ঘর, বাড়ি, আঙিনা
সমস্ত সন্তর্পণে দিয়ে মামিমা
ভেজা পায়ে চলে গেল খালের ওপারে সাঁকো পেরিয়ে—
ছড়ানো পালক, কেউ জানে না!
—রাঙামামিমার গৃহত্যাগ, শঙ্খঘোষ
১.
আমরা সবাই কইতাম মামিমা। হিন্দুগো মাসি আমাগোর খালা, হিন্দুগো পিসি আমাগোর ফুপু। কিন্তু মা, মামা, মামির কোন হিন্দু মুসলমান নাই। আমরা সবাই তাই কইতাম চপল মামা আর রাঙামামিমা। আরেকটা মজার জিনিস ছিলো, মামির সঙ্গে মা লাগাইতাম, মানে মামিমা কইতাম। মামার সঙ্গে কিন্তু বাবা জাতীয় শব্দ মিলাইতাম না। মানে মিলানির নিয়ম ছিলো না, আমার আম্মা কইতো মামা হইলো দুইটা মা। কিন্তু চপল মামারে কোনভাবেই একটা মা কিংবা অর্ধেক মা মনে হওয়ার সুযোগ ছিলো না। তাই বইলা রাঙামামি’রে খুব মা মা মনে হইতো তা না। কিন্তু আমরা সবাই মামীর সঙ্গে আরেকটা মা যোগ কইরা দিতাম। আদতে মামীমা হইলো দুইটা মা। মামীমা, আগে মা, পরে মা। কিন্তু মিছা কথা কমু না বাপ, রাঙা মামীমারে আমার কোনদিনই মা মনে হইতো না। বরং আমার মুখে যখন থাইকা গোঁফের রেখা দেখা গেছে তখন থাইকা তার জন্যই আমার পরাণ পুড়তে শুরু করে। তখন কে জানি কইছিলোও, শ্রীরাধা নাকি সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণের মামী ছিলো। সেই থাইকা নিজেরে কেমন শ্রীকৃষ্ণ কৃষ্ণ মনে হইতো।
দুধটা, মাখনটা চুরি করার কিংবা নৌকা বিলাসের সুযোগ তো ছিলো না। তয় তালের পিঠা, তিলের নাড়ু, লুচি আলুর দম মামির হাতে খুবই খাইতাম। বুঝলা নাতি, তোমাগোর পোলাপান এখন কয় না, ক্রাশ খাইছে আমি তখন নাড়ু, তালের বড়া খাইছিলাম। তোমরা কইতে পারো এইটাই ক্রাস খাওয়া। আমি তখন খালি রাঙা মামির আগেপিছে ঘুরতাম। বয়স তো কম ছিলো। সবার দেখাদেখি মামিমা কইতাম, কিন্তু মী খুব টেনে কইলেও ‘মা’টুকু টুক করে গিলে ফেলতাম। মা শব্দটা কোন সময় কইলেও সেটায় জোর দিতাম না মোটেও। এইসব অবশ্য তখন বুঝি না। কেন মামি’র দীর্ঘ টানের পর হ্রস্ব করে মা বলতাম কিংবা বলতে চাইতাম না সে দ্বিধার কারণ জানতে জানতে আমার যৌবনকালটাই খরচ হয়া গেলো। কোন সময় যে রাঙামামি আলতাপরা হাত-পায়ের চিন্তায় শৈশবকালটা হারায়া ফেললাম তাও ঠিক কইরা বুঝি নাই তখন। আরো সোজা কইরা কইলে, শৈশব, কৈশোর না, আমি তো ভার্জিনিটি হারাইলাম। না ফিজিকাল না, মেন্টাল ভার্জিনিটি। চিন্তার সতীত্ব হারাইলাম। খাঁড়াও, মুইতা আসি, তারপরে তোমারে এই বিষয়টা আগে কই। লুজিং মেন্টাল ভার্জিনিটি, মানসিক সতীত্ব হারানো, এইটা আজকের দিনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হুম। চাপ, তলপেটের নিচে চাপ মারাত্মক