ছেলেটা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে গলির ভিতর দৌঁড়ায়। ওর দৌঁড়টা তীরের মতো এত নিখুঁত যে দুইপাশের ভাঙ্গাচোরা দেয়ালে একবারের জন্যও ঠক্কর খায় না, এমনকি শ্যাওলা পিছল আধভাঙা আধখাওয়া ইটের রাস্তায়ও হোঁচট খায় না, এমনকি অল্প বৃষ্টিতে ডুবে থাকা ইটের খানাখন্দে একবারের জন্য পা-টা হড়কায় না। না হড়কাক, তাতে এমন কিছু মহৎকর্ম হয়নি। যা হবার হবে এবার, তার মায়ের হাতের দুমাদুম কিল-চড় আর গালি! কী বলবে সে মাকে? তিন দিন হলো মোটে রিকশা চালায় আর আজ সে রিকশাটা হারিয়ে ফেলল! প্রথম দিন সত্তর টাকা রোজগার করে মাকে দিয়েছিল, দ্বিতীয় দিন পঞ্চাশ, কাল দশ টাকা মেরে রেখেও পুরো একশ টাকা! আর রাতে মা যে কতবার গায়ে হাত বুলিয়ে বলেছে, বাপ অনেক কষ্ট অয়? পা বেদ্না করে তোর বাপের মতো? পা তার ব্যথা করেছে কিন্তু অম্লান বদনে দাঁতে ঝিলিক দিয়ে বলেছে, না, বেদ্না করবো কেন? আমি তো বাপের মতো বুইড়া হই নাই আর দূরেও তো যাই না, এই কাছেই। দূরের মানুষ তো আমার রিকশায় উডেই না, কয়, তুই পেডেল লাগুর পাস? মা, তয় আমিও কইসি পেডেল যহন লাগুর পামু ঠিক মতো তহন আমি বেবিটেস্কি চালামু, বুজছেন!
কিন্তু এখন কী হবে! রিকশা সে ইচ্ছা করে হারায়নি। এমন কি কোথাও ফেলে রেখে গাঁজাও খায়নি। গাঁজা সে একদিন মাত্র খেয়েছে, আর সে খাবে না, তওবা করেছে মায়ের কাছে। কিন্তু সে জেনে গেছে এখানে থাকলে গাঁজা তাকে খেতেই হবে, না খেলে টিকতে পারবে না।
কান্না শুনে তেমন কেউ এগিয়ে আসে না। বস্তুত, এমন সময় কেউ থাকেও না এলাকায়। গুয়ের লাইন আর পানির লাইন এক হয়ে যাওয়ায় কলে টাটকা গুয়ের পানি দিয়ে কিছুই করা যায় না। পানির লাইনের পাশে গর্তে অবাক চোখ মেলে দাড়িওয়ালা বাড়িওয়ালা গভীরভাবে কী যেন আবিষ্কার করার চেষ্টা করে বহুক্ষণ। একবার চোখ তুলে তাকালো কি তাকালো না তার দিকে, তারপর গর্তে চোখ পাতলো আবার। ভরা দুপুরে গর্তটা একা একা দেখে সে কী আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে কে জানে কিন্তু দ্বিতীয়বার সে ফিরে তাকালো কান্নাটা নিকটবর্তী হয়ে বিশ্রীভাবে কানে লাগলে।
নানা, আমার রিস্কা নিছে গা! নাকের ফ্যাত মুছতে মুছতে বলে।
কেডা?
লম্বা জোব্বা পরা হুজুর বেডা। কয় দোতলায় গিয়া এই পেকেটটা দিয়া আস তো বাবা, আমি পাহারা দেই রিস্কা। আইয়া দেহি নাই, কিছু নাই।
কীয়ের পেকেট?
