কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার : লেখালেখির সৌন্দর্য


সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও ভূমিকা : স্বকৃত নোমান

আমাদের আড্ডাগুলোতে কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের প্রসঙ্গ উঠলে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তাঁর অধিবাস, পরাধীনতা, কালাকাল, পরবাস, কালোঘোড়ো, ভূমিপুত্র প্রভৃতি উপন্যাস। নূরজাহান তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাসগুলোর একটি। গল্প-উপন্যাস লিখে প্রান্তের পাঠকের কাছে পৌঁছা সহজ কথা নয়। বাংলাদেশের কম লেখকই পৌঁছাতে পেরেছেন। সবচেয়ে বেশি পৌঁছেছেন হুমায়ূন আহমেদ, তারপরেই ইমদাদুল হক মিলনের স্থান। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হিসেবে এ দুই ঔপন্যাসিকের নাম পাশাপাশি উচ্চারিত হয়।

সাহিত্যের পাঠক হিসেবে আমরা কত কিছুই তো পড়ি। কিন্তু সব পাঠ আমাদর স্মৃতিতে থাকে না, আমাদের সঙ্গে থাকে না। অধিকাংশ পাঠই হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় সেসব পাঠ আমাদের মনে কোনো রেখাপাত করতে পারে না বলে, কোনো দোলা দিতে পারে না বলে। আমাদের সঙ্গে, আমাদের স্মৃতিতে থাকে অল্প কিছু লেখা, গল্প-উপন্যাসের অল্প কিছু চরিত্র, কবিতার অল্প কিছু পঙক্তি। আমার স্মৃতিতে থেকে গেছে তাঁর যাবজ্জীবন, পরাধীনতা, কালোঘোড়া, কালাকাল, পরবাস, একাত্তর ও একজন মা, সবুজপাতা, জিন্দাবাহার, মায়ানগর প্রভৃতি উপন্যাস।

স্মৃতিতে আরও রয়ে গেছে প্রায় পনের বছর আগে পড়া ইমদাদুল হক মিলনের বেশ কিছু গল্প। আমি মনোযোগ দিয়ে তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্প বইটি পড়েছিলাম। বুঝতে চেয়েছিলাম গল্পকার হিসেবে ইমদাদুল হক মিলন কেমন, কতটা দক্ষ, বাংলাদেশের শীর্ষ গল্পকারদের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে কিনা। বুঝতে চেয়েছিলাম গল্পকার হিসেবে তিনি আমাকে তুষ্ট করতে পারেন কিনা।

পেরেছেন। তাঁর গল্প আমার মনে রেখা এঁকে দিয়ে গেছে, দোলা দিয়ে গেছে। অবশ্য সব গল্প নয়, সব গল্পের কথা স্মৃতিতে নেই। আছে এই গল্পগুলো : গাহে অচিন পাখি, মমিন সাধুর তুকতাক, কিরমান ডাকাতের প্রথম ও দ্বিতীয় জীবন, লাশ পড়ছে, খরা কিংবা বৃষ্টির পরে, জোয়ারের দিন, মানুষ কাঁদছে, গগনবাবুর জীবনচরিত, সোনাদাস বাউলের কথকতা, রাজাবদমাস, লোকটি রাজাকার ছিল, নেতা যে রাতে নিহত হলেন, মানুষের আড়ালে মানুষ এবং গোপন দুয়ার।

কত বিষয়েই না তিনি গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন! লিখেছেন গ্রামীণ হাটের মিষ্টির দোকানিকে নিয়ে, হাজাম অথবা বেলদার সম্প্রদায়কে নিয়ে। তাঁর গল্প-উপন্যাসের বিষয় হয়ে এসেছে সেজাল খাঁ ফকিরের জ্বীন নামানোর কথা, সার্কাসের জোকার, গ্রামের পতিতা, পাগল, কুকুর, নদীর ভাঙন, জোয়ার-ভাটা, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামের অনুচ্চারিত প্রেম, চোর-ডাকাত, গাছপালা, শহুরে টাউট, দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতা, পরাধীনতার মতো বৈচিত্রপূর্ণ বিষয়। মনে রেখাপাত করে যাওয়া গল্পগুলোর কাহিনি, চরিত্র আমার স্মৃতিতে এখনো সজীব। 

স্মৃতিতে সবচেয়ে বেশি জাগরুক আছে ‘গাহে অচিন পাখি’ গল্পটি। ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্য প্রসঙ্গ উঠলেই প্রথমে মনে পড়ে যায় এই গল্পটির কথা। নাকে এসে ধাক্কা খায় আমিত্তির ঘ্রাণ, চোখের সামনে ভেসে ওঠে পবনার মুখ, লতিফের মুখ। একজন লেখক তখনই সার্থক, যখন তার কোনো গল্প, কোনো উপন্যাস কিংবা গল্প-উপন্যাসের কোনো চরিত্র পাঠকের স্মৃতিতে থেকে যায়; যখন লেখকের নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় তার সৃষ্ট চরিত্রসমূহের কথা। ফলে ইমদাদুল হক মিলন সার্থক। নিশ্চয়ই আমার মতো আরও অসংখ্য পাঠকের হৃদয়েও তাঁর গল্প-উপন্যাসের কাহিনি এবং গল্প-উপন্যাসের চরিত্ররা গেঁথে আছে।

কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে। তার বাবার নাম গিয়াসুদ্দিন খান এবং মার নাম আনোয়ারা বেগম। তিনি ১৯৭২ সালে লৌহজং উপজেলার কাজীর পাগলা হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৪ সালে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯৭৯ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকেই স্নাতক (সম্মান) সম্পূর্ণ করেন।

কথাসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ভূষিত হয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননায়। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে : হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, এস এম সুলতান পদক, অগ্রণী ব্যাংক শিশু একাডেমী শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং একুশে পদক।

একজন লেখক শুধু লেখালেখিকে অবলম্বন করে যে জীবনকে সাফল করে তুলতে পারেন, সেই দৃষ্টান্ত রেখেছেন কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন। জীবনের সত্তুর বছর তিনি অতিক্রম করেছেন। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তিনি লেখালেখির পেছনে ব্যয় করেছেন। অধিকাংশ সময় তিনি সাহিত্যের সঙ্গে ছিলেন, এখনো আছেন এবং অনাগত দিনেও থাকবেন। বাংলা সাহিত্যের ভূমিকে ফুলে ও ফসলে তিনি ভরিয়েছেন, ভবিষ্যতেও ভরিয়ে তুলবেন। তাঁর হাত দিয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে আমাদের সাহিত্য। তিনি অক্লান্ত এক সাহিত্যস্রষ্টা। পরিস্থিতি অনুকুল হোক কিংবা প্রতিকুল, কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি সাহিত্যকে ছেড়ে যাননি, ভবিষ্যতেও যাবেন না। 

বাংলা সাহিত্যের পরিশ্রমী, সাহিত্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, পাঠকহৃদয়ে স্থান করে নেওয়া এই কথাশিল্পর সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে লিখিতভাবে। প্রশ্নগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে। উত্তরগুলো লিখে তিনি মেইল করেন। তাঁর এই সাক্ষাৎকার নিতে পেরে আমি এবং আমরা আনন্দিত। ‘গল্পপাঠ’ টিমের পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা।

স্বকৃত নোমান
প্রথমে আপনাকে গল্পপাঠের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাই। গল্পপাঠ কথাসাহিত্যের ওয়েবজিন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীরা এই ওয়েবজিন পড়ে থাকেন। এটা অনলাইন ভিত্তিক, প্রিন্ট হয় না। গত শতকে আপনি যখন লেখালেখি শুরু করেছিলেন তখন এরকম অনলাইন ওয়েবজিন ছিল না, এখন বিস্তর। এখন প্রিন্ট ম্যাগাজিন বা পত্রিকার চেয়ে ওয়েবজিন বেশি পঠিত হয়। আপনি কোনটি পড়তে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন―ওয়েবজিন না, প্রিন্ট ম্যগাজিন?

ইমদাদুল হক মিলন
ধন্যবাদ স্বকৃত। আমি বই পড়তে শুরু করি একেবারেই ছেলেবেলা থেকে। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় পাঠ্য বইয়ের বাইরে প্রথম যে বইটি আব্বা আমাকে কিনে দিয়েছিলেন সেই বইয়ের নাম ‘সিন্দাবাদের সাত অভিযান’। আরব্য উপন্যাস থেকে সিন্দাবাদের অভিযানগুলো ছোটদের উপযোগী করে লেখা একটি বই। ১৯৬৩ সালের কথা। পরের বইটি পড়লাম ‘ভূতের মুখে রামনাম’। 

আমার নানাবাড়ি বিক্রমপুরের মেদেনীমণ্ডল গ্রাম। মাওয়ার ঠিক আগের গ্রাম। সেই গ্রাম আলোকিত করেছিলেন মনীন্দ্র ঠাকুর। এই ভদ্রলোকের কথা আমার অনেক লেখায় আছে। ডাক্তার ছিলেন, তবে পাস করা না। কিন্তু হাতযশ ছিল অসাধারণ। এলোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি আয়ুর্বেদীয় সব ধরনের চিকিৎসা করতেন। দশগ্রামে তাঁর সুনাম ছিল। মানুষ তাঁকে মাথায় তুলে রাখত। আমার নানাবাড়ির পাশেই তাঁর বাড়ি। আমি নানির কাছে প্রতিপালিত হচ্ছিলাম। মনীন্দ্র ঠাকুর আমাকে খুব ভালোবাসতেন। বইপ্রেমী মানুষ ছিলেন। তাঁর ঘরে ওষুধের আলমারির পাশে একটা বইয়ের আলমারিও ছিল। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়, আমি বই পড়তে পছন্দ করি শুনে ওই বইটি আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। সেই যে ভূতের গল্প আমার মাথায় ঢুকেছিল সেইসব ভূত এখনও মাথা থেকে নামেনি। যে কারণে সময় সুযোগ পেলে এখনও ভূতের গল্প লিখি। কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ‘পঞ্চাশটি ভূতের গল্প’ নামে বই বেরিয়েছে। 

যে কারণে এত কথা বলা, তা হচ্ছে ওই যে ছেলেবেলায় বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হল এখনও সেই অভ্যাসটা পুরো মাত্রায়ই রয়ে গেছে। এই কারণেই প্রিন্ট ম্যাগাজিন বা বই পড়তে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এই জীবনে বোধহয় প্রিন্ট ভার্সনের বাইরে গিয়ে তেমন কিছু পড়ার অভ্যাস আর করতে পারব না। পুরনো দিনের মানুষই রয়ে গেলাম।

স্বকৃত নোমান
বাংলাদেশের জীবিত লেখকদের মধ্যে বর্তমানে আপনিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বইমেলার সময় দেখা যায় আপনার জনপ্রিয়তা। প্যাভিলিয়নে বসে একের পর এক অটোগ্রাফ দিয়ে যান, পাঠকেরা আপনাকে ঘিরে থাকে―এটা মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। এই জনপ্রিয়তা বহু বছরের। কীসে আপনাকে পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় করে রেখেছে? কোন কৌশল অবলম্বন করে এই জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখেছেন?

