মঈনুল হাসান এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিক। ১৯৭৮ সালের ৪ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বটমলী হোম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক, চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে বিএসএস (সম্মান) ও এমএসএস ডিগ্রি অর্জন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের University of Bedfordshire থেকে MA in International Human Resource Management  বিষয়েও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে কর্মরত। প্রকাশিত উপন্যাস : নোনা মাটি ধূলিফুল, শূন্য রথের ঘোড়া। গল্পগ্রন্থ : বাস্তুসাপ, সন্ধ্যা নামার আগে, জলসংসার, শরফুন ও এক শহরের বৃত্তান্ত, শঙ্খজীবন, আয়না ভাঙার পর, খোয়াজ খিজিরের হাত। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গল্পের বই জলসংসার। বইটি নিয়ে গল্পপাঠের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রশ্নগুলোর লিখিত উত্তর দিয়েছেন তিনি।

গল্পপাঠ : 
এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হলো আপনার গল্পের বই ‘জলসংসার’। এটি আপনার কততম গল্পগ্রন্থ? কতটি গল্প আছে এ বইয়ে? গল্পগুলো কবেকার লেখা?

মঈনুল হাসান : 
অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ আমার ‘জলসংসার’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এটি আসলে পাঞ্জেরী সংস্করণ। ‘জলসংসার’ আমার তৃতীয় গল্পবই। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘চৈতন্য’ প্রকাশন থেকে। কিন্তু এবারের সংস্করণে গল্পগুলোকে আরও পরিমার্জন করে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পগ্রন্থ হিসেবে তৃতীয় হলেও আমার মোট গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ৭টি। তবে ‘জলসংসার’ বইয়ের গল্পগুলোর রচনাকাল ২০১৭ থেকে ২০১৮ সময়কালের শেষ পর্যন্ত। সেই সূত্র ধরে বলা যায়, কাজের সুবাদে একসময় চাঁদপুর জেলায় অবস্থান এবং সেখানকার জল-আলো-হাওয়ার চালচিত্র আর মৃত্তিকালগ্ন মানুষের সংস্পর্শ হয়তো খুব সন্তর্পণে অসামান্য কিছু গল্পের বীজ রেখে গিয়েছিল আমার মনে। মোট ৯টি গল্প নিয়ে তারই এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ছিল এই ‘জলসংসার’।

গল্পপাঠ : 
আপনার মতে এ বইয়ের সেরা গল্প কোনটি? গল্পটির বিষয়বস্তু এবং রচনার ইতিবৃত্ত জানতে আগ্রহী।

মঈনুল হাসান : 
‘জলসংসার’ আমার প্রিয় একটি বই। নবরত্নতুল্য প্রতিটি গল্পই আমার বিশেষ পছন্দের। তবে সেরা গল্প যদি বলি তবে ‘লোবানগন্ধি দিন’-কে নির্বাচন করা যেতে পারে। গল্পটি লিখেছিলাম চাঁদপুরে থাকার সময়। লেখক মাত্রই কোনো অভিজ্ঞতা, হঠাৎ কোনো মানুষ, ঘটনা, নাম, দৃশ্য, স্মৃতি ইত্যাদি দেখে বা স্মরণ করে গল্প লিখতে প্রলুব্ধ হন বা গল্পের বীজ মনে মনে বুনে নেন; এক্ষেত্রে তেমন কোনো ব্যাপার ছিল কি না আজ এতদিন পর তা আর ঠিকমতো মনে নেই। গল্পটি লিখতে গিয়ে বিষয় নির্বাচন ও নির্মাণের ক্ষেত্রে আমি একটু অন্যরকমভাবে ভেবেছিলাম হয়তো! কারণ ইতোপূর্বে মাত্র ২টি গল্পবইই প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেখানে গল্পসংখ্যাও খুব বেশি নয়। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, পূর্বের লেখা গল্পগুলোতে গ্রামীণ পটভূমি, প্রান্তিক জীবনের আখ্যানই প্রাধান্য পেয়েছিল বেশি। সেই বিবেচনায় ‘লোবানগন্ধি দিন’ গল্পটি ছিল আলাদা ধরনের একটি শহুরে মনস্তাত্ত্বিক গল্প।

