চৈত্রের মধ্যাহ্ন। রোদ ছিল গলানো সোনা, মেঝে বাঁচাতে না পেরে ঝলসে উঠছে। বাসস্ট্যান্ডের ঢালু মেঝেতে গরমের বাষ্প উঠছে, আর গলিতে হেঁটে যায় অদৃশ্য কোনো পুরোনো শোকের গন্ধ—পচা লেবুর খোসা, পুরোনো তেলের দাগ, এবং টঙঘরের ভাজাভুজির কড়কড়া ধোঁয়া। ওই টঙঘরটাকে লোকেরা ছোট করে বলে ‘ছাপ্পা টঙ’। টঙটার সামনে এক কাঁটায় ভরা বেঞ্চ, বেঞ্চের নিচে কাগজপত্রের গুচ্ছ, বেঞ্চের ওপরে নীল-বাদামি কৌতুক-বিতর্ক, আর সারিতে—দেবোত্তর নির্যাসে ভিজে থাকা বিক্ষুব্ধ মানুষ।
বাছাড়ে গাছটা স্থানীয়ভাবে 'ম্যালেরিয়া' নামে পরিচিত। তার ছায়ায় অন্ধ ভিখেরীরা গুটিকয়েক করে মিলেছে। তারা কাঁধ গুঁজে বসে আছে। কথায় কম, চোখে বড় বিষাদ। তারা সভা করেছে, যার কোনো সভাসূচি, কোনো ঠিকানা নেই; তবু বৈঠকের মতো লাগে যেন। অন্ধেরা যখন একসাথে হয়, তাদের কথা হয় অন্ধকারেরই ভাষায়—নিঃশব্দে বেশি, আভাসে বেশি। আমাদের কলেজপড়ুয়া কথক (আমার মতোই কিছুটা অহং, প্রায়শই প্রত্যক্ষকথ্যগহ্বরী) বারবার বলত, ‘তোমরা চোখের দিকে এসে বসো, চোখ তাদের নেই, কিন্তু চোখেরও বেশি তারা দেখেছে।’
এই বাসস্ট্যান্ডটা ছিল যেন শহরের নাভি—সব পথে গন্ধ, সব পথে জোয়ারের আভাস। সেখানে, টঙঘরের কোণায়, কেরামত অপেক্ষা করছিল। সে জন্মান্ধ, কিন্তু কণ্ঠে মাতাল। সেই অপেক্ষা এমনভাবে নয় যে কেউ তাকে দেখতে পাবে, বরং সে আছড়ে পড়া একজন যোদ্ধার মতো অপেক্ষায় ছিল, যার হাতে ধরা ছিল আশা আর বিষয়ের গুচ্ছ। কয়েকটা পকেটঘড়ির মতো ধীরে ধীরে তার শ্বাস চলছিল। প্রতিটি শ্বাসেই বুকে এক ছোটো শব্দ। সেই শব্দ শুনলে বোঝা যায়, মানুষ না হলে সে কতটা মানুষ।
শেফালি এলো। তার গায়ে ভেজা পারফিউমের গন্ধ ছিল। গন্ধটা এমন সরল যে কেরামতের নাসিকা-শিরায় পৌঁছে গেল। সে যেন গন্ধের একটু জাহাজে নৌকা বেয়ে ভেসে এলো। শেফালির কথাবার্তায় ছিল মৃত্তিকার এক সরলতা। কথাগুলো শুনতে মিষ্টি না, বরং হঠাৎ কাঁপিয়ে দেয়। তার চোখে ঠিক দেখতো না, তার দৃষ্টির কাছে কোনো আলোর কদর নেই, তবু সে দেখত মানুষের কাছে সঞ্চিত সম্ভাব্যতাকে। সেদিন কেরামতের পাশে এসে দাঁড়াতেই কেরামত বুঝে গেল তার জীবনটা হঠাৎ করে ভারী হয়ে উঠেছে।
গোলাপ মিঞাও এসেছে। তার হাঁটা ধীর, হাতে এক টুকরো মোড়ানো, যেন সংসারের শেষ জমি। গোলাপ মিঞার কণ্ঠে একটা খসে পড়া পুরুষত্বের শব্দ, কণ্ঠে মানুষের শেষ হাসি, জীবন-সংগ্রামের কলুষ। সে অন্ধ হওয়ার আগের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে। তার পুরোনো ট্যাক্সি, শোবার ঘর, স্ত্রী—সবকিছু ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজ তার হাতে অনড় এক ব্যথা।
আর আমরা ছাত্ররা নির্ধারিত দর্শক হিসেবে উপস্থিত। আমরা আমাদের জানি। আমরা চৌকস, আমরা বুদ্ধিমান, আমরা যে কোনো বিষয়ে, যে কোনো ব্যাপারে তড়িঘড়ি পূর্বাভাস করতে পারি। তারপরও আজ আমরা আঁচ করতে পারিনি। ঘটনার সঙ্গে আমাদের প্রথম মিলনে চোখ থেমে গেল। দ্বিতীয় মিলন ছিল কপালে হাত দেওয়া—‘এটা কি ঘটলো?’ এবং তৃতীয় ছিল সেই হঠাৎ শিকড়ভাঙা টান—কেউ ছুরি মারল।
কেউ জানে না আগে কী হল। কেবল শুনতে পাওয়া যায় শেফালির চিৎকার, কেরামতের গর্জন, গোলাপ মিঞার মুচকি কাবু : ‘হেই—কী করছস?’—এরকম শব্দ। তারপর ধীর-ধীরে রক্ত পড়তে শুরু করে। চারপাশে থাকা সবকিছু থেমে যায়, কেবল রক্তের লালই গাঢ় হয়, বৃষ্টি-অপেক্ষার মতো। কেরামত ছুরি বসাল গোলাপ মিঞার বুকের বাম দিকে—ঠিক সেখানে, যেখানে পুরুষের সব হাহাকার লুকায় : গর্ব, লজ্জা, বিব্রত, আর অযোগ্য এক আশা।
