অরিন্দম বসুর গল্প : ডায়েরির ছেঁড়া পাতায় যা লেখা ছিল


মন নয় যে প্রথমে আমাদের অঞ্চল থেকেই ধরপাকড় শুরু হয়েছিল। আবার এমনও হতে পারে যে প্রথমে আমাদের অঞ্চল থেকেই ধরপাকড় শুরু হয়েছিল। এ বিষয়ে কোনও নথিপত্র তো পাওয়া যায়নি। ইতিহাসেও ব্যাপারটা নিয়ে কিছু লেখা হয়নি। তবে পাগলদের যে ধরা হচ্ছিল সে কথাটা সত্যি কারণ তা দিবালোকে ঘটেছে এবং অনেকেই চর্মচক্ষে দেখেছে। নৈশালোকেও দেখেছে কেউ কেউ।

দায়িত্বটা কর্পোরেশনকে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশকে নয়। তারা খামোকা পাগল ধরতে যাবে কেন? ধরার মতো কি অন্য কেউ নেই? তাছাড়া পাগল ধরতে বলাটা পুলিশের পক্ষে অসম্মানজনকও বটে। পরে জানা যায় পুলিশ কমিশনার সেরকমই বলেছিলেন। আস্তে আস্তে এমন অনেক কিছুই জানা যাবে। শুধু ধৈর্য ধরে যদি অপেক্ষা করা যায়।

কর্পোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কেননা ইতিপূর্বে তারা কুকুর ধরার কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। রাস্তার কুকুর অবশ্যই। বাড়ির কুকুরকে তো বাড়িতেই ধরে রাখা হয়। তাদের ওঠা-বসা খাওয়া-শোওয়া সবই মালিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যত ঝামেলা রাস্তার কুকুরদের নিয়ে। বিশেষ করে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে। প্রকাশ্যে যেভাবে তারা উপগত হয় তাতে দৃশ্যদূষণ তো ঘটেই। অনেক চেষ্টা করেও তা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যাপারটা দেখেও না দেখার, পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অথবা ফ্যাক ফ্যাক করে হাসার কিংবা ঢিল ছুড়ে রসভঙ্গ করে মজা পাওয়ার। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ আসলে ওই সময় স্বকপোলকল্পিত কোনও দৃশ্যের সামনে পড়ে যায়। যতই হোক— জামাকাপড় তো পরা থাকে অভ্যাসবশত। অন্যসময় কুকুর দেখেও তাদের ল্যাংটো বলে মনে না হলেও ওই সময় পরিষ্কার বোঝা যায় এবং তখন নিজেদের সঙ্গে তুলনা টানার একধরনের প্রবণতা এসে যায়। হাসি পাওয়ার কারণও নাকি সেটাই। তবে এই সভ্য শহরে রাস্তার কুকুরের সংখ্যা এখন অনেক কম।

মনে রাখা ভাল যে মনোবিজ্ঞানীরা কথাগুলো কুকুর নিয়ে বলেছেন অথবা মানুষ নিয়ে। পাগলদের নিয়ে নয়। এখানে তাদের নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমি সে কথাই বলছি।

কোনওরকম আভাস ইঙ্গিত ছাড়াই, বা বলা যায় কোনও গুপ্ত খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ার আগেই সরকারি তরফে পাগল পাকড়াও অভিযান শুরু হয়েছিল। শহরে পাগলদের সংখ্যা বাড়ছে এবং তার ফলে জনমানসে ও সমাজজীবনে তার কুপ্রভাব পড়ছে— এই কারণেই পাগলদের ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বলা বাহুল্য এমন সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়নি। হলে তা পাগলামো হত। এর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ মন্ত্রীদের করতে হয়। কাজেই এজন্য কোনও আইন পাশ করাতে হয়নি। তবু এ হল সরকারি সিদ্ধান্ত। তখনই ঠিক হয় এই কাজের দায়িত্ব কর্পোরেশনকে দেওয়া হবে কারণ সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে একমাত্র তাদের কাছেই বিরাট সাঁড়াশি ও জাল রয়েছে। পদ্ধতি পুরনো হতে পারে তবে তা এখনও যথেষ্ট কার্যকর।