গল্পটির বিষয়বস্তু যদি বলি এর মূল চরিত্র বা প্রটাগনিস্ট হচ্ছে সামিন নামের সুদর্শন এক তরুণ। তিনি শহরের একজন নামজাদা শিল্পপতি ও বিত্তশালী বাবার ছেলে। পৈর্তৃক সূত্রে প্রাপ্ত বাবার বিভিন্ন ব্যবসা সামলানোর পাশাপাশি নিজেকে প্রতিষ্ঠা আর নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে ঝুঁকে থাকতেই আমরা তাঁকে দেখি। অন্তর্মুখী ও ব্যবসায়ী সামিনের সুগন্ধি পারফিউমের প্রতি আলাদা ও একান্ত একটি ঝোঁক রয়েছে। এ নিয়ে নিজেও তিনি ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন এবং দেশে-বিদেশে সুযোগ পেলে ভ্রমণ করেন। তাই গন্ধের বিচারে মানুষকে চিনে নেওয়ার একটি সূক্ষ্ম বোধ সামিনের ভেতর প্রতিষ্ঠিত থেকে যায়। মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় অন্যতম এবং সামিন যেন তাঁর ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়কে বেশি প্রাধান্য দিয়ে ওর কথিত বন্ধুদের সঙ্গে দিনযাপন করছিলেন। সামিন মাতৃহীন; ছোটোবেলা থেকেই বাবার পাশাপাশি তাঁকে লালন পালন করার দায়িত্ব তুলে নেন গ্রাম সম্পর্কীয় গফুর চাচা। আক্ষরিক অর্থে তাঁর গায়ে পরিশ্রমী মানুষের ঘামের নোনা গন্ধই লেপটে ছিল; কিন্তু হঠাৎ তাঁর মৃত্যুতে সামিন যেন সেটাই বারবার ভিন্নভাবে উপলব্ধি করছিলেন। যে মানুষটি সবকিছুকে ঘ্রাণের নিরিখে বিচার করতেন এক্ষেত্রে তা আর খাটছে না। গল্পের পরিণতিতে সামিন তাঁর প্রখর ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় থেকে বেরিয়ে সবগুলো ইন্দ্রিয় জাগিয়ে গফুর চাচার সঙ্গে তাঁর অনির্ণীত সম্পর্কের স্বরূপ খুঁজে নিতে চেয়েছিলেন।

গল্পটি রচনা করার ইতিবৃত্ত সেভাবে মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে গল্পের ভাবনা মাথায় আসার পর চাঁদপুরে সেই সময় যাঁদের সঙ্গে লেখালেখি নিয়ে আড্ডা হতো তাঁদেরকে ভাবনাটি শুনিয়েছিলাম।

গল্পপাঠ : 
গল্পগুলো ইতোপূর্বে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত, নাকি সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত? আমার ধারণা পূর্বপ্রকাশিত। পূর্বপ্রকাশিত গল্প বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করলে বই বিক্রিতে কি কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

মঈনুল হাসান : 
‘জলসংসার’ বইয়ের সবগুলো গল্পই পূর্বপ্রকাশিত। দেশের স্বনামধন্য ম্যাগাজিন, সাহিত্যের ছোটো কাগজ, জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা ও ঈদসংখ্যায় এগুলো প্রকাশিত হয়েছে। পূর্বপ্রকাশিত গল্প বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করলে বই বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে আমি বিশ্বাস করি না। আমার পর্যবেক্ষণ অন্যখানে। প্রথমত, লেখকের বই বিক্রির বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা সমীচীন নয়, অন্তত আমি কখনও এটি চিন্তা করি না। প্রকৃত পাঠক একজন লেখকের সঙ্গে পরিচিত হন বা তাঁর লেখা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন পূর্বপ্রকাশিত অর্থাৎ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, ছোটো কাগজ ইত্যাদিতে প্রকাশিত তাঁর গল্প পাঠ করেই। লেখক সম্পর্কে পাঠকের একটি সচেতন ধারণা, পরিচিতি, সংযোগ, পছন্দ-অপছন্দ ও বোঝাপড়া তখনই তৈরি হয়। পাঠকই তখন বইমেলা বা অন্য কোনো অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে প্রিয় লেখকের গল্পবই খুঁজে বের করেন, কেনেন, সংগ্রহে রাখেন। আমার কাছে বই বিক্রি মুখ্য নয় বরং কতজন প্রকৃত পাঠকের কাছে লেখাগুলো যেকোনো উপায়ে পৌঁছে গেল সেটাই মুখ্য। দ্বিতীয়ত, লেখা পূর্বে প্রকাশিত না হলে পাঠক লেখককে চিনবেনই-বা কী করে? আমার পক্ষে বছরে আসলে ৮ থেকে ১০টির বেশি গল্প লেখা হয়ে ওঠে না। ফলে যে গল্পগুলো একবার প্রকাশিত হবে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আবার ভিন্ন গল্প বাছাই করব এটা রীতিমতো অসম্ভব একটি ব্যাপার।

গল্পপাঠ : 
গল্প শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠার জন্য কী প্রয়োজন? বিষয়, আঙ্গিক, না ভাষা?

