ভঙুর মাটি আর নাম-পরিচয়হীন পাথরের বুক চেপে জিপ গাড়ির বহর প্রবলভাবে ছুটছে। পেছনে ধূলিবালির মিছিল। রাস্তার ডানপাশে পাহাড়ের আঁচল ছুঁয়ে বয়ে চলছে শীর্ণ এক নদী। সব যাত্রী এ পথে একদম নূতন। অতিথি পাখির মত বেড়াতে এসেছে। সকাল থেকেই ওরা পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। ক্ষীণদেহী একটি নদী ওদের সঙ্গী হয়েছে অনেকক্ষণ হলো। যাত্রীরা নদীটির নাম জানে না। সবাই ক্লান্ত, চোখে-মুখে উদ্বেগ। প্রায় পঞ্চাশ ঘণ্টা আগে ওরা আরাম করে ঘুমাতে পেরেছিল। এরপর কখনও ট্রেনে, কখনও বাসে চোখ বুজতে হয়েছে। এখন নদীদর্শন নয়, একটু বিছানা পেলেই ওরা সুখী হতো। কিন্তু এ স্বপ্নপূরণ হতে আরও পাঁচ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হবে।
দূরে বড় বড় পাহাড় উঁকি দিচ্ছে। যাত্রীরা এসেছে ঢাকা থেকে। ওখানে ছিল প্রচণ্ড গরম। কিন্তু এখানে? ওরা ভাবতেও পারেনি কতটা হাড়কাঁপানো শীত অপেক্ষা করছে। ওদের গন্তব্য পেহেলগাম। জম্বু থেকে এটি অনেক দূর। পথ যেন শেষ হয় না। মাঝে মাঝে পাহাড়চূড়ায় বরফ দেখা যাচ্ছে। যদিও এ দৃশ্য যাত্রীদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কারণ তখনও ঠাণ্ডার আবেশ শরীর স্পর্শ করেনি। অনেকে মৃদু ঘামছে। এত ঝলমলে রোদে কীভাবে বরফ থাকতে পারে? ওরা ভাবতেই পারে না। বরফ না অন্য কিছুÑ এ নিয়ে তর্ক চলে অনেকক্ষণ। কেউ হার মানতে রাজি নয়।
ওয়াদুদ প্রথমবারের মতো দূরযাত্রার ভ্রমণে এসেছে। বাস-জিপে ওর অস্বস্তি। তবু ওর ভালোই লাগছে। মনে হচ্ছে স্বপ্নের দেশে চলে এসেছে। ক্লান্তি তারও আছে। তবে পেহেলগাম দেখার আনন্দ সে তুলনায় অনেক বেশি। ওদের জিপে কয়েকজন বড় ভাই আছেন। সবাই মাঝবয়সী। ওয়াদুদ ভেবেছে একটা গান গাইবে। কিন্তু লজ্জায় গাইতে পারে না। চোখের ভেতর দূরের বরফ শীতলতা এনে দেয়। দেহ-মনে প্রশান্তি জাগে।
জিপ গাড়ির বহর আচমকা থামে। ধাবায় যাত্রা বিরতি। ওয়াদুদ প্রথম মনে করেছে, ধাবা কোনো পর্যটন স্পট। পরে দেখা গেলো দোকানপাটকে স্থানীয়রা ধাবা বলে। গাড়ি থামা মাত্রই নদীটির বয়ে চলার শব্দ স্পষ্টতর হলো। পথচলতি মানুষ খুব কম। ওয়াদুদ চালিয়ে নেয়ার মতো হিন্দি জানে। ধাবায় একজনকে জিজ্ঞেস করে, এ পাহাড়ি নদীটির নাম কী? লোকটি হাসে। জানায়, নদীর নাম চেনাব। ওয়াদুদ মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। এ নদীর নাম সে আগে শুনেছে। বইতে পড়েছে ‘তোমার অশ্রু আজ চেনাবের জল’। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ওয়াদুদ ছবি তোলে। হঠাৎ একদল স্মৃতির বিষণ্নতা ওকে ঘিরে ঘরে।
