শাহনাজ মুন্নীর গল্প : আবির্ভাব


ক আবছা কুয়াশামাখা শীতের সন্ধ্যায় প্রথম দেখা গেলো তাকে। মনিপুর গ্রামের গৃহবধু জোসনার লেপকাঁথা রাখার তোরঙ্গে, বাংলা দ অক্ষরের মতো হাঁটু ভাঁজ করে মায়ের জরায়ুর ভেতরে শুয়ে থাকা শিশুর ভঙ্গীতে কাঁচুমাচু হয়ে শুয়েছিল দুলু মিয়া। জোসনা তখন কেবলই তার কোলের বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়িয়ে সন্তর্পণে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে অভ্যস্ত হাতে তোরঙ্গের ডালা খুঁলেছিল একটা কাঁথা বের করার জন্য। ঘরে টিম টিম করে জ¦লতে থাকা পল্লী বিদ্যুতের ১০০ ওয়াট বাল্বের ঘোলাটে আলোতে তোরঙ্গের ভেতরে পা গুটিয়ে শুয়ে থাকা ফ্যাকাশে নগ্ন দুলু মিয়া তখন তার লাল চোখ দুটো মেলে শুকনা কালচে নীল ঠোট দুটো ফাঁক করে ক্ষীণ স্বরে বললো, ‘দরিয়ার পানি বরফের মতো ঠান্ডা, বড্ড শীত লাগে গো জোসনা ...’

এই ঘটনার আকস্মিকতায় খানিকক্ষণের জন্য জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল জোসনা। মুহূর্তের জন্য জবান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার। তারপরই দুলু মিয়ার দুঃখ ও অভিমান ভরা ভেজা মুখের ওপর ঠাস করে গোলাপ ফুল আঁকা টিনের তোরঙ্গের ডালা ফেলে দিয়ে জোসনার গলা চিরে একটা ভয়ার্ত চিৎকার বেরিয়ে এসেছিল। জোসনার বুিড় শাশুড়ি সবে এশার নামাজ পড়ার জন্য উঠানের এক কোণায় লোটা ভরা পানি নিয়ে অজু করতে বসেছিলেন। চিৎকার ও পতনের শব্দ তার কানে পৌছালে ‘হায় আল্লারে! কি হইল, আবার-’  বলে প্রায় দৌড়ে ঘরে এসে হাত পা ছেড়ে মাটিতে পড়ে থাকা অচেতন পুত্রবধুকে আবিস্কার করেন তিনি।

বহুবার ডাকাডাকি আর চোখে মুখে ঠান্ডা পানি ছিটানোর পর জোসনার জ্ঞান ফিরে এলে সে শুধু বিড়বিড় করে বলতে পারলো, ‘দুলু মিয়া ফিরা আসছে।’

গ্রামের সবাই জানে দুলু মিয়া একদা জোসনাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু দরিদ্র দুলুর চাইতে পয়সাওয়ালা মুদি দোকানদার সেকান্দারকে মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র বলে পছন্দ করেছিলো জোসনার বাবা। সেই দুঃখেই কিনা কে জানে জোসনার বিয়ের পর পরই আদমের দালাল হালিমকে ধরে দুলু মিয়া টাকা রোজগারের জন্য বিদেশ করতে ঘর ছাড়ল।

সদ্য জ্ঞান ফিরে আসা জোসনাকে ঘিরে থাকা প্রতিবেশিরা এবার নানা রকম মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে থাকে।

‘আরে ও জোসনা, দুলুমিয়া এইখানে কিভাবে আসবে? সে তো কবেই লিবিয়ায় গেছে। সেইখান থেইক্যা ডিঙ্গি নৌকায় চইরা সাগর পাড়ি দিয়া চইল্যা গেছে ইতালি। ওইখানে রেষ্টুরেন্টে চাকরি কইরা দুলু হাজার হাজার লিরা কামাই করতাছে।’

‘তুমি ভুল দেখছো জোসনা, দুলু মিয়া তো এখন মালয়েশিয়ায়, রাবার বাগানে দিনরাত কাজ করে। রিংগিত কামায় রিংগিত। দুলুরে তুমি এইখানে দেখবা কিভাবে?’