মঈনুল হাসান : 
আমি মনে করি গল্প শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠার জন্য বিষয়, আঙ্গিক ও ভাষা তিনটিই জরুরি, তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেকোনো গল্পে এর অন্তত একটির শক্তিশালীরূপে প্রকাশ থাকা চাই। কোনো গল্প হয়তো নির্বাচিত বিষয়টির জন্য ভালো লাগে, আখ্যান পড়ে পাঠক মুগ্ধ হয়। আবার কোনো গল্প হয়তো চমৎকার উপভাষা ও এর প্রাঞ্জল উপস্থাপনের জন্য একটি উৎকৃষ্ট শিল্পে পরিণত হয়। সব গল্পেই সবগুলো একসাথে পাওয়া যাবে না। যেকোনো একটি বিষয় ওজনদার হলেও কালের বিচারে গল্পটি টিকে যেতে পারে।

গল্পপাঠ : 
কবে থেকে গল্প লিখতে শুরু করেছিলেন? প্রথম গল্প লেখার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

মঈনুল হাসান : 
প্রথম গল্প কবে লিখতে শুরু করেছিলাম দিন, তারিখ, ক্ষণ সেভাবে মনে নেই। কৈশোর পেরোনো সময়ে সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে থাকার সময় ‘খাঁচা’ নামে প্রথম একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলাম। গল্পটি শেষ করে খুব যত্নে রেখে দেওয়ার পর আর তা খুঁজে পাইনি। অনেক বছর পর তার ছেঁড়া দুটি পাতা উদ্ধার হলেও বাকিটা হারিয়ে যায়। আমি আর চেষ্টা করিনি। তারপর বহুদিন বাদে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় একবার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ‘নুলিয়া লগন’ ও ‘ঝরা ফাগুন’ নামে আবারও দুটি দীর্ঘ গল্প লিখেছিলাম। এগুলো ছিল অসম্পূর্ণ ভাবনার কাঁচা হাতের বয়ান। অবশেষে সেগুলোও আর খসড়া থেকে আলোর মুখ দেখেনি। অনেক অনেক দিন পর সম্পূর্ণ প্রাণের তাগিদ, ভালোবাসা ও নিজের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে আবারও গল্প লেখার চেষ্টা করলাম। গল্পের শিরোনাম ছিল ‘ভোগ’—লিখেছিলাম ২০১৫-এর নভেম্বরের দিকে।

আগেই বলেছি ‘ভোগ’ গল্পটি দীর্ঘদিন পর আমার প্রথম কোনো লেখা। কর্মসূত্রে আমি তখন মেহেরপুর শহরে থাকতাম। ছোট্ট ছিমছাম একটি শহর, সন্ধ্যার পর তেমন কাজ থাকে না। আমার বাংলোয় বিভিন্ন কবি, লেখক ও সুহৃদ বন্ধুদের সাহিত্য আড্ডা হতো। তাঁরা এসে দীর্ঘসময় নিজেদের রচিত গল্প বা কবিতা পাঠ করতেন। একদিন তাঁদের মধ্য থেকেই কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ ও শাশ্বত নিপ্পন আমাকে বললেন আমারও আবার লেখা উচিত বা নতুন করে শুরু করা উচিত। ভেতরে ইচ্ছে ও অভ্যাসটা তো ছিলই আগে থেকে। সেই থেকে আবার নতুন করে গুছিয়ে শুরু। প্রায় আড়াই বছর সেখানে থেকেছি। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আকুতি, টানাপোড়েন ও ভালোবাসার মর্মস্পর্শী রূপ দেখেছি কাছ থেকে। এভাবেই হয়তো লেগে রইলাম গল্প লেখার চেষ্টায়।

গল্পপাঠ :
গল্প লেখা শুরুর আগে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল? কোন গল্পকারদের গল্প পড়েছেন? আপনাকে কি কোনো গল্পকার প্রভাবিত করেছিল?

মঈনুল হাসান : 
আমি খুব ছোটোবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়েছি। বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন ধরনের বই। ছাত্রজীবনে ক্যাডেট কলেজে পড়াকালীন আমি অনেক সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার পেয়েছিলাম সেখানে। এছাড়া বিতার্কিক ও বাগ্মী হিসেবে প্রস্তুতি গ্রহণকালে প্রাসঙ্গিক প্রচুর বইও ঘেঁটেছি তখন। এভাবে সেই কৈশোর থেকেই বই বা সাহিত্যের সঙ্গে একটা যোগাযোগ ঘটে গেছে। প্রাথমিকে থাকার সময় ‘চয়নিকা’ এবং মাধ্যমিকে বাংলা বইয়ের পাশাপাশি দ্রুত পঠনের জন্য সাহিত্য সঞ্চয়ন, সাহিত্যমালা ইত্যাদি নামে ছোটোগল্পের বই ছিল। সেখানে অনেক বড়ো বড়ো লেখকদের দারুণ সব গল্প ছিল। এখনও মনে আছে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘মাঠের পারের দূরের দেশ’ [পথের পাঁচালী থেকে সংক্ষেপিত], সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘রসগোল্লা’, আবু ইসহাকের ‘জোঁক’ কিংবা প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ-র ‘সোনার হরফে লেখা নাম’ ইত্যাদি গল্পগুলো কতবার যে পড়েছি! বিশিষ্ট গল্পকারদের মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ মুজতবা আলী, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখকগণের গল্প নিবিড়ভাবে পড়েছি। এঁদের প্রত্যেকের লেখাই বিষয় বৈচিত্র্য, ভাষা ও আঙ্গিকের বিচারে আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং পরোক্ষভাবে হয়তো কিছুটা প্রভাবিতও হয়েছি। তবে আমি আমার মতোই গল্প লিখতে চেষ্টা করি।

গল্পপাঠ : 
আপনি কি মনে করেন আপনার গল্পে এখনো কোনো গল্পকারের প্রভাব আছে? প্রভাব থাকাটা কি ক্ষতিকর?