ঘটনাটা মুহূর্তেই ঘটল। দর্শকের চোখ গেঁথে রইল, কপালে হাত পড়ল। কেউ চেঁচালো, কেউ গলা কাঁপালো, কেউ কর্মটাকে চিহ্নিত করার মতো শব্দও ধরল না। কী ঘটল, কেন ঘটল—সব প্রশ্নগুলো হাওয়ায় ভাসতে লাগল।
কথক-ছাত্রটা—আমরা—শুধু চেয়ে রইলাম। তারপর তার মুখ খুলল, জবানবন্দি করল, কিন্তু তা কোনো আবেগ-ভিত্তিক মহীমা নয়, বরং এক দীর্ঘ দিনের জমে থাকা চিন্তার প্রবাহ। সে বলল, ‘এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা পুরনো অপচিন্তার ফসল।’
এভাবে চৈত্রের দুপুরে, গরমে ভেজা রাস্তায়, আমাদের যুবক ছাত্ররা প্রথম বার বুঝল কথাটি যে মোটেই কল্পনা নয়, এখানে হৃদয়ে প্রচণ্ড তীব্রতার একটা আগুন জ্বলে উঠেছে। এই আগুনকে কেউ আটকাতে পারেনি।
অধ্যায় ২ : গন্ধ, কথা, আসমুদ্রের সুর
কেরামত ও শেফালির কথোপকথন শুরুটা ছিল শিশুসুলভ—গন্ধে, সুরে, হাসিতে। কিন্তু কথা বলার ভঙ্গিটা ছিল এমন একাকার, যেন পুরোনো বইয়ের পাতায় কবিতার আভাস ঝুলে আছে। কেরামত বলেছে, ‘তোর গন্ধে আমি ভাইস্যা যাই শেফালি। তোর হাসিতে পাগল হই, রাইত কাটে নির্ঘুম।’
শেফালি—হালকাস্বাস্থ্য, চোখ ধারালো—হেসে বলে, ‘তুমি ক্যামনে এত ভালো কইরা কতা কও? তুমি নায়েক, আমি তোমার অপু। তুমি আমারে বিয়া করবা নাকি?’
এই কথাগুলো কেবল মিষ্টি নয়, এগুলোতে আছে এক রকম অস্তিত্ব-ব্যাখ্যা—একটা দরিদ্র মানুষের স্বপ্নের ভাষা। কেরামত প্রতিটি বাক্য দিয়ে একে মানুষের মতো গড়ে তোলে—কথার ভেতর ছোবল থাকে, ছোবলে বসে আছে প্রেমের ধ্বনি। প্রেম নয় শুধু, প্রতিজ্ঞাও আছে। প্রতিজ্ঞায় বিষাদ আছে, প্রতিজ্ঞায় লজ্জা আছে।
শেফালির সঙ্গে গোলাপ মিঞার প্রথম মিটিং ছিল অন্যরকম। গোলাপ মিঞা বলছিল তার ক্ষত, তার শোক, তার কাজের শেষ কথা। সে বলছিল, ‘আমি অন্ধ হওয়ার আগে ট্যাক্সি চালাইতাম। ওরা আমারে ছেড়ে দিল। আমার বাপ-দাদার বাড়ি আছিল। বাপের আছিল মদের নেশা, দাদা খেলত জুয়া। এইসবে সব শেষ হইয়া গেল।’ শেফালির কণ্ঠে ছিল এক সামান্য করুণা। কিন্তু করুণার ভেতরেও ছিল আত্মসুরক্ষা। সে বলল, ‘তুমি আমায় ভালবাসবা? আমি তোমারে সংসার দিমু।’
এই তিন দিকের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে গেঁথে ওঠে—প্রেম, প্রতিশ্রুতি, কখনো ঝামেলা—একটা ত্রিভূজ কাহিনি তৈরি হলো। আমরা—কথক-ছাত্ররা—এই ত্রিভূজ জটিলতাকে উপভোগ করছি, বিশ্লেষণ করছি। প্রায়ই মনে করি আমরা এক ধরণের তত্ত্ববিদ; কিন্তু বুঝতে পারছি না, প্রতিটি ছোটো শব্দের ভেতর থেকে একটা বড় গোপন স্রোত জন্ম নিচ্ছে। স্রোতটি দ্রুত, কিন্তু অদৃশ্য।
শেফালির পেছনে ছিল মাতাব্বর চাচা—এক চতুর মাঝবয়স্ক মানুষ। তার হাতে ছিল খবরের খুঁটিনাটি, কাকে লোভ দেখানো যাবে, এবং কখন দরকার হলে কোন মুদ্রা তুলে দেওয়া হবে—এসব ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কৌশল ছিল তার অস্ত্র। সে এক ধরনের মধ্যস্থতাঘটিত ষড়যন্ত্রকার। তার হাসি ছিল পানির মতো—পরিশ্রুত, কিন্তু ভিজিয়ে দিলে খাঁচ খুঁচ হয়ে যায়।
কেরামত বুঝতে পারছিল শেফালির চোখের অগোচর কিছু আছে, কিন্তু তার ভালোবাসা ছিল তীব্র। সে বলল, ‘তুই আমারে বিয়া কর্, আমরা দুজনে ভিক্ষার টাকায় সংসার চালামু।’ শেফালি হেসে বলল, ‘আমি তোরে বিয়া করমু, যদি তুই ডেরা ঠিক করে নিতে পারস।’ এই কথাবার্তা মহাজনীয় অভিনয়ের মতো, যেখানে প্রেম নির্ভর করে বাস্তবের টিস্যুতে।