এই যে, জানি না। কেউ দরোজা খোলে না।
ভিতরে কয়েকটা পুরানো নোংরা ঝোলমাখা পত্রিকা আর একটা পুরানো গামছা, ব্যাপক ব্যবহারে পাতলা ফিনফিনে আর স্যাঁতসেঁতে।
ঘরের সামনে বসে ছেলেটা কাঁদে। ওর নাম মাসুম, তো মাসুম বসে বসে কাঁদে, ঘরে কেউ নাই তার কান্না দেখার। অনেকক্ষণ কান্নার পর আশপাশের মানুষ সহমর্মিতা দেখায় আবার দেখায়ও না। দুই বছর না যেতে মাসুমের মা মানুষের বাসায় কাজ করে দুটো রিকশা বানিয়ে ফেললো, তো একটা যদি কারো ভোগে যায় তো যাক না!
বিকালে কাজ শেষে গলিতে পা রাখতেই বাড়িওয়ালার ঠোঁটে আফসোস, ছেলেডারে মাইরো না মাসুমের মা, বুগা দিয়া রিকশাডা লইয়া গেছে কোন হুজুর শালায়!
মাসুমের মা বুঝতেই পারে না বাড়িওয়ালা খাচ্চর লোকটা কী বলে! আজ তিনদিন ধরে যে কিনা রোজ বলে, পানি আপনায় ঠিক হইয়া যাইব, মাসের মইদ্যে বাসা ছাড়লে মালমাত্তা নিতে পারবা না, এক কথা। অন্যখানে যাইবা? হেনো কি কলে সরবত আহে?
জোব্বাপরা লোক রিকশা নিলো কেমন করে বর্ণনা শোনে ছেলের মুখে তিনবার। ছেলে বর্ণনা করতে করতে উত্তেজনায় চোখ কপালে উঠে যায়, কিন্তু মায়ের বিস্ময় নাই। চোখমুখ খিঁচিয়ে বসে থাকে, ছেলেকে সে মারে না। কে যেন জানালায় মুখ রেখে বলে, মাসুমের মা পোলারে মাইর না, এইডা আল্লার কোনো ইশারা, তোমার কী ক্ষমতা বোঝো!
ছেলেকে মারতে নিষেধ করছে নাকি মারার উস্কানি দিচ্ছে ঠিক বুঝতে পারে না, মুখে বলে মাইরা তক্তা বানামু, আপনে যান।
যেদিন ছেলে গাঁজা খেয়ে এসে বমি করে ঘর ভাসিয়েছিল সেদিনের মতোই আজকেও তার সব কিছু নাই নাই লাগে। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে পা ছড়িয়ে কেঁদে বুক ভাসাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সে কিছুই করে না, ছেলেকে মারে না, কাঁদে না। বুকের ভিতরের নাই নাই ভাবটাই যা একটু অসহ্য লাগে।
রাতে ভাঙগাঁজা খাওয়া জুয়াখোর স্বামীটা ফিরে এলো নিজের রিকশা নিয়ে। গলির মুখেই শুনে এসেছে রিকশা হারানোর সংবাদ। কিন্তু ময়নালকে খুব চিন্তিত মনে হলো না। রাতে ঘুমাতে গিয়ে বলে সকালে এক জায়গায় যাইতে কইছে, দেহি কোনো খোঁজ পাইনি। মাসুমেরর মা উত্তেজনায় উঠে বসে, কই খুঁজবেন? খুঁজুম, গলির সামনে বসিরের লগে দেহা, কইল খবর, কাইল এক জায়গায় নিয়া যাইব। সেনো চোরাইমাল বেচাকেনা হয়, তাড়াতাড়ি না গেলে চালান দিয়া দিব।
কোন জায়গা?
কী জানি নাম কইল! নদীর ওই পাড়ে, কয়লা, আজব জায়গার নাম, কয়লা!