মঈনুল হাসান :
আমরা যারা সৃজনশীল কাজ করি বা ফিকশন লিখি একদম মৌলিক বা স্বতন্ত্র বলে কিছু আছে কি? আপনি আপনার চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনা ও পরিপার্শ্ব নিয়েই চরিত্র তৈরি করছেন, লিখছেন। ভাষা ও আঙ্গিক কেবল ভিন্ন হতে পারে, উপস্থাপন ভিন্ন হতে পারে। হয়তো বিশ বছর আগে দেখা কোনো ঘটনা বা পাঠ করা কোনো অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে থেকে গিয়েছে এখনও। সেটাই অজান্তে অবচেতনে লেখার সময়ে কলমে চলে এসেছে। আপনি হয়তো সচেতনভাবে সম্পূর্ণ অনুকরণ বা অনুসরণ করছেন না কিন্তু পাঠক যিনি তাঁর মনে হলো এমন ঘটনা বা লেখা পূর্বেও হয়তো তিনি দেখেছেন বা পড়েছেন। এভাবে পরোক্ষভাবে কোনো লেখকের প্রভাব থাকতে পারে যা লেখককে কেবল সমৃদ্ধই করে। এটাকে আমি ক্ষতিকর মনে করি না।

গল্পপাঠ : 
বাংলাদেশে তো গল্পের পাঠক কম। কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই কম। কেন কম? আপনার বোঝাপড়ার জায়গা থেকে যদি বলতেন....।

মঈনুল হাসান : 
বাংলাদেশে হয়তো কবিতার পাঠক বেশি কিন্তু গল্পের পাঠকও যে একেবারে কম সেটা আমার বিশ্বাস হয় না। সারা পৃথিবীতে ফিকশনের পাঠক কেমন এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান জানা না থাকলেও আমার ধারণা ফিকশনের প্রভাব একেবারে মন্দ নয়। তবে বলব প্রতি বছর প্রথিতযশা লেখকের পাশাপাশি অনেক নতুন সম্ভাবনাময় তরুণ গল্পকারের বই প্রকাশিত হচ্ছে। পাঠক হয়তো বিভিন্ন মাধ্যমে সেগুলো সংগ্রহ করে নিচ্ছেন। পাঠক কম হলে এত বেশি সংখ্যায় গল্পবই প্রকাশিত হতো না। তাছাড়া, আমি প্রায়শ দেখি বাংলাদেশে ও কলকাতায় অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক যাঁরা এখন আর বেঁচে নেই তাঁদের বইও বিভিন্ন প্রকাশনী নতুন রূপে, বর্ধিত কলেবরে প্রকাশ করছে। পাঠক কমে গেলে এসব বই এত বেশি প্রচারিত ও বহুলভাবে বিক্রি হতো না বলে আমার মনে হয়।

গল্পপাঠ :
একটি গল্প লিখতে আপনার কতদিন লাগে?

মঈনুল হাসান : 
একটানা বসে আমি গল্প শেষ করেছি এমন ঘটনা খুব কম। ৪/৫টি গল্পের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে। একটি গল্প ধারাবাহিক বসে সাধারণত ৩/৪ দিনের মধ্যেই শেষ করি। তারপর ফেলে রাখি। গল্পটি মনে-মগজে বারবার ভাঙতে থাকে, অনেকটা পানি থিতিয়ে ওঠার মতো গল্পটি পুরো মাস মাথার মধ্যে থেকে যায়, চরিত্ররা অবিরাম আসা-যাওয়া করে। তারপর কম্পিউটারে টাইপ করে নিয়ে প্রিন্ট বের করে কাগজের মধ্যে আরও ২/৩ বার সংশোধন করে চূড়ান্ত করার চেষ্টা করি।

গল্পপাঠ : 
আপনার গল্প লেখার প্রক্রিয়া কেমন? লেখার আগে কি কোনো ছকআউট করেন, নাকি সরাসরি লিখতে শুরু করে দেন? কম্পিউটারে লেখেন, নাকি কাগজ-কলমে?

