মো. শওকত আলী
স্বকৃত নোমান বাংলা ভাষার তরুণ প্রজন্মের কথাসাহিত্যিক। তার সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে নিঃসন্দেহে তিনি অন্যতম। গল্প আর উপন্যাসে তার বিচরণ বেশি। এর মধ্যে বেশ কটি উপন্যাস এবং গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে তার। পাঠক এবং বোদ্ধাপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছে তার রাজনটী উপন্যাসটি। ২০১১ সালে প্রকাশিত হবার পরের বছরই ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরষ্কার’ অর্জন করে উপন্যাসটি। পাঠক সমাবেশ থেকে ২০২৩ সালে উপন্যাসটির যুগপূর্তি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তখন উপন্যাসটি পুনর্লিখন করেন লেখক।
রাজনটী উপন্যাসটি নারীর শোষণ, আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং সমাজের বিরূপতার বিপরীত স্রোতে এগিয়ে যাবার এক অনবদ্য উপাখ্যান। তরুণ ঔপন্যাসিক স্বকৃত নোমান কাব্যিক ভাষাশৈলী, ইতিহাস, লোক কাহিনি আর কল্পনার মিশ্রণে উপন্যাসের পটভূমি তৈরি করেছেন। এতে তিনি যথেষ্ট মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন। এটি শুধু একজন নারীর গল্প নয়, বরং একে বিদ্যমান সমাজ-বাস্তবতায় একজন নারীর অস্তিত্ব সংগ্রামের প্রতীকী উপন্যাসও বলা যায়। স্থান-কাল ও পাত্রভেদে নারীরা যে অনবরত সংগ্রাম করে যাচ্ছে, তারই এক সাক্ষী রাজনটী উপন্যাস।
লেখকের ভাষ্যমতে, অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশরা যখন কোম্পানি শাসনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তখন ত্রিপুরা রাজ্যের সুধাবতী নদীর (কাল্পনিক নাম) তীরে হরিদশ্ব নামক একটি ছোট গ্রামে তারু সরকার নামের এক পালাকারের বাস ছিল। তিনি ছিলেন সংসার উদাসী। গুরুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর কেটে যায় দুই বছর। এদিকে প্রচণ্ড খরায় শুরু হয় আকাল। এরপর মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো আসে বন্যা। শুরু হয় দুর্ভিক্ষ।
তারু সরকারের ছিল তিন সন্তান। প্রথম সন্তান গুলনাহার। তিন সন্তান নিয়ে তারু সরকারের স্ত্রী মনজুরি অসহায় হয়ে পড়েন। একদিকে স্বামী নিখোঁজ, অন্যদিকে অভাব-অনটন, দুর্ভিক্ষ, চরম দারিদ্র্য। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে গ্রামের এক লোক গুলনাহারকে দত্তক দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে মনজুরির কাছে আসে। প্রথমে গররাজি থাকলেও অসহায় মা কোন উপায়ান্তর না দেখে এবং মেয়ের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে গুলনাহারকে দত্তক দিয়ে দেয়। জীবনের নির্মম বাস্তবতার কাছে মাতৃত্ব হেরে যায়।
দত্তক পিতা সোবানলি গুলনাহারকে পাঁচ বছর নিজের কাছে রেখে লালনপালন করে। কিন্তু এক সময় তাকেও দারিদ্র্য গ্রাস করে। সেও গুলনাহারকে বেচে দেয় সাবেরা বাঈজীর কাছে। এরপর শুরু হয় গুলনাহারের আসল জীবন।
