যারিসের নিঃসঙ্গতা এবং জেমস কেইনের দ্য পোস্টম্যান অলওয়েজ রিংস টোয়াইস উপন্যাস পাঠ—সব মিলিয়ে তিনি দ্য স্ট্রেঞ্জার লেখা শুরু করেন এবং লিখে শেষ করেন। পিয়া তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন ফরাসি কর্মী ও সাহিত্যিক আন্দ্রে মালরোর সঙ্গে। তিনি উপন্যাসের কিছু দৃশ্য পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করেন এবং গ্যালিমার প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইটি প্রকাশের পথ করে দেন।
একমাত্র সমস্যা ছিল—জার্মানি তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছে, এবং ফ্রান্সকে দখলকৃত ও অদখলকৃত অঞ্চলে ভাগ করেছে। দ্য স্ট্রেঞ্জার-এর পান্ডুলিপি নানা পথে, নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, শেষ পর্যন্ত ১৯৪২ সালের এপ্রিলে বইটি প্রকাশিত হয়। এদিকে যক্ষ্মা আবার ফিরে আসায় কাম্যু আলজেরিয়ায় ফিরে যান। পরে তিনি ফ্রান্সে ফিরে এসে প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দেন এবং গোপন পত্রিকা কমব্যাট-এর জন্য লেখা ও সম্পাদনার কাজ করেন। নাৎসিরা তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে কারাবন্দি করে এবং হত্যা করে। এই সময়েই তিনি দ্য প্লেগ লেখা শুরু করেন।
দ্য স্ট্রেঞ্জার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কাম্যু সমকালীন ফরাসি লেখকদের প্রথম সারিতে উঠে আসেন। ধর্মপ্রাণ ও ঐতিহ্যবাদী লেখকেরা বইটি অপছন্দ করেন এবং প্রায়ই ভুলভাবে বোঝেন। ক্যাথলিক বামপন্থার প্রধান লেখক ফ্রাঁসোয়া মোরিয়াক লেখেন, “আমি দ্য স্ট্রেঞ্জার উপন্যাসটি একেবারেই কারিগরি কারণে পছন্দ করি না, তবে: এর ভাষাশৈলীকে আমি খুব বেশি অনুকরণমূলক মনে করি।” সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমালোচক ছিলেন সার্ত্র। তিনি কাম্যুর দার্শনিক প্রবন্ধ দ্য মিথ অব সিসিফাস-কে বিদ্ধ করেছিলেন—কাপলান লিখছেন, “প্যারিসের বুদ্ধিজীবী আলজেরিয়া থেকে লেখা মানুষের কাছে পাঠ দিচ্ছিল”—কিন্তু দ্য স্ট্রেঞ্জার তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সার্ত্র বুঝেছিলেন, কাম্যুর ভাষার ব্যবহার ছিল অনন্য—“উপন্যাসের প্রতিটি বাক্য যেন একটি করে দ্বীপ”—এবং তিনি কাম্যুর শৈশব সম্পর্কে কিছুই না জেনেই তা বুঝেছিলেন। কাপলান মন্তব্য করেন, “সার্ত্রের ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার এক্সপ্লেইন্ড’ প্রমাণ করে যে কোনো সাহিত্যকর্ম বুঝতে লেখকের জীবনের কথা জানা অপরিহার্য নয়।”
যুদ্ধের পরে দ্য প্লেগ প্রকাশিত হয় এবং ১৯৫৭ সালে কাম্যু সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। এর আগেই তিনি আমেরিকায় সফরে যান। বক্তৃতা করেন এবং সে সময়ে কার্তিয়ের-ব্রেসোঁর তোলা ট্রেঞ্চ কোট পরা, ঠোঁটে ঝুলন্ত সিগারেটসহ তাঁর সাদা-কালো ছবির মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে এক খুনি দ্য স্ট্রেঞ্জার বইটিকে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। খুনিটি দাবি করে এই বইটি তাকে অপরাধে প্রভাবিত করেছে। নিহত ব্যক্তির বাবা কাম্যুকে অনুরোধ করেন যেন তিনি অভিযুক্তকে নিন্দা করেন। কাম্যু জবাব দেন, “আমার কাজ, মহাশয়—এবং এই কথাটি আমি এই প্রথম দুঃখের সঙ্গে বলছি—মানুষকে অভিযুক্ত করা নয়। মানুষকে বোঝাই আমার কাজ।”
