“মার্চ মাসের এক ছুটির বিকেলে, একুশ বছর মৃত থাকার পর দেউই আয়ু তার কবর থেকে উঠে দাঁড়াল। একটি ফ্র্যাঞ্জিপানি গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়া এক রাখাল বালক ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলল আর চিৎকার করে উঠল, আর তার চারটি ভেড়া ছুটে পালাল—পাথর আর কাঠের কবরফলকের ফাঁকে ফাঁকে—যেন তাদের মাঝে হঠাৎ করে একটি বাঘ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে…”
মূল চরিত্র দেউই আয়ু একুশ বছর পর মৃত থেকে ফিরে আসে, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সময়ের ভেতর সামনে–পেছনে যাতায়াত করি। দেউই আয়ু একজন দৃঢ়চেতা আধা–ডাচ আধা–ইন্দোনেশিয়ান নারী—যার নিয়তি পতিতা হওয়া এবং পুরুষদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়া, ঠিক তার অপূর্ব সুন্দর তিন কন্যার মতোই, ‘বিউটি’ ছাড়া।
বিউটি হলো দেউই আয়ুর শেষ কন্যা—ভয়ংকরভাবে কুৎসিত—যার জন্ম দেউই আয়ুর মৃত্যুর বারো দিন আগে। গর্ভেই মা তাকে অভিশাপ দিয়েছিল যাতে সে কুৎসিত হয়, কারণ : “গরমে পাগল কুকুরের মতো পুরুষে ভরা এই পৃথিবীতে সুন্দর মেয়ে জন্ম দেওয়ার চেয়ে ভয়াবহ অভিশাপ আর কিছু নেই।”
তবু দেউই আয়ু যখন মৃত থেকে ফিরে আসে, সে আবিষ্কার করে যে বিউটির একজন রহস্যময় প্রেমিক আছে—যদিও...
“সে ছিল এক কুৎসিত মেয়ে—তার নাসারন্ধ্র বৈদ্যুতিক সকেটের মতো, আর ত্বক ছিল কালি–কালো ছাইয়ের মতো। সে ছিল এমন ভয়ংকর যে মানুষ তাকে দেখে বমি করত, ভয়ে জ্ঞান হারাত, প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলত, বা ভূতে ধরা মানুষের মতো দৌড়ে পালাত—কিন্তু কেউ তার প্রেমে পড়ত না।”
দেউই আয়ু বাস করে এক কল্পিত ‘ইন্দোনেশিয়ান ম্যাকোন্ডো’—হালিমুন্ডায়। সেখানে সে ইন্দোনেশিয়ার যন্ত্রণাবিদ্ধ ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে—ডাচ উপনিবেশের শেষ দিনগুলো থেকে শুরু করে জাপানি আগ্রাসন, যুদ্ধোত্তর বিপ্লব, সুহার্তোর একনায়কতন্ত্র এবং তার পতন পর্যন্ত। জাপানি শাসনের সময়ই দেউই আয়ু পতিতা হয়ে ওঠে। নিজের অপার সৌন্দর্য যে এক সম্পদ—এবং যে তাকে শরীর বিক্রি করতেই হবে—এই উপলব্ধির আগেই দেউই আয়ু এক আশ্চর্য রকম বাস্তববাদী নারী হিসেবে ধরা দেয়, বিশেষ করে যখন তাকে জোর করে যৌনপল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয় :
“বাড়িতে ফিরে এসে তারা আরও বিরক্ত হলো, কারণ তারা দেখল—তাদের বন্ধু দেউই আয়ু দোলনা চেয়ারে বসে আলতো করে গান গাইছে, এখনও আপেল খাচ্ছে। সে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসল, তাদের মুখে জমে থাকা রাগ দেখে।
‘তোমাদের দেখতে মজার লাগছে,’ সে বলল, ‘ঠিক যেন কাপড়ের পুতুল।’
তারা তাকে ঘিরে দাঁড়াল। দেউই আয়ু চুপ করে রইল, যতক্ষণ না তাদের একজন বলল, ‘তোমার কি মনে হয় না, কিছু অদ্ভুত ঘটছে? তুমি কি কিছু নিয়ে চিন্তিত নও?’
