আবুবকর সিদ্দিকের গল্প : চরবিনাশকাল


ত্তরবংগের ধুলো কার্তিকেও মরে না। রোদে পাঁশুটে ঝিম লাগে তো বাতাসের ওজন বাড়ে। সে ওজনে ছায়ার শরীর গাঢ় কালশিটে হয়। তবু ধুলো ধেয়ে আসে ঘোরালো বাতাসের পাক খেয়ে।

পাকা রাস্তায় খরখর খরখর একঘোড়ার টমটম চলে। কন্ট্রাক্টরের শিডিউলমাপা খোয়ারাস্তা ঘোড়ার লাদ চোনা ধুলো—এসব বুক পেতে ধারণ করে। তখন আশপাশের জমিজিরাত আমুণ্ডু ঘুলিয়ে ধুলোর ঘোলা আকাশ ফৌজী দেয়ালের মত ধেয়ে আসে।

ডর নাইখ জী পুংখিরাজ।
সহিসের চাবুক খেয়ে খটমহল ঘোড়া সামনের ঠ্যাং উঁচিয়ে কেঁদে ওঠে।
দ্যাশ কতোয়ানি দূর গো দ্যাশ কই?

মেয়েটার পায়ের ভাঁজে হাঁটুর ঠোনা কিন্চিৎ ঠেকিয়ে রাখার ভান করে সহিস এবারে যে গৎ তোলে টাবুটুবু টাবুটুবু..., তা বুঝি এই ভরবেলার মাঝপথেও করুণা ও ভয়ের আণবিক সংক্রাম। আপাতখোয়ানো সময়ের কদমছাঁট রোমাঞ্চ হিম করে আনে লোকটার স্মৃতিবিস্মৃতির তলা। এই টাবুটুবু মর্শিয়াতে দিক্ভ্রান্ত এমামহোসেনের শাদা দুলদুল কুফার দিক ছেড়ে দস্তে কারবালার পথে পা রেখেছিল।

বুকের তলা হিম হতে লাগলে বিদেশী যাত্রীটি মেয়েটার হাতের মাংসে তাপ খোঁজে।
হেইডা কি মউতের মুলুক নাকি? যাও কই? ফুরায় না দেহি!
আরেকদফা কলকল হাসি ও তাচ্ছিল্য উপেক্ষা অহংকার।
ঘোড়াটা মদ্দা কিন্তু অত্যন্ত বায়ুত্যাগী। সহিসের নাকসওয়া। তবুও চাবুক নাচায় বদবায়ুবৃত্তে। স্বভাববশের নাচন।

আঁধি কেটে যেতে যেতে সর্বনাশা ধ্বংসাবশেষের সিনেমাস্কোপ মেলে ধরে পুবের আকাশ। প্রাচীন গড়ের উঁচু সীমানা দেয়ালের মত ভেসে চলেছে মাইলের পর মাইল। জনমানুষ নেই। বুঝি সাপগোসাপে খোঁড়ল খুঁড়েছে। বুঝি সজারুবাঘডাসা অরণ্যের অনড় অন্ধকারে হামা দিয়ে ফেরে। তারা কি মানুষ? এই সর্বনাশা শূন্যতার কোনো মানে হয় সত্যি? লোকটা তিরিক্ষি চিৎকার করে দূরের আধমোছা গড়কেই পাঠিয়ে দেয় মানুষের কথা,
এয়া আল্লা! এইডা ক্যার এ্যাট্টা যাদু কিসিম।

সঙ্গিনী নয়, সহিস, নাকের রোমা পট পট করে উপড়ে এনে চোখের উপর ধরে পরখ করতে থাকা বুড়োলোকটা কথকের ঢঙে শুরু করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সামন্ত জমিদারদের মূল বসতভূমি। লোকে বলে গোকুলের কাঁঠাল। তখন এমন অরণ্যের ঝাড় ছিল না। কয়েকপুরুষ আগে গম গম করত। হাতি ছিল। তহশীল ছিল খাজনা আদায়ের। কুয়োর মধ্যে চাপা দিয়ে মারা হতো অনাদায়ী প্রজাদের। তাদের বুকফাটা চ্যাঁচানী এখনো দুপুররাতে শোনা যায়। ব্রিটিশ আমলে সন্ত্রাসবাদীরা এখানে ঘাঁটি করেছিল। তারা দেখেছে খটখটে কংকালের মিছিল।

বিদেশী যাত্রীপুরুষটার আর সহ্য হয় না। আবার চেঁচিয়ে ওঠে ছুরি খাওয়া ভ্যাড়ার মত, না আমি যাইতাম না। আগে কইলা না ক্যারে?
হয়ত আরো কিছু উক্তি ছিল। দুইপাটি দাঁতের ফাঁকে ধুলোর সর। বরং ফিরে যাই, মন বলে মনে মনে।

কিন্তু এই ক'রাতে ঐ ধুলট সরের চেয়ে পুরু প্রণয় ও বাৎসল্যের পর্দা জমেছে পরস্পরের জোড়আড়ালে। মেয়েটা ক্ষোভ জানায়,
আ গ মাকে দেখব্যা না? কী হোলাবেড়াল রে বাপ্ আঁ? তুমায় দ্যাখাবো তো হামার মাকে না কী বটে? তা অ চাচা! বুলি চাচাগে!
গলার ছিলে চড়িয়ে সহিসবুড়োকে বলে, কহছি তুমি লিজে কি দেখ্যাছো কংকালংকাল দুট্যাএ্যাকট্যা?
নাগে বিটি। সি জেল্লা কি আর আচে চোকে? তা'বাদে ছানি ডান চোখট্যেয়।
অজী তাহেল্যে তো তুমি হাঁর দুলাভাইই, লয় কি? ফুঃ!
সহিস সরস গলায় বলে, ধ্যেসশালী!

সামনের অনিশ্চয়তায় ঠাণ্ডা ঘামের ফোঁটা জমে ওঠে বুকে। এসব বিপদআপদের মাথায় একটাই নিদান লোকটার জানা। কিছু খেতে পেলে স্নায়ুগুলো পথে আসে। আবার কাজে লেগে যায়। এই মেয়েটা তাকে চটচটে ঘায়ের মত আটকে রেখেছে সেই প্রথম দ্যাখার পর থেকে। ঠোঁটের ধুলোয় জিভবুলোতে বুলোতে পাশের শরীরটা দেখে নেয়। প্রায় গবেষকের চোখে। মূল গঠন লাল টিস্যুর শাড়ির আবডালে যেমনটা থাকার কথা। উত্তরবংগের সেই অনড় গড়ন। খাড়া হয়ে বসে আছে কালো শিবলিংগের মত। এ এলাকার কালো রঙে একছটাক ভদ্রতার ভেজাল নেই। দুপিঠের মধ্যিখানে সরু খাল শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গড়খাই বাঁক নিয়েছে কোমরের ঢালে। টনটনে ধনুকের ছিলা। গুণ পরানো সর্বক্ষণ। বুক। তাও কঠিন। প্রায় পাথুরে।