উপন্যাসটি ইতিহাস আশ্রিত, তবে লোকমুখের বয়ান। তাই যে নুরজাহান নাম ঘুরে ফিরে বেড়ায় এলাকার মানুষের মুখে মুখে, তাকে লেখক সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। নূরজাহানের নাম দিয়েছেন গুলনাহার।উদ্দেশ্য, যেন কখনো ইতিহাসের অনুষঙ্গ না হয়ে ওঠে কল্পনায় মিশ্রিত এ উপাখ্যান।
অনেক চরিত্রের ভিড় রয়েছে উপন্যাসটিতে। তবে কোনো চরিত্র দীর্ঘ নয়। মূল চরিত্র গুলনাহারকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে সব চরিত্র। চরিত্রগুলো গুলনাহারকে ঘিরে আবর্তিত হলেও বৈশিষ্ট্যে অনন্য, সমাজ বাস্তবতার প্রতিনিধিত্বশীল। কোনো কোনো চরিত্র আবার একেবারে হ্রস্ব। গুরুত্ব অনুযায়ী গুলনাহারের মা, সাবেরি বাঈ, মহারাজা দ্বিতীয় রাজধরমাণিক্য, হামজা, অজয় পণ্ডিত, জালাল মির্জা, কাদের মৌলবি, হায়াত তালুকদার—এদের কথা বলা যায়।
গুলনাহারের মা অসহায় এক নারী। একদিকে মাতৃস্নেহ, অন্যদিকে কঠোর বাস্তবতা। চরিত্রটি যেমন দারিদ্র্যের কঠোর নির্মমতার প্রতীক তেমনই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দায়িত্বশীল একজন সংসারী নারী।
সাবেরি বাঈয়ের হাতে গুলনাহার গড়ে ওঠে বাঈজী রূপে। সামন্ততান্ত্রিক যুগে সামন্তপ্রভুদের মনোরঞ্জনের জন্য যে যোগান আসতো বাঈজীদের মাধ্যমে তার খানিকটা চিত্র দেখতে পাওয়া যায় সাবেরি বাঈয়ের অন্দর-মহলে। সে বাঈজীকোঠার নিয়ন্ত্রক, গুলনাহারের টিকে থাকার নিয়ম শেখানোর অভিভাবক। যেমন : “ওস্তাদ রেখে নাচ-গান শিখিয়েছে, দিনের পর দিন পরিশ্রম করে নিজে বাজনা-বাদন শিখিয়েছে। পুরুষদের সঙ্গে কীভাবে আলাপ করতে হয়, কীভাবে কটাক্ষ করতে হয়, কীভাবে করতে হয় ন্যাকামি-ছলনা, সবই শিখেছে তার কাছ থেকে। পুরুষদের কুহকচক্রে টেনে আনার যত বিদ্যা আছে, তাকে সবই শিখিয়েছে সাবেরি বাঈ।” (রাজনটী : পৃ. ২৬)
মহারাজ রাজধর মাণিক্যের সঙ্গে গুলনাহারের সম্পর্ক কিছুটা মায়ার, কিছুটা আবেগের, আবার কিছুটা অনুরাগের। মহারাজকে নিয়ে মনের কোণে কল্পনা বাসা বাঁধলেও সেই কল্পনা ডানা মেলে উড়তে পারেনি। মহারাজা রানি চন্দ্ররেখার কারণে তার থাকার জায়গার পরিবর্তন করলেও আমৃত্যু তার জন্য একটা সুন্দর বাড়ির ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন। মহারাজার আমৃত্যুকাল পর্যন্ত মাইনের ব্যবস্হাও করে রেখেছিলেন গুলনাহারোর জন্য।
এসব কারণে হয়তোবা তার মনের মধ্যে মহারাজের কাছে একটা অধিকারবোধের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। তার ধারণা ছিল মহারাজও হয়তো তাকে কিছুটা প্রশ্রয়ে রেখেছিলেন। সেই কারণে যুবরাজের দুর্ব্যবহারে মানসিক অস্হিরতায় মহারাজের কাছে ছুটে গিয়েছিল গুলনাহার। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কারণে ভুল বোঝাবুঝিতে মহারাজ যখন তাকে অপমান করেন, তখন আত্মসম্মানবোধের কারণে রাজধানী ত্যাগ করে গুলনাহার। কিন্তু মহারাজ রাজধর মাণিক্যের মনের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে তো ছিল গুলনাহার। তাই তো তিনি মনোকষ্টে ভুগেছেন, তাকে খুঁজে বের করার ব্যবস্হা করেছেন, তাকে বিরাট অংকের অর্থকড়ি দিয়ে সাহায্য করেছেন। এমনকি পত্র দিয়ে বাঈজী পেশা ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে থিতু হবার অনুরোধ করেছিলেন। এবং নিজের জীবনবোধেও পরিবর্তন এসেছিল, জলসাঘরের বিনোদন ছেড়ে দিয়ে ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করেছিলেন।
