অনেক লেখকই এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যান, যখন তাঁরা লিখতে চান, কিন্তু লিখতে পারেন না। লেখার টেবিলে বসলে মন খারাপ লাগে, কারণ মনে হয় অনেকদিন কিছু লেখা হয়নি। আবার লিখতে শুরু করতে গেলেই দেখা যায়, দু-এক লাইন লেখার পরেই এক ধরনের আলস্য এসে ভর করে। কলম থেমে যায়, কীবোর্ডের উপর আঙুল স্থির হয়ে থাকে। তখন মনে হয়, হয়তো লেখার ক্ষমতাটাই হারিয়ে গেছে। হয়তো আর লেখা আসবে না। এই অভিজ্ঞতা এতটাই সাধারণ যে পৃথিবীর অসংখ্য লেখক জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এর মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু যাঁরা এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কাছে সমস্যাটি মোটেও সাধারণ বলে মনে হয় না। তাঁদের কাছে এটি এক ধরনের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, এক ধরনের গভীর উদ্বেগ।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যার নাম লেখার অক্ষমতা নয়। বরং এটি কয়েকটি ভিন্ন সমস্যার সম্মিলিত ফল। বিশেষ করে যারা পূর্ণকালীন চাকরি করেন, সংসার সামলান, দৈনন্দিন জীবনের নানা দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে লেখার সংকটের পেছনে সাধারণত তিনটি কারণ কাজ করে। প্রথমত, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি। দ্বিতীয়ত, অসমাপ্ত লেখার চাপ। তৃতীয়ত, লেখা নিয়ে উদ্বেগ ও আত্মসন্দেহ।
ধরা যাক একজন মানুষ সকাল নয়টায় অফিসে যান। যানজট, কাজের চাপ, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, নানা দায়িত্ব—সব মিলিয়ে সন্ধ্যা সাতটা বা আটটায় তিনি বাসায় ফেরেন। তারপরও দিন শেষ হয় না। সংসারের কাজ, বাজার, রান্না, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে রাত এগারোটা বাজে। এই অবস্থায় যখন তিনি লেখার টেবিলে বসেন, তখন দিনের সবচেয়ে মূল্যবান মানসিক শক্তিটুকু ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে। শরীর শুধু ক্লান্ত নয়, মস্তিষ্কও ক্লান্ত। অথচ তিনি আশা করছেন যে এখন বসেই তিনি একটি দুর্দান্ত গল্প লিখবেন, নতুন চরিত্র সৃষ্টি করবেন, জটিল দৃশ্য নির্মাণ করবেন। বাস্তবে এটি প্রায় অসম্ভব একটি প্রত্যাশা।
আমরা প্রায়ই সময়কে লেখার প্রধান শর্ত বলে মনে করি। কিন্তু আসলে লেখার জন্য সময়ের চেয়ে শক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই ঘণ্টা সময় পাওয়া গেলেও যদি মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ ক্লান্ত থাকে, তবে সেই দুই ঘণ্টা খুব বেশি ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। অন্যদিকে, একেবারে সতেজ অবস্থায় মাত্র ত্রিশ মিনিটও অসাধারণ কাজ করে দিতে পারে। তাই অনেক লেখকের জন্য সময় ব্যবস্থাপনার চেয়ে শক্তি ব্যবস্থাপনা বেশি জরুরি।
লেখার সংকটের দ্বিতীয় বড় কারণ হলো অসমাপ্ত কাজের স্তূপ। অনেক লেখকের কম্পিউটার বা খাতায় অসংখ্য গল্প পড়ে থাকে। কোনোটা পঁচিশ শতাংশ লেখা, কোনোটা অর্ধেক, কোনোটা প্রায় শেষ। বাইরে থেকে দেখতে এগুলো সম্ভাবনা বলে মনে হয়। কিন্তু লেখকের মনের ভেতরে এগুলো প্রায়ই বোঝা হয়ে ওঠে। কারণ প্রতিবার লেখার টেবিলে বসার সময় তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—আজ কোন গল্পটি নিয়ে কাজ করব? কোন চরিত্রের কাছে ফিরে যাব? কোন কাহিনির জগতে প্রবেশ করব?
এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজটিও শক্তি খরচ করে। মনোবিজ্ঞানে একে decision fatigue বলা হয়। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নিতে নিতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, লেখক লেখার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করছেন কোন লেখা লিখবেন তা ঠিক করতে। ফলাফল হলো, লেখাই আর শুরু হয় না।
এক্ষেত্রে একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে সব অসমাপ্ত লেখার একটি তালিকা তৈরি করা। প্রতিটি গল্পের পাশে তার অগ্রগতির হার লিখে রাখা—২৫ শতাংশ, ৫০ শতাংশ, ৯০ শতাংশ। তারপর একটি গল্প নির্বাচন করা, সম্ভব হলে সবচেয়ে বেশি সম্পন্ন হওয়া গল্পটি। এবং নিজের সঙ্গে একটি চুক্তি করা—নতুন কোনো গল্প শুরু করা যাবে না, যতক্ষণ না এই গল্পটি শেষ হচ্ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে। একটি গল্প শুরু করা যতটা আনন্দের, একটি গল্প শেষ করা তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। কারণ অসমাপ্ত লেখা কল্পনার সম্পদ, কিন্তু সমাপ্ত লেখা বাস্তব অর্জন। লেখকের আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে সমাপ্ত কাজের উপর, অসমাপ্ত সম্ভাবনার উপর নয়।
লেখার সংকটের তৃতীয় কারণ হলো উদ্বেগ। অনেক লেখক মনে করেন, প্রতিবার লেখার টেবিলে বসেই তাঁকে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হবে। তাঁকে দুর্দান্ত বাক্য লিখতে হবে। তাঁকে অসাধারণ হতে হবে। এই প্রত্যাশা লেখাকে আনন্দের জায়গা থেকে টেনে এনে পরীক্ষার হলে বসিয়ে দেয়। তখন লেখার আগে থেকেই ভয় কাজ করতে শুরু করে।
এই ভয় কাটানোর একটি উপায় হলো লেখার সংজ্ঞা পরিবর্তন করা। প্রতিদিন নতুন কিছু সৃষ্টি করার বদলে প্রতিদিন পুরনো কিছু মেরামত করা। একটি অনুচ্ছেদ সম্পাদনা করা। একটি সংলাপ ঠিক করা। একটি দৃশ্য ঝালিয়ে নেওয়া। কারণ সম্পাদনা অনেক সময় সৃষ্টির চেয়ে সহজ। বিশেষ করে ক্লান্ত অবস্থায় নতুন জগৎ নির্মাণ করার চেয়ে পুরনো জগৎকে একটু পরিষ্কার করা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত কাজ।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। অনেক লেখক মনে করেন, আজ বসে অন্তত পাঁচশো বা এক হাজার শব্দ লিখতেই হবে। কিন্তু এই ধরনের লক্ষ্য অনেক সময় বিপরীত ফল দেয়। কারণ লক্ষ্য যত বড় হয়, ব্যর্থতার ভয়ও তত বড় হয়। এর পরিবর্তে লক্ষ্য হওয়া উচিত অনেক ছোট। যেমন—আজ মাত্র পনেরো মিনিট বসব। লিখতে পারি বা না পারি, পনেরো মিনিট টেবিলে থাকব।
এই কৌশলটি শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি আছে। মানুষ কাজকে নয়, কাজ শুরু করাকে বেশি ভয় পায়। একবার শুরু হয়ে গেলে অনেক কাজই সহজ হয়ে যায়। তাই লক্ষ্য যদি লেখা না হয়ে বসা হয়, তাহলে প্রতিরোধ অনেক কমে যায়।