পাগলদের সংখ্যা যে বাড়ছে সে বিষয়ে আমারও কোনও সন্দেহ ছিল না। আমাদের পাড়াতেই তো সাত-সাতটি পাগল ঘোরাফেরা করত। একসঙ্গে এত পাগল আর কোথাও দেখা যায় বলে জানতাম না। বহুবার মনে হয়েছে একটি বড় পার্ক থাকায় আমাদের অঞ্চলে পাগলের সংখ্যা বেশি। এমন নয় যে পাগলরা পার্কে হাওয়া খেতে আসে। পার্ক হচ্ছে সকালে মানুষের হাঁটা ও বাড়ির কুকুরদের হাগামোতার জায়গা। বিকেলে খেলা ও শিশুদের ছুটোছুটির জায়গা। রাতে অত্যন্ত চড়া সোডিয়াম আলো লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে কোনও নারী-পুরুষ আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় বসে থাকার সুযোগ না পায় ও দৃশ্যদূষণ না ঘটে। তবে যে কোনও মুক্তাঞ্চলই পাগলদের বাড়বৃদ্ধির পক্ষে উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আমার ধারণা হয়েছিল। পার্ক হয়তো সেরকমই।

আমাদের পাড়ায় প্রথম ধরা পড়ে বিশু পাগল। এক কবির প্রাচীন, ভগ্ন, জরাজীর্ণ মূর্তির পাদদেশ থেকে, অনেক বছর আগেই যা পরিত্যক্ত হলেও সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি। প্রাকৃতিক ভাবে বিলীন হয়ে যাওয়ার জন্য ফেলে রাখা হয়েছে। বিশু সকাল আটটা থেকে ন’টা ও সন্ধে সাতটা থেকে আটটা চারমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিত। কেউ যখন এভাবে ঘড়ি ধরে চেঁচায় তখন বোঝার আর কী-ই বা বাকি থাকে যে সে পাগল। অবশ্য সেয়ানাও হতে পারে। এও বোঝা যায় যে বিশু ওই সময়গুলোতেই বত্তৃতাবাজি করত কারণ তখন শোনার লোক বেশি থাকে। তবে তার বিরুদ্ধে প্রকৃত অভিযোগ আরও মারাত্মক। তা হল, যে কোনও রাজনৈতিক দলকেই সে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করত এবং নেতাদের গালিগালাজ করত। অক্ষমতাসীন বিরোধীরা আপাতত তা সরিয়ে রাখলেও ক্ষমতাসীন দলের তো গায়ে লাগতেই পারে। একে ঠিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলা যাবে না, তবে যাকে বলা যায় প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা। বিশুর কিছু কিছু কথা আমি শুনেছি আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। যেমন—

যতই জনগণের কথা বলো না কেন, আসলে তো তাদের পিছনেই হুড়কো দেওয়া চলছে।
নেতারা সব এক একটি বিষফোঁড়া, না কাটলে রক্ষে নেই।
কথা আমি বলবই, কোনওভাবেই আমার মুখ বন্ধ করা যাবে না।

আরও অনেকের মতোই আমি সুস্থ মানুষ। রান্না, খাওয়াদাওয়া, ঘোরা, কেনাকাটা, ফুল ফোটানো, গৃহপালিত পশুর যত্নআত্তি ছাড়া দেশ এবং পৃথিবীর স্পর্শকাতর কোনও ঘটনাতেই কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পর থেকে আমি প্রকৃত সচেতন নাগরিক এবং সম্পূর্ণ সুস্থ ব্যক্তি হিসেবে স্ত্রী, পুত্র, চাকরি-সহ আমার জীবন অতিবাহিত করে আসছি। ভোল্টেজ বা ম্যাগনেটিক পোলারাইজেশনের মতো সহজ ডিজিটাল জীবন।

একটা সময় ছিল যখন সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানাতে পারত। নেহাত প্রতিক্রিয়া জানানোও সহজ ছিল। কিন্তু ক্রমশ দেখা যায় এসবের ফলে তাদের মনের ওপর খুবই চাপ পড়ছে। বিভিন্ন সামাজিক ঘটনাকে অনেকেই অসামাজিক বলে মনে করতে শুরু করছে। এমনকি লটারি জেতার মতো ইতিবাচক অর্থনৈতিক ঘটনাতেও মনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ভীত, বিচ্ছিন্ন, কর্মহীন, সামাজিক মেলামেশায় অনুপযুক্ত, রাগী ও অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কোনওরকম বায়োলজিক্যাল কারণ ছাড়াই কারও মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। ওই একইরকমভাবে অনেকে অন্ধও হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ তার কানে কারও অদৃশ্য কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে। যদিও সরকারি চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানানো হয় যে এ সবই আসলে কল্পনা। মনের ভুল। সত্যি করে কিছুই ঘটছে না। তারপরেও যদি কেউ এমন বলে তাহলে তাকে পাগল বলে ঘোষণা করা হবে যা থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে প্রতিক্রিয়া জানানো বন্ধ করা। সমাজে তোমার আচরণ কেমন হবে তা ঠিক করার জন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন—

