সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : কার্মেন বুয়োসা
ইংরেজি অনুবাদ : মার্গারেট কারসন
বাংলা অনুবাদ : শুভশ্রী বিন্তু
রোবের্তো বোলানিও লাতিন আমেরিকার সেরা ঔপন্যাসিকদের একজন। অভ্যুত্থানের চিলি, সত্তরের দশকের মেক্সিকো সিটি, আর কবিদের বেপরোয়া যৌবন—এগুলো তাঁর প্রিয় বিষয়। এছাড়াও তিনি আরও নানা বিষয় নিয়ে লেখেন : সেসার ভায়েহোর মৃত্যুশয্যা, অখ্যাত লেখকদের কষ্টের জীবন, প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন। ১৯৫৩ সালে চিলিতে জন্ম নেওয়া বোলানিও কিশোরবেলা কাটান মেক্সিকোতে, তারপর সত্তরের দশকের শেষে চলে যান স্পেনে। কবি হিসেবে তিনি মারিও সান্তিয়াগোর সঙ্গে মিলে ‘ইনফ্রারিয়ালিস্ট’ আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯৯ সালে তাঁর উপন্যাস দ্য স্যাভেজ ডিটেক্টিভস-এর জন্য তিনি রোমুলো গায়েগোস পুরস্কার পান। এই পুরস্কার আগে পেয়েছিলেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং মারিও বার্গাস য়োসা। একই উপন্যাসের জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ এরাল্দে পুরস্কারও পান।
বোলানিও প্রচুর লিখেছেন। তিনি একজন নিষ্ঠাবান সাহিত্যিক। কোনো আপোষ করেন না। একজন ঔপন্যাসিকের দুটি মূল প্রবৃত্তি তিনি সফলভাবে মেলান : ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি আকর্ষণ, আর সেই ঘটনার ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা। মেক্সিকো তাঁকে দিয়েছে পৌরাণিক স্বর্গের ছবি, চিলি দিয়েছে বাস্তবের নরক, আর উত্তর-পূর্ব স্পেনের ব্লানেস শহর—যেখানে তিনি এখন (এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়) বাস করেন ও লেখেন—সেখানে তিনি দুই দেশের পাপ থেকে মুক্তি খোঁজেন। মেগালোপলিস হয়ে ওঠা মেক্সিকো সিটির জটিলতা এত বিশ্বস্তভাবে আর কোনো ঔপন্যাসিক তুলে ধরতে পারেননি। চিলির অভ্যুত্থান আর ‘ডার্টি ওয়ার’-এর ভয়াবহতাও এত তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিদীপ্তভাবে আর কেউ লেখেননি।
বোলানিওর নিজের কথা মনে রেখেই বলা যায় : “পড়া লেখার চেয়ে বেশি জরুরি।” যেমন রোবের্তো বোলানিওকে পড়া। যে মনে করেন লাতিন আমেরিকার সাহিত্য এখন তেজহীন, তাঁর কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়লেই সেই ধারণা ভেঙে যাবে। বোলানিওর সাহিত্য হলো একটি অব্যাখ্যেয় সুন্দর বোমার মতো—যা বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস করে, আবার নির্মাণও করে। সাহিত্য তার এই সৃষ্টি নিয়ে গর্বিত হতেই পারে।
আমাদের কথোপকথন হয়েছিল ই-মেইলে, ২০০১ সালের শরতে, ব্লানেস আর মেক্সিকো সিটিতে আমার বাড়ির মধ্যে।
-

কার্মেন বুয়োসা :