কথা কয়টা বলে ভাত খায় ডাটা তরকারি দিয়ে তারপর ঘুম যায় নিশ্চিন্তে।
ময়নাল বসিরের কাছ থেকেই গত দুই বছরে দুটো রিকশা কিনে দিয়েছে স্ত্রীকে। শেষেরটা কিনতে চায়নি মাসুমের মা, টাকার খুব সমস্যা। বলে, অস্তে অস্তে দিও, তাড়া নাই। এখনও দ্বিতীয় রিকশার পাঁচ‘শ টাকা পাবে বসিরের মহাজন। দাম ছয় হাজার, সারাই করতে লেগেছে দেড় হাজার, মোট সাড়ে সাত। বসির বার বার বলেছে, বাজারে পুরাতন একটা রিকশা বিশের কম না, কিনলে আখেরে জিতবা।
রাতে বিছানায় ছটফট করে মাসুমের মা কিন্তু নাক ডাকিয়ে ঘুমায় লোকটা। গাঁজাখাওয়ার এই হলো সুবিধা, গাঁজায় কোনো চিন্তা নাই।
আসলে ভিতরের মারপ্যাচ কি জানে তার বউটা! রিকশার দাম তো আসলে পাঁচ, সেরেছে হাজার দিয়ে, বাকিটা ময়নাল মেরেছে, দেড়।
নৌকায় বসিরের সঙ্গে নদী পার হয় ময়নাল। ব্রিজের উপর দিয়ে ভ্যানে যাওয়া যেত, কেনো যে নৌকায় আনল, ময়নাল বুঝতে পারে না। বর্ষায় নদীর পানি সীমানা ছাড়িয়ে কোথায় না পৌঁছেছে। চারিদিকে বালুর নৌকা, পাথরের নৌকা, এক আজব জায়গা। কোনটা যে ঘাট, কোনটা যে বালুর মহাল বোঝা দায়। সঙ্গে ছ্যারছেরে বৃষ্টির উপদ্রব।
এঁকেবেঁকে অনেকটা পথ আসার পর বসির বলে, এবার হাঁটতে হইব ময়নাল বাই, বেশি না পন্রো মিনিট।
কিসের পনের, পুরো আধ ঘণ্টা পা চালিয়ে অদ্ভুত এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। উঁচু ডিবির মতো, মাথা সমান বুনোঘাস। এক হাত দূরেও কিছু দেখা মেলে না। উপরে শূন্য নীলাকাশ, দূরে হয়তো পানি আর পানি। বসির শুধু বলে এই পথেই আসতে বলছে, আইজই পরথম আইলাম। কিন্তু ময়নাল এত কাঁচা লোক না, এমন প্যাঁচানো রাস্তায় কেউ এভাবে প্রথম এসে পৌঁছাতে পারে না। ঘাগুমাল ময়নাল চুপ থাকে আর সায় দেয়।
বছর কয়েক আগে দুইমাসের শাপলা আর বার বছরের মাসুমকে নিয়ে যখন শাশুড়ির ভরসায় এই শেখের টেকে এসে পৌঁছায় মাসুমের মা, তখন স্বামী আছে কি নাই। ভাত দেয় না, কাপড় দেয় না, মজে আছে অন্য মাগিতে। এই ভাঙগাঁজা খাওয়া লোকটার আশায় মোটেই আসেনি যদিও। এসেছে শাশুড়ির আশায় কিন্তু সেও ছেলের মতোই শয়তান। সুদূর ময়মনসিং থেকে ভরসা দিয়ে ঢাকায় আনলেও তাকে কোনো সাহায্যই সে করে না। প্রথম তিনচারদিন শাপলাকে দেখিয়ে ভিক্ষা করলেও চালডাল সব শাশুড়ি নিজের জিম্মায় রেখেছে মনের আনন্দে। তারপর আস্তে আস্তে একটা দুটো বাসায় কাজ করতে করতে এখন কাজ করে সাতটা বাসায়। যখন গুছিয়ে নিয়েছে তখনই এসে জুটেছে ময়নাল। জানে ময়নাল খারাপ কিন্তু ভাগাতে পারে না। বারভূতে হাত বাড়ায় শরীরের দিকে, শয়তানগুলো জেনেই আসে কামাই ভালো আর শরীরও টানটান মজবুত। তো থাক, বজ্জাত স্বামীটাই থাক। জমানো টাকাগুলোরও খুব দরকারি কাজে লাগিয়ে দিতে পারবে ময়নাল, এইটুকু ভরসা তো করতেই পারে!
