নিবেদিতা ঘোষ রায়ের গল্প : নাটুয়া


বিহারের ভাগলপুরে, শহর থেকে অনেক দূরে মায়াগঞ্জে ছিল আমার ঠাকুমার বাপের বাড়ি। সরু একটা ধুলোমাখা রাস্তা পেরিয়ে সে গঞ্জে ঢুকতে হত। উদোম বাচ্ছা কাচ্ছা সারাদিন সে রাস্তায় গড়াতো। বুড়োরা খাটিয়া পেতে বসে চুট্টা জ্বালাতো। বাড়িটা ছিল উঁচু জায়গার ওপর। বাড়ির সামনে সিঁড়ির নিচে ঢালু জমি বেয়ে নামতে হত সামনের ক্ষেত জমিতে। টমেটো ভুট্টা বেগুনের ক্ষেত পেরিয়ে সামনে গঙ্গা। ঠাকুমাদের বাড়ির বারান্দা থেকে সেই নদীর ঘোলাটে সাদা ঢেউ দেখা যেত। উঁচু চার পাঁচ ধাপ সিড়ির ওপরে বারান্দা, সিমেন্ট বাঁধানো বসবার জায়গা। সেখানে বসে ঠাকুমার বাবা পঞ্চায়েতি করত।

গ্রামে যখন ধুলোর ঝড় উঠত দেহাতি গাঁয়ে সবাই বলত আড়াইয়া। ভূগোলের বইতে যাকে বলে সাময়িক বায়ু। তখন গঙ্গার জল ফুলে ফেঁপে ভাঙা ক্ষয়াটে ঘাট পেরিয়ে ক্ষেত পর্যন্ত চলে আসতো।

বাড়ির সামনে ছিল দুর্গা দালান। খড়, মাটি, ঠাকুরের গয়নাগাঁটি জরি কাপড়ের টুকরো টাকরা, ভাঙা অস্ত্র সস্ত্র কিছু কিছু পড়ে থাকত। ভারী ভারী বাসন কোসন, পেতলের বিশাল পিলসুজ সব তালা বন্ধ একটা ঘরে থাকত। বিশাল দুটো লোহার কড়ায় তালা ঝুলতো। বাড়ির দক্ষিণে ছিল হাসপাতালের মাঠ। সেখানে নাকি কাটা হাত পা পড়ে থাকত। তার ওপারে ধূ ধূ গম ভুট্টা জনারের ক্ষেত। নদীর ওপারে ধূসর গাছের সারি। বন জঙ্গলের আবছা আভাস দেখা যেত। সন্ধে হলেই নেমে আসত এক অদ্ভুত ভৌতিক পরিবেশ। গঙ্গা পেরিয়ে নাকি নৌকো করে যেকোন সময়ে ডাকাত আসতে পারে বলে বাবাদের ভয় দেখানো হত। মুখের কথা নয়, ডাকাত সত্যিই আসত। বিকেলে গঙ্গার বেড়াতে গিয়ে দূরে অস্পষ্ট ওই পাড়ের দিক থেকে কোন নৌকো দেখা গেলেই বাবা ও তার পুঁটে পুঁটে ভাই বোনেরা চটি জুতো হাতে নিয়ে যে যার দড়ি বাঁধা হাফ প্যান্ট চেপে ধরে তৈরি হয়ে থাকত দৌড়ে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যাবার জন্য।

বাড়ির দক্ষিণে হাসপাতালের মাঠে সন্ধেবেলা ভৌতিক নৃত্য শুরু হত। পেঁচা ডাকত। সামনে অন্ধকার ক্ষেত, আর গঙ্গার অতল জলের বিস্তার। লন্ঠন জ্বালিয়ে বাবা ও মামাতো ভাই বোনেরা সব ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত। উত্তরে ছিল দাদুর আরো সব শরিকদের বাড়ি। ক্ষেতের ধারে ধারে দেহাতিদের খাপরার চালের ঘর। টিম টিমে লন্ঠনের আলোয় ক্ষেত পেরিয়ে তাদের ঢোল করতাল বাজিয়ে রামা হৈ গান ভেসে আসত। বাবার দিদিমা রান্না ঘরের কোনে বসে কালো ডাব্বা হুঁকোয় গুড় গুড় তামাক খেত।