লাতিন আমেরিকায় দুটি সাহিত্য-ধারা আছে, যেগুলোকে সাধারণ পাঠক পরস্পরবিরোধী—এমনকি পরস্পরের শত্রু বলে মনে করেন। একটি হলো কল্পকাহিনির ধারা—আদলফো বিওই কাসারেস, কোর্তাসারের সেরা লেখাগুলো। আরেকটি হলো বাস্তববাদী ধারা—বার্গাস য়োসা, তেরেসা দে লা পার্রা। প্রচলিত ধারণা বলে, লাতিন আমেরিকার দক্ষিণ অংশ কল্পকাহিনির দেশ, আর উত্তর অংশ বাস্তববাদের কেন্দ্র। আমার মতে, আপনি দুটো ধারা থেকেই পুষ্টি নেন। আপনার উপন্যাস ও গল্পগুলো একদিকে আবিষ্কার-কল্পনার জগৎ, অন্যদিকে বাস্তবতার তীক্ষ্ণ ও সমালোচনামূলক প্রতিফলন—বাস্তববাদ। এই যুক্তি ধরে এগোলে বলতে হয়, এর কারণ আপনি লাতিন আমেরিকার দুই প্রান্তে—চিলি আর মেক্সিকোতে বড় হয়েছেন। এই ধারণাটা কি আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য লাগে, নাকি আপত্তি আছে? সত্যি বলতে, আমার কাছে এটা কিছুটা আলো দেখায়, কিন্তু পুরোপুরি সন্তুষ্ট করে না। কারণ সেরা লেখকরা—বিওই কাসারেস এবং তাঁর বিপরীত মেরুর বার্গাস য়োসাও—সব সময় দুই ধারা থেকেই নেন। তবু ইংরেজিভাষী উত্তরের দৃষ্টিকোণ থেকে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে একটাই ঘরে বন্দি করার প্রবণতা আছে।
--------------------------------------------------------------------
বোলানিওর মতে, আর্হেন্তিনার লেখক আদলফো বিওই কাসারেস (১৯১৪–১৯৯৯) ‘লাতিন আমেরিকার প্রথম ও সেরা কল্পকাহিনির উপন্যাস’ লিখেছিলেন। তিনি বোর্হেসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং লেখিকা সিলভিনা ওকাম্পোকে বিয়ে করেছিলেন। বিওই কাসারেস ও বোর্হেস মিলে অনেক লেখা লিখেছেন। ১৯৯০ সালে তিনি স্প্যানিশ ভাষার সর্বোচ্চ সম্মান সের্বান্তেস পুরস্কার পান। তাঁর প্রধান রচনা The Invention of Morel (১৯৪০)। বোলানিওর সম্ভবত সবচেয়ে প্রিয় লেখক হুলিও কোর্তাসার (১৯১৪–১৯৮৪) অসংখ্য লাতিন আমেরিকান লেখককে প্রভাবিত করেছেন। বোলানিও তাঁকে শুধু ‘সেরা’ বলে উল্লেখ করেন।
স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যে অগ্রদূত তেরেসা দে লা পার্রা (১৮৮৯–১৯৩৬) একজন ভেনেজুয়েলান কূটনীতিকের মেয়ে ছিলেন। প্যারিসে জন্ম, ইউরোপে বড় হওয়া, উনিশ বছর বয়সে ভেনেজুয়েলায় ফেরা। তাঁর প্রধান রচনা Iphigenia (১৯২৪) আধুনিকতাবাদী বাস্তবতার একটি কাজ।
-------------------------------------------------------------------
রোবের্তো বোলানিও :
আমি ভেবেছিলাম বাস্তববাদীরা দক্ষিণ থেকে আসেন—মানে দক্ষিণ শঙ্কুর দেশগুলো থেকে—আর কল্পকাহিনির লেখকরা আসেন মাঝ ও উত্তর লাতিন আমেরিকা থেকে। অবশ্য এই বিভাজনগুলোকে কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত নয়। বিশ শতকের লাতিন আমেরিকান সাহিত্য অনুকরণ ও প্রত্যাখ্যানের টানে চলেছে, একুশ শতকেও কিছুটা তাই চলবে। সাধারণত মানুষ বড় স্মারকগুলোকে হয় অনুকরণ করে, নয়তো প্রত্যাখ্যান করে—ছোট, প্রায়-অদৃশ্য ভাণ্ডারগুলোকে নয়। কল্পকাহিনি যারা কঠোর অর্থে চর্চা করেছেন এমন লেখক আমাদের কাছে খুব কম—সম্ভবত কেউই নেই। কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতায় উপশাখা সাহিত্যের বিকাশ হয় না। অনগ্রসরতা শুধু মহৎ সাহিত্যের