সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার নিয়ে বই


সীমান্ত নওশের

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন অগ্রচিন্তার মানুষ। তাঁর পরিচিতি বহুবিধ। শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, নন্দনতাত্ত্বিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক। তিনি জীবৎকালে খুব বেশি সাক্ষাৎকার দেননি। যে কটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে আগে কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। সমকালীন ও ভবিষ্যৎকালের পাঠকদের কথা ভেবে তাঁর সাক্ষাৎকারগুলো নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটির নাম দেওয়া হয়েছে : ‘সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : নন্দনচিন্তা ও বিবিধ আলাপ।’

বইটিতে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নয়টি সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সাক্ষাৎকারগুলো নিয়েছেন যথাক্রমে কবি ওবায়েদ আকাশ, কথাসাহিত্যিক কুলদা রায়, সাংবাদিক শাখাওয়াত লিটন, কথাসাহিত্যিক মাসউদ আহমাদ, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক তুষার তালুকদার, কথাশিল্পী স্বকৃত নোমান, কথাশিল্পী মোজাফ্ফর হোসেন, কবি ইমরান মাহফুজ এবং সাংবাদিক মোহাম্মদ কবীর আহমদ।

এসব সাক্ষাৎকারে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে কথা বললেও প্রধানত তাঁর নন্দনচিন্তা নিয়ে বেশি বলেছেন। যেমন কবি ওবায়েদ আকাশের নেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “নিরীক্ষার প্রবণতা সব সময় থাকবে, তাই বলে সকলেই এই কাজে নামলে তো মুশকিল। এ জন্য প্রস্তুতির একটা ব্যাপার আছে। একটি পত্রিকার সম্পাদকীয় সাধু ভাষায় লেখা হতে পারে। কারণ, যে ভাষাটা হারিয়ে যাচ্ছে তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে তা হতে পারে। কিন্তু সব পত্রিকা তা শুরু করলে এটি চমকে পরিণত হবে। জীবন থেকে যেমন সাহিত্য, সাহিত্য থেকেও জীবন তেমন আলাদা নয়, সেই অর্থে জীবনের ভাষা সাহিত্যে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু সাহিত্য তো সাংবাদিকতা নয়, সেখানে কল্পনার একটা জায়গা আছে, পরিশীলনের একটা জায়গা আছে। ভাষায় তার প্রতিফলন থাকতে হবে। জীবন থেকেও নিতে হবে আবার কল্পনা থেকেও নিতে হবে। কিছুটা পরিচ্ছন্নতা থাকবে। আমি যদি শুধু সংস্কৃতনির্ভর ভাষার ব্যবহার করি, তাহলে তো আমি দূরেই চলে গেলাম। যে ভাষাটা মানুষ ব্যবহার করে না, তাতে সাহিত্য হলে তা মন কাড়বে না।”

গল্পকার কুলদা রায়ের নেওয়া এবং গল্পপাঠে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি মনে করি আমাদের গল্প বলার মূলধারার ভাষা একটিই, যা স্থান-কালের ঊর্ধ্বে এবং সেটি একদিকে স্থানিক, অন্যদিকে সেই ভাষাটা সবাই বোঝে। তা না হলে কথ্যসাহিত্যের ধারা কবেই শুকিয়ে যেত। দিদা যে ভাষায় কথা বলতেন, সেটা না বোঝার কোনো কারণ ছিল না। কোনো গ্রামের লোক যখন গল্প শোনেন, তাদের ভাষায় সবাই তা বোঝেন। ওদের জন্য সেটাই প্রমিত ভাষা। কিন্তু আমি যেহেতু জানি রংপুরের, খুলনার বা সিলেটের মানুষ, সবাই আমার পাঠক। এই নানান জায়গার মানুষকে নিয়ে আমি গল্প বলব। আমি তো আর সিলেটের ভাষায় তা বলতে পারি না। কিন্তু একটা প্রমিত, অর্থাৎ এদের সবার চর্চাক্রমে যে ভাষাটিকে জীবন্তভাবে বহুদিন ধরে ব্যবহার করা হয়েছে, তা যদি সর্বজনবোধ্য হয়ে ওঠে, তাহলে তা ব্যবহার করতে অসুবিধাটা কোথায়? তবে এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভালো, গল্প যখন মুদ্রিত হয়, বইয়ে জায়গা পায়, তখন এর অডিয়েন্স তো পড়ালেখা জানা মানুষ। এরাও যখন সবাই আমার ভাষাটি সহজে বুঝতে পারেন, ভাষার কারুকাজে, এর গোপন কুঠুরি অথবা চোরা স্রোতে হারিয়ে বিপন্ন না হয়ে, তাহলে সেটিই তো প্রমিত। আমি জানি না কেন কলকাতার ভাষার সঙ্গে এর তুলনা চালাতে হবে। আমি যখন লেখি, কলকাতা কখনো আমার মাথায় থাকে না, কিন্তু কলকাতার কোনো পাঠক তো বলেননি, তিনি আমার ভাষা বোঝেননি বা এটি ক্যালকেশিয়ান প্রমিত।”

কিংবা কথাসাহিত্যিক মাসউদ আহমাদকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘লেখকরা নেপথ্যে থাকতেন মুদ্রিত পৃষ্ঠার পরাক্রমের দিনে, কারণ লেখকরা তখন প্রকাশিত হতেন তাদের লেখার মধ্য দিয়ে। আধুনিকতার একটা সময়ে তো নিভ্রমের অনুকরণে একটা ধারণা কল্কে পেল যে লেখক বলতে আসলে কেউ নেই। লেখক আসলেই মৃত। এর একটা গূঢ় অর্থ লেখক যে টেক্সট তৈরি করেন, তা আসলেই ইন্টার টেক্সট। আন্তগ্রন্থিকতার চিন্তায় লেখক তো আলাদা দ্রষ্টা ননÑযা লেখার তা তো ইতোমধ্যে লেখা হয়েই গেছে। তবে দৃশ্যমাধ্যম যখন পরাক্রমশালী হলো, ইমেজ বা ছবি হয়ে উঠল প্রধান বিবেচনা, তখন সবই নির্ধারিত হয় দৃশ্যমানতার মাপকাঠিতে। লেখকরা লিখছেন বটে, কিন্তু তারাও এখন স্পেক্ট্যাকল। ফলে সিনেমার নায়ক বা পণ্যের মডেলদের মতো তাদেরও দৃশ্যমান হতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পণ্যায়নের চিন্তা। এখন বইও “পণ্য”। আমি নিজে পুরোনো দর্শনটাকেই পছন্দ করি। কিন্তু না চাইলেও দৃশ্যমান হতে হয় দু-একসময়। হয়তো এটিই এখন প্রথা। এতে আমার আপত্তি নেই, সম্মতি তেমন না থাকলেও।”

বইটি এবারের বইমেলায় প্রকাশ করেছে বেঙ্গল বুকস। গ্রন্থনা করেছেন স্বকৃত নোমান ও মোজাফ্ফর হোসেন। প্রচ্ছদ ও বইনকশা করেছেন কবি, চিন্তক ও শিল্পী আজহার ফরহাদ। দাম রাখা হয়েছে ৩৯৪ টাকা। বাংলাদেশের বাতিঘর, পাঠক সমাবেশসহ বই বিক্রির দোকানগুলোতে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। ঘরে বসে পেতে চাইলে বাতিঘর, রকমারিসহ অনলাইন বই বিক্রয় কেন্দ্রগুলোর ওয়েবসাইটে বা ফেসবুক পেজ থেকে অর্ডার করা যাবে। ·

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