এখানের খাবার-দাবারও অদ্ভুত। নানা দেশের নানা বেশ। খাবারেও তা-ই। তবে ক্ষুধা নিবারণই বড় বিষয়। সবাই পছন্দ মতো খাবার খাচ্ছে। ওয়াদুদের মনে মনে ভাবেÑঢাকায় থাকলে কী খেতো? পুরাণ ঢাকার ছেলে ও। ঝাল, ভাজা-পোড়া আর কাচ্চির ভক্ত। বাখরখানি, চা ছাড়া চলে না। এখানে কী খাচ্ছে ও নিজেই জানে না। তবে হাত ধুতে গিয়ে চমকে উঠলো। পানির স্পর্শে হাত যেন বরফ হয়ে গেছে। এত ঠাণ্ডা! ওয়াদুদের বিস্ময় দেখে দোকানি দাঁত বের করে হাসে। জানায়, পেহেলগামে ঠাণ্ডা মাত্র শুরু। শ্রীনগরে তো বরফের পৃথিবী।
ওরা চা দিয়েছে। ট্যুর পার্টনাররা যার যার মতো আশপাশ ঘুরে দেখছে। মেয়েদের মুখগুলো খুব ম্লান। কিন্তু চোখে চঞ্চলতা স্পষ্ট। ওয়াদুদ আশেপাশে তাকায়। কোথাও মসজিদ আছে কি-না। নেই। স্রষ্টা খুব কম মানুষকে পৃথিবী দেখার সুযোগ করে দেয়। তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্য অনুধাবন করবে এমন সাধ্য ওয়াদুদের নেই। পৃথিবী এত বিশাল, তার আর্থিক সঙ্গতি সেই তুলনায় খুবই সামান্য। এ ভ্রমণেও হয়ত আসা হত না। দুর্দিনে তার বন্ধু সব ব্যবস্থা করেছে।
ঢাকায় খুব বাজে সময় যাচ্ছিলো ওয়াদুদের। দুএকজন ছাড়া কেউ জানত না ওর কষ্ট। প্রিমার সঙ্গে ওর বিয়ে হতে পারতো। দুজনেরই প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু হয়নি। জীবন আসলে জোয়ারভাটা। কখন কী হয় কেউ কি জানে? ওয়াদুদ আহসান মঞ্জিলে গিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে। দূর থেকে প্রিমাকে হঠাৎ চোখে পড়ে। সঙ্গে অন্য একটা ছেলে। দেখেই ওর মাথাটা কেমন ঘুরে গিয়েছিল। একটু আগেই প্রিমা ওকে বলেছিল, ও বাসায়, বোনের সঙ্গে গল্প করছে। ওয়াদুদ এমনিতেই খুঁতখুঁতে। জীবনে বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না। পরে প্রিমাকে দেখে অসম্ভব ভালো লাগা। পারিবারিক পছন্দ। তারপর ওয়াদুদ অনেকটা এগিয়েছে। প্রিমার কথাবার্তা অসাধারণ। প্রেমে না পড়া ছেলেটা ভালোবাসার সমুদ্রে গিয়ে পড়েছিল।
ছেলেটা ওর প্রেমিক কি-না ওয়াদুদ জানে না। ধরে নেয়, প্রেমিকই হবে। কাছে গিয়ে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হয় না। কি দরকার। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে প্রিমাই ওদের মুখোমুখি। সঙ্গে সেই ছেলেটি। ওয়াদুদ ভালোভাবে তাকায়। নিজের কমতি খোঁজে। কি দুর্দান্ত ছেলে। মাথাভর্তি চুল, ফর্সা আর যথেষ্ট লম্বা। খুব পরিপাটি। দেখে মনে হয়েছে, যথেষ্ট ফ্যাশন সচেতন। প্রিমা অস্বস্তিতে পড়ে। কিন্তু ও কিছু বলার আগেই ওয়াদুদ অসুস্থতার ভান করে পালিয়ে আসে। গাড়িতে উঠতে গিয়ে ওর বন্ধুরা অবাক হয়। ওয়াদুদের চোখভরা পানি!