গনগনে খিধে সত্যিই মাথায় চড়ে যায় লোকটার। এই তার অসুখ। দ্যাখনাদ্যাখ হঠাৎ খাই খাই করে ওঠে গোটা শরীর। কচি কলাপাতার মত কাঁপতে থাকে কাঠামোখানা। বেঁটে হলে কি এ সব ব্যাধির জ্বরে বেশি জোর করে? ওর গরম নিঃশ্বাসে মেয়েটা বিষণ্ণ চোখে তাকায়। কটাক্ষ হেনে পায়ের পাতা দিয়ে চেপে ধরে লোকটার বাঁ গোড়ালি।

পশ্চিমের রোদে কপালের চামড়া কানপিঠ পুড়ে যায়। ঘোড়াটা আসল পংখিরাজ। টাগবুগ টাগবুগ করে লাফায়। হাড্ডিসার দেহ নিয়ে উড়ে চলে।
গোবরাতলা বাজারে আসতে আসতে ভয়াবহ গড়ের দেয়াল, যার নাম সেই গিয়ে গোকুলের কাঁঠাল, ওদের পিছু ধাওয়ায় ক্ষান্তি দিয়ে সরে যায়।

বাজারের পেছনে নদীর দিকে তাকিয়ে কলকলিয়ে ওঠে মেয়েটা, এট্যাই তো মহানন্দা দেখতে লাগছে। পদ্মায় মুখ লাব্যিয়েছে। কতো খেল্যাছি গই লদ্দীর সঁতে আঃ!
লোকটা শার্টের হাতায় নাক মোছে ঘন ঘন। তার আবার সর্দির ব্যারাম ছেলেবেলা থেকে।
মেয়েটা তাকিয়ে আছে নদীচোখো পুতুল। একটা নিঃশ্বাসের আধখানা ফেলে বিড় বিড় করে বকে, কোশখানেক মুটটেই আর। তারপর তো মল্লিকপুরের হাট। হাটের ঘাটে নাম্যা হাঁরা মুখহাত ধুয়্যা লিবো। মা গে! যা ধুলা!

লোকটা অভয় পাবার কায়দার মাংসের ঘড়ার কাছ ঘেঁষে বসে প্রশ্ন করে, অয় আর কতোয়ানি দূর গো?
উই তো হাট দ্যাখালছে না, ওয়ার উত্তরপুবে হাঁটাপথ লদ্দীর পাড় ধর‍্যা ধর‍্যা। সানপুর, সালালপুর, আমলাইন, বকরীড্যাঙা, ব্যালড্যাঙা, ট্যাকাহাঙা, সব ছাড়্যা ছাড়্যা যায়্যা তাবাদে...মা...
বাকি আধ্ধেকটা নিঃশ্বাসও ছেড়ে দেয়। ফিশ ফিশ করে বলে, মাকে পাবো তো? হায় গ! মুখখান য্যেনে ছায়া হয়্যা গেলছে এ্যাদ্দিনে। সেই ছটুকালে বাড়ি ছাড়নু।

সত্যি যখন মল্লিকপুরের হাটে পৌঁছে টমটমের ভাড়া মিটিয়ে দ্যায় ওরা, বেলা তখন মাথায় ওঠার চক্রান্ত করছে।
একটা ফজলী আমগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে হাতপা ছেড়ে দেয় হতক্লান্ত পুরুষটা। মুখেমাথায় ধুলোর ছোপ। হাতের ব্রিফকেস, হ্যাঁ, বিশপঁচিশ টাকার বিনিময়েও এ জিনিশ আজকাল বাংলাদেশের হাতে হাতে ঘোরে, চ্যাপটা হালকা বাক্শটা মাটিতে নামিয়ে রাখে।

কী আর করে! ফস্ করে দেশলাই ঘষে একটা স্টার ধরায়। মেয়েটার আঁচলের গিট খুলে কখানা নোট বের করে। এবারে বোঝা যায়, পুরুষটারও পৌরুষ আছে। বিরক্ত গলায় প্রশ্ন করে, কী করবা কী ট্যাহা দেয়া?
কেনে কুশরের গুড় আর চিড়্যা কিন্যা খাবো। ভোঁক লাগ্যাচ্ছে। লাগে নাই?
আঃ মুই দিতাছি।

আধডজন নীলরঙা রেশমী চুড়ি বাজিয়ে মেয়েটা হাত নাড়ায়, না জী। সেট্যা হবেনি। তুমি তো কুটুম হামার অখন। হাঁর বাপের বাড়ির দ্যাশ না ইট্যা?
কইছো ঠিকোই। আমি তো তোমার পতপাওয়া জামাই হেঁ হেঁ!
সমঝদারের মত মাথা নাড়াতে থাকে লোকটা।

ওদের এই যাত্রার একটা ইতিহাস আছে।
একজনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। আরেকজনের এই উত্তরবংগে। পুরুষটা স্বভাবে যাকে বলে, দুশ্চরিত্র, তাই। তেরো বছর বাইরে কাটানোর পর এবারে ঈদের সময় হঠাৎ বাড়ি গিয়ে ওঠে। ইউনিভার্সিটি ছুটি থাকায় খালাতো বোনও বাড়িতে তখন। অনার্সপড়া মেয়ে। তার কায়দাকানুন দেখে ভয়ানক ক্ষেপে যায় ও। বিয়ে করতেই হবে, না হলে জানে মারা যাবে। তখন দুই খালাতো ভাইতে ধরে একরাতে ধুমসে পিটিয়ে ওকে দেশছাড়া করে দেয়। পথে জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের বেশ্যাপাড়া থেকে কালো নোড়ার মত বরণগড়ন সঙ্গিনীটিকে জুটিয়ে নেয়। খালিশপুরের জুটমিলে ফিরে গিয়ে রটিয়ে দেয়, দেশের থেকে শাদি করে এনেছে। হেইডা বউ। নাম ছানবিবি। হেডদরোয়ান বাচ্চুর বাড়ি গফরগাঁও। সে গোঁপ চুমরে বলল, ও ছানবিবি দেইখ্যা অইছে কিয়ের? রেট তিনের থেইক্যা ফাঁচট্যাহা। আমি দুই ট্রিপে দশট্যাহা দিছি জগন্নাথগোনজো ঘাড়ে। তখন মেয়েটি বলল, চলো হাঁর বাপেরবাড়ির দ্যাশে যাই। মাকে দ্যাখতে কতো মন কোরছোলো। কাহকি পাইনিখ সঁত লিব্যার। ছটুকালে বাপু মরলে মামু আস্যা লিয়া যায়। আর ফির‍্যা যাইনিখ। মাবেটি তো বাপের ভিঠ্যা ছাড়্যা লড়লো না। এই কথায় লোকটার যেতে মন চায়। মাকে দেখতে সেও তো বাড়ি গিয়েছিল এতকাল পরে। ভাঙাচোরা কবরে তিনমুঠো মাটি দিয়ে ফিরে এসেছে। বলল, তাই-ই যাওযাই। এডার লগে লগে নতুন দ্যাশও দ্যাহা অইয়া যাইবোগা।

