মৃতদেহের সুরতহাল, খুনের মোটিভ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ক্রু, সন্দেহের তির কাদের দিকে―সেই তালিকা, এবং তদন্তের অগ্রগতি, সম্ভাব্য খুনিদের তালিকা প্রসেস অব এলিমিনেশন খাটিয়ে ছোটো করে আনা এসব কিছুই ঘটেনি। ঘটা সম্ভব ছিল না বলে। কিন্তু খুন যে হয়েছে তাতে সন্দেহ না-থাকায় বিশ্বনাথ চৌধুরী অনেকের সঙ্গে পরামর্শ করে অগ্নি বসুকেই তদন্তের দায়িত্ব দিলেন। খরচখরচা হিসাবে অগ্নি বসুকে চল্লিশ হাজার টাকার একটি অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেক কেটে দেওয়াটাই সবুজ পতাকা নাড়ার মতো ঘটনা। আর সঙ্গে সঙ্গে সিক্রেট আই নামের প্রাইভেট ডিটেকটিভ সংস্থাটির তরুণ গোয়েন্দা অগ্নিও ঝাঁপিয়ে পড়লেন। একটা খটকা লাগতেই পারে একথা ভেবে, কেন পুলিশের কাছে বিশেষ দরবার করা হল না। বিশ্বনাথ চৌধুরী হিন্দুস্থান লার্সেন কোম্পানির ইস্টার্ন রিজিয়নের ম্যানেজার, জেভিয়ার্স-প্রেসি-জোকা ব্যাকগ্রাউন্ড যাঁর, বড়ো কর্তাদের সব মাথাগুলো তো তাঁর নাগালেই, তবু, সিক্রেট আই কেন?
ওহ আমরা এখন পর্যন্ত কিছুই জানতে পারিনি খুন হওয়া মানুষটি এবং খুন সম্পর্কে। শুধু খুন বললেই তো হবে না, কে, কোথায়, কখন, কীভাবে, কেন, এরকম হাজারটা প্রশ্ন ধাওয়া করে আসবেই। ধরা যাক 'কে' এই প্রশ্নটিরই কথা, নিতান্ত সহজ কথা নয়। কোনো দার্শনিকতার ইঙ্গিত ছাড়াই এই প্রশ্ন ফুলে-ফেঁলে ঢোল হতে পারে, ঠিক যেভাবে মর্গে পড়ে থাকা লাশের হয়। হয়তো আপনি একে একটা পারিবারিক-সামাজিক ফ্রেমের মধ্যে, কোনো বিশেষ এলাকায় চিহ্নিতও করতে পারলেন খেটেখুটে। কিন্তু নিহত লোকটির সমস্ত ধান্দা, ফিকির, উদ্দেশ্য জানা তো মুখের কথা নয়। ব্যক্তিগত যৌনজীবন ও অন্যান্য ছকবাজি না হয় ছেড়েই দিলাম। এমনকী যখন আপনি মনে করছেন যে, না এবার মালটাকে কবজা করা গেছে, তখন, এমনকী তখনও আপনি জানেন না এই লাশ বেঁচেবত্তে থাকলে ভবিষ্যতে ডিগবাজি খেত না, নিজের পরিচয়টাকে একেবারে আনকোরা নতুন করে তুলত না। বা, অন্যভাবে বললে, নিহত যে সেই বীজ বহন করছিল, ডি এন এ যাচাই করেও তা ধরা সম্ভব নয়। সামান্য কেরানি যেমন ভবঘুরে হয়ে যেতে পারে, যেভাবে এই বিশ্বনাথবাবুদের পাড়ারই কালি গুন্ডা পাকা ভদ্রলোক হয়ে গেল, বা একজন সুস্থ সবল সতেজ মানুষ আচমকা এমনই বিষণ্ণতায় তলিয়ে যেতে পারে যেন একটা ভিজে ন্যাতা... এই বৃত্তান্তটি ঠিক সেইরকম রহস্যময় কিছু নয়, নিহত বা মৃত বলে যার উল্লেখ করা হয়েছে সে এক যুবতী, মর্জিনা চৌধুরী, যার জীবনে তেমন কোনো শূন্যতা, বিষণ্ণতার কথা জানা নেই।
সমস্যা অবশ্য আরও পাকানো, জটিল, গাঁটযুক্ত এবং বেঁকা। কারণ, মর্জিনার লাশটাই বেপাত্তা। বিশ্বনাথ চৌধুরী প্রথমে নারকেলডাঙা থানায় ডায়ারি করেন, সেটি নিখোঁজ সংক্রান্ত। সেই সময় কলকাতায় কিডন্যাপিংয়ের হিড়িকও ছিল না, তা ছাড়া ফিরৌতি বা মুক্তিপণ দাবি করে কেউ ফোনও করেনি তাঁকে। নিখোঁজের অভিযোগকে লোকাল থানা বিশেষ পাত্তা তো দিলই না, উলটে বিশ্বনাথের পাওয়ার-পজিশন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ খোঁচড়রা দাঁত কেলিয়ে নিজেদের মধ্যে মশকরা করছিল, 'শালির কুটকুটুনি হয়েছিল' 'জওয়ানির গরমি' অর্থাৎ সেক্সুয়াল অ্যাপেটাইট সামাল দিতে না পেরে মর্জিনা কোনো ষাঁড়-সদৃশ যুবকের পিঠে চেপে (বুকে চেপেই হবে) কোথাও এখন ওয়াইল্ড সেক্সে ডুবে আছে।
এখনও পর্যন্ত খোলসা নয়―কেন এটি খুনের ঘটনা। অন্তত, যখন সেরকম কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ, মোটিভ কিছুই নেই। এই জটটি অবশ্য তেমন মারাত্মক কিছু নয়, বিবরণকর্তার বাঁয়ে হাত কি গেল। তবু জটটি বহাল থাকবে কিছু দূর পর্যন্ত, কাহিনির স্বার্থে। কাহিনি মানেই সেখানে বাস্তবের, পরিবেশের, ঘটনার মধ্যে কায়দা করে মাদারির খেল চালান দিতেই হয়। এই ব্যাপারটাকে আপাতত আমরা একটুও কচলাব না। যা-যা ঘটা স্বাভাবিক, অর্থাৎ পুলিশকে অ্যাক্টিভাইজ করতে টিকি ধরে টানাটা বিশ্বনাথের পক্ষে নেহাতই মামুলি কাজ হওয়ায়, উড়ো খবরের উপর ভিত্তি করে পুলিশের একটি দল একবার বেগুসরাই এবং একবার ছত্তিশগড়ও ঘুরে আসে।
বিশ্বনাথ চৌধুরী ধর্মভীরু মানুষ, একটু বামঘেঁষা হলেও, মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনে সাফল্যের সন্ধান পেলে, একটু কেষ্টবিন্ধু হয়ে উঠতে বেদ-উপনিষদ-গীতা মায়ায় যেমন, বিশ্বনাথ কিন্তু একেবারেই সেরকম নন। ধর্ম, দর্শন ইত্যাদিতে তিনি এমন এক আনন্দ পেতেন, এমন এক প্রসন্নতার স্পর্শ পেতেন যে, বিদঘুটে বাংলায় লেখা আদ্যিকালের টেক্সট পড়াতেও ক্লান্তি ছিল না।
একটা নমুনা পেশ করি:
শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণায় নমঃ [শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ]। [অথো আপ্তজিগাসা। তুমি কে। [আমি কে।] আমি জীব [জিব]। তুমি কোন জীব [কোন জিব]। আমি তটস্থ জিব।। থাকেন [থাক] কোথা [কথা] ভাঙে। ভাণ্ডে (ভাও কি রূপে হইল] তত্ত [তর্ত] বস্তু [বস্তুতে হৈতে কৰ্ম্ম ইন্দ্র পাঁচ [কৰ্ম্ম পঞ্চ ইন্দ্রি] জ্ঞানীন্দ্র পাঁচ (জ্ঞান পঞ্চ ইন্দ্রি)। আবরণ এক (মন এই একাদশ ইন্দ্রি)।।
রূপ গোস্বামী না কার লেখা বলতে পারব না, পাতা ধরতে ভয় করে এমনই ঝুরঝুরে, তবে এইসব ফার্স্ট ব্র্যাকেট-থার্ড ব্র্যাকেট দেখে মনে হয়, দু'-তিনটি বয়ান একসঙ্গে হাজির করা হয়েছে। কথা অন্য। আত্মজিজ্ঞাসা তো সুস্থ, বুদ্ধিমান লোকের একটু-আধটু থাকেই, বিশ্বনাথের কিঞ্চিৎ বেশিই ছিল। তবু সে মর্জিনার মিলিয়ে যাওয়াটাকে যুক্তি, বা আবরণ উন্মোচন, পাখির উড়ে যাওয়া, সোনালি ডানা ভাবতে পারল না। বদ্ধ জীব। বেচারা। তাই রক্তের ছিটে দুঃস্বপ্ন হয়ে এল। সে মনে মনে একটা খুনের দৃশ্য সাজাতে পারল। হতে পারে মর্জিনার অন্তর্ধান তাকে এমন কাবু করেছিল, শোকের গাছপাথর ছিল না, তাই খুনের এই কল্পনা, এই অপঘাত-মৃত্যু রীতিমতো দেখতে পাওয়াটা আসলে এক মানসিক অসুস্থতা। কিন্তু তিনি সফল পুরুষ, অর্থবান, বিস্তর যোগাযোগ আছে এবং মোটের উপর বুদ্ধিমান বলে আত্মীয় এবং দু'চারজন প্রতিবেশীও সন্দেহ করেনি। ভেবেছে, হতেই পারে। বা, মনে পড়ে গেছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সেই ঐতিহাসিক বচনটি, 'অমন তো কতই হয়।'
আসুন, আমরা বিশ্বনাথবাবুর বাড়িটি শনাক্ত করি, কলকাতার সেই পাড়া-মানচিত্র, লোকজন ও পরিবারটির বর্ণনা ছাড়া কাহিনি দাঁড়ায় না, এজন্য যে, দেখতে পাওয়াটা জরুরি। আত্মজিআসায় বর্ণিত ভাণ্ডটি কোথায় ওতপ্রোত না-জানলে এই খুন-অন্তর্ধান রহস্য আজগুবি থেকে যাবে। খুবই পুরোনো এই পাড়াটি বেলেঘাটা খালপোল থেকে, বন্ধ কোলে বিস্কুট কোম্পানি, পাকা বাড়ি, বস্তি, চড়কতলা (এটি একটি মাঠ এবং তিনটে রাস্তা এখানে মিশেছে) পাকা বাড়ি ও বস্তি, রেল কোয়ার্টার্স, রেলের পাঁচিল, নারকেলডাঙা হাই স্কুল ছাড়িয়ে যে রাস্তাটি গেছে চড়কডাঙা মেন রোড নামে, সেই রাস্তার ওপর রেলের পাঁচিলে পিঠ ঠেকিয়ে রাস্ট কালারের ফুলবারান্দা সমেত তিনতলা বাড়িটিতেই বিশ্বনাথবাবুদের তিনপুরুষের বাস। দিগম্বর আর সুবর্ণলতা বিয়ের পর দোতলাটি ভাড়া দেন, জনাই থেকে পুরো ফ্যামিলি এসে পৌঁছতে পৌঁছতে কেটে যায় প্রায় একটা বছর। দিগম্বর কাজ করতেন এক জাহাজ কোম্পানিতে। এ-পাড়ায় তিনিই প্রথম টাই পরতেন বলে, পাড়ায় তাঁকে 'টাইবাবু' বলেই আড়ালে উল্লেখ করা হত। দিগম্বরের বউ সুবর্ণলতার বার পাঁচেক বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। পাঁচ বার মানে পরপর, টানা পাঁচ বছর। ছ'নম্বরটি দীননাথ। দীননাথের সম্ভবত পৃথিবীর এই উপমহাদেশটির এই ছোটো, ঠান্ডা, নিস্তরঙ্গ পাড়াটি পছন্দ হয়েছিল। সে টিকে গেল। দিনে দিনে সে বেশ খলবলে, হাসুনে, কোলচাটা হয়ে তিনতলা বাড়িটি থেকে কীভাবে যেন রাস্তায় নেমে এল, এর-তার কোলে কোলে ঘুরতে থাকল। সে-সময় একটি বড়ো রকম বিপর্যয়ও ঘটে একারণে, যার পর দিগম্বরের মুখ সাক্ষাৎ আষাঢ়ে মেঘ হয়। সবে কথা বলতে শেখা দীননাথ একদিন বাপের ধমক খেয়ে, এক মুহূর্ত থমকে গিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে, 'তোল মালে তুদি।...' বজ্রপাতের থেকেও ভয়ংকর কাণ্ড যে তা বুঝতে দিগম্বরের একটু সময় লাগে।
আমাদের মূল আখ্যানের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কতদূর সে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আবার বেশি কাটছাঁট, বাদসাদের মধ্যে গেলে অঙ্গহানি ঘটাও অসম্ভব নয়। এমতো অবস্থায় দুকুল বাঁচানো বেজায় টাফ জেনে, বিশল্যকরণীর জন্য গন্ধমাদন বয়ে আনায় যদি আখ্যানকারের (একজন নন অনেক, ক্রমে জানা যাবে) পশ্চাতে বিচিত্রকর্মার সিলমোহর দেগে দেওয়া হয় তা হোক।
পাঠক জানেন, ক্ষেত্রভেদে, বিষবৃক্ষে নানা ফল ফলে। পাত্রবিশেষে, বিষবৃক্ষে রোগশোকাদি নানাবিধ ফল। চিত্তসংযমপক্ষে প্রথমত, চিত্তসংযমে প্রবৃত্তি; দ্বিতীয়ত, চিত্তসংযমের শক্তি আবশ্যক। ইহার মধ্যে শক্তি প্রকৃতিজন্যা, প্রবৃত্তি শিক্ষাজন্যা। কিন্তু শিক্ষা হয় ক'জনের? কলেজ-ইউনিভার্সিটি মারালেই যে অন্তরের শিক্ষা হবে তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে? অন্তঃকরণের পক্ষে দুঃখভাগই প্রধান শিক্ষা।
দীননাথ নেহাত অপোগণ্ড, একটা কাঁচা খিস্তি শিখে ফেলায় দিগম্বর বাড়ি মাথায় তুলল। কিন্তু অগ্রিম বলে রাখি, এই ফাঁক দিয়ে যা ঢুকবে, আপাতদৃষ্টে তা সুচ মনে হলেও, ক্রমে জানা যাবে বস্তুত তা একটি বৃহৎ ফাল। আমরা এ-ও জানতে পারব শিক্ষার লাগাম পরিয়ে দিগম্বর নিজের প্রবৃত্তিকে বশ করতে পারেননি।
কেউ নজর করল না পাড়াটিতে প্রথম একটি সাহেবি ঘটনা ঘটল, দিগম্বর দীননাথের জন্য একটা সধবা যুবতীকে গভর্নেস হিসাবে (হলেই-বা আনট্রেইনড) নিযুক্ত করলেন; রজনী নামের সেই মহিলার কুল-বংশ ইত্যাদি সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার পর। রেলের ফায়ারম্যান নীল মুখার্জির বউ সে। এক দুর্ঘটনায় নীলুর দুটি পা কাটা যাওয়ায় রজনী ঘোর বিপদে পড়ে। তখনই এই ব্যবস্থা। এখানে উল্লেখ থাকুক দিগম্বরের পরিবারে যখন, যেইদিন এই ঘটনা, তথা রজনীর নিয়োগ, ঠিক সেই দিন বাঙালির জাতীয় জীবনেও একটি বড়ো ঘটনা ঘটেছিল, ওইদিনই বঙ্গভঙ্গ বিল আনা হয়। স্মরণ আছে নির্ঘাত যে সুবর্ণলতার বছর-বছর বাচ্চা নষ্ট হয়েছিল। এর অনিবার্য ফল শরীরের উপর, মনের উপর পড়বেই। সুবর্ণলতার শরীরের যা হাল দাঁড়াল তাতে এখন তাঁর নাম হওয়া উচিত শুকনো লতা। লতা শুকোনোর সঙ্গে সঙ্গে দিগম্বরের প্রেমসমুদ্রও অতিকায় কোনো জীব এক গণ্ডুবে শুবে নেওয়ায় দু'জনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। যেভাবে এককথায় বলে দেওয়া হল জিনিসটা তত সোজা ও ঝটপট ছিল না। সুবর্ণলতা বরং তাঁর কঙ্কালটি দিয়ে স্বামী সোহাগের ফিকিরে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর দিগম্বর তখন পালাচ্ছেন, রেহাই চাইছেন, মনে মনে যা নয় তাই খিস্তি করছেন। একসময় সুবর্ণলতা হতোদ্যম হয়ে ঠাকুরঘরে খিল দিলেন। নারায়ণকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে তিনি তখন মীরা ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে তিনি যথার্থই দেবতার ভোগের শরীর হয়ে উঠেছিলেন কিনা বলতে পারব না। তবে এই বৃত্তান্তটি কাছে থেকে দেখে বুদ্ধিমতী রজনী নিজের ভালো-মন্দ-সুখ-শখ-আহ্লাদের একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিতে পেরেছিল। সেই বিবরণে আমরা যাব না কচির করণে নয়, কামকলার বিবরণ পেশের জন্য একটা বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন যা এই কলমের আয়ত্তাধীন নয়। পাঠককে বঞ্চিত হতে হচ্ছে জেনে বড়ো জোর ক্ষমা চেয়ে নেওয়া যেতে পারে।
বরং এক লাফে আমরা ফিরে আসি মর্জিনা-বৃত্তান্তে। থানায় এফ আই আর করা এবং গোয়েন্দ নিয়োগের পর বিশ্বনাথ যে নিষ্কর্মা হয়ে বসে রইলেন তা কিন্তু নয়। মান্ধাতার আমলের রেমিটেন টাইপ মেশিনটিতে এ-ফোর সাইজের দু'খানা ধবধবে সাদা কাগজের মধ্যে কার্বন পেপার ঢুকিয়ে বিশ্বনাথ এখন টাইপ করতে ব্যস্ত।
Regd: With A/DDate: 12.02.98To The Hon'ble Chief Minister Govt. of West Bengal Writer's Building Kolkata-700 001Sub: Unreasonable delay and most casual attitude of Kolkata Police regard ing the investigation in the matter of murder or mysterious disappearance of my daughter Morjina Choudhury.Sir, Painfully and with a heavy heart I would like to draw your imperative and immediate attention to the above for your intervention and a suitable order for enquiring into the matter in the light of the facts and circumstances narrated hereunder.