গুলনাহার উদয়াচল ছেড়ে চলে যাওয়া পর প্রথমে যায় তার দত্তকপিতা সোবানালির গ্রামে, তার কাছে আবার আশ্রয়ের আশায়। সেখানে তাকে খুঁজে না পেয়ে রাত কাটানোর জন্য একটি শিবমন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিল গুলনাহার। সেই শিবমন্দিরের পুরোহিত অজয় পণ্ডিতের চরিত্রের উদারতা পাঠকদের নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করবে। সমাজ তো ধর্মগুরুদের কাছে এমন আচরণই প্রত্যাশা করে। গুলনাহারকে যিনি মন্দিরে এক রাত কাটানোর অনুমতি দিয়েছিলেন, সেই তিনি গুলনাহারের জীবনের কাহিনি শুনে বলেন, “মানবজীবন বড় বিচিত্র। আমরা সবাই আসলে যুদ্ধ করছি। একেকজনের যুদ্ধ একেকরকম। যতদিন ইচ্ছা তুমি থাকো এখানে।” (রাজনটী : পৃ.৪১)
এরকম আরেকটি চরিত্র পাওয়া যায় উপন্যাসটিতে। তিনি হচ্ছেন পীর বাহরাম কলন্দর। তিনি বলেন, “বড় ভালোবেসে খোদা মানুষ পয়দা করেছেন। তিনি আমাদের ভালোবাসেন, আমরাও তাকে ভালোবাসব। মানুষ ভুল করে। ভুল করাই মানুষের স্বভাব। মা হাওয়া আর বাবা আদম ভুল করেছিলেন। আমরা তো তাদেরই সন্তান। ভুল করি বলেই আমরা মানুষ। খোদা রাহনুমার রহিম। দয়ার সাগর। তার কাছে ভুলের ক্ষমা চাইলে তিনি ক্ষমা করে দেন ।” (রাজনটী : পৃ. ১২১)। আর পীরের দরবারের মুরীদ ওভক্তদের ভক্তি প্রকাশ—এসবের এক নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায় উপন্যাসটিতে।
উপরের চরিত্র দুটোর বিপরীতে রয়েছে গ্রাম্য এক মৌলভীর চরিত্র—যার নাম কাদের মৌলবি। গুলনাহারের গ্রাম হরিদশ্বের মসজিদের ইমাম। এই কাদের মৌলবির কাছে গুলনাহার তার জীবনের গোপন অধ্যায়সহ সমস্ত ঘটনা খুলে বলে এবং প্রায়শ্চিত্ত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। তার পরামর্শে গুলনাহার গ্রামে মসজিদ নির্মাণ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করার আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। মসজিদ নির্মাণ প্রায় শেষ হলেও একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সেটি ভেস্তে যায়। কাদের মৌলবিও গুলনাহারের অতীত জীবন সমাজের কাছে প্রকাশ করে দেয়।
কাদের মৌলবি ছিল লোভী, গুলনাহারের টাকায় গ্রামে মসজিদ নির্মাণের কাজ দেখভাল করত সে। যেমন : “পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ আর নাওয়া-খাওয়ার সময় ছাড়া বাকি সময় বহেরাতলাতেই পড়ে থাকে। গুলনাহারের উসিলায় খোদা তার আয়-রোজগার বাড়িয়ে দিয়েছে। গুলনাহার নটী ছিল কি বেশ্যা ছিল তাতে তার কী? আল্লাহ গাফুরুর রাহিম। মসজিদের অসিলায় নিশ্চয়ই তিনি গুলনাহারের অতীত জীবনের সমস্ত গুনাহ-খাতা মাফ করে দেবেন। পুকুর কাটার আগে গুলনাহারকে সে বড়সড় একটা মিলাদ দিতে বলেছে। গুলনাহার দিয়েছে। গ্রামবাসীকে মিষ্টিমুখ করানোর জন্য তাকে জিলাপি-বাতাসা কেনার জন্য যে টাকা দিয়েছে তার অর্ধেকও খরচ হয়নি। উদ্বৃত্ত টাকা গুলনাহারকে সে ফেরত দেয়নি।” (রাজনটী : পৃ১২৮)। কোরানখানির টাকাও সে ভিন্নভাবে আত্মসাৎ করে।