খুলনা থেকে পার্বতীপুর মেলে রাজশাহী। সেখানে সাহেববাজারের হোটেলে একরাত। তারপর ট্রেনে নবাবগঞ্জ। তার পর থেকে বারোচোদ্দ মাইল টমটমের পাড়ি।

যে টমটমটা ওদের পৌছে দিয়েছে, তার এখন হাঁপ ছাড়ার ফুরসৎ। কাঠের কাঠামো এলিয়ে দিয়ে দম টানছে পাকুড়ের ছায়ায়। ঘোড়াটা ডানা গুটিয়ে নিয়েছে। চোখে পিচুটি। কানে মাছি। ঠোঁটের কশ ঝুলে নেবে গেছে। পিঠের চামড়া বিনা চাবুকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। দানাপানি দেয়া হচ্ছে। রেহাই বা স্বাধীনতা কোনোটা নেই। আরেকজনের স্বার্থের চাকায় নিয়তি বাঁধা। তাই আবার নতুন করে দম পোরার ব্যবস্থা হচ্ছে। চাকার এবারে ফিরতি পাক্।

মুদীদোকানের বেন্চে পা ঝুলিয়ে বসে নদী দ্যাখে লোকটা। শাদা চোখ। হাঁ মুখ। নাড়ুগোপালটি। তায় শরষের তেলে চিকন তেড়িটি পথের ধুলোট বাতাসে চিরলচেরা।
বসে নদী দ্যাখে। নদীর লেনাদেনা।
মহানন্দা এখানে দক্ষিণবাহী। খরস্রোতা। রোদ এসে খাড়া কোপ খেয়ে পড়েছে পানির উপর। চোখ ঝলসে যায়।
খেয়ানৌকোর দেয়ানেয়া পারাপার জুড়ে। একদল মানুষকে নিয়ে তুলে দেয় ওপারে। সেখানে ঘন মেঘের মত আমগাছের অরণ্য। আকাশের সাথে ব্যবধানটুকু আর নেই। মানুষগুলো কদ্দুর অবধি যেতে পারে হেঁটে হেঁটে? হাতে থলিঝোলা। পিঠে বোঁচকাবোঝা। মাথায় দুনিয়াদারী।

ঘাটে লাগোয়া জেলেডিঙি। চাঁদবিবির পুরুষ ঝোঁকের মাথায় একটা দেড়সেরী মিরগেল কিনে ফেলে। জেলেরাও আজকাল পলিটিক্সে দর হাঁকে।
যেমন,
দাম কি আর লামে জী? ঝে ঝ্যাখন চ্যারে চড়হেন বাড়হিয়্যাই চলছেন। ভোটের ঠ্যালাটা কী ল্যাও কেনে।
তবু এ খরচটা কর্তব্যকর্ম। শাশুড়ির কাছে প্রথম যাচ্ছে নতুন জামাই। তাও চাকরে বটে।

মেয়েটাও বুদ্ধি করে চালডালমশলাপাতি সদাই করে নেয়। ঘুরেফিরে ফর ফর করে কথা বলে চলে তার নিজের সাথে। যেমন,
ই পাইকড়গাছ তিনট্যার ঝ্যে তিন নাম, হামি জানি হেঁ। কহবো? জয়নালপাইকড়। আক্কাসপাইকড়। আর গেলছে তোমহার দেলদারপাইকড়।
লয়? ওই যাঃ, কলও বস্যাচে হাটে এঃ? চাইল ডাইল গহম সব এ্যাকসঁতে ভাঙে, লয়?
আ ম'লো! কেসমতভকত্ জী। এ্যাকসঁমাতে মিম্বর ছেলো না? অর লাতীনট্যে হামি বটে।

খেয়া ফিরে এসে আবার ঘাটে ভেড়ে। নতুন মানুষ দেখে হঠাৎ সূর্যের দিকে নজর পড়ে মেয়েটার। তাড়া দিয়ে তুলে দেয় লোকটাকে।
এ মাগে! ব্যালা না মাথায় উঠ্যে! যাব্যা কখুন?
তখন, ভোঁ পড়ার সাথে সাথে জুটমিলের গেটে ঢোকার জন্যে যেমন মাথা হেঁট করে এগুতে হয়, তেমনি ঘাড় ঝুলিয়ে খেয়ার দিকে পা বাড়ায় লোকটা। মেয়েটা কল কল করে ওঠে, ই বেভুঁই মিনস্যার রীত দ্যাখোসে। ঢঙ! বুলছি লদ্দী কেনে? মরণ পাড় ধর‍্যা ধর‍্যা হাঁটাপথ। হাঁর পাছু লাওসে।
ওদের সেই টমটমওলা নতুন সোয়ারি পেয়েছে। তাদের নিয়ে ফিরে যাচ্ছে সদরের দিকে।
.............

চোখের বিষাদে মণি জ্বালা করে লোকটার। নদীর পুবপাড় ধরেধরে পায়ে তৈরি পথ। ধুকতে ধুকতে চলে গ্যাছে। ক্লান্তিতে চোখের পাতা নেমে আসে।
হাঁটতে হাঁটতে অদ্ভুত সব ভূতুড়ে দশার পাল্লায় পড়ে লোকটা। ফুসফুসের ওজন কমে যায়। হাতের ব্রিফকেস ভারি হয়ে ওঠে। মাথার পেছনখুলিতে ধিম ধিম আওয়াজ ওঠে। পায়ের গোড়ালি, তাও ঝন ঝন করে।
এ কি মরুভূমির দেশ এল নাকি? মাটি কই হায়? তামাপোড়া বালি হা!
কাঁটাঝোপ হা! ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ শ্মশানচাঁড়াল বাবলাগাছ। আকাশের মত ফ্যাকাশে ছাইরঙা। এমন থাকার চেয়ে না থাকলেও চলে।
কালো কালো মানুষের উদ্ভট গ্রাম। বনবাদাড়ের ফাঁকে ফাঁকে একচিলতে। ঝুপড়ির জীবন। থাকার চেয়ে না থাকলেও চলে।

এটাও কি গ্রাম নাকি? মাটির দেয়াল। মাটিগাঁথা ঘরবাড়ি। ঝ'রে গ'লে খ'সেও সবই টিকে আছে মূল আদলে। শুধু জীবন নেই। না। একটা মোরগের বাগ কী শিশুর কান্না, কোনো লক্ষণ নেই। শিউরে ওঠে লোকটা।

