প্রথমমাছি
চশমার চুলকানি ইদানীং বেশি বেড়েছে; সারানোর মতো পয়সা নেই। ডাক্তারের ফিসে চুলা চলে বেশ কদিন। ময়লা আঁচল দিয়ে আরো একবার চশমাটা মুছে নিলো; চশমার চুলকানি কী মুছানিতে থামে! তবু মোছে বারবার; বারবার মুছেও দেখতে পায় একইরকম। মনে মনে বুঝে নেয়, চশমে দোষ হলে চশমারইবা কী দোষ। চশমার ওপর রোষ করেও লাভ নেই, আফসোস করেও লাভ নেই।
পেনশনের যে মোটাত্ব এখন আছে তা দিয়ে চলতে হবে আরো পনের দিন। এক একটা মাস এক একটা বাঘ। প্রত্যেক বাঘের তিরিশটা করে পেট। বর্তমান বাঘটার আরো আস্ত আস্ত পনেরটি পেট আছে।
বারান্দায় সেলাইয়ের কাজ করছিল; কাপড় সেলাইয়ের কাজটা তালাইয়ের ওপর ফেলে সোমরুত বেওয়া ঘরের ভেতর থাকা টিনের ট্রাংকটার কাছে যায়। ট্রাংক ঠিক আছে; তালা, আলতালা ঠিক আছে; কোনো ভাঙাচোরা ঘটেনি; প্রাথমিক একটা স্বস্তিশ্বাস বা শান্তিশ্বাস তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
এসব সন্দেহ বা সাবধানতা হয়ত একসময় বাতির মতো ছিল কিন্তু এখন একেবারে বাতিকের মতো হয়ে গেছে; ট্রাংকের কাছে আসার সময় তার প্রতিবারই মনে হয়—দেখবে, ট্রাংকের আলতালা ভাঙা, তালা ভাঙা বা পুরো ডালাই ভাঙা এবং একটা টাকাও নেই। কিন্তু এমন হবার কোনো কারণই নেই যে, তালা ভেঙে ডালা ভেঙে টাকা নাই হয়ে যাবে।
কিন্তু বাতিকটা এতই গভীর যে অটুট তালা দেখেও তার স্বস্তিশ্বাসের আয়ু খুব বেশিক্ষণ থাকে না। সন্দেহশ্বাস তৈরি হয় তার ভেতরে। সে এখন খুলে দেখতে চায় সব ঠিকঠাক আছে কিনা।
যে আঁচল দিয়ে সে চশমার চুলকানির ওপর ঘষা দেয় সেই আঁচলেই একটা চাবি বাঁধা আছে। তালা খোলে। তালা খোলার সময়ও বুক ধড়ফড় করে; যদি দেখে টাকাগুলো নেই তবে কী হবে, কী উপায় করা যাবে? মাসের খরচপাতি কীভাবে চলবে? এইসব ভাবনাচিন্তা করতে করতে সোমরুত বেওয়া ট্রাংকের ডালা না তুলেই দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
মানুষ তো মোমবাতি পুড়ে পুড়ে শেষ হয়; মানুষ তো দমবাতি; দম শেষ হলেই শেষ; মানুষ তো গমবাতি; গম বা যব বা ধান না হলে বাঁচে না; মানুষ তো যমবাতি; এ বাতি জ্বলে গেলে আর নিভে না কোনোদিন; মাটিতে মিশে যায়; স্মৃতিতে মিশে যায়, বিস্মৃতিতে মিশে যায় শেষে। যদি টাকা না থাকে তো সেও মিশে যাবে স্মৃতিতে; স্মৃতিতে মিশে থাকতে থাকতে শেষে মিশে যাবে বিস্মৃতিতে। বিস্মৃতি এক বিশাল কৃষ্ণগহ্বর; কত শত রাজা আর রাজাই, বাদশাহ আর বাদশাহি, সুলতান আর সুলতানি ডুবে গেছে বিস্মৃতিজলে; ডেবে গেছে বিস্মৃতিবালিতে। বিস্মৃতি মৃত্যুর থেকেও বড়ো। মৃত্যুটা মৃত্যু নয়, বিস্মৃতিটা মৃত্যু; অথবা মৃত্যুটা মৃত্যু এবং বিস্মৃতিটা মহামৃত্যু। তার বুক ফেড়ে একটা দুঃখশ্বাস বেরিয়ে এলো আর নিঃশ্বসিত শ্বাস ঢুকে গেল বাতাসের বুক ফেড়ে।
