জিটকালা-সা’র ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান স্টোরিজ’ এবং অমর মিত্রের ‘র‍্যাডক্লিফ লাইন’


জিটকালা-সা (১৮৭৬-১৯৩৮) ছিলেন একজন আদিবাসী আমেরিকান লেখক, সংগীতজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, ও রাজনৈতিক কর্মী। তাঁর ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান স্টোরিজ’ বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন নাহার তৃণা। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র। তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘র‍্যাডক্লিফ লাইন’ পাঠক নন্দিত। বই দুটি নিয়ে লিখেছেন রিটন খান

জিকাল-সা’র আমেরিকান ইন্ডিয়ান স্টোরিজ

মিলান কুন্দেরা এক জায়গায় লিখেছিলেন, নস্টালজিয়া হলো এমন এক যন্ত্রণা, যার উৎস ফেরার আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু সেই ফেরা কখনোই সম্পূর্ণ হয় না। কথাটা শুনলে প্রথমে বড় দার্শনিক মনে হয়, কিন্তু একটু থামলে বোঝা যায়, এতে নতুন কিছু নেই। মানুষ আদিকাল থেকেই ফিরতে চেয়েছে। ফিরতে চেয়েছে মায়ের গর্ভে, শৈশবে, গ্রামে, হারানো শহরে, এমনকি এমন এক অতীতে, যা আদৌ কখনো ছিলই না। সাহিত্য এই ফেরার ইচ্ছেটাকেই বারবার ভাষা দেয়। ‘একদা এক দেশে’ বা ‘once upon a time’ বলেই গল্প শুরু হয়, কারণ পাঠক জানে, সে এখন বাস্তবের ভেতরে ঢুকছে না, ঢুকছে এক স্মৃতির ঘরে, যেখানে সবকিছু হয়তো সুন্দর, হয়তো ভাঙা, কিন্তু বর্তমানের মতো নিষ্ঠুর নয়।

এই অর্থে সাহিত্য নিজেই এক ধরনের নস্টালজিক শিল্প। লেখক লিখতে বসে যা হারিয়েছে, পাঠক পড়তে বসে যা পায়নি, দুজনেই মিলে এক কল্পিত ঘরে বসবাস করে। এখানে স্মৃতি আর কল্পনার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা নেই। আমরা যা মনে করি, তা প্রায়ই যা ঘটেছিল তার হুবহু নয়; বরং যা ঘটলে ভালো লাগত, তার কাছাকাছি কিছু। এইখানেই নস্টালজিয়ার রাজনীতি।

নস্টালজিয়া মানে এমন এক বাড়ির জন্য আকুলতা, যা আর নেই, কিংবা আদৌ কখনো ছিলই না। নস্টালজিয়া অতীতকে উদ্ধার করে না, সে অতীতকে নতুন করে বানায়। স্মৃতি, আবেগ, আকাঙ্ক্ষা সব একসাথে মিশে এক ধরনের দ্বৈত চিত্র তৈরি করে। ডাবল এক্সপোজার। একদিকে বাড়ি, অন্যদিকে প্রবাস। একদিকে অতীত, অন্যদিকে বর্তমান। একদিকে স্বপ্ন, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবন। এই দুই ছবির উপর্যুপরি বসানোতেই নস্টালজিয়ার আসল কাজ।

এই আলোকে দেখলে বোঝা যায়, সাহিত্য শুধু স্মৃতির ভাণ্ডার নয়, এটি পরিচয়, অন্তর্ভুক্তি আর হারানোর এক যৌথ অনুশীলন। এখানে অতীত কোনো নির্ভরযোগ্য দলিলের বদলে, আবেগ দিয়ে বাছাই করা এক পুনর্গঠন। এই বাছাইয়ের মধ্যেই ক্ষমতার প্রশ্ন ঢুকে পড়ে।

এইখান থেকে যদি আমরা ঔপনিবেশিক নস্টালজিয়ার কথায় আসি, তাহলে বিষয়টা আর নেহাত সাহিত্যি থাকে না। ঔপনিবেশিক নস্টালজিয়া হলো এক ধরনের স্মৃতির-রাজনীতি, যেখানে উপনিবেশের অতীতকে সাজিয়ে-গুছিয়ে দেখানো হয়। রেললাইন, প্রশাসন, আইন, আধুনিকতা; এই শব্দগুলো সামনে আসে। পেছনে পড়ে থাকে দাসত্ব, লুট, ভূমি দখল, ভাষা ও সংস্কৃতির ধ্বংস। তথাকথিত ‘সভ্যতার মিশন’–এর গল্প বানিয়ে উপনিবেশিক হিংসাকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়।