এরপর ১৯৬০ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় কাম্যু মারা যান। তাঁর পকেটে ছিল সেই ট্রেনের টিকিট। সেই ট্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। আর গাড়ির ভেতরে ছিল একটি উপন্যাসের পান্ডুলিপি—দ্য ফার্স্ট ম্যান। উপন্যাসটি চৌত্রিশ বছর পরে প্রকাশিত হয়। কাপলান বলেন, “দ্য স্ট্রেঞ্জার যতটা শীতল ও অস্থির, তার চেয়ে অনেক বেশি কোমল ও আবেগপ্রবণ এই উপন্যাসটি।”
২০১৩ সালে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটিদ্য স্ট্রেঞ্জার-এ মেরসোর হাতে নিহত নামহীন আরবের ভাইয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা। কাপলান লিখছেন—
“যুগচেতনা বলে একটি বিষয় আছে—তাকে সময়ের আত্মা বলা যায়। হয়তো আমাদের বর্তমান যুগচেতনা ‘অনুপস্থিত’ আরবের কথা নিয়ে অধৈর্য, এবং তার বাস্তবতা বর্ণনা করার ও তার গল্প বলার ইচ্ছায় ভরা। আলজেরীয় ঔপন্যাসিক কামেল দাউদ দ্য মেরসো ইনভেস্টিগেশন উপন্যাসে সেই আরবকে একটি নাম ও একটি জীবন দিয়েছেন—এই ভাই ও তার মাকে।”
দ্য স্ট্রেঞ্জার-এ আরবকে হত্যার ঘটনাটি বাস্তব জীবনের একটি মারামারির ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল। হত্যার ঘটনাটির কথা কাম্যু জানতেন এবং উপন্যাসে সেটা ব্যবহার করেছিলেন। মারামারিতে জড়িত ফরাসি দুই ভাই—রাউল ও এডগার বেনুসাঁ—এর নাম সবাই জানত, কিন্তু আরবটির নাম কেউ জানত না। কাপলান ল’এশো দ’ওরান পত্রিকার আর্কাইভে খুঁজে নামটি বের করেন: কাদ্দুর বেতুইল। আশ্চর্যের বিষয় হলো—বেতুইল ও কাম্যু দুজনেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত ছিলেন এবং যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি।
লুকিং ফর দ্য স্ট্রেঞ্জার বইটি কাম্যু-অনুরাগীদের জন্য, এবং দার্শনিক উপন্যাস বা উপন্যাসের ভেতরের দর্শনে আগ্রহীদের জন্য, অত্যন্ত আকর্ষণীয় পাঠ। সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বর্ণনা লেখকদের—যে কোনো স্তরের—জন্যই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। যদিও কাপলান কখনো কখনো তাঁর অনুমানে একটু বেশি এগিয়ে যান, তবু সামগ্রিকভাবে তিনি দৃঢ় গবেষণাভিত্তির ওপরই লিখেছেন—নোটের সংখ্যাই পঞ্চাশ পৃষ্ঠা। নামহীন আরবকে ঘিরে বইটির শেষ অংশটি, যদিও কেউ কেউ একে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শুদ্ধতার উদাহরণ বলে মনে করতে পারেন, তবু এটিকে প্রয়োজনীয় সমঝোতা এবং স্বাভাবিক কৌতূহলের তৃপ্তি হিসেবেও দেখা যেতে পারে। ·


0 মন্তব্যসমূহ