এ এক অদ্ভুত মানুষীয় ব্যাপার, নানারকম শ্বাস আছে সবতাতেই; সাধারণশ্বাস, মাঝারিশ্বাস, দীর্ঘশ্বাস; যদিও শ্বাসের দৈর্ঘ্য কত সেন্টিমিটার বা কত মিটার হলে তাকে স্বাভাবিকশ্বাস বা দীর্ঘশ্বাস বলা যায় জানা নেই। আরো রকম আছে শ্বাসের; মনের ভেতর কখন কী হয় কে জানে দুঃখশ্বাস পড়ে, সুখশ্বাস পড়ে; স্বস্তিশ্বাস বা অস্বস্তিশ্বাস পড়ে; শান্তিশ্বাস বা অশান্তিশ্বাস পড়ে। কতরকম শ্বাস; গভীরশ্বাস, অগভীরশ্বাস। কতরঙের শ্বাস; স্বর্ণালিশ্বাস, তাম্রাভ শ্বাস, রুপালি শ্বাস। কত স্বাদের শ্বাস, টকশ্বাস, তিতাশ্বাস, নোনাশ্বাস। শ্বাস; শুধু শ্বাস আর শ্বাস; মানুষ শ্বাসচাষী; শ্বাসচাষই তার মূল কাজ। মানুষ শ্বাসবাসী; শ্বাসের ভেতরেই বাস করে। মানুষ শ্বাসাশী; শ্বাস খেয়েই বাঁচে; নিজে নিজের শ্বাস খায়, অন্যের শ্বাসও খায়।
আজ বুক ধড়ফড় করছে অন্যান্যদিনের চেয়ে একটু বেশি। চিন্তার চাপে স্থির থাকতে থাকতেই হঠাৎ এবং তড়িৎ ট্রাংকের ডালা তোলে। এই ট্রাংকে যেসব কাপড়চোপড় আছে তার তিন নম্বর স্তরে সবসময় টাকাগুলো রাখে।
তিন নম্বর স্তরে যেখানে টাকা রাখে সে জায়গাটা দেখে। তিন নম্বর স্তরে চোখ রেখে সে থ বনে যায়। চমকে ওঠাতে নাকের নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে চশমাটা দৌড়েছিল। চঞ্চল গোরুর মতো ছুটে যাওয়া চশমাটাকে দ্রুত ধরে নেয় আর ঠিক করে বসায়। তিন নম্বর স্তরের কাপড়চোপড় সব ঠিক আছে। টাকা নেই। বুকের ভিতর ধড়াস করে ওঠে। পরের স্তর দেখে সোমরুত। যদি ভুলে রেখে থাকে! আর এক স্তর দেখে। না, নেই। হ্যাঁ, নেই।
দ্বিতীয়মমাছি
টাকা দেখতে না পেয়ে, হতাশায়, দুঃখে বিষণ্ন এবং অবসন্ন হয়; বিপন্নবোধ করে। হাঁপাতে হাঁপাতে, যেখানে কাপড় সেলাই করছিল সেখানে গিয়ে বসে সে। কঠোর কাঠরতা তাকে ঘিরে ধরে; কাঠ হয়ে যায় সে। বিষণ্নচিত্তে সোমরুত কত কী ভাবতে থাকে—সামনের দিনগুলো কীভাবে চলবে, কী খাবে!
সে আবার উঠে দাঁড়ায়। ট্রাংকের কাছে যায়; বাইরের বারান্দায় নিয়ে আসে। ট্রাংক খুলে। যদি থাকে। যদি থেকেই যায়। পুরো টিনের ট্রাংকটাকে উলটে ফেলে। কাপড়গুলোকে বন্যের মতো উলোটপালোট করে; কাপড়ের স্তরগুলোকে।
সব স্তর ভেঙে যায়। স্তরের মধ্যে স্তর ঢুকে পড়ে। স্তর হতে স্তর বেরিয়ে যায়। স্তর বিস্তর বেড়ে যায় সংখ্যায়। এবার সে খুঁজে পায়। টাকা আর একটা কাগজ। টাকাগুলো গুণে দেখে। যে পরিমাণ থাকার কথা তার চেয়ে বেশি আছে—অনেক বেশি। যে নোটগুলো থাকার কথা ছিল সেসব নোট নেই। এগুলো গোট নোট, সবই পাঁচশটাকার। সে অবাক।
চশমার চুলকানি মারার জন্য আবার আঁচল দিয়ে কচলায়। কাগজটা পড়ে দেখে। সে বিমূঢ় হয়ে যায়। টাকা এ আর কাগজ এ, কোন স্তরে ছিল বুঝতে পারে না। সে আর তার মেয়ে কোন স্তরে ছিল? সে আর তার মেয়ে আর তার ছেলে আর তাদের বাবা কোন স্তরে ছিল তা বুঝতে পারে না। জীবন আর মৃত্যু কোন স্তরে থাকে তা বুঝতে পারে না। মানুষের বেঁচে থাকা কোন স্তরে থাকে তা বুঝতে পারে না। মানুষের বেঁচে থাকা কোন স্তরে থাকে, তাদের যৌনতা, ক্ষুধা, ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, বাসস্থান কোন স্তরে, কীভাবে থাকে বুঝতে পারে না। কিন্তু কোনো স্তরে থাকেই তো। কোনো স্তরে ছিলই তো। থাকেই তো। থাকবেই তো। এলোমেলো কাপড়ের কাছে বসে থাকতে থাকতে স্তর নির্ণয় করার চেষ্টা করে সোমরুত বেওয়া। নির্ণয় করার চেষ্টা করে কিন্তু নির্ণীত হয় না।
তৃতীয়মমাছি