‘চিন্তা আসে অজ্ঞতা থেকে,’ বলল দেউই আয়ু।
‘তুমি কি জানো আমাদের কী হবে?’ ওলা জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ,’ সে বলল, ‘আমরা পতিতা হতে যাচ্ছি।’
সবাই জানত কথাটা। কিন্তু দেউই আয়ুই ছিল একমাত্র, যে সাহস করে তা উচ্চারণ করেছিল।”
যুদ্ধের পরও দেউই আয়ু এই পেশা চালিয়ে যায়। সে নিজেকে একরকম উদ্যোক্তায় পরিণত করে—সে সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতি রাতে শুধু একজন পুরুষের সঙ্গেই সে শোবে, যদিও শহরের প্রতিটি পুরুষ তার দরজার সামনে লাইন দিতে প্রস্তুত।
উপন্যাসে অনেক হাস্যরস থাকলেও, প্রধান সুর হলো প্রতিশোধের বাসনা এবং দেউই আয়ু ও তার আরও সুন্দর কন্যাদের ওপর রক্তপিপাসু, নির্মম পুরুষদের দ্বারা চালানো সহিংসতা। এই উপন্যাসে নারীরা অত্যন্ত জীবন্তভাবে চিত্রিত—তারা সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি—কিন্তু তারা পুরুষদের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। এই পুরুষেরা মূলত যৌন লালসায় বন্দি হিংস্র গুন্ডা—লোহার অন্তর্বাস পরেও তাদের হাত থেকে রেহাই নেই।
এছাড়া দেউই আয়ুর পরিবার—নাতি–নাতনি সহ—নিরন্তর দুর্ভাগ্যের ভেতর দিয়ে যায়। দেউই আয়ু জানে, তার বংশকে তাড়া করছে এক স্থানীয় জেলের দুষ্ট আত্মা—তার ডাচ দাদার বহু বছর আগের এক অন্যায়ের প্রতিশোধ হিসেবে। আর এর কোনো মুক্তি নেই বলেই মনে হয় :
“প্রায় পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনজুড়ে সে এটাই ভেবে এসেছে—কীভাবে সে তার মেয়েদের রক্ষা করবে, তাদের সুখ পাহারা দেবে, সেই বিদ্বেষপূর্ণ অভিশাপ থেকে তাদের মুক্ত রাখবে—যে দুষ্ট ভূতটি তার সারাজীবনের সঙ্গী ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থাকবে, এমনকি মৃত্যুর পরেও।”
এই কারণেই দেউই আয়ুর জীবনে ফিরে আসা—এই অভিশাপের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।
এই ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিবারটিকে ইন্দোনেশিয়ার রূপক হিসেবে দেখা যায়—একটি দেশ, যা প্রথমে ডাচ উপনিবেশবাদের লোভে লুণ্ঠিত হয়েছিল। এরপর রাজনৈতিক সংঘাত ও রক্তপাত বছরের পর বছর হালিমুন্ডাকে গ্রাস করে—বিভিন্ন শাসকের অধীনে। এমনকি কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের গণহত্যার পরও শহরটি “…সেচখালজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহে ভরে গিয়েছিল...”