মঈনুল হাসান : 
মাথায় গল্পের নতুন বীজ এলে বা কোনোকিছু দেখে গল্প লেখার চিন্তা মাথায় এলে প্রথমে মাথার মধ্যে কঙ্কালের মতো ছোটো করে একটা স্ট্রাকচার সাজিয়ে নিই। এরপর গল্পের শিরোনাম দিয়ে দিই। নাম ঠিক না হলে আমি গল্প লেখা শুরু করতে পারি না। তারপরই সাদা কাগজে গল্পের নাম লিখে যেনতেনভাবে যা মনে আসে লেখা শুরু করি। তবে এখন ভাবনার বিষয়বস্তু অনেকসময় মোবাইলে টুকে রাখি যেন ভুলে না যাই। গল্প কীভাবে শুরু করব বা শেষ হবে, কী কী বিষয় গল্পের শরীরে থাকতে পারে এসব বিষয়ও আমি আমার মতো ছোটো করে নোট করে রাখি। কম্পিউটারে আমি লিখতে পারি না এবং সরাসরি সংশোধনও করি না। কেন জানি মনে হয় এতে আমার চিন্তা হোঁচট খায়, একদমই এগোয় না। গল্প কাগজে-কলমে চূড়ান্ত হলে পরে তখন কম্পিউটারে শুধু টাইপ করে নিই।

গল্পপাঠ : 
আপনি সরকারি চাকরিজীবী। পেশাগত কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। পেশাগত কারণে লেখালেখির কোনো অসুবিধা হয় কি না? কীভাবে দুটোর সমন্বয় করেন?

মঈনুল হাসান : 
সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় পেশাগত কারণে অবশ্যই লেখার বিঘ্ন ঘটে। কারণ, কোনো লেখা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে লিখতে না পারলে তা আবার মগজ থেকে ছুটে যায়। আমি সার্বক্ষণিকভাবে হয়তো নিবিড় পাঠের মধ্য দিয়ে যেতে পারি না। সবসময়ই একটা ছেদ ঘটে, নতুন করে আবার চিন্তা শুরু করতে গেলে অনেক সময় খেই হারিয়ে যায়। আর সমন্বয়ের বিষয় বলতে গেলে আমার একটা চেষ্টা থাকে বৃহস্পতিবার রাত, শুক্র বা শনিবার সারাদিন লিখতে চেষ্টা করা। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে অবসর না পাওয়ার কারণে সেই অর্থে নিয়মিত বসা হয় না।

গল্পপাঠ : 
আপনি সাধারণত দিনের কোন সময়টায় লেখেন? এবং কখন পড়েন?

মঈনুল হাসান : 
লেখালেখির সময় আমার একমাত্র রাতে। ছুটির দিন হলে সেটা অবশ্য সকাল এবং সন্ধ্যার পর থেকে রাত অবধিও হতে পারে। আর যেদিন লিখতে ইচ্ছে করে না সেইসব রাতগুলোতে বইপড়া হয়। তবে ঘুমানোর আগে আমি প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম করে বই পড়ার চেষ্টা করি।

গল্পপাঠ : 
সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ অনেক তরুণ গল্প লিখছেন। তাদের গল্প কি পড়া হয়? বাংলাদেশের এই সময়ের ছোটগল্প সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মঈনুল হাসান : 
সাম্প্রতিককালে অনেক তরুণ কথাসাহিত্যিক গল্প নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদের অনেকের লেখাই পড়া হয় এবং তাঁদের বইও সংগ্রহে রাখার চেষ্টা করি। অনেকেই ভালো লিখছেন এবং কিছু শক্তিশালী গল্পও উঠে আসছে। এক্ষেত্রে আমার পর্যবেক্ষণ বলতে এককথায় বলব খুব নিরীক্ষাধর্মী নতুন আঙ্গিকের গল্প চোখে পড়ছে না। আমিও হয়তো গৎবাঁধা একই ধাঁচের লেখা লিখছি। আমি হয়তো সবার গল্প পড়িনি, কেউ কেউ হয়তো ভেঙেচুড়ে নতুন কিছু করছেন—কিন্তু গল্পের মধ্যে বিষয় বৈচিত্র্য, আঙ্গিক ও ভাষা ব্যবহারে নিরীক্ষা না থাকলে, চমকপ্রদ কিছু না থাকলে শেষে একঘেঁয়েমি হয়ে উঠতে পারে।

গল্পপাঠ : 
আপনি একজন ঔপন্যাসিকও। কী লিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেনÑগল্প না উপন্যাস?