হ্যাঁ, প্রতিদিনই সে টাকা পরীক্ষা করে; মাসের দিন গুণে দেখে। দিন গুণতে গুণতে মাসের দিনগুলো গুঁজে ফেলে আঙুলের ভাঁজে। প্রতিদিনই টাকা পরীক্ষা করার সময় তার সন্দেহ তৈরি হয়। পরে টাকা পেলে, হিসেব মিলে গেলে মনটা স্বস্তি পায়, সন্দেহ মরে।
তারপরেও বুকের ধড়ফড়ানি একেবারে কমে না। সন্দেহ মরে আবার জীবিত হয়। ভীরুরা মরার আগে বহুবার মরে। সন্দেহ খুব ভীরু, খুব কাপুরুষ; ক্ষণেকেই মরে, ক্ষণেই আবার জীবিত। অথবা, সন্দেহ ডারউইনের মতবাদের যোগ্য উদাহরণ। সন্দেহের ভীরুতাই সন্দেহের শক্তি; সন্দেহ জগতে যোগ্যতম; সন্দেহ নিজেকে চিরকালের জন্য টিকিয়ে রাখতে পারে; রেখেছে। সন্দেহের এই ভীরুত্ব বা সন্দেহের এই ডারউইন প্রীতির জন্যই সোমরুত বারবার এদিকওদিক তাকিয়ে পেনশনের মোটাত্ব পরীক্ষা করে। একবার, দুবার, তিনবার আরো কতবার করে হিসেব মেলায় মনে থাকে না তার নিজেরই।
প্রতিদিনই টাকাগুলো নাড়তে নাড়তে স্বামীর কথা মনে পড়ে। তার স্বামী ডাকবিভাগে কাজ করত; ডাকপিওন। লোকটা কাজে ছিল পাগলাটে। কাজকে খুব ভালোবাসত। চিঠি বিলি করার মধ্যে সে কত যে আনন্দ পেত তা তার কথা বলার ভঙ্গি আর মুখ না দেখলে বোঝা যাবে না। ডাকের কাজ শেষে ফিরত যখন তখন প্রায় সন্ধ্যা। এসে হাতমুখ ধুতে ধুতেই গল্প শুরু করত। কখনো ডাকমুনশির গল্প, কখনো অন্য সহকর্মীদের গল্প। কখনো, কোন মানুষের বেয়ারিং চিঠির ডাকমাশুলের টাকা নিজেই দিয়ে দিয়েছে Ñ প্রেরক প্রাপক দুজনই গরিব—তার গল্প। তবে বেশিরভাগ সময় চিঠি পাবার পর প্রাপকের খুশি বা কান্নার গল্প করত। চিঠি দিতে দিতে সকলের সাথে তার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল; চিঠি পাবার পর অনেকেই ওখানেই চিঠি পড়ে গল্প করত তার সাথে।
একদিন বলছিল—‘যত চিঠি, ততরকম খবর, ততরকম মনের অবস্থা। প্রাপকেরা চিঠি পাওয়ার পর যে আনন্দ পায়, তা দেখে মনে হয় আনন্দটা আমিই দিলাম। বুক ভরে যায়। যখন দুঃখ পায় চিঠি পড়ে, মনে হয় আমিই তাকে দুঃখটা দিলাম। মনটা খারাপ হয়ে যায়।’
ডাকঘর থেকে ফিরে আসার পর স্বামীকে সোমরুত একদিন বলেছিল—‘একটা জীবনবিমা খোলো। এ চাকরি করে ছেলেটাকে, মেয়েটাকে কিছু দিয়ে যেতে পারবে কিনা কে জানে!’
কথাটা শোনার পর সোমরুতের স্বামী বিরক্তিবোধক একটা চিহ্ন এঁকেছিল চোখেমুখে। পরে যখন দেখে তার বউ খুব সরলভাবেই বলেছে কথাটা। তখন সোমরুতের কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল তার ডাকপুরুষ; তার নিজস্ব ডাকপিওন বলেছিল—‘থাক ওসব। সোমরুত বিবি তুমি জান না—জীবনবিমা দেখায় মৃত্যুর লোভ!’
সোমরুত চুপ করে থাকত তার ডাকপুরুষের কথা শুনে; নিজস্ব ডাকপিওনের কথা মেনে।
কিন্তু আজ এই এলোমেলো কাপড়ের মধ্যে থেকে বের হওয়া টাকা, বেশি টাকা, নোট টাকা পাবার পরে তার বুকের ধড়ফড়ানি যায় না; ভেতরকে চুপ করাতে পারে না। সে ঝাপসা চোখে বসে থাকে এলোমেলো কাপড়ের দিকে তাকিয়ে।
সে বারবার মেলানোর চেষ্টা করে কোন স্তরের গর্ভ থেকে এ নোটগুলো বের হয়ে এলো। কোন স্তর থেকে মেয়ের এমন চিঠি বের হয়ে এলো! কোন স্তর থেকে চিঠির বক্তব্য উঠে এলো!