কিন্তু গোলাপ মিঞা—তার কথা ভিন্ন। সে বলল, ‘আমি তো জন্ম থেইকা অন্ধ না। আমি চোখ হারাইছি। আমার বউ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, আমায় ছাইড়া দিতে চায়।’ গোলাপ মিঞার কণ্ঠে হতাশার প্রকাশ থাকলেও ছিল এক ধরণের দৃঢ়তা। একজন পুরুষ যে নিজের পুরানো মর্যাদাকে ফিরে পেতে চায়, সেই আকুলতা। কিন্তু শেফালির কাছে গোলাপ মিঞা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিদ্বন্দ্বী; শেফালির কাছে গোলাপ মিঞা ছিল হাহাকার, একই সময়ে তার কাছে ছিল একটা উপহাস। এই উপহাস নিতান্তই তীব্র।
তাদের কথোপকথনগুলো হঠাৎই একটি নাটকীয় বাঁকে ঢুকে পড়ে—ছোট ছোট প্রসঙ্গ থেকে বড়ো একটা ষড়যন্ত্রের সূচক মেলে। মাতাব্বর চাচা কানে কানে বলে, ‘আমরা পিচ্ছিল কথায় কান দিমু ক্যা, কেরামতরে বসাইয়া দিমু না।’ গোলাপ মিঞা আর শেফালির মধ্যে যে বার্তাবহতা আদান প্রদান দেওয়া হয়, তাতে একটা নীরব লেনদেন থাকে—কখনো নোট, কখনো কোনো সুবিধার কথা, কখনো কোনো গোপন প্রতিশ্রুতি।
এই সর্বক্ষণের মধ্যে কেরামতের মনের ভেতর অচেতন একটি ক্ষত গাঢ় হতে থাকে—প্রেমে আঘাত, প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অতল কটুভাষ্য, এবং শেষমেষ—অস্তিত্বের অবমাননা। সে দেখতে পায় যে শেফালি বদলে গেছে, শেফালি এখন গোলাপ মিঞার অভিশাপে ভর করে। কেরামতের চোখতে নয়, তার অন্তরের অন্ধকারে, কিন্তু সে অনুভব করে—অবধারিত, গলিত, আর বেদনার।
এখানেই গল্পের উত্তেজনা ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। কোনো মানুষ যদি বোঝে যে তার ভালোবাসার মূল্য কমে গেছে, সে কি চুপ থাকতে পারে? কেরামত, জন্মান্ধ হলেও, প্রেমের আভাসে পুড়ে যাচ্ছে। প্রেম ভাঙলে যন্ত্রণা বিকশিত হয়, এবং যন্ত্রণা কখনো কখনো রক্তের মতো, যাতে বেরিয়ে আসে পরিস্কার, তীক্ষ্ণ, অপ্রত্যাশিত।
অধ্যায় ৩ : মাতাব্বর চাচা, কুদ্দুস, এবং ভাঙা ভবিষ্যত
মাতাব্বর চাচা গল্পে আসেন এক ধরণের নীরব প্রভাবশালী হিসেবে। তার মুখে কথা মিশে আছে বাণিজ্যের গন্ধ। কাজেই সবকিছুই তার কাছে ‘লেনদেন।’ প্রেম, মানুষ, শ্রদ্ধা—সবই একটা মূল্য তালিকা। সে কেবল তথ্য নয়, পরিস্থিতি বিকশিত করার মতো 'ঘাঁটি' রচনা করে। তার হাত আছে—কখনো টাকায়, কখনো গোপন উত্তেজনায়, কখনো এক চকলেটে সবকিছু কিনে ফেলার ক্ষমতা।
কুদ্দুস স্থানীয় রাইসমিলের ম্যানেজারের ছেলে। এক ধরণের আধা-শহুরে বলিষ্ঠ তরুণ। তার কপালে শ্রমিক শ্রেণির দাগ, তার হাতে ক্ষমতাহীনতাজনিত নৈরাজ্য। সে দেখতে নৈতিকতায় এক গোঁড়া নাবালক। তবু তার মাঝে লুকিয়ে আছে ‘খাওয়া-দাওয়া’ দৌড়—কিভাবে স্বচ্ছন্দে জীবিকা কাটানো যায় সেই ভাবনা। কুদ্দুস আর মাতাব্বর চাচার আগ্রহের মিল হলো—তারা দুইজনেই শেফালি ও গোলাপ মিঞাকে ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব সুবিধা অর্জন করতে চায়।
একদিন সকালে কলেজে যাওয়ার পথে কথক দেখে যে শেফালি মাতাব্বর চাচার সঙ্গে আলাপ করছে। সে লুকিয়ে শোনে—শেফালি জিজ্ঞেস করছে, ‘এইডা কি হইতাছে?’ মাতাব্বর চাচা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ‘তোর কাহিনি জানতাছি না? জানতাছি তো। শোন্ শেফালি, কেরামতের একটা গোপন বিষয় আছে, যেইটা তোর চিন্তার বদল ঘটাইবে।’ শেফালি প্রশ্ন করে, ‘কী গোপন?’ মাতাব্বর চাচা বলে, ‘এখানে এক পুরুষালি সমস্যার নাম আছে।’