ইমদাদুল হক মিলন
আমি লেখালেখি শুরুই করেছিলাম জনপ্রিয় হওয়ার জন্য। এরকম ধ্যান ধারণা নিয়ে কোন লেখক লিখতে শুরু করেন বলে মনে হয় না। লেখক লেখেন তাঁর মতো করে। সেই লেখা পাঠক কতটা গ্রহণ করবেন বা না করবেন তা সম্পূর্ণতই পাঠক রুচির ওপর নির্ভর করে। যখন লেখালেখি শুরু করি, ১৯৭৩ সাল, শুরু করেছিলাম ছোটদের গল্প দিয়ে। সেই লেখা ছাপা হওয়ার পর মনে হল এমন বিষয় নিয়ে আমি লিখতে চাই যে ধরনের লেখা কমবেশি সবাই পছন্দ করেন। ভেবে বের করলাম বই বেশি পড়েন ছাত্রছাত্রী আর গৃহবধূরা। এই ধারণার পিছনেও কারণ আছে। থাকি ঢাকার গেণ্ডারিয়াতে। সেখানে সীমান্ত গ্রন্থাগার নামে একটি পাঠাগার আছে। সেই পাঠাগার থেকে মা খালাদের জন্য বই আনতে যেতাম। দেখতাম সেখানে স্কুল কলেজ আর ইউনিভার্সিটিতে পড়া অনেকেই বসে বই পড়ছেন। 

আমার মায়ের মামাবাড়ি গেণ্ডারিয়াতে। সেই বাড়ির খালা মামাদের দেখতাম প্রচুর গল্পের বই পড়ছেন। সেইসব বই নিয়ে পাড়ার সমমনাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ পড়ে আমার মাকেই তো কতবার কাঁদতে দেখেছি। নীহাররঞ্জন গুপ্ত, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকের প্রেমের বইগুলো সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখছে। এইসব দেখে মনে হয়েছিল পাঠক প্রেম ভালোবাসা বিষয়ক লেখা বেশি পছন্দ করেন। ওই ধরনের গল্প উপন্যাস লিখলে রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়া যাবে। এই কারণেই আমি প্রেম ভালোবাসা বিষয়ক গল্প উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলাম। 

আমার প্রথম বইয়ের নাম ‘ভালোবাসার গল্প’। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হল। তখন বাংলাদেশী লেখকদের বই বছরে দুই তিনশো, পাঁচশো কপির বেশি বিক্রি হয় না। ওই বইটি দু’হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। ততদিনে বুঝে গেছি আমার জনপ্রিয় হওয়ার হিসেবটা কাজে লেগেছে। তারপর থেকে ওই ধরনের বইই বেশি লিখতে লাগলাম। বইমেলায় দেখি এইসব বইয়ের বিপুল পাঠক। ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ নামে একটি বই ১৯৯৩ এর বইমেলায় ২৮ দিনে ৮৭ হাজার কপি বিক্রি হয়ে গেল। আমার দ্বিতীয় উপন্যাসের নাম ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’। এই বইটি এখন পর্যন্ত ১৭টি এডিসন হয়েছে। আশি নব্বই দশকে বা এই শতাব্দির গোড়ার দিকে আমার ওই ধরনের বইগুলোর একেকটি মুদ্রণ হত তিন বা পাঁচ হাজারের। ‘তোমাকে ভালোবাসি’ নামে একটি গল্পগ্রন্থ ১৬টি এডিশন হয়েছে। ‘নির্বাচিত প্রেমের গল্প’ ৩১টি এডিসন। কথাশিল্পী মইনুল আহসান সাবেরের প্রকাশনা সংস্থা ‘দিব্য’ থেকে বেরিয়েছিল ‘কেমন তোমার ভালোবাসা’ বইটির প্রথম পর্ব। সেটি বিক্রি হয়েছিল ৩৫ হাজার কপি। দ্বিতীয় পর্ব ও তৃতীয় পর্বেরও একই অবস্থা প্রায়। পরে তিন পর্ব একত্র হয়ে বেরোল অনন্যা প্রকাশনী থেকে। সেটারও অনেকগুলো এডিসন হয়েছে। ‘তোমার ভালোবাসা’ নামে একটি বই এশিয়া পাবলিকেশন্স থেকে বেরিয়েছিল। বোধহয় ’৯৪ বা ’৯৫ সালের কথা। সেই বইটি এক মেলায় সাত না আটটি এডিসন হল। 

তার মানে প্রেমের গল্প উপন্যাস লিখে এক ধরনের জনপ্রিয়তা আমার তৈরি হয়। ১৯৮৪/’৮৫ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত এ অবস্থাটা ছিল। এই সময়ের মধ্যে আমার লেখা টেলিভিশন নাটকগুলো বই বিক্রির ক্ষেত্রে বড় রকমের ভূমিকা পালন করেছিল। বিটিভির সাপ্তাহিক কিংবা ধারাবাহিক নাটকগুলোর জনপ্রিয়তা বই বিক্রির ক্ষেত্রে বড় রকমের প্রভাব ফেলত।

আমি ততদিনে যেহেতু লেখাটাকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছি, লিখে যেহেতু সংসার নির্বাহ করতে হবে সেহেতু সব সময়ই তখন ভাবতে হয়েছে বইয়ের বিক্রিটা কিভাবে ধরে রাখতে পারি। জনপ্রিয়তা কিভাবে ধরে রাখতে পারি। পাশাপাশি এও ভেবেছি, আমাকে সর্বস্তরের পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হবে। শিশু-কিশোররাও যাতে আমার বই পড়ে সেই কারণে আমি ছোটদের লেখাও লিখতে শুরু করলাম। একটা সময় লক্ষ্য করলাম এক্ষেত্রেও আমার কিছু পাঠক তৈরি হয়েছে। ছোটদের জন্য প্রথম উপন্যাস লিখলাম ‘কিশোর বাংলা’ ঈদ সংখ্যায়। ‘চিতা রহস্য’। লেখাটি জনপ্রিয় হলো। 

বইটি নিয়ে একটা ঘটনা আছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসেছেন ঢাকায়। বোধহয় ’৮২ বা ’৮৩ সাল। শহীদ আলতাফ মাহমুদের বাড়িতে ঢাকা থিয়েটারের শিল্পীরা সুনীলের সঙ্গে একটি আড্ডার আয়োজন করেছেন। আমার বন্ধু আফজাল হোসেন সেই আড্ডায় আমাকে নিয়ে গেছেন। আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন কিশোরী। তাকে ভেতর থেকে কেউ বলে দিয়েছে সুনীলের অটোগ্রাফ আনার জন্য। একটা খাতা হাতে সে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘অটোগ্রাফ দাও।’ আমি বললাম, ‘সুনীলদার কাছে যাও, উনি অটোগ্রাফ দেবেন’। শাওন বলল, ‘না, তুমি দাও। আমি তোমার ‘চিতা রহস্য’ পড়েছি। আমি লজ্জায় সংকোচিত হয়ে গিয়েছিলাম। এই ঘটনা নিয়ে আফজাল পরে একটি লেখা লিখেছিলেন ‘শাওনদের চিতা রহস্য’। ‘মুক্তধারা’ থেকে বেরিয়েছিল কয়েকটি সংস্করণ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন আফজাল হোসেন। 

এসব লেখার ফাঁকে ফাঁকে এক ধরনের মনোকষ্টেও ভুগতাম। শুধুমাত্র কী পয়সার জন্যই একজন লেখক সব সময় লিখবেন? লিখতে ভাল লাগে না এমন লেখাও কি টাকার কথা ভেবে সমানে লিখে যাবেন? এই বোধটা খুব ভোগাত। শুরু থেকেই ওসব প্রেমের গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি অন্যরকম কিছুও লেখার চেষ্টা করেছি। প্রথম বইয়ের নাম ‘ভালোবাসার গল্প’, পরের বইটির নামই ‘নিরন্নের কাল’। পাশাপাশি দুটো বই পড়ে কেউ কেউ আমাকে বলেছিলেন, ‘নিরন্নের কাল’ও কি তুমিই লিখেছ? এ কী করে সম্ভব? কোথায় ‘ভালোবাসর গল্প’, কোথায় ‘নিরন্নের কাল’? 

আমার তখন মনে পড়ত সমরেশ বসুর কথা। এই মহান লেখক টাকার জন্য কত কত দুর্বল উপন্যাস লিখেছেন। আবার লিখেছেন ‘বিটি রোডের ধারে’, ‘শ্রীমতি ক্যাফে’, ‘জগদ্দল’, ‘গঙ্গা’, ‘টানা পোড়েন’, ‘দেখি নাই ফিরে’। তাঁর কালজয়ী উপন্যাসের সংখ্যা ৪০টির কম না। আমি একবার সমরেশ বসুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি যে হাতে গঙ্গা লেখেন, সেই হাতেই ‘বিকেলে ভোরের ফুল’ কী করে লেখেন?’ তিনি একটি চমৎকার জবাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি হচ্ছি দু’হাতের লেখক। ডান হাত দিয়ে ‘গঙ্গা’ লিখি বাম হাত দিয়ে লিখি ‘বিকেলে ভোরের ফুল’। ‘গঙ্গা’ পয়সা দেয় না। ‘বিকেলে ভোরের ফুল’ পয়সা দেয়। কী করবো বলো, আমাকে তো খেয়েও বাঁচতে হয়।’ আমি সমরেশ বসুর কথাটা মাথায় রেখেছি। যে কারণে শুধুই ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ আর লিখিনি। অন্যরকম কিছুও লেখার চেষ্টা করেছি। 

আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’। এখন আর জনপ্রিয়তার কথা ভাবি না। বই বিক্রি হবে ভেবে বই আর লিখি না। পছন্দের লেখাটি লেখার চেষ্টা করি। জনপ্রিয়তা নিয়ে কয়েকটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯৩ সালের বইমেলা। একুশে ফেব্রুয়ারি। ‘বিনোদন’ নামে একটি স্টল হয়েছিল শুধুমাত্র আমার বই নিয়ে। এক হাজার কপি ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ এনেছে ওরা ওই একদিনের জন্য। আমি বসে বসে অটোগ্রাফ দেই। সেদিন ৯৯৯ কপি বই বিক্রি হয়ে গেল। একটি বই রয়ে গেল, কারণ বইটির বাইন্ডিং উল্টো হয়েছে। সেদিন সন্ধ্যার মুখে যে কাণ্ডটা হল, সেটি ভয়াবহ। বিনোদনের স্টলটা ছিল বাংলা একাডেমির পুকুরের ধারে। সেদিন এমন চাপ পড়ল স্টলে, পাঠকের ধাক্কাধাক্কিতে আমাকে নিয়ে স্টলটি ভেঙ্গে পড়ল পুকুরে। লোকজন আমাকে টেনে তুলল। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ পরদিন থেকে বিনোদনের স্টলের সামনে আমার জন্য পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করল। চারজন পুলিশ পাঠকের লাইন ধরানোর কাজে নিয়োজিত। আশপাশের স্টলগুলোতে বিক্রিই হয় না। তারা কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করলেন। আমার উপর ক্ষোভে নিজেদের স্টলগুলো বন্ধ করে দিলেন। রাগ করে আমি আর বিনোদনের স্টলে যাই না। ফলে ওদিকটায় কোনও পাঠকই আর যান না। আমি গিয়ে বসি ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’র প্রকাশক ‘শিখা প্রকাশনী’তে। সেখানে ১৫ যুবকের একটি দল এল। প্রত্যেককে একটা করে বই ফ্রি দিতে
হবে। সেলসম্যানরা তর্কাতর্কি শুরু করল। দলের প্রধান একটা রিভলবার বের করে কাউন্টারে রাখল। বইটির দাম চল্লিশ টাকা। আমি সেলসম্যানদের বললাম, ‘বই দিয়ে দাও, দাম আমি দেব।’ আমি অটোগ্রাফ দিতে লাগলাম। ছেলেগুলো একে একে আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। তবে যাওয়ার আগে সেলসম্যানদের বলল, ‘তোমাদের মালিককে বলবে, যদি মিলন ভাইয়ের কাছ থেকে এই বইয়ের দাম নেওয়া হয় তবে খবর আছে। এই বই বিক্রি করে তোমরা অনেক লাভ করেছ।’ তখনও স্যার বলার প্রচলন হয়নি। পাঠকরাও লেখকদেরকে ভাই বলেই সম্বোধন করতেন। তবে বিনোদনের পাশের স্টল মালিকরা দু’দিন পরই আমাকে অনুরোধ করে আবার বিনোদনে নিয়ে বসিয়ে ছিলেন।

একদিন নিউমার্কেটের একটি বইয়ের দোকানে গেছি। একটি মেয়ে ছুটে এসে বলল, ‘আপনার একটা বই আমি খুব খুঁজছি। কোথাও পাচ্ছি না।’ সে একটা বইয়ের নাম বলল। শুনে বললাম, ‘এই নামে আমার কোনও বই নেই।’ মেয়েটি বলল, ‘না না, আছে। আপনি জানেন না।’ আমি অবাক। আমার বই আর আমিই নাকি জানি না! 