জায়গা দেয়। এই একঘেয়ে বা ধ্বংসাত্মক পরিবেশে সাধারণমানের সাহিত্য এক দুর্লভ বিলাসিতা। তার মানে এই নয় যে আমাদের সাহিত্য মহৎ রচনায় ভরা। বরং উল্টো। লেখক প্রথমে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে চান, কিন্তু যে বাস্তবতা এই আকাঙ্ক্ষা জন্ম দেয়, সেই বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত শিল্পকে বামন করে রাখে। আমার মনে হয়, মাত্র দুটি দেশের প্রকৃত সাহিত্য-ঐতিহ্য আছে যারা মাঝে মাঝে এই নিয়তি এড়াতে পেরেছে—আর্হেন্তিনা আর মেক্সিকো। আমার নিজের লেখা সম্পর্কে কী বলব জানি না। মনে হয় বাস্তববাদী। ফিলিপ কে. ডিকের মতো কল্পকাহিনির লেখক হতে চাইতাম—কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিককে আমার আরও বেশি বাস্তববাদী মনে হয়। আসলে—এবং মনে হয় আপনিও একমত হবেন—প্রশ্নটা বাস্তব/কল্পনার বিভাজনে নয়, প্রশ্নটা ভাষায়, কাঠামোয়, দেখার ভঙ্গিতে। তেরেসা দে লা পার্রাকে আপনি এত পছন্দ করেন জানতাম না। ভেনেজুয়েলায় থাকার সময় তাঁর কথা অনেক শুনেছিলাম। অবশ্য আমি তাঁকে কখনো পড়িনি।বুয়োসা :
তেরেসা দে লা পার্রা সেরা নারী লেখকদের বা সেরা লেখকদেরই একজন। পড়লে আপনি একমত হবেন। আপনার উত্তর আমার ধারণাকেই সমর্থন করে যে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য-জগতে বিদ্যুৎ-প্রবাহ বেশ এলোমেলো। দুর্বল বলব না। কারণ হঠাৎ হঠাৎ মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সেটা ঘটে মাঝে মাঝে।তবে ক্যানন নিয়ে আমরা পুরোপুরি একমত নই। সব বিভাজনই অবশ্য কৃত্রিম। দক্ষিণ নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি কোর্তাসার, সিলভিনা ওকাম্পোর উন্মত্ত গল্পগুলো, বিওই কাসারেস আর বোর্হেসের কথা ভেবেছিলাম—এই লেখকদের ক্ষেত্রে কোনো ক্রমতালিকা চলে না, সবাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভেবেছিলাম মারিয়া লুইসা বম্বালের সেই ছোট্ট, ঝাপসা উপন্যাসটার কথাও—House of Mist—যার খ্যাতি হয়তো অনেকটাই কেলেঙ্কারির জন্য, কারণ তিনি তাঁর প্রাক্তন প্রেমিককে হত্যা করেছিলেন। উত্তরের দলে রাখতাম বার্গাস য়োসা আর মহান তেরেসা দে লা পার্রাকে। কিন্তু আরও উত্তরে গেলে জিনিস জটিল হয়ে যায়—সেখানে আছেন হুয়ান রুলফো, আর এলেনা গার্রো তাঁর A Solid Home (১৯৫৮) ও Recollections of Things to Come (১৯৬৩) নিয়ে। সব বিভাজনই কৃত্রিম : কল্পনাহীন বাস্তবতা নেই, বাস্তবতাহীন কল্পনাও নেই।
আপনার গল্পে, উপন্যাসে—এবং সম্ভবত কবিতায়ও—পাঠক পুরনো হিসাব মেটানো আর শ্রদ্ধার্ঘ্য—দুটোরই চিহ্ন খুঁজে পান। এই দুটো আপনার কাহিনিকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমি বলছি না আপনার উপন্যাস সাংকেতিক ভাষায় লেখা, কিন্তু আপনার কাহিনি-রসায়নের চাবিকাঠি হয়তো এখানেই—যে ঘটনাগুলো আপনি বলেন তাতে আপনি ঘৃণা আর ভালোবাসা কীভাবে মেশান সেটাতে। রোবের্তো বোলানিও—এই দক্ষ রসায়নবিদ—কীভাবে কাজ করেন?