কাদের মৌলবি ছিল কামাতুর প্রকৃতির। যেমন : “গুলনাহার খেয়াল করে কাদের মৌলবির দৃষ্টি তার বুকের ওপর। চোখ দুটি লকলক করছে। গুলনাহার চমকে ওঠে। মৌলবির মুখটা অচেনা ঠেকে। মনে হয় কোনো মৌলবির সামনে নয়, সে বসে আছে জলসাঘরে সুরার নেশায় নেশাতুর কোনো পুরুষের সামনে। যে কাদের মৌলবিকে সে এতদিন ধরে চেনে, এ যেন সেই মৌলবি নয়, অন্য কেউ। এ চোখ যেন সাবেরি বাঈয়ের কোঠায় আসা কোনো কামুক পুরুষের চোখ।" (রাজনটী : পৃ.১৩৫)
জালাল মির্জার চরিত্রটি গ্রামবাংলার কিছুটা সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন মুরুব্বি গোছের ব্যক্তির যথাযথ প্রতিনিধিত্বশীল। গুলনাহার বাঈজী জীবন থেকে বের হয়ে যখন তার নিজগ্রাম হরিদশ্বে যায়, তখন পণ্ডিত অজয়-এর সুপারিশে এই জালাল মির্জাই তাকে প্রথম আশ্রয় দেয়। জালাল মির্জার ওপর সবধরনের নির্ভরতা ছিল গুলনাহারের। গ্রামে আবার থিতু হবার ব্যবস্হা করেছিল জালাল মির্জাই।
আবার গ্রাম্য রাজনীতির জটিল এবং কুটিল চরিত্র হচ্ছে হায়াত তালুকদার। যে গুলনাহারের পরিবাবের সম্পত্তি দখল করেছে। গ্রামে গুলনাহারের প্রভাবকে প্রথম থেকেই হায়াত তালুকদার মেনে নিতে পারছিল না। সে ছাড়া অন্য কারো নামে গ্রামের লোকজন ধন্য ধন্য বলে উঠুক সেটি সে কখনো চাইতো না। যার কারণে গুলনাহারকে সে মানসিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। শেষপর্যন্ত তার কারণেই গুলনাহারকে আবার গ্রাম ছাড়তে হয়।
হামজা চরিত্রটি গুলনাহারের সঙ্গে অনেকখানি অংশ জুড়ে রয়েছে। সে ছিল মূলত গুলনাহারের সহকারী। রাজধানী উদয়াচলে গুলনাহার যখন রাজনর্তকীর কাজ করত তখনও হামজা তার সঙ্গে ছিল। আবার গুলনাহার হরিদশ্বে ফিরে যাওয়ার পর মহারাজ রাজধর মাণিক্যের আদেশেই গুলনাহারের খোঁজে বের হয়ে হামজা তাকে হরিদশ্বে পেয়ে যায় এবং গুলনাহারের সঙ্গে গ্রামে থেকে যায়। সহজ সরল প্রকৃতির হামজা ছিল গুলনাহারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাদের সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত মানব-মানবীর চিরন্তন সম্পর্কে রূপ নিয়েছিল।
গুলনাহার চরিত্রটি একজন নারীর সমাজে টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। আত্মসম্মানবোধ সস্পন্ন গুলনাহারের জীবন হতভাগ্য একজন নারীর জীবন। শিশু বয়সে অভাবের তাড়নায় মা তাকে দত্তকের নামে বিক্রি করে দিয়েছিল। পালকপিতার ঘরে পাঁচ বছর থাকার পরে সেও তাকে ধরে রাখতে পারেনি। আবার বিক্রি হয়ে যায় একজন বাঈজীর কাছে। সে বাঈজী তাকে নাচ, গানের তালিম দিয়ে গড়ে তোলে রাজনর্তকী হিসেবে। রাজ দরবারে তার যথেষ্ট কদর ছিল। মহারাজা রাজধরমাণিক্য তাকে ‘প্রেমিকা’র চোখে দেখতেন। সেও মহারাজকে নিয়ে বুকের কোণে একটা স্বপ্ন লালন করতো। হয়তো একদিন মহারাজা তাকে বিয়ে করবে। এ যে কল্পনা মাত্র। যেমন : “সে জানে কোনদিন যে এই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার নয়।...তবু স্বপ্নটাকে সবার অজান্তে লালন করেছে গুলনাহার।” (রাজনটী : পৃ.২০)