মেয়েটা জানায়, একসময় সবই ছিল। করম দেবতা। চড়ক পরব। শূকরমুরগী। কামিনদের নাচ। মরদমাঝির মাদল। হঠাৎ ওরা তেভাগার দাবিতে সরকারি আমলাভক্ত জোতদারদের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দেয়। তারপর সদর থেকে মিলিটারি এসে বেঁটে দিয়ে যায়। সাঁওতালরা চৌকাঠে উঠোনে সড়কে গুলি খেয়ে শুয়ে শুয়ে পচতে থাকে। বাদবাকিরা গাঁও ছেড়ে পালিয়ে গেল তো গেল। আর ফেরেনি। এটা তাই আজো ছাড়াগাঁও। নাম বকরীডাঙা।

সেই ছাড়াপুরীর পানে তাকাতে তাকাতে নতুন কুটুমের বুকের তলা ফাঁক হয়ে যায় এই রবরবে দুপুরবেলায়! পা কামড়ে ধরে পেছনের মাটি। সামনে অন্ধকারের হাঁড়কাঠ। ঝুপসি আমবাগান পথ মেলে দিয়ে ডাকে। পায়ের পেশীর গোছে পাথরের ভার। এ রকম গোমড়া বকরী ওর দ্যাখা আছে। কশাইয়ের ছুরি দেখে খামি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকিয়ে দ্যাখে, সুমুখে ছুরি হাতে কশাই নয়; লাল টিস্যুর রক্তে রাঙা কালো মোজাইকের চাঁদবিবি। শাদা দাঁতের ছুরি শানিয়ে কলকলিয়ে ওঠে,
আগ লাগর! শ্বশুরবাড়হি যাবা না? ই বাগানট্যে পার হও পহেলা।

বকরীডাঙা পেছনে ফেলে আসে ওরা।
এতক্ষণে উত্তরবংগের স্বাভাবিক যে আমবাগান, তার আসল ঝাড় শুরু হয়। দক্ষিণবংগের বাদাবনের মত এ অরণ্যেরো বুঝি মাথা নেই। সারাপথ কেবল কালো কালো আমের গুঁড়ি। মাথায় মাথায় কালচে পাতার জমজমাট ভার। নিচেকার মাটি যেন নিকিয়ে দেয়া। চাঁদবিবির আপশোস তাকে আমের মরশুমে আনতে পারেনি। ভাতের বদলে স্রেফ আম খাইয়ে রাখত।

অন্ধকারের পর অন্ধকার পার হয়ে হয়ে একসময় ওরা নদীতীরে একটা ফাঁকা বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হয়।
ভেতরে পা দিতেই ছম ছম করে ওঠে সর্বাংগ। নদীর ওপারে বারুণীর মেলা মিলেছে। ঢোলবাঁশিকোলাহল জল ছাপিয়ে এপারে ভেসে আসছে। এখানে এপারে মানুষ নেই। সাড়া নেই। জীবন? আছে কী নেই! টাটকা দুপুরের তাপে কন্টিকারীর পাতারা মিইয়ে আছে। বরেন্দ্রকে এ এলাকার লোকে বরীন বলে। বরীনের লাল মাটি যুগ যুগ ধরে শুকিয়ে খটখটে হয়ে আছে। তার উপরে বহু পুরনো আমলের কোঠাবাড়ি। গলে পচে মিশে যাবার প্রায়। চৌকাঠ পুরনো অভ্যেসের বশে ধরে আছে দরোজার জীর্ণ পাল্লা। ভেতরটা হাঁ হাঁ করছে। আর ঝুলকালিমাখা অন্ধকার বলে দিচ্ছে : না, কেউ নেই আর। সব শেষ। মানকচুর ঝোপের ভেতর থেকে একটা ধূসর ভাম বেরিয়ে এসে ওদের দেখতে থাকে ট্যারাচোখে। মেয়েটা সিঁড়ির রানায় এলিয়া বসতে ভামটা ভোঁৎ করে ছুটে পালায়।

উত্তরপোতায় রান্নাঘর। তারও দরোজা আছে। জানালা আছে। প্রাচীন কালো কাঠের লোহার জোড় খসে গ্যাছে। কব্জার বোঁটা ছিঁড়ে একটা পাল্লা ঝুলে আছে কোনোমতে। কোথাও তক্ষক ডেকে ওঠে এই দিনদুপুরে। তখন লোকটার খেয়াল হয়, তাই তো, এপারে এসে এ অবধি একটা মানুষেরও মুখ দ্যাখেনি। এ কোন দেশে এল? তবে হ্যাঁ, এটাই যদি তার শ্বশুরবাড়ির দালান হয় তো আফিল জুটমিলের হেডদরোয়ান বাচ্চুকে এনে একদিন দেখিয়ে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু কত শত বছর আগে থেকে বাড়িটা এরকম বোবা দরবেশের মত দাঁড়িয়ে বুড়োচ্ছে কে জানে? কত বছর ধরে এর মধ্যে লোকের আনাগোনা বন্ধ কী জানি? লোকটা ভিতরে ভিতরে ঘামতে লাগে।

দালানের হাতপনেরো পুবে তেলাকচু লতায় জড়ানো একটা বিশাল ব্যাপারের শরীরে চোখ আটকে যায়। কাছে এগিয়ে দ্যাখে, অনেক সেকেলে ইটসুরকির কঠিন পিণ্ড। মাটিতে শুয়ে আছে নিঃশব্দে। হাতদশেক লম্বা। বটগাছের গুঁড়ির মত। বেড় পাঁচ হাতেরও বেশি। উঁচুতে লোকটার কোমরসমান। অবাক হয়ে জিগেস করে, এইডা কিয়ের আলামত রে আল্লা?

চাঁদবিবিও সঠিক জানে না কী। জন্মের গোড়া থেকে দেখে আসছে। তার বাপদাদারাও অমনি দেখে এসেছে। বলল, লোয়াবদেরি তো জী। ক্যা জানে বোরুজ না খেলান কী কহে লোকে? গাঁয়ে এমুন মরদট্যে জুটলো না ধর‍্যা লড়ায় এ্যাকসুঁত্।

লোকটাও দুহাতে ধরে একটু চেষ্টা করে। কোমরে চাড় লাগতে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেয়। চাঁদবিবি আবার কলকলিয়ে ওঠে, ইহিরে মরদ! কতো ত্যাজ!

ততক্ষণে ওদের গলার খলবলানিতে ভেতরবারান্দায় শুয়ে থাকা পুরনো বুড়ির দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে গ্যাছে। কুঁজ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসে রে রে করে। লাঠিতে ভর দিয়ে শরীরের কাঁপুনি সামলাতে সামলাতে মুখ ছাড়তে শুরু করে, অ অলপেয়েরা! মরিনি কেনে? কোন চুল্যা দিয়ে উঠ্যা আলিরে তোরা?