জিনিস রে নাতি। না-খায়া থাকতে পারবা, কিন্তু তলপেটের চাপ নিয়া থাকতে পারবা না। বাপের লাশের সামনেও তলপেটের চাপ অপ্রতিরোধ্য। আহা, ‘অপ্রতিরোধ্য’ কী সুন্দর একখান শব্দ। এইসব শব্দ তো এখন খালি সাহিত্যের মধ্যে পাওয়া যায়। তাও কি পাওয়া যায় গো? যাউকগা, তা যা কইতাছিলাম, তখন পড়ি কলকাতায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হইছি মাত্র। যথাবিহিত আড্ডা চলতো কলেজ স্ট্রিটেই। সেইখানেই পড়ার বইয়ের বাইরে নানান জ্ঞান চর্চা। নানা জ্ঞান অর্জন করি আর তেলেভাজা খাই আর সারা রাইত গ্যাস নির্গত করি। মনে করো, জ্ঞানেরও একটা বদহজম আছে। পাঠ্য বই পড়িই না। তখন এমন একটা ধারণা হইছিলো, পাস দেয়ার জন্য যে বই পড়তে হয় সেইটা কোন বই না। আদতেই পাঠ্য বই তো ছিলো ওষুধ গিলা। ওষুধ কি কেউ শখ কইরা খায়? তো আমি পড়ি দেশ পত্রিকা, মানিক, বিভূতি, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, এইসব পড়া প্রায় শেষ। তা সেইসময়ই এইসব পার হইয়া তিন দাঁড়িঅলার সঙ্গে পরিচয় হইলো। পরিচয় মানে, এগোর নাম-ধাম শুনছি, এগোর কথা শুনছি। এদের লেখার সঙ্গে পরিচয় হইতে শুরু করলো সেই সময়। কথা সত্য, এদের সঙ্গে ডাইরেক্ট পরিচয় নাই, কিন্তু এরা আমার ডাইরেক্ট ক্ষতি করছে। এই তিন দাঁড়িঅলা বদমাইশ কেমনে আমার ডাইরেক্ট ক্ষতি করছে সেইটা বলি। এটার সঙ্গে ভার্জিনিটি লুসের সম্পর্ক আছে।
তো প্রথম দাড়িঅলা শয়তানের নাম হইলো চার্লস ডারউইন। বিরাট দাড়িঅলা। সে কইলো কি, বির্বতন হইতেছে, হইছে, হইবে। মানে সবকিছুই একটা প্রাকৃতিক সিস্টেমে, প্রসেসে বদলাইছে। এই যে মানব জন্ম, এই যে শুয়োর, কুত্তা, বিলাই, আম গাছ, জাম গাছ, আঙুর, বেদানা, করল্লাÑ সবই জন্মাইছে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়া। একটা প্রাকৃতিক পদ্ধতি আর লড়াই করে যে জাতি টেকার সে টিকতেছে। তা টিকুক কিংবা হারিয়ে যাক। তাতে অসুবিধা কি! অসুবিধা একটাই, তাইলে তো কোন পরম থাকলো না, পরম বোঝ? এবসুলেট পাওয়ার। মানে তাইলে তো একজন সৃষ্টিকর্তা থাকলো না। পবিত্র বাইবেল, কোরানশরীফ, ভগবদ গীতা সবই তো মিছা হইয়া গেলো। এই যে আমরা জানতাম, মানতাম যে স্বর্গের ফ্যাক্টরিতে আমাগোরে বানাইছে স্বয়ং বিধাতা, সেইটা তো মিথ্যা হইয়া গেলো। সেইটা মিথ্যা হইলে তো আমরা এতিম হইয়া গেলাম। মানুষের মা-বাপ না-থাকলে কেমুন অসহায় লাগে, আর যদি ঈশ্বরই না থাকে তাইলে কেমুন লাগে কও! সৃষ্টকর্তা যদি না থাকে তাইলে বিচারটা দিবা কুনখানে, কানবা কার দরবারে গিয়া, ভরসা রাখবা কার উপরে?