গঞ্জে ঢুকতে সরু ধুলোর রাস্তাটা চলে গেছে তিলকামাঝি খঞ্জনপুরের দিকে। লোমওঠা ঘেয়ো কুতুয়া গুলো ল্যাং ল্যাং করতে করতে বড় রাস্তার মোড় থেকে ফিরে আসতে না আসতেই ঝুপ করে আঁধার নেমে যেত। খটিরামের দোকানে তখন বড় বড় কড়াইতে ভৈসা দুধ টগ বগ করে ফুটতো। বুড়ো হাবড়ারা কানে চুট্টা গুঁজে ভাঁড়ের দুধে মোটা মোটা ফুলকারি করা সাড়ে তিন প্যাঁচের জিলাবি ডুবিয়ে খেত। হাতির কানের চামড়ার মত শক্ত লাল আটার পুরির গন্ধ উঠতো খটিরামের কড়াই থেকে।

দোকানের কোনের দিকে বেঞ্চে নেতানো গামছার মত পড়ে ঘুমোতো গঞ্জের চোর নাটুয়া। তার শুভ নাম নাকি নটবর লাল। সামনের জমিতে বাতিল ফুটো লোটা পড়ে থাকলেও, নাটুয়া নিয়ে পালাত। বাবার দিদিমা বলত, ওসব জঞ্জাল ফেলে রেখে দে নাটুয়া নিয়ে যাবে।
“নাটুয়াকে আর আসকারা দিও না”- বড়মামা বলত।

এই তো সেদিন নাটুয়ার বহিন এসে বড় কাঁসার লোটা ফেরত দিয়ে গেল।
ওর নামে হুলিয়া আছে।

নাটুয়া চারপাশে ঘুর ঘুর করতো, কিছু না পেলে মাটিতে গর্ত করে রাখত, সজারু ধরার ফাঁদ। তার ছিল খোঁচা চুল, তাকে সাহিল বলত সকলে। মানে সজারু। সারাদিন ঝাঁ ঝাঁ রোদে জল তেতে বাষ্প উঠে, সন্ধের দিকে কুয়াশার মত নদীর আকাশে ছেয়ে থাকত। গরমের ছুটিতে মামার বাড়ি এসে, বাবা, সেজকাকা, বড়পিসি রোদ ঠেঙিয়ে মাঠ ঘাট ঘুরে রাতে লণ্ঠনের আলোয় দশঘুঁটি, লুডো খেলতো চুপচাপ। চাঁদের আলোয় নদীর চকচকে জল বৈঠায় তুলে দু একটা দেহাতি নৌকা যেত ওপারে গঞ্জের দিকে।

বাবার বড় মামা ছিল ডাক্তার। গেঁয়ো বদ্যি নয়, বেশ নামডাক তার। দাদু ছিল গাঁয়ের মোড়ল। বারান্দায় হাতলওলা চেয়ারে ধুতি ফতুয়া পড়ে বসে তিনি গাঁয়ের মেয়ে পুরুষের ভিড় সামলাতেন। অভাব অভিযোগ সমস্যার সমাধান করতেন। টমেটোর ক্ষেতে বড় মামার ডিসপেনসারি বসত সকালে। লম্বা লাইন লেগে যেত, ভাঙের শরবত খেয়ে টলমল করতে করতে রোগীরা আসত সুই নিতে।

গ্রীষ্ম কালে কেউ ঘরে ঘুমোত না।বাড়ির বাঁ ধারে শরিকদের পরিত্যক্ত ছাদের ওপর সার সার খাটিয়া পাতা থাকতো। ড্রাইভার হাফিজ মিঞা, দারোয়ান লক্ষ্ণন সিং, দুর্গা দালানে উদোম হয়ে পড়ে থাকতো। তারা সব দুর্ধর্ষ আফিম সেবক। চোর কান কেটে নিয়ে গেলেও তারা জেগে উঠবে এমন আশা ছিল না।