জন্মের পর থেকেই তোমার পরিবার।
তারপর তোমার প্রতিবেশী।
তারপর ধর্মভিত্তিক সংগঠন।
তারপর সরকার।
তাতেও না কুলোলে জেল এবং পাগলাগারদ।

সমাজে সুস্থ মানুষের প্রয়োজন আছে। সুস্থ থাকতে গেলে বিধি মেনে চলার প্রয়োজন রয়েছে। সরকার যখন থেকে তোমার দায়িত্ব নেবে তখন থেকে তার পদ্ধতিতেই সে চলতে চাইবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

যদিও এই পদ্ধতি কাজের বলে প্রমাণিত হয় তবে সকলেই যে সুস্থ হয়ে উঠেছিল তা নয়। পাগলরা রয়েই গিয়েছিল। তখন অবশ্য তাদের আচরণ ধর্ম, শান্তি ও সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠেনি। বুঝতে পারার পর তাদের ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিশু পাগলকে ধরতে কর্পোরেশনের লোকদের বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। চারদিক বন্ধ একটি ভ্যান এসে চৌমাথায় থামে। সেখান থেকে দুজন গিয়ে বিশুর দু’হাত চেপে ধরতেই সে সুড়সুড় করে ভ্যানের দিকে এগিয়ে যায়। অকুস্থলে অনেক মানুষ ছিল। তারা কেউই কিছু বলেনি। শুধু দেখছিল। তবে ভ্যানে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে, কেন কে জানে, বিশু ওপর দিকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসে ও চেঁচিয়ে বলে ওঠে— “এরপর কী হইল জানে শ্যামলাল।” আমার বুক ছ্যাঁত করে ওঠে ও আমি স্যাঁত করে ব্যালকনি পরিত্যাগ করি।

একটু পরে আমি রেগে গিয়েছিলাম। বউকে বললাম, “আমাকে ওরকম কেন বলল বলো তো?”
সে বলল, “ছাড়ো। পরে কী হবে তা তুমি কী করে জানবে? তুমি কি পাগল! যদি কেউ কিছু জানতে চায়, বলবে, আমি কিছুই দেখিনি।”

বিশু পাগল ধরা পড়ার পর আমাদের অঞ্চল যে শান্ত হয়ে গেল তা নয়। দু’দিন পর রাতের বেলা আরও একজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল। সে হল দেশি পাগল। একেও পার্কের আশেপাশেই ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত এবং হাঁটার সময় তার দু’হাঁটু ভেঙে যেত ও দু’হাত কাঁধ থেকে এমনভাবে ঝুলত যেন আলগা লাগানো। মাঝে মাঝেই সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠত— “দেশের কথা কেউ ভাবল না। মা, মাগো, তোর জন্য বুক চিরে রক্ত দিতে পারি। তুই আমার জননী মা গো।”

বজ্রনির্ঘোষ না হলেও এই চিৎকারে অনেকেই সময়ে সময়ে চমকে উঠত। “এই যাঃ এই যাঃ” করত। তারপর দেশি আচমকা উধাও হয়ে যাওয়ায় ব্যাপারটা থিতিয়ে যেত। তবে সরকার যেহেতু জনতার খেয়াল রাখে তাই তাদের ওপর কোনও পাগলের প্রভাব পড়তে দেওয়া হয়নি। দেশির দেশমাতৃকার বন্দনা নিয়ে হয়তো কোনও আপত্তি ছিল না কিন্তু ওই বুক চিরে রক্ত দেওয়ার কথাটা নিয়েই সম্ভবত আশঙ্কার উৎপত্তি ঘটে থাকবে। যে নিজের বুক চিরতে পারে বলছে তার অন্যের বুক চিরতে কতক্ষণ! এ তো যাকে বলে ঘুরপথে হুমকি। তাছাড়া দেশের কথা কেউ ভাবল না এরকম বলার মানেই বা কী? কেউ মানে কারা? তারা যদি নাও ভেবে থাকে তাহলেই বা তুই বলার কে?

