চৈতন্যে ধরা দেওয়া অনুভূতিকে সুনিপুণ শব্দজালে বন্দী করার প্রয়াসে ব্রত থাকাই লেখকের পরম ধর্ম। তিনি সচেতন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে স্থান, কাল ও ঘটনার নিরিখে তুলে আনেন লেখার অনুষঙ্গ। তাই প্রতিটি সাহিত্যকর্মই রচিত সময়ের সাথে স্থানিক সাক্ষ্য বহন করে। কালের আবর্তে ঘটে যাওয়া এমন কিছু ঘটনাপ্রবাহ থাকে যা সমকালীন এমনকি পরবর্তী লেখকগণের মানসভূমিতে ছায়াপাত করে, ফিরে ফিরে এসে প্রবল কষাঘাত করে মনোদরজায়। কালের পরিক্রমায় এই জনপদে ঘটে যাওয়া তেমনই একটি ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। ইতিহাসের অন্ধকারাচ্ছন্ন সুড়ঙ্গপথ পেরিয়ে এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমরা পেয়েছি উদিত সূর্যের দেশ। সুদীর্ঘ নয় মাস যে রক্তের উষ্ণ স্রোত বয়ে গেছে এই জনপদে, যে আর্তনাদে ভারী হয়েছে এই আকাশ; শব্দের ক্যানভাসে তার স্বরূপ তুলে ধরে অনুরূপ দৃশ্যের ভেতর পাঠককে প্রোথিত করার চেষ্টা যেকোনো শক্তিমান লেখকের জন্যে শুধুমাত্র দুরূহই নয়, অসম্ভবও বলা চলে। স্বল্প পরিসরের সাহিত্যকর্মে বিশেষ করে কবিতা বা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে সেটি একেবারেই অকল্পনীয়। ছোটগল্পমাত্রই স্বল্প পরিসরের ক্যানভাস যেখানে, রবীন্দ্রনাথের মতে, বর্ণনার ছটা থাকে না, ঘটনার ঘনঘটা থাকে না, তত্ত্ব থাকে না, উপদেশ থাকে না, হঠাৎ শুরু হয়ে হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধকাল থেকে শুরু করে বিগত পাঁচ দশকে বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ গল্পকারই তাদের লেখায় অনুষঙ্গ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে এনেছেন, ছোটগল্পের ক্যানভাসে শব্দের শৈলীতে সপ্রাণ করে তুলতে চেয়েছেন যুদ্ধকালীন সময় ও ঘটনাকে। প্রায় অধিকাংশ গল্পের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন টুকরো ঘটনাকে উপজীব্য করে সেগুলো লেখা হয়েছে। মূলত ছোটগল্পের ক্যানভাসে মুক্তিযুদ্ধের বিস্তীর্ণ প্রেক্ষাপট তুলে ধরা সম্ভবও নয়। তবে যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী প্রেক্ষাপটে লেখা গল্পগুলোর পাঠান্তে যেকোনো পাঠকই সে সময় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে পারেন। মূলত মুক্তিযুদ্ধ শুরুর লগ্ন থেকেই এদেশের লেখকগণের কলম সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে এখনও লেখা হচ্ছে। অনেক লেখক সরাসরি যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে অনুষঙ্গ তুলে নিয়েছেন। আবার অনেকেই পরোক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ সংবেদের আশ্রয়ে গল্পকে ঘটিত বাস্তব সত্যের উচ্চতায় কিংবা ঘটিত বাস্তবতাকে গল্পমানে উন্নীত করার প্রয়াস দেখিয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগ গল্পের ক্ষেত্রেই একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগকেই এসব গল্পের উপজীব্য বিষয় হিসেবে তুলে আনা হয়েছে। আমার এই লেখায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্পের বিষয়-আশয়কে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে বেশকিছু গল্প লিখেছেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পগ্রন্থটি। এই গ্রন্থের সাতটি গল্পের সবকটি গল্পই মুক্তিযুদ্ধকালীন কিংবা যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে রচিত। যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে রচিত এই গ্রন্থের গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ভূষণের একদিন, নামহীন গোত্রহীন ও কৃষ্ণপক্ষের একদিন। তিনটি গল্পেই মূলত উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের বর্ণনা, উঠে এসেছে বাঙালি জাতির প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গল্প। ভূষণের একদিন গল্পে রাষ্ট্র ও রাজনীতির মারপ্যাঁচ না-বোঝা গ্রাম্য চাষাভূষার ওপর পাকিস্তানিদের বর্বর নির্যাতনের চিত্র দেখা যায়। এই গল্পের মূল চরিত্র ভূষণ একজন গ্রাম্য চাষা। সে যুদ্ধের সাত-পাঁচ নিয়ে ধার ধারে না। কিন্তু এই যুদ্ধের ভয়বহতা থেকে তার রেহাই মেলে না। রেহাই মেলে না তার মতো রাষ্ট্রের সাত-পাঁচ না-ভাবা অপরাপর চাষাভূষারও। একদিন পুত্র হরিদাসকে খুঁজতে সে হাজির হয় দোকানে জড়ো হওয়া মানুষের ভীড়ে। হঠাৎ সেখানে পাকিস্তানি হানাদাররা উপস্থিত হয়ে অতর্কিতে হামলা চালায়। পাখির মতো গুলি করতে থাকে মানুষকে। হাসান আজিজুল হকের বর্ণনায় : ‘চিৎকার করতে করতে মানুষজন তীব্রবেগে দৌড়াতে দৌড়াতে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, কেউ মুখ ফিরিয়ে একবার নদীর দিকে তাকায়, তারপর তলপেট চেপে মাটিতে বসে পড়ে আর রক্ত ছোটে কলকল ঝনঝন শব্দে।’