এ এক সাম্রাজ্য। টিনের একটা বড়ো দোচালা। মানুষজন একটা দুইটা। রিকশা, মটরসাইকেল এমনকি বেবিটেক্সিও রয়েছে কয়টা ছড়ানো ছিটানো। কোন কোন রিকশা এত বছর ধরে পড়ে আছে যে চাকার অর্ধেক মাটিতে গেঁথে আছে, ফাঁকে সবুজ দুব্বাঘাস বুক সমান, জড়িয়ে আছে তেলাকুচার লতা আর থলথল সাদা ফুলের বাহার।
বসির বলে, এইটা খোয়াড়, বুঝছো? ময়নাল মাথা নাড়ে, বেশ বুঝেছে সে।
লুঙ্গিপরা মাঝবয়সী মোটা থলথলে এক লোক আসে কাছে, হাতে বিড়ি। চোখের ইশারায় জিজ্ঞাসা করে, কোনটা তোমার গাড়ি? ময়নাল সম্বিত ফিরে পায়, ও আচ্ছা, ও তো রিকশা নিতে আসছে। এবার সে খোঁজে এবং পায়। ময়নাল জানে টাকা চাইবে তবু না বোঝার ভান করে সে গাড়ি বের করে আনে, প্যাডেলে পা রাখে। লোকটা বলে দশ হাজার টাকা নিয়া আস, বাইরে বেচলে বিশে বেচবো। তোমার জিনিস, তুমি দশেই পাবা। বসির বলে, দাদা একটু কমান, গরীব মানুষ, রিস্কাডা একমাসও চালায় নাই। লোকটা কী জানি ভাবে, বলে, যাও একদাম, পাঁচ নিয়া আস বিকালের মইধ্যে, নাইলে সকালে বিশে চালান দিব।
ময়নাল জানে চালান হবে, হয়ত পাঁচেই হবে, যেমন সে পেয়েছিল পাঁচে। বসির মনে মনে হাসে, তাইলে কি দাঁড়াইল, পাঁচ যোগ পাঁচ দশ হইল দুইবারে, আরো কয়বার হয়, দেখা যাক! না, মাসুমের মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে ব্যর্থ হওয়ায় এই কম্ম সে করছে না, এটা তার জীবিকা, ব্যবসা।
বাড়ি এসে ময়নাল জায়গার বর্ণনা দেয়, ভীতিকর এক বর্ণনা। যতটা তার চেয়ে অনেক বেশি, যেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে রিকশা বের করে আনতে গেছে। মাসুমের মা দেখে নিক সে কত কাজের! এখানকার মালই সে কিনেছে তা কি ময়নাল জানত! এখন জানে এবং গোপন রাখে। বলে, আসলে এখন ছয় হাজার না দিলে রাতের মধ্যে চালান হয়ে যাবে। ময়নাল বলতে চায় বিবিসাব গো কাছ থেকে টাকা ধার করাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আগের বার যেমন বলতো পুরাতন একটা গাড়ির দাম বিশ হাজার, এখন সে বলে নতুন একটার দাম চল্লিশ হাজার।
সত্যি সত্যি ধারদেনা করে ছয় হাজার সে ময়নালের হাতে তুলে দেয় বিকালে আর রাত নটা নাগাদ গাড়ি বাড়ির উঠানে এনে রাখে ময়নাল। বলে, বসির না থাকলে খোদায় জানে তোমার রিস্কার কী হইত। বাইতদারের পথ? দুইজনে চালায় আইছি। বসিররে একদিন পিডা বানায় খাওয়াইও, তেলের পিডা। কমলাপুর থাকতে না কয়দিন পিডার ব্যবসা করছিলা? ময়নালের এই এক দোষ, পকেটে দুটো না হক পয়সা আসার সঙ্গে সঙ্গে বউকে তোয়াজ করতে থাকে। বাপের সাথে মাসুমও খুশি। মাসুমের আনন্দে মা কিঞ্চিত খুশি কিন্তু কাল থেকে রিকশা কে চালাবে? নাকি পড়েই থাকবে, ধার শোধ করতে কত দিন লাগবে, ধারের সুযোগে বিবিসাবরা কত না হক কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নিবে! ছেলে বলে, মা তোমার রিস্কা আর ধরুম না, শিক্ষা হইছে!