এরপর ঘটে অদ্ভুত ঘটনা। গোলাপ মিঞাকে দেখা যায় মাতাব্বর চাচার আসে পাশে। তারা দুজন ফিসফিস করে কথা বলে। কথক দেখল গোলাপ মিঞা মুচকি হাসছে, হাতে কিছু দিচ্ছে। কোনো কাগজ, না কি কয়েকটা নোট। কথক দেখে না পুরোটা, তবু সে দেখে যে গোলাপ মিঞার চোখের মধ্যে এক ধরণের শান্তি ফিরে এসেছে। এই শান্তি যেন বিক্রয়ের মতো, কেনার মতো, একটি আর্থিক বিনিময়।
শেফালির চরিত্র এখানে বদলে যেতে শুরু করে। তার চুলায় এক নতুন কাড়া পড়ে। সে কেরামতকে আর চোখে রাখে না, সে এখন গোলাপ মিঞার সঙ্গে অধিকতর সময় কাটায়। কেরামত এই পরিবর্তন দেখে ধীরে ধীরে আহত হয়, হৃদয়ে জন্মায় এক ঘোর। সে জানে না কীভাবে এই ঘোরকে শব্দে ভাঙবে।
এখানে গল্পের তন্তু মজবুত হয় : মাতাব্বর চাচা, কুদ্দুস, গোলাপ মিঞা, শেফালি—এরা সবাই জড়িয়ে পড়ছে এক অচেনা জালে। আর কেরামত—জন্মান্ধ, কেবল প্রেম তার দিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে, সে কোনো কৌশল জানে না, সে জানে শুধু কষ্ট। কিন্তু কষ্ট যখন বারবার ধারে ধারে এসে শরীরের থেকে বেরিয়ে পড়ে, সে তখন আর মানবীয়তা ধরে রাখতে পারে না।
এই অধ্যায়ের শেষ অংশে কথক বলে, ‘আমি জানতাম কিছু হবে, কিন্তু ছুরি—এসেই বুকে ঢুকবে—এইটা ভাবিনি।’
অধ্যায় ৪ : শীতল সূত্র—ষড়যন্ত্র ও টকটকে লেনদেন
মাতাব্বর চাচা হাসেন। হাসি তার কাছে চুক্তি। হাসি দিয়ে সে কোনো প্রকল্প সম্পন্ন করত, কোনো ভালোবাসা বিক্রি করত। হাসি তার ট্রেডমার্ক। আফটারনুনের অর্ধেক, যখন রোদ খানিকটা নরম হয়, আমি তাকে টঙঘরের পাশেই দেখলাম—চেয়ারটা ভাঙা, পা দুটো জমিতে, হাতে সিগারেট, চোখে এক ধরণের গণিত। তার দিকে তাকিয়ে বোঝা যায় সে সবসময় পরিস্থিতি গণনা করে; একজন ব্যাঙ্কারের মতো।
কুদ্দুস তার খারাপ ধাঁচে এলো। ভান করে সহানুভূতিশীল, কিন্তু মনের ভেতর সবকিছু গোনা গাছের মতো। শেফালির হাসির পেছনে যে চাচার ছত্রছায়া আছে তার মূল ছিল কুদ্দুসের নীরব নির্দেশনা। তারা দুজন মিলে বানিয়েছিল একটা 'রিউমার'—একটা গুঞ্জন, যার নাম ছিল 'কেরামতের গোপন পুরুষালি ব্যাধি।' একটা অদৃশ্য উপদেশ, যার সঙ্গে মিললেই কোনো মেয়ের বিশ্বাস অটল করে ফেলা যায়।
এই রিউমার কাজ করল ধীরে ধীরে। কেরামতকে 'বিপজ্জনক' বলে লেবেল করে তারা শেফালির অচল প্রেমকে সংস্কার করে দিল। তারা জানত শেফালি সহজে কাঁদে না, কিন্তু লোকের সামনে তাকে নামকরা করে তুলে দিলে সে আরেক ধরণের আত্মবিশ্বাসে সিক্ত হবে। আর কেরামত—সে পারছে না, কারণ তার যন্ত্রণার নীল বিষ কেবলই ছড়িয়ে পড়ছে মনে-মগজে-শরীরের শিরা উপশিরায়।
এক সন্ধ্যায় ম্যালেরিয়ার নিচে অন্ধেরা আবার জড়ো হলো। কথক ছায়ার পেছনে লুকিয়ে শুনতে পায়—মাতাব্বর চাচা গোলাপ মিঞাকে কিছু টাকা দিয়েছেন। কুদ্দুস কিছুটা আশ্বাস দিয়েছেন যে শেফালিকে তিনি 'সাজিয়ে' দেবেন। গোলাপ মিঞার মুখে একটু স্বস্তি দেখা গেল। একজন মানুষ যখন নিজের মর্যাদাকে ফেরাতে পারে এমন আশায় ভর করে, তখন তার চোখ অধিকার ফিরে পায়—অচেতনভাবে হলেও।
আমরা বুঝতে পারি এটা যেন এমন একটা খেলা, যার নিয়ম জানি না, তবু কোনো অদ্ভুত আনন্দ আছে—যৌক্তিক বিশ্লেষণের আনন্দ। কিন্তু বিশ্লেষণ কখনোই মানুষের হৃদয়ের ঘাটতি পূরণ করে না। বিশ্লেষণ কেবল বলে, ‘একটি সূত্র আছে’। কিন্তু সূত্রের ভেতর যদি আগুন লুকিয়ে থাকে, তাতে বিশ্লেষণ কী করে?