তেঁতুলগাছের দিকে এগিয়ে আসা এক চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সের তরুণীর কোলের শিশুর মাথায় গুলি লাগে। রক্ত ও মগজ বেরিয়ে আসে। তরুণীটি হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে। কিন্তু তার হাত বেয়ে রক্ত আর সাদা মগজ গড়িয়ে পড়ে। স্থির হয়ে যায় শিশুটির শরীর। তরুণীটি এই দৃশ্যে উন্মাদপ্রায় হয়ে ওঠে। সে বুকের ব্লাউজ ছিঁড়ে ফ্যালে। বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে দুধেভরা ফুলে ওঠা স্তন। সে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ‘মার হারামির পুত, খানকির পুত—এইখানে মার। পরমুহূর্তেই পরিপক্ক শিমুল ফলের মতো একটি স্তন ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ছিটকে এসে সে পড়ল তেঁতুলতলায়। আক্রোশপূর্ণ ভয়শূন্য চাউনি নিয়েই সে মরে রইল।’
শেষ বাক্যটিতে হানাদারের প্রতি বাঙালি জাতির ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ইঙ্গিত মেলে। একটা নারী যে আক্রোশে বুকের ব্লাউজ খুলে বুক চিতিয়ে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়েছিল, মৃত্যুর পরও সেই আক্রোশ তার নির্ভীক চেহারায় ফুটে উঠেছিল। কৃষ্ণপক্ষের একদিন গল্পটিতে উঠে এসেছে পাঁচ তরুণের প্রতিরোধের গল্প। রাজাকারের রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে তারা শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়ায়। অনাধুনিক অস্ত্র দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারে মেশিনগানের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। তারা পিছু হটে। কিন্তু তাদের একজন শত্রুর গুলিতে মারা যায়। অবশিষ্ট চারজন খাল সাঁতরে ওপারে নিরাপদে পৌঁছে ঝোঁপের মধ্যে বিশ্রাম নেয়ার সময় পাকহিনীর একটি দল তাদেরকে ঘিরে ফেলে। তাদের তিনজন শত্রর হাতে শহিদ হলেও একজন পাকসেনাকে কষে লাথি মেরে খালের পানিতে লাফিয়ে পড়ে। সাথে সাথে বৃষ্টির মতো গুলি ঝরতে থাকে খালের পানিতে।
যুদ্ধকালীন সময়কে ধারণ করে হাসান আজিজুল হকের আরেকটি গল্প ‘নামহীন গোত্রহীন’। গল্পটির বর্ণনায় উঠে এসেছে যুদ্ধকালীন রাতের বিভীষিকাময় এক বাংলাদেশের চিত্র। জনমানবশূন্য পথঘাট, পাকসেনাদের গাড়ি ছাড়া রাস্তায় কোথাও কিছু নেই, দরজা বন্ধ করে দমবন্ধ এক সময় পাড়ি দিচ্ছে মানুষ। সর্বত্র আতঙ্ক আর উদ্বেগ। এই গল্পটির সাথে কিছুটা সাদৃশ্য পাওয়া যায় বিপ্রদাশ বড়ুয়ার সাদা কফিন গল্পের রাতের ঢাকা শহরের। পুরো শহরের রাস্তায় কোথাও কেউ নেই। গল্পকথকের কাছে এক অঘোষিত কারফিউ মনে হয়। এই দুটি গল্পের মূল দুটি চরিত্র রাতের ভয়াল সময়ের সাক্ষী। তারা পাকসেনাদের ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে। তারা ঘরে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন নিজের মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ করে আর অপরজনের সাক্ষাৎ ঘটে প্রিয়জনদের দেহাবশেষের সাথে। মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে সে তুলে আনে স্ত্রী ও সন্তানের পায়ের পাতা, হাড়গোড়, চুলের গোছা। সে পুনরায় কোদাল চালাতে থাকে যেন পৃথিবীর নাড়িভুঁড়িসুদ্ধ বের করে আনবে। দারুণ মুন্সিয়ানার সাথে গল্পের শেষ লাইনটিতে একটি প্রবল মোচড় দিয়েছেন হাসান আজিজুল হক। যুদ্ধকালীন সময়ের আরেকটি গল্প রফি। এই গল্পের মূল চরিত্র রফি কৃষিকাজ করে। সে একদিন যুদ্ধে যোগ দেয় এবং হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তারা রফিকে ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। রফি হত্যার রোমহর্ষক বয়ানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় গল্পটি। যুদ্ধের শেষদিকে যখন একের পর এক বিভিন্ন এলাকা মুক্তিবাহিনীর দখলে আসতে থাকে, যখন হানাদার বাহিনী হতোদ্যম হয়ে পড়ে এবং আটক হতে থাকে, সে সময়ের চিত্র উঠে আসে হাসান আজিজুল হকের ‘আটক’ গল্পে। তার ‘কেউ আসেনি’ নামক গল্পে দেখা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবাই আনন্দ-উল্লাস করতে থাকলেও হাসপাতালে পড়ে থাকা মুমূর্ষু আর মৃতদেহের খোঁজ নিতে কেউ আসে না। হাসান আজিজুল হকের ঝড়, নবজাতক ও নিশীথ ঘোটকী নামে আরও তিনটি গল্প আছে যে গল্পগুলোতে নির্মম হত্যাযজ্ঞ, ত্রস্ত মানুষের পলায়ন, আতঙ্ক ও শঙ্কার চিত্র ফুটে ওঠে।
যুদ্ধপরবর্তী প্রেক্ষাপটেও অনেকগুলো গল্প লিখেছেন হাসান আজিজুল হক। যুদ্ধ শেষে ঘরে ফেরে আলেফ নামে এক মুক্তিযোদ্ধা। এই আলেফের ঘরে ফিরে যাবার পর যা ঘটে তা পাঠককে চমকে দেয়। আলেফের ভাগ্য নগুগি ওয়া থিয়োঙের ‘দ্য চেইঞ্জ’ গল্পের নায়ক কাম্যুর ভাগ্যের মতো মন্দ নয়। কাম্যু বাড়ি ফিরে দেখেছিল, তার স্ত্রীকে আরেক প্রতিবেশী যুবক তার মৃত্যুর গুজব শুনিয়ে নিজের করে নেয়। এরিক নেলসনেরও এমন একটা গল্প আছে ব্লেক‘স গার্ল নামে। ব্লেকের বন্ধু ডেভ তার মৃত্যু সংবাদ শুনিয়ে স্ত্রী অ্যামিকে দখলে নেয়। এরপর ডেভের নিজের ভেতর একটা দহন চলতে থাকে। অবশ্য সে যুদ্ধে ব্লেক নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধে কিংবা যুদ্ধের গল্পে মা-স্ত্রী-পরিবার-পরিজন হারানোর বা চলে যাওয়ার ঘটনা নৈমিত্তিক। ঘরে ফিরে কাউকে না পাওয়ার গল্প অগুনতি। কিন্তু আমাদের ‘ফেরা’ গল্পের নায়ক