লেখকদের জন্য আরেকটি উপকারী কৌশল হলো পরের দিনের জন্য একটি সেতু রেখে ওঠা। অনেকেই দিনের শেষে লেখা এমন জায়গায় থামান, যেখানে পরবর্তীতে কী হবে তা তাঁরা জানেন না। ফলে পরদিন আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। কিন্তু যদি লেখক উঠে যাওয়ার আগে কয়েকটি নোট লিখে রাখেন—পরের দৃশ্যে কী ঘটবে, কোন চরিত্র কী বলবে, গল্প কোন দিকে এগোবে—তাহলে পরদিন শুরু করা অনেক সহজ হয়। কারণ তখন কল্পনার দরজা আবার নতুন করে খুঁজতে হয় না।
সবচেয়ে বড় কথা, লেখার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে—এই ভয়কে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। প্রায় সব লেখকই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই ভয় অনুভব করেছেন। বহু বিখ্যাত লেখক দীর্ঘ সময় কিছু লিখতে পারেননি। কেউ চাকরির চাপে, কেউ পারিবারিক দায়িত্বে, কেউ মানসিক ক্লান্তিতে। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই পরে আবার লিখেছেন। কারণ লেখার ক্ষমতা সাধারণত হারিয়ে যায় না। যা হারিয়ে যায় তা হলো লেখার ছন্দ। আর ছন্দ হারানো এবং ক্ষমতা হারানো এক জিনিস নয়।
আমরা প্রায়ই মনে করি অনুপ্রেরণা এলে লিখব। বাস্তবে অনেক সময় উল্টোটা সত্য। আমরা লিখতে বসি বলেই অনুপ্রেরণা আসে। অর্থাৎ অনুপ্রেরণা কাজের কারণ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে কাজের ফল। তাই লেখার ইচ্ছা হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি কার্যকর।
শেষ পর্যন্ত লেখালেখি একটি দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রায় এমন সময় আসবেই যখন মনে হবে আর কিছু লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ হলো নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়া। আপনি যদি সারাদিনের কাজের পর ক্লান্ত হন, তাহলে সেটি ব্যর্থতা নয়। আপনি যদি অনেকগুলো অসমাপ্ত গল্পের চাপে বিভ্রান্ত হন, সেটিও অস্বাভাবিক নয়। আপনি যদি ভয় পান যে আর লেখা আসবে না, তাহলেও আপনি একা নন।
এই অবস্থার পরিবর্তন একদিনে হবে না। কিন্তু একটি প্রায় সমাপ্ত গল্প বেছে নেওয়া, প্রতিদিন মাত্র পনেরো মিনিট সময় দেওয়া, নতুন প্রকল্প শুরু না করা, এবং লেখাকে সৃষ্টির বদলে মেরামতের কাজ হিসেবে দেখা—এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো ধীরে ধীরে লেখকের হারানো ছন্দ ফিরিয়ে আনতে পারে। এবং একদিন হয়তো আপনি লক্ষ্য করবেন, যে গল্পটির দিকে এতদিন তাকিয়েও এগোতে পারছিলেন না, সেটিই শেষ হয়ে গেছে। সেই সমাপ্তির আনন্দ নতুন কোনো অনুপ্রেরণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। কারণ তখন আপনি শুধু একটি গল্প শেষ করেন না; নিজের ভেতরের সংশয়কেও অতিক্রম করেন।
রাইটারস ব্লক নিয়ে
কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের অভিজ্ঞতা-
১. ফ্রাঞ্জ কাফকা : চাকরি ও লেখার দ্বন্দ্ব
কাফকা দিনের বেলা একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কাজ শেষে তিনি এতটাই ক্লান্ত থাকতেন যে নিয়মিত ডায়েরিতে অভিযোগ লিখেছেন—চাকরি তাঁর লেখার শক্তি শুষে নিচ্ছে। অনেক সময় রাত ১১টার পর তিনি লিখতে বসতেন। তাঁর বিখ্যাত গল্পগুলোর অনেকগুলোই গভীর রাতে লেখা।