এই স্মৃতির কাজটা নিরীহ নয়। এর মাধ্যমে আজকের বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া হয়। পাঠ্যবইয়ে, জাদুঘরে, জাতীয় আখ্যানের মধ্যে এই পরিশীলিত অতীত ঢুকে পড়ে। ফলে নতুন প্রজন্ম শেখে, প্রশ্ন করতে নয়, মেনে নিতে। ঔপনিবেশিক নস্টালজিয়া ইতিহাসের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে দেয় না; বরং ভুলে যাওয়াকে শৃঙ্খলা হিসেবে শেখায়।

নতুন বিশ্বের আসল ইতিহাস হলো বিস্মৃতি। এই বিস্মৃতি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিত। উপনিবেশ শুধু জমি দখল করেনি, স্মৃতিও দখল করেছে। ফলে ঔপনিবেশিত মানুষের সামনে দুটো রাস্তা খোলা থাকে। একদিকে সমুদ্রপারের কোনো কল্পিত অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকা, অন্যদিকে ভাষার ভাঙা শব্দে ব্যথাকে উচ্চারণ করা। এই দুই পথই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ ইতিহাস নিজেই খণ্ডিত।

এই ভাঙা ইতিহাসের ভেতর দাঁড়িয়ে Zitkala-Ša–এর American Indian Stories একেবারে অন্যরকম গুরুত্ব পায়। এটি নিছক আত্মজীবনী নয়, এটি স্মৃতির বিরুদ্ধে উপনিবেশিক সহিংসতার দলিল। ইয়াংকটন ডাকোটা সমাজে বড় হওয়া এক মেয়ের চোখ দিয়ে আমরা দেখি, কীভাবে ‘সভ্যতা’ নামের প্রকল্প ধীরে ধীরে ঘর ভাঙে।

এই লেখাগুলোয় নস্টালজিয়া আছে, কিন্তু তা আরামদায়ক নয়। ছোটবেলার গ্রাম, আচার, ভাষা, সম্পর্ক; সবকিছু স্মৃতিতে উজ্জ্বল, অথচ বাস্তবে অপ্রাপ্য। বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতায় এই ব্যবধান প্রকট হয়। ‘The School Days of an Indian Girl’–এ চুল কেটে ফেলার দৃশ্যটা শুধু শারীরিক অপমান ভাবলে ভুল হবে, এটি আত্মার ওপর আঘাত। লম্বা চুল এখানে সৌন্দর্যের চিহ্ন নয়, পরিচয়ের অংশ। সেই চুল কাটা মানে ইতিহাস কাটা। এইখানে নস্টালজিয়া বোঝার চেষ্টা। কেন সেই ঘরে ফেরা আর সম্ভব নয়। জিটকালা-শা জানেন, তাঁর শৈশবের ‘বাড়ি’ আর আগের মতো নেই। তাই তাঁর নস্টালজিয়া পুনরুদ্ধারের দাবি করে না, সাক্ষ্যের দাবি করে।

“The Trial Path”–এর মতো গল্পে তিনি এক বিকল্প ন্যায়বোধের ছবি আঁকেন। আদিবাসী সমাজের বিচার, পরামর্শ, সমষ্টিগত দায়িত্ব; সবকিছুই এখানে স্মৃতির আলোয় দেখা। এটি কল্পনা, কিন্তু এই কল্পনাই প্রতিরোধ। কারণ বাস্তব আইন ও শিক্ষাব্যবস্থা তাঁকে যে ন্যায় দিয়েছে, তা ছিল অপমান আর নিশ্চুপ থাকার পাঠ।

এই লেখাগুলোতে নস্টালজিয়া নিছক শোক না হয়ে, হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক ভঙ্গি। অতীতকে মনে রাখা এখানে বর্তমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর উপায়। জিটকালা-শা অতীতকে আদর্শ মনে করেন না, কিন্তু তা অস্বীকারও করেন না। তিনি জানেন, স্মৃতি না থাকলে পরিচয় থাকে না।