চতুর্থমমাছি
স্বামী মারা যাবার পর থেকে পেনশনের টাকা দিয়ে চলছে। সে যখনই পেনশনের টাকা নাড়ে সে তার স্বামীর অস্তিত্ব অনুভব করে টাকার গায়ে। যখন টাকাগুলো দিয়ে কাপড় কিনে আর গায়ে পরে তখন তার অস্তিত্ব অনুভব করে। যখন টাকাগুলো দিয়ে তার সন্তানেরা বই কিনে আর বইয়ের পড়া আবৃত্তি করে তখন তার অস্তিত্ব অনুভব করে। প্রত্যেকটা খরচপত্রে তার অস্তিত্ব অনুভব করে।
মেয়েটা বড়ো; ছেলেটা ছোটো।
মেয়েটা যখন এইটে আর ছেলেটা যখন সিক্সে তখন ছেলেটা নদীতে সাঁতরাতে গিয়ে সাঁতরাতে সাঁতরাতে কোথায় চলে গেছে। কেউ বলতে পারেনি। তার বন্ধুরা বলতে পারেনি; আরো যারা গোসল করছিল; কাপড় ধোলাই করছিল; মাছ ধরছিল তারাও বলতে পারেনি।
নদীর জল বেড়ে গেছিল তখন খুব। অপরিচিত জল এসে দুকূল ভরে দিয়েছিল। অপরিচিত জলের স্রোতে সে সাঁতার কাটার জন্য গেছিল। অপরিচিত জলের সাঁতার থেকে সে আর ফেরেনি। কিছুদিন পর অপরিচিত জলেরা নদী থেকে চলে যায়, কিন্তু ছেলে ফেরেনি। পুরাতন জল নিয়ে নদীটা এখনো আছে।
এখনো হঠাৎ হঠাৎ কোনো কোনো দিন সোমরুত বেওয়া নদীর ধারে গিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। যদিও নদী তখন থেকে আরও আট-দশ বছরের বেশি বয়স নিয়েছে; বহুবার অতিথি জল এসে এসে চলে গেছে।
এখনো, নদীর দিকে তাকিয়ে ছেলের উদ্দেশ্যে বলে—‘আর কতবছর সাঁতার কাটবি রে! তোর সাঁতরানো শেষ হবে না! আমার কাঁচা সাঁতারু; এবার ফিরে আয় বাবা!’
এখনো, বন্যার সময় ভরা নদীর ধারে গিয়ে চশমার চুলকানি মারে আঁচল দিয়ে; নদীতে আসা নতুন জলদের গালি দেয়, তোরা অতিথি জল না ছেলেধরা জল! তোরা ছেলেধরা জল। আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দে, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস আমার বুকের ধনকে!
হো হো করে জল বয়ে যায়, হি হি করে স্রোত বয়ে যায়, হা হা করে ঢেউ এসে পড়ে পাড়ের বালুর ওপর। আট-দশ বছর আগে খরস্রোতে সাঁতার কাটতে যাওয়া ছেলে ফিরে আসে না।
যারা ঘাটে গোসল করতে যায় তারা সোমরুত বেওয়ার এমন কান্নাকাটি দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারে না। তারা সন্তান হারানো সোমরুতকে সান্ত¦না দিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনে।
আজ টাকার নোট হাতে ধরে, মেয়ের চিঠি হাতে ধরে; এসব ভাবতে ভাবতে সোমরুত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে; বিস্ময়শ্বাস ছাড়ে; মেয়ের প্রতি; জীবনের প্রতি; বসুন্ধরার প্রতি দীর্ঘবিশ্বাস ছাড়ে—সুস্থতার, সুস্থিরতার স্বাদ আর সময় কোনোদিনই পৃথিবীতে নেই। কী জীবন এ খোদা! কখনো পাথারে পড়ে ভেসে যাচ্ছি; কখনো পাথরে মাথা লেগে রক্তাক্ত হচ্ছি।
মেয়ের চিঠি নিয়ে, টাকা নিয়ে আরো গভীরভাবে গম্ভীর হয়ে বসে থাকে সোমরুত।
পঞ্চমমাছি
মেয়েটার বিয়ে দেবার ইচ্ছে ছিল গ্রামেরই কোনো একটা শিক্ষিত ছেলের সাথে; যে ছোটোখাটো একটা চাকুরি করে। অবশ্য মেয়েকেও শিক্ষিতা করবে তাইতো গ্রামের স্কুলে পড়া শেষ করে, কাছের কলেজ পড়া শেষ করে মেয়েকে দূরের শহরে পাঠায় অনার্স পড়ার জন্য।
মেয়েটা সম্মান শ্রেণিতে পড়ছিল আর ছুটির সময় মাঝে মাঝে আসছিল। আজকে সকালে সে চলে গেছে। ছুটিতে এসেছিল। সোমরুত তার বিয়ে কাছের মধ্যে দিতে চেয়েছিল; কারণ, দুভাবে অভাবে পড়ে থাকে সে সবসময়; টাকার অভাব আর মানুষের অভাব। তার কেউ নেই; কেউই থাকছে না তার কাছে; ছেলেমেয়ের বাবা মরে গেল আগেই; ছেলেটা নদীতে সাঁতরাতে গিয়ে সাঁতার কাটা শেষ করল না। মেয়েটাই শুধু। কাছের ভেতরে বিয়ে দিলে হয়ত দম ফুরানোর সময় কাছে পাবে মেয়েটাকে। দুধভাত না হোক খুদভাত খেয়েই শান্তিতে সুখ হবে মেয়ের আর তার। কিন্তু তা হবার নয়। দীর্ঘশ্বাস উৎপন্ন হয় তার হৃদয়ে; হৃদয়ে উৎপন্ন দীর্ঘশ্বাস ফুসফুসের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে—কতদিন কোনো আনন্দ নেই তার; নানন্দজনক আবহ ঘিরে ধরে আছে।