আলেফের ক্ষেত্রে কথাকার হাসান আজিজুল হক দেখিয়েছেন একেবারেই ভিন্ন কিছু। আলেফ ঘরে ফিরে দেখে তার স্ত্রী ফিরে এসেছে। যুদ্ধে যাওয়ার আগে খাবার না পেয়ে সে আলেফের ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এখন সে আবার ফিরে এসেছে। ঘরে তার বৃদ্ধা মা আর স্ত্রী দুজনেই আছেন। আলেফ জানে, যুদ্ধোত্তর দেশে অভাব কতটা প্রকট হয়ে ওঠে। তাই সে স্ত্রীর দিকে অস্ত্র তাক করে জানতে চায়, খাবার না পেলে আবার ছেড়ে যাবে কি-না। কান্নায় ভেঙে পড়ে স্ত্রী এবং প্রতিজ্ঞা করে, যত কষ্টই হোক আর ফিরে যাবে না। এরই মধ্যে সরকারি ঘোষণা আসে তিনদিনের মধ্যে সকল অস্ত্র সমর্পণের জন্যে। কিন্তু আলেফ ভবিষ্যতের বিষয়ে সন্ধিহান। সে ভাবে, হয়ত আবার যেকোনো সময় অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হতে পারে। তাই সে অস্ত্র জমা না দিয়ে পানিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। হাসান আজিজল হক তার ‘ঘরগেরস্থি’ গল্পে তুলে এনেছেন যুদ্ধপরবর্তী সময়ের কঠিন সমাজবাস্তবতা। আশ্রয়ের সন্ধানে ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া পরিবারগুলো দেশে ফেরার পর কতটা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা দেখাতে চেষ্টা করেছেন তিনি এই গল্পে। শাসক বদল হলেও দুর্বলের ভাগ্য সহজে বদল হয় না, এই সত্যটিকে গল্পে তুলে এনেছেন কথাকার হাসান আজিজুল হক। তার গল্পগুলোর পাঠে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক একটি পরিস্থতি অনুধাবন করা যায়।
মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে তিনটি গল্প লিখেছেন কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তিনটি গল্পেই একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। নাগরিকের মনোস্থিত দেশপ্রেমের সুপ্ত চেতনাকে উসকে দেওয়া। এই চেতনা উসকে দেওয়ার কাজটি করতে গিয়ে তিনি কোথাও কোথাও বর্ণনার দীর্ঘসূত্রিতা টেনেছেন। অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে এই বর্ণনাশৈলীকে কিছুটা স্থুলতা মনে হলেও এর পেছনে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। তিনি তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে সরাসরি উপস্থাপন করতে চাননি। তিনি তার বক্তব্যকে ব্যঞ্জনাময় করে তোলার ক্ষেত্রে চরিত্রগুলোর আশ্রয় নিয়েছেন। তার ‘অপঘাত’ গল্পটির দিকে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, তরুণ মুক্তিযোদ্ধা বুলু বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে জীবন দিয়েছেন। কিন্তু তারই বন্ধু চেয়ারম্যানপুত্র সাজাহান নিজের বাড়িতে অসুখে মারা যায়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস শহিদ বুলুর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘ ন্যারেটিভের আশ্রয় নেননি। তিনি সাজাহানের মৃত্যুর বর্ণনাকে দীর্ঘায়িত করেছেন। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লেখক বারবার ফিরে গেছেন বুলুর বীরত্বের কাছে। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি উসকে দিয়েছেন বুলুর পিতার ভেতরের দেশপ্রেমের চেতনা।
গল্পের শুরুতে আমরা দেখতে পাই, বুলুর পিতা মোবারক আলী এবং তার স্ত্রী অত্যন্ত ভীরু প্রকৃতির। সন্তানের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে মৃত্যুর পরও তারা দুজন শব্দ করে কাঁদতে পারেন না। তাদের মধ্যে এই ভয় কাজ করে যে, উচ্চ শব্দে কান্না করলে পাক হানাদাররা টের পেয়ে যাবে এবং তাদের দুর্গতি নেমে আসবে। এক রাতে উচ্চশব্দে কান্নার শব্দে চমকে ওঠেন মোবারক আলী। তিনি ভেবেছিলেন, সন্তানের জন্যে স্ত্রী কাঁদছেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি টের পান, চেয়ারম্যানবাড়ি থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। চেয়ারম্যানের পুত্র সাজাহান মারা গেছে। চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশেই পাকবাহিনীর ক্যাম্প। তাদের সাথে চেয়ারম্যানের সখ্যও আছে। কিন্তু বাসায় যুবতী কন্যা থাকায় ভয়ে তিনি তাদের সাহায্য চাননি। সাজাহানের মৃত্যু হয় বর্ষাকালে। সেনা ক্যাম্পের সামনের একমাত্র পথ দিয়ে লাশ নিয়ে যেতে বারণ করে পাকবাহিনী। তাই কাদাজলের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রমের পর চেয়ারম্যান পুত্রের লাশ সমাধিস্থ করতে সক্ষম হয়। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জেগে ওঠে মোবারকের ভেতরের দেশপ্রেমের চেতনা। সে নিজের সন্তানের মৃত্যু নিয়ে গর্ব করতে থাকে। জুমার নামাজে দাঁড়িয়েও তার মনোচক্ষুতে খোদার বদলে পুত্রের চেহারা ভাসতে থাকে। বাড়ি ফিরতে দেরি হলে তার স্ত্রীর দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। মোবারক ভেবে পায় না, সন্তানের এমন বীরত্বপূর্ণ মৃত্যুর পর একজন মা কীভাবে অন্য বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করার সময় পায়, তার তো চিৎকার করে কান্নাকাটি করার কথা।