হঠাৎ কী হল রোলার ঘুরিয়ে চিঠিটি ও তার কপি টেনে বের করে 'ধ্যাত্তেরি' বলে ছিঁড়ে ফেললেন। শুধু তাই নয় ভয়ংকর আক্রোশে কুটি-কুটি করে ফেললেন। মনোভাব, যতদূর আন্দাজ হয় এরকম―ভাষাটা ঠিক জমছে না। এ তো সেলস প্রমোট করা, বাঁশ দেওয়া কিংবা উপরমহলকে গদগদ করার চিঠি নয়। যদিও বিশ্বনাথ জানতেন পার্টিতে তাঁর যা ক্যাচ তাতে অশুদ্ধ ইংরেজিতে চিঠি লিখলেও কাজটা হবার হলে আটকাবে না। সমস্যা অন্যত্র, ওই 'hereunder' এক বিপদসীমা। এরপর কী লিখবেন। সরকারি পার্টির সঙ্গে মর্জিনার এককালে বিস্তর দহরম-মহরম ছিল। স্কুলের ছাত্রী যখন তখন থেকেই অ্যাক্টিভ এস এফ আই। অর্থনীতিতে অনার্স সমেত বি এসসি পাশ করা পর্যন্ত পার্টিভক্তি, আনুগত্য, অ্যাক্টিভিটি মারকাটারি। এম এসসি পড়তে গিয়ে এক পাগলা প্রাত্তন নকশাল অধ্যাপকের নানাবিধ বচনে মর্জিনা মুগ্ধ হতে শুরু করল... এত কথা কীভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে লিখবেন প্রশ্ন তা নয়, আসলে যতই কেন না রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হোন, মানুষটার আত্মা, হাড়মাংস সবই দলের। সন্দেহের আঙুল বা তির যে সেই দলের দিকেও যাচ্ছে না এমন তো নয়। মুখ্যমন্ত্রীর দলেরই একটি ডাকাবুকো, নেতাদের সুগন্ধ-বলয়ে ঘুরপাক খাওয়া, বহু কমিটির মাথায় হাগা ঝুম্পা দত্তের তো আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজ নেই। পুরো মামলাটাই হাপিশ হয়ে গেল।
মোদ্দাকথা সিক্রেট আই-এর উপর ভরসা করে, তাদের মুখ চেয়ে বসে থাকা আর মর্জিনার প্রিয় কাকাতুয়াটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকানো ছাড়া প্রায় সত্তরের বিশ্বনাথের আর কিছুটি করার নেই এখন।
খুলে বলার দরকার নেই। শিরোনামেই মালুম যে আখ্যানটিতে পাখির শরীর, উষ্ণতা, ডানা ঝাপটানো ইত্যাদি আসবেই। তবে এই প্রেডিক্টেবল ঘটনাপুঞ্জ কখন, বিবরণের কোন অংশে ও কতটা ঘটবে সারপ্রাইজ সেইটুকু।
মর্জিনা অদৃশ্য হয় ১৯৯৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর। সেবার ঠান্ডার নামগন্ধ ছিল না। লোকে ক্যালেন্ডার মতে শীতকাল বলেই, অভ্যাস বা আনুগত্যবশত, কিংবা সাজগোজের জন্য হেদিয়ে মরায় গরম জামাকাপড় যৎসামান্য গায়ে চাপিয়েছে। বিশ্বনাথের পরিচর্যায় ছাতের টবে কালো গোলাপের কুঁড়ি ফুটতে অবশ্য বিলম্ব হয়নি। এখানে একটি কথা প্রকাশ থাকুক, হিন্দুস্থান লার্সেনের এই কর্তাব্যক্তিটির স্ত্রী পঞ্চমী মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সে ব্রেস্ট ক্যানসারে মারা যান। মুম্বাইতে টাটার হাসপাতালে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ডাক্তারদের নির্ভয় বাণী ও গুটিকয় কেমোর পর পঞ্চমী সেখানেই জীবনলীলা সাঙ্গ করেন এবং এই গোটা প্রক্রিয়াটি বাবদ গলে যায় দেড় লাখ টাকা। ১৯৭১ সালে পত্নী বিয়োগের পর থেকেই চাকরিটা গৌণ হয়ে ওঠে। দায়সারাভাবে যতটুকু না-করলে নয় তার বেশি আর মাথা ঘামাতেন না বিশ্বনাথ। বহুজাতিক কোম্পানিটি গাদা খানেক টাকা দিয়ে এমন ম্যানেজার পুষতে যাবে কেন। অতএব স্বেচ্ছাবসরের একটি পরিকল্পনা ম্যানেজমেন্টের মাথায় বোনা হতে থাকে। বিশ্বনাথ নির্বিকার। শেয়ার বাজার, ফিক্সড ডিপোজিট এবং কিছু স্থাবর সম্পত্তি মিলিয়ে তাঁর অবস্থা বেশ মজবুতই। চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলে বাল ছেঁড়া যাবে। তবে যদ্দিন টানা যায় এভাবে গড়িমসি করে চলুক না তদ্দিন―এই তাঁর মনোভাব। পত্নীবিয়োগের পর বিশ্বনাথের টপ প্রায়োরিটি মেয়ে মর্জিনা, যে তখন রডন স্ট্রিটের লা-মার্টে পড়ছে। আশ্চর্যের শোনালেও তারপরই ছিল গোলাপ। থার্ড প্রায়োরিটি বৃহৎ খাঁচায়, কখনো-বা-দাঁড়ে বসানো ধবধবে সাদা কাকাতুয়াটি। যখন এই ফুল-পাখি ও ফুলের মতোই মর্জিনা বিশ্বনাথের স্বর্গ, তাঁর নিবিড় ভুবন, বেলেঘাটায়, চড়কডাঙায় তখন ছুটছে থ্রি নট থ্রি বুলেট, সকেট বোমা, মলোটভ ককটেল। তখন বালকের হাতে গরম পাইপগান। ঝুপড়ির বেজন্মা বাচ্চা ছেলে পুলিশের গাড়িতে দড়ির মাল টপকানোর আগে গলার শিরা ছিঁড়ে চিৎকার করছে, 'চেয়ারম্যান মাও যুগযুগ জিও পুলিশের শুষ্টিকে চুদি।' দুর্দান্ত কন্ট্রাস্ট। বিশ্বনাথ কিছু মার্কসবাদী বই তো পড়েছিলেনই, ছাত্রজীবনে এস এফ এবং পরে বিশ্বস্ত বামপন্থী ভোটদাতা হওয়ার জানতেন―এ গল্প দু'দিনের। কিছু ক্যাজুয়ালটি হবে এই যা।
রাস্তার বিপ্লব, ছাত্রদের গরম, কিছু গরিবের বাড় খাওয়া এবং কতিপয়ের নেতা হওয়ার অ্যাম্বিশন হিসাবে বেলেঘাটার এই রঙ্গমঞ্চ তথা রণক্ষেত্রটিকে শনাক্ত করতে খুব বেশি সময়ও লাগেনি। ভবিষ্যৎ যে বিশ্বনাথের মতো বাপ-কাকাদের, জ্যাঠাদের মতকেই নির্ভুল বলে রায় দিয়েছিল প্রিয়-পাঠক, ছকু পাঠক, দড়কচামারা-পাঠক, আপনারা সকলেই তা অবগত। ক্ষয়ক্ষতি, জীবননষ্ট, হারিয়ে যাওয়া, 'অবিশ্বাস, সন্দেহ, নৈতিক পতন―ইত্যাদি যার যা হয়েছে, সে-সম্পর্কে শোকগাথার বদলে একটি লাইনই যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়―যেমন গাঁড় মারতে গেল...। রগড়প্রিয় জনগণ কাউকেই ছেড়ে কথা বলে না, তাই বুদ্ধ ভটচাজ্জির নেতৃত্বে শপিং মল, আই টি ম্যাজিক, ছ'-লেনওয়ালা মাখখন রাস্তার বৈপ্লবিক প্রকল্পকেও তারা নুন্ধু দেখায়। এইসব মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-বাজারবাদীরা কোথায় বিরাজ করেন বোঝাতে বলে থাকে, 'মালে-বালে মাখামাখি'। ইতর, ছোটোলোকি, লুম্পেনমার্কা এবদ্বিষ বচন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর শ্বেত বসনে যে বিন্দুমাত্র কাদা ছেটাতে অসমর্থ সেকথা বলা বাহুল্য। বরং এই তিতকুটে খ্যাঁচা চেহারার জনগণই মুখ্যমন্ত্রীর দলের প্রতিটি জুলুস, সভায় জনসমুদ্র রচনা করে একান্ত নিষ্ঠায়। কোনো-না-কোনোভাবে নেতার পাঞ্জাবি টেনে বা দাঁত কেলিয়ে বলে, 'খা'লে কমরেড সোলো গান হোক...।' কেন এমনটা করে সে গ্রন্থ চুলোয় যাক, আমাদের আখ্যানে এটা বিলকুল ফালতু প্রশ্ন।
বিশ্বনাথবাবুর বাড়িটি চড়কডাঙায় বটে এবং তিনি পার্টি অফিসে যেতেন, ভোটেও কিছুটা রোল প্লে করেছেন, তাই বলে মুড়ি মিছরি একদর নয়। অদৃশ্য এক মোড়ক ছিল। যা স্বচ্ছ বলে একটা ইলিউশনও হত-চাইলেই তাঁকে জড়িয়ে ধরা সম্ভব। স্বচ্ছ মোড়কটি, বা সেই কফিন বাক্সের ডালা খুলে বিশ্বনাথ অবশ্য কোনোদিনই আত্মপ্রকাশ করেননি। তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রগতিশীলতা এবং তিনি সমার্থক নন। দুটো খোপ, দুটি মহল, এই দুই মহলের মধ্যে এমনকী কোনো সেতুও ছিল না। বিশ্বনাথ তাঁর অহং কিন্তু ওই অহং ফ্র্যাকচারড, তাতে চিড়, ফাটল অনেক। অফিসে উন্নতি সূত্রে, প্রেশারের মুখে, অপমান করে, অপমানিত হয়ে ধীরে ধীরে নিজেও ফ্র্যাকচারড ব্যাপারটা বুঝেছিলেন। সেই লোক যেন নিজেকে আবিষ্কার করলেন মর্জিনা কাণ্ডে। গোপনে হাউহাউ করে কাঁদলেন। দু'তিন পেগ বাড়তি খেয়ে ফেললেন। না-খেয়ে, চান না-করে সোফায় উপুড় হয়ে ভেটকে পড়ে থাকতে লাগলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হয়তো তখন বিড়বিড়ও করছেন। 'আমি বাবা, বাবা, শুধু বাবা' 'সৃষ্টিপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার একটি বিন্দু, একটি কণা মাত্র।।
গোলাপ গাছ জল পাচ্ছে না, ডাল ছাঁটা, শুকনো পাতা ছেঁড়া সমস্তই বন্ধ.... ১৯৯৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর দুপুর বারোটার পর এবাড়ির ঘড়ির কাঁটার নড়ন-চড়নও যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। কোনো এক মহান লেখকের বচন যেন ওই স্তব্ধতার খোদাই হয়ে আছে; যাই বলো বাপু, সময় জিনিসটা ঘড়ির জন্যে ঠিক আছে, মানুষের বেলায় ওটা খাটবে না।
একতলার মাথায় বেশ খানিকটা টেরেস ছেড়ে কলাম তুলে দোতলা বানানোর পরিকল্পনাটি বিশ্বনাথের পূর্বপুরুষের হলেও কীভাবে এই টেরেসটি তাঁদের এক বংশধর ব্যবহার করবেন সে সম্পর্কে তাঁর কোনো আন্দাজ থাকার কথা নয়। ফুল আর পাখি প্রকৃতি থেকে চয়ন করে বিশ্বনাথ যে কাশুটি ঘটান, তাতে কিন্তু প্রভুত পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনার সারকথা মর্জিনার সুন্দর, সার্বিক বিকাশ। লা-মার্টে পড়তে পাঠানো একরকম উচ্চাশা হলে ফুল-পাখি আর-এক। তবে এটা করতে গিয়ে একটু বেশি ইনভলভড, বেশি সিরিয়াস হয়ে পড়েন। যেজন্য সাহেবদের লেখা গোলাপ সংক্রান্ত বই-ই কিনে ফেলেন অন্তত হাজার পাঁচেক টাকার। মর্জিনাকে মুখে মুখে গোলাপ সম্পর্কে কত তথ্যই-না জানিয়েছেন।
যেমন:
জংলি গোলাপকে নবজন্ম দিয়েছিলেন হেনরি বেনিট।
গোলাপ নিয়ে প্রথম বই লেখা ১৭৯৯ সালে, লেখেন মিস ম্যারি লরেন্স। আরও মজার কথা গোলাপ-বিপ্লব ও ফরাসি বিপ্লব দুয়েরই সূচনা ১৭৮৯ সালে।
ক্রিমসন গোলাপের হিস্ট্রি তো ফাটাফাটি। এনলাইটেনমেন্টের কলকাতার এক নেটিভ মুৎসুদ্দি লাল গোলাপের একটি চারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজের এক কাপ্তানকে ঘুষ দেয়, উক্ত কাপ্তান তার বস কোম্পানির অন্যতম ডাইরেক্টর গিলবার্ট প্লেটারকে ওই গোলাপটি উপহার দেয়। গোলাপটি পশ্চিমে পৌঁছনোর পর এক ঘোর উন্মাদনা শুরু হল। গোলাপের নাম হানিমুন থেকে কিস অব ফায়ার, লিটল ফ্লার্ট, হার্টপ্রব, অজস্র, অজস্র।