একটা দিনই কেবল বিরতি, তারপর আবার রিকশা নিয়ে বের হয় ছেলে, সঙ্গে মায়ের হাজারটা বুদ্ধিফিকির। ছেলে আগে সওয়ারি দেখে, পছন্দ হলে তবে তোলে। কিন্তু পছন্দ সে কমই করতে পারে। ছোট মানুষ বলে লোকে এমনি উঠতে চায় না। এই এলাকায় মহিলা আরোহীও কম, এটাও সমস্যা। মহিলারা ওজনে কম, টাকা দেয় ভালো আবার বিপজ্জনকও না। প্রায়ই ছাত্রীরা তাকে দুটো তিনটে টাকা বেশি দেয়, কখনো পাঁচ টাকাও দেয়। ‘আহা তোমার বুঝি বাপ নাই’, ‘তোর বাপ বুঝি খেতে দেয় না’! প্রথম প্রথম ও বলে, না, বাপ আছে, রোজগারও করে। তারপর সে বলে বাপ আছে খেতে দেয় না, বাপ আছে দেখে না। আরোহী খুশি হয় আর ও পায় বাড়তি দুটো টাকা।
ছয়মাস ভালোই চলে। মাসুম সতর্ক। ধারদেনাও শোধ। ময়নাল বউকে আবার ফুসলায় আরেকটা রিকশা কেনার জন্য। বলে কুমিল্লা বডি, কেন্, লাভ করবি। ময়নাল বুঝতে পেরেছে ওর হাতে দুটো পয়সা জমতে শুরু করেছে। বউ রিকশা কিনলে ওর পকেটে হাজার কি তারও বেশি জমা পড়ে, জুয়াখেলাটা মন মতো চলে কয়দিন। গাইগুই করে ও, বলে, বাড়িতে দুই তিন শতাংশ জমি কেনার কথা ভাবতেছি, আপনে তো বাজার ছাড়া একটা পয়সা দেন না, ঘর ভাড়াডা দিলেও কয়ডা পয়সা জমে ইত্যাদি।
কপাল খারাপ, আবার মাসুম মাথায় হাত দিয়ে উঠানে বসে থাকে, লজ্জায় কাঁদতে পারে না। কেন লজ্জা! কি না, এক মেয়ে তার রিকশা নিয়ে গেছে। একই কায়দা। এই প্যাকেটটা একটু চারতলায় দিয়া আস তো! গত সাত দিনে মেয়েটা আরো দুইতিনদিন রিকশা চড়েছে, চেনা মুখ। প্যাকেট খুলে দেখে ভিতরে একটা পুরানো সেলোয়ার কামিজ। চারতলার মহিলাই খুলেছে, বলে, তুমি কি রিকশা দাঁড় করায়ে আসছ? দৌঁড়াও, রিকশা নিয়ে পালাচ্ছে! মাসুম প্যাকেট ফেলে পাগলের মতো দৌঁড়ায় চোখ বন্ধ করে। না, সিঁড়িতে সে একবারও হোঁচট খায় না। এগারটা ধাপ সে দুইবারে নামে।
যথারীতি বিকালে বসিরের সঙ্গে দেখা। বসির বলে, সেখানে যাও, রিকশা পাবা, চালান কিন্তু দিতে সময় নেয় না। তয় মাইয়া মানুষ আবার রিকশা নেয় কেমনে ময়নাল ভাই!
এবার তারা ভ্যানে করে যায়। ময়নাল বুঝতে পারে চট করে জায়গাটা যাতে না চেনা যায় সে কারণেই একেক দিনে একেক রুটে তাকে আনা। একই কাহিনি, পাঁচ আনো, ছাড়ায় দিমু।
এবার বেঁকে বসে মাসুমের মা, থাউক রিস্কা, আমার রিস্কার দরকার নাই, মজা পাইছে, আমি ছয় হাজার টাকা কই পামু? এক রিস্কার দাম পরলো আডার হাজার, আনলে আরো পড়বো, আমারে ক্ষেমা দেও। ময়নাল এবার পীড়াপীড়ি করে না।
সকালে বসির আসে, গাড়ির কী করলা?