আইচ্ছা, মনে করো ঘটনাক্রমে আমরা এতিম, আমরা অসহায়, ঈশ্বরহীন হইলাম। মাইনাও নিলাম। কঠিন সত্য তো মানতে হয়। কিন্তু তাইলেও তো ঝামেলা মেটে না। ঈশ্বর যদি উপরে নাও থাকে তাইলেও তো মাইনষের সঙ্গে মাইনষের একটা মিল আছে, মহব্বত আছে, বন্ধন আছে। আছে না? মনে করো, তুমিও এতিম, আমিও এতিম। এতিম এতিম ভাই ভাই, আমাগো কোন ঈশ্বর নাই। কিন্তু সেইটাও ভাইঙ্গা দিলো আরো দুই দাড়িঅলা মিল্লা। একজন কইলো জগতের সকল মানুষ দ্ইু শ্রেণীর, শাসক আর শোষিত। তুমি হয় শাসক নয়, শোষিত। এই যে তুমি আর আমি কথা কইতাছি। আমি বুইড়া, তোমার বড় দাদা, ঘাটের মরা, সিনিয়র, অতএব তুমি শুনতে বাধ্য। শুধু শুনতাছো না, রেকর্ড করতাছো। নিশ্চয়ই কোন ফায়দার চিন্তায়। তোমরা তো ব্রিটিশ শিক্ষায় বড় হইছো, ফায়দা ছাড়া কিছু বোঝ না। যাক, যা কইতেছিলাম, আমি এখন শাসক, তুমি শোষিত। আমি যা কমু তুমি তা শুনতে বাধ্য। তো আরেক দাড়িঅলা, সে কইলো মানুষে মানুষে মিল নাই, সব মানুষ এক না, আলাদা। তো সে ভালোমানুষ ছিলো। তাই সে ছিলো শোষিতের পক্ষে, আর তখন তো কলকারখানার যুগ। শোষিত মানুষ মানেই কারখানার মজুর। তো সে হাক দিলো, দুনিয়ার মজদুর এক হও। তার হাকডাক কলকাতায় আইসা পৌঁছাইলো। সেই ডাকে কোন কোনখানে মনে করো মজদুররা এক হইলো। তখন কি তামসাটা হইলো! মজদুররা এক হইলে কি লড়াই লাগবো না! লাগবো তো। আর লড়াই লাগলে কি হইবো, মালিকরা আঙুল চুষবো? না। তাদের টেকা আছে, বুদ্ধি আছে, পোষা দালাল আছে। ফলে তারা আরো প্যাঁচ খেলবো। আরো গিট্টু লাগবো। বুঝছো তো, কার কথা কই। সে ভালো কইরা গিট্টু লাগায়া দিলো। এই গিট্টুর ঠেলায় দেশে দেশে যুদ্ধ লাইগা যায়। ঠাণ্ডা লড়াই, স্নায়ু যুদ্ধ, নানা কাহিনী শুরু হইলো।
কিন্তু এরচেয়েও বড় গিট্টু লাগায়া দিলো ফ্রয়েড। খেয়াল করো, সেও দাড়িঅলা। সে কি কইলো, যৌনতা, বুঝলা সবই হইলো সেক্সের খেলা। আইজকা তো তোমরা বাস করো ফ্রি সেক্সের দুনিয়ায়। যে যার সাথে পারো কাম সারতে পারলেই আধুনিক হয়া গেলা। শরীরের স্বাধীনতার কথা তোমরা কও। আমার দেহ যারে খুশি তারে দিমু, যেমনে খুশি তেমনি দিমু। মাশাল্লা! কিন্তু আমাগোর কথা ভাবো? যখন এইসব পড়লাম, শরমে মাটির তলে যাইতে মনে চাইতো। ঘিন্না লাগলো নিজের উপরেই। এই যে পোলায় ভালোবাসে মায়েরে, বাপে ভালোবাসে মাইয়ারে এরমধ্যেও আছে লিঙ্গের খেলা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ। ছি, ছি, ছি! এইসব কথা শোনার পরে কি আর সতীত্ব থাকে মিয়া! কিন্তু এইসব পড়তে পড়তেই বুইঝা গেলাম রাঙামামি হিন্দু, আমি মুসলমান, রাঙামামিরা বড়লোক আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী আর কী বুঝলাম, রাঙামামির প্রতি আমার সেক্সের টান, মানে শুধু ভালোবাসাবাসি না, আরো কিছু! মানে তার রাঙা গায়ের রঙ আমারে টানে। তার ভারী বুক-পাছা, গোলগাল গড়ন, টকটকা গাল, টসটসা ঠোঁট আমার চাই। কি মিয়া, শরম পাইতাছো নি! আরো আছে, কাহিনীর মধ্যে আরো শরম আছে। এখনই উসপিশ কইরো না।
তো মনে করো মানসিক সতীত্ব হারাইয়াই কলকাতা থাইকা ফিরছি। ফিরছি মানে, ফিরতে বাধ্য হইছি। ওই যে ইংরেজ জাত। তারা কি চাইবো, ভারতবর্ষের সবাই মিলামিশা থাক? তারা বিভাজনের আরো টেকনিক বাইর করলো। তারা করলো কি, হিন্দু-মুসলমানের মধ্য লাগায়া দিলো চির শত্রুতা। কইলেই কি আর হিন্দু আর মুসলমান আলাদা থাকবো! তারাও তো আঙুল চোষা পাবলিক না। তাগোরো ক্ষমতা ছিলো, চামচা ছিলো, দালাল ছিলো, বুদ্ধি ছিলো। দিলো লাগায়া দাঙ্গা। তো মূলত দাঙ্গার ভয়েই কলকাতা ছাড়লাম। আমি তো মুসলমান, তারপরে আবার বাঙাল। জানের ডর তো ছিলোই। কাজেই ফিরা আসলাম। নিজে বাচলে বাপের নাম। চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা। শোনো নাতি, তখন আমি জান-প্রাণ নিয়া পলাইছি বইলাই তো তুমি দুনিয়া দেখতাছো। নাকি?