যে উদ্দেশ্যেই ফুল-পাখি জুটিয়ে বা তাতেই প্রকৃতির এক অনুভূবন রচনা করতে চেয়ে থাকুন মর্জির পিতা (এখানে বাবা বা বাপ বলাটা ঠিক হয় না কারণ সেই গোপন এজেন্ডা-সমস্ত তুচ্ছতা, নীচতার পাশকাটিয়ে কঠোর নিরাপত্তার বলয়ে পূর্ব-পশ্চিম ম-ম করা সুগন্ধ ও সৌন্দর্যে ফুটে উঠুক তার মেয়ে। জনক জন্ম দিয়েছে, এবার পালনের মধ্য দিয়ে আশ্চর্য, অদৃশ্য পরাগ সংযোগে দ্বিতীয় জন্ম দেবে পিতা), নিজেও ফুল-পাখি ও ফুলের মতো মেয়েটিকে নিয়ে এক রূপকথার বা গোলাপ-কথার ভুবনেই যেন বাস করতেন। ভুলেও তাঁর কাছে এমন সংকেত কখনো পৌঁছোয়নি যে এই আমরা অবশ্য এই স্বয়স্থ হওয়ার ব্যাপারটি ছানবিন করে দেখতে গেলে প্যাঁচে পড়ে যাব, একটা জলজ্যান্ত মেয়ে, হেসেখেলে বেড়ানো, কিছুটা পর-ভোলানিও যে, সে কোত্থেকে কী নিচ্ছে, কী শিখছে, তার চাওয়াটা কীভাবে শেপ পাচ্ছে- সেসবের হন্দহদিশ করা চাট্টিখানি নয়। এটা কোনো টাস্ক হতে পারে না। এখন, যেহেতু লাশ লোপাট, যেহেতু হত্যা না কিডন্যাপ, অন্তর্ধান, নিরুদ্দেশ না অপহরণ এই ডাইলেমা থেকে যাচ্ছেই, সেইহেতু সোশ্যাল কন্ডিশন, এনভায়রনমেন্ট, পার্সোনাল হিস্ট্রি ইত্যাদি কিঞ্চিৎ গোদা এবং আপাতসূক্ষ্ম গম্ভীর ব্যাপারে একটু নাক গলাতে হবেই। নাকের এহেন বহুল ব্যবহারে আমরা সিদ্ধও বটে। তদুপরি ও যতই ব্যক্তি মারানো হোক না কেন, সমাজ-সচেতনতার বা সোশ্যাল কনটেন্টের বাতাস শুষে নিলে, টেনে বের করে দিলে দেখা যাবে ব্যক্তি বাল, বলুন ঠিক কি না? হান্ড্রেড পার্সেন্ট? ইয়েস, হান্ড্রেড কেন টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট।
ওপরের প্যারাটি একটি জবরদস্ত অ্যাটিটিউড হিসেবেই দেখবেন মান্যবর কেলানে পাঠক কারণ এই আখ্যানে আমরা কোনোরূপ কিচাইন বরদাস্ত করিব না। মহান, লক্ষ সূর্যের বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে যেমন অহরহ কনস্পিরেসি, যেমন, টিভি সিরিয়ালের ফ্যামিলি এবং কর্পোরেট ক্যাচালের বাইরেও আমরা সর্বত্র ষড়যন্ত্র-দেখিতে-দেখিতে তাহা একটি খাসা তত্ত্ব হইয়া উঠিল, সেইরূপ কোনো কিছুর সহিত আমরা এই আখ্যানের সংস্রব এড়াইব। এ ছাড়াও কথা আছে, ছানবিনের কাজটি সিক্রেট আই নামক সংস্থাটির, অন্যের ও আমরা কেনই-বা সাফ করিতে যাইব। মাল কামাবে ওরা, আর বেগার খাটতে যাব, অতটা গুড় আদবো নয় চাঁদু। থা'লৈ আমরা এখানে কী প্রস্তাব করিতেছি? ঝেড়ে কাশা যাক। চড়কডাঙা একটি ছোটো মহল্লা। বেলেঘাটা খাল থেকে কিছুটা পূর্ব দিকেই ওই অঞ্চল। পাড়াটি আরও শুটিকয় পাড়ার সঙ্গে জড়িয়ে গোটা এলাকাটি বা ওই জনপদটিতে টইল দিত মর্জি। এই টইলসূত্রে সে ব্লটিং পেপারের মতো জনপদটির অনেক গালগল্পস্মৃতি এবং ফ্যাক্ট শুষে নিলেও মালটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। আদৌ কিছু বোঝা সম্ভব ছিল কিনা, আমরা জানি না। তাই প্রশ্নের ওই কাঁটাটি থাকুক। আমরা নাকচ করছি না। বরং জনপদটির টুকরো কথায় চোখ বোলাই আসুন। শহরের মধ্যে একে এক আন্ডারগ্রাউন্ড শহর বলেই ধরতে পারেন। এই আন্ডারগ্রাউন্ড শহরটির কথা সাজাতে বা তাকে দৃশ্যমান করতে আমাদের সম্বল কিছু পুরোনো ফোটো, মানচিত্র, আত্মকথা, বকোয়াজি, গুল, হিস্টরিক্যাল ফ্যাক্ট এবং গাছ, পাখি, ডোবা, মাঠ, রং ও গন্ধের ক্রমিক মৃত্যু। আন্ত্রিকে, দাঙ্গায় লোকক্ষয় হিস্টরিক্যাল ফ্যাক্টের অন্তর্গত। বেনজর, হারানো এই শহরকথার অনেকটাই এক বুড়ো মাস্তান, কাপড়েচোপড়ে হাগা জুটমিলের টাইমবাবু এবং জোড়ামন্দিরের কাছে স্বপ্নদত্ত মাদুলি বেচা, শনি-মঙ্গলে ভর হওয়া পঁচাশি বছরের জটিবুড়ি সূত্রে প্রাপ্ত।
আন্ডারগ্রাউন্ড শহর
খাল-মাতৃক সভ্যতা বলার জো নেই, এখানে দশম বা একাদশ বা তার পরের শতকের কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি বলেই শুধু নয়, পুঁথি বা কোনো প্রত্ন-পদার্থই আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু খালমাতৃক শহর বলাই যেতে পারে। গাঙ্গেয় সভ্যতার দুটো-একটা ছেঁড়া পাতা, এক-আধটা শ্লোক, উষ্ণ নিশ্বাস যে উড়ে আসেনি এমনও নয়। গঙ্গা নদীটির শীর্ণ এক শাখার দরুনই সবুজের উৎসব, জনজাতির হুল্লোড়, শিকার, চাষবাস। হার্মাদ মানুষের, কারিগর ও কৃষকের এই জনপদটি তর্কালঙ্কার-রাজচক্রবর্তী-ফিরিদি এবং রায়বাহাদুরের দৃষ্টির আড়ালে জলজঙ্গল হয়ে ছিল-বাগডাবকা সুন্দরবনই যেন-বা। ইতিহাসের সময় এই বুনো, পুরাণে উল্লিখিত অঞ্চলটির দিকে তার আনাঞ্ছনী শলাকাসমূহ এবং বিবিধ পদ্ধতি প্রেরণ বা নিক্ষেপে যথেষ্ট বিলম্ব করায় দলিল-দস্তাবেজ-নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ-চিহ্নরা হারিয়ে যায়। কী কারণে এইসব নথিপত্র যখের ধন জনপদটি তা জানতই না। অনুমান এই যে, খালটি, যা গঙ্গার শীর্ণ শাখা বলে বর্ণিত হলেও সে ছিল তখন এক ভরা যৌবন। পূর্ব-পশ্চিম দুই বঙ্গের সামান-রসদ জলপথে এই বালটির বুঝেই ভেসে যেত, যেমন যেত যাত্রী নৌকোও। কখনো কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক না-ঘটলে মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা খালসংলগ্ন জনপদটিতে পা ফেলেনি। কবে, কীভাবে খালটির পূর্ব সীমান্তের ছাড়া-ছাড়া গ্রামের জনপদ, ভূমি বা দেশ আবিষ্কৃত হয়, কবেই-বা বেলেঘাটা-বেলিয়াহাট্টা ছাড়িয়ে, দশদ্রোণ, রাজারহাট, ওদিকে চিংড়িঘাটা, ভাঙর, বিষ্ণুপুর, মাছিগ্রামের মৌজা ও দাগ নম্বরের খোপকাটা বিবর্ণ দস্তাবেজের উপর পূর্ব-পূর্বোত্তর কলকাতার সিলমোহর লাগানো হল-সে-সবের তত্ত্বতালাশে তেমন মজা কিছু নেই। 'কাপড়ে আগুন লাগার একটি ঘটনাকে বরং আমরা দায়ী করতে পারি।' টাইমবাবুর কথা জড়ানো, নববই চলছে, ভিমরতি চলছে, স্মৃতি চলছে অথর্ব সবল এখানে। পোকায় কাটা, ঝুরঝুরে একটি বইয়ের একখানি পৃষ্ঠায় দাগানো দুটি অনুচ্ছেদ পড়তে বলবেন। পাঠক, আপনিও পড়ুন:
'ইংরাজি ১৬৩৪ অব্দে যে সময়ে শাহজাহান বাদশাহ ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্যে বিগ্রহার্থ প্রবাস করিতেছিলেন, সেই সময়ে তাঁহার এক দুহিতার বস্ত্র একদা দৈবাৎ অনলসংলগ্ন হওয়ায় তাঁহার শরীর গুরুতররূপে দগ্ধ হইয়া যায়। সেই রাজকুমারীর যাতনা প্রতিকার নিমিত্ত সুরাটস্থ ইংলণ্ডীয় বাণিজ্য কুটি হইতে জনৈক ইংরাজ চিকিৎসক আনয়নার্থ সংবাদ প্রেরিত হইলে বোটন নামক একজন সাহেব উক্তকার্য্যে বৃত হন। সৌভাগ্যবশতঃ তাঁহার চিকিৎসা কৌশলে নৃপনন্দিনী সম্পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভকরাতে সম্রাট মহোদয় কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনার্থ বোটনকে কহিলেন―তোমার ইচ্ছানুসাবে আমি পুরস্কার করিব, অতএব তোমার কি ইচ্ছা কহ।
উদারচিত্ত স্বদেশহিতৈষী বোটন কহিলেন, 'আমার আত্মস্বার্থে কিছু প্রার্থনা নাই। আমার দেশীয় লোকেরা বাঙ্গালাদেশে শুল্ক বিরহে বাণিজ্য করিবার জন্য বাণিজ্যালয় স্থাপনের অনুমতি পাইলেই আপনাকে প্রভু রূপে জ্ঞান করিব।'
টাইমবাবুর ফোড়ন, 'শাজাহানবুড়ো তো তথাস্তু বলেই খালাস। তবে আসল কম্মোটি করলেন সুজা। সেখেনেও গল্পো একই। সুজার হাবেলির এক ভূপতিভামিনী কঠিন পীড়ায় শয্যাশায়ী, আবার বোটনের কেরামতি, আবার বরদান প্রার্থনা এবং তথাস্ত। তবে এতে করে কিছুটা টাইম বরবাদ হল ১৬৬৮-তে গিয়ে হুগলি শহরে জাহাজ নিয়ে যাওয়ার ফাইন্যাল পারমিট ইংরেজরা পেল। তা এখন, পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ যে কলকাতার কথাই বলো তার মূল তো ওই পারমিট। পারমিটের মূল রাজকন্যের কাপড়ে আগুন, একেই বলে কার্যকারণ।'
জটিবুড়ি ভট্টাজবাড়ির মেয়ে, ঠাকুরদার টোল ছিল এই বেলেঘাটাতেই। রেগে কাঁই হয়ে গেলেন, 'ওই ঢ্যামনা, মাগচাটা বুড়ো কার্যকারণের ছাই জানে-ওসব জানতে গেলে ন্যায় পড়তে হয়, ও বেটা জুটমিলের মজুর ছিল, এক লালমুখোর অ্যাড়ে তেল ঘষে টাইমবাবু হয়... দুঃ পুঃ।
জটিবুড়ির কথার মধ্যে ফ্যাক্ট আছে। চেক করে দেখেছি। কলকাতা ফেরঙ্গ শহর হলেও, পূর্ব কলকাতা হিসাবে কর্পোরেশনের জাবেদা খাতায় যে মানচিত্রটি আছে, পূর্বের সেই জনপদটির সঙ্গে শুরুতে আদি কলকাতার কোনো মাখামাখি, পিরিত ইত্যাদি ছিল না। উগ্রক্ষত্রিয়, পোদ, কাহার, নিষাদ, মণ্ডলের এই অঞ্চলে কিছু কলকাত্তাইয়া বাবু বাগানবাড়ি করেছিল, তার কিছু নমুনা ভগ্নাবস্থায় এখন আছে, যেমন নর্থ রোডের পেছনের ফিল্মের স্টুডিয়োটি, আদতে সেটি ছিল বাইনাচের, ফুর্তির ফোয়ারা-অর্থাৎ বাগানবাড়ি। জল আর মাটি নিংড়ে সবজি-মাছের অঢেল উৎপাদনসূত্রেই কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ। বা অন্যভাবে বললে, অঞ্চলটি মূল কলকাতার সাপ্লাই বেস হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে, তাতেই নবজন্ম। এই নবজন্ম সূত্রেই পূর্বাঞ্চল খাস কলকাতার কলোনিতে রূপান্তরিত হল।
বাড়িঘরের ছাঁদ বদলাল, ব্যাবসা সূত্রে বাইরের লোকজন এল, শেষ জনপ্লাবন দেশভাগের পর, অজস্র চোখের মতো ডোবা-পুকুর আকাশের দিকে তখন ঠায় তাকিয়ে আছে, পাখির ডানার ছায়া সেই জলে, আরও পরে উড়োজাহাজের গর্জন শোনা যাবে, তার ডানার ছবিও মুহূর্তের জন্য আঁকা হয়ে যাবে ওই জলে।
জটিবুড়ি শুধু যে টাইমবাবু তথা ইতিহাসের মা-মাসি করছিল তা-ই নয়, মাত্র দুটি কালো দাঁতের সঙ্গে রক্তলাল জিভ ঘষে বলল, 'আমাদের বেত্তান্ত―ইতিহাস গল্প-কথা, এখেনে মহামহোপাধ্যায় স্মার্ত ভট্টচাজ্জিকে দোলের সময় আসতে দেখেছেন আমার বাবা। নৈয়ায়িক পণ্ডিতের বিদায় ধার্য ছিল ১০০ থেকে ৮০ ঘড়া গাড়। শ্রাদ্ধে কাঙালি বিদায়ে দুটাকা দিতে তো আমিই দেখেছি।'
মহা ফাঁপরে পড়ে যাচ্ছি আমরা। এইসব গল্পকথা জুড়ে কোনো হদিশ যে মিলবে না সে তো জলের মতো সত্যি। টাইমবাবুই একটু আলো দেখালেন এই অন্ধকারে, তিনি যেন উঠে আসছেন খালটি থেকে, একহাঁটু কাদা আর বাবলা কাঁটার আঁচড়ে ছিপছিপে শরীরে রক্তের বিন্দু সমেত। বনজঙ্গল হাসিল করতে এভাবেই নাকি এসেছিল কালো পাথরে খোদাই কিছু মনুষ্যমূর্তি। তারা ছিল ভাগ্যহত, গৃহহীন, ভিটেছাড়া মানুষ। টাইমবাবুর গ্রেডিকশনটি উচ্চারিত হল সাবেকি, মার্জিত ভাষায়, 'বর্তমানে যাহাদের রিফিউজি বলা হয়, তারা তাই। ভাগ্যতাড়িত সেই শরণার্থীরা মানবসভ্যতার উষাকাল হইতেই কেবল চলিতেছে চলিতেছে...'