নাটুয়া দিনের বেলা মিটিমিটি হেসে, খৈনি ডলে, খাটিয়ায় বসে মাছি তাড়ালেও রাতে সে পাকা চোর। আমার ঠাকুমা ছিল জাঁদরেল, রাশভারী মহিলা। তার নাম এলোকেশী। লম্বা চুল ফিটফাট খোঁপায় বেঁধে,রুপোর কাঁটা গুঁজে,পান খেয়ে সর্বত্র ঘুরে বেড়াতেন। ঠাকুমা ছিল সে সময়ে হিন্দিতে ম্যাট্রিক পাস। হিন্দিতে ছোটদের গল্পও লিখতে পারতেন। আলস্যে আঁচল নাড়িয়ে, ঘরকন্যা করে তার দিন মোটেও কাটত না। ঠাকুরদাদার সঙ্গে তার কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন জায়গায় তিনি ঘুরতেন। মহিলাদের নিয়ে কিটি পার্টি করতেন। চায়ের আসরে জাঁকিয়ে বসে তাস খেলতেন, আবার কোথায় জল আসছে না, মহিলাদের সমস্যা নিয়েও বিস্তর হাঁটাহাঁটি করতেন। সেলাই ফোঁড়াই শেখাতেন দুঃস্থ মেয়েদের। স্টিল ফ্রেমের চশমা পড়া ব্যক্তিত্বময়ী চেহারা ছিল তার। গভীর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ সর্বত্র নজর রাখত। রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন, সেবামূলক কাজের জন্য এই স্টিল ছবি বহুদিন টাঙানো ছিল বৈঠকখানা ঘরের দেওয়ালে।

সেবার মায়াগঞ্জে ঠাকুমা, ছেলে পিলে ভাইপো ভাইঝি নিয়ে একতলার ঘরে শুয়েছেন। সামনে গরাদ দেওয়া কাঠের পাল্লাওলা পেল্লাই জানলা খোলা। মৃদু দখিন বাতাস দিচ্ছে। তারা ভরা আকাশ ঝক ঝক করছে হাসপাতালের মাঠের ওপর। ছোটদের চোখ শক্ত করে বন্ধ। জানলা দিয়ে কাটা হাত পা মুন্ডুর নাচ দেখতে কেউ উৎসাহী নয়। ঠাকুমার অমিত সাহস। তিনি শুয়েছেন জানলার পাশে। হাত পাখা নাড়ছেন। হাতে হীরের আংটি অন্ধকারে ঝলসে উঠছে। সন্ধে আটটার পর গাঁয়ে গঞ্জে রাত নিঝুম হয়ে আসে। মাঠের ওপারে ক্ষেত জঙ্গল থেকে বন্য খরগোশ, সাপ, এমনকি বন্য শুয়োর পর্যন্ত ছিটকে এদিকে আসে। গুলবাঘাও আসত আগে যখন গজাড় জঙ্গল ছিল। ক্ষেতের মাঝে বাঁকা বাবলা গাছ ভৌতিক শরীর নিয়ে হাতছানি দিচ্ছে। দূরে দেহাতি গান ভেসে আসছে। "পরদেশী আয়ি দুয়ারে হো গোরি, ক্যায়সিয়া সামালে"।

বাবা ছিল, অস্থিরমতি দুরন্ত বালক। সারাদিন রোদে ঘুরে,চাকা চালিয়ে তার গর্মি জ্বর মতো এসেছে। ভাগলপুরের সোনহালুয়া ব্লকের “নাকি” গ্রামে দাদুর দেশের বাড়িতে, চষা খেতে চাঁদনি রাতে বসে বন মুরগি, আলু পুড়িয়ে খেয়ে তার ঠান্ডা লেগেছে। ঠাকুমা তাই সজাগ আছেন। জানলার বাইরে খর খর সড় সড় শব্দ শুনে ঠাকুমা কান খাড়া করলেন। খরগোশ শেয়াল ভেবে আবার তন্দ্রা মত এসেছে। আবার সেই আওয়াজ। ঠাকুমা হাতের আঙুলে টান পড়ায় তাকিয়ে দেখেন একটা হাত জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। বিছানার ওপর রাখা ঠাকুমার বাঁ হাতের অনামিকায় হীরের আংটি ধরে টানছে। ঠাকুমাও শক্ত করে চেপে ধরলো সেই হাত। দু পক্ষই টানতে লাগল। বাইরে অন্ধকার মুখ দেখা যায় না। বড় বড় আম জামরুল, তেঁতুল গাছে বাতাস বেধে শোঁ শোঁ করছে। ঠাকুমা চেঁচালো না শুধু হাত চেপে ধরে রইল। কিন্তু সে আংটি প্রায় খুলে ফেলেছে। জানলার কাঠের গরাদ আর পাল্কার মাঝে হাতের পাতা চেপে ধরেছে ঠাকুমা।