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আরেকটি বিখ্যাত গল্প ‘রেইনকোর্ট’। এই গল্পটিতেও আমরা ‘অপঘাত’ গল্পের মোবারক আলীকে রসায়নের অধ্যাপক নুরুল হুদার ভেতর দেখতে পাই। গল্পের শুরুতে আমরা এক ভীরু নুরুল হুদাকে দেখতে পাই যিনি তার শ্যালক মিন্টুর মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার তথ্য গোপন করার জন্যে চারবার বাসা বদল করেন। কিন্তু একদিন মুক্তিযোদ্ধা মিন্টুর রেইনকোর্টটি গায়ে দেওয়ার পর তিনি অন্যরকম এক চেতনা অনুভব করেন। পাক সেনাদের নির্মম অত্যাচারের পরও তার এই চেতনায়, এই মনোবলে বিন্দুমাত্র চিড় ধরে না। ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ নামে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প লিখেছেন কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
গল্পটিতে আমরা সমাজের একটি শ্রেণিকে যুদ্ধের সময় আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে দেখি। বিপথগামী রানার হাতের স্টেনগানটি পেতে চায় আব্বাস পাগলা। সে দেখতে পায়, দখলদার বাহিনী চাঁদের দখল নিয়ে নিচ্ছে। তাই শত্র তাড়াবার জন্যে এই স্টেনগানটি তার দরকার। সবাই আব্বাসকে পাগল ভাবলেও মিলি তার কথার অর্থ বুঝতে পারে। তাই সবাই যখন আব্বাসকে ধরে হাসপাতালে রেখে আসে চিকিৎসার জন্যে, মিলি তাকে গোপনে দেখতে যায়। আব্বাস মূলত মিলির ভেতরে দেশপ্রেমের লুকানো বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আব্বাস সুস্থ হয়ে ফিরে এলে মিলি তার হাতে স্টেনগানটি তুলে দিতে চাইলে, সে তা ফিরিয়ে দেয়। তার সুস্থ মস্তিষ্ক আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর হয়ে ওঠে। তাই চেতনায় ঘোরগ্রস্ত মিলি হাতে তুলে নেয় স্টেনগান। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের তিনটি গল্পেই মূলত আমরা এমন এক দেয়াশলাইয়ের কাঠি দেখতে পাই যা মানুষের ভেতরের আগুনকে জ্বালিয়ে দেয়, অন্ধকারকে তাড়াতে প্ররোচিত করে।
মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে বেশ কিছু ছোটগল্প লিখেছেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। তাঁর গল্পে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আলোচনার নামে পাকিস্তানি শাসকদের কালক্ষেপণ, রণপ্রস্তুতি, যুদ্ধকালীন পাকবাহিনীর হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণ, বাঙালির তীব্র প্রতিবাদ এবং যুদ্ধপরবর্তী নিদারুণ সমাজবাস্তবতা। তার ‘বিস্ফোরণ’ নামক একটি ছোটগল্পে আমরা দেখতে পাই, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রাক্কালে আলোচনার নামে ভাওতাবাজি করে কিভাবে কালক্ষেপণ করা হয় এবং বাঙ্গালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে কিভাবে রণপ্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। পাকিস্তানি শাসক বাহিনী মানুষের মনে যে ঘৃণার বারুদ ছড়িয়ে দিয়েছিল তা মূলত বিস্ফোরন্মুখ হয়ে অপেক্ষমান ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ক্ষমতা হস্তান্তর না করা এবং একটি সংঘাত অনিবার্য করে তোলা পাকবাহিনী কি বিপুল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ২৬শে মার্চ কালরাতে, তার নিখুঁত বয়ান উঠে এসেছে আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘যুদ্ধ নয়’ গল্পে। গল্পটিতে একটি ব্যতিক্রম বর্ণনা শৈলীর আশ্রয় নিয়েছেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। গল্পের কথক হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন জন নামের একটি কুকুরকে। মার্চের কালরাতে কী বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকবাহিনী তার বর্ণনা উঠে এসেছে এই গল্পটিতে। লেখকের বর্ণনায় সে রাতের একটি মুহূর্তের পাঠ নেয়া যাক, ‘একটি ক্রুদ্ধস্বরের সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠলো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলোর দৌড়াদৌড়ি আর্তচিৎকার, কিন্তু পালাবে কোথায়? পেট্রোল ছড়িয়ে মারছে ধুমসে আগুনের গোলা, অল্পক্ষণেই দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল সারাগলি।’
আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সবচেয়ে মর্মস্পর্শী গল্পটি হচ্ছে ‘নীরবতা’। এই গল্পটিতে হানাদার বাহিনীর নারী নির্যাতনের ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে ওঠে। গল্পটির মূল চরিত্র তুফানী। তার ভাই মুক্তিফৌজের সদস্য। নুরা নামের এক রাজাকার এসে তাকে খবর দেয়, তার ভাইকে পাকিস্তানি বাহিনী আটক করেছে এবং তাকে উদ্ধার করতে হলে তুফানীকে মেজরের নৌকায় যেতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে বাঁচাতে তুফানী মেজরের নৌকায় যায় এবং নিপীড়ক মেজরকে নিয়ে খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সন্ধান মেলে না তুফানীর কিংবা মেজরের, সন্ধান মেলে না তুফানীর এই অসম সাহসিকতার গল্পের। কোনো খবরের কাগজের পাতায় কিংবা জনশ্রুতিতে তুফানীর গল্প প্রাধান্য পায় না। যুদ্ধের পর অসম সাহসিকতা নিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের কিভাবে মানুষ ভুলে যায় তার দৃশ্যপট নিয়ে ‘আমাকে একটি ফুল দাও’ নামক একটি গল্প লিখেছেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। যুদ্ধ করতে করতে হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে এক যোদ্ধার। তার সঙ্গীরা তাকে মৃত ভেবে রেখে চলে যায়। ঠিক সে সময় একটি গাড়ি তাকে উদ্ধার করে ভারতের হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। যুদ্ধের কয়েক বছর পর সুস্থ হয়ে নিজের গ্রামে ফিরে আসা সেই মুক্তিযোদ্ধাকে চিনতে পারে না তার পরিবারের সদস্যরা। তার ঘরের স্ত্রীটিও হয়ে যায় অন্য কারও। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আরও বেশকিছু গল্প লিখেছেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। গল্পগুলোর মধ্যে ‘রূপান্তর’, ‘দূরযাত্রা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘সংক্ষিপ্ত রূপ’, ‘আগন্তুক’, ‘আমার রক্ত’, ‘জলনাঙ্ক’, ‘কাক’ প্রভৃতি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে কয়েকটি অসাধারণ গল্প লিখেছেন মাহমুদুল হক। গল্পে তিনি সার্থকভাবে মুক্তিযুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্বকে উদঘাটন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে তার লেখা অন্যতম একটি গল্প ‘কালো মাফলার’। এই গল্পে দুই ভাই মনোয়ার ও টুলটুল। বড় ভাই মনোয়ার যুদ্ধে যায়নি। সে আগলে ধরে রাখে বাবা-মাকে। ছোট ভাই টুলটুল যুদ্ধে যাওয়ায় তাদের সকলের জীবনই বিপন্নপ্রায়। মনে হয় এই বুঝি রাজাকার এল, পাকবাহিনী এলো, এই বুঝি তাদের তুলে নিয়ে গেল। শঙ্কায়, অস্থিরতায় আর আতঙ্কে কাটতে থাকে তাদের দিন। এরই মধ্যে একদিন ছোটভাই টুলটুল মাকে দেখতে আসে রাতের আঁধারে। পথে দেখা হয়ে যায় এক রাজাকারের সাথে। রাজাকারটি তাকে চিনতে না পারলেও তার পথের দিকে লক্ষ্য রাখে এবং সে এ পথে হানাদার বাহিনীকে নিয়ে আসে তাকে ধরার জন্য। টের পেয়ে টুলটুল ঘর থেকে পালিয়ে যায়। মায়ের সাথে ইচ্ছে থাকলেও সে দেখা করে না। কারণ মা আবেগের আতিশয্যে তা সকলের কাছে বলে দেবে এবং বিপন্ন হয়ে উঠবে পরিবারের সকলের জীবন। তাই সে রাজাকার ও হানাদার বাহিনীর তাড়া খেয়ে ফিরে যায়। যাবার সময় বড় ভাই মনোয়ারের কাছ থেকে নিয়ে যায় কালো একটি মাফলার। টুলটুল চলে যাওয়ার পর থেকেই রাতভর মনোয়ারের ভেতর চলতে থাকে এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যুদ্ধে জড়িয়ে যায় মনোয়ারের হৃদয়। পরদিন সকালে শোনা যায় সম্ভবত কোনো চোর কিংবা ডাকাত দেয়াল টপকে পালিয়ে যাবার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে। তার গলায় থাকা কালো মাফলারে ফাঁস দিয়ে নাকি তাকে হত্যা করা হয়।
এই গল্পে মনোয়ারের পিতার আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠা, সন্তান ও দেশের প্রতি মায়ের গোপন প্রণয়, অন্য সবার স্বার্থপরতার মনস্তত্ত্বের প্রভাবে মনোয়ারের ভেতরের দেশপ্রেমের সত্ত্বাটি জেগে ওঠাসহ মুক্তিযুদ্ধকালীন সাধারণ শ্রেণির মনস্তত্ত্ব উঠে এসেছে এই গল্পটিতে। মাহমুদুল হকের ‘বেওয়ারিশ’ গল্পে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধকালীন আশঙ্কা, অস্থিরতা ও উত্তেজনার স্বরূপ। গল্পের কাহিনী শুরু হয় জামশেদ চৌধুরীর জানালার পাশে পড়ে থাকা একটি বেওয়ারিশ লাশকে ঘিরে। আতঙ্ক আর উত্তেজনায় হিম হয়ে যায় পুরো পরিবার। লাশটিকে ঘিরে তারা পুরো পরিবার বিপন্নতা বোধ করে। কোনো করণীয় ভেবে উঠতে পারে না তারা। প্রতিবেশী তরফদারও কোনো সমাধান দিতে পারে না। অবশেষে দুজন রাজাকার আসে। তাদের হাতে পঞ্চাশ টাকা বকশিশ তুলে দেয় জামশেদ চৌধুরীর স্ত্রী। এতে সমাধান মিলে যায়। রাজাকাররা লাশটিকে টেনে নিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে পরিবারটি। মুক্তিযুদ্ধকালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার টানপোড়েন এভাবেই তুলে আনেন গল্পকার মাহমুদুল হক।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন শওকত ওসমান। তার দুই বিগ্রেডিয়ার নামক ছোট গল্পটি যেকোনো সুস্থ মানুষের মস্তিষ্ককে ঝাঁকুনি দিতে সক্ষম। গল্পটিতে তিনি শাসক ও শোষিতের মনোভঙ্গির স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। গল্পের একটি চরিত্র সয়ীদ ভুঁইয়া। তিনি ফায়ার বিগ্রেডের সদস্য। দায়িত্বসচেতন সয়ীদ ভূঁইয়া ২৬শে মার্চ কালরাতে হঠাৎ দেখতে পান আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়েছে। সবাইকে সাবধানে থাকতে বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন আগুন নেভাতে। তারপর ফায়ার স্টেশন থেকে সদলবলে বেরিয়ে পড়লেন আগুন নেভানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু পথেই পাকবাহিনীর বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয় তার সহকর্মীদের প্রায় সকলেই। তারা সবাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তাদের সাথে শহীদ হন ফায়ার বিগ্রেড অফিসার সয়ীদ ভুঁইয়াও। এই গল্পটিতে গল্পকার দেখিয়েছেন, একটি বাহিনী মানুষকে হত্যা করতে ও অগ্নিসংযোগ করতে কী বিপুল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আরেকটি বাহিনী জীবনকে হাতের মুঠোয় রেখে কিভাবে মানুষকে বাঁচাতে আগুন নেভানোর জন্যে নেমে পড়ে। শওকত ওসমানের ‘জন্ম যদি তব বঙ্গে’ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আরেকটি সুখপাঠ্য গল্প।