জমি কে চষে, কৃষি-উদ্বৃত্ত আহরণ পদ্ধতি এবং রাজস্ব সংগ্রহ, আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতা, কৃষি প্রযুক্তি―চাষ পদ্ধতি ও জলসেচ... এ জাতীয় সূক্ষ্ম বিচার অঞ্চলটিতে লাল ঝান্ডার হাত ধরে এসেছিল বটে কিন্তু তদ্দিনে খালপাড়-ছোঁয়া অঞ্চল, কাদাপাড়া, নলবন, চিংড়িঘাটা থেকে চাষ গুটোনোর ব্লু প্রিন্ট রেডি, ভেড়ি সূত্রে এই অঞ্চলে বড়োলোক হয়ে ওঠা মণ্ডল-নস্কর-আগুয়ান-সর্দারদের লবি বিধানসভায় ঢুকে পড়েছে, মন্ত্রীও হয়েছে। চলিতেছে চলিতেছে-র আখ্যানটিকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বেগ সঞ্চারের জন্য একটি বড়ো করে 'দ' অক্ষর কইখালি থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত যে আঁকা হবে এবং তার বিস্তার ঘটবে সাগর পর্যন্ত একথা কেউ কল্পনা করেনি, প্ল্যানাররাও নয়। তখন কলকাতাকে তিলোত্তমা বানানোর বিউটি পার্লারটি সি আই টি-র দখলে―উলটোডাঙা থেকে জোড়ামন্দির পর্যন্ত রাস্তা বানানোটাই এক দক্ষযজ্ঞ।
বুড়োদা বা বুড়ো মাস্তানের প্রবেশ এরও আগে, ভাটিখানার ঠিক উলটোদিকে মিয়াবাগান নামে বিশাল মহল্লাটি আজও আছে, বুড়োদার লিডারশিপেই মিয়াবাগান মুসলিমশূন্য হয়। আবার দাঙ্গার সময় গান্ধী মহারাজ বেলেঘাটার পদধূলি যখন দিলেন, বুড়োদা তখন 'মহাত্মাজিকি জয়' এই স্লোগান যেমন দিয়েছে, তেমনই লুটের মাল বেচার ভাগ ঠিকমতো না-পাওয়ায় ভগলুকে ক্ষুরও মেরেছে। তবে বুড়োদার যথার্থ উত্থান পঁয়ষট্টি থেকে তিয়াত্তর এই আট বছরে, ভেড়ি দখল আন্দোলনের সময়। আমরা এইসব আন্দোলন-ফান্দোলন নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাব না। শুধু এটুকু প্রকাশ থাকুক, পূর্ব কলকাতার জিলিপির প্যাঁচ গলিতে দেওয়ালে খুঁটে দেওয়ার মতো, সর্বত্র এক চিনেম্যানের স্টেনসিল এবং দড়ির মাল, সকেট এবং পাইপগান নিয়ে আবোধা, ছন্নছাড়া বস্তির বেওয়ারিশ নাদানদের খেলকুন। খবরের কাগজও তা-ই নিয়েই মত্ত, পুলিশ, মন্ত্রী সবারই দম ছুটে যাচ্ছে ওই বৈপ্লবিক রগড়ে। যখন ভেড়ির পর ভেড়িতে ঝান্ডা দেওয়া হচ্ছে। ভেড়ি মালিকরা জবরদস্ত বাধা দেওয়ার, কালিকাপুরের কাছে এক মালিকের বউয়ের যোনিতে ঝান্ডা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমন পৈশাচিক ঘটনাও ঘটে। নিশিকান্তবাবু ভেড়ি মালিকদের প্রেসিডেন্ট, হিয়ারিং এইড ছাড়া তিনি এক বর্ণ শুনতে পান না। বুড়োদা নিশিকাস্তের ছায়া। নিশিকান্ত বলেছিল―বোকাচোদারা বুঝতে পারছে না কী সব্বোনাশ করছে।
এক্ষণে, সমস্তই মালুম। গরিব মজুররা লাল ফান্ডার কথায় নেচে সেদিন নিজেদের উৎখাত হওয়ার ভবিষ্যৎটি পাকা করা ছাড়া, বা নিজের গোয়া মারানো ছাড়া কিছু ছিঁড়তে পারেনি, সেজন্য আবার চলিতেছে, চলিতেছে, চলিতেছে... ভেড়িগুলো ছিল শুধু তো পরিবেশের নয়, ওদেরও উৎখাত না হওয়ার রক্ষাকবচ। দমদম বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের পেট থেকে খালাস হয়ে সাহেবসুবো-আমলারা যে এখন সাঁ করে চলে-যাচ্ছে নিউ টাউনের রাস্তা ধরে, কলকাতার সাপ্লাই বেসটাকেই যে কলকাতা নামের মড়ক ব্যাধিটি গ্রাস করে নতুন নগর পত্তন করতে পারল, সেসব আটকে দিতে পারত ধীবর সন্তানরা। কিন্তু তখন তো তারা ভেড়ি দখলের আহ্লাদে পোঁদের কাপড় তুলে নাচছে।
আমরা এই অঞ্চলের হিস্ট্রি, টপোগ্রাফি ইত্যাদি নিয়ে আর ঘষাঘষি করব না, পণ্ডিতদের জন্য ওসব তোলা থাক। বুড়োদা অতীতের বালুচর, এখনকার সল্টলেকে বাড়ি হাঁকাতে পারলেও সেখানে থাকে না। জোড়ামন্দিরের সামনে চরস খেয়ে বুড়ো ভামটির এখন একমাত্র কাজ আনসান বকা এবং সে আমলের মাস্তানি যে আসলে বীরের কাজ ছিল তা সপ্রমাণ করতে নানান গল্প ফাঁদা।
হিরোগিরির ওইসব কিস্সা শোনার টাইম বা ইচ্ছে এখন আর কারও নেই, গুলতানি বিহনে বুড়োদার গালকাটা দেড় ফুট মুখ বুকের কাছে ঝুলে থাকায়, এখন সে এক বিষণ্ণ মাস্তান বই কিছু নয়। বরং প্রাচীনকালে এখানে বসবাসকারী হার্মাদদের উপাখ্যান বেজায় ইন্টারেস্টিং হতে পারত।
ভেড়ি দখল বা ঝান্ডাবাজির গল্পই-বা তেমন দম কোথায়। গরিবগুর্বোর নসিবই ওইরকম। না যদি লড়ে তো মরবে, আবার লড়লেও মরবে। তা সে ন্যায়যুদ্ধই হোক কিংবা ভেড়ি দখলের মতো ভুল লড়াই। এ কথা কি হলফ করে বলা যাবে যে, ভেড়ি দখলের মতো লড়াইটা না হলে মাল্টিপ্লেক্স, শপিং মল, আই টি জাদু, মধ্যবিত্তের কমপ্লেক্স―ঢ্যাঙা অ্যাপার্টমেন্ট এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সের বিগ বাজার, সি-থ্রি, আইনক্স গজাত না।
ভবিষ্যতে সাঁড়াশি আক্রমণও অনিবার্য। তাতে সূরা ফার্স্ট লেন, বেলেঘাটা মেন রোড, চড়কডাা, সুরি লেন, নর্থ রোড, বাগমারির পাড়াগুলোও তাদের স্বভাব-চরিত্তির খোয়াবে―এ একেবারে নির্যস সত্য। বুড়োরা, অবস্থার চাপে, লড়াইয়ে মার খেয়ে এই সত্য দিব্য দেখতে পাচ্ছে বলে নিজেদের তাইরেসিয়াস ভেবে ছাতি ফোলাতেও কসুর করছে না। অতীতেও এমন গর্ব, এমন দূরদৃষ্টির কিছু খামতি ছিল না। সো হোয়াট।
জমির ফাটকা, জমিতে ইনভেস্টমেন্ট, দখল ও উচ্ছেদ, আকর্ষণীয় প্লট হাতানোর, হাপিশের জেরে গুটিকয় লাশও পাওয়া যায়। পরে তাদের কাউকে কাউকে দাগি ক্রিমিন্যাল বলে জানা গেলেও সবাই ঠিক তা ছিল না। দু'-চারজন ঠেটা জমি-মালিকের লাশও ওই স্তূপের মধ্যে খুঁজলেই পাওয়া যেত। তবে সেটা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়। সমস্ত খুনের মধ্যে একটি লক্ষণীয় মিল ছিল, লাশগুলো গুলিবিদ্ধ বা ছোরা খাওয়া যা-ই হোক না কেন, সব ক'টিই পাওয়া যায় বাইপাসের ধারে এবং তাদের মুজুগুলো ভেড়ির জলে ডোবানো। বললে বিশ্বেস করবেন না, এই হত্যাকাণ্ডের তান্ত্রিক ব্যাখ্যাও ছিল এবং লোকজন তা উড়িয়ে দেয়নি মোটেই। হাওড়ার ব্রিজ বানানোর সময় শিশু বলি দিয়ে যে কাজ শুরু হয়েছিল কে তা অস্বীকার করতে পারবে। নতুন নগর পত্তনের সময় বলির সংখ্যা বাড়াটাই কি স্বাভাবিক নয়?
টোয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরির ন্যাজে এসে মর্জি বাইপাসের ধারে গুটিকয় জলাশয়, বিষ্ণুপুর-কেষ্টপুর-রাজারহাটের দিকে অতি প্রাচীন দু'-চারটে গাছ অবশ্য দেখেছিল। তাতে শোনা কথা, পড়া কথা, ধার করা স্মৃতি, পুরোনো দুনিয়ার যৎসামান্য অবশেষ এবং আরবি ঘোড়ার মতো বেগবান নিজস্ব কল্পনার জোড়াতামিতে খাল পেরোনো এই অগোছালো, আধা শহরাঞ্চলটির একটা ছবি রচে নেয়। সেই ছবিটিতে ছাপোষা নিম্নবিত্ত মানুষ, দু'চার পিস বড়োলোক, শুটিকয় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-মোক্তার-টিচার ছাড়া সবাই গতরজীবী, খেটে খায়। তার মন খারাপ হয়ে যেত একথা ভেবে যে, গাছগাছালি-জলাশয়ে ঘেরা ফিরিঙ্গি হাতের ছোঁয়া-না-লাগা, পুরোনো, পরিকল্পনাহীন, কোথাও ঘিঞ্জি, কোথাও বিস্তৃত দিগন্তের, আত্মগোপনকারী এই শহরটির নিসর্গ সে চোখ মেলে দেখতে পেল না।
মর্জির জন্ম আর আগ্নেয় লাভার মতো সিমেন্টের এবং পিচের স্রোতের নেমে আসা একই সঙ্গে ঘটে। নস্টালজিক হওয়ার সুযোগ যেজন্য প্রায় না-থাকারই কথা। তার মনোকষ্ট, বেদনাকে আমরা ওভাবে দেখবও না। বাম রাজনীতি যে এতে আশকারা দিয়েছে, ইন্ধন জুগিয়েছে তা-ও নয়। পাড়ায় মেলামেশাটা তার বেশি, পাড়ার লোকমুখে শোনা কথা, তাদের স্মৃতিরই একপ্রকার চালান ঘটে থাকবে মর্জির মস্তিষ্কে। জিনিসটা কিঞ্চিৎ ভূতুড়েও বটে। ভূতের ইতিহাসকে লোপাট, নিশ্চিহ্ন করবে আসল ইতিহাস, তার বিধান। এ তো জানা কথা, কে খণ্ডাবে।
হয়তো উদ্ভট শোনাবে, তবে মেয়েটাও তো কম খেপি নয়। বস্তি, পাকাবাড়ি, গলি, কানাগলি, হাসপাতাল, দেড়শো বছরের পুরোনো স্কুল, কর্পোরেশনের দাবাখানা, ঘাস গজানো, তালায় মরচে পড়া বন্ধ মিল ও ফ্যাক্টরি, পাতা কাঠের ব্যাবসা, কাঠের গোলা, বাঁশের গোলা, মর্নিং স্কুল, কাঁচা নর্দমার জ্যামিতিক এই নকশাটির জন্য তার ছিল দেশপ্রেম জাতীয় এক গভীর দুর্বলতা, যেটা ওই লা-মার্টি এডুর সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান। উচ্চাকাঙ্ক্ষী তার বাপ মর্জির এই মন টের পায়নি। জানতই না পাড়াটির জন্য কতখানি অসুস্থ বোধ করত মেয়েটা, তা-ও আবার এমন এক পাড়া যা নেই। অনেক আগেই মরেহেজে গেছে। এই মেয়ে তবু কবর খুঁড়েই যাবে। উদ্ভট কাণ্ড। বা বলা যেতে পারে, মর্জির মধ্যেই মজুত ছিল এক বিদঘুটে ব্যাপার, উদ্ভটত্ব।
আখ্যানে বিদঘুটে এই মেয়েটা এখন পর্যন্ত প্রচ্ছন্নই থেকে গেছে। কয়েকটি জিনিস আমরা অনুমান করতে পারি, যেমন শিশুরা, বিশেষ করে আদি শৈশবে, এক আজগুবির দেশেই মনে মনে বাস করে। যেজন্য দ্বিতীয়বার জন্ম-নাড়ি কাটা দরকার। হতে পারে মর্জির ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। অন্যদিকে পাড়াটির সাবেক মধ্যবিত্তের তখন নাভিশ্বাস। অতীত কথা টেনে অঞ্চলটির জন্য এক অর্থহীন, গর্ব অনুভব করত এরা। শিষ্টাচার, আপ্যায়ন, ভদ্রতা, আন্তরিকতায় মিলেজুলে বাঁচার জয়গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিৎ রায়-সত্যেন বোস প্রভৃতিতে বানানো একটি খাসা মিকশ্চারও ছিল, যা তাদের বিচারে সংস্কৃতি। ছোটোলোক, গরিবগুর্বোকেও যত্ন করে মহাপুরুষদের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে, বিজয়া ও নববর্ষের উৎসবে ওই মিকশ্চারটি বেশ কয়েক দাশ খাওয়ানো হত। কিন্তু এই চেষ্টাটা ক্রমে মলিন, হাস্যকর, প্রায় ভাঁড়ামির পর্যায়ে চলে যাওয়ায় স্মৃতির শহর পেরিয়ে, রাখালি-বাগালি পেরিয়ে, হাজার বছর পিছিয়ে কোনো এক আদিমতার গর্ভেই রূপকথার দেশটি খুঁজতে চেয়েছে এই মেয়ে।
মাস্টার-উকিল-কেরানি-ডাক্তার ও ছোটোমোটো ব্যবসায়ীদের তখন আর ডাল গলছে না। সাপ্লাইয়ের কাজে, রেলের ঠিকেদারি, নিলামি, দলের চামচাগিরি ও জমির ফাটকাবাজিতে টাকা করা এবং সেই টাকার ওপর নির্ভরশীল নতুন এক সম্প্রদায়ের ইশারাতেই তখন পাড়াটির ওঠাবসা। সাঁ-সাঁ বাইক ছুটছে। লো-কাট জিনসের প্যান্টের ওপর এক চিলতে টপ পরনে ঝকাশ মেয়েরা উড়ে যাচ্ছে। তাদের প্রজাপতি ঠোঁট ডিজেলের ধোঁয়া আর গন্ধের মধ্যে প্রদীপ ভাসানোর মতোই চুমু ভাসিয়ে দিয়ে আওয়াজ করছে উম্ মা... দুর্দান্ত বাঁচা, চমকপ্রদ ইংলিশ আর হিন্দিই ভাষাতুবড়ি... সাবেক মধ্যবিত্ত এই দৃশ্যটির সামনে পড়ে গিয়ে সংবিৎ হারিয়ে ফেলল। তারা যেন তখন প্রস্তর মূর্তি, যেন মৃত, তাদের মাথা হেঁট। গো-হারা, হতাশায় মুখ কালো, বিরক্তিতে ফালা ফালা, থুতু ছেটাচ্ছে বলে গলা শুকিয়ে কাঠ, ভুলে গেছে কে তারা, যে জন্য ছায়া-ছায়া, ভূত যেন-বা। কেবল লুকোচ্ছে, কেবলই লুকোচ্ছে। তাহাদের একটিই প্রার্থনা, চল আমরা হারাই, হারাইয়া যাই। আর এত সবে স্তব্ধতার দীর্ঘ ইতিহাসটি ভরে উঠতে থাকে নতুন-নতুন পরিচ্ছেদে।
মর্জিও কি পালাচ্ছিল, হারিয়ে যেতে চাইছিল। যেজন্য, শেষ পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হল? এইভাবে দেখলে খাসা একটি ছক তৈরি হয় বটে, কিন্তু সেক্ষেত্রে উদ্ভটত্বের কী হবে। তা ছাড়া, আদিম মানব-মানবীর খোঁজে, বা অঞ্চলটির সৃষ্টিকাল পর্যন্ত খোঁজখবর নিতে গিয়ে যেভাবে সে পুরাণ-টুরান ঘাঁটল সেসবেরই-বা মানে কী; এই দোটানার একটা কমফর্টেবল সলিউশন হল যে, যেমন চলছে চলুক, কোনটা শাখা আর কোনটা মূল, কোনটা আধার, কোনটা আধেয় ওইসব সূক্ষ্মবিচারে যাওয়ার তাগিদ গল্পের স্বার্থেই বর্জনীয়।
বরং কল্পনা করা যাক গোপন, এক রূপকথা ছিল তার। ড্রাগের নেশার থেকে চড়া এবং যার প্রকোপ দীর্ঘমেয়াদি। ওই রূপকথাটির অবতরণ ঘটে। অকস্মাৎ এক নিঝুম দুপুরে মর্জিদের বাড়ির টেরেসটিতে নিঃশব্দ পদচারণে সে এল। মর্জির হাত ধরল। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় থাক?' স্তব্ধতা, মর্জির চোখ বুজে আসছে, জুঁই ফুলের গন্ধ, বনের গন্ধ, জিজ্ঞাসা আবারও, 'তোমার দেশ কোথায়?'