মঈনুল হাসান : 
আমার মাত্র দুটো উপন্যাস আছে। উপন্যাসের ক্যানভাস অনেক বিস্তৃত, যাত্রা সুদীর্ঘ এবং অনেক চরিত্রের উপস্থিতি ঘটিয়ে তাদের মধ্যে বোঝাপড়া করে জটিল অভিযানের একটি ব্যাপার। এটা অনেক ধৈর্যেরও বটে। আমি গল্প লেখাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তবে এখন সব গল্পই উপন্যাসের শরীর পেতে চায়। এই দ্বন্দ্বও বেশ উপভোগ করি।

গল্পপাঠ : 
আপনার প্রথম উপন্যাস কোনটি? এই উপন্যাসের বিষয় এবং রচনার পেছনের কথা জানতে আগ্রহী।

মঈনুল হাসান : 
আমার প্রথম উপন্যাস ‘নোনা মাটি ধূলিফুল’। উপন্যাসের বিষয়বস্তুর কথা যদি বলি তবে বলা যায়, মানুষের স্বভাব মূলত আকাশপ্রসারী বৃক্ষের মতো। বৃক্ষেরই মতো মাটির নরম আভাস পেলে সে এক জায়গায় শেকড়-বাকড় ছড়িয়ে থিতু হয়—যদিও সে জানে এই বেঁচে থাকা, এই থেকে যাওয়া চিরদিনের নয়। জীবনের অনিবার্য প্রয়োজনে কখনও মায়াচ্যুত হলে তখনই প্রয়োজন হয় স্থানান্তরের। জীবন-সংসার-সম্পর্ক, ঘর-গেরস্থি এমনকি আপনজনের সমস্ত মায়া ছেড়ে ভিন্ন কোনো মোহের টানে চলে যেতে হয় অন্য কোনোখানে। যুগ-যুগান্ত ধরে এই ছুটে চলাও হয়তো গভীর কোনো মায়া; আর অন্তর্হিত মায়ার সাথে সমঝোতা করে টিকে থাকাই যেন মানুষের ধর্ম। নোনা মাটির মানুষগুলো তাই স্মৃতি থেকে বিস্মৃত-বিচ্যুত হলেও সেখানে থেকে যায় শুকনো ফুলের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু সুবাস। তাই বলা যায়, মানুষ আসলে নোনা মাটির মিঠেগন্ধি এক সুবাসিত ফুল। রেখে যাওয়া সুবাসই তাঁর আসল পরিচয়; তাঁর ফেলে যাওয়া স্মৃতি, তাঁর কৃত কাজ, বিস্মরণে টিকে থাকা ছন্দময় সুর ও স্বর—এসব নিয়েই জগৎ-সংসারের বৃহৎ সময়ের বুকে চিহ্নরূপে থেকে যায় বাকিটা জীবন। ‘নোনা মাটি ধূলিফুল’ সেই কন্ঠস্বরেরই এক খণ্ডিত দলিল। উপন্যাসের মূল চরিত্র বিপত্নীক ফণীচাঁদ ও তার কিশোরপুত্র নন্দকে ঘিরে প্রবল জীবন সংহতি যেমন দেখা যায়, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষে আবার কখনও তা হয়ে ওঠে জটিল ও ক্লেদময়। প্রধান নারী চরিত্র সুলেখা নিজের জীবন খুঁড়ে আশা জাগাতে গিয়ে আটকে যায় ভিন্ন এক মোহ ও মায়ার অবিচ্ছিন্ন শিকলে। কিন্তু তাঁরা কেউ মায়ার দায় থেকে বাঁচতে পারে না। আপন ধূলিমাটির স্মৃতি-গন্ধ-পরশ থেকে পালিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিলেও জীবন থেকে ঠিক পালাতে পারে না। সম্পর্কগুলো অনিবার্য ভাঙনের মুখে পড়েও শেষমেশ আস্থা ও ভরসার মিলনবিন্দুতে উপনীত হয়ে টিকে থাকে অচেনা স্থানান্তরে। চিরচেনা সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে জীবনের অলৌকিকতা প্রকাশ পায় সেখানেই—অলীক কোনো গন্তব্যে।

উপন্যাস রচনার পেছনের কাহিনিতে যতটুকু মনে আছে তা হলো, ‘মায়া মন্থন’ নামে আমার একটি দীর্ঘ গল্প আছে। সেই গল্পের মানুষগুলো যে স্থান জুড়ে বিচরণ করেছে, প্রাত্যহিক যে সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্না, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-প্রেম তাদের মন ও শরীরকে দীর্ণ করে কখনও সরস আবার কখনওবা আবেগে মথিত করে বিপুলভাবে ছাপ ফেলেছে তাদেরই জীবন-সমস্তে—সেই ধূলি-মাটি, মাঠ-প্রান্তর, বিল-জলার জোলো গন্ধ কিংবা মানুষজন ও তাদের মুখের ভাষা সবকিছুই কেন জানি আমার দেখা মেহেরপুরের সেই চিরচেনা জনপদের সাথে মিলে যায় আশ্চর্যভাবে। মাটির গর্ভজ খনির মতো অন্তরের ভেতরকার সত্তায়ও বোধহয় এর প্রভাব মিশে ছিল অনেকখানি। আর তাই সেখানকার আলো-হাওয়া-জলের দায় জারিত হয়ে একটু একটু করে যে রূপ পেয়ে উঠল তা এক রূপান্তরিত মায়াসমষ্টির কাছেই সমর্পিত হলো শেষে। ‘মায়া মন্থন’ গল্পের বীজটিও মূলত সেই মেহেরপুরের। আমঝুপির কাছে সুবিশাল চাঁদবিলের চিরচেনা রূপটি খানিকটা সত্য, কিছুটা কল্পনা আর দেখা-অদেখার মিলন কৌশলে বাস্তবে প্রাণ পাওয়ার চেষ্টায় মগ্ন ছিল ভীষণভাবে। কিন্তু, গল্পের সেই শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিস্তৃত এক আখ্যানের নাম ‘নোনা মাটি ধূলিফুল’। প্রথমবারের মতো উপন্যাসের কল্পনা করতে গিয়ে হঠাৎ কীভাবে যেন সেই বীজগল্পটিই ধীরে ধীরে রূপ পেতে থাকল আখ্যানের বিস্তৃত শরীরে।