এই অর্থে American Indian Stories দেখায়, কীভাবে নস্টালজিয়া ঔপনিবেশিক বিস্মৃতির বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। এখানে ফেরার আকাঙ্ক্ষা নেই, আছে স্মরণ করার দায়। এই স্মরণ কোনো বিলাস নয়; এটি টিকে থাকার শর্ত। নস্টালজিয়া এখানে ইতিহাসের সঙ্গে নৈতিক বোঝাপড়া।

সাহিত্য যখন এই কাজটা করে, তখন সেটি আর শুধু গল্প থাকে না। সে সাক্ষ্য হয়ে ওঠে। আর এই সাক্ষ্যের মধ্যেই নস্টালজিয়া তার সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় রূপটা পায়।

Zitkala-Ša–এর American Indian Stories বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন আমাদের সময়ের খ্যাতনামা অনুবাদক নাহার তৃণা। বইটি লা-লিনা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিতব্য।


অমর মিত্রের র‍্যাডক্লিফ লাইন

এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হয়, দেশভাগ যদি কোনও দিন পিএইচডি করত, তার থিসিস সুপারভাইজার হতেন অমর মিত্র। হ্যাঁ, ঠিক সেই অমর মিত্র, যিনি ছিটমহলের গালভরা বেদনা দিয়ে পাঠককে টানেন, আবার যিনি জানেন, গানের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক কিছু বোধহয় বাংলায় আর নেই। 'র‍্যাডক্লিফ লাইন' উপন্যাসে তিনি ইতিহাসকে রেফ্রিজারেটরের ঠান্ডা শবদেহ বানিয়ে রাখেননি, উলটে তার শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে খাড়া করে দাঁড় করিয়েছেন, সাথে জিন্নার বিলেতি ইংরেজিতে গান না-শোনার জেহাদ দিয়ে।

ঘটনা শুরু হয় এক সভায়, মুসলিম লিগের প্রাদেশিক কাউন্সিলে, যেখানে বাংলার হেলে চাষারা আব্বাস উদ্দীনের গান শোনার লোভে মিটিংয়ে এসেছে—কায়েদ-ই-আজমের বাণী শোনার আশায় নয়। গান হবে না, জিন্না বললেন, কারণ গান অনৈতিহাসিক, গান অবাঞ্ছিত, গান হলো আবেগ, আর এখানে তো ধর্ম আছে, আদর্শ আছে, ভাগের ম্যাপ আছে! কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত চিরকালীন ইতিহাসের যেটুকু সাউন্ডট্র্যাক ছিল, সেটাকেই চেপে ধরল। হাজার হাজার লোক গর্জে উঠল, ‘আব্বাস উদ্দীনের গান আগে চাই!’

এই অংশটুকুতে যেন অদ্ভুত একটা প্রাক-স্মৃতি তৈরি হয়—যেটা আসবে ১৯৭১-এ। ধর্মে ভাগ করা দেশকে ছিঁড়ে বাঙালি নিজের গান দিয়ে বলে, ‘না, আমরাও আছি। আমরা শুধু হেলে চাষা নই, আমরা ইতিহাসকেও গান দিয়ে নাচাতে জানি।’

তারপর গল্প এগোয় আঁখি মঞ্জিলের দিকে। ঠিক যেন কোনও বংশীবাদক সেখানে বসে পুরনো বেহালার তার টানছেন। এই মঞ্জিল আসলে এক প্রতীক—পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার জমি-আত্মার অদলবদলের প্রতীক, যেখানে এক মুসলমান পরিবারের জায়গা এক হিন্দু পরিবার নিয়ে নিয়েছে বিনিময়ে, কিন্তু স্মৃতি বিনিময় হয়নি। জমি চলে যায়, কিন্তু পুকুরের মধ্যে ডুবে যাওয়া মেয়ের কান্না, চম্পাকলির খেয়াল, কিংবা “গাড়িয়াল ভাই”-এর প্রতিধ্বনি থেকে যায়।