প্রচণ্ড শব্দ করে গাড়ির হর্ন বাজছে। এটার অর্থ হলো সবাই দ্রুত গাড়িতে আসুন। এখনই গাড়ি ছাড়বে। ওয়াদুদ দেখে ওর চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। দোকানিকে দাম পরিশোধ করে। সামনে পাহাড় সারি। যেন কবিতার দেশ। যেন সিনেমার কোনো দৃশ্য। নিজের অজান্তেই ওয়াদুদের মুখে হাসি ফোটে। গাড়িতে উঠতে গিয়ে চালককে জিজ্ঞেস করে, পেহেলগাম যেতে আর কতক্ষণ? চালক জানায়, আরও দু ঘণ্টা।
ওয়াদুদের চোখে পাহাড়গুলো ধূসর হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশই দৃশ্যমান হচ্ছে প্রিমা। ওয়াদুদ ওকে চিন্তা আনতে চায় না। অথচ এসে পড়ে। ও কোনো রূপসি নয়। কিন্তু ওর কথা-কাজে একটা মাধুর্য আছে। যা বলার সরাসরি বলে। সেজন্যই ওয়াদুদ ওকে পছন্দ করেছিল। প্রিমা সেদিন কল দিয়েছিল কিছুক্ষণ পরেই। ওর খোঁজখবর নিয়েছে। নিজ থেকে বলেছে, আহসান মঞ্জিলে যাওয়ার কথা ছিল না। ওর কাজিন খুব জোরাজুরি করেছে। সেকারণে বের হয়েছে। ওয়াদুদ হাসে। বলে, সমস্যা নেই। কথা বাড়ে না, দূরত্ব বেড়ে যায়।
ওয়াদুদ প্রায়ই বিষণ্ন হয়। ছেলেটার মুখ ভাসে। ও কত সুদর্শন। হয়ত অনেক টাকাও আছে। কিন্তু সে? না সুদর্শন, না পয়সাকড়ি ভালো আছে। প্রিমা যে ছেলেটির দিকে ঝুঁকেছে, সেটি ওর দোষ নয়। ওয়াদুদ নিজেকে দোষী মনে করে। ওরই যোগ্যতার অভাব। ভালো কোনো অপারচুনিটি এলে কেন প্রিমা নেবে না? রাতে ওয়াদুদের ঘুম হয় না। আয়নায় বারবার নিজেকে দেখে। সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি যেন। ও স্মৃতি থেকে প্রিমার মুখ মুছে দিতে চায়। কিন্তু কাজটা এত সহজ নয়।
গাড়িতে ওয়াদুদ ঘুমিয়ে পড়েছিল। সহযাত্রী ইকবালের ডাকে ওর ঘুম ভাঙে। পেহেলগাম চলে এসেছে। পাহাড়ের ঢালে ওদের হোটেল। তীব্র শীত পড়েছে। ওয়াদুদ বিস্মিত হয়। হোটেলের পাশ দিয়েই ছোট নদী ছুটে যাচ্ছে। পাহাড়ের বরফগলা নদী। বয়ে চলার শব্দ কি চমৎকার। তার দেখা সবচেয়ে মধুর কণ্ঠস্বরের চেয়েও এ ধ্বনি মধুর। হোটেলে উঠেই কোনোমতে রাতের খাবার খেলো ওয়াদুদ। শরীরে পথের ক্লান্তি। বিছানায় পিঠ লাগতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে। কতদিন পর ওর শান্তির ঘুম হচ্ছে কেউ জানে না।
দুই.
পেহেলগাম শান্ত একটি শহর। এখানের লোকজন খুব ধনী নয়। ঠাণ্ডার কারণে সবার গাল কমবেশি লাল। মেয়েদের নাক-মুখও লাল টুকটুকে। মুখগুলো খুব ধারালো। চোখজোড়াও চমৎকার। ঢাকায় অনেকেই বলেছে, কাশ্মিরের মেয়েরা অপূর্ব। কিন্তু ওয়াদুদ দেখেছে, ছেলেরা বেশি সুন্দর। হয়ত কোনো রূপবতী ওর চোখে পড়েনি। এখানে জিনিসপত্রের দামও কম। বিশেষ করে ফলের। ঢাকায় আঙুর তিনশ টাকা হলেও এখানে আশি রুপি। আপেলও সস্তা। ওয়াদুদ আপেল বাগানের ছবি তুলেছে। বন্ধুদের পাঠাবে। মনে পড়লো, নেট নেই ফোনে। ভারতের সিম নেয়া হয়নি। হোটেলে পৌঁছে ওয়াইফাই কানেক্ট করে ও। সঙ্গে সঙ্গে হোয়াটস আপে একের পর এক মেসেজ আসা শুরু। পুরানো মেসেজ। নেট ছিল না বলে আসেনি। প্রিমার মেসেজও এসেছে। ওর পড়তে ইচ্ছে হয় না। কী ভেবে ওয়াদুদ গ্যালারি থেকে ওর ছবি খুঁজে বের করে। কি হাস্যোজ্জ্বল। ও আগে কখনও প্রেমে পড়েনি। কেন যে পড়তে গেলো? আফসোস হয়। অবশ্য হৃদয় তো নাবালক। কার প্রেমে কখন পড়তে হবে সে কি জানে?