কয়েক বন্ধু মিলে গিয়েছি সীতাকুণ্ডে। সেখানে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপর প্রাচীন মন্দির। সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে উঠেছি। ঘুরে ঘুরে দেখছি। মাজার মন্দিরের চত্বরে সব সময়ই কিছু মানুষ থাকেন। ভক্ত ধরনের মানুষগুলো অনেক সময় সাহায্যের জন্য হাত বাড়ান। তেমন একজন এসে হাত পাতলেন আমার সামনে। মুখ ভর্তি দাড়িগোঁফ, মাথায় ঝাকড়া চুল, পরনে গেরুয়া। বয়স্ক মানুষ। নব্বই দশকের শেষ দিককার কথা। আমি তাকে দশটা টাকা দিলাম। বন্ধুদের একজন ঠাট্টা করার জন্য মানুষটিকে বললেন, ‘কে আপনাকে টাকাটা দিল, জানেন?’ মানুষটি নির্বিকার ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইমদাদুল হক মিলনকে কে না চেনে?’ শুনে আমি কেঁপে উঠেছিলাম। 

আমি জাপানে গিয়েছি চারবার। বৈশাখী মেলায় আমার বইয়ের একক স্টল করা হয়েছিল সেখানে। বাঙালিরা বিশাল আয়োজন করে বৈশাখের প্রথম দিন। আমার স্টল করেছিল পি আর প্লাসিড নামে জাপানে বসবাস করা এক বাঙালি যুবক। জায়গাটার নাম সম্ভবত ‘ইকেবুকোরা’। সেখানকার ‘নিশিগুচি’ পার্কে আয়োজন। ওই পার্কেই শহীদ মিনার করা হয়েছে। শহীদ মিনার উদ্বোধনেও আমি উপস্থিত ছিলাম। যে গৌরবময় ঘটনার সঙ্গে জড়িত হলাম জাপানে, তা হল জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘তাকেশি কায়েকো মেমোরিয়াল এশিয়ান রাইটারস লেকচার সিরিজ’ এ বাংলা ভাষার একমাত্র লেখক হিসেবে জাপানের চারটি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে বক্তৃতা দিতে যাওয়া। সেখানে শ্রোতাদের পাশাপাশি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক ছিলেন অনেক। সাওরি তাকাহাসি নামে আমার একজন গাইড ছিল। সে ভালো বাংলা জানে। সাংবাদিকরা একপর্যায়ে ঘিরে ধরে আমাকে। অনেক কথা হয় তাদের সঙ্গে। মূল ঘটনার এ হচ্ছে আসলে ভূমিকা। 

সেই ঘটনার সাত আট বছর পর অলিম্পিক গেমস হচ্ছে লন্ডনে। বাংলাদেশের একজন তীরন্দাজ কোয়ালিফাই করেছেন। তাঁর নাম ইমদাদুল হক মিলন। এই নাম শুনে একজন জাপানি সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই নাম তোমার কী করে হলো? তোমাদের দেশে তো এই নামে একজন বিখ্যাত লেখক আছেন।’ আর্চার ইমদাদুল হক মিলন তাঁকে বললেন, ‘আমার বড়ভাই ওই লেখকের খুবই ভক্ত। বড়ভাইয়ের সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান অনেক। আমার জন্মের পর তাই তিনি প্রিয় লেখকের নামে আমার নাম রেখেছেন।’ 

কীসে আমাকে পাঠকের কাছে জনপ্রিয় করে রেখেছে তা বুঝিয়ে বলা মুশকিল। যদি বলা হয় কোন কৌশল অবলম্বন করে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছি সেই কৌশল নিয়েও আসলে বলার কিছু নেই। প্রথম দিকে ওইসব প্রেমের গল্প উপন্যাস হয়তো বড় ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি তো নানারকম লেখার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয় এটা একটা কারণ। সর্বস্তরের পাঠককে নিজের লেখা পড়াতে পারাটাকে কৌশল বলা যেতে পারে।

স্বকৃত নোমান
আমার জানা মতে আপনার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন।’ যদি আপনার সেরা উপন্যাসগুলোর একটা তালিকা তৈরি করি, তাহলে আবশ্যিকভাবে ‘যাবজ্জীবন’কে রাখতে হবে। সাধারণত যে কোনো ঔপন্যাসিকের প্রথম উপন্যাস খানিকটা দুর্বল হয়ে থাকে, অথচ আপনার ক্ষেত্রে উল্টো―‘যাবজ্জীবন’ সবল। এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? উপন্যাসটি রচনার পেছনের কথা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।

ইমদাদুল হক মিলন
‘যাবজ্জীবন’ লেখার পিছনের ঘটনাটা বলি। ’৭৬ সালের কথা। তখন ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ খুব জনপ্রিয় পত্রিকা। ‘বিচিত্রা’য় আমার একটা গল্প ছাপা হয়েছে। সম্ভবত ‘না সজনী’ নাকি ‘ফুলের বয়স’ ঠিক মনে করতে পারছি না। পরের সপ্তাহে বাংলা একাডেমিতে গিয়েছি। দোতলার একটা রুমে পাশাপাশি বসেন রশীদ হায়দার আর সেলিনা হোসেন, অন্যপাশের টেবিলে রফিক আজাদ। রশীদ হায়দার আমার বন্ধু জাহিদ হায়দারের বড়ভাই। তাঁর সামনে গিয়ে বসেছি। রফিক আজাদ আমাকে চেনেন না। চেনার অবশ্য
কারণও নেই। আমি তখন কে? ঠিক তখনই রফিক আজাদ রশীদভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই রশীদ, ‘বিচিত্রা’য় ইমদাদুল হক মিলন নামের একটা ছেলের গল্প বেরিয়েছে। তুই তাকে চিনিস?’ রশীদভাই হেসে বললেন, ‘এই তো আমার সামনে বসে আছে।’ রফিকভাই আমাকে ডাকলেন। গেলাম তাঁর টেবিলে। চা খাওয়ালেন। তিনি তখন বাংলা একাডেমির পাক্ষিক ‘উত্তরাধিকা’ পত্রিকার সম্পাদক। উত্তরাধিকারের জন্য গল্প চাইলেন। দশদিন সময় দিলেন। কবি রফিক আজাদ আমার গল্প চেয়েছেন, তা-ও বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকার জন্য, এ তো আমার জন্য বিশাল ব্যাপার! 

বাড়ি এসে সেদিনই লিখতে বসে গেলাম। মাথায় একটা ঘটনা ছিল। বলতে গেলে কৈশোর স্মৃতি। মাওয়ায় যেখানে পদ্মাসেতু এর পশ্চিমে এখন দু’তিন কিলোমিটার নদীর ভিতরে চলে গেছে মাওয়ার সেই পুরনো বাজার। বাজারের দক্ষিণ পশ্চিম পাশটায় বিশাল প্যান্ডেল করে সার্কাস পার্টির আয়োজন হয়েছিল একবার। সেই সার্কাস দেখতে গিয়ে সার্কাসের জোকারকে দেখে, একটা ঘোড়া নিয়ে তার কৌতুক করা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তালুকদার বাড়ির উপর দিয়ে স্কুলে যাই সকালবেলায়। তালুকদাররা কাজীরপাগলা এলাকার জমিদার ছিলেন। ষাটের দশকের শুরুর দিকেই তাদের বাড়ি প্রায় পরিত্যক্ত। দালানগুলো ধ্বসে পড়েছে। তালুকদারদের গরিব আত্মীয় স্বজনরা থাকে। পরিত্যক্ত একটি দালানে স্বাস্থ্যবতী কিন্তু আধা পাগলা ধরনের এলোমেলো এক যুবতীকে বসে থাকতে দেখতাম। একদিকে সার্কাসের সেই জোকার লোকটি, আরেকদিকে এই যুবতী। এই দুটো চরিত্র ঘুরছিল মাথায়। অন্যদিকে মাওয়ার বাজারের মমিনা পাগলার কথা খুব মনে হত। একেবারেই চুপচাপ ধরনের পাগল। বাজারে ঘুরে বেড়াত। নিতাই নাপিতের কাছে আমরা চুল কাটাতাম সেই বাজারে। নিতাই দেখতে সুপুরুষ। টকটকে ফর্সা গায়ের রং। নাপিতদের বাড়ির ছেলে এত সুন্দর হয়, ভাবা যায় না। নিতাইও ছিল স্মৃতিতে। লেখার সময় এইসব চরিত্র মাথায় আসতে লাগল। লিখতে শুরু করলাম। 

দশদিন পর দেখি ফুল স্কেপের ১৮ পৃষ্ঠা লিখেছি কিন্তু লেখা শেষ হয়নি। ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে লাগল। কোন মুখে রফিক আজাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াব। তিনি কী ভাববেন? ওই ১৮ পৃষ্ঠা নিয়েই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম একদিন। তিনি উৎফুল্ল। ‘দাও, লেখা দাও।’ আমি কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বললাম, ‘লেখা শেষ করতে পারিনি রফিকভাই। বড় হয়ে গেছে।’ রফিকভাই অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতি নবীন এক লেখক রফিজ আজাদ বলার পরও ‘উত্তরাধিকার’ এর জন্য গল্প শেষ করে আনেনি, এ তো দুঃসাহসিক ঘটনা! খুবই বিরক্ত হয়ে তিনি লেখাটা নিলেন। বললেন, ‘এক সপ্তাহ পরে এসে খবর নিয়ো। 

তখন এক পৃষ্ঠা ফটোকপি করতে দু’টাকা লাগে। আঠারো পৃষ্ঠা ফটোকপি করতে হলে ৩৬ টাকা দরকার। তা-ও ফটোকপির মেশিন মতিঝিল ছাড়া কোথাও পাওয়া যায় না। আমার পকেটে তখন ১০/২০ টাকাও থাকে না। নিজের লেখা ৩৬ টাকা খরচ করে ফটোকপি করব ভাবতেই পারি না। মূলকপি রফিকভাইকে দিয়ে এলাম। খবর নিতে গেলাম পরের সপ্তাহে। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘এই লেখা জোর করে ছোট করার চেষ্টা করবে না। যেভাবে এগোচ্ছে সেভাবেই এগোবে। লিখতে থাকো। আমি ছাপবো।’ দেড় বছর ধরে লেখাটি তিনি ছাপলেন। আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ এইভাবে লেখা হল। কী সৌভাগ্য আমার, ‘উত্তরাধিকার’ এ তখন ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছিলেন আবু ইসহাক। তাঁর উপন্যাসের নাম ‘মুখর মাটি’। পরে এই উপন্যাসটিই ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। জীবনের প্রথম উপন্যাস ছাপা হয়েছিল শ্রদ্ধেয় ঔপন্যাসিক আবু ইসহাকের পাশাপাশি! এ এক বিরল সৌভাগ্য। 

‘যাবজ্জীবন’ আমাকে দেশের খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিকদের নজরে এনেছিল। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরি এইসব শ্রদ্ধেয় কবি নানাভাবে আমাকে উৎসাহিত করতে লাগলেন। শহীদ কাদরি তাঁর কলামে উপন্যাসটির প্রশংসা করলেন। শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও হুমায়ুন আজাদ উপন্যাসটি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলতে শুরু করলেন। আমাদের সাহিত্যের আরেকজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমার নাম শুনে বাংলা একাডেমিতে একদিন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। স্যার খুব ভালবেসেছিলেন আমাকে। এইসবের মূলে ছিল ‘যাবজ্জীবন’।
স্বকৃত নোমান
উপন্যাস লেখার আগে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল? কী ধরনের বই পড়তেন? কোন বইটি আপনার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল?