ময়নাল সকালে পরোটা খায় দুধচায়ে ডুবিয়ে, দোকানের চা, দোকানের পরোটা। খাস্তা পরোটা, মুচড়ে চুবানো সময় ঝুরঝুরিয়ে পড়ে চায়ে। ছেলের জন্য একটা রেখেছে। ছেলে বিছানার ছেঁড়াময়লা চাদরটা মুড়ি দিয়ে ঘুমায়। ঘুমটা তার আসে যায়, জমে না বাপের চাবড় চাবড় পরোটা চাবানোর শব্দে।
দরোজা আগলে চা-পরোটা খাওয়া দেখে বসির। সুযোগ পেলেই এ বাড়ির ভিতর সে ঢুকে পড়ে। মাসুমের মায়ের হাতের পিঠা তার কাছে অমৃত লাগে। বলে, ভাউজ আরেকদিন পিডা খাওয়াইয়েন যে!
ময়নালের হাতে ধরা পরোটার দৃশ্যমান অংশ বহুক্ষণ একই রকম দেখে বসির। ময়নালের কোনো তাড়া নাই, রিকসা ছাড়নোর চেষ্টাটা করে যাবে আপাতত।
মাসুমের মা কাজে চলে গেছে, সে এক পয়সাও দিবে না, রিকশার দরকার নাই তার। ময়নালও তাচ্ছ্যিলের সাথে বসিরকে বলে, কী রোজ রোজ খোয়াড়ে দেয়, বেইচা দেয় দেক, বাল আনতে যামু না!
বসির অনেকক্ষণ পীড়াপীড়ি করে উঠে যায়। ময়নাল কিন্তু চা খেয়ে একটা ঘুম দেয়।
দুপুরে উঠে রওয়ানা দেয় ভ্যানে। পথ সে হারায় আবার পথ খুঁজেও পায়। কয়লা গ্রাম কেউ চেনে না, এই নামে কোনো গ্রাম নাই।
এটা একটা রাষ্ট্রের ভিতর রাষ্ট্র, নিজেরা নিয়ম করে নিয়েছে, টাকার ভাগ কে পায় না! এমপি থেকে কমিশনার থেকে পুলিশ থেকে মায় দারোয়ান পর্যন্ত। নিজেরা লোক নিয়োগ দিয়েছে, তারা নানা কিসিমের গাড়ি চুরি করে নিয়ে আসে, বখরা নিয়ে চলে যায়। অন্য এজেন্ট যায় মালিককে খবর দিতে, আসে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। কমিশন নিয়ে কোনো ঝামেলা নাই, সকলের ভারি ভাব। ভয়াবহ ডিসিপ্লিন। তারপরও যদি মাল না নেয় তো চালান ব্যবস্থা তো রইলই। তো ময়নাল ওদের লোক হতে চায়। সে অনেক বিশ্বস্ত, পরীক্ষা করে দেখতে পারে।
কাজ যেই করুক নগদ পাঁচ’শ। বাকির কোনো কারবার নাই এখানে। কিন্তু সমস্যা। তুমি কোন এলাকায় কাজ করবা? তোমার এলাকায় তো তোতা কাজ করে! তোতা কে? অহ্, সে বসির, তোমার এলাকায়। তুমি অন্য জায়গা চয়েজ কর। কিন্তু তোমার গাড়ি কিন্তু তোমারে পয়সা দিয়াই নিতে হবে, বুজলা!