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে বেশ কয়েকটি চমৎকার গল্প লিখেছেন কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক। স্বাধীনতাকে উপজীব্য করে লেখা আবু ইসহাকের অন্যতম একটি গল্প ‘ময়না কেন কয় না কথা’। এই গল্পটির মূল চরিত্র একটি ময়না পাখি। পাখিটি প্রায় মানুষের মতো করে জয়বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারত। একদিন বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় একজন রাজাকার জয়বাংলা ধ্বনি শুনতে পায়। সে পাকিস্তানি ক্যাম্পে হানাদার বাহিনীকে খবর পৌঁছে দেয়। হানাদার বাহিনীর সদস্যরা বাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং তন্নতন্ন করে খোঁজ করে। কিন্তু জয়বাংলা ধ্বনি শুনতে পেলেও তারা কোথাও কোনো মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান পায় না। অবশেষে মেজর দেখতে পান, খাঁচায় বন্দী একটি ময়না পাখি জয়বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করছে। তিনি পাখিটিকে ক্যাম্পে নিয়ে আসেন এবং একজন সৈন্যকে দায়িত্ব দেন পাখিটিকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শেখানোর জন্যে। কিন্তু সে পাখিটিকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শেখাতে ব্যর্থ হয়। পাখিটিকে যতই পাকিস্তান জিন্দাবাদ শেখানোর চেষ্টা করা হয়, ততই পাখিটি জয়বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করে। অবশেষে বিরক্ত হয়ে মেজর পাখিটিকে ছেড়ে দেয়। পাখিটি একটি গাছের ডালে বসে জয় বাংলা উচ্চারণ করতে থাকে। একদিন ক্যাম্পে ফিরে মেজর জয়বাংলা ধ্বনি শুনতে পেয়ে খুব বিরক্ত হন এবং পাখিটিকে গুলি করেন। পাখিটি তখন উড়ে পূর্বদিকের বনাঞ্চলে চলে যায়। স্বাধীনতার পর আবার পাখিটি ফিরে আসে। তারপর একদিন পাখিটি বুঝতে পারে এদেশে স্বাধীনতা নেই। তখন পাখিটি আবার উড়ে চলে যায় বনে। মূলত এই গল্পটিতে মুক্তভাবে পাখিটির জয় বাংলা উচ্চারণকে স্বাধীনতার সাথে প্রতীকী তুলনা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশের স্বাধীনতা আবার ভূলুণ্ঠিত হয়। তাই স্বাধীন দেশে পাখিটি ফিরে এলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আবার বনে ফিরে যায়। গল্পে ময়না পাখিকে প্রতীকী অর্থে সার্থক ব্যবহার করেছেন গল্পকার আবু ইসহাক।
সত্যেন সেনের গল্পে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আবহ। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে এদেশের আপামর জনতা যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। তিনি গল্পচ্ছলে দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের চেয়ে এদেশের আমজনতার আত্মত্যাগই মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে প্রকৃত ভূমিকা রেখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদানও কম ছিল না। তার ‘পরীবানুর কাহিনী’ গল্পে আমরা দেখতে পাই একজন স্কুল মাস্টার হারুন মুক্তিযুদ্ধে যেভাবে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছেন, তার স্ত্রীও সে ক্ষেত্রে কম যাননি। মূলত পরীবানু এদেশের নারী যোদ্ধাদের প্রতীক। নারীরা কিভাবে তাদের আজন্ম লালিত সতীত্বকে বিসর্জন দিয়ে পাকবাহিনীকে বিভ্রান্ত করেছেন, তা অত্যন্ত যত্নের সাথে সত্যেন সেন তাঁর পরীবানুর কাহিনী গল্প তুলে এনেছেন। এই পরীবানুরা প্রজাপতির মতো উড়ে গেছেন ডানা মেলে আর তার পেছনে পেছনে পঙ্গপালের ন্যায় ছুটে আসা পাক হানাদার বাহিনীকে কিভাবে নেশা দ্রব্য খাইয়ে দিয়ে পুরুষ সহযোদ্ধাদের মতো বীরদর্পে হত্যা করেছেন এই পরীবানুরা, তা খুব সযত্নে চিত্রায়িত করেছেন সত্যেন সেন।
মুক্তিযুদ্ধে নারী নিপীড়নের ঘটনা নিয়ে অনেকগুলো গল্প রচিত হয়েছে। বেশিরভাগ গল্পের বিষয়বস্তু প্রায় একই রকম। গল্পগুলোতে উঠে এসেছে হানাদার বাহিনী কর্তৃক নারী নিপীড়ন, নারীদের অসম সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের কথা। এক্ষেত্রে আমি দুটি গল্পকে বিশেষভাবে পর্যালোচনা করতে চাই। দুটি গল্পের বিষয়বস্তুই প্রায় কাছাকাছি। দুটি গল্পতেই উঠে আসে হানাদার বাহিনী কর্তৃক নারী নিপীড়ন ও নির্যাতিত নারীর অসম সাহসী হয়ে ওঠা। কিন্তু দুটি গল্পে পাঠককের মনোজগতে একেবারেই ভিন্ন মাত্রায় মোচড় দিতে সক্ষম হয়েছেন দুজন গল্পকার। প্রথম গল্পটি লিখেছেন গল্পকার আবু রুশদ। গল্পটির নাম ‘খালাস’। এই গল্পের মূল চরিত্র শাহানা। তার দূর সম্পর্কীয় ছোট ভাই বরকত একজন রাজাকার। কিন্তু শাহানার প্রতি তার ছিল কৈশোরের প্রেম। বরকত পাকিস্তানি অফিসারদেরকে ক্যাম্পে নারী সরবরাহ করে। একদিন সে শাহানা আপার একটি চিঠি পায়। চিঠিতে শাহানা আপা একশো টাকা চায় তার কাছে। বরকত দ্রুত ছুটে যায় শাহানা আপার কাছে। শাহানা তাকে বিবস্ত্র হয়ে বলে, ‘দেখ, চোখ ভরে দেখ। মিলিটারি পেট কেমন করেছে খতিয়ে খতিয়ে দেখ। তারপর ফিরে গিয়ে রসিয়ে রসিয়ে গল্প করিস।’ এই সংলাপের মধ্য দিয়ে শাহানার ভেতরের অবর্ণনীয় ঘৃণা, ক্ষোভ ও দ্রোহের ফুলকি উগরে বেরিয়ে আসে।