কেরামত বদলে গেল। তার দৃঢ়চেতা ভালোবাসার ভাষায় হঠাৎ রাগের রং বাড়ে। সে শেফালির কাছে একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তুই আমায় ফুঁকাইয়া ফেলছস।’ শেফালি বলল, ‘আমি কি তোরে ঠকাইছি?’ কিন্তু কথাতেই ভাঁজ ছিল, ‘আমি তো সংসারের জন্যই তোমাকে বেছে নিয়েছি।’ কথাটিতে প্রেম মনে হলেও ছিল লেনদেনের ভাষা—যে প্রেমটাই মুদ্রায় গোনা যায়।
কালের সঙ্গে একটি উগ্রতর জটিলতা বেড়ে গেল। কেরামতের ভেতর থেকে একটি পুরোনো ক্ষতোন্মুখ স্মৃতি মাথায় উঠে এলো—তার মা, তার শৈশবের গন্ধ, এবং সেই একবারের প্রত্যাশা যে কেউ তাকে ঠিক মতো দেখবে। সে হঠাৎ অনুভব করল, শেফালি তাকে সহ্য করে না, শেফালি তাকে ব্যবহার করে, এবং গোলাপ মিঞার কাছে শেফালি বাঁচে। এই উপলব্ধি কেরামতকে অনুষ্ঠানবহ করে তোলে—তার নীরবতা ভেঙে পড়ে এক ধরনের হাহাকার।
সে দিনের এক বিকেলে, টঙঘরের ধারে, কেরামত শেফালিকে ধরে বলল, ‘তুই আমায় বুঝতে চেষ্টা কর্?’শেফালি কচকচ করে উত্তর দিল, ‘আমি কেমনে বুঝুম? আমি কী এত কিছু বুঝি!’ একইঙ্গে কথাটা কেরামতের হৃদয় ভেঙে দিল। হৃদয় ভাঙলে বাকি যা থাকে ওটা মারাত্মক।
অধ্যায় ৫ : ভাঙনের অঙ্গিকারে—রাগ, বিতর্ক ও নিয়তি
আমাদের বাসস্ট্যান্ডে রাত্রির নীরবতা এমন কিছু রঙ নিয়ে এসেছে, যা দিনের আলোয় বিস্মৃত। গরমে মুখ ঘামা, চোখে অন্ধকার—এই সব কিছু মিশে এক বিষন্ন কবিতা রচিত হয়। কেরামত একদিন আমাদের কলেজপথে এসে বলল, ‘আমি শেফালির পাশে ছিলাম। সে আমারে তুচ্ছ করল।’ আমরা শুনে বলি, ‘তুই ভুল বুঝছিস।’ কিন্তু ভুল বোঝা ও মিথ্যার মাঝখানে কখনো কখনো সত্য থাকে—একটা সত্য যার নাম 'উদাসীন দূরত্ব'।
কেরামতের ভেতর থেকে কঠিন এক সিদ্ধান্ত গজায়। এটা এমন সিদ্ধান্ত যার পেছনে আছে পুরনো ক্ষোভ, হারানো মর্যাদার প্রতিশোধ, এবং এক জীবনের দ্বন্দ্ব। সে দিনের পর দিন ভাবল। কেন না সে তাকেই দেখাতে চায় যে প্রেমে কী হয়—কিন্তু তার পদ্ধতি ছিল আড়াল, কালো, নিস্পৃহ।
এক সন্ধ্যায় শেফালি আর গোলাপ মিঞা হাত ধরে হাঁটছে। তাদের হাসি আজ বড়ো তৃপ্তিকর। কেরামত টংঘরের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে লুকিয়ে আছে ছুরি। ছুরি পুরোনো, ধারালো, যেন দীর্ঘদিন অপেক্ষা করা প্রতিশোধের প্রতীক। সে জানে না কীভাবে এই ছুরিটি জাগিয়ে উঠল। সম্ভবত প্রেমের অদৃশ্য কাটা, হয়তো মায়ের কণ্ঠে লুকানো গুঞ্জন। কিন্তু সে জানে, এটি এখন তার হাতে।
আমি—কথক—ওই সময়ে ছিলাম সেখানে, এবং আমার মন বলল, ‘তুমি আগে থেকেই জানতে, কিছু একটা হবে।’ কিন্তু আমি তখনও ভাবলাম, ‘একটা ঘটনার সম্ভাবনা বুঝে ক্ষমা করা যায় না।’ আমরা সবাই বুঝতাম না কেন প্রেম ঝগড়ায় বদলে যায়, কেন মানুষের পিঠে ছুরি বসাতে হয়।
ঘটনাটি দ্রুত ঘটল। টঙঘরের সামনে মানুষের ভিড়। শেফালি ও গোলাপ মিঞা হেসে আড্ডা দিচ্ছে, কেরামত ঝাঁপিয়ে পড়ল, ছুরি বসাল। গোলাপ মিঞার বুকের বাম পাশে ছুরি ঢুকল। ঠিক সেই স্থানে, যেখানে পুরুষত্বের সব কঠিন স্মৃতি জমে থাকে।গোলাপ মিঞা ছিটকে পড়ল, রক্ত ছড়িয়ে পড়ল, সময় স্থবির হয়ে গেল। কেরামত কাঁদল না। তার চোখে ছিল এমন এক ধরণের ফোকাস যা আমাকে ভয় ধরাল।
মানুষ চিৎকার করে উঠল, কেউ ফোন করে, কেউ দৌড়ে, কেউ দেখে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। গোলাপ মিঞা ধীরে ধীরে মাটির দিকে নত হলো, চোখ বুজে এলো। আমাদের কলেজপড়ুয়া কথক তখন বলল, ‘আমি সব সময় ধারণা করতাম কিছু একটা হবে। কিন্তু ছুরি—এইটা কিভাবে?’ এটা যেন ভবিষ্যৎ-ধ্বনি, আর ভবিষ্যৎ নিজেই একটা প্রশ্ন রেখে যায়।
কেরামত ধরা পড়ল। তাকে বেঁধে পুলিশ নিয়ে গেল। শেফালি বসল মাটিতে, কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি কি করলাম?’ তার মুখে ছিল দুটো জিনিস—শরীরগত ক্রোধের ক্ষত এবং আত্মরক্ষার অসহায়তা। মাতাব্বর চাচা ও কুদ্দুস মুখচক্ষু লোপাট করে ভেসে গেল। তারা বুঝল যে তাদের খেলাটা অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ হারালো।