বিষণ্নভাবে নিষণ্ন সোমরুত টাকা হাতে, চিঠি হাতে স্তর মিলায়; স্তর মিলে না। একটা শ্লেষাত্মক নিঃশ্বাস বাইরে হারিয়ে গেল; কিছু শ্লেষ্মাত্মক কাশ-থুথু বাইরে ফেলে এলো। মেয়েটা লিখে দিয়েছে চিঠি। মেয়েটা খুচরা টাকা গোটা করে রেখে চলে গেছে। খুচরা টাকা নিয়ে গেছে রাস্তায় লাগবে এজন্য।
মেয়ে চিঠিতে জানিয়েছে, ‘এক বছর আগেই প্রেম দিয়ে ফেলেছি এক ধনীর স্মার্ট ছেলেকে; তাদের প্রচুর টাকা-পয়সা; বলা যায় ধনদেব। একথাও তো সত্য যে, মানি ইজ হানি। ছেলেটি আমাকে বিয়ে করবে আর সাথে নিয়ে চলে যাবে সুদূর আমেরিকা। আর কোনোদিন তোমার সাথে দেখা হবে কিনা সে নিশ্চয়তা দিতে পারব না। হতেও পারে। না-ও পারে।’
সোমরুত চিঠির এখানে থেমে একমুঠ স্মৃতি রোমন্থন করে নেয়, কোনো একদিন মেয়েকে বলেছিল, হীনম্মন্যতায় ভোগে কেউ; উচ্চম্মন্যতায় ভোগে কেউ কেউ; কিন্তু মধ্যম্মন্যতায় থাকা ভালো। একথা কেন সে তার নরমমতি মেয়েকে বলেছিল তা তার চিন্তাতে ধরতে পারে না; মেয়েকে কখনই তো বেয়াড়া মনে হয়নি; দুর্বাধ্য মনে হয়নি; দুর্বোধ্য মনে হয়নি। তাকে তেমন কোনো বাধানিষেধও দিতে হয়নি, কিছু কিছু সাদানিষেধ দিয়েছিল হয়ত; এই যেমন, সন্ধ্যার পর বাইরে থাকবে না, পড়তে বসবে ঠিকঠাক; সময়নিষ্ঠ হবে; আজেবাজে ছেলেদের সাথে মিশবে না। তারপরেও এসব সাদাবিধি শুধু কথার কথা ছিল; সে সুবোধ শ্রেণির মেয়ে; এমনিতেই এসব মানত।
মেয়ে চিঠিতে জানিয়েছে, ‘আত্মীয়স্বজন কখনই ঠিক বিচার করতে পারে না; ছোটোকে বড়ো করে দেখে কখনো; কখনো দেখতেই পায় না; পায়ে পিষে চলে যায়। আর মা তো মহাআত্মীয়, মহাস্বজন; তার ভুলটাও হয় মহা। গ্রামে বিয়ে করে গ্রামেই থেকে যাবার জন্য আমি না; আমার কাজ আরও বেশি; আরও বড়ো। মায়েরা সন্তানকে কাছছাড়া হতে দিতে চায় না; তারা জন্ম দেবার পর খুশি হয় খুব, যখন শিশু বড়ো হয় তখনও খুশি হয়; কিন্তু যখন আরও বড়ো হয়ে দূরে যেতে চায় তখন মায়ের মন চায় সন্তানটি আবার ছোটো হতে থাকুক; ছোটো হতে হতে আবার তার ভেতর প্রবেশ করে তার কাছেই থাকুক। তারা বোঝে না কত সম্ভাবনা বোনা আছে ভবিষ্যতের বুকে।’
আগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মেয়ে লিখেছে, ‘তুমি মাঝেমাঝেই বলতে, আমার ভেতর নাকি একটা পাখি আছে; হা হা। হ্যাঁ আছে; আমার ভেতর পাখি আছে কিন্তু তুমি যে পাখি আছে ভেবে বলতে সে অহেতুক পাখি নেই; আমার ভেতর যে পাখি আছে সেপাখির পালক খুব গুছানো; আমার ভেতর যে পাখি আছে তা সত্যিকার অর্থেই মানুষপাখি বলতে যা বোঝায় তা-ই; তাতে বুদ্ধির বেগ আছে, প্রয়োজনের যোগ আছে, আনন্দের গুণ আছে।
আমেরিকান কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শিখে এসে দেশের বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতে চাই। তুমি বেঁচে থাকলে দেখতে পাবে, তোমার মেয়ে কত্তবড়ো! মা তুমি ভালো থেকো।’
মেয়ে তাকে ভালো থাকতে বলেছে। সোমরুত ভাবল, চিঠিতে থাকা এসব ভাষা আমি বুঝি না; এসব ভাষা একদিন আমাকেই বুঝে নেবে এই আশাও নেই; অতদিনে আয়ু ফুরাবে।
মনে মনে বিচলিত হয় সোমরুত, কোথাকার কোন লোক তাকে ডেকে নিয়েছে আর সে চলে গেছে তার কাছে; এখন তো তেমন করে আর প্রেম নেই; এখন এক আরেককে শিস দিয়ে ডেকে নিয়ে বিষ ঢেলে দেয়; বিষবাণ মারে। সোমরুত নিজের বিচলিত ব্যাপার নিজের কাছেও প্রকাশ করতে চায় না। মোম পুড়তে গিয়ে গলে যায় কিন্তু কাঠ যতই পুড়ুক গলে গড়িয়ে পড়ে না। সোমরুতও তেমনি নিজেকে কাঠ করে রাখে। একটা কাঠরতা হৃদয়ে মেখে রাখতে চায়; একটা কঠোরতা মুখে মেখে রাখতে চায়।
কাঠরতা ধরে রাখতে পারে না; কাঠ তো ভাবে না কিছুই কিন্তু তার ভেতরে ভাবনা আসে; বিহ্বলা সোমরুত ভাবে, কোন মোহ্বল তার মেয়েকে কোথায় টেনে নিয়ে গেছে!