এই তল্লাটের বাঙালরা খুব দ্যাশের গল্প রং চড়িয়ে করত। নানা জেলা থেকে আসা গরিবগুর্বোরাও দেশের বাড়ির কথা বলত। কিন্তু এই মেয়েটির এরকম কোনো ফেলে আসা ভূখণ্ড নেই। সে এই দুঃখ, এই দেশহীন থাকাটা মেনে নিতে যেমন পারেনি, তেমনই কোনো এক গাঁয়ের কল্পনা দিয়েও তা ভরাট করতে চায়নি। তার আকুল চাওয়ার প্রান্তে ছিল মানুষ, ছিল মানুষী, মর্জির উচ্চারণে 'মানসী' এবং সম্ভবত সেটাই ঠিক-মানস-মানসী।
আর একটি 'অকস্মাৎ', আর এক দিন অরণ্যে দাবানল। বাঘ-ভালুক-অজগর-বাজ পাখির মরণ চিৎকার। কিরাত-নিষাদ-ব্যাধ-হার্মাদদের আর্তস্বর। যখন মর্জি শুকনো পাতার বিছানায় শুয়ে আছে, তার চোখের পাতার টপটপ করে পড়ছে গত রাতের শিশির।
এই ঘটনা সত্য না হলেও মিথ্যে নয়। বন ও প্রাণগ্রাসী সেই ভয়ংকর আগুনে সব পুড়ে থাক হয়ে যাচ্ছে, ছাইয়ের বন্যা, ছাইয়ের বৃষ্টি, ছাইমাখা বাতাস ঢেকে দিল চতুর্দিক।
তারপর এই শহর। এই আধা-শহর। ব্যাঙের ছাতার মতো সিমেন্ট বৃক্ষের মতো মাথা তুলল। এখানকার ধুলোর প্রতিটি বিন্দুর মধ্যে সাংকেতিক ভাষায় লেখা আছে ওই দাবানল ও তার আগেকার সমস্ত কথা। স্মৃতি অতদূর যেতে পারে না, অত কথা জানে না, যা জানে সামান্য ধূলিকণা।
কেতাব। কেতাব।
কল্পনাই আমাদের একমাত্র বল-ভরসা, বাস্তবের থেকে তা ঢের বড়ো বলে, তারই আশ্রয়ে আমরা এক আশ্চর্য দৃশ্য ভাবতে পারি, ধরা যাক মর্জি বেঁচে আছে। সে এই পৃথিবীর কোনো এক শহরের বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে ফ্লাইটের অপেক্ষা করছে ভিন্ন কোনো শহরে যাবে বলে। বা, একই উদ্দেশ্যে কোনো রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে আছে। কোনোভাবে এই আখ্যানটি পত্রিকা বা পুস্তকাকারে তার দুটি হাতের পাতায় খোলা। প্রথম দিকটায় সে মজা পেয়েছে, 'আন্ডারগ্রাউন্ড শহর' অংশটি পড়ে সেই সুর, সেই মেজাজের ভুত্তিনাশ তো ঘটলই, মর্জি সাংঘাতিক খচে গিয়ে মনে মনে কাঁচা খিস্তিও দিল। স্কাউণ্ডেল। এর নাম সাহিত্য। যত হাফ-উইটেড... বাংলা সাহিত্যের বারোটা বাজিয়ে দিল এইসব অর্ধশিক্ষিত লেখকরা। বোকা-বোকা রহস্য, দুঃখ-দুঃখ ভাব, প্রতিবাদের আগুন আর ছক-বাঁধা সোশ্যাল অ্যানালিসিস। একটা খবর লেখার মুরোদ নেই সাহিত্যে মারাচ্ছে।
আধুনিক সাহিত্য কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে মর্জির সুচিন্তিত ধারণা (আমরা তা মানি আর না মানি) থাকা অসম্ভব কিছু নয়। অন্তত মর্জি যে ভোরেশ্যাস রিডার একথা কবুল করতেই হবে। তার চিন্তা ও কল্পনা, নিজেকে জানাবোঝার ব্যাপারেও কেতাবের ভূমিকা মুখ্য। পূর্বাঞ্চলের আদি উপজাতি ও মানুষজন সম্পর্কে আষাঢ়ে কল্পনায় নিজেকে আটকে না-রেখে সে বিস্তর কেতাব বেঁটেছিল তথ্যের খোঁজে। মর্জির মুখ বন্ধ করতে সেসবের কয়েকটি চিলতে এখন পরিবেশিত হবে।
১
১৮২৩-২৪ সালকে ভিত্তি করে বিশপ হেবার 'Indian Journal' লেখেন। উক্ত জার্নালে গায়ের রং নিয়ে নিমখাসা এক তত্ত্ব পেশ করেছিলেন সাহেব। যেমন, প্রাকৃতিক শক্তির হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারেনি বলেই নেটিভরা এত কালো। ন্যাংটো পোঁদে, উদোম গায়ে রোদ-জল-ঝড়ে ঘুরে মরেই গাত্র বর্ণটির এমন করুণ হাল করেছে। বুনো বলেই রং এমন কালো। পশ্চিমের সভ্যতা আচ্ছাদন, নিরাপত্তা ও আরাম জোগাতে পেরেছিল বলেই সাহেবরা অত সাদা। তত্ত্বটি যে অকাট্য তার সাক্ষাৎ প্রমাণ জন্তুজানোয়ার।
বইটি মর্জিদের বুক সেলফে এখনো আছে। কেউ যদি বইটির পাতা উলটো যান দেখবেন একটি পাতার ডানদিকে পেনসিলের আঁচড়ে এরকম একটি লাইন লেখা আছে―'অস্ট্রেলিয়ান শূকরদের ক্ষেত্রে কী বলিবেন?'
২
পুণ্ড্রবঙ্গের আদি জনগোষ্ঠী পোদ, চণ্ডাল, এরাই ছিল সংখ্যাগুরু। মনু-মতে শূদ্র পুরুষ আর ব্রাহ্মাণ নারীর যৌনমিলনেই চণ্ডালের জন্ম। পরশুরামের হাতে নিহত ক্ষত্রিয়দের বিধবারা ব্রাহ্মণদের আশ্রিতা, রক্ষিতা হন। ক্ষত্রিয় বিধবা আর ব্রাহ্মণ পুরুষদের যৌনমিলনেই পোদ বা পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়দের জন্ম। ভবিষ্যতে এরা উৎখাত, দলিত এবং দাস যে হবেই এ যেন তারই জন্মলিপি।
৩
ব্রাহ্মণ পুরুষের স্ত্রী নির্বাচন অবাধ। শূদ্রা, বৈশ্যা, ক্ষত্রিয়া এবং ব্রাহ্মণী তো বটেই, যে কোনো নারীই তার স্ত্রী হতে পারে।
জাতের ধুয়ো কেন, বিদেশির রক্ত মেশেনি এমন জাত আছে নাকি।
৪
ঐতরেয় ব্রাহ্মাণে আদি জনগোষ্ঠীর কথা আছে। মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন চক্রলিপিতেও যাদব, কোলে, পোদ এবং বহু আদিম জাতির উল্লেখ আছে।
৫
গোল বেধেছে এইসব আদিম জনগোষ্ঠীকে বর্ণাশ্রম প্রথায় আঁটাতে গিয়ে। শবর, চণ্ডাল ও শূদ্রদের গোষ্ঠীপতিরা কি রাজা ছিল না। তাদের সিংহাসন যদি মাটির ঢিপিও হয়। রাজা বললে ক্ষত্রিয়ই যদি বুঝি, সে-ও কিন্তু বর্ণাশ্রমের ক্ষত্রিয় নয়।
ছিল দস্যু কৌম-ও। পুত্ররা উপজাতি বিনা আমরা নিশ্চিত নই।
দ্বিতীয় ভাগ
চিরকুট, চুটকি যাই বলি না কেন, এসবের মাথামুন্ডু বোঝা যাবে না। কয়েকটি বইয়ে মর্জির দাগানো। কিছু অংশ সহজ ভাষায় টুকে দেওয়া হল। কলকাতার পূর্বাঞ্চলের আদি জনগোষ্ঠীর অনিবার্য মৃত্যু, সুদীর্ঘ মৃত্যুর গোঙানি এই মেয়েটি কোনোভাবে শুনে ফেলেছিল হয়তো, শপিং মল-ম্যানিয়ার শহর, তার বিচিত্র মিশ্র ভাষার ক্যাচালের মধ্যেও কী করে এটা সম্ভব হল সে-ও এক তাজ্জব কথা। তবে, মর্জির এই খাপছাড়া পাঠে একটি অভিমুখ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। আজকের দলিতের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্মাণই তার লক্ষ্য। ভুলক্রমে, বাতিকে বা অযৌক্তিক বিশ্বাসে আদি পিতা-মাতার জন্য এক আকুল অনুসন্ধানস্পৃহাই সম্ভবত তাকে ঠেলছিল।
এখানে, এই অনুসন্ধানস্পৃহা আমাদের ফাঁপরে ফেলে। বিস্ময়াভিভূত করে। গল্পখোর বলেও হয়তো। এই আখ্যানে আমরা নিহত বা নিখোঁজ মেয়েটির স্মৃতি, কল্পনা, ইতিহাস, পরিবেশ ও নানা অনুষঙ্গ থেকে সতীর দেহের টুকরোর মতো ছড়িয়ে থাকা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুঁজছি, তেমনই মর্জি নিজেও লিপ্ত ছিল এক আশ্চর্য, অর্থহীন অন্বেষণে। এই দুটি অন্বেষণ কোনোদিন মিলবে না। তবে কিছু, অবজার্ভেশন ও প্রশ্ন তো লোকের থাকবেই, যেমন ঈশ্বরবিশ্বাসীরা কষ্ট পাবেন একথা ভেবে, হায়, মেয়েটা ওইরকম আদি বাপ-মার জন্য হেদিয়ে না-মরে তাঁর (ঈশ্বর) কথা কেন ভাবল না। বামপন্থী সমাজতাত্ত্বিকরা (পার্টি-করা) আদি দলিতের খোঁজের মধ্যে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির ইতিহাসটি সমৃদ্ধতর করার সম্ভাবনাও দেখে ফেলবেন নিশ্চয়ই। তাঁরা এ-ও আশা করবেন জনজাতি ও শ্রেণি, এই দুয়ের মধ্যে মালাবদল ঘটবে। সাবলটার্ন-পোস্ট মডার্নিস্টরা অন্য প্রশ্নে দাড়ি ছিঁড়ছেন―'ক্যান ডলিটস স্পিক?' তথাপি, একটি মুচকি হাসি ফ্রি গিফ্ট হিসেবে ঠোঁটের কোণে নির্ঘাত ঝুলিয়ে রাখবেন।
একটি ব্যাপারে অবশ্য আমরা টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিয়োর, কেউই মর্জির ওই তত্ত্বতালাশ-বাতিক-অবসেশনকে স্বপ্নতাড়িত মানবীর আচরণ বলে ভাববেন না। এই মুলুকে স্বপ্নের কোনো হদিশ নেই। হায়, স্বপ্ন। সর্বভুক আদর্শবাদ (রাজনৈতিক) সে সকল ভস্ম করিল... ভস্ম করার পরই-না এই আখ্যান।
নেহাত এই ছিটিয়াল, ডাকাবুকো, বিদীর্ণ হয়ে, রেণু-রেণু হয়ে এ পৃথিবীর মাটি ও আবহমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার স্বপ্নে বিভোর মেয়েটা ছিল। শহর-সভ্যতার অ্যাটিলা আক্রমণ, তার দুঃস্বপ্ন, মর্জির মগজ দখল করেছিল। যেজন্য, তার নিজের ওজনের বোধ পর্যন্ত ছিল না, ভেবেছে, ফিল করেছে-সে এক মরা পাখির পালক।
বিধবার সমঝোতা
এইখানে একটি চরিত্রের আবরণ উন্মোচিত হবে―যেন-বা সে একটি মর্মর মূর্তি, পর্দা ঢাকা। আশ্চর্যের ব্যাপার, চরিত্রটিই স্বয়ং তার ওই মর্মর মূর্তির পর্দাটি সরাবে।
তার নাম সুরবালা, সুরবালা সেন। অঞ্চলটিতে অবশ্য 'সরি' বা 'সরিদি' নামেই সে পরিচিত। গরিব ছেলেমেয়েদের মধ্যে পাঠ্যবই বিতরণ, বস্তিতে স্কুল চালানো, আন্ডারপ্রিভিলেজড মেয়েদের মধ্যে অধিকার বোধ জাগানো, তাদের মিটিং-মিছিলে নিয়ে আসা ও রক্তদান এবং ফ্রিতে ছানি কাটানোর শিবির চালানোয় সরিদি মাস্ট। তাকে চাই-ই চাই। মর্জি এ-জাতীয় অনেক কাজেই সরিদির পাশে থেকেছে। সরিদির স্ট্রাগল, কনফিডেন্স ইত্যাদিতে সে মুগ্ধ। আর একটা গোপন টানও ছিল। যৌবনে দেশ হারিয়ে, উৎখাত হয়ে 'স্রোতের শ্যাওলার মতো ভাইসা যাওয়া'। কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তার ওই ভাসাটাকেই যেন দেখতে পেত মর্জি। সত্তরের কাছাকাছি বয়স, ফিগার আজও পদ্মের ডাঁটা। রং ফেটে পড়ছে। ছোটো ছোটো দাঁতগুলি অটুট এবং প্রতিটি এমনই সমান মাপের যেন কোনো শিল্পী ডেন্টিস্টের হাতের খেল। ওপরের পাটির সামনের দুটি দাঁত সামান্য উঁচু। ফোলা-ফোলা ঠোঁট দুটি এদের মেলে ধরলেই গোটা পাঁচেক দশক আর খুঁজে পাওয়া যায় না, মুহূর্তে সরি এক সাক্ষাৎ মরণটান, বিদ্যুৎরেখা, বিরল যৌবনবতী। 'আশ্চর্য' সেখানে নয়, মোস্ট অ্যাক্টিভ, সেলফ মেড, মোটের ওপর সাকসেসফুল এই প্রৌঢ়ার দৃষ্টিতে কাজল হয়ে থাকা বিষণ্ণতাই এক বিস্ময়। মর্জি যাকে মনে করত দেশ ছাড়ার, ভেসে যাওয়ার বেদনা, সরির নাকের ডগার ঘামের বিন্দুটিও মর্জির চোখে সেই বেদনারই মুক্তাফল।
সরিদির চরিত্র সম্পর্কে পাড়ায় একটা কানাঘুষো ছিল, একটা হিসহিস, ফিসফাস। কেচ্ছা। মর্জির কানে ওই কেচ্ছা তরল আগুন হয়ে ঢুকেছিল। কোন যৌবনে সরিদি কার সঙ্গে কী করেছে তাতে নৈতিকতা, পাপপুণ্য এসব নিয়ে মর্জি বিব্রত নয়। কিন্তু এরকম রটনা ও কেচ্ছার প্রধান যে উদ্দেশ্য, আচ্ছা করে সরিদির মুখে ভুসো কালি ঘষা, তাকে হেনস্থা করা, তার সম্পর্কে 'খানকি' শব্দটি উচ্চারণের নিষ্ঠুর মজা মর্জি সহ্য করতে পারেনি। একদিন সে সুরবালাকে চেপে ধরে, 'লোকের মুখে বাজে কথা শুনতে ভাল্লাগে না। যা-ই ঘটে থাকুক তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হবার নয়। আমি তোমার মুখে শুনতে চাই।'
আর তখন মর্জির দিকে কিছুক্ষণ পাথর-দৃষ্টি মেলে রেখে সুরবালা ধীরে ধীরে সেই গোপন কথার বন্ধ মুখটি খুলতে থাকে।
'শোনো তা হলে কিচ্ছুডি লুকামু না, তিনকাল গিয়া এককাল আছে, তা-ও যাই-যাই। লুকানোর আছেডা কী? আড়ালই-বা কীসের...'