কিন্তু হত্যার পরে বিষয়টা থেমে যায় না। হত্যা হচ্ছে সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। খবর ছড়ায়, মানুষ আসে, সাংবাদিকরা আসে। কেউ কেউ বলতে থাকে, ‘এই শহর তো শান্ত ছিল।’ কেউ বলে, ‘এমন দৃশ্যের জন্য তো আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না।’ আর আমরা—অনেকেই—শুধু দাঁড়িয়ে দেখছি।
অধ্যায় ৬ : বিচার, ভাষণ ও ঝরের পরে
পরের দিনগুলো যেন এক দীর্ঘ আদালতের রুম। কেরামতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জিজ্ঞাসা করেছে। মাতাব্বর চাচা নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। কুদ্দুস গোপনে চমকে উঠেছে। শেফালি—তার চোখে এখন এক ধরণের শূন্যতা ভর করেছে। গোলাপ মিঞার লুট হয়ে যাওয়া জীবনের বাকি অংশগুলো এখন কাগজে পরিণত হয়েছে। ফিরতি সম্ভাবনা নেই।
আদালতের বাইরে কথক বসে আছে। তার হাতে নোটবুক, যেখানে সে লিখছে, ‘এই শহরের অভ্যন্তরে অন্ধকার কেমন করে ঢুকে পড়ে—আমরা কখনো জানি না।’ সে উপলব্ধি করে, এই কাহিনি কোনো সরল ন্যায়বিচারের উপাখ্যান নয়। এটি মানুষের দুর্বলতার কাহিনি। আর সেই দুর্বলতা যখন সম্মিলিত হয়, তখন একটি সমাজও ক্ষতবিক্ষত হয়।
পুলিশি তদন্তে উঠে আসে মাতাব্বর চাচার নাম। তার কথা, তার নীরব উদ্যোগ—কুদ্দুসের হাত রয়েছে তাতে। কিছু সাক্ষ্য বলে, শেফালির তহবিলে কিছু টাকা গেছে। কিন্তু আইনের গতি ধীর। শহরের মানুষ দ্রুত হরফ রচনা করে চলে। কেউ খোঁচা দেয়, কেউ মিথ্যাচার করে।
কেরামতকে যখন জেলে নিয়ে যাওয়া হয়, সে বলে, না, কথা নেই। তার নীরবতা যেন এক চূড়ান্ত ভাষা। সে জানে না কেন সে এটা করল। হয়তো সে জানতে চায়নি কেন। কারণ সে এক বিষয়ে নিশ্চিত ছিল : সে ভালোবাসা হারিয়েছে। আর হারানো ভালোবাসা ফিরে আসে না। তাই সে সেটাই জয় করেছে—পাথরের মত এক শুদ্ধ অনুভব।
শেষে কথক নীরব হয় না। সে কাগজে লিখে রাখে, ‘আমরা বুদ্ধিমান, আমরা বিশ্লেষক, আমরা আন্দোলন করি। কিন্তু কখনো আমরা স্পর্শ করি না মানুষের অন্তর। প্রতিটি মানুষ যদি একটু চোখ খুলে দেখতো, খুনটা হতো না।’ এই লাইনটি যেন একটি নীরব অভিযোগ। সবচেয়ে শক্তিশালী অভিযোগগুলোই সাধারণত নীরবে হয়ে যায়।
কাহিনি এখানে থামে না, এটি শুরু করে নতুন এক ইতিহাসের। শহর আর শহরের মানুষ তাদের ভিতর থেকে পকেটের কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন, আইন প্রণেতারা থেমে থাকেন না, চলতে থাকে যুক্তি ও পাল্টাযুক্তি-তর্ক। সংবাদপত্রের শিরোনামে ওঠে এলো আখ্যান, উপাখ্যান, এবং টঙঘরের কোণে অন্ধেরা আবার মিলিত হয়। তারা আগেই বলেছিল তাদের সভার কোনো ঠিকানা নেই; কিন্তু ইতিহাসে তাদের পরিচয় এখন চিহ্নিত। তারা জানে না, তারা কেবল অনুভব করে।
অধ্যায় ৭ : তদন্তের ঠান্ডা লণ্ঠন—শহরের বিচারকরা
হত্যার মাত্র তিনদিন পরই শহরে এক অদ্ভুত পরিবেশ জন্ম নিল। রাতের বাতাস যেন ঠান্ডা, আর মানুষের মুখগুলো যেন ঝড়ে ভিজে শুকিয়ে যাওয়া পাতার মতো। পুলিশ তদন্তে নেমে গেল। ইন্সপেক্টর সামাদ ছিলেন আমাদের কল্পনায় একমাত্র মানুষের মতো, যিনি সকালে রোদ ওঠার আগে সত্যকে চিনতে পারেন বলে মনে হতো। তিনি গোলাপ মিঞার বাসায় গেলেন। ঘরে কান্নার গন্ধ, মেঝেতে শীতলতার ছোঁয়া, আর দেয়ালে যত ছবি—মলিন হয়ে গেছে। শেফালি বসেছিল কোণের চেয়ারে, চোখে এত ক্লান্তি যেন কয়েক জন্মের হিসাব তার ওপর এসে পড়েছে।
ইন্সপেক্টর সামাদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি জানতেন কেরামত আপনাকে অনুসরণ করছিল?’
শেফালি চোখ তুলল না, ‘আমি কাউকে অনুসরণ করতাম না, আমাকে সবাই অনুসরণ করত।’
পুরো শহর যেন এই এক বাক্যে চমকে উঠল। কথাটির ভেতর লুকিয়ে আছে নিষ্ঠুর সত্য : শহরের সবাই শেফালির জীবনের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু কেউ তার জীবনের দায় নেয়নি।
মাতাব্বর চাচাকে ডেকে পাঠানো হলো। তিনি এলেন এমন ভঙ্গিতে যেন তাকে সম্মান জানাতে সবারই বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু সামাদ এসব মানুষ চেনেন। তার চোখে মাতাব্বর চাচার মুখের ভাঁজগুলো আলাদা করে পড়া যায়।
‘আপনার নাম কেন বারবার আসছে?’