রাজনর্তকী হলেও তার আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রখর। তাই যুবরাজ যখন তাকে লাঞ্ছিত করে, তখন সে অভিযোগ জানাতে ছুটে গিয়েছিল মহারাজার কাছে। কুর্নিশ না করাতে মহারাজা তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। রাগে ক্ষোভে অভিমানে আত্মবিক্রিত না হয়ে রাজধানী থেকে বেরিয়ে পড়ে সে অজানার পথে। অবশেষে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ফিরে যায় নিজ গ্রামে।
গ্রামে ফিরে যাবার পথে দেখা হয় অজয় পণ্ডিত নামে একজন পুরোহিতের। যিনি তাকে শিবমন্দিরে আশ্রয় দিয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যে তাকে আপন করে নিয়েছিলেন। জাতপাত, বর্ণধর্মের উপরে মানবতাকে ঠাঁই দিয়েছিলেন। একজন ভালো মানুষের সান্নিধ্য ছেড়ে যাবার সময়ে গুলনাহারের হৃদয় ব্যথিত হয়েছিল।
অজয় কুমার পণ্ডিতের বদৌলতে গুলনাহার আশ্রয় পেয়েছিল জালাল মির্জার কাছে। সেখানে দুই বছর ছিল। জালাল মির্জার অভিভাবকত্বে মহারাজার প্রদত্ত অর্থকড়ি দিয়ে বসত গড়ে গুলনাহার শুরু করেছিল জীবনের নতুন অধ্যায়—সমাজের স্বাভাবিক জীবন যাপন। সে জীবনে আসে প্রেম, আসে পুরানো জীবনের প্রায়শ্চিত্ত করে সামাজিক যাপনের আকাঙ্খা।
বাঙালি নারীর যে চিরন্তন আকাঙ্খা—ঘর বাঁধার স্বপ্ন—গুলনাহারের চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক সেটি তুলে এনেছেন। প্রেমের গতানুগতিক কোন সংলাপ নেই, নেই দৃশ্যপট। আছে অসাধারণ কাব্যিক উপস্থাপনা : “পশ্চিম আকাশের একটা তারা খসে শাঁই করে আরেকটা তারার কাছে গিয়ে মিলিয়ে গেল। দুটি তারা মিলেমিশে এক হয়ে গেল। গুলনাহার বলল, ঘরে যাবে না? তার বুকে হাত রেখে হামজা বলল, আমার ঘর তো এখানে। এখানেই থাকবো চিরকাল।” (রাজনটী : পৃ.১১১)। এককথায় অপূর্ব বর্ণনা।
যে জীবনে গুলনাহার থিতু হতে চেয়েছিল সে জীবন না পেয়ে হতাশায় ডুবে যায় সে। ক্ষণিকের জন্য জীবনের মায়াও ত্যাগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। তাকে জীবন টেনে নিয়ে নিয়েছিল। জীবন সম্পর্কে গুলনাহারের শেষ বোধটা যদি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যদি বলা হয়, তবে তা এরকম—
“রূপ-নারানের কূলে
জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়।
রক্তের অক্ষরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়;
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।”
গ্রামীণ মানুষের যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গ এসেছে উপন্যাসটিতে। শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে আছে ঐতিহ্যিক আনন্দ-বিনোদনের জন্য মেলার বর্ণনা, সাধারণ মানুষের ধর্মের মোহ, ষড়ঋতুর মতোই তাদের মনের বিচিত্রতা। যে মানুষেরা গুলনাহারকে ভালোবাসতো, সম্মান করত, তারাই আবার মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঘৃণা করতে দ্বিধা করে না বিন্দুমাত্র। তাদের মনের আগাপাশতলা খুঁজে পাওয়া কঠিন—যেটা গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক চরিত্র—সহজ সরল, জটিল এবং কুটিল।