বুড়ির ধবধবে হলুদবরণ গা। গলায় রূপোর হাঁসুলি। শাদা পাটের মত চুলের গোছা। উঁচু কুঁজ। সব কিছু দেখে চাঁদবিবি অবাক। ভয়ে ভয়ে জিগেস করে, হামি তো চাঁদবিবি। এট্যাই হাঁর লিজ্যের ভাতার। তুমি কে গা? হাঁরি বাপের ভিট্যা বটেক। তা হ্যাঁগে, মা কুণ্ঠে?

বুড়ি এবারে আশ্বস্ত হয়। বারান্দায় লাঠি শুইয়ে রেখে দুহাঁটু উরুসমেত নামিয়ে দেয়। হাতের শাদা চামড়া নীল রগের ওজনসুদ্ধ ঝুলে পড়েছে। তার একখানা কাঁপাতে কাঁপাতে নেড়ে নেড়ে বলে, অ তা কহবি তো! তুই তাহেল্যে চান্দদিবি? হাঁর পরীবিবির বেটিটো? পুরী যে হাঁর লাতিন হয়গে।
অয় মাগে। সে কী কহিছো। তা তুমায় তো আগে দেখিনি কখুনো?
কী কর‍্যা দেখবি বুল্ মা? বাড়ি তো সেই চরবিনাশকাল গাঁয়ে। ব্যাটার বহু উই আবাগী মাগীট্যে। বছোরবিয়্যানী গাই। হাঁকে লাব্যিয়ে দিলে গা পোতার থাক্যা! হাঁর ছ্যালাট্যা বাঁচ্যা থাকলে—আঃ হায় হায় গ!
আহা! আবার কাঁদতে লাগল্যা কেন্যে এই ধুলামাখা গতরের মুখে? বুলে শরীল জ্বল্যা যেইচে। কদ্দিন আস্যাছো গ তুমি মইমা?
গ্যালোগে তোর তিনমাসকম দশসন তো হলচে বটেক। অ দ্যাখো, জাঁওই যে খাড়ে হয়্যা থাকল্যে!

মাথায় কাপড় টেনে দেবার চেষ্টা করে বুড়ি। তাকে আপ্যায়নের সুযোগ না দিয়েই জামাই খপ করে বুড়ির পায়ে হাত দিয়ে সে হাতের ধুলো মাথার ধুলোয় মুছে নেয়। বারান্দায় বসে পড়ে নাকের সর্দি মুছে প্যান্ট সামলাতে থাকে। খুলনা রেলস্টেশনের দক্ষিণ দিকে পুরনো কাপড়ের দোকান থেকে কেনা। পরা অবধি সেলাই কাটছে পটাপট করে।

বুড়ি তখন তার গল্পের ঝাঁপি খুলে দিয়েছে। চাঁদবিবির মাথাটা টেনে নিয়ে বিলি কাটতে কাটতে শুরু করে, সেই যে তোর মা গ্যালো না! অমা তাও জানিসন্যা?
চাঁদবিবি কেঁদে ওঠে, মা নাইখ হাঁর? ও মইমা মা নাইগে?

গ্যালো সোনের আগকার সোন। আ—ঘোন মাস ত্যাখুন। ঠিক সন্‌ঝে লাগ্যা গেলছে! হামি বুলে ত্যাখুন জ্বরে কাঁপতে লাগ্যাচি। পুরী বুঝিন উদিকে চুলায় ভাত চাপায়‍্যা বস্যা আছে। উত্তরের লদ্দী টপক্যা ল্যাংড়ার ডালপালা নাড়্যা দিয়্যা কহছিলো, আ—য়! সন্ঝেতারা চুপি চুপি ডাক্যা কহছিলো, আয়। পরী আর পুরীতে নাই ত্যাখুন। আখা ভাব্যা মন ঠেল্যা দিলো চুল্যায়। সাড়া দিয়্যা কহিলো, যাইগে! হামি পছিমের চালিত্তরে ক্যাঁথা মুড়ি দিয়্যা কহিনু, কুণ্ঠে লা? ও মা, আর সাড় নাইখো সেই থাক্যা চাঁনদের আলা ফুট্যা উঠলো। পরীর সাড় নাইখ। কাঁপতে কাঁপতে বাহিরে উঠ্যা আস্যা দেখনু, মা গে, কী কহবো তোকে, আখা জুল্যা ছাই। দুয়ার খুল্যা হাট। চোকাঠে পড়্যা আছে পেতলের চাভিখ্যান। ডাক দিনু গলায় অক্ত তুল্যা, পুরী লো। পুরী লো। তক্ষকটা ডুকর‍্যা কহিল্যে, নাই লোং নাই লো! আ! কাল অথে ডাক্যা লিল্যে। আ কপাল, হাঁর পানে লজর দিলো না। হায় হায় গ।

শুনতে শুনতে বুকের তলা শির শির করে ওঠে পুরুষলোকটার। কথার মোড় ফেরাবার জন্যে বলে, লোক কি মোডে নাই এ দ্যাশে? আইস্যা অবধি একটা মাইনরে মুখ নজরে পইলো না।
মেয়েটা গল্পো শুনে কাঁদতে লাগে মুখ গুঁজে।

বুড়ি চোখের সামনে হাতের পাতা তুলে ধরে বলে, কী যে কহো রাঙাজাঁওই। কুনখান দিয়্যা আসবে জনমুনিষ্যি? তামাম তো আকালেউপাসে হাজ্যা মইললো। হাঁর পাপীর পরাণট্যা বটে। সেগনে যমের অরুচি। ভিনগাঁয়ে মাঙন মেঙে বাঁইচা আছি। তা তোরা বুঝিন আন্‌ন্ধ্যাবাড়্যা খাবি লা?
হ্যাঁ মইমা। দুটা ফুটিয়্যা লিবোখন। তুমিও খায়ো হামারঘে সঁত। হ্যাঁগে, এ্যাকটা কাজ করো না।
এ্যা, আমারে কইতাছো? লোকটা একটু চমকে ওঠে।
আর কাথে কহবো এই নিশুত পুরীতে? শুনো। তুমি আর ফির‍্যা না যাইলে উই পোড়ার পাটকলে। এখানে থাক্যা যাও।
বাঃ, তাই নাকি? তা খাইয়ামডা কী?
কেন্যে, ই গুষ্টির আমবাগান দেখতে পেছো না? তুমার ম্যানিজারের বেতুন থাক্যা এট্যার আয় ঢের বেশি বুল্যা দিছি। তাছাড়া কুন সুমুন্দি মানা করতে আসছে গা? গাঁওভর ল্যাংড়া গোপালভোগ ক্ষীরসাপাত ফজলীর সাইর সাইর বাগান। ফলাও না কেনে। বেচ্যা খাও না কেনে।