জোসনার সামনে তার গোলাপ ফুল আঁকা টিনের তোরঙ্গের সকল লেপ কাঁথা বের করে ঝেড়ে ঝুরে উল্টে পাল্টে দেখা হয়, এই দেখো কেউ নাই, কিছু নাই। সব তোমার চউক্ষের ভুল। মনের কল্পনা।

‘দুলু মিয়া তো সেই কবে উড়োপ্লেনের চাকা ধইরা ঝুলতে ঝুলতে দুবাই চইলা গেছে।ওইখানের মরুভূমিতে ধনী শেখেদের উটের খামার দেখা শোনা করে। দিরহামে মজুরী পায়। দুলুরে তুমি দেখবা কিভাবে?’

স্ত্রীর অসুস্থতার খবর পেয়ে সিকান্দার সেদিন তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসে। ঘোরগ্রস্থ বিভ্রান্ত জোসনাকে শান্ত করতে সেই রাতেই পাশের গ্রামে দুলু মিয়ার বাড়িতে খবর নিতে লোক পাঠায় সে। সেকান্দরের লোকেরা যায় মটর সাইকেলে চেপে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে হেডলাইটের আলোতে গ্রামের অন্ধকার রাস্তা চিরে।

গিয়ে দেখে, দুলুর বাড়ির জায়গায় ফসল কেটে নেয়া ক্ষেতের মতো খালি পড়ে আছে শুনশান শুন্য ভিটা। একটা অলস কুকুর শুয়ে আছে কুন্ডুলি পাকিয়ে পরিত্যক্ত রান্নাঘরে,ভাঙা চুলার পাশে। অচেনা লোক দেখে লেজ গুটিয়ে ঘেউ ঘেউ করে বিরক্তি প্রকাশ করে কুকুরটা।

মানুষের সাড়া শব্দ পেয়ে পাশের বাড়ি থেকে প্রতিবেশিরা বেরিয়ে আসে।

‘দুলুমিয়ার পরিবার? তারা তো কবেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে! বিদেশ যাওয়ার জন্য তিন লাখ টাকা ঋণ করছিলো দুলুমিয়া। কথা ছিলো, বিদেশ গিয়া দুলু টাকা পাঠাবে, সেই টাকায় দেনা শোধ হবে। কিন্তু দুলু তো শুনছি নৌকায় কইরা ইতালি যাইতে গিয়া সাগরে ডুইবা মরছে। লাশটাও পাওয়া যায় নাই। পাওনাদারদের যন্ত্রণায় রাতের অন্ধকারে বাড়ি ছাড়ছে ওরা। আহা কত স্বপ্ন দেখছিল ওর বাপ, ছেলে বিদেশ থেইক্যা টেকা পাঠাইব, সংসারের চেহারা বদলায়া যাইব।’

‘আরে ধুর চাচা তুমি জানো না, ‘তরুণ বয়সী একজন সামনে এগিয়ে আসে,‘দুলু মিয়া তো আসলে মরে নাই, সে আছে মালয়েশিয়ার জেলখানায়, বেআইনি দেখায়া তারে বন্দি কইরা রাখছে ওই দেশের পুলিশ! বড় কষ্টে আছে গো ছেলেটা, জেলখানায় কি আর খাওয়াপরার ঠিক আছে? শুনছি নাকি নির্যাতনও করে। কবে ছাড়া পাইব কে জানে!’

লাঠি ঠুক ঠুক করে এক বৃদ্ধা এগিয়ে আসে এবার। বয়সের ভারে ধনুকের মতো বাঁকা পিঠ, চোখে মাকড়সার জাল। উটের মতো গলা উঁচিয়ে সে জানতে চায়, ‘দুলুরে খোঁজো কেন? ওরে তো সেই কবেই কবর দিছি। বিদেশ যাইতে গিয়া উড়োজাহাজের চাক্কার বাকসের মধ্যে ঢুকছিল ও। সেইখানেই মইরা শক্ত হইয়া গেছিল, জানো না সেই কথা?’