দ্বিতীয় যে গল্পটির কথা বলছিলাম সেটি লিখেছেন গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই। গল্পটির নাম ‘একাত্তরে মোপাসাঁ’। লেখক এই গল্পে মুক্তিযুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্বকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। যেসকল পরিবারে যুবতী মেয়ে ছিল, সেসব পরিবার কতটা উদ্বেগ-উত্তেজনায় কাটিয়েছে প্রতিটি দিন, তারই সচিত্র রূপ বর্ণনা করেছেন হাসনাত আবদুল হাই। পাকিস্তানি মেজরের জিপ পাশ্ববতী রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় প্রবল শীতের রাতেও আতঙ্কে ঘামতে থাকে প্রতিটি পরিবার। মনে হয় এই বুঝি ঘনিয়ে এলো কেয়ামত। এক একটি রাত যেন পুলসিরাতের রাত। যেন প্রবল অন্ধকারে অনিঃশেষ চুলের সাঁকো পাড়ি দিচ্ছেন তারা। প্রতিটি রাতেই পাকিস্তানি মেজরের জিপটি গিয়ে থামে এলাকার সর্বশেষ বাড়িটির সামনে। তারপর দ্রুত পায়ে মেজর উঠে যায় তিনতলায়। যেন তখনই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে প্রতিটি পরিবার। তিনতলা ফ্ল্যাটে রমা নামে এক যুবতী থাকেন। মেজর তার প্রতি ভীষণ মুগ্ধ। মেয়েটির নাচ-গান আর শরীরের আস্বাদ নিতে প্রতিরাতেই ছুটে আসে সে। দিন যায়, এই ঘটনা জানাজানি হয়ে যায় মানুষের মধ্যে। প্রতিদিনই মেয়েটির কাছে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন আবদার নিয়ে ছুটে আসে তার কাছে। কেউ পদোন্নতি, কেউ ব্যবসার সুবিধা আবার কেউ কেউ নিখোঁজ আত্মীয়ের সন্ধান নিতে ছুটে আসেন। সময়ের সাথে সাথে পূর্ববর্তী গল্পের শাহানার মতো স্ফীত হতে থাকে রমার পেট। পেট স্ফীত হওয়ার বয়স যখন সাত মাস, তখন যুদ্ধের বয়স নয় মাস। বিভিন্ন স্থান থেকে আসতে থাকে পাকিস্তানীদের পরাজয়ের খবর। পাকিস্তানি মেজর আর রাস্তায় নামতে পারে না। রমার কাছে মেজরের একটি চিঠি আসে। সে তাকে সাথে করে পাকিস্তানে নিয়ে যেতে চায়।
গল্পটিকে এখানেই থামিয়ে দিয়ে এক মনস্তাত্ত্বিক খেলায় মেতে ওঠেন গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই। তিনি মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে তিনটি সিদ্ধান্তে আসেন। মনস্তত্ত্বের প্রথম ব্যাখ্যায় হাসনাত আবদুল হাইয়ের কাছে মনে হয়, বিনা বাক্যব্যয়ে মেয়েটি মেজরের হাত ধরে পাকিস্তানে চলে যাবে। কিন্তু এরপরই হাসনাত আবদুল হাই আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দাঁড় করান। এমনও হতে পারে মেয়েটি মেজরের আহবানে সাড়া দেবে না। সে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করবে। এরপর গল্পকার ফিরে আসেন তার এই ব্যাখ্যা থেকেও। এমনও হতে পারে, মেয়েটি মেজরের হাত ধরে পাকিস্তানে চলে যাবে না, মেয়েটি আত্মহত্যাও করবে না। কিন্তু একদল লোক তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সম্পর্কের অভিযোগ আনবে। তারা তার বিচার চাইবে। তখন মেয়েটি বলবে, ‘চলো, বিচার হোক।’
মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে যারা ছোটগল্প লিখেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জহির রায়হান। যুদ্ধলব্ধ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছেন বেশকিছু ছোটগল্প। নিজে সাংবাদিকতা করেছেন, চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করেছেন। তার প্রভাব গল্পেও পড়েছে। তার ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পটিতে একজন রিপোর্টারের চরিত্রে দাঁড় করিয়েছেন নিজেকে। গল্পটির শৈলী একেবারেই ভিন্ন বলা যায়। ছোট ছোট বাক্যে লেখা গল্প। অধিকাংশ বাক্যই দুই-তিন শব্দে লেখা। এক শব্দের বাক্যও আছে। এই ছোট ছোট বাক্যগুলো সাগরসম গভীরতা ধারণ করা আছে। পুরো গল্পটি চেতনার অন্তঃশীল প্রবাহে লেখা। ঝরঝরে। মেদমুক্ত। শুধু কি শৈলীর জন্যেই এই গল্পটি অসাধারণ? না, মোটেও তা নয়। পাঠক যতক্ষণ এই গল্পটি পড়তে থাকে, তার ভেতরে চলতে থাকে উত্তেজনা আর ক্ষরণ। যে মুক্তিযোদ্ধা ছেলেটি স্বপ্ন দেখত, একদিন দেশ স্বাধীন করে ফিরে যাবে মায়ের কাছে, বোনের কাছে, প্রিয় নারীটির কাছে, শেষ পর্যন্ত সে একটা অপারেশনে গিয়ে ধরা পড়ে পাকবাহিনীর হাতে। তার ডায়েরির লেখাগুলো পাঠককে অশ্রুসজল করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদাররা এদেশের যতটা ক্ষতি করতে পারতেন, সে ক্ষতির পরিমান বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছিল এদেশের রাজাকাররা, এ ব্যাপারে কারোই দ্বিমত থাকার কথা নয়। তাই যুদ্ধকালীন সময় থেকেই তাদের প্রতি মানুষের