ইমদাদুল হক মিলন
আসলে আমার কোনও প্রস্তুতি ছিল না। শৈশব থেকেই কল্পনাপ্রবণ ছিলাম। নানির বুকের কাছে শুয়ে শুয়ে তাঁর মুখে গল্প শুনতাম। বাইরে নিঝুম হয়ে নেমেছে বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই। আমার নানি সেই আমলে বাংলা পড়তে ও লিখতে জানা মানুষ। তিন শরিকের বাড়ি। কোনও কোনও পূর্ণিমা সন্ধ্যায় বাড়ির মহিলারা পাটি বিছিয়ে উঠোনে বসতেন। আশপাশের বাড়ি থেকেও কেউ কেউ আসতেন। নানি তাদের মাঝখানে বসে হারিকেনের আলোয় ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উচ্চস্বরে পড়তেন। পড়তে পড়তে নিজে কাঁদতেন, অন্য মহিলারাও কাঁদতেন। বড় হয়ে আমার মনে হয়েছে একটি বইয়ের কী বিপুল শক্তি থাকলে মানুষকে ওভাবে কাঁদাতে পারে! নানির ছোট একটি বইয়ের আলমারি ছিল। সেখানে অনেকগুলো ধর্মীয় বইয়ের সঙ্গে ছিল মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’, ছিল বক্মিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডুলা’, ‘সীতারাম’ আর ‘দূর্গেশনন্দিনী’। শরৎচন্দ্রের বই ছিল অনেকগুলো। ‘দেবদাস’, ‘দত্তা’, রামের সুমতি’, ‘বড়দিদি’। নজরুলের ‘অগ্নিবীনা’ বইটি ছিল। আর ছিল নজিবুর রহমান সাহিত্যরত্ন নামে এক ভদ্রলোকের লেখা তিনটি বই। ‘আনোয়ারা’, ‘মনোয়ারা’, ‘গরিবের মেয়ে’। এসব বইয়ের পাশাপাশি ছিল ‘ঠাকুমার ঝুলি’ ও নানা রকমের রূপকথার বই। 

নানি রোজ রাতেই আমাকে গল্প শোনান। ডালিমকুমারের গল্প, তেপান্তরের মাঠের গল্প, দৈত্য দানবের গল্প। এসব শুনে শুনে একটা কল্পনার জগত তৈরি হয়েছিল আমার মধ্যে। নিজেকে আমি ডালিমকুমারের চরিত্রে দেখতে পেতাম। তেপান্তরের মাঠের মধ্য দিয়ে যেন ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছি। আমি যেন এক রূপকথার রাজপুত্র। তখনকার বর্ষাকাল খুব দীর্ঘ ছিল। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। একটানা দশদিন বারোদিন ধরে পড়ছে। রোদের দেখা নেই। বাড়ির উঠোন পালান ভেসে গেছে বর্ষার জলে। আলমারির বইগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে যেত। শীতকালে সেই বই উঠোনে মেলে দিতেন নানি। পাটি বিছিয়ে তার উপর মেলে দেওয়া হয়েছে বই। বাড়ির মুরগিগুলো বা কাক শালিক বইয়ের কাছে যাতে না আসতে পারে সেজন্য আমার হাতে একটা কঞ্চি দিয়ে বইয়ের সামনে বসিয়ে রাখতেন। নানিকে আমি ডাকতাম বুজি। রোদে দেওয়া বইগুলো থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ আসত। আশ্চর্য ব্যাপার এখনও সেই দৃশ্যটা আমি চোখে দেখতে পাই। বইয়ের গন্ধটা দূর শৈশব অতিক্রম করে এখনও আমার নাকে এসে লাগে। 

সেইসব দিনে কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে, যাঁরা এসব বই লিখেছেন তাঁরা অনেক বড় মানুষ। লেখক জীবনে এসে প্রচুর আবর্জনা লেখার পাশাপাশি কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে, আমি ওরকম একটা বই লিখতে চাই। যে বইটির গন্ধ বহুকাল অতিক্রম করে পাঠকের নাকে এসে লাগবে। হয়তো এই জীবনে সেই স্তরের বই লেখা হবে না। হয়তো আমি ওই পর্যায়ের লেখক নই। উপন্যাস লেখার আগে আমার কোনও প্রস্তুতি ছিল না। ‘যাবজ্জীবন’ কিভাবে লেখা হয়েছে বললাম। তাতেই বোঝা যায় কোনও প্রস্তুতি না নিয়ে লেখা। লিখতে লিখতে লেখাটা হয়ে গিয়েছিল।

সেই সময় যা পেতাম তাই পড়তাম। প্রথম আলোড়িত হয়েছিলাম শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’ পড়ে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘ছুটি’, ‘অতিথি’ আর ‘পোষ্টমাষ্টার’ দারুণ আলোড়িত করেছিল। নীহাররঞ্জনের ডিটেকটিভ কাহিনি, বিদেশি লেখকদের নানা ধরনের অভিযান কাহিনির অনুবাদ খুব আকৃষ্ট করেছিল। লিখতে শুরু করার আগেই পড়েছিলাম বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’ আর ‘আরণ্যক’। তারাশঙ্করের ‘কবি’ আর ‘গণদেবতা’, ‘রাইকমল’ও সেই সময়ে পড়া। এসব বই খুব আলোড়িত করেছিল। মনে দাগ কেটেছিল ‘পথের পাঁচালি’।

স্বকৃত নোমান
যার শৈশব-কৈশোর যত সমৃদ্ধ, তার লেখা তত সমৃদ্ধ। আপনার লেখায় সেই সমৃদ্ধি আমরা দেখতে পাই। জন্মগ্রাম বিক্রমপুরের মেদেনীমণ্ডল আপনার লেখায় ঘুরেফিরে আসে। আসে পদ্মা নদী, আসে গ্রামের মানুষজন। পদ্মা-তীরবর্তী সেই মেদেনীমণ্ডল গ্রামে আপনার শৈশব-কৈশোর কেমন ছিল? একটু বিস্তারিত যদি বলেন...।

ইমদাদুল হক মিলন
মেদেনীমণ্ডল গ্রামে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত নানির কাছে ছিলাম। তখনকার মেদেনীমণ্ডল কেমন ছিল এখনকার মানুষজন তা ভাবতেই পারবে না। এখন মেদেনীমণ্ডলের উপর দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-মাওয়া সড়ক আর রেললাইন। মাওয়া প্রান্তে যে টোলপ্লাজা তার পশ্চিমে হাজারখানেক গজের মধ্যে আমার নানাবাড়ি। যেখানে টোলপ্লাজা আমার ছেলেবেলার বর্ষাকালে সেখানটায় দশ এগারো হাত পানি থাকত। কী নির্জন গ্রাম! গ্রীষ্মকালকে ওই অঞ্চলের মানুষ বলে খরালিকাল। ‘খরালি’ নামে আমি গল্প লিখেছি। রোদে পুড়ে যাওয়া একেকটা দিন। মাঠের দিকে তাকালে দেখা যায় ধানপাট আর তিল কাউনের ক্ষেতের উপর দিয়ে রোদের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। বারবাড়ি থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে দেখা যায় বিল। ওদিকটায় গ্রামের গোরস্থান। সেখানে বাঁশঝাড় শনশন করে দিনমান। তারও কিছুটা দূরে একলা একটি বাড়ি। বাড়িটি ছাড়াবাড়ি। একদা বসতি ছিল। ডাকাতের ভয়ে সেই বাড়ি ছেড়ে গৃহস্থলোক গ্রামের দিকে চলে এসেছে। লোকে বলে ‘বিলের বাড়ি’। বিশাল একটি শিমুলগাছ আছে বাড়িতে। বিস্তৃত বিলের চারদিক থেকে দেখা যায় গাছটি। রৌদ্রতপ্ত দুপুরে মানুষের চিহ্ন নেই বিলে মাঠে। দুয়েকটা ক্লান্ত গরু চড়ে বেড়ায়। হেমন্তের সোনালি ধানে ভরে যেত বিল। দুপুর থেকে শুরু হত ডাহুকের ডাক। কত পাখি ছিল তখন। কত মাছ ছিল। সেই বিলে বিশাল একটা দিঘি ছিল। দিঘির দিকটায় ডাহুক ছিল বিস্তর। কোনও কোনও উদাস বিকেলে বিলপাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি। দিঘির ধারে খেলতে চলে গেছি বন্ধুদের সঙ্গে। এখনও চোখে ভাসে সেইসব দিন। 

পুরনো দিনের গান শুনতে আমি খুব ভালোবাসি। ছেলেবেলা থেকেই শুনে আসছি অমল মুখোপাধ্যায়ের গান। তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ছোটভাই। শেষদিকে আর গান করেননি। সুরারোপ করতেন। তাঁর সুরের বিখ্যাত গান গীতা দত্তের ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’। খুব মিষ্টি কণ্ঠ ছিল অমল মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর দু’তিনটি গানের কথা আমার মনে আছে। ‘এই পৃথিবীতে সারাটি জীবন’ ‘উড়ে যা উড়ে যা আকাশে, কাঞ্চন পিঞ্জিরা দিলাম খুলে’। 

কিন্তু যে গানটি আমাকে এখনও সেই ছেলেবেলার বিকেলগুলোতে টেনে নেয় সেই গানটি হল ‘পদ্মদিঘির ধারে ধারে, ডাহুক ডাকা মাঠের পাড়ে, কানামাছি খেলার কথা যায় কী ভোলা, মনে আজ সেই ভাবনা দেয় দোলা’। এই গান শুনে এখনও আমি ফিরে যাই বিলের মধ্যকার সেই দিঘিটির ধারে। আমরা খেলছি আর ডাহুক পাখিগুলো ডেকেই চলেছে। গল্প লিখেছি ‘হেমন্তের ডাহুকপাখি’। কত ধান ছিল মাঠজুড়ে। কী সুন্দর সুন্দর নাম ধানের। সোনাদিঘা, লক্ষ্মীদিঘা। ধানকাটা নিয়ে শ্রমিকদের সংঘর্ষ। ধান শ্রমিকদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলাম ‘ভূমিপুত্র’। বাড়ির উঠোনে ধান মাড়াইয়ের স্মৃতি। ধানি মাঠের ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান তুলতে গিয়ে সাপের কামড়ে মরছে গরিব বাড়ির শিশু। কত ধান মাঠজুড়ে। তারপরও গরিব মানুষের ঘরে ভাত নেই। খড়ায় নষ্ট হয়েছে ফসল। গ্রাম জুড়ে হাহাকার। গল্প লিখেছি ‘নিরন্নের কাল’। পদ্মার ভাঙনে উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ। এই নিয়ে লিখেছিলাম ‘নদী উপাখ্যান’। 

আমার গ্রাম জীবনের উপন্যাসগুলো সবই বিক্রমপুরের মেদেনীমণ্ডল ও তার চারপাশের গ্রাম ও মানুষজন নিয়ে লেখা। বর্ষার মুখে মুখে পদ্মা থেকে খাল বেয়ে গ্রামে ঢুকছে নতুন পানি। হাতের আঙুলের মতো ছড়ানো ছিটানো খাল চারদিকে। আকাশ থেকে একটানা ঝরছে বৃষ্টি। খালের পানি উপচে ডুবে যাচ্ছে গ্রামের ডোবা নালা পুকুর। বিল প্রান্তর ভেসে যাচ্ছে। মাছের প্রজনন মৌসুম। চারদিকে শুধুই মাছ আর মাছ। গ্রামের মানুষ দিনরাত মাছ ধরছে। মাছের সঙ্গে কত কিংবদন্তি। ওই সময়টাকে লোকে বলে জোয়ারের দিন। গল্প লিখেছিলাম ‘জোয়ারের দিন’ নামে। ‘অধিবাস’ উপন্যাসে আছে ওই সময়কার বর্ণনা। প্রতিবছরই বন্যা হত। বাড়ির উঠোন পালান ডুবিয়ে ঘরে ঢুকে যাচ্ছে পানি। দশদিন বারো দিনে রোদের দেখা নেই। বৃষ্টি পড়ছেই। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে হয় কোমড় পানি ভেঙে। ছোট্ট একটি উপন্যাস লিখেছিলাম, ‘বাঁকাজল’। রবীন্দ্রনাথের সেই লাইন মাথায় ছিল। ‘চারিদিকে বাঁকাজল করিছে খেলা’। একদিকে বন্যার জলে ডুবছে বাড়িঘর, অন্যদিকে পরিবারের ভিতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সম্পর্কের এক জটিল জলস্রোত। ভোরবেলাকার কুয়াশা ভেঙে ভারে করে খেজুরের রস নিয়ে আসছে কান্দিপাড়ার দবির গাছি। শীতে জুবুথুবু হয়ে বারবাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গাছি আসবে। কখন কাঁচা রস খাবো। রস জ্বাল দিয়ে পাতলা গুড় বানাবেন বুজি। হাঁড়িতে ছেড়ে দেবেন নারকেল কোড়া। কী অপূর্ব গন্ধ উঠবে। খেতে কী স্বাদ! এই দবির গাছি চরিত্র হয়ে এসেছিল ‘নূরজাহান’ উপন্যাসে। 

ঠাকুর বাড়িটি ছিল গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা ছোট্ট এক টুকরো বনভূমি। মনীন্দ্র ঠাকুর ছিলেন এক অসামান্য চরিত্র। তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলাম ‘অধিবাস’। উপন্যাসের শেষে যে মানুষটি গভীর খেদ থেকে বলেছিলেন, ‘মানুষ আর মানুষ নাই। হয় হিন্দু হইয়া গেছে না হয় মুসলমান।’ নানিবাড়ির পাশে ছিল হাজামবাড়ি। কত গল্প কথা এই বাড়ির মানুষগুলোর মুখে মুখে। আমি সারাদিন পড়ে থাকি সেই বাড়িতে। গাবগাছে অচিন সুরে ডাকে এক পাখি। নানা বাড়ির পুকুরের কচুরির তলা থেকে মাথা তোলে অতিকায় এক গজার মাছ। ভয় পেয়ে ছুটে আসি। এই তো আমার শৈশব কৈশোর। ‘কেমন আছ, সবুজপাতা’ উপন্যাসে সব লিখেছি। ‘যাবজ্জীবন’, ‘কালোঘোড়া’য় টুকরো টাকরা ভাবে লিখেছি। 

হাজাম বাড়ির বুড়ো মানুষটিকে নিয়ে সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষায় লিখেছিলাম ‘কালাকাল’। হাজাম সম্প্রদায় নিয়ে বাংলাভাষায় কোনও উপন্যাস আছে কিনা, জানি না। পদ্মা তখন এতই বিশাল, মনে হত সমুদ্র কী এরচেয়েও বড় হয়। ‘কুমারভোগ’ এর ওদিক দিয়ে পদ্মাতীরে গিয়ে দাঁড়িয়েছি কোনও কোনও বিকেলে। নদীর দিকে তাকিয়ে মন উদাস হয়েছে। নদীর হাওয়ায় ফুরফুর করে উড়ছে মাথার চুল। হাওয়ায় নদীজলের গন্ধ। কত পাল তোলা নৌকা নদীতে। পুবে যায়, পশ্চিমে যায়। কোথার, কোন অচিন দেশে যায় মাঝিরা? এসব জানতে ইচ্ছে করে। নিজেকে এখনও কোনও কোনও বিকেলে পদ্মার নির্জন তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। এ যেন অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা। ওই জীবনটাই তো আমার ছিল। সম্ভবত এই কারণেই আত্মজৈবনিক রচনাটির নাম দিয়েছিলাম ‘যে জীবন আমার ছিল’।

স্বকৃত নোমান
আপনার শিক্ষাজীবন নিয়ে জানতে আগ্রহী। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং তৎপরবর্তী পড়ালেখা কোথায় করেছিলেন?