চাঁদবিবির কথায় সুমুখে ঝুঁকে নাক ঝাড়ে লোকটা। চারদিকের ভাবসাবে খিদেক্লান্তি মাথায় উঠেছিল। মনে মনে মতলব আঁটছিল কেটে পড়ার। কিন্তু হঠাৎ এত বড়ো মালিকানার লোভ পেয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এমনি কার্যকারণসূত্র, বাচ্চুদরোয়ানের শয়তানী হাসিমাখা গোঁপটা ভেসে ওঠে চোখের উপর। একে একে ম্যানেজারের ঠাণ্ডা গলা, কেরানীসাহেবের দাঁতখিচুনি, কয়েকখানা দশটাকার নোট, পঁচুই মদের হাঁড়ি, বয়লারের আওয়াজ, ঘামচটচটে খাটুনি,—খালিশপুরের বৈকালী সিনেমা হলের স্লাইডের মত চোখের উপর দিয়ে দৃশ্যের পরত ভেসে যেতে থাকে। আধবোজা চোখের তলা দিয়ে আরো সব প্রাচীন দৃশ্য উথলে উঠতে লাগে। শৈশবে মা ধরে কী পেটান না পিটত! না খাইয়ে রেখে শাস্তি দিত যেদিন পোষা পাঁঠাটাকে গাঁয়ের ছেলেরা ধরে খোঁয়াড়ে নিয়ে পুরে দিত। মাস্টার বাড়ি থেকে ফ্যান চেয়ে এনে মায়েপোয়ে ভাগ করে সুডুক টানত। জেলফেরৎ বাপ বাড়িতে দুদিন থেকে পালিয়ে গেল। যাবার সময় মা'র রূপোর তাবিজছড়া হাতিয়ে নিল। তখন মা বিড়ি বাঁধা শুরু করল। ও-ও বিড়ি টানতে শিখলো মা'র দ্যাখাদেখি। বিড়ির প্যাক বেঁধে নিয়ে গঞ্জের দোকানে বেচে দিয়ে আসত। ফেরার সময় সমকামী সঙ্গীরা পথের পাশে কালভার্টের নিচেয় অথবা ফাঁকা নৌকোর খোলে ফেলে দশপয়সা করে ওকে ধর্ষণ করত। একদিন কোথা থেকে এক নাগর জুটে গেল। দাড়িয়ালা কারী। ঘরে দোর দিয়ে রাত্তিরে কোরান পড়তো আর মার সাথে কুস্তি লড়তো। ও বাইরের বারান্দায় শুয়ে শুয়ে হাত কামড়াত আর ঠোঁট কামড়াত । একদিন ভোররাতে গাঁয়ের হেলালদ্দির সঙ্গে গুলে এল নারায়ণগনজে জুটমিলে। সেখানে অ্যাপ্রেন্টিশগিরি করতে করতে পুরো লেবার হয়ে গেল। দাংগা লাগার বছর ভাসতে ভাসতে খালিশপুরের জুটমিলে এসে হাজির। আজ পর্যন্ত একটা পয়সা নগদ জমেনি। বৌমতোন একটা এএ্যাদ্দিনে জুটল তো ঘরবাড়িটুকু পড়শি খালুর দখলে। মা আর তার সেই কাবীনাগর আগেই মরে ফৌত। অনেকগুলো দিনমাসবছরের ছবি ভেসে যেতে যেতে আবার বাচ্চুদরোয়ানের পাকধরা লাল গোঁপটা ভ্রূর উপর এসে দুলতে লাগে।

বাহুল্য সময় খরচে চাঁদবিবি চটছিল এতক্ষণ। তিতোবিরক্ত স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে এবারে, মিনস্যার কি মুখে খিল পড়লো নাকি গা? রা নাইখ।
তা অইলে এ্যাটটা বড়ো দেইখ্যা ব্যাফারীর নাও কিনবাম ছিন্তা করতাছি। আম চালান দিবাম হাডে হাডে। আর এ্যটটা রেডু। মাচাঙে বইয়া সারারাইত আম পাহারা দিবাম আর বানেছাপরীর ঘাডুগান শুনবাম।
হিইস্! কালোগাই এ্যাকটা পুষবো হামি হাঁ। পাঁচসের তড়িক দুখ দিব্যে রোজ।
আর ঐ বাঁকের মইধ্যে চরজমিডা না, হেইডায় লাঙল দিবাম আমি।
রথের ম্যালা থাক্যা এ্যাকটা কালো দেখ্যা সেন্ধুক আনাবো হামি। রূপার পাত পরানো।
রাইতকালে শেতলপাডি পাইত্যা ফুলের খ্যাতা বিছায়া শুইবাম। আর এ্যটটা জুম্মাঘর তুলবাম বড়ির পরে।
এ্যাকটা ঝিনাই ঢুঁঢ্যা আনবো প্যাটমোটা। ছ্যালাকে গালে ধর‍্যা বলকতোলা দুধ খাওয়াবো।
ছ্যাইল্যা? জ্বালা! ছ্যাইলাডা কই তোমার?
অয় মাগে! কী শরম এট্যা!
শরমডা কিয়ের? বউই তো তুমি আমার অহন। তোমারে পাইয়াই এ্যাতো বিষয়আশয় অইলো আমার। তো আইজ রাইতে ছাওয়ালই দিবাম তোমারে।

চাঁদবিবির চোপা টিপে দেয় নাগর। বুড়ির সামনে লজ্জা পেয়ে মেয়েটা ঘুরে বসে বিপরীত দিকে।
হয়্যাছে। অখন ঝট কর‍্যা গা ধুয়্যা আইসোগা লদ্দী থাক্যা। হামি আনধার দিক করি।
ব্রিফকেস খুলে লুভি গামছা মেটেসাবান বের করে দেয়। লোকটা গুন গুন করে বানেছাপরীর সুর ভাঁজতে ভাঁজতে নদীতে নাইতে যায়।

যখন ফিরে আসে, বেলা তখন আমগাছের মাথা ছুঁই ছুঁই। চাঁদবিবিতে আর বুড়িতে তখনো কথার পিঠে কথা সেলাই দিয়ে মুছে যাওয়া সময়ের বুনটকর্ম চলছে। খোশমেজাজী নাগর হেসে বলল, বেল তো নাই বিবি। তোমার ছিঁড়াগুড় কিন্তুক অহনো বহাল আছে প্যাডের মইধ্যে। রইয়াসইয়া রানধো। বরঞ্চ রাইতে এ্যাকইচোডে খাইবাম। অহন এটটু ঘুইর‍্যা আইগা।
এই দ্যাখো! কুনঠে আবার?
এই এট্‌টু আশপাশ আর কী। যাইবাম আর আইবাম।
দেরি কইরো না বাপু। সাঁন্দ লাগলে পরে ডর পাবো।
.............

