হরিপদ দত্তের প্রবন্ধ : লালসালু ও ওয়ালিউল্লাহ্’র রাষ্ট্রচিন্তা


রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবোত্তর এবং আসন্ন চীন বিপ্লবের কালে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তি ছিল ক্রম অগ্রসারমান মানব সভ্যতার জন্য ভীতি সঞ্চারক এক ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক অন্ধকার বাস্তবতা। পূর্বাঞ্চলের বাংলা বিভক্তি গণমানসে দু’ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। একদিকে আগুনের মতো লকপকে আশা-প্রত্যাশা, অন্যদিকে নিকষকৃষ্ণ হতাশা-নিরাশা। সমসাময়িক রাজনৈতিক জটিল জালে আবদ্ধ পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন অধিকাংশ কবি-লেখকের মানস জগৎ ছিল কুহেলিকায় আচ্ছন্ন।

বিস্ময়কর সত্য এই, একমাত্র সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ই ধরতে পেরেছিলেন কোন ধরনের ছদ্মবেশী একটি নতুন রাষ্ট্র জন্ম নিচ্ছে বা নিয়েছে এই অঞ্চলে। ১৯৪৮ সালে ‘লালসালু’ নামক যে উপন্যাস প্রথমে প্রকাশ পেল, নিশ্চয়ই এর গঠন প্রক্রিয়া চলছিল তারও অনেক আগে থেকে। আরো একটি কাকতালীয় ব্যাপার এই যে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্মের মাস ও তারিখ অখণ্ড রাষ্ট্র বিভক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অর্থাৎ ১৫ আগস্ট, সালটি ছিল ১৯২২। লালসালুর লেখক কতটা দূরদর্শী হলে স্পষ্ট চিনতে পেরেছিলেন কী ধরনের রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটেছে এই মাটিতে। লালসালুর আড়ালে কিংবা প্রতীকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর মানুষের তাজা রক্তের রঙে রঞ্জিত রাষ্ট্র হলো পাকিস্তান।

ধর্মকে আশ্রয় করা সেই রাষ্ট্র তো কেবল ১৯৪৭ সাল নয়, ১৯৭১ সাল এবং পরবর্তী দীর্ঘকাল পর্যন্ত মুক্তিকামী মানুষের রক্তে রঞ্জিত লালসালু। বারবার রাষ্ট্র ভাঙে, রূপ বদল হয় তার, কাল বয়ে চলে মহাকালের দিকে, কিন্তু লালসালু তো অদৃশ্য হয় না। সামরিক-বেসামরিক মজিদীয় দুঃশাসনে শোষণে রক্তক্ষরণে বাংলাদেশ নামক আজকের ‘মহব্বতনগর’ গ্রাম ভীত-তটস্থ। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ সেই রাষ্ট্রকে চিনতে পারলেন জন্মমাত্রই। অথচ অন্য কারো বোধবুদ্ধিতে পৌঁছল না কেন? সে এক বিস্ময় বটে। আক্ষেপও কম নয়।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সম্পর্কে যুক্তিহীন, মেধাহীন নানা অভিযোগ আছে লালসালুকে ঘিরে। বলা হয়েছে রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্র জন্ম নিচ্ছে, চলছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, কোটি মানুষ দেশান্তর হচ্ছে, অন্যদিকে সাম্যবাদী আন্দোলন হচ্ছে, তেভাগার লড়াই চলছে, অথচ সেসব অবজ্ঞা করে তিনি লিখলেন পীরের গল্প ‘লালসালু’। তাঁকে অভিযুক্ত করা হয় তিনি রাজনীতি থেকে হাজার মাইল দূরে, সেই অভিঘাত নাকি তাঁকে স্পর্শ করেনি। যারা ওয়ালীউল্লাহ্ সম্পর্কে এসব অভিযোগ পূর্বে করেছেন এবং যারা বর্তমানেও করে থাকেন, তারা তাঁর সৃষ্টিকে চিনতে ব্যর্থ। দীর্ঘদিন পর তাঁর প্রকাশিত ইংরেজি উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ পড়েও কি তাঁকে চেনা যায় না?

