সরোজ মোস্তফা
ইচক দুয়েন্দে
সূর্যাস্তের পাশে একাই ঝরাই দুঃখ!
পাপ সঞ্চিত ভূমিতে কার যে কী নাম
দু-হাত ধরেও বুঝতে পারিনি!
গা থেকে সেন্টের গন্ধ যদি খুলে পড়ে
তবেই কিছুটা দেখা হয় ভেতর-বাহির।
সব ঋতুতে কদম ফুটবে না জেনেও আমরা
ফসলের সীমারেখা ভেদ করে দেখি
কেউ নয় নিখুঁত সুন্দর।
দিন ফুরুলেই দিন। আবার নতুন হয়ে ওঠা।
সকালে ফেইসবুক খুলে দেখি কথাসাহিত্যিক ‘ইচক দুয়েন্দে’ লোকান্তরিত হয়েছেন। একজন লেখক লোকান্তরিত হলে সমাজের ভেতরে যতোটা আক্ষেপ উচ্চারিত হওয়ার কথা ততোটা আজকাল আর দেখা যায় না। তাহলে শূন্যতাটা কার? মুষ্টিমেয় সহচরদের? পরিবারের? সমাজ সংবেদনশীল না-হলে, লেখককে না-ধারণ করলে এইসব সাহিত্যযাপন একান্ত ব্যক্তিগত। ইচক দুয়েন্দের মতো লেখকের ক্ষেত্রে এই কথা আরো সত্য। তাঁর মৃত্যুতে গড়াগড়ি খাবেন কবি মাহবুব কবির, তাঁর মৃত্যুতে হাহাকার করে উঠবেন কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ, তাঁর মৃত্যুতে পদ্মা পাড়ের অসীম কুমার দাস আরো নীরব হয়ে যাবেন, ফ্যানের বাতাসে শূন্যতার বিমূর্ততা দূর করতে পারবেন না কবি টোকন ঠাকুর কিংবা সুব্রত আগাস্টিন গোমেজ। তাহলে লেখকের শূন্যতাকে, স্মৃতিকে, দর্শন ও দার্শনিকতাকে লেখককেরাই বহন করে।
অন্তত আমার তাই মনে হয়। এই দেশে লেখকের তেমন ফলোয়ার নেই। আত্মযাপনের চিহ্ন নিয়ে লেখকেরা প্রস্থান করেন। আত্মজীবনীতে কিংবা লেখায় তাঁরা জীবন্ত থাকলেও সেসব পৃষ্ঠা কয়জন আর খুলে দেখেন। তাই লেখকের সহচর, অনুজ বন্ধুরা কিংবা আগামীর ধ্যানী লেখক ছাড়া লেখকের কোনো ফলোয়ার নেই। গা থেকে সমস্ত অহংকার খুলে আবার নতুন হয়ে ওঠার তাগিদেই অগ্রজ লেখকের কাছে আশ্রয় নিতে হয়। সেই আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির হই। কবি পরাগ রিসিল এবং প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক পল্লব চক্রবর্তীর অন্তরিকতায় এই রাজশাহী সফর। এখানেই ঘুমিয়ে আছেন হাসান আজিজুল হক। তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হলো বুড়ো বটের মতো তিনি একটা প্রজন্মকে আশ্রয় দিয়েছেন। কারো কারো নিরাশার দুপুরকে তিনি হয়তো শীতলতা দিতে পারেননি, কিন্তু অনেকের দু-হাত ধরে বলেছেন কী চাও তুমি। আচ্ছা, সবাইকে কি শীতলতা দেয়া যায়? রাজশাহীর সবুজ-নির্জন পদ্মাপাড়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে চেয়েছিলাম সত্যিকার লেখকের মুখ। আমি জানতাম কবি বিষ্ণু বিশ্বাস, কবি অসীম কুমার দাস, কবি ও লেখক ইচক দুয়েন্দে এই ক্যাম্পাসে ঘুরেছেন। ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়েছে প্রত্যেকের জীবনই একটা নদী। এই নদী, একা। কবি বিষ্ণু বিশ্বাস কী এক অভিমানে কোথায় যে হারিয়ে গেছে! তাঁর সন্ধান কেউ হয়তো জানেন। কিন্তু কবিতা থেকে হারিয়ে গেলে কবিকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়!