সড়াৎ করে আংটি খুলে বেরিয়ে গেল। চোরের হাতে হীরের আংটি আর ঠাকুমার হাতে চোরের আঙুল। চোর আঙুল ফেলেই পালাল।

পরদিন হৈ হৈ কান্ড। বাবার দিদিমা পাক্কা দেহাতি ছাইছুই ভাষায় কপাল চাপড়ে মেয়ের আংটির শোকে বাড়ি মাথায় তুললেন। রান্না ঘরের কোণে ছিলকার গাদায় তার হুঁকোটি পড়ে রইল।

বেলা বাড়তে বড় মামার ক্ষেতের ডিসপেনসারিতে লোকের ভিড় বাড়তে লাগল। দূর জায়গা থেকে টাট্ট ঘোড়ায় চেপেও লোক আসে। ভিড়ের পেছন দিকে গামছায় হাত জড়িয়ে নাটুয়া ঘাপটি মেরে ছিল। সে সময় মত তার দাবি পেশ করল।

“হমরা ঊঙলী কাটি গেলেই, ডাগদর বাবু, একরা জোড়ি দো”।
মামা ইনফেকশানের ওষুধ ইঞ্জেকশন দিয়ে তাকে বুঝিয়ে বললেন, “অখনি ঊঙলী নেই ছেই, মিলতেই তো লগায় দেবেই’।

নাটুয়া কিছুতেই বোঝে না। মামার অবশ্য বুঝতে কিছু বাকি নেই। সে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগল। নিকষ কালো, খোঁচা চুল, লাল মার্বেলের মত চোখ। খাঁকি ছেড়া হাফ প্যান্ট পরা, মাথায় গামছা বাঁধা নাটুয়া কিছুক্ষণ কেঁদে গাছে তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ফর ফর করে নাক ডাকতে লাগল।

বাড়িতে পরামর্শ হল। নাটুয়াকে ধমকে কোতোয়ালের ভয় দেখিয়েও আংটি আদায় হল না। ঠাকুমাও নাটুয়ার আঙুল দেবে না। নাটুয়াও আংটি দেবে না। দাদুর হস্তক্ষেপে জল বেশিদুর গড়ালো না। নাটুয়া গ্রাম ছেড়ে পালাল। তাকে নাকি নেড়া করে টোকো ভৈসা দই মাথায় ঢেলে দেওয়া হয়েছিল।

হীরের আংটি থিতিয়ে পড়ল তলায়। মায়াগঞ্জের আমবনের ছায়ায়, নদীর উতলা হাওয়ায় গরমের ছুটি কেটে গেল।

এর অনেক বছর পর। আমার ঠাকুরদা বদলি হয়েছে আন্দামানে। পি ডাবলু ডির ইঞ্জিনিয়ার। রাস্তা ঘাট ব্রিজের কাজে বহু জায়গায় ঘুরে, এসেছেন আন্দামানে। জাহাজে চড়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ঠাকুমাও এসেছেন সঙ্গে। কাঁচের আলমারিতে সংগ্রহ করেছেন, প্রবাল, ঝিনুক,সামুদ্রিক গাছ, শঙ্কর মাছের মেরুদন্ডের হাড়। দেওয়াল থেকে ঝুলতো হাঙরের চোয়াল।

ঠাকুমার নামে একদিন পার্সেল এল একটা। ঠাকুরদার অফিসের ঠিকানায়। তিনি আর্দালি দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন বাড়ি। দড়ি দড়া দিয়ে বাঁধা বাক্স খুলে ভেতরে পাওয়া গেল একটি সুদৃশ্য কৌটো। তার মধ্যে সুন্দর কারুকাজ করা আংটি। জ্বলজ্বলে দামী পাথর বসানো। কে কোথা থেকে পাঠিয়েছে সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে সেই ভুয়ো ঠিকানায় কাউকে পাওয়া গেল না।