একথা অনেকেরই জানা যে, ওয়ালীউল্লাহ্ সমাজতন্ত্রী নন। এর প্রতি তাঁর আগ্রহের পরিচয়ও মেলে না। কিন্তু তিনি ছিলেন আধুনিক ইউরোপীর সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক। আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের রাজনৈতিক উদারতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তি এবং বুদ্ধিবাদের তিনি ছিলেন একজন অনুসন্ধানী, অনুসারী শিল্পী। অন্য কোন ইউরোপীর লেখকের সঙ্গে তুলনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, আমরা দেখবো তিনি কতটা রাষ্ট্রনীতিমনস্ক। উপন্যাসের শুরুতেই লেখক এমন একটি জনগোষ্ঠী এবং জনপদের বর্ণনা দিচ্ছেন, যা আমাদের শিহরিত করে। সঙ্গে সঙ্গে যেন তিনি চিত্রকল্প অঙ্কন করেছেন একটি ঝিমধরা সর্পিল গতির রেলগাড়ি, লণ্ঠন জ্বালানো রেল স্টেশনের উপকরণ দিয়ে। নিশ্চয়ই এসবের দার্শনিক অর্থের বদলে বাস্তব অর্থ আছে। হতে পারে এসব প্রতীক, কিন্তু তাৎপর্য অতলস্পর্শী। সেখানে আমরা কি খুঁজে পাই না চল্লিশ দশকে জন্ম নেয়া একটা দেশকে? কেমন সেই দেশ? খাদ্যশূন্য, মানুষের মনে মিথ্যে আগুনে-আশা, ওরা গৃহহীন হচ্ছে, উন্মাদের মতো ছুটছে? “শস্যহীন জনবহুল এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের বেরিয়ে পড়বার ব্যাকুলতা ধোঁয়াটে আকাশটাকে পর্যন্ত যেন সদা সন্ত্রস্ত করে রাখে। ঘরে কিছু নেই। ভাগাভাগি, লুটালুটি আর স্থান বিশেষে খুনাখুনি করে সর্বপ্রচেষ্টার শেষ। দৃষ্টি বাইরের পানে, মস্ত নদীটির ওপারে, জেলার বাইরেÑ প্রদেশেরও....জ্বালাময়ী আশা; ঘরে হা-শূন্য মুখথোবড়ানো নিরাশা...দূরে তাকিয়ে যাদের চোখে আশা জ্বলে তাদের আর তর সয়না...তাই তারা ছোটে, ছোটে।”

১৯৪৭ কিংবা ‘৪৮ সালের এ-কোন দেশের এই নির্মম বাস্তবতার বর্ণনা দিচ্ছেন ওয়ালীউল্লাহ? কোথায় সেখানে মানুষের স্বপ্ন পূরণ? ক্ষুধার্ত স্বপ্নভঙ্গ জনতা যেন ছুটছে খাদ্য, নিরাপত্তা, প্রশান্তির সন্ধানে অনিশ্চিৎ এক দেশের ঠিকানায়। রাজনীতি আর সময়ের ট্রেন তাদের কোথায় পৌঁছে দেয়? ওখানে পৌঁছার জন্য প্রতিযোগী মানুষের অবস্থাটা কী? “ইতিমধ্যে আত্মীয়-স্বজন....হারিয়ে যায়। কারো জামা ছেঁড়ে, কারো টুপিটি অন্যের পায়ের তলায় দুমড়ে যায়। কারো বা আসল জিনিসটা অর্থাৎ বদনাটা আলগোছে হারিয়ে যায়।...নিশুতি রাতে যে দেশে এসে পৌঁছেছে সে দেশ এখন অন্ধকারে ঢাকা...তাতে শস্য নেই...যা আছে তা যৎসামান্য। শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের চেয়ে আগাছা বেশি। ভোরবেলায় এত মক্তবে আর্তনাদ ওঠে যে, মনে হয় এটা খোদাতালার বিশেষ দেশ।”