সুরবালার ভাষা এখন আর তার জেলার সব টানটোন, ডায়লেক্ট ঠিকমতো মেলে ধরতে পারে না। পূর্ববঙ্গের আর পাঁচটা জেলার বাগধারাই শুধু নয়, তাতে কলকাতার এবং পশ্চিমবঙ্গের দু'-একটি জেলারও প্রভাব পড়ায় মাতৃভাষাটি এখন কিছুটা মিশ্র। বেদনার ঝাঁপি খোলার চেষ্টায় শুরুতে। 'বাঙালদিদি'-ই (একসময় পাড়াটিতে তাকে এই নামেও চেনানো হত) কথা বলে উঠলেও, পরে আর তা বজায় থাকেনি। তার এই মৌখিক আত্মকথায়, ঘটনাক্রম, সময়ক্রম কোনো কিছুরই মা-বাপ ছিল না। কাহিনির প্রয়োজনে সেসব একটু শুছিয়ে, আগেপিছে করে নেব আমরা (পাঠক ইনক্লুডেড)। ভাষাটাও যাতে মোটের উপর সকলের বোধযোগ্য হয় সেদিকটাও দেখতে হবে। তবে কথা সুরবালার, তাই উদ্ধৃতিচিহ্ন থাকুক। যদিও মনে রাখলে সুবিধে হবে, তার কথার মধ্যে এর-তার দু'-চারটে কথা চোরাগোপ্তা হামলা চালাবে।
'...নোয়াখালির শ্রীরামপুর গ্রামে আমার স্বামীর চোদ্দোপুরুষের নিবাস। গান্ধীর নোয়াখালি যাত্রার বিবরণ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা গ্রামটির নাম মনে করতে পারবেন। চৌমুহনী, রামগঞ্জ সব ওই রুটে। আমার স্বামী কাজ করতেন নোয়াখালি মিউনিসিপ্যালিটিতে, জমি-জায়গা ছিল, আমি গ্রামের স্কুলে টিচার ছিলাম। দেশভাগের আগেই অনেক হিন্দু ইন্ডিয়ায় চলে গেল। এমনিতেই ফলের বাগান, গাছগাছালি আর জলের দেশ, মানুষ আর ক'টা। আমি তো গাছের সঙ্গে কথা বলতাম সেই ছেলেবেলা থেকেই। সেই ঠান্ডা নির্জন প্রান্তর, নদী-নালা কেঁপে উঠল 'আল্লাহ আকবর' ধবনিতে। আর আমার স্বামীর মাথাটা ধড় থেকে পড়ে গেল পাকা বাতাবিলেবুর মতো। গোবর লেপা উঠোনের খটখটে মাটি মুহূর্তের মধ্যে রক্ত শুষে নিল, কাঁঠাল গাছের ডালপাতার আড়ালে লুকিয়ে সেই মাটির দিকে তাকাতেই বুক শুকিয়ে গেল, রাক্ষুসে মাটি।..
'এরপর তো পালানোর পালা। পালাতে হবে। সঙ্গে দুটি অপোগণ্ড শিশু। কীভাবে যে বেত বন, পাট খেত, ধান খেত, নদী-নালা পেরিয়ে, মাইলের পর মাইল হেঁটে ট্রেনে-বাসে চেপে শিয়ালদার পৌঁছেছিলাম তার পূর্ণ বিবরণ দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। অত দ্রুত, অত অজস্র ঘটনা ঘটায় স্মৃতিরও সাধ্য হয়নি পুরোটা ধরে রাখার। শ্রীরামপুর গ্রামে তো কোনোকালেই ঘটনার বাহুল্য ছিল না। মনের গড়নটাও তাই অন্যরকম। ১৯৫০ সালের ওই ভয়, নিরাশা, সংকট, দুঃস্বপ্ন চলতে চলতে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁফাতে হাঁফাতে শিয়ালদায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ল।...
'দুঃখকষ্টের বর্ণনায় আর যাচ্ছি না। শিয়ালদায় আর সবাইয়ের সঙ্গে হোগলার ছাউনিতে থাকতে লাগলাম। আমার বয়স তখন বছর বাইশ। দিন কাটে সরকারি ডোলে। এই সময়, মানে শিয়ালদায় আসার মাস দুই পরে, একটা ভলান্টিয়ার অর্গানাইজেশনের মাঝবয়সি এক কর্তাব্যক্তি লুকিয়ে খান দুই শাড়ি দিয়েছিলেন আমাকে। প্রায় দিনই তিনি আসেন। কেমন মায়া মায়া চোখে তাকান। দু'-পাঁচ টাকা হাতে গুঁজে দেন। ক্রমে বুঝলাম ভদ্রলোক আমার প্রতি আসক্ত।
'মনে মনে অনেক ভাবলাম। ভাবি আর দুই অবোধ শিশুর মুখের দিকে তাকাই। শেষে একদিন নিজেই জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনে কি আমারে কিছু কইতে চান?' প্রথম দিন উত্তর না, দিয়ে খুব নরম করে হাসলেন। এইভাবে দিন কতক গেলে একদিন নিজের মুখেই বললেন-'আমার নাম কেদার বসু, ব্যাবসা করি, ভালোই চলে ব্যাবসা। আমার ঘরে বউ আছে। তার সঙ্গে আমার বনে না। তোমাকে খুব ভালো লাগছে।'
'অর্থাৎ কিছুই বাকি রাখলেন না বলতে। পরে একেবারে পুরো প্রস্তাবটাই মেলে ধরলেন। ছেলেদের বড়ো করতে হবে। লেখাপড়া শেখাতে হবে। এই হোগলার ছাউনিতে থেকে বা দণ্ডকারণ্যে গিয়ে তা কতদূর হবে সন্দেহ আছে। তিনি আমার জন্য বেলেঘাটার বস্তিতে ঘর দেখে রেখেছেন। মাস-খরচও তিনিই জোগাবেন। ব্যাবসার খাতা দেখার কাজ দেবেন, তার মাইনেতেই সব খরচ-খরচা ভালোভাবে চলে যাবে।
'মনে মনে ভাবলাম কামুক একটা। আসলে রক্ষিতা করতে চায়। আমার তো তার জন্য শরীর বা মনে কোনো টানই নেই। কেদারবাবুর প্রস্তাবে রাজি হওয়া তো বেশ্যাবৃত্তিই। কী ঝড় যে গেছে মনের ওপর দিয়ে বলে বোঝাতে পারব না। শেষটা তা-ই হল এরকম অবস্থায় যা হওয়ার কথা। তবে, একথাও সত্য, আমার মতো দুর্যোগে-বিপাকে পড়েও কেউ-কেউ এ-ধরনের প্রস্তাব পেয়েও রাজি হয়নি। আজ তোমাকে বলি মর্জি, সেই সব মেয়েমানুষ বোকা, মূর্খ। আমাদের রক্তের মধ্যে দাঙ্গা না, হিংসা না, ভালোবাসার এক জটিল খেলা আছে, বাঁচার এক গভীর টান। কেদারবাবু এরপর বছর পনেরো বেঁচেছিলেন। কোনোদিন আমাকে অসম্মান করেননি। স্বামী আমাকে যে যৌনসুখ দিতে পারেননি, সে-ও আমি তাঁর কাছেই পেয়েছি। এখন যে আমার এক ছেলে ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি করে এবং অন্যজন ঠিকেদারি করে খাচ্ছে সেসবই তো ওই মানুষটার জন্য। দুর্গতি-দুর্বিপাকে তলিয়ে কোথায় ভেসে যেতাম আমি। দুঃস্বপ্নে নুয়ে পড়া মানুষ, তাদের ছায়ামিছিল আমি আজও ভুলিনি। আমি জানি তারা আছে আমারই আশেপাশে, জানি তারা জন্মাবেই, অন্তহীন এই মিছিল। তবু যে বাঁচি, বেঁচে থাকি, বাঁচাই সে তো ভালোবাসারই টান গো?'
সংযোজন
একদমে বলে যাওয়া সুরবালার এই বৃত্তান্তে ছুট-ও তো কিছু কম নেই। না-বলা কথা তো কতই। এমনকী সেইসব কথার মধ্যে সুরবালার নিজের কাছেই আজও অব্যক্ত এমন কথাও আছে। সেই আখ্যান কোনোদিনই ফুরোবার নয়। যেমন সুরবালার সমঝোতা বা নেগোসিয়েশন, ব্যবসায়ী পুরুষটির সঙ্গে তার সম্পর্ক তো সেখানেই, সুযোগ-সুবিধা-নিরাপভায় আটকে থাকেনি। মর্জির কাছে ছেঁড়া-ছেঁড়া মন্তব্যে পরে সে জানিয়েছে, 'নিয়ম, প্রথা যে কত বড়ো শেকল', 'মানুষের মন আর যুক্তি এই শেকলের চারপাশেই ঘুরঘুর করে', 'হয় মানো না হলে ভাঙো', 'প্রয়োজন একটা ছিল কিন্তু আমাদের সম্পর্ক সেই দেওয়ালও ভেঙে ফেলে', 'আমি বুঝতে পারছিলাম আমার মধ্যে প্রেম আছে, প্রেম ছিল, দুটি ডানার মতো...'
―তা হলে তুমি উড়লে?
―অন্তত আমার ডানা দুটো নড়ে উঠল।
―সংস্কার?
―দেশ হারিয়ে, সর্বস্ব খুইয়ে আর সংস্কার থাকে। হারানোটা যে কত দরকার ছিল আজ বুঝি
―মুক্তি...
―সে যেন এমন রেফিউজি মিছিল, পোঁটলা বাঁধা লাঠির মাথায়, বোঁচকা-কুঁচকি, চলো, চলো,
চলো...