তো কলকাতা থাইকা ফিরাই মনে পড়লো রাঙামামিমার কথা। সে তো হিন্দু, চপল মামার বউ। আমি যেমন কলকাতা থাইকা আইসা পড়তে বাধ্য হইছি তাগোরেও তো বাংলাদেশ থাইকা চইলা যাইতে হবে এখন। মার্কসের ডাক জার্মানী থাইকা কলকাতায় আসে আর কলকাতার দাঙ্গার বাতাস আমাগোর কলমাকান্দায় আসবো না? ঠিকই আসছে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতেই খবর পাইলাম চক্কোবত্তিগো বাড়ি আগুনে পুড়ায়া দিসে। অনিমেষরা কেউ নাই। জ্যোতি, বীথিরে ধর্ষণ করছে। আমার মনে হইলো এই কলমাকান্দা আমার চেনা মাটি না। কেমন যেন রক্তের ঘেরান, হিংসার ঘেরান।
বাড়ি ফিরা তিনদিন আমি ঝিম মাইরা থাকি। কলকাতায় একরকম দাঙ্গা দেইখা আসছি, এইখানে আইসা আর দাঙ্গা দেখি না, এইখানে দেখি এক তরফা হামলা। যদিও কলমাকান্দায় হিন্দুরাই ছিলো বড়লোক। তাগোরই পাকা বাড়ি। কেউ স্বর্ণকার, কেউ বণিক, কেউ গোমস্তা। কিন্তু সবাই কেমন দিশাহারা। বাড়িঘর ছাড়তে লাগলো রাতের আন্ধারে। ডর, ভয়, এইগুলা হইলো আসল জিনিস। ওই যে কয় না, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে আগে খায়।
তো আমাগোর তিনবাড়ি পরেই ছিলো রাঙামামি’র পাকা বাড়ি। বাড়ির সামনেই বিরাট গেট। রাস্তার লগেই গেট। রাস্তার উপরে একটা বড় ছাতিম গাছ। ছাতিম গাছটা পুরা বাড়িটারে আড়াল কইরা রাখতো। এই ছাতিম গাছটার সাথে আমার জন্মের একটা ইতিহাস আছে। আমাগো তো জন্মদিন-ফিন ছিলো না, এইসব বার্থ সার্টিফিকেট, ন্যাশনাল আইডি কার্ড, এইগুলা অনেক পরে হইছে। দেশভাগের পরে কলকাতা গেছি দুইবার। তখন তো পাসপোর্টের কারবার ছিলো না। যাক, কইতেছিলাম, আমার জন্মের কথা। পেরেশান হওইয়ো না, বয়স হইছে কম কইরা হইলেও নব্বই। আমার দোস্তরা তো কেউ বাইচা নাই। এই বয়সে সব কথা গুছায়া কইতেও পারি না। তো আমার জন্ম হইছে কোন এক জৈষ্ঠ্যের রাতে, তীব্র ঝড়ের সময়। সাল-তারিখের হিসাব কেউ রাখে নাই। আম্মায় বলছিলো, ওইদিকে সাহা গো বাড়ির সামনের বিরাট ছাতিম গাছটা হুড়মুড় কইরা ভাইঙ্গা পরলো রহমানগোর বাড়ির ওঠানে আর এইদিকে আমি পেটে থেইকা বাইর হইয়া চিক্কুর দিলাম। ব্যাপারটা কেমন সিনেমা সিনেমা না? সাহা গো বাড়ির গাছ, পড়লো গিয়া রহমান গো বাড়ি। প্রথম দৃশ্যে সাহা বাড়ি, পরের দৃশ্যে রহমান গো বাড়ি। তারপরের দৃশ্যেই দেখাইলা একটা বিরাট মহীরূহ ভাইঙ্গা পড়তেছে, তারপরের দৃশ্যে দেখাইলা একটা টিংটিংয়া বাচ্চা পয়দা হইছে আর নিজের শরীরের চেয়ে বড় চিৎকার দিতাসে।
তো আমি যখন কলকাতা যাই পড়তে, ভাঙা ছাতিম গাছটা তখনও ছিলো। ওটা প্রায় দশফুটের মতো উঁচুতে গিয়া ভাঙছিলো। সেই ভাঙা মাথার নিচ থেকে ডালপালা ছড়াচ্ছিলো খুব। শেকড় তো ছিলো। গাছটা মরেনি। কিন্তু কলকাতা থেকে ফিরে দেখি গাছটা নাই। শেকড়ও নাই। মজার বিষয় হইলো কলকাতা থেকে ফিরেই তিনদিন আমি ঝিম মাইরা থাকলাম। আর তারপরই আমার প্রথমে মনে পড়লো ছাতিম গাছটার কথা, তারবাদে মনে পড়লো রাঙামামি’র কথা। তো ছাতিম গাছটা তো সচোক্ষে দেখলাম নাই। শিকড় বাকড় সহ নাই। কোন চিহ্ন নাই। এইখানে যে পুরা একটা বাড়ি ঢাইকা রাখার ছায়া ছিলো সেইটা নাই। বাড়িটারে এখন ন্যাংটা দেখা যায়। তো আমি বিজেশরে জিগাইলমা, বিজেশ, ছাতিম গাছটার কি হইলো রে? বিজেশ পাল্টা জিগায়, কোন ছাতিম গাছটা?