কাফকার সমাধান ছিল একটি কঠোর বাস্তবতা মেনে নেওয়া: তিনি আদর্শ পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করেননি। বরং যে সামান্য সময় পেয়েছেন, সেটাকেই লেখার জন্য ব্যবহার করেছেন। তিনি লেখাকে অনুপ্রেরণার ঘটনা নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন।
তাঁরও অভিযোগ ছিল—সময় নেই, শক্তি নেই। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা না করে ছোট ছোট সময়ের ফাঁক ব্যবহার করতেন।
২. টনি মরিসন : ভোরের সময় উদ্ধার
টনি মরিসন ছিলেন একাধারে সম্পাদক, মা এবং লেখক। সন্তানদের দেখাশোনা, চাকরি এবং সংসারের মধ্যে তিনি দেখলেন যে দিনের শেষে তাঁর আর সৃজনশীল শক্তি থাকে না।
তখন তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভোরে উঠতে শুরু করেন। সূর্য ওঠার আগের সময়টুকু তাঁর লেখার সময় হয়ে ওঠে।
পরে তিনি বলেছেন, ভোরের সেই সময়টুকু তাঁর কাছে ছিল এক ধরনের মানসিক মুক্ত অঞ্চল—যেখানে অফিস নেই, ফোন নেই, সংসারের দাবি নেই।
সপ্তাহে কয়েকদিন ভোরে ৩০–৪৫ মিনিট লেখার চেষ্টা করা রাত ১১টার ক্লান্ত সময়ের চেয়ে বেশি ফল দিতে পারে।
৩. গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ : আত্মসন্দেহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
মার্কেসকে আমরা প্রায়ই এক অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাসী লেখক হিসেবে কল্পনা করি। বাস্তবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ভয় পেতেন যে তিনি হয়তো আর কোনো ভালো বই লিখতে পারবেন না। অনেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, প্রতিটি নতুন বই শুরু করার সময় তাঁর মনে হতো তিনি আবার লেখালেখির প্রথম দিনে ফিরে গেছেন।
তাঁর কৌশল ছিল কাজটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা। তিনি পুরো উপন্যাস নিয়ে ভাবতেন না। তিনি একটি দৃশ্য, একটি অনুচ্ছেদ, কখনো কখনো একটি বাক্য নিয়ে কাজ করতেন। অর্থাৎ তিনি ভবিষ্যতের বিশাল বইয়ের চাপে ভেঙে পড়তেন না; আজকের কাজটুকু করতেন।
৪. আর্নেস্ট হেমিংওয়ে: মাঝপথে থামার কৌশল
হেমিংওয়ের একটি বিখ্যাত অভ্যাস ছিল। তিনি কখনো সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত লিখতেন না। তিনি তখনই থামতেন, যখন জানতেন পরের অংশে কী লিখবেন।
ফলে পরদিন সকালে বসে তাঁকে নতুন করে পথ খুঁজতে হতো না।
তিনি নিজের জন্য এক ধরনের মানসিক সেতু তৈরি করে রাখতেন।
কোনো কোনো লেখক হয়তো বহু অসমাপ্ত গল্পের মধ্যে আটকে যাচ্ছেন, হেমিংওয়ের এই পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। প্রতিবার লেখার শেষে পরের দৃশ্যের সংক্ষিপ্ত নোট রেখে উঠুন।
৫. ভার্জিনিয়া উলফ : মানসিক ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই
ভার্জিনিয়া উলফ প্রায়ই ভয় পেতেন যে তাঁর প্রতিভা ফুরিয়ে যাচ্ছে। ডায়েরিতে বারবার লিখেছেন যে তিনি নিজের লেখায় অসন্তুষ্ট। তাঁর একটি পদ্ধতি ছিল নিয়মিত ডায়েরি লেখা। ডায়েরি তাঁর কাছে সাহিত্য নয়, অনুশীলন ছিল।
যখন বড় কাজ এগোত না, তখন তিনি ব্যক্তিগত নোট, পর্যবেক্ষণ, টুকরো ভাবনা লিখতেন।
এর ফলে লেখার পেশিগুলো সচল থাকত। গল্প না এগোলে প্রতিদিন ১০ মিনিটের একটি লেখক-ডায়েরি কার্যকর হতে পারে।
৬. জন স্টেইনবেক: অসমাপ্ত কাজের ভয় কাটানো
স্টেইনবেক প্রায়ই বড় প্রকল্পের সামনে আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন।
যখন তিনি The Grapes of Wrath লিখছিলেন, তখন তিনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—তিনি পুরো বই নিয়ে ভাববেন না। প্রতিদিন কেবল কয়েক পৃষ্ঠা লিখবেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছিলেন, "পুরো বইয়ের কথা ভাবলে আমি ভয় পাই। আজকের পৃষ্ঠার কথা ভাবলে পারি।"
এটি লেখকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
৭. হারুকি মুরাকামি : অনুপ্রেরণার বদলে রুটিন
মুরাকামি বিশ্বাস করেন না যে অনুপ্রেরণার জন্য অপেক্ষা করা উচিত। উপন্যাস লেখার সময় তিনি প্রায় সামরিক শৃঙ্খলায় জীবনযাপন করেন। নির্দিষ্ট সময়ে ওঠেন, লেখেন, হাঁটেন, দৌড়ান, ঘুমান। তাঁর মতে, সৃজনশীলতা অনেক সময় প্রতিভার চেয়ে অভ্যাসের উপর বেশি নির্ভর করে। অনেকের রাইটারস ব্লকের একটি অংশ সম্ভবত অনুপ্রেরণার অপেক্ষা। মুরাকামি বলতেন, আগে বসুন, অনুপ্রেরণা পরে আসবে।
৮. রে ব্রাডবুরি : অসম্পূর্ণতার অনুমতি
ব্র্যাডবেরি তরুণ লেখকদের বলতেন, "খারাপ লিখতে ভয় পেও না।"
অনেক লেখক লেখার শুরুতেই ভালো লেখার চেষ্টা করেন। ফলে কিছুই লেখা হয় না।
ব্র্যাডবেরির বিশ্বাস ছিল, প্রথম খসড়ার কাজ সুন্দর হওয়া নয়; অস্তিত্বে আসা।
কারো কারো ক্ষেত্রেও সম্ভবত "ভালো লিখতে হবে" এই চাপ কাজ করছে। আপাতত লক্ষ্য হওয়া উচিত "শেষ করতে হবে"।
এই সব লেখকের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে রেখে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। তাঁদের সংকটের কারণ ভিন্ন ছিল—চাকরি, সংসার, ক্লান্তি, আত্মসন্দেহ, মানসিক চাপ, অসমাপ্ত কাজের বোঝা। কিন্তু সমাধান প্রায় একই ধরনের :
আদর্শ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করা।ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা।প্রতিদিন অল্প হলেও লেখা।অসমাপ্ত প্রকল্প কমানো।অনুপ্রেরণার চেয়ে অভ্যাসকে গুরুত্ব দেওয়া।
এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ভেতরের ভয়কে লেখার অনুপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে না দেখা।
কারণ লেখকের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো এই বিশ্বাস করা যে, "আজ লিখতে পারছি না, তার মানে আমি আর লিখতে পারব না।" ইতিহাসের অধিকাংশ বড় লেখকই কোনো না কোনো সময়ে এই ভয় পেয়েছেন। কিন্তু তাঁরা ভয়টিকে সত্য বলে মেনে নেননি; কাজ চালিয়ে গেছেন। আর সেই কারণেই তাঁদের লেখা আজও আমাদের কাছে পৌঁছেছে।


0 মন্তব্যসমূহ