গল্পপাঠ : 
আপনার সর্বশেষ উপন্যাসটি সম্পর্কে যদি বলেন...।

মঈনুল হাসান : 
আমার সর্বশেষ উপন্যাস ‘শূন্য রথের ঘোড়া’। এটি প্রথম উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব। উপন্যাসের চরিত্র, আখ্যান, পরিবেশ এক থাকলেও এটি একটি স্বতন্ত্র উপন্যাস। পড়তে গেলে পাঠকের কাছে খাপছাড়া মনে হবে না।

প্রথম উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব এই ‘শূন্য রথের ঘোড়া’য় মানুষের ইচ্ছেশক্তি হয়ে ওঠে প্রচণ্ড সাহসী। সে দিগি¦দিক ছুটতে পারে তেজী ঘোড়ার মতো। ইচ্ছের লাগাম পরিয়ে মানুষকেই তখন জীবনের পথ খুঁজে নিতে হয়। অনির্ণীত সম্পর্কের সাথে সন্ধি করে জীবনের সংযোগ ঘটাতে হয় প্রবলভাবে। মানুষের মধ্যে মন্থিত মায়ার যে চিহ্ন ফুটে ওঠে তা কখনও কখনও দারুণ কদর্যতায় কালো-ক্লেদময় হয়ে উঠতে পারে। সেই ভাবনায় দৃঢ়চেতা, সাহসী, জেদি ও প্রধান নারী চরিত্র সুলেখা হয়তো পালিয়ে বাঁচতে চায় জীবন-সংসার থেকে। সমস্ত শিকড় উপড়ে সবার অলক্ষে থিতু হতে চায় অন্য কোনোখানে। নিজের মতো করে একদিন যেখানে ধূলিফুলের সৌরভ রেখে যেতে চেয়েছিল অথচ জীবনের টানাপড়েনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সেখান থেকেই। এভাবে এক ঘর থেকে অন্য ঘর, আপন গাঁয়ের ভিটে থেকে অন্য আশ্রম—মায়ার স্থানান্তরের সাথে সাথে যেন নিজের জীবনের সঙ্গেই চলে তুমুল অবিচার। এটাই জীবনের নিয়ম, বেঁচে থাকার আশ্চর্য পরম সত্য। এভাবে ইচ্ছের ঘোড়া যদি পথ চিনিয়ে নিয়ে যায় অনিশ্চিত কোনো ভবিতব্যে—সেই গন্তব্য এড়ানো কি কারও পক্ষেই সম্ভব? প্রথম পর্বের শেষে এমনিভাবে সুলেখার কাহিনি যেখানে থমকে গেছে এক দারুণ মর্মবেদনায়, দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অনিশ্চয়তায়, সেখান থেকেই শুরু এই নতুন আখ্যানের। মানুষ যদি শূন্যরথ হয় তার তীব্র ইচ্ছেটাই এক মহাপরাক্রমশালী ঘোড়া। সেই তেজী ঘোড়া কোথাও থিতু হতে না দিয়ে জীবনভর দাপিয়ে ছুটিয়ে বেড়াতে চায় কাহিনির চরিত্রগুলোর মতো। এখানে ফণীচাঁদ, নন্দ আর সুলেখার জীবন রসায়নে মায়া ফুটে উঠলেও কোথায় যেন একটা রহস্যই থেকে গেছে অনির্ণীত সম্পর্কের মতো। সুলেখার এই পালিয়ে বাঁচা সত্যিই কি পরাজয় নাকি দূর থেকে আরও গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে রাখার ভিন্ন এক কৌশলÑ সুলেখার মতোই সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে শূন্য রথের ঘোড়ায় চেপে।

গল্পপাঠ : 
এ বছর কলকাতার অভিযান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘খোয়াজ খিজিরের হাত’ নামের একটি গল্পগ্রন্থ। বইয়ের গল্পগুলো কি নতুন, নাকি পূর্বপ্রকাশিত বা অন্য সংকলন থেকে নেওয়া?