এক বৃষ্টির রাতে দেশি পাগলকে ধরে ফেলা হল। সে চিৎকার করে উঠেছি— “মা গো, তুই সাক্ষী রইলি মা।” ঝটাপটিও হয়েছিল খানিকক্ষণ। মুষকো দু-তিনজন তাকে চ্যাংদোলা করে ভ্যানে নিয়ে গিয়ে তোলে। আমি সেদিনও ব্যালকনিতে ছিলাম। তবে আগের বারের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বেশ আড়ালে। ভ্যানের পিছনের দরজা খুলে যাওয়ায় কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি ভেতরের নিকষ কালো অন্ধকারটুকু দেখতে পেয়েছিলাম। সেই অন্ধকার পাগলটাকে গিলে ফেলে আর ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।

এখন বই পড়া নিষিদ্ধ। তবে আমি যখন বই পড়তাম তখন একবার জানতে পারি, মিশরের একটি প্রাচীন পুথিতে লেখা ছিল— কারও হৃদয় যখন আঘাত পায় তখন তা সংকুচিত হয়ে আসে এবং শরীরে কালো ছায়া পড়ে কারণ রাগ তখন তার শরীরকে কুরে কুরে খায়। সে পাগল হয়ে যেতে থাকে।

ব্যালকনি থেকে সরে আসার পর মনে হয়েছিল ভ্যানের ভেতরের ওই কালো অন্ধকার কোনও ছায়া ফেলে গিয়েছে যা ক্রমশ আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

এরপর ধরা পড়ে দুই বোন। শুকিয়ে যাওয়া শরীর, নোংরা শাড়ি, ফাটাচটা খালি পা। দুজনে একটিমাত্র পেটমোটা ব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেড়াত। সেখানে তাদের জামাকাপড় থাকত বলে মনে হয়। তারা কখনও পার্কের পাঁচিলের একধারে এসে বসত। একে অপরের মাথার উকুন বাছত। দিন কয়েক থেকে আবার চলে যেত। আশ্চর্যের বিষয় হল তারপরেও কী করে যেন তাদের সঙ্গে অন্য লোকদের ঝগড়াও হত। দেশ কোথায় জানতে চাইলেই তারা ভীষণ রেগে যেত এবং তেড়ে তেড়ে আসত। কী ভাষায় যে গালাগাল দিত তা বোঝা যেত না। ব্যাপারটা খুবই সন্দেহজনক ছিল নিশ্চয়ই। যে সে সেখানে খুশি এসে বসবাস যে করতে পারে না সে ব্যাপারে সরকারের স্পষ্ট ঘোষিত নীতি রয়েছে। এমন তো হতেই পারে যে ওরা পাগলের ছদ্মবেশে রয়েছে। যদি এরকম অনেকে ঢুকে পড়তে থাকে তাহলে তো নাগরিক শ্রেণিবিন্যাস গুলিয়ে যাবে। ওরা কী খায় তার খোঁজ না রাখলেও কোনও না কোনওভাবে সরকারেই যে খায় তা কি সরকার বোঝে না! ফলে ওই দুই বিপজ্জনক মহিলাকেও ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই বসন্তের সন্ধেবেলায় বাইকের পিঠে সওয়ার বহু তরুণ-তরুণী এ দৃশ্য দেখেছিল। কর্পোরেশনের পুরুষ কর্মীরা দুই নারীকে ছোঁয়নি। দু’পাশে পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়েছে। শুধু ভ্যানে ওঠানোর সময় তাদের ব্যাগটা রাস্তায় পড়ে যায়। তারা হাহাকার করে ওঠে। বাকিটা দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শোনা যায়নি।

যে কয়েকটি খবরের কাগজ এখনও টিকে রয়েছে সেখানে এই পাগল ধরার বিষয়ে এক লাইনও ছাপা হয়নি। বিজ্ঞাপন ও উন্নয়নমূলক খবর ছাড়া আর কিছু ছাপা যায় না বলেই তা সম্ভব ছিল না। টিভিতেও কিছু দেখানো হয়নি। শুধু একবার একটি প্যানেল ডিসকাশন হয়। সেখানে সবাই সহমত ছিলেন যে পাগলরা ০ থেকে ১-এর মধ্যে কোথাও নেই। এখন আর আগের মতো যুক্তি তর্ক উত্তেজনা হাতাহাতি চলে না। সবাই খুব শান্ত স্বরে কথা বলেন। কোনও একটি বিষয় উত্থাপিত হয় এবং তা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। অনেক আগে দু-একজন বেগড়বাঁই করার চেষ্টা করেছিল। তাদের গৃহবন্দি রাখা হয় ও সারা বাড়িতে মায় পায়খানায় পর্যন্ত ক্যামেরা লাগিয়ে দেওয়ায় তারা ঢিট হয়ে যায়।