মাতাব্বর চাচার মুখ শুকিয়ে গেল, ‘আমি সব সময় সমাজের ভালো চেয়েছি, স্যার।’
এই ‘ভালো’ শব্দটাই ছিল সন্দেহের পতাকা। কারণ শহরে যত অন্যায় ঘটে সবাই ‘ভালো’র নামে করে।
কুদ্দুসকে ধরা হলো। তার মুখে বিষণ্ণ হাসি, মনে হলো সে কিছুই জানে না, কিন্তু সামাদ তার পকেট থেকে বের করলেন পুরোনো কাগজ, যার ভেতর লেখা : ‘শোনো, কেরামত অসুস্থ। শেফালি তারে মানিবে না।’
মিথ্যার ভিত্তি যত পাতলা, ততই তাকে ছড়াতে সহজ হয়।
কথক দেখে—পুলিশ, প্রতিবেশী, আত্মীয়, সাংবাদিক—সবাই এখন ‘বিচারক’। যেন মানুষ হত্যা হলে শহরও হত্যার একটা ছোট অংশ হয়ে যায়।
অধ্যায় ৮ : কেরামতের শৈশব, জগদীশের সিঁদুর-রঙা গল্প
কেরামত জেলে বসে আছে। কারাগারের ভেতর এমন এক নীরবতা বোনা আছে, যা কিছুই বলে না, কিন্তু সবকিছু শুনিয়ে দেয়। তার চোখে প্রথমবারের মতো ফিরে আসে শৈশবের সেই দিনগুলো, যেগুলো সে ভুলে থাকতে চেয়েছিল।
কেরামতের মা ছিল এক বিশেষ নারী—সবার চোখে স্বপ্ন, আর নিজের চোখে চূর্ণহৃদয়। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘তুই জগদীশের মতো হবি। সে নাকি শহরের ওপাশে থাকে। চোখে আগুন, মনে দয়া।’
কোনো এক বর্ষার রাতে কেরামতের মা মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে বলেছিলেন, ‘জগদীশ তোকে চাইলেই আশ্রয় দেবে।’
কিন্তু সেই জগদীশ ছিল আদৌ বাস্তব? নাকি মা তার শূন্য জীবনের শূন্যতা পূরণে এক প্রতীক তৈরি করেছিলেন?
এক রাতে কেরামত স্বপ্ন দেখল জগদীশ তাকে নিয়ে যাচ্ছে এক বিশাল মাঠের দিকে, যেখানে ঘাস জ্বলে ওঠে, বাতাসে আলো হয়, আর মানুষের চোখের ভেতর থেকে কাগজ উড়ে যায়। জগদীশ বলছে, ‘তুই অনেক সহ্য করছিস, ছেলে। কিন্তু সহ্য কি সবসময় পুণ্য?’
এই প্রশ্ন ছিল কেরামতের ভবিষ্যৎ অপরাধের অঙ্কুর। তার স্কুলজীবনজুড়ে অপমান আর নীরবতার কাহিনি। সে একবার ভালোবাসতে চেয়েছিল, মেয়েটি তাকে বলেছিল, ‘তোমার চোখ দেখে মনে হয় তুমি কোনোদিন ঘুমাও না।’
এই বাক্য তার মনে লেগে থাকে।
শেফালির প্রতি তার আকর্ষণের মূল ছিল এই শৈশব—এক ক্ষুধা, এক একাকিত্ব, যা প্রেমকে নয়, ব্যক্তিগত মুক্তিকে খুঁজছিল। যখন শেফালি তাকে দূরে ঠেলল, সে মনে করল আবারো সেই পুরোনো প্রত্যাখ্যান ফিরে এসেছে। আর সেই প্রত্যাখ্যান তাকে ঠেলে দিল সেই ছুরির দিকে, যা কোনোদিনই তার সত্যিকার অস্ত্র ছিল না, ছিল ভয়ের উত্তর।
অধ্যায় ৯ : শেষ পর্ব—শহরের অদৃশ্য নালিশ
গোলাপ মিঞার হত্যার পর শহর দুই ভাগ হয়ে গেল। কেউ বলল, শেফালি দোষী। কেউ বলল, মাতাব্বর আর কুদ্দুসই আসল অপরাধী। কারও মতে, কেরামত জন্ম থেকেই অভিশপ্ত। কিন্তু শহরের টঙঘর—সেই ম্যালেরিয়া আক্রান্ত অন্ধেরা—তারা বলল এক অন্যরকম কথা : ‘মানুষের ভেতর যদি অন্ধরা বাস করে, শহরের আলো কোন কাজের?’
একদিন বিকেলে শেফালি বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। তার আর কারো দরকার নেই। গোলাপ মিঞা নেই। কেরামত হাজতে। মাতাব্বর চাচারা গর্ত খুঁড়ে ঢুকতে ব্যস্ত। সে তাকিয়ে দেখল শহরের মানুষ এখনও তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখে হঠাৎ অশ্রু এল, ‘তোমরা সবাই দেখলে। কেউ বাধা দিলে না। খুনটা তো আমরাই করলাম।’
এই লাইন শুনে কথকের ভেতর কেঁপে উঠল।
কেরামত সাজা পেল। মাতাব্বর চাচা রেহাই পেল। কুদ্দুস পার পেল না, কিন্তু বড়ো শাস্তিও হল না। শহরে আবার আড্ডা শুরু হলো, চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ল, এবং রিকশাওয়ালারা বলল, ‘মামলা তো সময়ের ব্যাপার। মানুষ এক সময় ভুইল্যা যায়।’
কথক শেষবার লিখল: ‘আমরা সবসময় ভাবতাম মানুষ খুন করে। কিন্তু সত্যি হলো, খুনের আগেই সমাজ হত্যার মঞ্চ প্রস্তুত করে।’
গল্প এখানেই শেষ নয়, এটি এক অনন্ত পুনরাবৃত্তি। আজও শহরের ভিতরে একটা অদৃশ্য পুকুর আছে, যেখানে মানুষ কখনো না কখনো পড়ে যায়। আর যারা পড়ে তারা উঠে দাঁড়ানো শিখে না। তাঁরা কেবল দেখেন কেউ এসে হাত বাড়াল কি না।
সমাপনী অধ্যায়—১ : মৃতদের নীরব সাম্রাজ্য, জীবিতদের অনন্ত ঋণ