মর্জির সঙ্গে যখন এরকম কথা, তখন তো দেশভাগ, উদ্বাস্তু ইত্যাদি স্মৃতি। সুরবালার ব্যাখ্যা ও অনুভব অন্য এক সময়ে, যখন সে তার স্মৃতিকে সচেতনভাবে সাজাচ্ছে-গোছাচ্ছে, তাতে নানারকম তাৎপর্য খুঁজছে, আর এতসবে স্মৃতিও নবীন, সুরবালার সঙ্গে চলতে চলতে, ভাব জমাতে জমাতে কেমন আশ্চর্য সুন্দর হয়ে উঠছে দুঃখের দিনগুলো।
সুরবালার ছায়া কত জলা, জমি, মেঠো আর পিচের রাস্তায়, দালানে, অফিসেই না পড়েছে। ছায়া আরও কত জনের। দঙ্গলের। লাঠি ও পুঁটলির, দাঙ্গাবাজের। বন্দুকধারী পুলিশের। মিছিলেরও। সমস্তই চলমান, কোথাও-না-কোথাও ডুবে থাকা মানুষজনের সামান্য লোভ, সামান্য ঈর্ষা, হোঁচট খাওয়া এমনকী মুখ থুবড়ে পড়া, একে-তাকে খামচে ধরারও কোনো দাগ থাকে না। মর্জি সুরবালাকে কাছ থেকে, দূর থেকে অনেক দেখেছে। সেই দেখায় শেষ পর্যন্ত এক আকস্মিক আবির্ভাব থাকত অজস্র ছিন্নমূল মানুষের, তার মনে হত, মানুষমাত্রেই তা-ই, সে নিজেও আসলে এক শরণার্থী, শুধু সে তো জানতে পারেনি, হয়তো কোনোদিন জানতেও পারবে না। লালবাজারের পিছনে পাসপোর্ট অফিসের সামনে ওই দীর্ঘ লাইনটিই-বা কাদের? তারা তো এসেছে বাংলার গ্রাম ভেঙে-আরবদেশ, হংকং, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কোথায় না গতর খাটাতে যাবে। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে, ভিসা অফিসে, জাহাজঘাট ও রেলের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষার শেষ নেই, যেমন শেষ নেই বরফ আর মরুতে। গুলিবর্ষণেরও, দাউ দাউ জ্বলে যাচ্ছে প্রাচীন আরবীয় স্থাপত্য, ক্রোয়েশিয়ায় গুলিবিদ্ধ করফে মুখ। গোঁজা সৈন্যটি এখনও মরেনি কিন্তু ওর দিকে শুশ্রূযার হাত বাড়ানোই যাবে না, পেটের তলায় কারা যেন মাইন পেতে রেখেছে।
অন্ধকার যে কত।
অন্ধকারে শিশুদের অস্থি পর্যন্ত আছে। যাদের জন্মভূমি চিতার দাউদাউ। আকাশ-পাতাল ফুঁড়ে সভ্যতার বুলডোজার এদের এবং ভবিষ্যতের শিশুদের হাড় ছাই করবে। রামধনু খেলবে সেই উড়ন্ত ছাইয়ের প্রতিটি বিন্দুতে। অপেক্ষা তারই, ভবঘুরে, চিরশিশু চার্লি এসবই জানত।
'খবর না থাকাটাই মঙ্গলজনক'
বলেছিলেন পুলিশ কর্তা। দেখুন খবর নেই মানে এটুকু আমি সিয়োর, ওভার কনফিডেন্ট, 'মরজি বেঁচে আছে।' যদিও এর মধ্যে অজল ফুল শুকিয়েছে, নাগরিক জীবনে, মরুতে জলের চিহ্নমাত্র রাখতে ব্যর্থ গুটিকয় বর্ষা অনেকবারই মারুতি ৮০০-কে নৌকো বানিয়ে ছেড়েছে। ম্যানহোল গিলে খেয়েছে সতেরোটি শিশু। ধনঞ্জয় মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে মৃত্যুদণ্ডে। শিক্ষিত প্রগতিশীল লোকরা মাস-দুই মৃত্যুদণ্ডকে ধিক্কার জানিয়েছে। এ সি হল বিতর্কে আগুন হয়েছে।
আজ, অবশ্য সববাই শুধু ক্রিকেট ক্রিকেট ক্রিকেট। শুধু হিন্দু-পাক ভাই ভাই ভাই ভাই যা শোনায় বাই বাই বাই বাই।
মিনিবাসে বাঙালিরা ঘামতে ঘামতে এইসব তর্কবিতর্ক, বেঁচে থাকার যা প্রমাণও বটে, তার জের টেনেও দু'চার কথা বলে, সেইসব কথার পাঠোদ্ধার বড়োই কঠিন:
'সব-ই ও-ব্যাস হয়ে যায় ব্রাদার'
'ওরম কতা মিনিস্টারকে মানায় না'
'লাইফে মান-ইজ্জত কামাতে গেলে অত ছানবিন করা যায় না'
'সোমোস্যাটা কী জানেন'
কিন্তু আমরা যে তিমিরে সেই-তিমিরেই রয়ে গেলাম। মর্জির বাবা নাজিম হিকমত একটু এডিট করে মনে মনে আওড়াতে চাইছেন হয়তো, 'একুশ শতকে শোকের পরমায়ু'... আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে, শোক কেন, মর্জি তো বেঁচে আছে। ক্রমে, তিনি নিজেকে দীর্ঘ অপেক্ষার যোগ্য করে তুলেছেন। ফুল এবং পাখির দিকে মন দিচ্ছেন। এখন আমরা পাখিটির কথা বলব, কারণ তার কথা কিছুই বলা হয়নি।
তোতা কাহিনি
সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, কিছুটা প্রভাব-প্রতিপত্তি সত্ত্বেও বিশ্বনাথ মনে মনে জানতেন তিনি খোঁড়া। তিনি ঠিক মনের মতনটি, নিজের চিন্তা ও কল্পনা অনুযায়ী হয়ে উঠতে পারেননি। মর্জিনা, তথা মর্জিকে নিজেরই এক বিস্তার ভেবেছেন। এই চিন্তার গলদ এখন স্পষ্ট। বুঝতে পারছেন যযাতি মিথ্যে নয়। এই তা হলে যযাতি। আর তখনই পাখি ডেকে ওঠে, 'কোটায় যে, যে কোটায়', মর্মার্থ: কোথায় সে, সে কোথায়?
নিজের অজান্তেই বিশ্বনাথ পাখিটিকে শ্লোক মুখস্থ করানোর এক অসম্ভব চেষ্টা করলেন:
ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি ন বাগগচ্ছতি নো মনঃ।ন বিয়ো ন বিজানীমো যথৈতদনুশিষ্যাৎ।।
চোখ যায় না, কথা না, মনও না, এই দুরূহ তত্ত্ব আচার্য যে কীভাবে শিষ্যকে ব্যাখ্যা করে বোঝান-তা-ও তো জানি না।
পাখি, শ্লোক ও শ্লোকার্থ মিলেমিশে আবছা, কেমন অন্ধকার-অন্ধকার, বিশ্বনাথ দেখেন সেই অন্ধকারে ফুটে আছে মর্জির মুখটি। নিজেকে সামলানো, শান্ত করা, উপনিষদ আউড়ে ব্রহ্মকে কল্পনা করার চেষ্টা বানচাল, শঙ্করাচার্য বানচাল, মায়া। কী গভীর মায়া।
মর্জি ভবিষ্যতে কেমনটি হয়ে উঠলে বিশ্বনাথ তৃপ্তি পেতেন সে অন্য কথা। আজ তা নিতান্তই অর্থহীন। ফুল, পাখি আর লাইব্রেরিতে মর্জির একান্ত পরিবেশটি রচে দেওয়ার মধ্যে তার ক্রু খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। পাড়ায়, বস্তিতে কিছুটা আলগা মেলামেশা ও সামাজিক-রাজনৈতিক কাজের প্রতি অনুমোদনেরও একটা মাপ ছিল। বিশ্বনাথ টের পাচ্ছেন এখন, কোথাও একটা বড়ো ধরনের কেলো করে বসে আছেন। মেয়েটাকে নরম কাদার তাল ভেবেছিলেন, টিপেটুপে, চেঁছে সেই তালটিকে শেপ দেওয়ার চেষ্টাটা স্নেহ-ভালোবাসার রসসিক্ত হয়েও নির্দয়ই থেকে গেছে। মর্জিকে তিনি চালাতে, গড়তে, কন্ট্রোল করতে গিয়েছিলেন। মর্জি এখন কোথায়, কত দূরে চলে গেল। নিয়ন্ত্রণের, মর্জিকে নিজের চিন্তা ও কল্পনা মতো গড়ার সংকল্প আজ তিনি নোংরা গঙ্গায় বাসি, ধ্বস্ত ফুলের মতোই বিসর্জনে প্রস্তুত। কিন্তু সে কোথায়। চোখের, দৃষ্টির, কথার, মনের সীমা ছাড়িয়ে কোন দূর আকাশে। বিশ্বনাথ এখন খাঁচার সামনে। কাকাতুয়ার পালক, চোখ, লেজের ওপর দিয়ে তাঁর নজর বারবার গড়িয়ে যাচ্ছে। ফুল আর পাখিতে এক ফোঁটা প্রকৃতিও তিনি কি মর্জির সিলেবাসে রাখতে চাননি। কী বোকা। কী অপদার্থই না ছিলেন।
পাখিটি বেছেওছিলেন তো এইজন্য যে, কাকাতুয়ার থেকে শান্ত পাখি আর হয় না। বাচ্চাদের সঙ্গে ভাব করে ফেলে সহজে, মেজাজ শান্ত, আর শেখার কী আগ্রহ। এইটুকু সেই পাখির বাচ্চাটি ছিল মানুষের বাচ্চার মতোই, একেবারে মর্জির বয়সি। রোজরেস্টেড ককাটু আশি বছর বাঁচে, অস্ট্রেলিয়া থেকে এই প্রজাতিটির ভারত আগমনের ইতিহাস বহু পুরোনো। মর্জি ওকে 'রোজি' বলে ডাকত। রোজির সাড়া দেওয়ার ভঙ্গি ও ভাষা ছিল অদ্ভুত। পালকে ঠোঁট গুঁজে সে বলত―টুকি'। পৃথিবীর সমস্ত ELO PHOLUS ROSEICAPILLOW তথা রোজব্রেস্টেড ককাটু বহুদিন যাবৎই উদ্বাস্তু। জল-জঙ্গলের আদি বাসস্থান, অবাধ আকাশ কবেই মুছে গেছে। খাঁচা আর খামারের পোষা পাখি, খাঁচার জীবনেই বাঁচে বেশি। পাখিটির গোলাপি শরীর, তাতে গোলাপি লাল ছিট ও শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে করতে বিশ্বনাথ খাঁচার কাছে নিজের মুখটি নিয়ে গেলেন, রোজি তাঁকে চুমো খেলে বিশ্বনাথের দৃষ্টি আবছা, চোখে জল এসে গেল।
ওই চোখে মর্জিনার কোনো নতুন পট ভাসিয়া উঠিল কি না, বা মুহূর্তমধ্যে তাহা অন্তরে ফোটোগ্রাফ হইল কি না, আমরা বলিতে পারি না। এই স্থলে কোন পটবন্ধনী ক্রিয়াশীল তাহাও আমরা নির্দিষ্টরূপে জানি না। তবে অনুমান করা যাইতে পারে সেই সুর, সেই রূপের গন্ধ ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল চিত্রও হইতে পারে। যে ভবিষ্যৎ এক্ষণে মৃত, সম্ভাবনারহিত বলিয়া অতীত হইল...
নাহ্, উপস্থাপনার, পেশকারের এই তরিকা আমাদের জন্য নয়। অ ছাড়া, হাতে এমন কিছু তথ্য আছে, যার দরুন বিশ্বনাথবাবু মর্জিনাকে ভবিষ্যতে কী ভাবে দেখতে চেয়েছিলেন, তা আমরা জানি। অর্থনীতির ছাত্রী মর্জিনা আন-অর্গানাইজড সেক্টর নিয়ে, স্বল্প পুজি ও বৃহৎ পুঁজির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিল। গবেষণা সূত্রেও তাকে শহর ও শহরতলির গরিবশুর্বোর সঙ্গে ইস্টারঅ্যাকশন, ডায়ালগ ইত্যাদি করতে হত। বিশ্বনাথ চাইতেন থিসিসটা এখানে না-করে মর্জিনা আমেরিকার কোনো ইউনিভার্সিটি থেকে করুক। মর্জিনা যদিও এব্যাপারে একটু দোলাচলে ছিল। ছোটোবেলা থেকেই সে সাহিত্যের পোকা, ইংরেজিটাও খাসা লেখে, সুতরাং চাইলে, চেষ্টা করলে ঝুম্পা লাহিড়ি কিংবা অরুন্ধতী রায়দের থেকে ঢের ভালো বই প্রোডিউস করে বুঝার-টুকার হেসেখেলে ছিনিয়ে নিতে পারত―বিশ্বনাথ ভেবেছেন।
আমাদের সংশয়, বিশ্বনাথবাবুর চোখে জল এল কোন মর্জিনার কথা ভেবে। ভবিষ্যতের, নাকি নিরুদ্দিষ্ট মর্জিনার কথা ভেবে? খুনের কথাটাই-বা তাঁর মাথায় এল কেন? মর্জি সব ছেড়েছুড়ে কেটে পড়ায় ভবিষ্যতের ছবিটির যে ক্যানভাস, বিশ্বনাথ কি সেখানে রক্তের ছিটে দেখে ফেলেন?
বিশ্বনাথবাবুকে কাঁদতে দিন, সেই অবসরে আমরা বরং পেশাদার বেসরকারি গোয়েন্দার রিপোর্টটি দেখে নিই চলুন।
ডিটেকটিভ অগ্নির রিপোর্ট
সিক্রেট আই সংস্থার গোয়েন্দা অগ্নি (রায় কিংবা বসু) বছর খানেক রগড়ঘষের পর হাল ছেড়ে দেয়। একটু ভুল হয়ে গেল, হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং বলা উচিত―প্রাপ্ত তথ্যাদি এবং অনুসন্ধানলও ইতিপূর্বে অজানা ঘটনা ও তথ্যের ভিত্তিতে তরুণ গোয়েন্দা একটি সম্রে উপনীত হন। আর সেই সত্য হল, নিজেকে আবিষ্কার করার উদ্দেশে যদি কেউ পূর্ব-পরিচয় সজ্ঞানে লোপ করে, তা হলে সেই উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির সন্ধান করা দর্শনের কাজ হলেও হতে পারে, অপরাধ-বিজ্ঞানের কাজ নয়।
বুঝতেই পারছেন অফিসিয়াল ভাষা থেকে ছবৎ বঙ্গানুবাদে কী টাইপের রদ্দি জিনিস দাঁড়ায়। আসুন, আমরা ওই পথ ত্যাগ করি। সকলের বোধগম্য এবং এনজয়েবল, রিডার-ফ্রেন্ডলি ভাষায়
রিপোর্টটির কিছু (স্পাইরাল বাঁধাই, এ-ফোর কাগজের ১১৮ পৃষ্ঠার রিপোর্ট। যার অনেকটাই সাজুগুজু, কায়দাকেতা, ডায়াগ্রাম, পরিভাষায় জবরদস্ত। মক্কেলের ঘাড় মটকাতে 'করনা পড়তা'), ইন্টারেস্টিং অংশ অতঃপর পেশ করা হচ্ছে:
'মেয়েটা একটু টম-বয় টাইপের, অর্থাৎ কিনা গেছো ছিল। মা না থাকায়, বা বিশ্বনাথও মনে মনে চাইতেন মর্জি টগবগে, দৃঢ়, এককথায় পাওয়ার হাউস হয়ে উঠুক। টিপিক্যাল লবঙ্গলতা টাইপ যেন কিছুতেই না হয়। মেয়েটার ধাতই ওইরকম নাকি বিশ্বনাথের ক্রমাগত প্রম্পটিং-এর দরুনই সে অতটা স্পষ্ট, পাড়ার বিচারে একটু নির্লজ্জা হয়ে ওঠে, সে ব্যাপারে নিশ্চয় করে কিছু বলা যাবে না।
...'এর দরুন অঞ্চলটিতে তার দুটি ছবি লটকে থাকতে দেখেছি। যেন দুটি কাটা মুণ্ডু। যেন ইলেকট্রিক তারে বা বাড়ির কার্নিশের বটগাছে আটকে থাকা দুটি কাটা ঘুড়ি। একটিতে সে বল-ভরসা জাগায়, ডাকাবুকো। অন্যটিতে নষ্ট মেয়ে। গেরস্থদের একাংশের বিচারে বাপের টাকা আর ধৃতরাষ্ট্র-বাৎসল্যহেতু মর্জি গোল্লায় গেছে। একুশ বছর বয়সের মধ্যেই সে গুটিকয় ছেলের মাথা খেয়েছে, তাদের বিছানা গরম করেছে। আবার এই মেয়েই নিজের জরুরি কাজ ফেলে রেখে কারখানায় গেটমিটিং করেছে, আন্ত্রিকের রুগিকে আই ডি-তে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করেছে, কাঁকুড়গাছির পুলিশ ফুলবাগান বস্তির এক বিধবাকে রেপ করায় থানার ওসির টেবিল উলটে দিয়ে সেই পুলিশকে গরাদে। ঢুকিয়েছে।
'ভদ্রবাড়ির মেয়ে হয়েও ছেলেদের মতো খিস্তি করত। যৌনবিশ্বস্ততার ধার ধারত না। আবার সেক্সের ব্যাপারে যে মুখিয়ে থাকত এমনও নয়। পাড়ার এক সাট্টাবাজের সঙ্গে শুতেও তার দ্বিধা হয়নি। প্রসঙ্গত, ভোম্বল নামের সেই সাট্টাবাজ যুবক মর্জির পাল্লায় পড়ে ধান্দা পর্যন্ত ছেড়ে দেয়। এতে যে ভোম্বলের খুব সুবিধে হয়েছিল। তা নয়। সে অন্য কথা। কিন্তু মর্জি চারিদিকে যা বলেছিল, মেয়েটির মনের একটা আন্দাজ পেতে সেটা খুবই জরুরি। মর্জি বলেছিল, 'সেক্সুয়াল রিলেশন ইজ অ্যান এক্সটেনশন অব অ্যাফেকশন' একথার বিস্তর মানে হতে পারে। আবার সে হয়তো সাহিত্যা বা অন্য কোথাও এরকম একটা লাইন পেয়েছিল এবং তাতে মজে যায়। না হলে তো ধরে নিতে হয়, সদ্যযৌবনা এই মেয়েটির মধ্যে থেকে কথা বলে উঠেছে এক প্রাচীন নারী, এক আদি মা!