সেকান্দরের লোকেরা ফিরে যায় সেই সব পরস্পর বিরোধী তথ্য নিয়ে।

দুলু মিয়াকে দ্বিতীয় বার দেখা যায় মণিপুর বাজারে। লাকি সেভেন হোটেলের পেছনে রান্না করার আধো অন্ধকার জায়গায় মাথা নিচু করে উবু হয়ে বসেছিল সে। চামড়ার উপর দিয়ে তার পাঁজরের প্রতিটি হাড় গোণা যাচ্ছিলো, চোখ ঢুকে গেছিল কোটরে। পানি ভর্তি কলস কাঁখে নিয়ে তখন হোটেলের ড্রামে পানি রাখতে এসেছিল কমলার মা। নগ্ন দেহ রুগ্ন দুলুকে প্রথম চিনতে না পেরে সে ভেবেছিল, কোনো পাগল টাগল হবে হয়তো! দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে গেছে। কমলার মা তাই একটু উচ্চস্বরেই ধমকালো, ‘কেডারে তুই? এইখানে কি করোছ? ভাগ এইখান থেইক্যা, ভাগ্।’

তখনই দুলুমিয়া মাথা তুলে তাকালো, চোখে রাজ্যের ক্ষুধা আর পিপাসা নিয়ে সে আকুতির সুরে বললো, ‘একটু ভাত দিবা বুজি, দুই মাস এক দানা ভাতও খাই নাই...’

গলার স্বর আর চওড়া কপাল দেখে কমলার মা এবার চিনতে পারলো পাড়ার ছেলে দুলুকে । সে ভয় পাওয়া গলায় বললো, ‘দুলু! তুই না মইরা গেছোস, মালয়েশিয়া থেইকা কালো কফিনে ভইরা তোর লাশ আসছে ...’

দুলু এইবার হাসার চেষ্টা করলে তার ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো বেরিয়ে আসে। সে মুখে বিবর্ণ হাসি টেনে ভাঙা ভাঙা গলায় বলে, ‘মরণ কি এত সহজ নাকি, বুজি? জঙ্গলে জঙ্গলে কত পালায়া থাকছি, পোকা মাকড় কামড়াইছে, সাপে বিচ্ছু ছোবল দিছে, সাগরের লোনা পানি খাইছি, ঢেউয়ের মধ্যে ডুবছি, ভাসছি, হাঙ্গর কামটের দাঁতের ফাঁক দিয়া এখনো কেমন কইরা বাইচ্চা আছি... দেখো ...’

দুলু তার কাঠির মতো শুকনা কালো লম্বা হাত বাড়িয়ে দিলে অসম্ভব শীতল একটা স্পর্শ অনুভব করে কমলার মা। তারপর আর কিছু মনে নাই তার। কমলার মার তীক্ষè চিৎকারটা শুধু হোটেলের কর্মচারি বাবুলের কানে এসে পৌছেছিল। জ্ঞান ফিরে এলে অস্পষ্ট কন্ঠে বিড়বিড় করলো কমলার মা, ‘দুলুরে দেখলাম গো, উপাস থাকতে থাকতে হের শইল্যে খালি হাড্ডিগুলি দেখা যায় ...’

‘উফ্! কমলার মা! দুলু তো বাহরাইনে, ফার্ণিচারের দোকানে কাজ করে, চেয়ার টেবিল খাট সোফা কত কিছু বানায়, মাস গেলে দেশে দিনার পাঠায়। তুমি চোখের ভুলে অন্ধকার ঘরে কারে দেখছো কে জানে?’

কমলার মা’র জ্ঞান ফিরিয়ে আনা কর্মচারি বাবুলের কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।

ছোট্টবাজারে এই খবর রটতে সময় লাগে না। সেন্টু মিয়ার চায়ের দোকানে দুলু মিয়ার আবির্ভাব বিষয়ে গল্প জমে উঠলে সদ্য দুবাই ফেরত দুলুর বাল্যবন্ধু শওকত আলী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে, ‘তোমরা তো সঠিক ঘটনা জানো না,আমার কাছে শুনো, দুলু আসলে যাইতে চাইছিল স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়, টেকা দিছিলো দালালদের হাতে, সেই দালালরা তারে প্রথমে নিয়া গেল ব্রাজিল, তারপর বহু কষ্টে ট্রাকে লরীতে, কখনো হাঁটা পথে, লুকায়া পলায়া, না খাইয়া, না ঘুমায়া, ৭টা দেশ পারি দিয়া নিয়া গেছে পানামার জঙ্গলে। নাম শুনছো কোনদিন সেই জঙ্গলের?’

গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলি গরম চায়ে সুড়ুত সুড়ুত শব্দ করে চা খায় আর এদিক ওদিক মাথা নাড়ে। কেউ কেউ দেশলাই জ্বালিয়ে ফস করে বিড়ি ধরায়। নাক মুখ দিয়ে ধোয়া ছাড়ে। শওকত আলী তখন আবার গল্প শুরু করে, ‘সেই জঙ্গল বড় ভয়ংকর, উঁচা নিঁচা পাহাড়ি পথ, ঘন লম্বা গাছপালা, সাপ খোপ আর বিষাক্ত বিছার আখড়া। ভয়ংকর সব হিংস্র জন্তু জানোয়ার বাস করে সেই জঙ্গলে। দিনের পর দিন খাবার নাই, পানি নাই, ঘুম নাই, গোসল নাই, খালি হাঁটা, খালি কাদা পানি, গাছপালা ভাইঙ্গা পথ চলা। আদম দালালরা তো টাকা নিয়া কাইটা পড়ছে। পথে যদি মারা যাও তো মরলা, বাঁইচা থাকো তো কপাল ভালো, স্বর্গরাজ্যে পৌছাইলা। একবার যাইতে পারলে খালি ডলার আর ডলার। এই ডলারের গন্ধে সব কষ্ট মিঠা হইয়া যায়। দুলু ফিরবে কেমনে, ওতো ডলারের আঠায় আটক হইছে।’

চা ষ্টলের ভেতরে যেখানে অনেক মানুষের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিশেছিল, তারই এক কোণায় মাথা নিচু করে বসেছিল ইট ভাটার শ্রমিক কাশেম। ছোটবেলায় এই গ্রামের মেয়ে মর্জিনার সাথে একই মক্তবে কায়দা আর আমপারা পড়েছিল সে। দুইজনে মিলে খড়ের গাদার নীচে মিছিমিছি জামাই বউ খেলতো ওরা। আড্ডাবাজদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবার গলা খাকারি দিয়ে একটু কাশলো কাশেম। সবাই মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালে সে বললো, ‘খালি দুলুমিয়া না, তেলিপাড়ার মর্জিনারেও দেখা গেছে। সেও ফিরা আসছে।‘

‘আহাহা, কি কও মিয়া?’

গ্রামবাসী অবিশ্বাসের স্বরে বলে। তাদের মনে পড়ে বছরখানেক আগে মর্জিনা কালো বোরখা পড়ে হাতে সবুজ পাসপোর্ট আর ভিসা নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিল। কথা ছিল সে মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করবে। ঘর ঝাড়ু দিবে, মেঝে মুছবে। ফার্ণিচারের ধুলা পরিস্কার করবে। মনিবের জামা-কাপড় ধুবে, কাপড় ইস্তিরি করবে। রান্নাঘরে থালা বাসন মাজবে। ঘর গেরস্থালির নিত্যদিনের কাজ। সব মেয়েরাই নিজ ঘরে নিত্য দিন এইসব কাজ করে। কিন্তু এবার এই কাজে মর্জিনা চকচকে রিয়াল পাবে। সেই রিয়াল দেশে পাঠালে তার অনাহারী পরিবারের পেটে খাবার জুটবে। ভাঙা ঘর মেরামত হবে। ছোট ভাইটার একটা সাইকেল কেনার সখ, বোনটা চায় একটা রংগীন টেলিভিশন...।

বিদেশ যাওয়ার আগে গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিল মর্জিনা।
‘দোয়া রাইখেন গো খালাম্মা, যেন ছহি সালামতে ফিরতে পারি।’
‘যা, যা, ভাল কইরা কাম করিছ।’
‘আরবি ভাষা তো বুঝিনা চাচী, ডর লাগতাছে। কি জানি হয়? কেমন কফিল পড়ে!’
‘আরে চিন্তা করিছ না, আরব দেশের মানুষতো দিলে দয়া থাকবো, হেরা তো মুসলমানই, আস্তে আস্তে সব কথাবার্তাই বুঝবি, বাপ মার দু:খ দূর করবি।’
‘দোয়া ক্ইরো গো চাচী।’