‘ঝঞ্ঝা ও পুনরুত্থান’ লিখেও নিভৃতেই থেকে গেলেন কবি কবি অসীম কুমার দাস। তাঁর খোঁজে ইংরেজি বিভাগে গেলাম। ইংরেজি বিভাগে যাকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি হয়তো কোনো শিক্ষকই হবেন, যিনি বললেন: তিনি অবসরে চলে গেছেন। অত্যন্ত প্রতিভাবান, ব্যতিক্রমী এবং নতুন ভাষা তৈরিকারী নিভৃতচারী অসীম কুমার দাস অবসরে চলে গেছেন। অত্যন্ত অন্তর্মুখী, প্রচারবিমুখ. নিজের কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে এক ধরণের নীরবতা বা ধ্যানমগ্নতা বজায় রেখে তিনি কাব্যচর্চা করেছেন। তাই হয়তো সমকালীন সাহিত্য অঙ্গনে তাঁর নাম যতটা আলোচিত হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। না-হোক; কবিতায়, সৃষ্টিতে তো পদ্মানদীর মতো তিনি। এই নদী, একা।
ইচক দুয়েন্দে অসীম কুমার দাসের বন্ধু ও সহচর। রাজশাহীর লবণ্যে তাঁরা পাশাপাশি নদী। কথাসাহিত্যিক ইচক দুয়েন্দে (শামসুল কবীর কচি), কবি বিষ্ণু বিশ্বাস, কবি অসীম কুমার দাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে আড্ডা দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে তারা দীর্ঘ সময় ধরে কবিতা, উপন্যাস, সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য ও ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে আড্ডায় মেতে থাকতেন। পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকা (পদ্মা পাড়) এবং শহরের বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডার চেনা জায়গাগুলোতেও (যেমন বকুল তলা) তারা বসতেন। আড্ডা দিতেন। আমি ঘুরে ঘুরে সেই জায়গাগুলো খুঁজতে থাকি। মোরগঝুঁটির সন্ধ্যাবেলা আমি প্রিয় লেখকের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলোতে হাঁটতে থাকি। আমি জানতাম, ইচক দুয়েন্দে রাজশাহী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন শহরের শিরোইলের বিশাল ও প্রায় পরিত্যক্ত পৈতৃক বাড়িটিতে থাকেন। সেখানেও অনেক তরুণ লেখক ও বন্ধুরা এসে সাহিত্যচর্চা ও আড্ডায় অংশ নেন। কিন্তু কী এক উদাসীনতায় সে-দিন আর যাওয়া হয় না। আর যাওয়াও হবে না।
ইচক দুয়েন্দে হলেন বাংলা সাহিত্যের একজন নিরীক্ষাধর্মী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, অনুবাদক এবং প্রকাশক। কবিরা, লেখকেরা সহচরেরা তাঁকে কচি ভাই নামে ডাকতেন। কচি তাঁর ডাকনাম। এই কচি শব্দকে ভেঙেই তিনি ইচক করেছেন। দুয়েন্দে নিয়েছেন লোরকার স্পেনিস মিথ থেকে।
মগরার ছোট শহরে থেকেও বকুল তলার আড্ডায় নব্বুই দশকের মাঝামাঝি কবি মাহবুব কবিরের মুখেই তাঁর নাম প্রথম শুনেছি। আড্ডায়-বিচরণে কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ প্রেম ও মগ্নতায় কতোবার যে তাঁর নাম উচ্চারণ করেছেন—এই নথি আর কে লিখে রাখে। একসময় তিনি ‘শামসুল কবীর’ নামেও লেখালেখি করতেন। প্রথাগত গল্পের বাইরে গিয়ে চেনা বাস্তবতাকে তিনি ভিন্ন দর্শনে, রূপকে ও মনস্তত্ত্বের আলোকে তুলে ধরেছেন।