আমাগোর সময় তো গ্রামে গঞ্জে ছাতিম গাছের তেমন কোন গুরুত্ব ছিলো না। আমাদের কলমাকান্দায় অনেক ছাতিম গাছ ছিলো। তাই বিজেশ জানতে চাইতেই পারে, কোন ছাতিম গাছটা? আমি বরং এইবার জানতে চাইলাম, রাঙামামি’র কি হইলো রে?
এইবার আর বিজেশ জিজ্ঞেস করলো না, কোন রাঙামামি। কারণ রাঙামামিমা তো আর ছাতিম গাছ না, সে এই গ্রামের একজনই। তারে গ্রামের সবাই চিনতো। চেনার মতো রূপ-যৌবন ছিলো তার। শাখা, সিঁদুর, পলা, চোক্ষে কাজল দিয়া সব সময় সাইজা গুইজা থাকতো। আলতাও দিতো প্রায়ই। লাল টুকটুকা শাড়িও পরতো। কুমকুমের টিপ দিতো। আর কী যেন গায়ে মাখতো। একটা শিউলি ফুল শিউলি ফুল গন্ধ। সন্ধ্যাবেলা যখন পিদিম হাতে তুলসী তলায় আসতো দেখলে তারেই দূর্গা মনে হইতো। আহা কি যে অপরূপ ছিলো রাঙামামী।
বিজেশ আমারে কইলো, আর রাঙামামীমা, তার কথা কইস না।
আমি ভয় পাইয়া গেলাম। কেন কমু না? মইরা গেছে? মাইরা ফেলছে? ওইপার চইলা গেছে?
তখন খুব এইপার ওইপার চলতেছে। হিন্দুরা ভারতে যাও, মুসলমানরা বাংলাদেশে আসো। যাও কইলেই কি যাওয়া হয়? বাড়ির তুলসি তলা, বাঁশঝাড়, পুস্কুরনির মাছ, মন্দির, শ্মশান তলা, এইসব রাইখা যখন তখন যাইতে পারে? মানুষ কি খালি ঘর বানায়? ঘরের লগে স্মৃতি বানায়, প্রেম বানায়। ঘরের লগে থাকে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ। এইসব কি টান দিয়া উঠায়া নেয়া যায়?
দাঁড়াও নাতিন, এট্টু পানি খাইয়া লই। এই এক কাজ আমার। পানি খাই আর মুতি। শোনো, নিয়মিত বিয়াম করবা। ডায়বেটিস হইতে দিবা না। তোমরা নতুন যুগের পুলাপান। তোমাগোরে এইসব রোগ থাইকা দূরে থাকতে হইবো। আমরা এক জীবনে যতো রোগ শোক দেখছি তাতে কইরা আমাদের পোলাপানের পোলাপানগো আর রোগ শোক না দেখলেও চলবো। আইচ্ছা নাতিন, ডাইবেটিসটা দুনিয়া থাইকা যায় না ক্যা! তুমি তো জ্ঞানী লোক, আমারে কও দুনিয়াতে কি একটা বিজ্ঞানী নাই যে এই রোগটারে ভালা কইরা দেয়ার ওষুধ দিতে পারে। এমন একটা টীকা দিলো যাতে যক্ষার মতো, বসন্তের মতো ডায়বেটিসটা গায়েব হইয়া গেলো! নাকি অখনও খালি জ্ঞান পাপীদের রাজত্বই চলতেছে?