ইমদাদুল হক মিলন
আমি ক্লাস ওয়ানে পড়িনি। ক্লাস টুতে ভর্তি হয়েছিলাম বিক্রমপুরের কাজীর পাগলা এটি ইনস্টিটিউশনে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত সেই স্কুলে। তারপর ঢাকার গেন্ডারিয়া হাইস্কুল। তারও পরে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইএসসি, ইকোনমিকসে অনার্স।

স্বকৃত নোমান
লেখালেখি কি ছাত্রজীবনেই শুরু করেছিলেন? লেখক হওয়ার ব্যাপারে কীসে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছিল? কোনো ব্যক্তি, কোনো বই, কোনো ঘটনা? আপনার কি মনে পড়ে?

ইমদাদুল হক মিলন
প্রথম লেখা ১৯৭৩ সালে। ছোটদের গল্প ‘বন্ধু’। তখনকার ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘চাঁদের হাট’ এ ছাপা হয়েছিল। একজন তরুণ লেখককে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। গেন্ডারিয়াতে ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’ নামে পাঠাগার আছে। আমার জন্মের বছরে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৫৫। সেই পাঠাগারে গিয়ে বই পড়তাম। ওখানে সেই তরুণ লেখকও মাঝে মাঝে আসতেন। তাঁর লেখা নিয়মিতই পত্রপত্রিকাতে ছাপা হয়। তখনও পর্যন্ত আমার ধারণা বই পড়লেই লেখক হওয়া যায়। আমার এত বই পড়ার নেশা। ওই ছেলে যদি লিখতে পারে তা হলে তো আমারও পারার কথা! এভাবেই শুরু।

স্বকৃত নোমান
লেখকের কি অনুপ্রেরণার দরকার হয়? একটা উপন্যাস বা গল্প লেখার প্রেরণা আপনার মধ্যে কীভাবে জারিত হয়?

ইমদাদুল হক মিলন
এক ধরনের অনুপ্রেরণার দরকার হয়। কোনও চরিত্র বা ঘটনা লেখককে অনুপ্রাণিত করে। আমি আসলে সারাক্ষণ লেখার মধ্যেই থাকি। মনে মনে ঘুরে বেড়াই ফেলে আসা মেদেনিমণ্ডল গ্রামে। কত চরিত্র সেখানে, কত ঘটনা। কত শ্রেণী বিভেদ। কত অভাব আর সুখ দুঃখের ঘটনা। এসব লিখতে চাই। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়াই। কত রকমের মানুষ দেখি। কত ঘটনা মানুষের জীবনে। প্রতিদিন চারপাশের জীবনে ঘটছে কত টানাপোড়েন। এইসব থেকে অনুপ্রাণিত হই।

স্বকৃত নোমান
আমি যদি আপনার সেরা উপন্যাসগুলোর একটা তালিকা তৈরি করি, তার মধ্যে ‘কালোঘোড়া’কে প্রথম দিকে রাখব। কী সুসহংত এই উপন্যাসের ভাষা! কী চমৎকার এর বুনন! উপন্যাসটির লেখার পেছনের কথা জানতে চাই।

ইমদাদুল হক মিলন
আমি তখন জার্মানিতে। ১৯৮০ সালের কথা। অভাবের সংসারে বড় হয়েছি। গিয়েছিলাম টাকা রোজগার করে সংসারের চেহারা বদলাবার আশায়। গিয়ে পড়েছিলাম এক কষ্টকর শ্রমিক জীবনের ভিতরে। এত কষ্টের কাজ, শরীরে কুলাত না। এক দু’মাস কাজ করে তিন চারমাস হয়তো বসে আছি। লেখার পোকা মাথা থেকে যায়নি। আমি থাকতাম বিখ্যাত আবদুল্লাহ আল মামুনের ছোটভাই আবদুল্লাহ আল হারুনের সঙ্গে। স্টুটগার্টের পাশে ছোট্ট একটি শহর, ‘সিনডেলফিনগেন’। ছোট হলেও শহরটি খুব বিখ্যাত। ‘মার্সিডিজ বেঞ্জ’ কোম্পানির মূল কারখানাটি এই শহরে। 

আবদুল্লাহ আল হারুন ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন বাংলাদেশের একটি কলেজে। সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। আমি কাজ ছেড়ে দিয়ে বসে আছি। ভাবলাম একটা উপন্যাস লিখি। কী নিয়ে লেখা যায়? মনে পড়ল কাজীর পাগলা বাজারের এক হিন্দু মিষ্টি দোকানদারের কথা। পাশাপাশি বিক্রমপুরের ওই গ্রামগুলোতে কেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়টা। লিখতে বসে দেখি গড়গড় করে লেখা এগোচ্ছে। একটা করে চ্যাপ্টার লিখি। আবদুল্লাহ আল হারুনকে পড়তে দেই। তখন আমার হাতের লেখা গোটাগোটা, পরিষ্কার। এখন সেই লেখার এমন দুরাবস্তা, নিজের লেখা নিজের পড়তেই অসুবিধা হয়। 

যা হোক, হারুন সাহেব খুবই আগ্রহ নিয়ে লেখাটা পড়েন। আমাকে উৎসাহ দেন। এইভাবে লেখা হয়েছিল ‘কালোঘোড়া’। শেষ করে পাঠিয়ে দিলাম ‘রোববার’ পত্রিকায় রফিক আজাদের কাছে। সে বছরের ঈদ সংখ্যায় ছাপা হলো। এখন একটা কথা ভেবে শিউরে উঠি, কালোঘোড়ার জেরক্স কপি আমি রাখিনি। জার্মানি থেকে ডাকে পাঠিয়েছিলাম। যদি কোনও কারণে হারিয়ে যেত তা হলে ওই উপন্যাস আমি আর জীবনে লিখতে পারতাম না। ‘গাহে অচিন পাখি’ গল্পটিও জার্মানিতে বসেই লিখেছিলাম। ‘যাবজ্জীবন’ থেকেই গ্রামজীবন নির্ভর লেখাগুলোর মধ্যে নির্বিচারে বিক্রমপুরের আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছি। ‘কালোঘোড়া’র ভাষাতেও তা-ই ছিল।

স্বকৃত নোমান
যে ইমদাদুল হক মিলন যাবজ্জীবন, উপনায়ক, ভূমিপুত্র, পরবাস, কালোঘোড়া, নদী উপাখ্যান, পরাধীনতা, টোপ বা রজনীগন্ধাপুর-এর মতো উপন্যাস লিখলেন, তিনিই কিনা এমন সব উপন্যাস লিখলেন, যেগুলো পড়লে বোঝা যায় পাঠক-রুচির সঙ্গে আপনি আপস করেছেন। এই আপস কেন? নাকি আপনি একে আপস বলবেন না?

ইমদাদুল হক মিলন
একটা পর্যায়ে পাঠক রুচির সঙ্গে অবশ্যই আপস করেছি। করেছি রোজগারের আশায়। কারণ তখন আমাকে লেখার পয়সার উপর নির্ভর করে জীবন চালাতে হয়েছে। যে বই বেশি চলে সেই ধরনের বই লিখতে হয়েছে। ঈদ সংখ্যার পাতা ভরাতে হয়েছে। আমি বোধহয় বাংলাদেশের প্রথম লেখক যে প্রকাশকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতে শুরু করেছিলাম। বড় বড় পত্রিকার ঈদ সংখ্যার লেখার জন্যও অগ্রিম নিয়েছি। একটা কারণও ছিল। বই বেরোয়, এক এডিসন শেষ হয়ে আরেক এডিসন হয়, প্রকাশক টাকা দিতে চান না। পত্রিকার ক্ষেত্রেও তাই। লেখার টাকার জন্য দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিতে হয়। যেন আমি এক ভিখিরি কিংবা কারও কাছে সাহায্য চাইতে গেছি। এই কারণে অগ্রিম নেওয়া।

স্বকৃত নোমান
টাকার জন্য অনেকে উপন্যাস লেখে। পৃথিবীর বিখ্যাত লেখকরা লিখেছেন, আপনিও লিখেছেন। কিন্তু লেখক কি আসলেই টাকার জন্য লেখেন, নাকি অন্তর্গত তাড়না থেকে লেখেন? অর্থাৎ শুধুই কি টাকার জন্য আসলে লেখা যায়, নাকি অন্তর্গত তাড়নাও থাকতে হয়? আপনি কীভাবে দেখেন এ বিষয়টাকে?

ইমদাদুল হক মিলন
অন্তর্গত তাড়না অবশ্যই থাকতে হয়। টাকা পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে লিখতে হলে অন্তর্গত তাড়নার জায়গাটি এলোমেলো হয়ে যায়। ধরা যাক, আমার দ্বিতীয় উপন্যাসটির কথা। ‘ও রাধা ও কষ্ণ’। এই উপন্যাসটি অন্তর্গত তাড়না থেকেই লিখেছিলাম। বইটি যখন জনপ্রিয় হয়ে গেল তখন মনে হল এই ধরনের আরও কিছু লেখা লিখি। বসলেই তো লেখা যায়! লেখাও হল পয়সাও হল। তেমন কোনও ভাবনা চিন্তা করতে হয় না। মোটাদাগের একটা স্যাঁতসেঁতে কাহিনি লিখতে পারলেই হল। 

তবে, প্রকৃত লেখককে এই ধরনের ভাবনা কষ্টও দেয়। তিনি এক ধরনের অন্তর্জ্বালায় ভোগেন। এই অন্তর্জ্বালাটা আমার এখন তীব্র। প্রায়ই ওইসব লেখার কোনও কোনওটি পড়তে গিয়ে মনে হয়, হয় এই লেখাটি চিরতরে বাতিল করে দেই অথবা নতুন করে লিখি। খারাপ লেখার দায়ভারও তো আমারই!

স্বকৃত নোমান
আপনার সবচেয়ে আলেচিত উপন্যাস ‘নূরজাহান’, যদিও পাঠক হিসেবে আমি ‘কালোঘোড়া, পরাধীনতা ও যাবজ্জীবনকে এগিয়ে রাখব। সে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। নূরজাহান বেশ আলোচিত। দুই বাংলায় বহুল পঠিত। উপন্যাসটি লেখার পরিকল্পনা কীভাবে মাথায় এসেছিল? কতদি লেগেছিল এটি লিখতে?