অর্ধশতাব্দীকাল পূর্বে যে অন্ধকার দেশের বর্ণনা দিয়েছেন ওয়ালিউল্লাহ তার সঙ্গে আজকের এই সমকালের আত্মঘাতী নরঘাতক দেশ ধ্বংসকারী ধর্মান্ধদের হাতে পতিত বাংলাদেশের অমিলটা কোথায়? সেদিন কোন দেশের ঠিকানা দিয়েছিল জাতীয় নেতারা? কোন প্রতারণার বাণী শুনিয়েছিল জনগণকে? ১৯৪৭-এর দেশকে চিনে ফেলেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ। এ ইহজগত বঞ্চিত, পরজগতের স্বপ্নতাড়িত নতুন দেশ তাঁকে ফাঁকি দিতে পারেনি। নিশ্চয়ই তিনি জানতেন দেশ ও জাতির গন্তব্য কোথায়! আমরা জানি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ নাস্তিক কিংবা সংশয়বাদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন যুক্তি ও বুদ্ধিবাদী। আধুনিকতার প্রতি একনিষ্ঠ। তাঁর স্বপ্ন ছিল বিজ্ঞানমনস্ক একটি জাতির, একটি দেশের। ধর্মশিক্ষায় শিক্ষিতদের প্রতি তাঁর প্রত্যাশা ছিল আধুনিকতার। “কেতাবে যে বিদ্যা লেখা তা কোন এক বিগত যুগে চড়ায় পড়ে আটকে গেছে। চড়া কেটে সে বিদ্যাকে এত যুগ অতিক্রম করিয়ে বর্তমান স্রোতের সঙ্গে মিশিয়ে দেবে এমন লোক আবার নেই। অতএব কেতাবগুলোর বিচিত্র অক্ষরগুলো দূরন্ত কোন এক অতীতকালের অরণ্যে আর্তনাদ করে।”

লেখক স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন পাকিস্তান নামের আড়ালে এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে যা ছিল মুক্তিকামী চিরবঞ্চিত মানুষকে মুক্ত করার বদলে দাস বানাবার চেষ্টায় রত। তিনি দেখছিলেন নতুন রাষ্ট্রকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে প্রবল এক ঘূর্ণী আবর্ত। ক্ষুধার্ত-বেকার মানুষ ছুটছে শহরে। ভাঙছে গ্রাম। অস্তিত্বের অভিঘাতে শেকড় ছিন্ন হচ্ছে মানুষের। মানুষ হচ্ছে ঠিকানাহীন। “এরা তাই দেশ (গ্রাম/জন্মের ঠিকানা) ত্যাগ করে...জাহাজের খালাসি হয়ে ভেসে যায়, কারখানার শ্রমিক হয়, বাসাবাড়ির চাকর, দফতরখানার এটকিনি, ছাপাখানার মেশিনম্যান, টেনারিতে চামড়ার লোক। কেউ মসজিদের ইমাম হয়, কেউ মোয়াজ্জিন।” কেন এই পেশা বদল? শুধু কি ধর্ম? তা নয়, আসল সত্য অস্তিত্ব রক্ষা। কেননা ওয়ালীউল্লাহ স্পষ্ট দেখছেন “দেশময় কত সহস্র মসজিদ। কিন্তু শহরের মসজিদ, শহরতলির মজসিদÑ এমন কি গ্রামে গ্রামে মসজিদগুলো পর্যন্ত আগে থেকে দখল হয়ে আছে।” কোথায়ও ঠাঁই নেই। যেন ধর্মরাষ্ট্রও উদ্দেশ্যহীন নিরুপায়।