তাঁকে কোনদিন দেখিনি। না-দেখেও মানুষকে ভালোবাসা যায়। মাহবুব কবিরের মুখেই কচি ভাই সম্পর্কিত গল্পগাঁথা শুনেছি। তাঁর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নাম ‘প্যাঁচা।’ তিনি মনে হয় এভাবে ‘পেঁচা’ লিখেছেন। এই নামে প্রকাশনালয়ের অধিকর্তাও তিনি। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সাংগঠনিক প্রতিভায় আশির দশকের শেষ লগ্নে ঢাকা শহরের তরুণদেরকে আকর্ষণ করেছিলেন। রাজশাহী ছেড়ে সম্ভবত আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকার শাহবাগের সাহিত্যআড্ডায় আবির্ভূত হন। নিরীক্ষামুলক, স্বতঃস্ফূর্ত, সংবেদনশীল পিজির আড্ডায় প্রচুর ধুম্র গেলা হতো। আড্ডায় তিনি ছিলেন অধিনায়কের মত। চারপাশের সহজ সহচরদের গান শুনাতেন। রবীন্দ্র সংগীত। কোনো রকম কারণ ছাড়াই ৯০-এর কবিরা এই আড্ডায় মিশে গিয়েছিলেন।
ইচক দুয়েন্দে যতটুকু লিখেছেন, ততোটুকুই তাঁর স্টাইল ও অভিজ্ঞান। সাধনার প্রকৃতি তাকে ঢাকাবাদীতা থেকে দূরে রেখেছিল। তাঁর গল্প কিংবা কবিতা তার মতই আড়াল প্রিয়। মানুষের মৃত্যু অনিবার্য কিন্তু জীবনযাপনটা একান্ত। জগতকে দেখার মত একান্ত। পদ্মা নদীর মত বিশাল চোখে একান্ত দৃষ্টিতেই পৃথিবীতে দেখে গেছেন ইচক দুয়েন্দে।
কিছুদিন আগে তাঁর টিয়াদুর উপন্যাসটি পড়েছি। পড়ছিলাম আর অবাক হচ্ছিলাম এই ধরনের একটা দুর্দান্ত, অন্যরকম সৃষ্টি কেন এত পরে পড়ছি আমি! টিয়া ও বাদুর মিলিয়ে এরকম একটা নাম রাখাও যে কারো পক্ষে কঠিন হবে। ভাষা-চিন্তা ও আখ্যান প্রবাহে উপন্যাসটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী । জাদুবাস্তবতা, রূপক ধর্মীতার মিশেলে নিঃসন্দেহে এটি নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস। ২০১৬ সালে রাজশাহীর ‘পেঁচা’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি মোট ৪৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত। উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্র ও ঘটনার সমাবেশ রয়েছে। চরিত্রের এই বিশাল সমাহার সাধারণ পাঠকের পক্ষে মনে রাখা কিছুটা কঠিন হলেও, অনেকের মতে—এটিই ছিল লেখকের মূল পরিকল্পনা, যাতে পাঠক কেবল গল্প না পড়ে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেন। উপন্যাসে দুর্দিক, চিরমা চি, তরুমা, চিঙ্ক দাপ্রি এবং হিদ্র পুনের মতো অদ্ভুত ও প্রতীকী চরিত্র দেখা যায়। লেখক সচেতন ভাবে বিচিত্র চরিত্র, কাল্পনিক ও রূপক স্থানের বিবরণ রেখেছেন।
ইচক দুয়েন্দে এই চরিত্রগুলোর মাধ্যমে আমাদের চেনা বাস্তবতার সমান্তরালে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসের নাম ভূমিকায় থাকা 'টিয়াদুর পাখিটি' আসলে মানুষের স্বাধীন চেতনার প্রতীক। এই পাখিটির মাধ্যমে লেখক একদিকে মুক্তির ডানা মেলে, আবার অন্যদিকে মাটির প্রতি দায়ও অনুভব করে। এই উপন্যাস প্রচলিত ও জনপ্রিয় সাহিত্যের বাইরে এসে সময় ও সমাজকে চেনার এক নতুন দৃষ্টি খুলে দিয়েছে। সাহিত্যকে চেনার এ-এক নতুন চশমা। মানুষের অবচেতন মনের খেলাটাই 'টিয়াদুর'-এর আখ্যান।
লেখক পরিচিতি : সরোজ মোস্তফা কবি ও গদ্যকার। জন্ম ১১ ডিসেম্বর, ১৯৭৬; নেত্রকোণা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক। গদ্য ও পদ্য লেখায় সতত সচল।


0 মন্তব্যসমূহ