হুম, হুম, আসতেছি। মূল গল্পে আসতেছি। তো, আমাগোর এই গ্রামটা ছিলো হিন্দু গ্রাম। তুমি তো জানোই, গ্রামের আদতে ধর্ম হয় না। ধর্ম হয় কেবল মানুষের। কিন্তু মানুষ তো সোজা জন্তু না, সে চাইলে সব কিছুর ধর্ম বানিয়ে দিতে পারে। খাওয়ার ধর্ম আছে, ভাষার ধর্ম আছে, দেশের ধর্ম আছে। এগুলো মানুষই বানাইছে। দেশভাগ যখন হইলো তখন ধর্মের নামে মুসলমানের হইলো পাকিস্তান আর হিন্দুর হইলো ভারত। আর মুসলমানের হলো ঊর্দূ আর হিন্দুর হলো হিন্দী। কিন্তু আমরা তো কেমন একটা প্যাঁচের মধ্যে পইড়া গেলাম। আমরা তো বাংলা ভাষায় কথা কই। আশেপাশের হিন্দু বাড়িতে যাই, প্রসাদ খাই, ঢাকের বাদ্যে নাচি, নাম কীর্তন শুনি। আবার আমাগোর ঈদে, শবেবরাতে ওরা আসে, হালুয়া, সেমাই, রুটি খায়, পটকা ফোটায়। বিজেশ তো গরুর গোস খাইতো। কুরবানির সময় সবার আগে বিজেশ হাজির। দোস্ত, কলিজা ভুনা করে নাই মাসী মা? সেই বিজেশও দেখি কেমন ছটফট করে। আমারে একদিন কয়, তুই আমার লগে আর মিসিস না। গ্রামের লোক ভালা চোখে দেখে না। আমার ইচ্ছা করে বিজেশরে একটা চটকানা দেই। দেই নাই। আমি বরং কইছি, বিজেশ, রাঙামামি’র ওখানে যাবি? সে কইলো, তুই যাইস না। আমি যামু কইতেই সে খেইপা গেলো, সে আমারে কইলো, তুই এতো বাল বোঝস আর এইটা বোঝস না, তুই মুসলমান।
আচ্ছা, আমি যে মুসলমান এইটা বুঝতে বিজেশের তিরিশ বছর লাগলো! রাঙামামিরে যে আমি ভালোবাসি সেইটা বুঝতে আমার কলকাতা ঘুইরা আসা লাগলো, ফ্রয়েড, মার্কস, ডারউইন পড়া লাগলো! দেখো, আমরা কতো পিছায়া ছিলাম। একেকটা জিনিস বুঝতে বুঝতেই বছরের বছর পার হইয়া যাইতো। এখন তো সুইচ টিপলে আলো, কল ঘুরাইলে পানি। দুনিয়াটা এমন সহজ ছিলো না। কিন্তু এতো কুটিলও তো ছিলো না। আদতে মানুষই দুনিয়ারে কুটিল করছে। দেশভাগ দেখলাম, মুক্তিযুদ্ধ দেখলাম আর দেখলাম মানুষ, কিন্তু মানুষ বুঝলাম না। মার্কস, ফ্রয়েড, ডারউইনের দোহাই, মানুষ সবচেয়ে জটিল জাতি। করাপ্ট। বদ। বুঝলা, নিজে রাজনীতি করি নাই, কিন্তু বরাবরই রাজনীতির শিকার হইছি। এখন আমার কী মনে হয় জানো, রাজনীতি না-করাটা সবচেয়ে বড় বোকামি হইছে। হয় তুমি রাজনীতি করবা নয় রাজনীতির শিকার হইবা। এইসব তো সবাইরে বলা যায় না। তুমি বুঝবা। আমি তো এগুলা বুঝতে বুঝতে বুড়ো হয়ে গেলাম। তুমি তো অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করছো, তুমি বুঝবা অনেক বেশি। আমি তো স্রেফ কলকাতায় অনার্স পড়তে গেছিলাম। শেষও করতে পারি নাই। দাঙ্গায় পলাইলাম। দাঙ্গা বোঝ? ইতিহাস বোঝ? নিশ্চয়ই বই পত্রে কিছু পড়ছো। তয়, পড়ছো তো ইংরেজিতে, ইংরেজদের বই। ইংরেজরা যে কী হারামি জাত ছিলো সেইটা তোমরা চোক্ষে দেখো নাই, আন্দাজও করতে পারবা না। তোমার বাপে দেখছে পাকিস্তানীগর বদমাইশি আর আমি দেখছি ইংরেজগোর বদমাইশি। ইংরেজরা যখন এই ‘সিভিলাইজেশন’, ‘কালচার’ টাইপের শব্দ খুব ঢং কইরা কয় তখন আমার হাসি পায়। এতো হাসি পায় যে তিনদিনের জমা হাগা ক্লিয়ার হইয়া যায়।
হ, হ, কইতাছি, রাঙার কথা কই। হ, তখন আর মামি কইতাম না। কলমাকান্দা প্রায় হিন্দু শূন্য। বিজেশও একদিন কান্নাকাটি কইরা চইলা গেলো। রাঙামামি’র বাড়িতে কেউ নাই। চপল মামার গলাকাটা শরীর পাওয়া গেলো পূব পাড়ার এক পাগারে। পাগার বোঝো। এই ময়লা ডোবা টাইপ। বডিটাই পাওয়া গেলো। মাথা নাই। সেই বডি পোড়ানোর লোকও নাই। চপল মামা আর রাঙামামিই ছিলো। বাড়ির বাকীরা আগেই বর্ডার পার হইছে। মামির জেদেই চপল মামা যায় নাই। এখন মামি কি করবে?