এই রাষ্ট্র তো মানুষকে সর্বহারা করে দিচ্ছে। মানুষের অস্তিত্বকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। মানুষকে করে তুলছে ধর্মাশ্রয়ী। আত্মশক্তি ধ্বংস করে সমাজকে করুণাপ্রার্থী করছে দৈব শক্তির। এই ধর্মরাষ্ট্র ক্ষুধার্ত মানুষকে বানাচ্ছে প্রতারক। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষ অন্ধকারে মিথ্যার ভেতর ডুবে যাচ্ছে। লালসালুর মজিদ তো যা করেছে তা জেনেশুনেই। এছাড়া তার পথ ছিল না। সে জন্মমাটি বিচ্ছিন্ন ভাসমান, শেকড়সন্ধানী এবং অস্তিত্ব ছিন্ন। রাষ্ট্রযন্ত্র তার আদর্শের অনুগামী, সে তো সেই রাষ্ট্রের হাতেই তৈরি। একটি ধর্মরাষ্ট্র যখন তার মহৎ অস্তিত্বের শেকড় টেনে উপড়ে ফেলে, তখন সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাছে প্রতারকের আত্মসমর্পণ ভিন্ন মজিদের কোন বিকল্প ছিল না। পীরের কল্পিত মাজারের স্রষ্টা কি মজিদ? নিশ্চয়ই নয়। মজিদের আড়ালে রয়েছে ছদ্মবেশী ধর্মরাষ্ট্র। আসল দুর্বিনীত দুর্বৃত্ত তো সেই রাষ্ট্র, যে কি না মজিদের স্রষ্টা দ্রষ্টা।

‘লালসালু’ উপন্যাসের স্রষ্টা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিস্ময়কর ক্ষমতার পরিচয় মেলে সেই ধর্মরাষ্ট্রটির উদ্ভবের পেছনে যাদের ব্যাপক সমর্থন এবং সহযোগিতা ছিল সেই ইংরেজি শেখা নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিকে শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে। সমাজের নয়, গণমানুষের নয়, নিতান্তই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি অর্থাৎ আত্মোন্নতিকল্পে সেদিন তারা ধর্মরাষ্ট্র তৈরির জন্য ছিল ব্যাকুল। “এক সরকারি কর্মচারী সেখানে (পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চল) হয়ত একদিন পায়ে বুট এঁটে শিকারে যায়। বাইরে বিদেশি পোশাক, মুখমণ্ডলও মসৃণ কিন্তু আসলে ভেতরে মুসলমান। কেবল নোতুন খোলসপরা নব্য শিক্ষিত মুসলমান।” নব্য শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে এমন নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কেবল তৎকালেই নয়, পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে ওয়ালীউল্লাহ ভিন্ন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই মধ্যবিত্তের উন্মোচন ওয়ালীউল্লাহই ঘটিয়েছেন তাঁর উপন্যাস ‘চাঁদে অমবাস্যা’ এর স্কুল শিক্ষকের ভেতর।

এই যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সে তো ছদ্মবেশী। সে তো উপনিবেশের তৈরি জীব। ভেতরের কাঠামো আধুনিক শিক্ষার ফলেও রয়েছে অটুট, কেবল বদলেছে বাইরের অবকাঠামো। শিক্ষা সে গ্রহণ করে আখের গোছানোর জন্য, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী মানুষ হবার জন্য নয়। জনগণের মুক্তির জন্য রাষ্ট্রবিপ্লব যখন আসন্ন তখনই সে খোলস ছেড়ে আসল ধর্মীয় স্বরূপটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ধর্মান্ধতা তথা মৌলবাদ বিকশিত হয় এই ছদ্মবেশী শ্রেণিরই দ্বারা।