খিস্তি পাগলকে ধরা হয়েছিল দুপুরবেলা। তখন আমি ছিলাম না। তবে এই পাগলটিকে বগলে একটি পুঁটলি নিয়ে রাস্তায় হেঁটে যেতে অনেকবার দেখেছি। বেশ ঢ্যাঙা। প্যান্টটা সম্ভবত অন্যের বলে মাপে ছোট। সে যতটা তড়বড় করে হাঁটত ততটাই দ্রুতবেগে খিস্তি করত। অশ্রাব্য, তবে সবাই শুনত। বেশ খানিক খিস্তির পর থেমে গিয়ে সে রাস্তার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে আঙুল সোজা করে বলত— “মর মর, মরে যা, এক্কেবারে মরে যা তুই।”

কাকে সে মরে যেতে বলছে তা বোঝার কোনও উপায় ছিল না। রাস্তায় তখন তার ছায়া। কাজেই নিজেকেও বলতে পারে। কিন্তু যারা এই অভিশাপ শুনছে তাদের মনেও তো ভয় ধরে যেতে পারে। হয়তো সে কারণেই, ওই তাদের বাঁচানোর জন্যই তাকেও ভ্যানে তোলা হয়। এক্ষেত্রে সাঁড়াশি ব্যবহার করতে হয়েছিল। ক্যাঁক করে নাকি তার ঘাড়ে সাঁড়াশি চেপে বসিয়ে দেওয়া হয় ও হাঁটার অভিমুখ বদলে দিয়ে ভ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রবল খিস্তি সহযোগে সে উঠেও পড়ে।

সপ্তম পাগলটিকে ধরা হয় বড়রাস্তা থেকে। কখনওসখনও পার্কের কাছাকাছি তাকে দেখা গেলেও অফিস টাইমে তাকে রাস্তাতেই পাওয়া যেত। কালচে জামা, মাথায় নোংরা একটা টুপি। একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে দু’হাত সামনে বাড়িয়ে দিত সে। তারপর অনেকটা সাঁতার কাটার ভঙ্গিতে হাত চালাতে থাকত। মুখে মিষ্টি হাসি। কোনও গাড়ি এলেই সে দৌড়ে সামনে চলে যেত এবং বলত— “একটু দেখবেন স্যার। আমার দিকে একটু খেয়াল রাখবেন। মানুষ হয়ে মানুষের জন্য যদি একটু না ভাবেন—।” তার আচরণে প্রায়ই যানজট হত। দুর্ঘটনা ঘটতে ঘটতে ঘটত না। কেউ কেউ গাড়ি থেকে নেমে তাকে মারতেও গিয়েছে। এই টুপি পাগলকে ধরার সময়ে যথেষ্ট কসরত করতে হয়েছিল কর্পোরেশনের কর্মীদের। তাদের ধৈর্যের বলিহারি। পাগল রাস্তা জুড়ে এদিক ওদিক দৌড়োচ্ছিল। গাড়ির ফাঁকফোকরে ঢুকে পড়ছিল। বয়স্ক মানুষদের কেউ কেউ পরে বলেছিলেন লুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি খেলা কবাডি নাকি ওভাবেই খেলা হত। যাইহোক, শেষপর্যন্ত জাল ছুড়ে ও সাঁড়াশি দিয়ে পা চেপে ধরে পাগলকে জব্দ করা গিয়েছিল। ভ্যানে ওঠানোর সময়েও সে হাত-পা ছুড়ছিল ও বলে যাচ্ছিল— “একটু দেখবেন স্যার।” কর্পোরেশনের একজন বলে, “ওঠ ওঠ, দেখার জন্যেই তো নিয়ে যাচ্ছি তোকে।” ধাক্কাধাক্কিতে পাগলের টুপিটা খুলে রাস্তায় পড়ে যায়। আমি দেখতে পেয়েছিলাম এবং দেখে চমকে উঠেছিলাম যে পাগলের মাথাজোড়া টাক ও তার মাঝখানে কালো রং দিয়ে লেখা— ‘না’।