একটা ঘৃণাবোধের জন্ম হয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ ভালোমন্দ বুঝতে না পেরেই রাজাকারে নাম লিখিয়েছিলেন, কেউ কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, কেউ কেউ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করার কৌশলগত উদ্দেশ্যে রাজাকারে যোগ দিয়েছিলেন। এমন প্রেক্ষাপট নিয়ে বেশকিছু গল্প রচিত হয়েছে। এই আলোচনায় এরকম দুটি গল্পের কথা উল্লেখ করছি। ‘কলিমদ্দি দফাদার’ নামে একটি গল্প লিখেছেন আবু জাফর শামসুদ্দিন। দফাদার হচ্ছে গ্রাম্য ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদারের সর্দার। কলিমদ্দি দফাদারের দরিদ্র চাকরি। যখন যে হুকুম আসে কলিমদ্দি তাই তামিল করে। দরিদ্রতার কারণে ১৯৭১ সালেও তার কাজে ইস্তফা দেয়ার সুযোগ থাকে না। কিন্তু সে মননে ধারণ করে দেশপ্রেমের চেতনা। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে হানাদার বাহিনীর সদস্যদেরকে হত্যা করার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলে সবাই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায়। শুধু দফাদার থেকে যায় কলিমদ্দি।
অনুরূপ প্রেক্ষাপটে আরেকটি গল্প লিখেছেন ইমদাদুল হক মিলন। তার লেখা গল্পটির নাম ‘লোকটি রাজাকার ছিল’। এই গল্পে এক রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে। রাজাকারটির নাম নিজাম। সে গ্রাম্য সহজ-সরল অভাবী লোক। তাকে লোভ দেখিয়ে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে ভুল বুঝিয়ে রাজাকারে নাম লেখানো হয়। পরবর্তীকালে সে তার ভুল সম্পর্কে জানতে পেরে অবাক হয় ও অনুতপ্ত হয়। গল্পটির মধ্য দিয়ে গ্রাম্য সহজ-সরল লোকজনকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত করার বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে আনেন কথাকার ইমদাদুল হক মিলন।
মুক্তিযুদ্ধকালে অনেকেই তাদের ব্যক্তিগত শত্রুতাকে চরিতার্থ করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এমনই একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় মঈনুল আহসান সাবেরের ‘কবেজ লেঠেল’ নামের একটি চমৎকার গল্পে। আকমল প্রধান তার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যে কবেজকে ব্যবহার করে। সে তাকে এক টুকরো জায়গা, নগদ টাকা ও সৃষ্ট ঝামেলা থেকে বাঁচিয়ে দেয়ার লোভ দেখায়। এমনকি তাকে লেঠেল বংশের মান ইজ্জত রাখতে হবে বলে ক্ষেপিয়ে তোলে। সে রমজান শেখকে হত্যা করার জন্যে কবেজকে প্ররোচিত করে। কিন্তু হানাদার বাহিনীর মর্মন্তুদ অত্যাচার, ধর্ষণ, নিপীড়ন দেখে কবেজের ভেতর মনুষত্ব জেগে ওঠে। হানাদার বাহিনীর অতি ঘনিষ্ট হয়ে ওঠা রমজান শেখকে শেষ পর্যন্ত সে হত্যা করে। এর আগেও সে প্রকাশ্যে একটি খুন করেছিল আকমল প্রধানের প্ররোচনায়। কিন্তু কোনো সম্পত্তি বা অর্থের লোভে সে এবারের খুনটি করেনি। হানাদার বাহিনীকে জুলুমে সহায়তা করায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটায় সে।
পরিসরের সীমাবদ্ধতার কারণে এই গদ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অসংখ্য গল্পের আলোচনা সংযুক্ত করা যায়নি। আরও অনেক গল্প আছে যেগুলো এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। বিশেষ করে শওকত আলীর লেলিহান সাধ, রশিদ হায়দারের তখন, সরদার জয়েনউদ্দিনের যে ঋণে দেউলিয়া, মকবুলা মনজুরের মুক্তিযুদ্ধের গল্প, সৈয়দ শামসুল হকের ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না বলে, বশির আল হেলালের প্রথম কৃষ্ণচূড়া, নির্মলেন্দু গুণের শেষ যাত্রা নয়, আবদুল হাফিজের লাল পল্টন, সুব্রত বড়ুয়ার বুলি তোমাকে বলছি, রাবেয়া খাতুনের মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, ফজলুল হকের চরিত্র, বুলবন ওসমানের সোলেমান ভাই, আসাদ চৌধুরীর কমলা রঙের রোদ, আবদুল গাফফার চৌধুরীর রোদের অন্ধকারে বৃষ্টি, জাহানারা ইমামের ভিটেমাটি, সেলিনা হোসেনের পরজন্ম, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের মুরুহীন মহারাজ, রবিউল হুসাইনের মাটির মেডেল, মাহবুব তালুকদারের শরনার্থী, সাদেকা সফিউল্লাহর যুদ্ধ অবশেষে, জুবাইদা গুলশান আরার বাতাসে বারুদ-রক্তে নিরুদ্ধ উল্লাস, এহসান চৌধুরীর একাত্তরের গল্পসহ আরও অনেক গল্প এই আলোচনায় সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও আলোচনার দাবি রাখে। ·
লেখক পরিচিতি : মাইনুল ইসলাম মানিক কবি ও অনুবাদক। জন্ম ১১ মার্চ, ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে, চাঁদপুরে। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি) পদে কর্মরত। এমফিল গবেষক, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। মোট গ্রন্থসংখ্যা নয়টি। এছাড়া ইউনিসেফের অর্থায়নে দুটি প্রকল্পে রুম টু রিড থেকে চল্লিশটি শিশুতোষ গ্রন্থ ইংরেজিতে ভাষান্তর ও সম্পাদনা করেছেন। সাহিত্য সংগঠন সাহিত্য মঞ্চ, চাঁদপুর-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।


0 মন্তব্যসমূহ