পরদিন সকাল সকাল সবাই বের হয়েছে। ঘোড়ায় চড়ে পেহেলগামের এক পাহাড়ে যাবে। লোকে বলে ওটা মিনি সুইজারল্যান্ড। পাহাড় বেয়ে ঘোড়া উঠবে। ঝুঁকিপূর্ণ পথ। পা-পিছলে গেলেই বিপদ। ওয়াদুদ তোয়াক্কা করে না। ওর জীবন এখন বোনাস। সাধ্যমতো দেখে নিবে সবকিছু। ঘোড়ায় উঠতে গিয়ে সে রোমাঞ্চ অনুভব করে। কিন্তু একটু পরেই সাহস উবে যায়। এত খাড়া পাহাড় বেয়ে ঘোড়া উঠছে। চোখের সমানে যমদূত ঘুরঘুর করছে। ওয়াদুদ মনে মনে ভাবে, কেন যে উঠতে গেলাম। কিন্তু মুখে স্মিত হাসি রাখে। ভীতসন্ত্রস্ত দেখলে পরে সহযাত্রীরা টিটকারি করবে।
কতক্ষণ কাটলো ও বলতে পারে না। একসময় আবিষ্কার করলো বরফের রাজ্য। চারপাশে পাহাড়, আকাশ আর স্নিগ্ধ হাওয়া। ওয়াদুদ মন খুলে হাসে। কি শান্তি! ভ্রমণসঙ্গীরাও চমকিত হয়। যেন স্বর্গে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। নিজ চোখে না দেখলে কারো বিশ্বাস হবে না। একজন আরেকজনকে বরফের গোলা ছুঁড়ে মারছে। কেউ শুয়ে পড়েছে বরফের ওপর। ছবি তুলছে। ওয়াদুদ দেখতে পায়, অনেক প্রবীণের ভেতরে থাকা নান্দনিক শিশুটিও বের হয়ে পড়ছে। সবাই খুব খুশি, সবাই নিষ্পাপ। মানুষের আনন্দ দেখলে ওয়াদুদের ভালো লাগে।
ওরা সন্ধ্যায় ফিরলো। পরেরদিন যাবে শ্রীনগর। শ্রীনগর থেকে গুলমার্গ, শ্যোনমার্গ, টিউলিপ গার্ডেন, ডাল লেক। ওখানের বিখ্যাত কাহোয়া-টি। কাশ্মিরের অনেক কিছুই ওয়াদুদ জানে। একসময় কাশ্মির নিয়ে কত পরিকল্পনা করেছে ও। তাই আর তর সয় না। অবশ্য শ্যোনমার্গ ওর স্মৃতির সঙ্গে গেঁথে আছে। ওয়াদুদ আর ভাবতে চায় না।
তিন.