গ্রামবাসী জানে খুব খারাপ অবস্থায় না পড়লে মর্জিনা হয়তো বিদেশ করতে যাইতো না। গেছে শুধু টাকা রোজগারের জন্য। হালিম দালাল তার ট্যাকে টাকা গুজতে গুজতে মর্জিনাকে আশ্বস্ত করে বলছে, ‘নবীর দেশে যাইবা,পবিত্রভূমিতে, অনেক টাকা বেতন পাইবা, থাকা খাওয়া ফ্রি, কাজ করবা চাইর দেয়ালের ভিতরে,পর্দা পুষিদার মইধ্যে, নিজের বাড়ির মতো, কোন সমস্যা নাই।’

কিন্তু নিজের বাড়ি কি এমন নির্দয় হয়? মর্জিনা জানে, নিজের বাড়িতে অভাব আছে কিন্তু শান্তিও তো আছে! এইখানের মতো কথায় কথায় সাদা সাদা লম্বা চওড়া নারী পুরুষের চড় থাপ্পড় লাত্থি গুতা, পেট ভইরা খাওন না দেওয়া, সবচে ভয়ংকর রাইতের বেলা ওর দুর্বল শরীরের উপর বিশালদেহী রাক্ষসদের হামলায়া পড়া! এইটা কি জীবন? ও দরদি মা, ও দয়ালু বাবা তোমরা আমারে বাঁচাও। কে কোথায় আছো, আমি আমার বাড়িতে যাইতে চাই। ও নবীজি, আমারে বাংলাদেশে পাঠায়া দেও। ও আল্লাহ আমাকে রক্ষা করো। এরা আমাকে কানতেও দেয় না গলা টিইপ্যা ধরে, এরা আমারে বাইর হইতে দেয় না, ঘরের মধ্যে বন্দি কইরা রাখে। ও আরব দেশের বাতাস, তুমি আমার কান্দন আমার চোখের পানি আমার দেশের মাটিতে পৌছায়া দেও। ও মরুর দেশের চন্দ্র সূর্যতারা, তোমরা তো দুনিয়ার সব আকাশে ঘুইরা বেড়াও, আমার আত্মীয় স্বজনরে জানাও, কেমন অত্যাচারের মধ্যে আমি আছি। তারা যেনো এই নিঠুর পাষাণ দানবদের হাত থেইক্যা আমারে মুক্ত করো। আমারে দেশে নিয়া যায়।

সেন্টুর চায়ের দোকানে সিলিন্ডার গ্যাসের গনগনে চুলায় এলুমিনিয়ামের বড় কেটলিতে গরম পানি টগবগ করে ফুটে। কেটলির নল দিয়ে চিকন ধোয়া বের হয়। চায়ের কাপে টুংটাং শব্দ করে দুধ চিনি মিশায় সেন্টু মিয়া। খদ্দেরের হাতে হাতে চায়ের কাপ পৌছে দিয়ে বলে, ‘মর্জিনা তো শুনছি আত্মহত্যা করছে। বারো তলা বিল্ডিংএর জানালা দিয়া নাকি ঝাঁপ দিয়া পড়ছে। ওইখানেই শেষ। গত বছর কালো কাঠের কফিনে ভইরা ওর লাশ আসছে।’

‘না, না, ভুল শুনছো তুমি। মর্জিনা জর্ডানে খুব ভাল আছে। এক বুড়ি থুত্থুরি মহিলার দেখা শোনা করে। নিয়ম কইরা ওষুধ খাওয়ায়। গোসল করায়। পেশাব পায়খানা পরিস্কার করে। মাস গেলে বেতন পায়। সেই বেতনের টাকায় ওর বাবা গেরামে জমি কিনছে। নতুন ঘর তুলছে।’

বেঞ্চির উপর পা তুলে বসে থাকা এক দাড়িওয়ালা তরুণ বলে। আরো দুয়েকজন তখন এ বিষয়ে সবজান্তার মত নিজেদের মত প্রকাশ করে।