কার্তিকের বিকেল। দেখতে দেখতে হলুদ রঙ ধরে আড়াআড়ি রোদে। পাতারা ঘন হয়ে আসে। সেই পুরনো বুরুজ ছায়াটায়া নিয়ে তখন মস্ত শরীর ধরে সিঁড়ি ছুঁয়ে ফেলেছে।

উঠোনবাড়িঘাট ঝাঁট দিয়ে আগাছাজন্‌ন্জাল সাফসুতরো করতে এত সময় কোথা দিয়ে উড়ে গেল ভেবে পায় না চাঁদবিবি। গা ধুয়ে এসে কাপড় পাল্টে এক সময় থির হয়ে বসে। সত্যিই তো। এ পর্যন্ত একটুখানি একা একা নিজের মনে বসবে সে ফুরসত জোটেনি।

বুড়ি বুঝি আবার ও বারান্দায় শুয়ে ঝিমুতে লেগেছে। চাল বাছতে বাছতে আপন অজান্তে হাত থেমে যায়। তাই তো! মা আমার কী হলোগে তবে? অয় মা!
কুলোর চাল কুলোয় রইল। মানকচুর ডগায় আউলা বাতাস বয়ে গেল। চাঁদবিবির মা-ডাক শুনে আমের গুঁড়ির ফোঁকর থেকে সাবেকি তক্ষক ডেকে ওঠে—
...তোক্কেৎ... কট্‌ট্ কট্ কট্‌ট...তোক্—কেৎ...তো—ক—কেৎ...কেৎ...

বাপের মুখখান মনে নেই। মা বলত, ওটা বাস্তুসাপ। পুরুষ-পুরুষ ধরে এ সংসারে বাস করছে।
মা বলত, তোদের দাদার ছিল শাদা ঘোড়া। শাদা পাগড়ি মাথায় দিয়ে জরির চাবকান পরে মহাল দেখতে যেত। লাফ দিয়ে পিঠে উঠে যখন ঘোড়ায় ছোপাড় কষাত, তখন পুংখিরাজের মত বাতাসের আগে উড়ে চলত।
মা বলতো, লেঠেলরা চরে জাগা জমি দখল করতে যেত আর শড়কির ডগায় মানুষের মুণ্ডু গেঁথে নিয়ে ঘরে ফিরত।
মা বলত, দহলিজে পুঁথি পড়া চলত পাল্লা দিয়ে। নানা আসত দলবল নিয়ে। তার গলার স্বরে এশার আজান ডুবে যেত। লোকে আশমান সিংয়ের ফাঁসি শুনতে শুনতে রাত কাবার করে দিত আর ঘরের মধ্যে বৌঝিরা শয়লাগীত গেয়ে গেয়ে শিয়েইপিঠে কাটত কাঁঠালপিড়ে পেতে।

একটা ঠাণ্ডা ভারি সাপ বহুক্ষণ ধরে ধরে চাঁদবিবির পায়ের পাতার উপর দিয়ে বেয়ে বেয়ে চলেই যেতে থাকে।
চাঁদবিবি বঁটি পেতে নিয়ে পাথর হয়ে ব'সে। দুহাতে মিরগেলের প্যাজ আব মুড়ো। কখন যে বুড়ি এসে সামনের উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে, টের পায়নি। সিঁড়িভর প্রথম ধাপের খাঁজে লাঠি আটকে রেখে কুঁজ উচিয়ে দাঁড়িয়ে। এককৌটো হাসি মেলে দিয়ে বলল, চানদু লা। যাবি?

চাঁদবিবি তাকিয়ে দ্যাখে, বুড়ির ধবধবে শাদা অংগ জ্বলছে।
শাদা চুলে রূপোর ঝিলিক। গলার হাঁসুলিতে শাদা আলো। সারা মুখে ফোকলা হাসির ছটা।
চাঁদবিবি আচ্ছন্ন। ঘনঘোর গলায় বলে, কুনঠে?
বুড়ি আরো একগাল হেসে বলল, তোর মা যেঠে গেলছে।
কুনঠে?
হুই পথবরাবর সিধ্যে। মাঠের নাবাল ছাড়ায়্যা জলা পার হয়্যা হুই ওইঠে।
চাঁদবিবির বুকের তলায় কতকালের শূন্যতা একচোটে ঘুলিয়ে ওঠে। আবেশভরা ধরাগলায় বলে, চল।
বুড়ির ইশারা ধরে চাঁদবিবি নেমে যায় সব ছেড়েছুঁড়ে।

.............

সন্ধে তখনো ঝুঁকে এসে পারেনি সবটা। কার্তিকের পাতলা রোদ আর আগাম শীতের একটুখানি কুয়াশা পশ্চিমে গাছের মাথায় জড়িয়ে। খানিক পরেই রোদটুকু মরে আসবে।

তখন সর্দিবসা গলায় বাহারী চটকার সুর ভেসে আসে। মেলা থেকে রংপুরী চটকা শুনেশিখে ফিরছে বটে নাগর। দুপ্যাকেট চানাচুর একগজ লালফিতে একশিশি তরলআলতা দুটো রঙীন শোলার মালা, এই সব নিয়ে। ব্যাপারীদের চলতি নৌকো ডেকে নদী পেরিয়ে মেলায় গিয়েছিল। সেখানে ব্যবসাদি বিষয়ে শুলুকসন্ধান নিয়ে খোলাদিলে শ্বশুরবাড়ি ফিরছে এখন।

                        সখা হে
                        সাঙাকে মোর পোণ লাগিবেক
                                    ওকি রসিক হে

তার গলা ছাপিয়ে তক্ষক ডেকে ওঠে তীক্ষ্ণ নির্মম।
তক্ষকের গলা ছাপিয়ে নদীর চিৎকার ফেটে পড়ে খাড়ির গায়ে চূর্ণবিচূর্ণ।
নদীর গর্জন ছাপিয়ে আকাশের বাতাস বনে বনে অশান্তি বাধিয়ে তোলে হুলুস্থুলু।
আধকোটা মাছ নিয়ে বঁটি বসে আছে ঘুম মেরে।
সে নেই।

লাল টিস্যুর শাড়ি আধভেজা দশায় তেলাকচু পাতাঢাকা সেই বিশাল বিস্মৃত যুগের বুরুজের উপর সাঁঝের অগ্রিম আঁধার গায়ে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে। মাটির নিচে বুরুজের মূল দেহ চাপা পড়ে আছে। হয়তো কোন পুরনো প্রাসাদট্রাসাদ। চিরতরে ঢাকা।
সে নেই।
বিবি!...... বিবি।....... ছানবিবি ই ই ই.......