ইমদাদুল হক মিলন
১৯৯৩ সালের কথা। আগের বছরের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছি। বইমেলায় ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছে। বিনোদনের স্টলে বসে অবিরাম অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছি। একটা পর্যায়ে এমন হচ্ছে ডান হাতের অবস্থা, হাত মুঠো করতে পারি না, নাড়াতে পারি না। স্টলের ছেলেরা হাত ম্যাসেজ করে দেয়। এক সন্ধ্যায় ভীড়ের মধ্যে এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তাঁর দিকে হাত বাড়ালাম। ভাবছি বই এগিয়ে দেবেন অটোগ্রাফের জন্য। তিনি বললেন, ‘আমি আপনার বইটা আগেই নিয়েছি। পড়েও ফেলেছি। এইসব ছাইপাশ কী লিখছেন আপনি? অল্প বয়সি ছেলেমেয়েদে মাথা নষ্ট করছেন। যে আপনি ‘যাবজ্জীবন’, ‘নিরন্নের কাল’, ‘কালোঘোড়া’, ‘পরাধীনতা’, ‘ভূমিপুত্র’র মতো উপন্যাস লিখেছেন সেই আপনার এই অধঃপতন? ছি!’ 

শুনে আমি একেবারে নিভে গেলাম। বিশাল ধাক্কা লাগল বুকে। সেই সময় আমার অবস্থা সিনেমার নায়কদের মতো। বাংলা একাডেমিতে শত শত ছেলেমেয়ে ঘিরে রাখে। তাদের চোখ এড়িয়ে বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়ে এলাম। থাকি গেন্ডারিয়ায়। বাংলা একাডেমি এলাকা থেকে অনেকটাই দূরে। ওই অতটা পথ একা একা হেঁটে গেলাম। মহিলার কথাগুলো কানে বাজছে। তার আগের বছর নূরজাহানের ঘটনা ঘটেছিল মৌলভী বাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ছাতকছড়া গ্রামে। দ্বিতীয় বিয়ের অপরাধে গ্রামের মাওলানা নূরজাহানকে মাটির গর্তে পুতে একশো একটি পাথর ছুড়ে মেরেছিল। এই অপমানে মেয়েটি আত্মহত্যা করে। আমার খুবই অনুরক্ত ছিল তরুণ সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম মিন্টু। সে কাজ করত ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায়। বিনোদনের স্টলে এসে আমার সঙ্গে বসে থাকত। 

মিন্টু একদিন বলেছিল, ‘নূরজাহানকে নিয়ে উপন্যাস লেখেন, মিলনভাই। গেন্ডারিয়ার দিকে হাঁটতে হাঁটতে কথাটা মনে পড়েছিল। কিন্তু নূরজাহানকে নিয়ে উপন্যাস লেখার একটি সমস্যা আছে। যে অঞ্চলে ঘটনা ঘটেছে সেই অঞ্চলের ভাষা ও পরিবেশ আমার জানা নেই। কী করা যায়? কয়েকদিন খুব ভাবলাম। তারপর মনে হল, বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে নূরজাহানদের অভাব নেই। কত কত নূরজাহান এভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, নিগৃহিত হচ্ছে। তাদের খবর আমরা জানি না। সুতরাং নূরজাহানকে একটি প্রতিকী চরিত্র হিসেবে তৈরি করতে পারলে ভাল হয়। 

নূরজাহানকে আমি বিক্রমপুরে নিয়ে এলাম। আমার মেদেনীমণ্ডল গ্রামে। তার সঙ্গে এল এই অঞ্চলের প্রচুর চেনা চরিত্র। বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে তৈরি হল বহু ঘটনা। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ আমার নখদর্পণে। লিখতে শুরু করলাম। শহীদুল ইসলাম মিন্টুই ধারাবাহিকভাবে ছাপার ব্যবস্থা করল। ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকার সাপ্তাহিক কাগজ ছিল ‘খবরের কাগজ’। ‘নূরজাহান’ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হল এই পত্রিকায়। ‘খবরের কাগজ’ খুবই জনপ্রিয় ছিল। উপন্যাসটি ভালই পঠিত হতে লাগল। কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক বাদল বসু এলেন ঢাকায়। নূরজাহান গ্রন্থাকারে ছাপার আগ্রহ দেখালেন। সময় বেধে দিলেন। সেই সময়ের মধ্যে উপন্যাস শেষ হল না। তিনি বললেন, ‘প্রথম পর্ব সমাপ্ত’ লিখে পাঠিয়ে দাও।’ দিলাম। বই ছাপা হল। তিনমাসের মধ্যে পাঁচ হাজার কপি শেষ হয়ে গেল। ‘দেশ’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বেরোল ‘চোখের পলকে দ্বিতীয় মুদ্রণ’। দ্বিতীয় পর্ব আর লেখা হয় না। 

চার পাঁচ বছর কেটে গেল। অনেকে অভিযোগ করেন, কেন ‘নূরজাহান’ দ্বিতীয় পর্ব লিখছেন না। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তখন সেগুন বাগিচায়। সেখানে এক অনুষ্ঠানে গেছি। এক বয়স্ক ভদ্রলোক আমার ওপর চড়াও হলেন ‘পাঠকের সঙ্গে ফাজলামো করেন? ‘নূরজাহান’ প্রথম পর্ব পড়ে বসে আছি। দ্বিতীয় পর্ব লিখছেন না কেন?’ খুবই লজ্জা পেলাম। একদিন হুমায়ূন আহমেদ ফোন করে বললেন, ‘আম্মা নূরজাহান পড়ে বসে আছে। দ্বিতীয় পর্ব লিখছো না কেন? আম্মা বলেছেন তোমাকে ধমক দিতে।’ লিখলাম দ্বিতীয় পর্ব। 

ভেবেছিলাম এখানেই শেষ হবে। দেখি আখ্যান এতটাই ছড়িয়েছে, দ্বিতীয় পর্বে শেষ হবে না। দ্বিতীয় পর্ব আর আনন্দ পাবলিশার্সকে দেওয়া হল না। ঢাকা থেকেই বেরোল। দ্বিতীয় পর্বের কোনও কোনও অংশ ভিন্ন ভিন্ন নামে ঈদ সংখ্যায় ছাপা হল। একটা অংশের নাম ছিল ‘বাবুই পাখির জীবন’। আরেক অংশের নাম ছিল ‘কাঁচা বাঁশের পালকি’। দ্বিতীয় পর্বের অনেকটা ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল ‘জনকণ্ঠ’র সাহিত্য পাতায়। তারপর পড়লাম তৃতীয় পর্ব লেখার জটিলতায়। ওরকমই চার পাঁচ বছর কেটে যায়। কত এলোমেলো লেখা লিখি। নূরজাহান নিয়ে বসাই হয় না। কী রকম একটা ভয় লাগে। আতঙ্ক হয়! আগের দুই পর্বের মতো লিখতে পারব তো? নিজের সঙ্গে একটা যুদ্ধ চলছে। অন্যদিকে পাঠকদের চাপ, প্রকাশকের চাপ। দিশেহারা অবস্থা। কোনও কোনও রাতে ঘুমাতে পারি না। 

এক রাতে এমন অবস্থা হল, একটা মিনিটও ঘুম হল না। শুধু মনে হয় নূরজাহান শেষ করতে পারব তো? ভোররাতের দিকে দেখি মাথা আর বুকে প্রবল চাপ। উঠে অনেকক্ষণ ধরে গোসল করলাম। পশ্চিম দিককার ওয়াল কেবিনেটের এক তাকে কোরআন শরীফ রাখা। কোরআন শরীফ বুকে জড়িয়ে দাঁড়ালাম। খালি গা। দেখি আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে। মনে মনে শুধু বলছি, ‘আল্লাহ আমাকে দয়া করো। আমাকে দয়া করো। ‘নূরজাহান’ শেষ করার শক্তি দাও।’ 

তারও অনেক্ষণ পরে টের পাই, আকুল হয়ে কাঁদছি আমি। গাল বুক ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়েছিলাম মনে নেই। কতক্ষণ কেঁদেছি, মনে নেই। তারপর বোধহয় ঘণ্টা দু’তিনেক ঘুমালাম। উঠে লেখার টেবিলে বসেছি। দেখি তরতর করে লেখা এগোচ্ছে। একটানা মাস ছয়েক লিখে শেষ করলাম তৃতীয় বা শেষ পর্ব। 

তখন আরেকটা সমস্যা দেখা দিল। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পড়ে দেখি শেষ পর্বের সঙ্গে ভাষাটা মিলছে না। ‘নূরজাহান’ বলতে গেলে পুরোটাই বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা। শুদ্ধ আর আঞ্চলিকতার মিশেল আছে প্রকটভাবে। প্রথম আর দ্বিতীয় পর্ব পুরোটাই আবার লিখলাম। আরও বছর দেড়েক লেগে গেল। এই হচ্ছে ‘নূরজাহান’ লেখার ইতিহাস। সব মিলিয়ে এই উপন্যাস লিখতে ১৮ বছর লেগেছিল।

স্বকৃত নোমান
উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশের পর কেমন সাড়া পেয়েছিলেন? পাঠক কীভাবে গ্রহণ করেছিল?

ইমদাদুল হক মিলন :
আনন্দ পাবলিশার্স ছয়মাসের মধ্যে বইটির প্রথম পর্ব আট হাজার কপি বিক্রি করেছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশি সংস্করণও প্রকাশিত হল। সব মিলিয়ে এক বছরে বোধহয় হাজার তিরিশেক কপি বিক্রি হয়েছিল। প্রথম পর্বটির সতেরোতম মুদ্রণ চলছে এখন। এক বিদগ্ধ পাঠক আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি এরকম উপন্যাসও লিখতে পারেন?’

স্বকৃত নোমান
নূরজাহান বড় পরিসরের উপন্যাস। পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আপনি চাইলে উপন্যাসটি আরও সংক্ষিপ্ত করতে পারতেন। আপনার কি মনে হয় উপন্যাসটির পরিসর আরও ছোট করা যেত?

ইমদাদুল হক মিলন
চাইলে অবশ্যই ছোট করা যেত। আমি চাইনি। ‘নূরজাহান’ লেখার সময় হাতের কলমটি ছেড়ে দিয়েছিলাম। কলম যেভাবে এগোয়, লেখা যেভাবে এগোয় এগোতে থাক। গদ্যভঙ্গি, বর্ণনা, চরিত্র চিত্রন আমি কলমের উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। জোর করে কলম থামাবার চেষ্টা করিনি। অন্যদিকে নূরজাহানকে ঘিরে বহু চরিত্র, একটি পুরো অঞ্চলের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনযাপন। প্রকৃতি ও ফসল। ঋতুর পরিবর্তন ও যোগাযোগের নতুন ব্যবস্থা ঘিরে একটি অঞ্চলের জাগরণ। সব কিছুই ধরার চেষ্টা করেছি।

স্বকৃত নোমান
এখন প্রযুক্তির কাল। মানুষ ব্যস্ত। চিত্ত বিনোদনের নানা মাধ্যম আছে মানুষের হাতে। পাঠক দীর্ঘ সময় ব্যয় করে ‘নূরজাহান’-এর মতো বিশাল উপন্যাস কেন পড়বে? একজন লেখক হিসেবে আপনার অভিমত জানতে চাই।

ইমদাদুল হক মিলন
কাউকে জোর করে কোনও কিছুই পড়ানো যায় না। যিনি পড়বেন না তাকে দু’তিন পৃষ্ঠার একটা গল্পও পড়ানো যাবে না। পড়া হচ্ছে অভ্যাসের ব্যাপার। পাঠ অভ্যাস যাঁর আছে, তিনি তাঁর পছন্দের লেখাটি অবশ্যই পড়বেন। সেই লেখা ছোট কী বড় ভাববেন না।
স্বকৃত নোমান
আপনার সব কটি উপন্যাসের মধ্যে কোন উপন্যাসটি আপনার দৃষ্টিতে সেরা? কেন?

ইমদাদুল হক মিলন
একজন লেখকের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। নিজের প্রচুর লেখার মধ্যে কয়েকটি ভালোলাগার গল্প ও উপন্যাস আছে। চারপর্বে আত্মজৈবনিক উপন্যাস লিখেছি। ‘কেমন আছ, সবুজপাতা’, ‘জিন্দাবাহার’, ‘মায়ানগর’, ‘একাত্তর ও একজন মা’। এই লেখাগুলোর প্রতি মায়া আছে। চারপর্ব মিলে বই হয়েছে ‘এমন জনম’ নামে। এই লেখাগুলোর মধ্যে শৈশব কৈশোরের কাল থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত আমার বেড়ে উঠা, দুঃখ দারিদ্র্য আর অসহায়ত্ব, আর প্রবল জীবন যুদ্ধের ছবিটা পাওয়া যায়। এই লেখাগুলোর প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে। ‘যাবজ্জীবন’, ‘ভূমিপুত্র’, ‘পরাধীনতা’ ‘নূরজাহান’, ‘চর কাজলির মানুষ’, ‘রজনীগন্ধাপুর’, ‘কালাকাল’, ‘অধিবাস’, ‘পর’ এইসব উপন্যাসের প্রতি টান আছে।

স্বকৃত নোমান
আপনার দৃষ্টিতে উপন্যাস আসলে কী?