সোমরুত বেওয়া ওলোটপালোট কাপড়ের কাছে বসে থেকে মেলাতে পারে না, এ চিঠি, এ টাকা কোন স্তর থেকে বের হয়ে এলো। সে এই একদিন আগেও তো ভেবেছিল পৃথিবীতে, দেশে, শহরে, গ্রামে অজস্র মানুষ; মানুষে মানুষে দারুণ সমাবেশ; সমান আবেশের ভেতর রয়েছে ব্যক্তি, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত, অপরিচিত। কিন্তু এটা আসলে কোনো সমাবেশ নয় এটা ব্যক্তির ভিড় শুধু; ভিড়টা যেন জাল একটা; জাল কেটে বেরিয়ে পড়তে চাইছে সবাই।
আঙিনাতে কিছু একটা পড়ার ভোঁতা শব্দ শুনে সোমরুত বেরিয়ে আসে। প্রচন্ড উদ্বেজন আর অস্থিরতা চেপে ধরে আছে তার ভেতরকে। চশমার চুলকানি মেরে দেখার চেষ্টা করে, তার আঙিনাতে কী এসে পড়ল?
ষষ্ঠমমাছি
কাছে গিয়ে দেখতে পায় একটা আমের আঁটি পড়ে আছে। কাকে ফেলে গেল হয়ত। আঁটিতে অল্প অল্প শাঁস লেগে আছে; ওপর থেকে পড়ার ফলে মাটিতেও কিছু কিছু শাঁস লেগে গেছে। আমের আঁটিতে নীলমাছি বসছে। সে গোনার চেষ্টা করে কতগুলো মাছি। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত... গোনাতে ভুল হয়, আবার প্রথম থেকে শুরু করে। আবার ভুল হয়।
এসময় আঙিনাতে এসে হাজির হয় লছমত পাড়ার দেলবর বুড়া। লোকটাকে দেখে সোমরুত বেওয়া অবাক হয়। কত বছর পর এ লোকের সাথে তার দেখা! সে কেন এতবছর পর এলো! সে বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
দেলবর বলে—‘সোমরুত চিনতে পারছ আমাকে? আমি তোমাকে প্রেমের কথা বলেছিলাম। কিন্তু তুমি রাজি হওনি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, কেন তুমি রাজি হওনি। আজকে বা কালকে বা কয়েকদিনের মধ্যে আমি মারা যাব। তাই তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে এলাম।’
সোমরুত চুপ করে আছে চুপগাছের মতো; কথা বলে না। তার ভেতরে থাকা ডালপাতা কাঁপে যেমনভাবে গাছের পাতা কাঁপে বাতাসে। মানুষ তো গাছই। গাছ আর মানুষের ফারাক হলো, গাছের শেকড় থাকে মাটির ভেতর আর মানুষের শেকড় কুণ্ডলী পাকিয়ে লুকিয়ে আছে পেটের ভেতর; যাকে বলে নাড়িভুড়ি; এগুলো যদি পেট থেকে মুক্তি পেয়ে মাটিতে ঢুকে যেতে পারত তাহলে মানুষকে এত দৌড়াদৌড়ি করতে হতো না; ব্যথাও এত পেতে হতো না; গাছ অন্তরে ব্যথা পুষে রাখে না; কারণ, তার শেকড় মাটিতে পোঁতা আছে; গাছের অন্তরে ব্যথা তৈরি হলেই তা শেকড়ের মাধ্যমে মাটিতে মিশিয়ে দেয়; ফুল, ফল, পাতা ঝরিয়ে ঝেড়ে ফেলে। মানুষের ফুসফুস, প্লিহা, হৃদয়, কলিজা, পিত্তথলি, কিডনি এসব তো গাছের পাতা ফুল ফলের মতো। হ্যাঁ, এগুলোই মানুষের পাতা-ফুল-ফল; এসবও মানুষের ভেতরে থাকে ফলে মানুষ তার ব্যথা বেদনা ঝেড়ে ফেলতে পারে না গাছের মতো।
দেলবর আবার বলে—‘এখন তো আমরা রঙিন মাংসের কারাগার থেকে বের হয়ে গেছি; আমাদের দেহে এখন সাদামাটা ঝোলা মাংস। লোভ তো আর নেই কোনো যৌবনসম্পদের; মৌবনসম্পদের।’
সোমরুত কথা বলে না। চুপ করে আছে।
অনেকক্ষণ পার হলে দেলবর ফের অনুরোধ করে—‘বলো তো সোমরুত, কিছু বলো। আমি শুধু তোমার সেইসময়ের মনবনের গাছপালার ফুললতা, পোকামাকড়, ফলপাকড় একটু দেখতে চাই। বলো, কেন সেদিন আমার প্রেমে আসনি!’
সোমরুত বলে—‘এই যে দেখ আমের আঁটি, আমি গোনার চেষ্টা করছি কতগুলো মাছি বসে আছে এ আমের আঁটিতে।’
দেলবরের বয়স সোমরুতের চেয়ে বেশি হলেও তার চোখ বেশ ভালো এখনো।
সে বলে—‘কই, কতমাছি আবার! একটা মাছিই তো বসে আছে আঁটির গায়ে।’
‘জাগো সব সখি, যা গো তোরা যা বন্ধুর সন্ধানে’ গান গেতে গেতে যেতে লাগল দেলবর বুড়া; বের হয়ে গেল বাসা থেকে। এ গানে কী আছে কে জানে। দেলবর একজন দিলদীপ্ত মানুষ তখন থেকেই জানত কিন্তু কেন যেন সে তাকে পছন্দ করেনি। সোমরুতের চোখে জল ঝরে। এ গানের সুর আর কথা তার চোখে জল এনে দিয়েছে? দেলবরের দিলদীপ্তির কথা ভেবে চোখে জল এসেছে? সে কয়েকদিন পর মরে যাবে বলে বলে গেল, এটাকে সত্য ধরে নিয়ে কাঁদছে?