শ্রীনগরে সবাইকে সকাল সকাল উঠতে হয়। ওয়াদুদও ওঠে। এখানের গাড়িচালকেরা খুব রাগী। কথায় কথায় রাগ করে। ওদের মনমতো করতে হবে সব। রওনা দিতে দেরি হলে ওরা বেঁকে বসে। ওই ভয়ে সবাই দ্রুত উঠে পড়ে। সাতটা নাগাদ গাড়ি ছেড়ে দেয়। আজকের গন্তব্য শ্যোনমার্গ। আজ ওয়াদুদের সহযাত্রী রাকিবুল হাসান বসেছেন। পেশায় সাংবাদিক। অনেক অভিজ্ঞতা। তিনি সহজেই ওয়াদুদের উদাস চোখকে পড়তে পারেন। ইতস্তত মন খারাপের কারণ জানতে চান। ওয়াদুদ জোর করে মুখে হাসি ধরে রাখে। বলে, রাতে ঘুমাতে পারিনি। এজন্য এমন মনে হচ্ছে। ও চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করে। প্রশ্নের মুখ থেকে বাঁচার এটিই একমাত্র উপায়। চারপাশে বরফসারি। এরমধ্যে দ্রুতবেগে গাড়ি চলছে।
প্রিমা ছিল পূর্ণ চাঁদ। এত চঞ্চল। সবসময় মুখভর্তি হাসি থাকতো। ঘুরতে খুব পছন্দ করতো। প্রায়ই পাঠাতো তুরস্ক বা ভিয়েতনামের কোনো ভিডিও। ওর খুব ইচ্ছে ভিয়েতনাম যাবে। হালং বে’র পাহাড়গুলো দেখবে। অসংখ্য ছবি তুলবে। কথা শুনে ওয়াদুদ হাসতো। বলতো, নিশ্চয়ই যাবে। ওরা হানিমুন করবে ভিয়েতনাম। অনেকদিন এই প্লান ছিল। তারপর প্রিমাই মত পরিবর্তন করেছিল। বললো, আমাদের প্রথম ট্যুর হবে কাশ্মির। পৃথিবীর স্বর্গে। ভ্রমণের প্রসঙ্গ উঠলেই ওর মুখ পূর্ণিমায় ভরে যেত। ওয়াদুদকে বলতো, তোমার সঙ্গে আমার সবচেয়ে বড় মিল কোনটা জানো? ওয়াদুদ মাথা নাড়তো। জানে না। প্রিমা বলতো, আমরা দুজনই পৃথিবী দেখতে চাই। ভ্রমণ পাগল। আমরা হিউয়েন সাং!
প্রিমা শাড়ি পরতে চাইতো না। কিন্তু ওকে খুব মানাত। ও যখন বউ সেজেছে, মনে হয়েছে আজমগড়ের রানি। এত সুন্দর। বিয়েতে ওয়াদুদকে দাওয়াত দিয়েছিল প্রিমা। অবশ্য চাইলেই তো যাওয়া যায় না। বিয়ের দিনে ওর পরিচিত একজন প্রিমার ছবি পাঠিয়েছিল। ছবিটি এত অশান্তি দিয়েছে ওয়াদুদকে, বলার মত নয়। অথচ ওয়াদুদই ওকে বিয়ে করতে পারতো। প্রিমার কারণেই হয়ত হয়নি। অথবা তার কারণে। ওয়াদুদ অবশ্য সম্পর্ক ভেঙেছে নিজ থেকেই। প্রিমা প্রথমদিকে খুব নাছোড় ছিল। পরে মেনে নিয়েছে। ওয়াদুদ ধরে নিয়েছে, এ সব অভিনয়। প্রিমাই ওকে ছাড়তে চায়। সেকারণে ওয়াদুদ মুক্তি দিয়েছে। যদিও নিজে কখনও মুক্ত হতে পারেনি। একমাস হলো প্রিমার বিয়ে হয়েছে। ওয়াদুদ এখনও তাকে মুছতে পারে না। মাঝে মাঝে তার সন্দেহপ্রবণ মনকে অপরাধী মনে হয়।
শ্যোনমার্গ গিয়ে ওয়াদুদের ঘুম ভাঙে। প্রচণ্ড শীত। ও যখন ঘুমাচ্ছিল রাকিবুল হাসান তখন ওর কিছু ছবি তুলেছে। ছবিগুলো ওকে দেখায়। ঘুমের ভেতরে ওয়াদুদ হাসছে। যেন শিশু। রাকিবুল হাসান ওয়াদুদকে খোঁচা দেয়Ñ কাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন? ওয়াদুদ বলে, পরি এসেছিল! তারপর দুজনেই হাসে।
প্রিমা একদিন ম্যাসেঞ্জারে একটা ছবি পাঠিয়েছিল। শ্যোনমার্গের বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়ায় তোলা এক দম্পতি ছবি। পোজ আর পোশাক সেন্স খুব সুন্দর। প্রিমা বলেছিল, বিয়ের পর আমরা এমন ছবি তুলবো! ওয়াদুদ কথা দিয়েছিল, তুলবে। তোলা হয়নি। তোলা হবেও না। প্রিমা এখন কোথায় কে জানে!