‘আমি তো শুনছি, মর্জিনা দুবাই গেছে। ওইখানে হোটেলের ড্যান্স বারে লাল নীল বাতির নিচে কোমর দুলায়া নাচে। ভাল বেতন পায়। ঠাটে বাটে চলে।’

‘আরে না, তোমরা জানো না কিছু, মর্জিনা তো বিষ্যুদবার মধ্যরাতে সৌদি আরবের ফ্লাইটে ঢাকা আসছিলো, ওর কোলে ছিল আট মাসের একটা বাচ্চা। এই বাচ্চার বাবা কে? কেউ জানে না। লোক লজ্জ্বার ভয়ে বাচ্চাকে সে ফেলায়া গেছে এয়ারপোর্টে...’

চায়ের ষ্টলে চা পানরত মানুষজন অনেকক্ষণ কোন শব্দ করে না। যেন তারা কল্পনায় মর্জিনার অসহায় করুণ মুখটা দেখতে পায়। তাদের তখন নিজেদের ঘরের স্ত্রী কন্যার চেহারা মনে পড়ে। হঠাৎ মর্জিনাকে খুব আপন মনে হয় তাদের আর তার পরিণতির কথা ভেবে গভীর ব্যাথায় মন ভরে যায়। চায়ের দোকানের নীরবতা ভেঙে কাশেম নিচু স্বরে বলে,‘বিশ্বাস করেন, আমি মর্জিনাকে নিজের চোখে দেখছি। পুকুর পারে, চান্দের আলোয় ওর সুন্দর মুখটা শুকনা ফুলের মতো মলিন লাগতেছিল। কইলো,কাঠের বাক্সের ভিতরে ওর নাকি দমবন্ধ লাগে। নাড়া চাড়া করা যায় না। আর ওইখানে নাকি খুব ঠান্ডা আর অন্ধকার।’

‘কার কথা যে সঠিক, বুঝি না, হালিম দালাল তো বলছিল মর্জিনা মরিশাস গেছে। ওইখানে গারমেন ফ্যাক্টরীতে চাকরি করে। মাস গেলে টাকা পয়সা ভালই পায়।’

রাত বাড়ে। চায়ের দোকানের আড্ডাটাও এক সময় ভেঙে যায়।

পরদিন সকাল থেকে গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে মর্জিনা আর দুলুমিয়ার ফিরে আসার কথা। লোকজন নিজেদের মধ্যে ঠোট চেপে ফিসফিস করে। পুকুর ঘাটে গ্রামের বউঝিরা কেউ কেউ দেখে ভর দুপুরে মর্জিনা একা একা তার মেঘের মতো কালো চুল মেলে দিয়ে বিষণ্ন ভঙ্গীতে বসে আছে। গভীর রাতে বাঁশবনের ভিতর থেকে দুলুর দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে। কেউ কেউ রাতের শেষ প্রহরে গ্রামের সরু মাটির পথ ধরে ভোঁতা থপ থপ শব্দে তার হাঁটা চলার আওয়াজ পায়। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে গ্রামটা থম থম করে। একটা গভীর বেদনায় আর অজানা ভয়ে গ্রামের মানুষের মন ভার হয়ে থাকে। তাদের সংশয় জাগে, এই যে বার বার দুলু আর মর্জিনা কোনো অলীক ভূবন থেকে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, বিহ্বল কুন্ঠিত ভঙ্গীতে নিজেদের মরে যাওয়া কিংবা বেঁচে থাকা নিয়ে কিছু বলতে চাইছে এসবের গুঢ় অর্থ কি? তারা কি সত্যিই জীবিতদের জগতে চলে এসেছে, নাকি গ্রামবাসীই ভুল করে এসে গেছে মৃতদের দুনিয়ায়!