উপন্যাসের শেষভাগে এসে সেই আঁখিমঞ্জিল ধসে পড়ে—প্রোমোটারের ‘নিরামিষ আবাসনে’র চাপ সইতে না পেরে। এটা শুধু একটি বাড়ির ভাঙন নয়, বরং একটি চিন্তার—যেখানে গণপিটুনি বাস্তব, যেখানে বনবিবি নাম বদলে বনদেবী হয়ে যায়—কারণ মুসলমানদের প্রবেশ নিষেধ। হ্যাঁ, এই যে সংখ্যালঘুদের মুছে ফেলার ঠাণ্ডা কৌশল, সেটাই তো আসল ‘মাস্টারপ্ল্যান’।

আরেক দিকে আছে রব-মুসলিম লিগপন্থী, প্রেতাত্মার মতো ঘোরে। আঁখিতারা, যাকে খুন করা হয়েছিল সম্পত্তির লোভে, সে ফিরে আসে উপন্যাসের ছায়ার মধ্যে। যেন মৃত মেয়েটিই সাক্ষী থেকে যায় উপমহাদেশের ক্ষমতা আর হিংসার তামাশার। ‘জমি ফেরত দিতে হলে স্মৃতি কোথায় রাখব?’—এই প্রশ্নই যেন শেষতক পাঠকের দিকে তাকিয়ে থাকে।

বিমল চন্দ্র এই উপন্যাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী চরিত্র। প্রোমোটারের থাবায় পড়া এক ক্ষয়িষ্ণু কলকাতার প্রতীক তিনি। প্রাক্তন সহ-সম্পাদক, যিনি জানেন মিথ্যা রিভিউ কীভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করে। তিনি প্রতিবাদ করেন, পত্রিকা ছেড়ে দেন, নিজের সংগ্রহে রাখা বই আর স্মৃতি আঁকড়ে থাকেন। তাঁর প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় নগরায়নের বিরুদ্ধে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার বিরুদ্ধে, এমনকি সাহিত্যজগতের মেকি শুদ্ধতার বিরুদ্ধেও।

উপন্যাসে ইতিহাস আর কুহক বাস্তব মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য বয়ান। এখানে যেমন জিন্নার নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে গান গাওয়া হয়, তেমনি কোভিডকালে নির্বোধ প্রোমোটাররা নিরামিষ আবাসনের ভেতর করোনাদেবীর উপাসনা করে। বনবিবি হয়ে ওঠেন সুপ্রতিষ্ঠিত এনআরআই সুচরিতার গৃহপরিচারিকা—নাম পাল্টে হলেও বেঁচে থাকা একটি অন্যসত্তার প্রতীক। ভাঙনের পর গড়ে ওঠা সেই "রিভার ভিউ" টাওয়ার ফেটে যায় মাঝরাতে—আবার এক প্রতীক, আধুনিক ভারতের চূড়ান্ত ভ্রান্তির।

এই উপন্যাসের গঠনশৈলী, বিস্তৃত সময়সীমা ও চরিত্রের গভীরতা রীতিমতো বিস্ময়কর। প্রায় এক শতাব্দীর ঘটনাপ্রবাহকে অমর মিত্র এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন যে পাঠক অনুভব করেন ইতিহাস তাঁদের ব্যক্তিগত আখ্যান। প্রতিটি চরিত্র যেন নিজেই একেকটি রাষ্ট্র—কখনও নির্যাতিত, কখনও অত্যাচারী, কখনও ইতিহাসের ভুলের সাক্ষ্যবহনকারী।

অনেকেই গম্ভীর কথাকে ঠাস করে চৌখুপি বসাতে পারেন, অমর মিত্র তা করেন গানে, স্মৃতিতে, এবং ভূগোলে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, এটা ‘দেশভাগ’ নিয়ে লেখা—কিন্তু না, এটা ‘মানুষভাগ’ নিয়ে লেখা।

এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হয়, সিরিল র‍্যাডক্লিফ না হয়ে যদি আব্বাস উদ্দীন দেশের সীমারেখা আঁকতেন, তাহলে মানচিত্রের কোণায় লেখা থাকত—‘ও গাড়িয়াল ভাই...’

আর জিন্না সাহেবের বরফঠান্ডা গলায় ভেসে আসত ‘নো সং। আই সে, নো সং।’ তবে ইতিহাস তো জানে, গানই শেষমেশ গলা ফাটায়। ·

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