নানাকথা ভাবতে ভাবতে ওখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে। কিছুক্ষণ পর চোখ মুছে সোমরুত বেওয়া ঘরে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ পর ট্রাংকের কাছে যেয়ে ওলোটপালোট কাপড়ের স্তর মেলানোর চেষ্টা করে আবার। আবার আঙিনায় এসে নীলমাছি দেখে। একটা মাছিকে তার বারবার অনেক মাছি মনে হচ্ছে। একটি অনেক মাছি আরও; আরও অনেক মাছি একটি। মাছি ভনভন করছে। মাছিতে মাছিতে নীল। নীলে নীলে কালো। কালোই কালোই অন্ধকার।
তার মনে হলো কালো অর্থাৎ অন্ধকারই জগতের অচল রূপ। সব রূপ এ রূপেই এসে মেশে যেমনভাবে নানারঙের, নানাস্বাদের জল এসে মেশে সমুদ্রে। তার খুব একা লাগে। দেলবরের সাথে আরো কিছুক্ষণ গল্প করলেও হতো। সোমরুতের অনেক একা লাগে; অনেকগুলো একা তাকে ঘিরে। সে চারদিকে তাকায়। চারদিকে অসম্ভব গম্ভীর বাড়ির ভিড়। কোনো মানুষ নেই যেন। সব চুপচাপ।
সপ্তমমাছি
তারপর আরও কয়েকদিন পার হয়ে গেছে সোমরুতের গায়ের রেখার ওপর দিয়ে, ফুসফুসের ওপর দিয়ে, মনের মানচিত্রের ওপর দিয়ে। এ কয়দিনে সে তার ট্রাংক পরীক্ষা করেনি। একটা কথাও হয়নি কারো সাথে। কিন্তু চাপ তো মানুষের জন্য রয়েছে দুরকমের; একটা বাইরের চাপ আরেকটা চাপ হলো নিজের জীবনের চাপ। বাইরের চাপ বাদ দিতে পারা গেলেও নিজের জীবনের চাপ থেকে কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারে না কেউ। খাদ্য খেতে বাধ্য মানুষ; সে খেয়েছে কিন্তু ভালো করে নয়।
বেশিরভাগ কাজ নিলম্বিত রেখেছে; বাধ্যতামূলক কাজগুলো বিলম্বিত লয়ে করেছে; নিস্পৃহায় করেছে। প্রতিদিন আকাশের কপালে সূর্য উঠেছে; সূর্য ঝুলে থেকেছে আকাশের তালুতে; তারপর আকাশের ঢালুতে সূর্য নেমে চলে গেছে কিন্তু তার মনোবিকার ঘটেনি এসবে।
শুধু মেয়ের চলে যাওয়ার ব্যথা মনকে চেপে ধরে থেকেছে। দুশ্চিন্তা হয়েছে, কোন লোকের কোন বর্ণের বর্ণনা মেয়েকে ভুলিয়েছে; কোন ঝর্ণার ঝর্ণনা সে শুনতে চায়; কোন স্বর্ণের স্বর্ণনা তার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে। কোথাকার কোথায় সে চলে গেছে কোন স্বপ্নের বা দুঃস্বপ্নের পথে।
কিন্তু আজ সকালে সে অন্যদিকেও খেয়াল দিয়েছিল সূর্য ওঠার পর থেকেই; মেয়ের জন্য মনে মনে মনকে বলে দিয়েছে, তার মঙ্গল হোক, সে ভালো থাকুক। সোমরুত টবের গাছগুলোর দিকে মায়া নিয়ে তাকিয়েছে। কয়েকদিন থেকে জল ঢালা হয়নি; তরুণতা হারিয়েছে তরুলতা সব; গাছের পাতা ঝরে গেছে; বুড়ি মানুষের হাতের শিরা উপশিরার মতো হয়ে আছে। এবারের বর্ষায় বৃষ্টির ফলন কম হয়েছে; তাপের ফলনই বেশি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, পৃথিবীর বারিমণ্ডল পৃথিবীকে নিয়ে কী ভাবছে কে জানে! শীতের ফলন কেমন হবে কে জানে! অবশ্য শীতের কথা ভেবে কিছুটা উদ্বেজিতও হয়েছে। শীতে বাতের ব্যথা আর হাঁপানি বেড়ে যায় তার।
সোমরুত গাছগুলোর যত্ন নিয়েছে; ঝাঁকড়মাকড় ডাল ছেঁটেছে। ঝারা দিয়ে জল ঢেলেছে টবের গাছে। গাছগুলো খুব খুশি হয়েছে; ছোটো ছোটো পাতা থেকে টুপটুপ করে জল ঝরেছে; খুশিতে কাঁদছিল গাছগুলো।
সে বাড়ির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছে; ফুলঝাড়ু দিয়ে তকতকে করে ঝাড় দিয়েছে ঘরের মেঝে। খ্যাংরা দিয়ে আঙিনা পরিষ্কার করেছে। সূর্য যখন আকাশের তালুতে তখন কাজ শেষ করেছে।