ওই যে মজিদ কর্তৃক মোদাচ্ছের পীরের কল্পিত মাজার আবিষ্কার তা তো রাষ্ট্র কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত-বিভাজনের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রটির জন্ম তার ভিত্তি এই মাজার অর্থাৎ ধর্ম। ওয়ালীউল্লাহ্ স্পষ্ট দেখছিলেন রাষ্ট্রটির আদর্শের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার কিছুতেই খাপ খাচ্ছে না, এখানে ধর্মীয়শিক্ষার জন্য ভূমি যথেষ্ট উর্বর। কেননা “ন্যাংটা ছেলেও আমসিপারা পড়ে, গলা ফাটিয়ে মৌলবীর বয়স্ক গলাকে ডুবিয়ে সমস্বরে চেঁচিয়ে পড়ে। গোঁফ উঠতে না উঠতে কোরান হেফ্জ করা সারা। সঙ্গে সঙ্গে মুখে কেমন একটা ভাব জাগে, হাফেজ তারা, বেহেশতে তাদের স্থান নির্দিষ্ট।”

এই যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তার দৃষ্টি তো রহস্যের পর্দায় আটকানো। সে দেখতে পায় না মানুষ কতটা ক্ষুধার্ত, কর্মহীন, দরিদ্র। সে কেবলই দেখতে পায় মানুষদের মধ্যে খোদাভীতি নেই, ওরা বিপথগামী। তাই রাষ্ট্র তো মজিদের আড়ালে দায়িত্ব নিয়েছে তাদের ধার্মিক বানানোর। “লোকগুলো অশিক্ষিত, কাফের। তাই তাদের মধ্যে আলো ছড়াতে এসেছে। বলে না যে, দেশে শস্য নেই, দেশে নিরন্তর টানাটানি, মরার খরা।” ধর্ম ব্যবসার এবং ধর্মের নামে দেশ শাসনের সে-কি ভয়ংকর অভীপ্সা-অভিলাষ।

এমনি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর থেকে যে শ্রেণিটি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়, তা মোটেই নির্বোধ নয়। সব কর্মকাণ্ড করে চলে সজ্ঞানে। ব্যক্তিস্বার্থ আর গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারের নামে প্রতারণা ছাড়া তার ভিন্ন অবলম্বন নেই। কেননা দেশটা যে ক্ষুধা আর অশিক্ষায় পূূর্ণ। তাই এর রাজনীতি মৌলবাদী হতে বাধ্য, ধর্মের কাছে সমর্পিত হতে বাধ্য, ঠিক মজিদও জানত ধর্মের নামে “দুনিয়ায় সচ্ছলভাবে দু'বেলা খেয়ে বাঁচবার জন্যে যে খেলা খেলতে যাচ্ছে সে খেলা সাংঘাতিক।” তাই ১৯৪৭ সালে যে রাষ্ট্রের জন্ম হলো তার আপাতঃ মৃত্যু ঘটে ১৯৭১ সালে। কিন্তু কবর থেকে সে জেগে ওঠে অচিরেই। তাই আজো এগিয়ে চলেছে সেই দিন। একইভাবে বরং ভয়ংকরভাবে। “নিরাকপড়া শ্রাবণের সেই হাওয়া শূন্য স্তব্ধ দিনে তার (মজিদের) জীবনের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, মাছের পিঠের মতো সালুকাপড়ে আবৃত নশ্বর জীবনের প্রতীকটার পাশে সে জীবন পদে পদে এগিয়ে চলল।”

অর্ধশতাব্দীকাল পূর্বে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যে রাষ্ট্রজীবনকে দেখতে পেয়েছিলেন তা আজো অটুট। কেবল অটুটই নয়, বরং পূর্বের চেয়েও শক্তিমান। এই রাষ্ট্র মজিদের মতোই প্রত্যাশা করে জনগণের গভীর আনুগত্য। প্রত্যাশা করে, “সে খোদাকে ভয় পায়, মাজারকে ভয় পায়, স্বামী মজিদকে ভয় পায়।” কে সে? ওই কিশোরী বৌ জমিলা। জমিলা তো প্রকৃত অর্থে শেকলপরা দরিদ্র গণমানুষেরই প্রতীক। ওই মজিদ সাত ছেলের বাপ দুদু মিঞাকে যে প্রশ্ন করে, ওই প্রশ্ন তো ধর্মরাষ্ট্র অহরহ খবরদারি গলায় করে যাচ্ছে জনগণকে। কোন সে প্রশ্ন? রক্ত হিম করে দেন ওয়ালীউল্লাহ, তাঁর পাঠক ভড়কে যায়। “কলমা জান মিঞা?” “কলমা জানস ব্যাটা?” “ব্যাপারির মক্তবে তুমি কলমা শিখবা”, “কী রে ব্যাটা, খৎনা হইছে?” “তোল লুঙ্গি, আজই নামাজের পর আমিই তোর খৎনা দিমু।”