'চড়কডাঙা থেকে মর্জি বহুদূরে চলে গিয়েছিল, ততটা দূরে, যেখান থেকে এই পাড়াটিকে দেখার একটা আশ্চর্য দৃষ্টি সে পেয়ে যায়। সাহেবি স্কুলে পড়া, দেশের শৈল-শহরগুলোয় ভ্রমণ, অফিসার গোছের লোকজনকে কাছ থেকে দেখা, ডিবেটে ফাটিয়ে দেওয়া, এন আর আই সঙ্গ এবং অবশ্যই বাড়ির লাইব্রেরিটি এই দূরত্বের রচয়িতা। যে জন্য চড়কডাঙার লোকজনকে তার মনে হত যেন অতীতের কোনো রেফিউজি কলোনি বা তারও বহু-বহু আগের সাহেবসুবোর আমলের নেটিভদের এক কলোনি মাত্র। গরিবগুর্বো মধ্যবিত্ত এবং ব্যাবসা বা পেশা সূত্রে কিছুটা পয়সা-করা লোকজনের কাছে এই পাড়াটি কোনোভাবেই ম্যাটার করে না। এর থাকা না-থাকা সমান। আসলে আওয়ান সভ্যতা, নতুন দেশের মানচিত্রে এর কোনো স্থানই নেই। এ-আসলে পরিত্যক্ত। জলা। যা অচিরে বুজিয়েও ফেলা হবে। তা না হলে দুর্বিপাকের অন্ত থাকবে না। এই বাদ যাওয়া, বাতিল হওয়ার কত চিহ্নই-না দেখে ফেলল।
'রিপোর্টের এইখানে এসে কারও মনে হতেই পারে এ কি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং নাকি জলো দর্শন-সাহিত্য ইত্যাদি হচ্ছে। আসলে কেসটা বেশ জটিল। একটি মেয়ের দেখা, তার ভাবাই এখানে সব কিছু। এবং ইনভেস্টিগেটর হিসেবে এরকম একমনা, পড়াশুনো করা, ভীষণ দলছুট কবি মেয়েটির সব কিছু ধরে ফেলা আমার বিদ্যেবুদ্ধির বাইরে। মর্জি নিজে তার ডায়রি, খাতা, বইয়ের মার্জিনে আপন খেয়ালে দু'-চার কথা যা লিখে রেখেছে সেসবে একবার চোখ বোলালে কিছুটা বোঝা গেলেও যেতে পারে।'
নিরুদ্দিষ্টার পত্র
রিপোর্টটি যত কেলিয়ে পড়েছে তার সাজসজ্জা, পরিভাষা ও ডায়াগ্রাম ততই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ওই বিরক্তিকর রিপোর্টটিতে আমাদের কী কাজ। আমরা বরং, ছড়িয়েছিটিয়ে, নানা কথায় মর্জি যে চিঠিটা রেখে গেল সেইটির ছেঁড়া ছেঁড়া অসম্পূর্ণ বাক্য, অনুচ্ছেদই পাঠ করি।
‘...রোজিটা মহা খচ্চর। থেকে থেকেই আমাকে দেখলে ডেকে ওঠে, 'কে? তুই কে?' শুনতে শুনতে কথাটা আমার মগজের দখল নিয়েছে। প্রথমে খুব বিরক্ত হতাম, রেগে যেতাম-ধ্যাত্তেরি, বাক্ষোৎ পাখিটাকে দূর করে দেব। তারপর কেমন করে যেন ওই জিজ্ঞাসা, ওই কথাটুকু গান হয়ে গেল। গানের একটা লাইন হয়ে সুরে সুরে আমাকে পেঁচিয়ে ফেলল। টের পেতে শুরু করলাম আমার শরীরের... সব ক'টা কোষ, আমার চোখ, ঠোঁট, চুল সর্বত্র ওই লাইনটির প্রতিধ্বনি...।'
....'বোকা বোকা উদাস ব্যাপার, রাবীন্দ্রিক সমর্পণ, ফিলজফিক্যাল কিংবা রিলিজিয়াস কোয়েস্টের দিকে আমাকে একটা কাকাতুয়া পুশ করবে... মোস্ট ফানি, ফুলিশ কোয়েশ্চেন... বেসিক্যালি দিজ ওয়াজ চেতনা, চেতনসত্তা বলাই ঠিক, এই সত্তা আমার ভিতরে, বাইরে পাখি, বাইরের পাখিটা কথা বলতে চাইছে ভিতরের পাখিটার সঙ্গে। ডাক শুনে চেতনসত্তায় মিশে থাকা শূন্যতা যদি হা-হা করে উঠত, তা হলেও কথা ছিল... আমার কেবলই মনে হত কী ছাই আলফাল ব্যাপারে জড়িয়ে আছি...।
'পার্টি, পড়াশুনো আর বাবার কামনা-বাসনা-স্বপ্ন কেমন মিলে যাচ্ছে। যেন একটাই ছক। যেন বলতে চায় বাঁচার মধ্যে যে অভ্যাসের ব্যাপারটি আছে তার থেকে সুন্দর... গভীর কিছুই নেই। লে হালুয়া...'
.....
'পরিস্থিতি জটিল। সংকট চলছে। দেখা না-গেলেও এক ভয়ংকর ঝড়, ভাঙনের সময় এখন। উৎখাতের কাল এটা। তাই মাটি কামড়ে থাকো। কিস্স করতে যেয়ো না। এখন কিসুটি হবার নয়-কেন? ঠুটো হয়ে থাকো। নিজের ভালোর কথা ভাবো। চাবুক পেশাদার হও। টাকা কামাও। নাম কামাও। প্রফেসর থেকে বাবা সবাই কী করে যে এমন এক সুরে কথা বলতে পারেন। কোথাও কি কোনো ভয়ংকর প্রম্পটিং আছে? মিডিয়ার রাবণমুখেও তো কমফর্ট-কনজিউম এবং সেলিব্রেট থেকে বি আ সেলিব্রিটি এই তো স্লোগান। হোঁতকা লেখকরা পর্যন্ত সরকারচাটা...।
....
'আই নো নিদার আই ক্যান বিকাম আ চাইল্ড এগেন, নর আই ক্যান বিকাম চাইন্ডিশ... তবু, তবু মনে তো হচ্ছে পাকা মাথাগুলো শয়তানের আড্ডা। সেদিন বেলেঘাটায় মেধার মধ্যে আমি এক শিশুকেই দেখতে পেলাম, শিশুটি কাঁদছে সর্দার সরোবর সংলগ্ন হাজার-হাজার একর ভূমির বিচিত্র সব পোকা, পাখি, লতা আর লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য। ওখানে তো জীবন কিছুদিন আগেও ছিল শিশুর মতোই... ডু আই নট ফাইন্ড জয় ইন দ্য চাইল্ড নাইভতে, অ্যান্ড মাস্ট আই নট মাইসেলফ স্ট্রাইভ টু রিপ্রোডিউস ইটজ ট্রুথ অ্যাট আ হায়ার স্টেজ। ডাজ নট দ্য স্পেসেফিক ক্যারেক্টর অব ইচ এপোক কাম অ্যালাইভ ইন ইটজ টু নেচার, ইন দ্য নেচার অব দি চাই...।
'হতশ্রী, দুর্গতদের, শরণার্থীদের মধ্যেই বেঁচে আছে সেই চিরশিশু। সেই শিশুদের স্পন্দন, অগোছালো, অস্ফুট কথা, টালমাটাল পা ফেলা...' সে আছে উত্তরে, দক্ষিণে, পূবে, পশ্চিমেও... ঝুপড়িতে, রেললাইনের বস্তিতে, ফানোরিয়া জুটমিলের বৃহৎ গাছটির ছায়াতেও..
প্রথাগত উপসংহার
মর্জির চিরকুট, নোট, ডায়রি আরও তন্নতন্ন করে খাঁটলে হয়তো এমন কিছু পাওয়া যেত যা থেকে মেয়েটা সম্পর্কে একটা ছক খাড়া করা যায়। আবার এমনও হতে পারত এক-একটা নতুন তথ্য, ঘটনা, বিবৃতি আমাদের প্রতিবারই বাধ্য করত আগেকার ছকটি বানচাল করতে। বেচারা ডিটেকটিভ। এই কেসটি নিয়ে প্যান্ট হলুদ হওয়ার অবস্থা, সেজন্য বেশি ঘাঁটাঘাটি না-করে যেসব টুকরো-টাকরায় মোটের ওপর বিশ্বাসযোগ্য একটা ছক বানানো যায় সেগুলোই বেছে নিয়েছিল। আমরা এখানে সততার স্বার্থে জানিয়ে রাখি সে যা-যা বাদ-সাদ দিল সেগুলোকেও এমন অনেক খোপে সাজানো সম্ভব, যা অগ্নি-প্রদত্ত ছকটির থেকে বেশি পাওয়ারফুল এবং অথেন্টিক হতে পারে। তবে কোনটা তার কথা, কোনটা-বা বইয়ের, চেক করা হয়নি।
একটি নজির :... 'মাটির টিলাটির উপর সূর্যাস্ত দেখিবার শখ এ-জীবনে আর একবারও শশীর আসিবে না।' যে খাতাটিতে মর্জি লাইনটি গোটা-গোটা করে লিখেছে, সেই খাতার আর একটি পাতায় লিখে রেখেছিল, 'অপ্রেশন অ্যাজ ইট অ্যাপিয়ার্ড টু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হ্যাড শোন ইটজ ফেস টু নেকেডলি, পার্টি হ্যাড গান ফার ইন টিয়ারিং দ্য হালো ফ্রম রাইটার্স অ্যান্ড পোয়েটস বাই ড্র্যাগিং দেম ইনটু দ্য গ্রাউন্ড অব স্লেভারি, সিমিলার থিংস হ্যাপেনড হোয়েন ক্যাপিটালিস্টস ড্র্যাগড দেম ইনটু দ্য মার্কেট-প্লেস।'
শশী যেখানে স্থিরচিত্র, মর্জি কি সেখান থেকেই এক যাত্রা শুরু করার কথা কল্পনা করেছিল? ছকা-বিপ্লব, পার্টি, পরোপকারের মধ্যে মহত্ত্বের মহীরুহ সে দেখতে পায়নি। একা সে, গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন, সে চেয়েছে সুস্থ হয়ে উঠতে। কোনো এক রাজার গৃহত্যাগের আখ্যানের সঙ্গেও জুড়ে যেতে পারে মর্জির অন্তর্ধান বৃত্তান্ত। আবার, এমনও হতে পারে মেয়েটা নেহাতই ছিটিয়াল। কিংবা চড়কডাঙার রটনা যেমন, নষ্ট মেয়ের কুটকুটুনি।
পাঠক, আপনাদের যাঁর যেমন রুচি উপসংহারটুকু সেইমতো ভেবে নেবেন। ফ্যাক্ট বলতে এই, আজও সে ফিরে আসেনি, খবরও পাঠায়নি। কাহিনি অসম্পূর্ণই যে কারণে। ·
রচনাকাল : ২০০৬
লেখক পরিচিতি : রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৪ নভেম্বর ১৯৪৮, কলকাতার ভবানীপুরে। ১৯৬৭-৬৮ সালে কলেজে পড়ার সময়ে লিটল ম্যাগাজিনে গল্প লেখা দিয়ে শুরু এবং প্রায় আজীবনই যুক্ত থেকেছেন বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে। কলেজজীবনের গোড়ার দিকেই নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। রাজনীতির সূত্রে জেল খাটতে হয়েছে বছর দুয়েক। পরবর্তীকালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন সাহিত্যসৃষ্টিতে।
প্রথম বই ‘অকালবোধন ও অন্যান্য গল্প’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় রাজনৈতিক উপন্যাস ‘কমুনিস’। গত শতাব্দীর চারের দশকের থেকে আটের দশক পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে যে কয়েকটি মহৎ রাজনৈতিক উপন্যাস লেখা হয়েছে তাদের মধ্যে রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কমুনিস’ বিশেষভাবে আলোচিত। এরপর তাঁর লেখনীতে রচিত হয়েছে—শৈশব, তাহারা, মুদ্রণ সৌন্দর্য, শহর সংস্করণ, সটীক জাদুনগর, চোর চল্লিশা, মেধাবী ভূত ও মাধবীলতা, অপারেশন রাজারহাট, কাটা জিভের বৃত্তান্ত/ চন্দনা ডাইনি আর জাদুবাতি, রক্তজবা রহস্যের মতো উপন্যাসসমূহ এবং অকালবোধন ও অন্যান্য গল্প, বাদার গল্প, অংশগ্রহণ, আশমানি কথা: উচ্ছেদের পাঁচ কহন, দলদাস ও আরও অন্যান্য গল্প।
এছাড়া সম্পাদনা করেছেন কিছু গ্ৰন্থের, লিখেছেন আরো কিছু গদ্যসমূহ। জীবিকার সূত্রে বিভিন্ন সময়ে বেছে নিয়েছিলেন এক-এক রকম কাজ―অনুবাদক, মার্কেট রিসার্চের ফিল্ডওয়ার্ক, গবেষণা সংস্থায় রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো ভিন্ন পেশা। সাংবাদিক হিসেবে গৌরকিশোর ঘোষের অধীনে কাজ করেছিলেন একসময় এবং পরবর্তীকালে স্থায়ী চাকরি পান আনন্দবাজার পত্রিকায়। ২০০৭ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে গড়ে তুলেছিলেন ‘চর্চাপদ’ প্রকাশনা। জীবন সায়াহ্নে এসে হাত ধরেছিলেন ‘তৃতীয় পরিসর’-এর। ২০১৭ ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।


0 মন্তব্যসমূহ