ওয়াদুদ নিজের অজান্তেই পাহাড়চূড়ায় হাঁটা ধরে। পাশেই পাকিস্তান বর্ডার। পায়ের নিচে বরফের আবরণ। ঝকঝকে রোদ বরফে রিপ্লেকশন করে। প্রচণ্ড আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ওর পিছু পিছু রাকিবুল হাসানও আসে। বরফে হাঁটা খুব কষ্টকর। ওয়াদুদের দমবন্ধ হয়ে আসে। স্লেজ গাড়িতেও চূড়ায় ওঠা যায়। কেন ওঠেনি সে জানে না। সবখানে মানুষ গিজগিজ করছে। ওয়াদুদের চোখে পানি এসে পড়ে। সম্মুখের এত সুন্দর দৃশ্য মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর পাহাড়চূড়ায় উঠে ওরা। রাকিবুল হাসান কিছু ছবি তুলে দেয়। ওয়াদুদ দূর থেকে একটা ছবি তোলায়। দৃশ্যটি হবে এমনÑপাহাড়চূড়ায় ও বসে আছে, ভীষণ নিঃসঙ্গ। এরপর রাকিবুল হাসানের কিছু ছবি তুলে দেয় ওয়াদুদ। আশেপাশে কত মানুষ। সবাই যার যার মতো ছবি তুলছে। ওরা চূড়া থেকে নামবে, এমন সময় একটা ছেলে এসে বলে, আপনারা বাংলাদেশি? ওরা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। ছেলেটা জানায়, ও স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে। ওদের একটা ছবি তুলে দিলে খুব ভালো হয়। রাকিবুল হাসান সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলতে চলে যায়। ওয়াদুদ দাঁড়িয়ে থাকে। পাহাড়ের, মানুষের, বরফের, সূর্যের ছবি তোলে।
দশমিনিট হয়ে গেছে। ওয়াদুদের এখন বিরক্ত লাগছে। এখান থেকে নামতে পারলে বাঁচে। রাকিবুল হাসান অদূরে ছবি তুলছে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ওয়াদুদ ওদের দিকে হাঁটা ধরে। সম্ভবত ছেলেটার নতুন বিয়ে। তাই ছবি তোলা শেষ হচ্ছে না। নানা পোজে ছবি তুলে দিতে গিয়ে রাকিবুল হাসান নিশ্চয়ই ক্লান্ত।
ওয়াদুদ চমকে ওঠে। এই বরফের মধ্যে শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে ছবি তুলছে ওরা। এখানে তাপমাত্রা মাইনাস এক ডিগ্রি! মানুষের পাগলামি দেখে ও হাসে। ছেলেটার গায়ে শীতের জ্যাকেটই ছিল। সম্ভবত জ্যাকেটের নিচে পাঞ্জাবি পরে এসেছে। ছবি তোলার জন্যে মানুষ কী কী না করে।
আরেকটু কাছে আসতেই ওয়াদুদ স্থির হয়ে যায়। নিশ্চল। কিছুক্ষণ নিজের হাতে হাত ঘষে। স্বপ্নের ভেতর অথবা নির্মম বাস্তবতার ভেতর শাড়িপরা মেয়েটা ওর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। ওয়াদুদ দেখে, পাহাড়চূড়ায় দিনদুপুরে আধেক চাঁদ উঠেছে। আর আধেক চাঁদের শূন্যতায় চারদিক কি ভীষণ শীতল! ওর মনের ভেতর সশব্দে অবিরাম বরফ পড়ছে। ·
লেখক পরিচিতি : মুহাম্মদ ফরিদ হাসান। কবি ও লেখক। পিএইচডি গবেষক। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থ ৩৩টি। প্রবন্ধ ও গবেষণা শাখায় কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার-২০২৪ প্রাপ্ত। বসবাস করছেন চাঁদপুরে।


0 মন্তব্যসমূহ