মায়াগঞ্জের বাড়িতে এখন কেউ থাকে না। দুর্গা দালান ফাঁকা পড়ে আছে। হাওয়া একা একা শূন্য দালানে ঘোরে। সেই ভুট্টা বেগুনের ক্ষেতে বড় মামার ডাক্তার খানা আর নেই। তিনি থাকেন কোলকাতায়। তবে নাটুয়া ডাক্তারবখানায় আরো অনেক বার এসেছিল। বড়মামার পিছু ধাওয়া করত ছায়ার মত। ঘ্যান ঘ্যান করত তার হারানো আঙুল নিয়ে। বড় মামা খুব গোপনে নাটুয়ার হাতে আঙুল বসিয়েছিলেন। অমানুষিক ক্লেশ আর প্রাণনাশের বিপদ থেকে নাটুয়াকে টিকিয়ে দিয়েছিলেন বড়মামা।

ব্যাপারটা চাপা ছিল। ডাক্তারদের অত চোর ছ্যাচোড় দেখলে চলে না। তার থাকে এথিক্স। তাছাড়া তার বোনটিও কম দর্জাল না।

হাসপাতালের মাঠ থেকে কাটা হাতের আঙুল কুড়িয়ে এনেছিল নাকি নাটুয়া। সেটাই নাকি অলৌকিক ভাবে জোড়া লেগেছিল। এ রহস্য উদ্ধার হয় নি। কাটা হাতটা ছিল নাকি দুর্ধর্ষ ডাকাত ভৈরো সিং এর। গঙ্গার ওপারে সে সাহেবগঞ্জ মনিহারীতে নৌকার ভেসে ডাকাতি করতে যেত।

গুলি খেয়ে তার হাত বিছড়ে যায়। বিখ্যাত ডাকাতের আঙুল পেয়ে নাটুয়ার ভাগ্য খুলে যায়। সেও ডাকাতের দল খোলে। টাকা পয়সা হীরে জহরতের কমতি ছিল না। বড় মামার কাছে প্রায়ই মিঠাইয়ের হাড়ি পাঠাত সে।

দাদুর চাকর চরুয়া একবার তাকে দেখেছিল কাটিহারে। নেড়া মাথায় বসে মোষের দুধের চা খাচ্ছে। হাতের আঙুলের সব কটাতেই পাথর। বটুয়া থেকে তাড়া নোট বার করে চরুয়াকে বলেছিল, ক্যা লাড্ডু খায়েগা?
নাহি রে, ডাকু, চোরো কি কামাই কা লাড্ডু মায় নেহি খাতেঁ।
গাঁওয়াঁর হ্যায় তু ইএ বড়িয়া মালাই লাড্ডু!
বহুত চমকদার হ্যায় তেরা আঙুঠি, অরৌ উঙলি ভি!
এর পর নাটুয়া নাকি হাত বগলের তলায় লুকিয়ে ফেলেছিল।

ঠাকুমার নীতিবোধ বড়ই প্রখর। আংটি ফেরত পেয়ে এত বছর পর ঠাকুমাও নাটুয়ার আঙুল ফেরত দিলেন পার্সেলে মায়াগঞ্জের ঠিকানায়। সে আঙুল অবশ্য কেউ কোনদিন দেখেনি। ঠাকুমার সুপুরির কৌটোয় নাকি নিমপাতা, কর্পূর, আর নিসিন্দের ডালের মধ্যে সেটা থাকত।
ছোটরা বাঁদরামি করলেই বলতেন, বের করব? নাটুয়ার আঙুল।

তার জীবনের সেই এক পরম মুহূর্তের রোমাঞ্চ। অতি মহার্ঘ্য জিনিস ছিল তার কাছে। দিদিমার ঘোর অমঙ্গল নিয়ে খুঁত খুঁত রাগী এলোকেশী পাত্তা দেন নি।
মামার বাড়ির কেয়ার টেকার কিছুই বোঝেনি। কালো চিমসে শুকনো কি বস্তু পার্সেলে এসেছে।
সেটা কি এখন কোলকাতায় বড়মামায় ঠিকানায়? নাকি মায়াগঞ্জের মাঠ ঘাট আগাছার জঙ্গলে কোথাও পড়ে আছে নাটুয়ার আঙুল। আঁকা বাঁকা বাবলা গাছ ঝুঁকে আছে তার ওপর। ·


লেখক পরিচিতিনিবেদিতা ঘোষ রায় কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যে এম. এ করেছেন। প্রকাশিতই বইয়ের সংখ্যা দুটি। বসবাস কলকাতায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