বাস্তব বর্ণনার পাশাপাশি অতিপ্রাকৃত শক্তি ও অশান্ত আত্মারা উপন্যাসটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে এবং চরিত্রদের তাড়া করে ফেরে। এতে স্পষ্ট হয় কুর্নিয়াওয়ানের ইন্দোনেশিয়ান পাল্প ফিকশন ও গথিক রোমান্সের প্রতি ঝোঁক। লেখক অনুপ্রাণিত হয়েছেন ইন্দোনেশিয়ান পুতুলনাট্য ‘ওয়ায়াং’ থেকেও—যেখানে গভীর বার্তা হাস্যরসের সঙ্গে বলা হয়।
২০১৫ সালে মেলবোর্ন রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে এক সাক্ষাৎকারে কুর্নিয়াওয়ান বলেছিলেন, “ওয়ায়াং–এ বিষয় সবসময়ই গুরুতর। কাহিনির পরিসর—মহাভারত, রামায়ণ—সবই মহাকাব্যিক। এতে নৈতিক বার্তা থাকে, কিন্তু পুতুলনাচিয়ে গল্প বলেন হাসি আর আনন্দের সঙ্গে। এটা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমি চেয়েছিলাম এমন এক গল্প বলতে, যা অন্ধকার, মহাকাব্যিক, নৈতিক প্রশ্নে ভরা—কিন্তু তা বলতে হালকা ও হাস্যরসপূর্ণ ভঙ্গিতে।”
এই রঙিন ও রক্তাক্ত বর্ণনার পরেও উপন্যাসটির প্রকৃত বিজয়ী শক্তি হলো সহনশীলতা ও দৃঢ়তা—যা গল্পের নারীরা ধারণ করে। পুরুষ চরিত্ররা তাদের বিস্ময়কর জীবন কাটায় ষড়যন্ত্র, হত্যা আর বিপ্লব উসকে দেওয়ার পরিকল্পনায়—ভালো ও মন্দের নিরন্তর লড়াইয়ে, ঠিক রামায়ণের মতো। কিন্তু গভীরে তারা সবাই রোমান্টিক ভালোবাসার খোঁজে থাকে—যা তারা পায় না। কারণ তারা যেসব নারীকে ভোগ করে, ভালোবাসা তত সহজে জয় করা যায় না, ধরে নেওয়াও যায় না।
এই জটিল মহাকাব্যিক গোলকধাঁধার ভেতরেও কুর্নিয়াওয়ান কখনো সুতো হারান না। বরং তিনি আমাদের দেন এমন এক পাঠ্য, যা অবক্ষয়ে ভরা হলেও অনুগ্রহ ও সৌন্দর্যে দীপ্ত। বাস্তবতা, কল্পনা, লোককথা ও সহিংসতাকে এত সুগঠিত পর্বে মিলিয়ে রাখা—এবং একই সঙ্গে চরিত্র ও তাদের বিকাশ ধরে রাখা—নিশ্চয়ই এক বড় চ্যালেঞ্জ। পাঠক কৌতূহল নিয়ে চরিত্রদের জীবন অনুসরণ করে, ভাবতে থাকে—এত অসম্ভবের পর আর কী ঘটতে পারে? এবং বুঝতে পারে—সে আধুনিক ইন্দোনেশিয়ার নির্মাণ প্রত্যক্ষ করছে।
আজ আন্তর্জাতিক পরিসরে উদীয়মান ইন্দোনেশিয়ান লেখকদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে—এটা নিঃসন্দেহে সতেজ। বিশেষ করে সুহার্তোর পতনের পর কুর্নিয়াওয়ানের মতো একজন লেখকের বিকাশ দেখা যায়। বাহাসা ইন্দোনেশিয়ান না জানলেও, আমি কৃতজ্ঞ উপন্যাসটির অনুবাদক অ্যানি টাকারের প্রতি। তিনি তাঁর পিএইচডি গবেষণার সময় মূল ভাষায় বইটি পড়ে লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন—বিশ্বাস করে যে তিনি এমন এক সম্পদ পেয়েছেন, যা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া দরকার।
‘বিউটি ইজ আ উন্ড’ আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। এটি আমার কাছে এক অজানা জগত খুলে দিয়েছে—যেভাবে একসময় One Hundred Years of Solitude খুলে দিয়েছিল। আমার কাছে এই দুই উপন্যাসই এক নতুন ‘মাত্রা’র আবিষ্কার—যার কাছে আমি যেতে পেরেছি, উপভোগ করতে পেরেছি, এবং তার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য থেকে শিখতে পেরেছি। ·


0 মন্তব্যসমূহ