মঈনুল হাসান : 
‘খোয়াজ খিজিরের হাত’ গল্পবইয়ের নাম গল্পটি একদম নতুন অপ্রকাশিত গল্প। বিভিন্ন সময়ে লেখা গল্পগুলো এই সংকলনে ঠাঁই পেয়েছে—যার কিছু নতুন এবং কিছু আমার পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ থেকে নির্বাচিত। তবে গল্পগুলোর শরীরজুড়ে নানান পটভূমি আছে। গল্পগুলো কখনও সরল, ভানশূন্য; তবে নিরুপায় নিরালম্ব মানুষের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে আবার হয়েছে অনন্ত মর্মভেদী। শেষ পর্যন্ত গল্পগুলো সর্বহারা মানুষ, প্রান্তিক মানুষ এবং কখনও তা মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকেও উতরে গেছে।

গল্পপাঠ : 
‘খোয়াজ খিজিরের হাত’ প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কি কোনো প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন?

মঈনুল হাসান : 
‘খোয়াজ খিজিরের হাত’ প্রকাশের পর কলকাতার পাঠকদের মধ্যে কিছুটা হয়তো পরিচিতি পেয়েছি। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা এবং অন্যান্য জেলা বইমেলাতেও পাঠকের হাতে দেখেছি ‘খোয়াজ খিজিরের হাত’ এবং তাঁরা হয়তো গ্রহণও করেছেন আমাকে। প্রচারবিমুখ মানুষ হিসেবে আমি নিজেকে আড়ালেই রাখি তবে তাঁদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া বলতে কলকাতার বিভিন্ন ছোটোকাগজে প্রকাশের জন্য আজকাল গল্প চাওয়া হচ্ছে। এতেই আমার একসমুদ্র আনন্দ।

গল্পপাঠ : 
বাংলাদেশের ছোটগল্প অনুবাদ হচ্ছে না। সবই অন্য ভাষার গল্প অনুবাদ করে। কিন্তু বাংলা ভাষার গল্প অন্য ভাষায় অনুবাদের প্রবণতা কম। এর কারণ কী?

মঈনুল হাসান : 
বাংলাদেশের ছোটোগল্প বিদেশি ভাষায় প্রধানত ইংরেজিতে অনুবাদ কম হচ্ছে এটা পীড়াদায়ক। আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতনামা সাহিত্যিক আছেন যাঁদের গল্প অন্তত ইংরেজিতে অনূদিত হলে বিশ্বসাহিত্যের অংশ হতে পারত। আমার মনে হয় অনুবাদ কম হবার পেছনে আমরা নিজেরাও কিছুটা দায়ী। আমাদের লেখা গল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক উপাদানের চাইতে স্থানীয় ও জাতীয় উপাদান বেশি থাকে। সে কারণে আন্তর্জাতিকতা বোধের অভাবে আমাদের মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করতে পারে যে আমাদের স্থানীয় একটি আখ্যান ইংরেজিতে অনূদিত হলে কে পড়বে বা বুঝবে? এটি একটি সম্ভাবনা মাত্র। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক জায়গাগুলোও লেখকদের লেখাগুলোকে ধারাবাহিক অনুবাদ করে সাহিত্যের বিশ্ব পরিমণ্ডলে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দিতে পারছে না বলে আমার মনে হয়। আমাদের এখানে বাংলা একাডেমি অনুবাদের কাজ করে। এছাড়া অন্যান্য জায়গাগুলো যদিও সীমিত তবু অনুবাদ সংক্রান্ত ফাউন্ডেশনগুলো শক্তিশালী হলে ও ধারাবাহিকভাবে অনুবাদের আয়োজন করে গেলে তরুণতম লেখকের নামও বিশ্বমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে বলে আমার বিশ্বাস। প্রসঙ্গক্রমে যদি বলি, আমি ও কথাসাহিত্যিক মোজাফ্ফর হোসেন-এর সম্পাদনায় ইলিশ বিষয়ক একটি গল্প সংকলন আছে ‘কল্পে গল্পে ইলিশ’। বইটি অতি সম্প্রতি অসমীয়া ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ফলে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের বাইরেও ইলিশ নিয়ে লেখা লেখকগণের গল্পগুলো ও লেখকের নাম ছড়িয়ে পড়ছে অন্য ভাষাভাষী পাঠক ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এটাই অনুবাদের শক্তি।

গল্পপাঠ : 
এখন কী লিখছেন? ভবিষ্যতে কী লেখার ইচ্ছে?

মঈনুল হাসান : 
আমি মাঝে মাঝে কবিতা ও ছড়াও লিখি। এটা আমার আনন্দের আর একটি জায়গা। তবে প্রবন্ধ ও মুক্তগদ্য লিখেছি খুব কম। আপাতত একটানা গল্পই লিখছি। একটা উপন্যাসিকার কাজে হাত দিয়েছি। দেখি, কবে তা শেষ করতে পারি! ভবিষ্যতে এসব নিয়েই থাকব বলে মনে হয়! ·