ময়নাল বুঝবে না! বুঝেছে, সে মাথা ঝাঁকায়। বলে, চালান দেন আমারে কয়টা পয়সা দিয়েন।
ঘরে আসার পথে বসিরের সঙ্গে দেখা, সে মিটমিট করে হাসে। মানে সংবাদ সে জেনে গেছে।
বসিলায় ময়নালের আগের একজন থাকে, সেখানে ডেরা বাঁধা যায় যদি সঙ্গী না জুটে থাকে। সমস্যাও হতে পারে এতদিনে সে যদি ঘরে অন্য কাউকে আশ্রয় দিয়ে ফেলে থাকে তো তাকে কুকুরশিয়ালের মতো তাড়াবে।
বহুদিন এমন সহজ একটা কাজই সে খুঁজছিল। লাইসেন্সবিহীন রিকশা চালানো তো ভয়ের কাজ আবার শক্তির কাজও রিকশা চালানো। এটা সে আর করতে চায় না। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবে কী করা যায়। একা একাই বলে আমার বয়স পঞ্চাশ, বয়স বাড়তেছে। একটু পর পর মাসুম মায়ের কাছে বকা খায়। এখন কী হবে সে জানে। ছেলেটা বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াবে, গাঁজা খাবে আর চুরিচামারিতে লেগে পড়বে!
এখন মাসুমও জানে রিকশাটা হাতছাড়া হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য। এদিকে মাসুমের মা মরিয়া আর ছয়মাস কাজ করে সে বাড়িতে দুই শতাংশ জমি কিনে একটা টিনের ঘর তুলবে, চালে পুঁই কি সীমের একটা লকলকে ডগা! বাড়িতে তাকে ফিরতেই হবে পাঁচ কি দশ বছর পর, শুরু করতে হবে এখন থেকেই। বুড়ো বয়সে স্বজনদের হাতের পানি খেয়ে সে মরবে, এইটুকুই খায়েস। এখানে কেউ কারো না, হিংসুট আর চোরছেঁচড় ভরা দেশ এটা।
গল্পের শেষটা! এর আট বছর পর ময়নালের বসিলায় ডেরা মোটামুটি পোক্ত। আগের জনকে কব্জা করতে প্রতিভার শেষ বিন্দু খরচ করেও ফেল করেছে। বহুবার ভেসে যেতে যেতে টিকে আছে যা হোক। ময়মনসিংহ থেকে সে অষুধ আনে, নাম মালতিলতা। সে আর তার বিয়ে না করা বউ খায়, বেচেও মোড়ের চায়ের দোকানে। প্রতিদিন তারা সহবাস করে আর প্রতি সপ্তাহেই একটা দুইটা খেপ নিয়ে যায় কয়লায়, কয়লা বলে কোনো জায়গা নাই যদিও। মুজুরি প্রতি গাড়িতে পাঁচ’শ থেকে বেড়ে হয়েছে সাত’শ। তার বিয়ে না করা বউটা বিয়ের জন্য চাপ দেয় না, বিয়ে করলেই নাকি স্বামীগুলি অন্য বেটির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তো সে অন্য বেটি হয়েই থাকতে চায়। তাদের দুজনের খুব মিল, দুজনেই পুত্র বিবাহ দিয়ে নাতির মুখ দেখেছে।
মাসুম কথা রেখেছে, সিএনজি চালায়, বউবাচ্চা নিয়ে তার সংসার, বউটা খুব খায়, তাই সংসারে আয়-উন্নতি কম। মাসুমের মায়ের গ্রামের বাড়িতে তিন শতাংশ জমি হয়েছে, তাতে টিনের একটা ঘরও হয়েছে পলকা। ঝড়ে হেলে পড়া সে ঘরে থাকা হয় না, আর সেখানে থাকলে খাবে কী! চার বাড়ি কাজ করে, মাসুম দেখে না। দুটো রিকশাই কয়লার পেটে গেছে বহু আগে। মাঝে বসিরের সঙ্গে তিন বছর ঘর করে লাভ কিছু করতে পারেনি। খানেক স্বার্থ উদ্ধার করতে পারলেও পুরোপুরি পারেনি বসিরও। ছেড়ে যাওয়ার কারণ বহুবিধ, মাসুম তাকে দেখতে পারে না, এটা প্রধান কারণ। ছেলে একটা হয়েছিল তাদেরও, বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে বসির থিতু হতো এখানে এ কথাও বলা যায় না নিশ্চিতভাবে। ·


0 মন্তব্যসমূহ