‘এই সবই ধোঁকাবাজি, সব মিথ্যা কথা...’ হালিম দালালের লোকজন চায়ের দোকানে গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচায়। তারা দোকানে ঝুলিয়ে রাখা কলা দিয়ে বনরুটি খায়, দুধ চায়ে চুবিয়ে টোস বিস্কুট খায় আর বাজারে আসা মানুষের সামনে আঙ্গুল নাচিয়ে বলে, ‘চোখের সামনে কত মানুষ বিদেশ গেল, চক্ষের পলকে গরীব থেইক্যা ধনী হইল, টিনের ঘরের জায়গায় রাতারাতি ছাদ দিয়া তিনতলা দালান তুললো। সেইসব দেখো না তোমরা? আরে, দুলু মিয়ার নসীব খারাপ, আর মর্জিনা কিনা পড়ছে দুষ্ট মালিকের হাতে। ভাগ্যের উপর কি কারো হাত আছে? খামাকা ভয় পাও তোমরা, মরা মানুষ কি কোনদিন ফিরা আসে? কেউ শুনছে কোনদিন?’

গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব তার লম্বা সাদা কালো দাড়িতে ডান হাত দিয়ে বিলি কাটেন। তারপর সুরমা দেওয়া চোখ বন্ধ করে মাথা দুলিয়ে বলেন, ‘না। মৃত মানুষেরা কখনো ফিরে আসে না। তারা অনন্ত লোকে চলে যায়, তবে হ্যাঁ, তাদের আহত আত্মারা মাঝে মাঝে ফিরত আসে। হঠাৎ চকিতে দেখা দেয়। অবিচারের বিচার চায়। জুলুমের কথা জানাইতে চায়।’

গ্রামের মানুষ হাহাকার করে উঠে।
‘হইছে গো, তাদের উপর অত্যাচার অবিচার জুলুম নির্যাতন সবই তো হইছে!
‘তাইলে এই শুক্কুরবার একটা মিলাদ দেও সবাই মিল্যা। আল্লাহর কাছে দোয়া খায়ের করো। ওদের জখমী আত্মা হয়তো তাতে শান্তি পাবে।’

ঘরে ঘরে বউঝিরা দুধ ঘন করে জ্বাল দিয়ে গুড় নারকেল দিয়ে যত্ন করে আতপ চালের সিন্নি রাধে। দরিদ্র অনাথ শিশুদের মমতা ভরে সেই সিন্নি খাওয়ায়। পুরুষেরা লুঙ্গির উপর পরিস্কার জামা পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে যায়। ইমাম সাহেবের সঙ্গে সুর করে মিলাদ পড়ে ‘ইয়া নবী ছালাম আলাইকা, ইয়া রসুল ছালাম আলায়কা...’ মিলাদ শেষে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে মোনাজাত ধরে কেঁদে আকুল হন ইমাম সাহেব।

‘হে আমাদের প্রতিপালক আমাদের ক্ষমা করো, আমাদের সেইসব ভাইবোনকেও ক্ষমা করো যারা অন্যের অনিষ্টের স্বীকার হয়ে দূর্ভোগে পড়েছে, দয়া করো তাদের প্রতি যাদের উপর জুলুম করা হয়েছে। তুমি তো দয়ার সাগর। দুলু মিয়া আর মর্জিনাকে তুমি শান্তি দেও।’

সেই রাতে অনেক দিন পর গ্রামের লোকের নিশ্চিন্তে ঘুম হয়। তাদের ঘুমের ভেতর ডলার, রিংগিত, দিনার, দেরহাম, রিয়্যাল, লীরা শুকনা পাতার মতো উড়ে, ঝনঝন করে হাসে। তারা উড়োজাহাজের চেপ্টা ডানায় চেপে মেঘের উপর হাল্কা হয়ে ভাসে। শুধু কালো মজবুত কফিনের নির্জন গহ্বরের ভেতর ওরা দুইজন হয়তো কোনদিনই শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। মনিপুর গ্রামের পথে ঘাটে মাঠে দিনে রাতে নি:শব্দে অদৃশ্য ছায়ার মতো স্তব্ধতা থেকে আরো স্তব্ধতায় ঘুরে বেড়াবে একজন দুলু মিয়া, একজন মর্জিনা। ·

লেখক পরিচিতি : শাহনাজ মুন্নী কবি ও কথাসাহিত্যিক। পেশায় সাংবাদিক। দীর্ঘদিন টেলিভিশন সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে চাকরি থেকে সাময়িক অবসর নিয়ে লেখালেখিতে মগ্ন। বসবাস করছেন ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের নয়াপুর এলাকায় প্রশান্তিবাড়িতে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