আলতা পরে না, সিঁদুর পরে না, শাখা পরে না, থুম মাইরা বইসা থাকে। রান্ধে না, খায় না। আমি একদিন রাইতে গিয়া হাজির হইলাম। মামি দাও নিয়া আগায়া আসলোÑ এক কোপে কল্লা ফালায়া দিমু।
রাঙামামি, আমি, আমি হাসান।
মামি দাও নামাইলো। আমি জিগাইলাম, খাইছো কিছু?
মামি আমার দিকে তাকাইলো। কোন কথা নাই। চোখ দিয়া টপটপ পানি পড়তাছে। আমারে কয়, আইছিস কেন তুই?
তোমারে দেখতে আইছি।
মারতে আসোছ নাই? আমারও কল্লাটা ফালায়া দিয়া যা। পাগারের পারে খালি দেহটা রাখিস। দাহ করার সুযোগও দিস না।
রাঙামামি!
আমার কল্লা ছাড়া দেহটা কেমন লাগবো রে দেখতে। মারার আগে ধর্ষণ করবি না?
আমার শরীর কাঁপতে লাগলো। রাগে, ঘেন্নায় আমি মাটির মধ্যেই ঘুষি দিলাম। মামির লেপাপোছা ওঠানে আমি বইসা থাকলাম সারারাইত। কেউ কোন কথা কই না। একরাইত, দুইরাইত, তিনরাইত...। আমি যাইতে থাকলাম। রাইত হইলে একটা নিশিপক্ষীর লাহান আমি যাই। বইসা থাকি। কখনো হাতে কইরা দুইটা চম্পা কলা, কখনো ঠোঙার মধ্যে দুইটা মিষ্টি। মামি ইচ্ছা হইলে খায়, না হইলে নাই।
এরমধ্যেই একরাইতে ঘটলো ঘটনা। দাওয়ায় বইসা রইছি। মট কইরা শব্দ হইলো। ঠ্যাংয়ের নিচে লাঠি ভাঙলে যেমন শব্দ। কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ। তাড়াতাড়ি মামিরে ঠেইলা ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। মামি কি জানি কইতে নিলো, আমি তার মুখ চাইপা ধরলাম। লোকগুলা চইলা গেলো। কিন্তু জানান দিয়া গেলো। তারা বাড়ির ভিতরে ইটা মারতে থাকলো। আমি মামির মুখ চাইপা রাখছি। শব্দ করতে দেয় নাই। আমারে এইখানে পাইলে ওরা আমারে জিন্দা পুড়াইবো। শুধু আমারে না। আমার বাপ, মা, ভাই, বোনÑ সবাইরে পুড়াইবো। কাউরে পুড়াইতে পারলে উচ্ছেদ করতে পারলেই লাভ। জমিটা, বাড়িঘর, জিনিসপত্র সব ভাগাভাগি কইরা খাইতে পারবো ওরা।
একসময় ওরা চইলা গেলো। জানি না, কেন চইলা গেলো। ওগোর তো বাড়িতে হামলা করার কথা। রাঙামামি একা ঘরে। যা খুশি করতে পারে ওরা। আমি মামির মুখ থাইকা হাত সরাইলাম। মামি আমার বুকের মধ্যে মুখ গুইজা দিলো। আমার বুকটা যেন একটা বালিশ। মামি বালিশ চাপা দিয়া কানতাছে। তার পুরা শরীর কানতেছে। কাঁপতেছে। আমি তারে শক্ত কইরা ধরলাম। রাঙা, রাঙা, ও রাঙা, আমি আছি। তোমারে কেউ কিছু করতে পারবো না।
যখন প্রথম কলমাকান্দা আসছিলো রাঙামামি, পালকি থাইকা নাইমা এদিক ওদিক চাইতেছিলো। আশেপাশের ধানক্ষেত, খাল, ছাতিম গাছটারে যেমনে দেখছিলো তেমন কইরা আমারে দেখতে থাকলো মামি। অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না। তাই হাত বুলাইতে লাগলো। আমার বুকে, মুখে। মনে হয়, ছাতিম গাছটারে খুঁজতাছে, ভরাট হয়ে যাওয়া খালটারে খুঁজতেছে। আমার শরীরের মধ্যে নিজেদের বিরাট ধানক্ষেতগুলারে খুঁজতাছে মামী।
আর আমার শরীরের মধ্যে ফ্রয়েড হালায় কারেন্ট মারতেছে। সেই কানের কাছে ফুসফুস শুরু করছে। ফ্রয়েডে কইতেছে, এই যে দেখ, শিউলি ফুলের ঘেরান, এই যে দেখ কি নরম, কি কোমল, এই যে দেখ তোর শৈশব-কৈশোরের স্বপ্নদোষের কারণ...