তার ডাকের রেশে শব্দহীন নির্জনতা বুঝি সাথি খুঁজে পায়। দিশেহারা হয়ে সে খানিকক্ষণ বারান্দার এধার-ওধার ছুটোছুটি করে। পায়ের ঘায়ে চালের কুলো উঠোনে ছিটকে পড়ে।
চাঁদবিবিকে তো না হলে নয় তার। চরজমি কালোগাই আমের চালানী প্রথম ব্যাটাসন্তান বি—বি—ই।

ঝোপঝাড় আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে খুঁজতে এবারে বাড়ির পেছনদিকটায় চলে আসে। প্রকাণ্ড হাঁ মেলে প্রাচীন কবর। বিকেলের আবছা আলোয় খাঁ খাঁ করছে।

এর চেয়ে, অন্ধকার তাও ভালো ছিল। একটা নয় দুটো নয় তিনটে নয় অনেক অনেক। তাদের লাল মাটি কালো হয়ে গ্যাছে শ্যাওলায়। তবু জীবনের উপর দাবি ছাড়েনি আজো। একটা জ্যান্ত মানুষকে দেখে হা হা করে উঠল সার সার কবর। সেই সুমসাম নৈঃশব্দ্য তার পুরুষানুক্রমিক অন্ধকার নিয়ে ওকে আহ্বান করল। ওর সহ্যক্ষমতাকে আক্রমণ করল।

তরল আলতা নাইলনের লালফিতে চানাচুরের প্যাকেট শোলার রঙীন মালা যা কিছু সওদাব্যাসাতের ভার সুমুখের কবরের মেলে ধরা হাঁয়ের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে পিছু ফিরে ছুট লাগাল এ বাড়ির জামাই।
না। অন্ধকার তখনো সবটা কালো হয়ে পারেনি। আরো কিছু বাকি আছে পুরতে।

ছুটতে ছুটতে আধাঅচেতন মানুষটা একেবারে নদীর তীরে এসে পড়ে। জিভবেরিয়ে ঝুলে পড়েছে। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার পথে। সর্দির ধারা গড়াচ্ছে ঠোঁটথুতনি বেয়ে।

ওপারে মেলা ভেঙে গ্যাছে প্রায়। দুটো একটা আলো জ্বলছে টিম টিম করে। এপারে তীর ঘেঁষে একটা ভারি পানসি দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে দক্ষিণে।
পাড় ধরে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে লোকটা তাড়া খাওয়া মোষের মত ছুটে চলে: ও মাজিবাই, আমারে লইয়া যাও গো। ও মাজিবাই, কতা নি হোনো।
পানসি থেকে হাঁক আসে, কুনঠে যাবা বটেক বাহে?
বাই! ম্যালায় যাইবাম বা'জি। আমি মাইনষের মধ্যে যাইবাম। এট্‌টু দয়া হরো বাই!
হোই সুমুখে তালগাছের গোড়ায় নাইম্যা আইস্যো হে। সাবোধান। হুঁশিয়ার। সোঁত ভারি।

হাতদশেক নিচ খাড়াই। নামতে নামতে হাঁচড়েপাঁচড়ে গড়িয়ে পড়ে। মাঝি ঠা ঠা করে হেসে ওঠে। ও লাফ দিয়ে নৌকোর ডালিতে উঠে পড়ে। মাঝি মেঘের মত গুম গুম করে বলে, ভিত্রি সান্ধিয়া পড়ো বাহে। রাতভোর বাহিতে হবে বটেক।

কী বলে কী লোকটা? মাথাখারাপ নাকি? ও খ্যাপা গলায় জিজ্ঞেস করে, রাইতভোর মানে? কই লইয়া যাওনের মতলব আঁ?
কেনে সমুনদ্রে?
সমুন্দুর মানে?
সমুনদ্রে জী। মোহানার মুখে সেই চরবিনাশকাল দ্বীপে ম্যালা বসবেক লয়? ই কাত্তিকের সারানিতে তো বটেক। ভিতরি ঢুক্যা শুয়্যা পড়োগে।

ছইয়ের ভিতর পানে তাকিয়ে ওর রক্ত হিম হয়ে আসে। শাদা শাদা কাপড়মুড়িদেয়া মানুষ শুয়ে আছে। প্রথমে মনে হয়েছে পাঁচসাতটা। পরে বোঝা যায়, একটার উপর আরেকটা চাপানো অনেকগুলো। ওই তো একজোড়া পা বেরিয়ে আছে। ইস! গোড়ালি থেকে আঙুলের মাথা অবধি লাল তরলআলতা পরানো।

ধসা গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, কেডা? কেডা তুমি? নামাইয়া দ্যাও আমারে। আমারে ছাইড়্যা দ্যাও তোমরা। হুনছো? হুনছোনি?

কে কার কথা শোনে! খরস্রোতে পানসি ছুটে চলে অনধ বেগে। ততক্ষণে অন্ধকার ঘন পোঁচ লেপে দিয়েছে আকাশের নিচেয় নদীতে ও বনজংগলে।
মাঝির দেহখানা সীসের মত দ্যাখা যায় আবছা। মুখের রেখাটেখা সব গাঢ় সনধ্যার কালো কালিতে একাকার হয়ে গ্যাছে।
মা—জি...

বিপন্ন মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদ ছাপিয়ে নদীর জল খলবল খলবল করে হেসে ওঠে। সে হাসির বাড়ি লেগে দুতীরের খাড়ি গাছপালা পৃথিবী শিউরে শিউরে চেয়ে দ্যাখে, আকাশগোলা অন্ধকারে অদৃশ্য পানসির একদলা ঘোলা অন্ধকার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে অন্ধকারের কবর পানে। ·

রাজশাহী, ২২ জুলাই ১৯৭৭


লেখক পরিচিতি : আবুবকর সিদ্দিক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ও কবি। জন্ম বাগেরহাটের গোটাপাড়া গ্রামের মাতুলালয়ে, ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগস্ট। পিতৃনিবাস একই জেলার বৈটপুর গ্রাম। পিতা মতিয়র রহমান পাটোয়ারী ছিলেন সরকারি চাকুরে, আর গৃহিণী মাতার নাম মতিবিবি। পিতার চাকরিসূত্রে ১৯৩৫ থেকে হুগলি শহরে এবং ১৯৪৩ থেকে তিনি বর্ধমানে বসবাস করেন। সাতচল্লিশের দেশভাগের পরের বছর তাঁরা স্বদেশে ফিরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে অর্জন করেন স্নাতক ডিগ্রি। শিক্ষাজীবন শেষ করার পরপরই শুরু হয় তাঁর শিক্ষকতা পেশা। পর্যায়ক্রমে তিনি চাখার ফজলুল হক কলেজ, দৌলতপুর বিএল কলেজ, কুষ্টিয়া কলেজ, বাগেরহাট পিসি কলেজ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এরপর কুইন্স ইউনিভার্সিটি এবং ঢাকার নটর ডেম কলেজে অধ্যাপনারত ছিলেন। ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াত হন। তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে : জলরক্ষস,খরাদাহ, বারুদপোড়া প্রহর, একাত্তরের হৃদভস্ম। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : ভূমিহীন দেশ, চরবিনাশকাল, মরে বাঁচার স্বাধীনতা, কুয়ো থেকে বেরিয়ে, ছায়াপ্রধান অঘ্রান। তাঁর গল্পটি নেওয়া হয়েছে ‍প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘শুদ্ধস্বর’ থেকে প্রকাশিত ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ বই থেকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