শহরের অদৃশ্য পুকুরটি ধীরে ধীরে এক ধরনের অতিনিজস্ব সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে—এমন এক সাম্রাজ্য, যেখানে ডুবে যাওয়া মানুষেরা মৃত্যুর নয়, বরং অসমাপ্ত জীবনের নাগরিক। তারা কেউই পুরোপুরি মরে না, কেবল দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আমি যতবার সেই পুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, ততবার মনে হয় টলমলে পানির ভেতর থেকে কেউ যেন হাত বাড়িয়ে দেয়, ঠিক সেই জায়গা থেকে, যেখান থেকে গল্প থেমে গিয়েছিল একদিন। চাঁদের আলোর নিচে সেই হাতগুলো কখনো তরঙ্গ হয়ে ওঠে, কখনো নিস্তব্ধ বাষ্প। শহরের বাতাসে তারা নিজেদের হাহাকার ছড়িয়ে দেয় না, বরং এক ধরণের ধৈর্যশীল নীরবতা ছড়িয়ে দেয়। যেন বলছে, ‘আমরা এখানে আছি, কারণ তোমরাই আমাদের শেষ করতে ভুলে গেছো।’
এই পুকুরে ডোবা প্রতিটি মানুষই তাদের জীবনের শেষ অনুচ্ছেদটি যেন আমাকে লিখতে দিয়ে গেছে। তাই আমি জানি—মৃত্যু আসলে লেখকের হাতে দেওয়া এক কালি-দানি মাত্র। এতে লেখা হয় সবচেয়ে গভীর বাক্যগুলো।
জীবন যাদের ছুঁয়ে গিয়ে চলে গেছে, তাদের গল্পের ভেতরই আমি দেখি শহরের গোপন মুখ—যেখানে কান্নাও লাজুক, আর আনন্দও যেন তামাশা করতে করতে হেঁটে যায়।
আমি বহুদিন ভেবেছি এই শহর কি সত্যিই বাঁচতে চেয়েছিল? নাকি শুধুই মৃতদের আশ্রয় দিতে দিতে একসময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল? পুকুরের নিস্তরঙ্গ ভাঁজে যখন পুরোনো চশমা, ভাঙা পেনসিল, বা কারো ছেঁড়া টিকিট ভেসে ওঠে, তখন মনে হয়, শহর তার অতীত ভুলতে চাইলেও, অতীত শহরকে ভুলতে পারে না।
এখানে যারা বেঁচে থাকে, তারা আসলে মৃতদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলে। তারা গোলাপ মিঞাকে পুরোপুরি ভুলতে পারে না। কোনো না কোনভাবে গোলাপ মিঞা ফিরে আসে তাদের আলোচনায়, স্মৃতিতে। যে স্মৃতিতে লুকিয়ে আছে অন্ধকার, রক্ত।
গোলাপ মিঞা মরে গিয়ে জীবিতদের শেষ কথা হয়ে ওঠেছে। এটাই অদৃশ্য পুকুরের নির্মম, অথচ মায়াময় নিয়ম।
সমাপনী অধ্যায়—২ : যে বৃষ্টিতে সব গল্প ফিরে আসে
সেদিন সন্ধ্যায় যখন বৃষ্টি শুরু হলো, মনে হলো, আকাশ যেন শহরের পুরোনো পুকুরটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর টুপটাপ শব্দ করে তার সমস্ত ভুলে যাওয়া স্বপ্নগুলো ফেরত দিচ্ছে। এমন বৃষ্টি সাধারণত গ্রীষ্মে হয় না, কিন্তু সেই দিনটি ছিল ব্যতিক্রম। আমি জানি না কেন। মনে হয়েছিল এই অদৃশ্য পুকুর আবার নতুন কাউকে ডাকবে। পুকুরের পানি অদ্ভুতভাবে ফুলে উঠছিল, যেন সে অতীতের সব গল্প আবার একবার শোনাতে চায়।
গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো হঠাৎই শব্দ করতে শুরু করল—গার্সিয়া মার্কেজের গ্রামগুলোর মতো, যেগুলো বৃষ্টি শুরু হলে নিজেদের ইতিহাস বলে ওঠে। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম—কেউ যেন বলল, ‘আমরা তো কখনো হারাইনি। তোমরা হারিয়ে ফেলেছ আমাদের।’
তারপর পানি ধীরে ধীরে উথলে উঠল। এমনভাবে, যেন শহরের গোপন গ্রন্থাগার খুলে গেছে।
মৃতদের সব মুছে যাওয়া পায়ের শব্দ, ধুলো মাখা চিঠি, অদ্ভুত হাসি, অসমাপ্ত প্রেম—সবই যেন বৃষ্টির সঙ্গে ফিরে আসতে লাগল। গোলাপ মিঞার শেষ গোঙানিও যেন এসবের সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে গেল।
আমি বুঝতে পারলাম এই শহর আসলে কখনোই বর্তমানকে নিয়ে বাঁচে না। সে বাঁচে অনুপস্থিতদের জমে থাকা শ্বাসে। যারা নেই, তারাই এখানে সবচেয়ে উপস্থিত। যারা চলে গেছে, তারাই শহরের প্রতিটি রাস্তার নীরব নায়ক। বৃষ্টির শব্দ বাড়তে থাকল।
আমার মনে হলো এই পুকুর কি আমাকেও একদিন ডাকবে? আমার কোনো অসমাপ্ত বাক্য, কোনো মানচিত্রহীন স্মৃতি, কোনো অর্ধেক লেখা গল্প কি এই পানিতে ভেসে থাকবে? শেষ পর্যন্ত মনে হলো, আমরা সবাই কোনো না কোনো অদৃশ্য পুকুরের নাগরিক। শুধু সময়ই ঠিক করে দেয়, কে কখন ডুবে যাবে, আর কে কতদিন ভেসে থাকবে। ·
লেখক পরিচিতি : শাহান সাহাবুদ্দিন গল্পকার, কবি ও সাংবাদিক। লেখালেখি করছেন দীর্ঘদিন ধরে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়টি। বসবাস করছেন গাজীপুরে।


0 মন্তব্যসমূহ