কবেকার কথা, দেখ নাতিন, এই দেখ, আমার চোক্ষে পানি। আমার জনম গেলো এই পানি নিয়া। দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ... কতো কি ঘটনা? কিন্তু, আমার জীবনে খালি সেই রাইতের আফসোসে, সেই রাইতের ঘেরানে কাটলো। আমি আইজ জানি না, সেই রাতে আমি পাপ করছি, না, পূণ্য করছি। আমি রাঙামামিমারে পরাণ ভইরা রাঙা রাঙা কইরা ডাকছি। সে হাসান, হাসান কইরা আমারে আদর করছে। কানছে আর আদর করছে। আমি শুধু কইছি, রাঙা, আমি তোমারে দেখমু, তুমি আমার, আমার জান গেলে যাইবো, তোমারে আমি যাইতে দিমু না।
পূব পাড়ার খালটার ওইপারেই বর্ডার। একটা বাঁশের সাকো ছিলো। সেইটা দিয়া পুরা খাল পার হওয়া যায় না। পানিতে নামতেই হয়। পানি বেশি গভীর না। তবে সাকো থাইকা লাফ দিয়া নামতে হয়।
পরদিন, বাজারে একজন কইলো, মাগীরে দেখছি, শাড়ি উঁচা কইরা খাল পার হইতে।
আচ্ছা নাতিন, খাল পার হইলে কি দুনিয়াটা হাতের মুঠায় থাকে। যার এ পারে শান্তি নাই তার কি ওই পারে শান্তি থাকে।
২.
হাসান দাদার চোখে পানি। কিন্তু মুখে কোন অভিব্যক্তি নাই। চোখেও নাই। যেন অন্ধ চোখ থেকে পানি পড়ছে। সে একটা নিমের কাঠি দিয়ে দাঁত খোচাচ্ছে। খায় তো দুধ, কলা, বার্লি। দাঁতে আর কী জমা থাকবে তার? তবু বহু বছরের অভ্যাস। দাঁত খোঁচানোর। দাঁত খুঁচিয়ে যাচ্ছে। হয়তো অভ্যাসবশেই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে।
আমি রেকর্ডারটা বন্ধ করলাম।
দাঙ্গা, দেশভাগের এইসব ব্যক্তিগত ইতিহাস আমার গবেষণায় কোন কাজে আসবে বলে মনে হয় না। আমি ব্যাগ গোছাতে থাকলাম। দ্রুত রওনা হতে হবে। রাত্রি থাকতে থাকতে রওনা দিলে পথে জ্যাম কম পাবো।
আমি বিদায় নিবো।
হাসান দাদা বসে আছে, ঝড়ে পড়ে থাকা একটা ছাতিমগাছের ভাঙা শরীর। যেই ছাতিম গাছটার শেকড়-বাকড়ের চিহ্নও হয়তো বিলীন হয়ে যাবে শিগগিরি। ·
লেখক পরিচিতি : মুম রহমান মূলত কথাসাহিত্যিক। লেখেন সিনেমা, নাটকসহ বিচিত্র বিষয়ে। অনুবাদক হিসেবেও সমান খ্যাতি। বসবাস করেন ঢাকায়।


0 মন্তব্যসমূহ