ওয়ালীউল্লাহ্র রাষ্ট্রচিন্তা যেমনি শাণিত, তেমনি অন্ধকারভেদী। তিনি জানতেন মজিদের প্রতীকে প্রতারক আধিপত্যবাদী শাসক শ্রেণির শক্তির উৎস হচ্ছে ধর্ম। জনগণ শাসিত হয়, অত্যাচার ভোগ করে, শোষিত হয়, কিন্তু দৈবশক্তির প্রতি অনুগত না থেকেও অন্য পথ খুঁজে পায় না। কেননা, “মজিদের শক্তি ওপর থেকে আসে, আসে ঐ সালুকাপড়ে আবৃত মাজার থেকে। মাজারটি তার শক্তির মূল।” বিস্ময় এই যে, পুরাতন রাষ্ট্রের পতন ঘটে গণবিপ্লবে। সেই বিপ্লব অল্প দিনের ভেতরই আগুনের বদলে ছাই হয়ে যায়। নতুন রাষ্ট্র ফিরে যায় পেছনে। জনগণ নয়, মাজার বা ধর্ম হয় তার শক্তির উৎস। এত আয়োজন, এত সংঘাত, এতটা জাতিধর্ম বিদ্বেষের ভেতর দিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তার স্বরূপ ধরতে তৎকালের, এমন কি সমকালের শিল্পীরা পর্যন্ত ব্যর্থ,তা কিন্তু ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ। তাই তাঁকে সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ সালে অন্যকিছু না লিখে লিখতে হয় ‘লালসালু’। শনাক্ত করতে হয় শিক্ষিত সেই ভদ্রলোকদের, যাদের পোশাক এক, আর ভেতরটা আরেক।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একক আধিপত্যের মজিদের বিশ্বের সঙ্গে প্রতিপক্ষের অনিবার্য দ্বন্দ্বকেও শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ধর্মীয় মৌলবাদের প্রতিপক্ষ যে গণতন্ত্রীরা ছাড়াও স্বগোত্রীয়, তা লেখক জানতেন বলেই অন্য এক শক্তিমান পীরের আবির্ভাবকে অনিবার্য করে তোলেন উপন্যাসে। ধর্ম ব্যবসায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব যে সংঘাতে পৌঁছে তাও আমরা দেখতে পাই। আমরা শুনতে পাই মজিদের প্রথম পক্ষের বিবি রহিমা স্বামীকে প্রশ্ন করে, “এক পীর সাহেব আইছেন না হেই গেরামে, তানি নাকি মরা মাইনষেরে জিন্দা কইরা দেন?” ভয়ংকর এই প্রশ্ন, ভয়াবহ এই সংবাদ। অন্তত রাষ্ট্রের জনগণের জন্য। কেননা মজিদের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার এবার সামনে দাঁড়িয়ে। এই দ্বন্দ্বটা আমরা কি সমকালে দেখতে পাচ্ছি না? মৌলবাদ তো কেবল প্রগতিবাদের বিরুদ্ধেই যায় না, প্রয়োজনে স্বগোত্রীয় অন্য মৌলবাদের সঙ্গেও সংঘাত সৃষ্টি করে ক্ষমতার আর স্বার্থের প্রশ্নে। ধর্ম যেন স্বার্থের দাস।