ইমদাদুল হক মিলন
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই প্রশ্নের নানা রকম উত্তর দেওয়া যায়। উপন্যাস একটি জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র হতে পারে। জীবনের খণ্ডাংশের চিত্র হতে পারে। ছোট একটি ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলো ফেলে তার বিশ্লেষণে উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে। উপন্যাস রচনা নির্ভর করে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির উপর। কে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কোন বিষয়টিকে তাঁর আখ্যানে ধারন করছেন, এটাই আসল ব্যাপার। 

এক সময় রাশিয়ান লেখকদের মধ্যে দীর্ঘ উপন্যাস লেখার প্রবণতা ছিল। ‘ওয়্যার এন্ড পিস’ টলক্টয়ের দীর্ঘতম উপন্যাস। ‘আনা কারেনিনা’ বিশাল। পাশাপাশি ‘কশাক’ ছোট আকারে উপন্যাস। কেন তিনি ‘ওয়্যার এন্ড পিস’ এত বিস্তৃত ভাবে লিখলেন, আর ‘কশাক’ কেন শ’দেড়েক পৃষ্ঠায় শেষ করলেন? এই দুটো উপন্যাস পাশাপাশি পড়লে কেনর উত্তরটা পাওয়া যাবে। একই ঘটনা দস্তয়ভস্কির ক্ষেত্রেও। তাঁর ‘ক্রাইম এন্ড পানিসম্যান্ট’, ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’, ‘ইডিয়ট’ বড় উপন্যাস। আবার ‘নোটস ফ্রম আন্ডার গ্রাউন্ড’, ‘গ্যামলার’ ছোট। কারণটা হচ্ছে বিষয়। মিখাইল শলোখভের ‘এন্ড কোয়াইট ফ্লোজ দ্য ডন’ এই উপন্যাসটি বিশাল। বিশালত্ব ছাড়া এই লেখার কোনও গতি ছিল না। 

একটা সময়ে একই উপন্যাসের ভিতরে বহু ঘটনা চরিত্র পরিবেশ ইতিহাস সবকিছু ধারন করার প্রবণতা ছিল। একটি উপন্যাসের ভিতরেই হয়তো জীবন জগতের দশটি দিককে ধারণ করার চেষ্টা থাকত। এই প্রবণতাকে ভাঙ্গতেও চাইলেন কয়েকজন লেখক। যেমন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, যেমন আলবেয়ার কাম্যু। হেমিংওয়ের ‘ওল্ডম্যান এন্ড দ্য সি’ ও কাম্যুর ‘আউটসাইডার’। ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ ১২০ পৃষ্ঠার উপন্যাস। এই উপন্যাসের ঘটনা তিন চার লাইনের। কিন্তু উপন্যাসটি বহু স্তরের। জীবনের অনেকগুলো স্তরকে স্পর্শ করে এই উপন্যাস।

সহজভাবে বলতে গেলে দশটি ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ দিয়ে একজন রোগীকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা না করে একটি ক্যাপসুল দিয়েই সেই রোগীকে সারিয়ে তোলা। ক্যাপসুলটির ভিতরে দশটি ওষুধের উপাদানই আছে। আউটসাইডারেও তাই। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচুড’ সোয়া তিনশো পৃষ্ঠার উপন্যাস। মারিও ব্যাগার্স য়োসার মতে, বিষয়গত দিক থেকে এটি একটি সামগ্রিক উপন্যাস। ১৯৭১ সালে মার্কেসকে নিয়ে ৬৬৭ পৃষ্ঠার একটি বই লিখেছেন য়োসা। বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রটি অন্যরকম। কোনও কোনও লেখক দীর্ঘ উপন্যাস লিখেছেন। পাশাপাশি ছোট উপন্যাসও লিখেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলো ছোট ছোট। রবীন্দ্রনাথের ‘গোড়া’ মাঝারি আকৃতির, ‘শেষের কবিতা’ ছোট। তারাশঙ্করের কোনও কোনও উপন্যাস অনেক বড়। যেমন ‘কীর্তিহাটের করচা’। বারোশো পৃষ্ঠার উপন্যাস। মাঝারি মাপের উপন্যাস ‘গণদেবতা’, ‘হাসুলি বাঁকের উপকথা’। ছোট উপন্যাস ‘কবি’। এই তিনটি উপন্যাসই অসামান্য। বিভূতিভূষণের ‘অপু ট্রিলজি’ বড়, ‘আরণ্যক’ ছোট কিন্তু তীব্র উপন্যাস। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব উপন্যাসই মাঝারি আকৃতির। সমরেশ বসুর উপন্যাসগুলোও তাই। ‘গঙ্গা’ মাঝারি, ‘জগদ্দল’ বড়। শেষ দিককার উপন্যাসগুলো একেবারেই ছোট ছোট। যেমন ‘শেকল ছেড়া হাতের খোঁজে’ অথবা ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’ ক্ষুদ্র কিন্তু তীব্র উপন্যাস। আর অর্ধেক শেষ হওয়া ‘দেখি নাই ফিরে’ দীর্ঘ হতে চলেছিল। 

সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢ়োঁড়াইচরিত মানস’ দীর্ঘ না হয়ে উপায় ছিল না। অমিয়ভূষণের ‘গড়শ্রীখণ্ড’, ‘রাজনগর’, ‘চাঁদবেনে’, ‘নয়নতারা’, বড় আবার ‘মাহিষকুরার উপকথা’ বা ‘মধুসাধুখাঁ’ ছোট। অদ্বৈতমল্ল বর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মাঝারি আকৃতির। ওয়ালীউল্লাহর তিনটি উপন্যাসই মাঝারি আকৃতির। উপন্যাসগুলো অতুলনীয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দুটো উপন্যাসই তিন চারশো পৃষ্ঠার মধ্যে শেষ হয়েছে। দুটো উপন্যাসই সাহিত্যের উচ্চ পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে। 

এরকম উদাহরণ অজস্র দেওয়া যায়। আমি অল্প কয়েকটির কথাই শুধু বললাম। উপন্যাস আসলে কী তা বোঝার জন্য ভালো উপন্যাসগুলো পড়ে ফেলাই শ্রেয়।

স্বকৃত নোমান
সাহিত্যের সব কটি শাখার মধ্যে বহু বছর ধরে নেতৃত্বের স্থানে রয়েছে উপন্যাস। অর্থাৎ পৃথিবীজুড়ে উপন্যাসের পাঠক বেশি। উপন্যাসের এই জনপ্রিয়তা কতদিন থাকবে বলে মনে করেন? উপন্যাসের ভবিষ্যৎ কী?

ইমদাদুল হক মিলন
মানুষ জন্মের পর থেকেই গল্প কাহিনি শুনতে পছন্দ করে। উপন্যাসে কাহিনি থাকে। সুতরাং যতদিন মানুষ গল্প কাহিনি শুনতে চাইবে ততদিন পর্যন্ত উপন্যাসের চাহিদা থাকবে। ভবিষ্যতে হয়তো উপন্যাসের ধারণা বদলাবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলায়। উপন্যাসও বদলাবে। তবে উপন্যাসের পাঠক অবশ্যই থাকবে। 

স্বকৃত নোমান
আপনি প্রচুর পড়েন। দেশি-বিদেশি সাহিত্য পড়েন। পড়েন তরুণদের বইও। পাঠের এই অভ্যাস কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

ইমদাদুল হক মিলন :
তৈরি হয়েছিল ছেলেবেলাতেই। প্রথমে নানির মুখে গল্প শুনতে শুনতে গল্পের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। তারপর জন্মায় বইয়ের প্রতি আগ্রহ। সেই আগ্রহ এক সময় অভ্যাসে পরিণত হয়।

স্বকৃত নোমান
এত এত পড়ার কারণে নিজের লেখায় সেই পাঠের কোনো প্রভাব পড়ে কিনা?

ইমদাদুল হক মিলন :
কখনও কখনও অবশ্যই প্রভাব পড়েছে। শুরুর দিকে সমরেশ বসু খুব প্রভাবিত করেছিলেন। পাঠের প্রভাব লেখকের উপর পড়বেই। আজকের পৃথিবীর বহু তরুণ লেখককে মার্কেজের লেখা প্রভাবিত করছে।

স্বকৃত নোমান :
উপন্যাস রচনায় প্রথম দিকে আপনি কোনো ঔপন্যাসিক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন? নাকি হননি?

ইমদাদুল হক মিলন :
কিছুটা বোধহয় সমরেশ বসু দিয়ে হয়েছিলাম। প্রেমের লেখাগুলোতে কিছুটা প্রভাবিত করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পরে সেসব কাটিয়েছি।

স্বকৃত নোমান :
বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার সমকালীন লেখকদের লেখাজোখা আপনার নিশ্চয়ই পড়া হয়। কোথায় ভালো সাহিত্যচর্চা হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন? ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, নাকি বাংলাদেশে?

ইমদাদুল হক মিলন
আমি পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার লেখা পড়ি। বাংলাদেশের লেখকদের তো পড়িই। আমার ধারণা বাংলাদেশের বহু নবীন ও তরুণ লেখক ভালো লিখছেন। সাহিত্যের চর্চাটা বাংলাদেশে ভালো হচ্ছে।

স্বকৃত নোমান
বাংলাদেশের উপন্যাস ও গল্প চর্চা কেমন হচ্ছে? আপনার পরবর্তী জেনারেশনের মধ্যে কি কোনো সম্ভাবনা দেখতে পান? নতুন কিছু কি হচ্ছে? নাকি সবাই পুরনো বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে?

ইমদাদুল হক মিলন
প্রচুর সম্ভাবনাময় লেখক আমি দেখতে পাচ্ছি। সবার নাম বলা সম্ভব নয়। একটানা বলতে গেলে প্রতিভাবান কোনও লেখকের নাম বাদ যেতে যারে। সেটা অন্যায় হবে। নতুন কিছু অবশ্যই হচ্ছে। তবে বইমেলাতে যে চার পাঁচহাজার বই প্রকাশিত হয় ওইসব প্রকাশনা দেখে ব্যাপারটা বোঝা যাবে না। আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পাতায় প্রায়ই চমকে উঠার মতো গল্প কবিতা ছাপা হয়। আমি খুঁজে খুঁজে তাদের লেখা পড়ি। আর যাঁরা পুরনো বৃত্তে ঘুরে বেড়ান বা কোনও জনপ্রিয় লেখককে অনুকরণ করে লেখেন তাদের ব্যাপারে আমার কোনও আগ্রহ নেই।

স্বকৃত নোমান
আপনি সাধারণ কোন সময়টায় লেখেন? একটানা কতক্ষণ লেখেন? এখন কি আর হাতে লেখেন, নাকি কম্পিউটারে?

ইমদাদুল হক মিলন
গত পঞ্চাশ বছর ধরে আমি সকালবেলায় লিখি। অভ্যাসটা এখনও যায়নি। একটানা ঘণ্টা দু’আড়াই বা তিনঘণ্টা। কম্পিউটারটা বোধহয় এই জীবনে আর শেখা হবে না। হাতেই লিখি। একজন কম্পোজ করে দেয়।

স্বকৃত নোমান
অনেক লেখক আছেন, যারা একবারেই লেখেন, পরে আর কোনো এডিট করেন না। আপনিও কি একবারই লেখেন, নাকি লেখার পর বারবার এটি করেন?

ইমদাদুল হক মিলন
আমি এডিট করি। এখন একটি উপন্যাস লিখছি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র পটভূমি ‘গাওদিয়া’ গ্রামটি নিয়ে। গত আট মাসে এই উপন্যাসটি আমি সাতবার এডিট করেছি। এখনও কাজটা চলছে। শ’তিনেক পৃষ্ঠার উপন্যাস।

স্বকৃত নোমান
আপনি অসাধারণ কিছু ছোটগল্প লিখেছেন। যেমন : গাহে অচিন পাখি, মমিন সাধুর তুকতাক, কিরমান ডাকাতের প্রথম ও দ্বিতীয় জীবন, লাশ পড়ছে, খরা কিংবা বৃষ্টির পরে, জোয়ারের দিন, মানুষ কাঁদছে, গগনবাবুর জীবনচরিত, সোনাদাস বাউলের কথকতা, রাজাবদমাস, লোকটি রাজাকার ছিল, নেতা যে রাতে নিহত হলেন, মানুষের আড়ালে মানুষ এবং গোপন দুয়ার। যদি জানতে চাই, আপনি ঔপন্যাসিক হিসেবে সফল, নাকি গল্পকার হিসেবে? ব্যক্তিগতভাবে আপনার কী মনে হয়?