দুপুরে খাবার খাওয়ার পর কিছুক্ষণ শুয়ে থেকেছে তারপর বিকেলে আবার ছাদে উঠেছে। ছাদের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়ে দিয়েছে; কারো সাথে কোনো কথা হয়নি; মনে মনেও কোনো কথা বলতে চাইনি সে।
সূর্য যখন আকাশের ঢালুতে ঢলেছে তখন সে নেমেছে ছাদ থেকে। ছাদ থেকে নামার সময়ই সে ভাবছিল আজ ঘুমাবে; মোটা ঘুম ঘুমাবে; গোটা ঘুম ঘুমাবে। কতকাল থেকে তার জীবনে মোটা ঘুম নেই, গোটা ঘুম নেই। ছোটো ছোটো ঘুমও নয় হয়ত; শুধু একটু ঝিমের মতো।
এখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। একটা মিষ্টি অন্ধকার বয়ে যাচ্ছে; মিষ্টি মিষ্টি তারা উঠেছে আকাশে। ঝিমজমাট গ্রাম। মিষ্টি নিস্তব্ধতা; মিষ্টি নীরবতা। পথেঘাটে লোকজন নেই; মাঝে মাঝে দুএকজন তালকীপায়ী মাতাল হয়ত যাচ্ছে গান গাইতে গাইতে।
মিষ্টি অন্ধকারের ভেতর বসে থাকতে ভালো লাগছে। সে বসে আছে বারান্দায়। একটা ঘরচিতা সাপ যেন চলে গেল আঙিনা দিয়ে; তার পা থেকে শির শিরশির করে উঠল যদিও সে জানে ঘরচিতা সাপ একটুও বিষাক্ত নয়; আক্রমক নয়।
সোমরুত ঘরে ঢুকে আর অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সুইচবোর্ড খুঁজে সুইচ চাপে। খট। বাতি জ্বলেনি। সুইচ ভুল হয়েছে। পাশের সুইচ চাপল। খট। আবার ভুল। আবার খট। খট। খট। এর মধ্যে বাহির থেকে কী যেন শুনল। আনভীরার নাম যেন! তার কানের ওপর, মনের ওপর তার সন্দেহ হয়।
দৃশ্যের মরীচিকা যেমন আছে তেমনভাবে শব্দের মরীচিকাও নেই কি? গন্ধের মরীচিকা? নইলে কেন সময় সময় শুনতে পায় আনভীরার কণ্ঠস্বর; যেন টানা স্বরে পড়েই চলেছে মুখস্থের পড়া। অথচ জানা কথা যে সে বাড়িতেই নেই; এ ঘটনা ঘটেছে বছরের পর বছর। গন্ধমরীচিকা যদি না থাকবে তো কেন কখনো কখনো বেলির গন্ধ পায়; মনে হয় বেলির সুবাস ভেসে আসছে অথচ জানা আছে কয়েক মাইলের ভেতর কোনো বেলিফুল গাছের নামগন্ধও নেই। আনভীরার নামটা শুনতে পেয়েছে মনে হওয়াটা তেমনই শ্রবণ-মরীচিকা নয় কী! সে সুইচ চাপতেই আছে আরও। সমবেত কণ্ঠের আরও শব্দ ভেসে আসছে। সে সুইচ চাপছে খট খট করে; নিজের ঘরের সুইচে এতও ভুল হয় মানুষের!
ভুল সুইচ চাপার অনেকগুলো খটখটের চাপে বাইরে থেকে আসা অনেক কথা মরে গেছে। এবার সে সুইচ চাপা বন্ধ রাখে; সমবেত শব্দ বা শব্দগুচ্ছ শুনতে চায়। আনভীরার নাম এবার ভেসে আসলে যেন শুনতে ভুল না হয়। কানখাড়া করে রাখে।
আনভীরা আসছে নাকি এমন খবর কেউ বা কয়েকজন চিৎকার করে দিচ্ছে। না, এটা শব্দ-মরীচিকা নয়। স্পষ্ট। স্পষ্ট মিষ্ট শব্দ—আনভীরা। তার ভেতরের বৃক্ক, বুক্ক, ফুসফুস সব খুশিতে শিউরে ওঠে; নেচে ওঠে।
নৃত্যরত হৃদয় নিয়ে সে আলো না জ্বালিয়েই হাতড়ে হাতড়ে বাইরে যায়; গেহগামী আনভীরাকে দেখার জন্য বা শব্দদের বা শব্দকারীদের দেখার জন্য। সে মনেপ্রাণে চাইছে, আনভীরা আসছে এ বাক্য সত্য হোক; শব্দমরীচিকা না হোক; শ্রবণমরীচিকা না হোক।
হ্যাঁ, আনভীরার লাশ আসছে। পুলিশ আছে, গ্রামের লোকজন আছে।
এই বসুন্ধরারই মোসারত নামের বিশাল এক ব্যবসায়ীর ফ্ল্যাটে সোমরুত বেওয়ার মেয়ে আনভীরার লাশ পাওয়া গেছে। ·
লেখক পরিচিতি : আনিফ রুবেদ এই সময়ের অগ্রণী গল্পকার। নিয়মিত লিখছেন গল্প, কবিতা উপন্যাস এবং মুক্তগদ্য। ‘মন ও শরীরের গন্ধ’ গল্পগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির জন্য অর্জন করেছেন জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার। বসবাস করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে।


0 মন্তব্যসমূহ