সমকালের ধর্ম শিক্ষার প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে রাষ্ট্রের মৌলিক শিক্ষার কাঠামো। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার। “আপনার সন্তানকে স্কুলে পাঠান”। গণশিক্ষার ওই পোস্টার ঢেকে দিয়েছে আর একটি পোস্টার “আপনার সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান।” ওই যে ‘লালসালু’ উপন্যাসে আধুনিক শিক্ষার জন্য ব্যাকুল যুবক আক্কাস হেরে যায় মজিদের কাছে, নিজে ক্ষুদ্র হয়ে হার মানে ধর্ম আর মাজারের কাছে, আধুনিক জ্ঞান চর্চার স্কুল তৈরি আর হয় না। তার চিত্র কি মেলে না বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে? কেননা মজিদের শক্তি তো কেবল মাজার নয়, ধনী খালেক ব্যাপারীও? ধনের সঙ্গে যেমনি আত্মীয়তা আছে মাজারের , ধনীর সঙ্গে ঠিক তেমনি মজিদের। দু’জনের উদ্দেশ্য অভিন্ন, শ্রেণিগত স্বার্থও এক।

একটি ধর্মরাষ্ট্রের বাস্তবতা কী? সেখানে সত্যি ধনের স্রোত আর ধর্মের স্রোত সমান্তরালে বহমান। তাই তো ওয়ালিউল্লাহকে বলতে হয়, “জীবন স্রোতে মজিদ আর খালেক ব্যাপারী কী করে এমন খাপে খাপে মিলে গেছে যে, অজান্তে অনিচ্ছায় দু’জনের পক্ষে উলটো পথে যাওয়া সম্ভব নয়। একজনের আছে মাজার, আরেকজনের জমি-জোতের প্রতিপত্তি। সজ্ঞানে না জানলেও তারা একাট্টা, পথ তাদের এক।” কী বিস্ময়করভাবে আমাদের সমকালীন বাস্তবতাকে রূপ দিতে পেরেছিলেন সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দীকাল পূর্বে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।

ওই যে মোদাব্বের মিঞার ছেলে আক্কাস, যে কি-না গ্রামে ইংরেজি স্কুল খুলতে চায়, তাকে যে প্রশ্ন করে মজিদ, সেই প্রশ্ন তো একটি ধর্মরাষ্ট্রেরই কণ্ঠস্বর। কী সেই প্রশ্ন? “তুমি না মুসলমানের ছেলে, দাড়ি কই তোমার?” স্বাভাবিক প্রশ্ন। তাই যার পক্ষে রাষ্ট্র নেই, সমাজ নেই, তার স্কুল তৈরির চাঁদার রূপান্তর ঘটে পাকা মসজিদ তৈরির চাঁদায়।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কেবল যে ধর্মরাষ্ট্রের স্বরূপই উন্মোচন করলেন তা তো নয়, সঙ্গে সঙ্গে তার বিনাশও কামনা করেছেন। জমিলার হাতে মজিদের পতন ইতিহাসের অনিবার্য ফল হলেও, অন্য অর্থে ঘটনাটি আপেক্ষিক। সভ্যতার ক্রমবিকাশকল্পে উপন্যাসে আপন প্রত্যাশার লেখক চরিতার্থ করেছেন মাত্র। মজিদের পতনই যে রাষ্ট্রের পতন এটা পরম সত্য, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতার কি পতন ঘটলো উপন্যাসে? এক মজিদের বদলে অন্য মজিদের আবির্ভাব যে ইতিহাসের বাস্তবতা, ওয়ালীউল্লাহ তা জানতেন। সে কারণেই উপন্যাসের শেষাংশে বিধ্বস্ত মজিদের ভেতর গভীর এক মনস্তত্বের জটিল বিশ্ব নির্মাণ করেছেন লেখক। “মজিদ অদূরে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে কেয়ামত হবে। মুহূর্তের মধ্যে মজিদের ভেতরেও কী যেন একটা ওলট-পালট হয়ে যাবার উপক্রম হয়, একটা বিচিত্র জীবন আদিগন্ত উন্মুক্ত হয়ে ক্ষণকালের জন্য প্রকাশ পায় তার চোখের সামনে, আর একটা সত্যের সীমানায় পৌঁছে জন্মবেদনা অনুভব করে মনে মনে।”