এই যে পাগলদের ধরা হয়েছিল তাদের ইতিহাস ও ভূগোল অর্থাৎ তারা কেন পাগল ও কোথা থেকে এসেছে তা অন্য সকলের মতোই আমিও জানতাম না। অবশ্য এটা জানতাম যে পাগলামি আসলে কী তা কেউ জানে না। সুস্থ লোকেরা যাদের পাগল ভাবে তাদেরই পাগল মনে করা হয়। পাগলরা সুস্থ লোকদের নিয়ে কী ভাবে তা জানার কোনও উপায় নেই। তবে আমার কৌতুহল ছিল— এইসব পাগল ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোথায়? খুব গোপনে শোনা যাচ্ছিল, শহর থেকে অনেক দূরে একটা পাগলাগারদ তৈরি করা হয়েছে যেখানে তাদের সুস্থ করার বা অন্তত পাগলামি কমানোর চেষ্টা করা হবে। যেমন করে বেকারি, দারিদ্র, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনা হয়েছে।

এরপরেও একটা বিষয় আমার খুব অদ্ভুত লেগেছিল। মুখে মুখে যে বিবরণ পাওয়া যাচ্ছিল তাতে দেখা যায় শহরের উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের কোনও না কোনও জায়গা থেকে পাগলদের ধরা হচ্ছিল। সে তো ঠিকই আছে। তবে যারা ধরা পড়ছিল তাদের সকলেরই আচরণ কী করে একইরকম হতে পারে তা বুঝে ওঠা যাচ্ছিল না। যেন সাতটি পাগলই সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। একই পাগল কি বারবার ধরা পড়ছিল তাহলে?

আমি জানি এসব আমার ভাবার কথা নয়। ফলে আমার আচরণে যে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিল তাতে ভয় হতে থাকে যে আমি নিজেই না পাগল হয়ে যাই। দেশের পক্ষে তা যে মোটেই হিতকারী হবে না সে আর বেশি কথা কী। তাহলে এত কথা যে লিখে ফেললাম তার কী হবে? ফেলে দিতে হবে।

এই লেখাটি এইরকম অসমাপ্ত অবস্থাতেই পাওয়া যায় কোনও ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে নেওয়া একটি পাতায়। কম্পিউটার জাঙ্ক ইয়ার্ডে পড়ে ছিল। ধরে নেওয়া যেতে পারে ওইরকম একটি জায়গায় কেউ খোঁজ পাবে না অথবা পরে পাওয়া যাবে ভেবে সেটা ওখানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পাতার ওপরে তারিখের অংশটিও ছেঁড়া ছিল। লেখার নীচে কোনও সই ছিল না। ডায়েরির সন্ধান পাওয়া যায়নি। দেশে একসঙ্গে অনেক লোক পাগল হয়ে যাওয়ার যে ঘটনা ঘটেছিল, হয়তো ছেঁড়া পাতাটি সেই সময়ের আগে-পরে। আরও নিখুঁতভাবে জানার জন্য সেটিকে রেডিওকার্বন ডেটিংয়ে পাঠানো হয়েছে। ফাইবার, মিনারেল, অ্যাসিডিটি, নাইট্রিক অ্যাসিড টেস্টের পর জানা যেতে পারে। শুধু ধৈর্য ধরে যদি অপেক্ষা করা যায়। ·



লেখক পরিচিতি : কথাসাহিত্যিক অরিন্দম বসুর জন্ম ২৫ জানুয়ারি, ১৯৬৭, কলকাতায়। পিতৃপুরুষ হুগলির হরিপালের। মাতুলালয় বাংলাদেশের ময়মনসিংহ। প্রথাগত শিক্ষা স্নাতক পর্যন্ত। একসময় দল গড়ে নাটক, সেলসম্যানের চাকরি, নানা ব্যবসাও করেছেন। পেশাগত ক্ষেত্রে সংবাদপত্রে চিত্রশিল্পীর চাকরি দিয়ে শুরু। তারপর কলকাতার বিভিন্ন সংবাদপত্রে এবং অডিও-ভিস্যুয়াল মাধ্যমে সাংবাদিকতা। সম্পাদনা করেছেন মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘পরশপাথর’ ও অনলাইন মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ তেইশটি। ছোটোদের জন্যও লিখেছেন। অনুবাদ করেছেন অন্য ভারতীয় ভাষার গল্প। উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’-র পুরস্কার, ‘নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার, ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’-এর পুরস্কার। গল্পের জন্য পেয়েছেন ‘গল্পসরণি’ ও ‘গল্পমেলা’ পুরস্কার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