লেখক অত্যন্ত দক্ষভাবে লোককাহিনীর চমৎকার মিশেল করেছেন উপন্যাসটিতে : “জয়গুনপুরের কিছু গাছে বৈশাখের শুরুতেই কাঁঠাল পাকতে শুরু করে। সেসব কাঁঠাল কেউ খায় না, রেখে দেয় মহাদেবের জন্য। সেসব কাঁঠাল তার ভোগ। জাজিনগরের ঘরে ঘরে চলে পূজা-অর্চনা। দুঃখ-দুর্দশায় মানুষ দিনের পর দিন পড়ে থাকে তার আরাধনায়।...প্রসন্ন হয়ে তিনিই তো হীরাবতীর গর্ভে মহারাজ ত্রিলোচনের জন্ম দিয়েছিলেন এবং প্রকাশ করেছিলেন চতুর্দশ দেবতার মুখ। সেই ভোলানাথ মহাদেবের উদ্দেশ্যে বছরের প্রথম ফলটি উৎসর্গ না করে জাজিনগরের মানুষেরা খায় কেমন করে?” (রাজনটী : পৃ. ১৩)
আবার প্রকৃতির বর্ণনা যেন গদ্য কবিতা : “জোনপহর। পুবের আকাশে দ্বাদশীর চাঁদ। গাছগাছালির ফাঁকফোকর গলিয়ে চাঁদের আলো পড়েছে রাস্তার ওপর। তাতে সৃষ্টি হয়েছে আলো-আঁধারির রহস্যময় জাল। দূর লোকালয় থেকে ভেসে আসছে বাঁশির সুর। কোনো বিরহী প্রেমিক বুঝি নির্জন টিলায় বসে মোহময় সুর তুলেছে মুরলিতে। দখিনা বাতাসে সেই সুর একবার স্পষ্ট হয় তো ফের অস্পষ্ট। গাছগাছালির ফাঁকে আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু নির্জন পাহাড়ি পথ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে জানে না গুলনাহার।” (রাজনটী : পৃ. ১৪)। ওদিকে খরা আর দুর্ভিক্ষের বর্ণনাও একেবারে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে উপন্যাসে।
এবারে একটা ভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা যাক। কোনো পাঠক যদি ইতিহাসের পাঠ মাথায় নিয়ে উপন্যাসটি পড়েন, তাহলে দ্বিধায় পড়ে যেতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক দ্বিতীয় রাজধর মাণিক্যের কথা। উপন্যাসে বলা হয়েছে ঘটনা অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকের। কিন্তু ইতিহাস বলে দ্বিতীয় রাজধর মাণিক্যের রাজত্বকাল ছিল ১৭৮৫ থেকে ১৮০৪ সাল। আবার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার অনেক নথিতে জাজিনগরের রাজধানী ছিল উদপুর। উদয়াচল মূলত একটি পৌরাণিক বা কাল্পনিক নাম, যার অর্থ যে পাহাড় থেকে সূর্য উদিত হয়।
উপন্যাসের এক জায়গায় রিয়াং বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে : “কুর্নিশ না করায় মহারাজের মনে হচ্ছিল গুলনাহারও বুঝি সেই রিয়াং বিদ্রোহীর মতো ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে।” কিন্তু ইতিহাস পাঠে দেখা যায়, রিয়াং বিদ্রোহ ঘটেছিল ১৯৪২-৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরার রিয়াং জনজাতির মানুষের অধ্যুষিত পার্বত্য ত্রিপুরায়। তখন ত্রিপুরার মহারাজা ছিলেন বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য।
উপন্যাসের শুরুটা যেভাবে হয়েছে শেষটা কিছুটা তাড়াহুড়ো করে হয়েছে বলে মনে হয়েছে। লেখকের বয়সের একটা প্রভাব এখানে থাকতে পারে। ·
লেখক পরিচিতি : মো. শওকত আলী অবসরপ্রাপ্ত সচিব। অবসরের পর পাঠ এবং লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছেন। বসবাস করছেন ঢাকায়।


0 মন্তব্যসমূহ