মজিদ সম্পর্কে লেখক আমাদের পরিণতিতে কী বলতে চান? কোন সে বিচিত্র জীবন পতনকালে তার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়? কোন সত্যের সীমানায় পৌঁছে সে জন্মবেদনার অনুভব করে? জটিল থেকে জটিলতর প্রশ্ন। মজিদ কি খোলস মুক্ত হতে চেয়েছিল? সে কি মিথ্যাকে অতিক্রম করে পরম সত্যের বাস্তবতায় বিশুদ্ধ হতে প্রত্যাশা করেছিল? কিন্তু তাকে পরমুহূর্তে ধানক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে, “খোদার উপর তোয়াক্কল রাখ,” কথাটা উচ্চারণ করতে হয়। করতে সে বাধ্য। উপায় নেই।

মজিদ বিদ্যুৎ ঝলকের মতো সত্যকে উপলব্ধি করেও অন্ধকার থেকে মুক্তি পেল না। লেখক জানেন, যে জগতে মজিদের অস্তিত্ব একাকার হয়ে গেছে তা থেকে তার মুক্তি নেই। ওই মুক্তিটা নেই বলেই সাতচল্লিশের ধর্ম আর ধর্মবিদ্বেষের জটিল বন্ধন একাত্তরের যুদ্ধটাও ছিন্ন করতে পারল না। রাষ্ট্র ফিরে গেল সাতচল্লিশে; একাত্তরের সেই রাষ্ট্র। একাত্তরটা ছিল মজিদের মতোই “আদিগন্ত উন্মুক্ত হয়ে ক্ষণকালের জন্য প্রকাশ।”

মুক্তির পথ যে ছিল না এমন নয়। একাত্তরের রাষ্ট্রটা সে পথে হাঁটল না। মুক্তির সেই পথটার নাম সমাজতন্ত্র। নতুন সে পথে যে হাঁটতে রাজি নয়, তাকে তো ফিরে যেতে হবে পেছনে। কেননা চল্লিশ দশকে চীনের বিপ্লবের অভিঘাতে কম্পমান বঙ্গ-ভারতের অভিযাত্রা তো ছিল আলো ছেড়ে অন্ধকারে। আলোর পথে না হেঁটে, হাঁটল ধর্মবিদ্বেষ আর বিভক্তির নর্দমার পথে। তো, সেই ঐতিহ্যের অংশ বাংলাদেশ কেমন করে এগিয়ে যাবে সূর্য মুক্তির পথে? ওয়ালিউল্লাহ জানতেন সেই নতুন পথে হাঁটা সহজ নয়। অস্তিত্বের সন্ধানে মজিদের পক্ষে যে পথে হাঁটা অসম্ভব, তার রাষ্ট্র হাঁটবে কেমন করে সেই মহান আদর্শের পথে? তাই হাঁটতে আজো রাজি নয় কেউ, নয় এই উপমহাদেশ, নয় আজকের আগ্রাসী এই পৃথিবী। সভ্যতার এই অন্ধকার অবশ্যম্ভাবী অভিযাত্রাকেই শনাক্ত করেছেন সৈয়দ ওয়াল্লীউল্লাহ তাঁর ‘লালসালু’ উপন্যাসে। ·


লেখক পরিচিতি : হরিপদ দত্তের জন্ম ২রা জানুয়ারি ১৯৪৭ সালে নরসিংদী জেলায়। তিনি বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার। তিনি ২০০৬ সালে উপন্যাস শাখায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বর্তমানে বসবাস করছেন পশ্চিমবঙ্গে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