ইমদাদুল হক মিলন :
তিপ্পান্ন বছর ধরে লিখে যদি কিছু ভালো গল্প বা উপন্যাস না লিখে থাকতে পারি তা হলে আমি পুরোপুরিই ব্যর্থ লেখক। তবে একজন লেখককে যে অর্থে সফল বলা হয়, সেই অর্থে নিজেকে সফল বলতে আমি নারাজ।

স্বকৃত নোমান
আপনার কি মনে হয় আপনার গল্পগুলো বেশি পঠিত হয়নি, কিংবা যা হয়েছে তার চেয়ে আরও বেশি পঠিত হতে পারত, আপনার উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কাছে ছোটগল্পগুলো চাপা পড়ে গেছে?

ইমদাদুল হক মিলন
 ছোটগল্প সব সময়ই কম পঠিত হয়। তুমি যে গল্পগুলোর কথা বললে সেগুলো কত পাঠক পড়েছে তা আমি জানি না। উপন্যাসের জনপ্রিয়তার তুলনায় ছোটগল্প সব সময়ই পিছিয়ে থাকে।

স্বকৃত নোমান
আপনার অধিকাংশ ছোটগল্প―বিশেষত সেরা গল্পগুলো―গ্রামজীবন কেন্দ্রিক এবং চরিত্রগুলোও গ্রামীণ। নগরজীবন নিয়ে আপনার ছোটগল্প তুলনামূলক কম। নগর এবং নগরের মানুষদের নিয়ে কম লেখার কারণ যদি বলতেন...।

ইমদাদুল হক মিলন :
আমাকে আসলে আচ্ছন্ন করে রেখেছে গ্রাম জীবন। গ্রামের মানুষগুলো। শহরে জীবন কাটাবার পরেও আমি বোধহয় ভিতরে ভিতরে গ্রামেই রয়ে গেছি। এছাড়া আর কোনও কারণ খুঁজে পাই না। তবে ঢাকা শহরের পটভূমিকে কিছু লেখা তো লিখেছিই।

স্বকৃত নোমান
এ যাবৎ যত গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন, আপনার কি মনে হয়েছে সেগুলো সত্যিকারের সাহিত্য হয়ে উঠেছে? কখনো কি মনে হয়েছে, নাহ্, আরও ভালো হতে পারত। যা লিখতে চেয়েছেন তা হয়নি। অর্থাৎ বলতে চাইছি এগুলো নিয়ে আপনার কোনো অতৃপ্তি আছে কিনা? নাকি আপনি সম্পূর্ণ তৃপ্ত?

ইমদাদুল হক মিলন :
নিজের প্রায় সব লেখা নিয়েই আমার খুঁতখুঁতানি আছে। যে কারণে নিজের লেখা আমি পড়তেই চাই না। পড়লেই মনে হয় নতুন করে লিখি। না হলে ওটিকে ফেলে দেই। যা লিখতে চেয়েছি, অন্তর থেকে বলছি, সেরকম আসলে লিখতেই পারিনি। নিজের জন্য বড় দুঃখ হয়।

স্বকৃত নোমান
চার পর্বে আপনি উত্মজৈবনিক উপন্যাস লিখেছেন। ‘এমন জনম’ নামের এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসের প্রথম পর্বে আছে ‘কেমন আছ সবুজ পাতা’, দ্বিতীয় পর্বে ‘জিন্দাবাহার’, তৃতীয় পর্বে ‘মায়ানগর’ এবং শেষ পর্বে ‘একাত্তর ও একজন মা’। এই বইগুলো আলাদা আলাদাভাবেও প্রকাশিত হয়েছিল আগে। সরাসরি আত্মজীবনী না লিখে আপনি আত্মজৈবনিক উপন্যাস কেন লিখলেন? এসব উপন্যাসে বাস্তবতাটা কতটুকু এসেছ? কল্পনাইবা কতটা? নাকি সবই বাস্তব?

ইমদাদুল হক মিলন
আশি নব্বই ভাগ বাস্তব। সে কারণেই আত্মজৈবনিক উপন্যাস। আত্মজীবনীও লিখতে চেয়েছি। একটা পর্ব বেরিয়েছে। ‘যে জীবন আমার ছিল’। ওটাকে আত্মজীবনী না বলে স্মৃতিকথা বলা ভালো। পরের আরও দুটো পর্ব লিখেছি। আসলে স্মৃতিকথাই। একটির নাম ‘আমার যেদিন গেছে’ অন্যটি ‘যত দূর চোখ যায়’।

স্বকৃত নোমান
আপনি বিস্তর গল্প-উপন্যাস লিখেছেন? কখনো কি মনে হয়েছে কোথাও রিপিটেশন হয়েছে? অর্থাৎ এই প্রসঙ্গটি বা এই চরিত্রটি আগের কোনো গল্প-উপন্যাসে লিখেছেন, আবার পরের কোনো উপন্যাসেও আপনার অজান্তে ঢুকে পড়েছে? এমনটা কি হয়েছে?

ইমদাদুল হক মিলন
অনেক হয়েছে। তবে হয়েছে নিজের অজান্তে। অতিরিক্ত লিখলে যা হয় আর কী।

স্বকৃত নোমান
আপনার বন্ধুভাগ্য ভালো। অনেক বিখ্যাতজন আপনার বন্ধু, যাদের সঙ্গে আপনি স্বর্ণালী সময় কাটিয়েছেন? বন্ধুদের নিয়ে কি কিছু লিখেছেন? তারা কি আপনার গল্প-উপন্যাসে চরিত্র হয়ে এসেছে?

ইমদাদুল হক মিলন
‘বন্ধুবান্ধব’ নামে আমার একটি বই আছে। বন্ধুদের নিয়েই লেখা। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় বিচ্ছিন্নভাবে লিখেছি। বহু শ্রদ্ধেয়জনের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। স্নেহধন্য হয়েছি। বন্ধুজন আর শিল্প সাহিত্যের শ্রদ্ধেয়জনদের নিয়ে একটি বই বেরোবে শীঘ্রই। নাম ‘যত দূর চোখ যায়’।

স্বকৃত নোমান
লেখক হিসেবে আপনি স্মার্ট। লেখক বলতে যে দৃশ্য সাধারণের চোখের সামনে ভেসে উঠে, আপনি তার থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। একই সঙ্গে আপনি নিয়মানুবর্তীও। লেখকের জন্য স্মার্টনেস ও নিয়মানুবর্তিতার প্রয়োজন আছে কিনা?

ইমদাদুল হক মিলন
আমি বিশ্বাস করি লেখক কবি শিল্পীরাই সমাজের সবচাইতে স্মার্ট মানুষ। শুধু পোশাক আশাকেই মানুষ স্মার্ট হয় না। স্মার্ট হয় তাঁর শিক্ষায়, রুচিতে আর কাজে। আমার বন্ধু হুমায়ুন ফরীদি খুবই সাধারণ পোশাক আশাকে চলতেন। কিন্তু তাঁর মতো স্মার্ট মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষেরই নিজের কাজের ব্যাপারে নিয়মানুবর্তিতার প্রয়োজন আছে। একেকজন একেকভাবে নিজস্ব নিয়ম অনুসরণ করে চলেন।

স্বকৃত নোমান
অনেকে বলে থাকেন, বেশি লিখলে লেখার মান খারাপ হয়। কম লেখা ভালো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো বিস্তর লিখেছেন। কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে আমাদের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ও কম লেখেননি। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, দেবেশ রায় কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও কম লেখেননি। আপনিও বিস্তর লিখেছেন। বেশি লেখা কি আসলেই খারাপ? বেশি লিখলে কি লেখা আসলেই দুর্বল হয়ে যায়? আপনার কী অভিমত?

ইমদাদুল হক মিলন
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কারও তুলনা করে লাভ নেই। তিনি ইশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা ও মেধা নিয়ে জন্মেছিলেন। তাঁর তুলনা তিনি নিজে। কাজী নজরুল ইসলামও তাই। তিনি গান লিখেছিলেন হাজার হাজার। অধিকাংশই পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায় হাজার তিন চারেক। তিন বন্দ্যোপাধ্যায় বা অন্য যাঁদের নাম বললে তাঁদের প্রত্যেকেরই কিছু কিছু দুর্বল রচনাও আছে। অতিরিক্ত লিখলে সব লেখার মান একরকম হবে না।

স্বকৃত নোমান
১৯৫৫ সালে আপনার জন্ম। সত্তুর বছর অতিক্রম করে এখন জীবনের আরেকটি অধ্যায়ে উপনীত হয়েছেন। এই জীবন আপনার কেমন লাগছে? এখন কি আগের চেয়ে ভালো লিখতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে? সামগ্রিকভাবে আপনি কি জীবন নিয়ে তৃপ্ত, সুখী?

ইমদাদুল হক মিলন
জীবন নিয়ে কী সেভাবে খুব তৃপ্ত হয় কোনও মানুষ? বিশেষ করে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষ? জীবন জীবনের মতো কেটে যাচ্ছে। ভালো লেখার চেষ্টা আছে। পারছি কিনা জানি না। কোনও কোনও বিষণ্ন বিকেলে সুনীলের একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে, ‘এ জীবন অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল’। হয়তো ভাল লেখক হতে পারতাম! হয়নি। 

স্বকৃত নোমান
এই প্রশ্ন দিয়ে শেষ করতে চাই। আপনার মৃত্যুভাবনা কী? মৃত্যুভয় আপনাকে তাড়িত করে কিনা? আপনি চান কিনা মৃত্যুর পরও আপনার সাহিত্যকর্ম পঠিত হোক কালে কালে? নাকি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সব শেষ হোক, তা চান?

ইমদাদুল হক মিলন
মৃত্যু ভাবনা হয়, ভয় হয় না। মৃত্যু অবধারিত। ‘জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে?’ মৃত্যুর পর আমার লেখা কেউ পড়বেন এই দুরাশা আমার নেই। যদি দয়া করে কেউ পড়েন, পড়বেন। সে আমার সৌভাগ্য। মৃত্যু তো আসলে এক রকমের শেষই। তারপর আর কী থাকে?

স্বকৃত নোমান
মিলন ভাই, আপনার প্রতি আমার অনিঃশেষ শ্রদ্ধা। আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ইমদাদুল হক মিলন :
তোমাকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ, স্বকৃত। তোমার প্রশ্নগুলো আমি খুব উপভোগ করেছি। গভীর আনন্দ নিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ‘গল্পপাঠ’-এর পাঠকদের প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা রইল।

**********

সাক্ষাৎকার গ্রহীতার পরিচিতি : স্বকৃত নোমান কথাসাহিত্যিক। ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রকাশিত উপন্যাস : রাজনটী, বেগানা, হীরকডানা, কালকেউটের সুখ, শেষ জাহাজের আদমেরা, মায়ামুকুট, উজানবাঁশি, মহুয়ার ঘ্রাণ, ইহযৌবন, আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি। গল্পগ্রন্থ : নিশিরঙ্গিনী, বালিহাঁসের ডাক, ইবিকাসের বংশধর, বানিয়াশান্তার মেয়ে, কয়েকজন দেহ। দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস সংগ্রহ এবং এক খণ্ডে গল্পসংগ্রহ।বসবাস করছেন ঢাকায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. ইমদাদুল হক মিলন যে বিস্তর লেখা লিখেছেন সেই অর্থে তাঁর খুব বেশি লেখা পড়া হয়নি।তবে যে কয়টি লেখা পড়েছি সবকটিই হৃদয়ে দাগ কেটে আছে।কিছু চরিত্র এখনও মাথার ভেতর খুরছে।ঘটনার বর্ণনা,দৃশ্যপটের বর্ণনা,চরিত্র এইসব তাঁর লেখায় একদম জীবন্ত হয়ে উঠে।আমার মনে হয় একজন পাঠককে বিমোহিত করে রাখার জন্য একজন সার্থক লেখকের এটাই সবচেয়ে বড় গুণ।ইমদাদুল হক মিলনেন ভেতর সেটা আছে।আর আছে বলেই পাঠক তাঁর লেখায় বুঁদ হয়ে যায়।ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় লেখক এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে।

    উত্তরমুছুন