----------------------------------------------------------------------------------
আর্হেন্তিনার কবি ও ছোটগল্পকার সিলভিনা ওকাম্পো (১৯০৩–১৯৯৩) বুয়েনোস আইরেসের আভাঁ-গার্দ সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন অপরিহার্য সদস্য ছিলেন। তিনি তাঁর কল্পকাহিনিগুলো প্রকাশ করতেন Sur-এ—বুয়েনোস আইরেস থেকে তাঁর বোন ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সম্পাদনায় প্রকাশিত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্য পত্রিকা। তাঁর রচনার একটি সংকলন, Leopoldina's Dream, ইংরেজিতে পাওয়া যায়।
চিলির লেখিকা মারিয়া লুইসা বম্বাল (১৯১০–১৯৮০) সে যুগের প্রভাবশালী বাস্তববাদকে ভেঙে কল্পকাহিনি ও পরাবাস্তব ধারায় লিখতেন। তাঁর প্রধান রচনা House of Mist (১৯৪৭) ইংরেজি অনুবাদে পাওয়া যায়।
মেক্সিকান নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও প্রাবন্ধিক এলেনা গার্রো (১৯২০–১৯৯৮) লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের পরাবাস্তব ও কল্পনাপ্রবণ ধারার সঙ্গে বাস্তববাদী ধারাকে মিলিয়েছিলেন। অক্তাভিও পাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ছিল ঝড়ঝঞ্ঝাপূর্ণ, শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গিয়ে ঠেকে।
----------------------------------------------------------------------------------
বোলানিও :
আমার লেখায় অন্য যেকোনো লেখকের বইয়ের চেয়ে বেশি পুরনো হিসাব মেটানো আছে বলে মনে করি না। পণ্ডিতি শোনাবে জেনেও—যদিও সম্ভবত আমি আসলেই পণ্ডিত—বলছি : লেখার সময় একমাত্র যা আমাকে আগ্রহী করে তা হলো লেখাটাই। মানে রূপ, ছন্দ, কাহিনি। কিছু মনোভাব, কিছু মানুষ, কিছু কাজকর্ম ও তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখে আমি হাসি—কারণ এত বাজে কথা, এত স্ফীত অহংকারের মুখোমুখি হলে না হেসে উপায় থাকে না। সব সাহিত্যই এক অর্থে রাজনৈতিক। মানে, প্রথমত এটা রাজনীতি নিয়ে একটা ভাবনা, আর দ্বিতীয়ত এটা নিজেই একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি। প্রথমটা বাস্তবতার দিকে ইশারা করে—সেই দুঃস্বপ্ন বা সুখের স্বপ্নকে যাকে আমরা বাস্তব বলি—এবং দুই ক্ষেত্রেই পরিণতি হলো মৃত্যু এবং বিলোপ—শুধু সাহিত্যের নয়, সময়েরও। দ্বিতীয়টা সেই ছোট ছোট টুকরোগুলোর কথা বলে যেগুলো টিকে থাকে, টিকে থাকার চেষ্টা করে এবং যুক্তির কথাও বলে। যদিও আমরা জানি, মানবিক মাপকাঠিতে টিকে থাকাটা একটা মায়া মাত্র, আর যুক্তি হলো একটা ভঙুর রেলিং—যা আমাদের খাদে পড়ে যাওয়া থেকে কোনোরকমে আটকে রাখে। কিন্তু এইমাত্র যা বললাম সেটাকে পাত্তা দেবেন না। মনে হয় মানুষ লেখে সংবেদনশীলতা থেকে—ব্যস, এটুকুই। আর আপনি কেন লেখেন? বলবেন না যেন—নিশ্চিত আপনার উত্তর আমারটার চেয়ে অনেক বেশি বাকপটু আর বিশ্বাসযোগ্য হবে।বুয়োসা :
ঠিক আছে, বলব না। তবে এই কারণে নয় যে আমার উত্তর বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে। কিন্তু এটুকু বলতে হবে—যদি কোনো কারণে আমি না লিখতাম, সেটা হতো সংবেদনশীলতার কারণেই। আমার কাছে লেখা মানে একটা যুদ্ধক্ষেত্রে ডুব দেওয়া, পেট চিরে ফেলা, মৃতদেহের অবশেষের সঙ্গে লড়াই করা, তারপর সেই যুদ্ধের মাঠটাকে অক্ষত ও জীবন্ত রাখার চেষ্টা করা। আর আপনি যাকে ‘হিসাব মেটানো’ বলছেন, সেটা আমার চোখে অনেক লাতিন আমেরিকান লেখকের চেয়ে আপনার লেখায় অনেক বেশি তীব্র।এই পাঠকের চোখে আপনার হাসি শুধু একটা ভঙ্গি নয়—এটা অনেক বেশি ক্ষয়কারী, এটা একটা ভাঙার কাজ। আপনার বইয়ে উপন্যাসের ভেতরের কলকব্জা চলে চিরাচরিত নিয়মে : একটা রূপকথা, একটা কল্পকাহিনি পাঠককে টেনে নেয় এবং একই সঙ্গে তাকে সহযোগী করে তোলে—পেছনের ঘটনাগুলো খুলে দেখার কাজে, যেগুলো আপনি ঔপন্যাসিক হিসেবে অসাধারণ বিশ্বস্ততায় বলে যাচ্ছেন। তবে এসব এখন থাক। যে কেউ আপনাকে পড়েছেন, তিনি লেখার প্রতি আপনার বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ করতে পারবেন না। এটাই পাঠককে প্রথমে টানে। যে পাঠক বইয়ে লেখা ছাড়া অন্য কিছু খোঁজেন—যেমন কোনো দলের সদস্যপদের অনুভূতি বা কোনো ক্লাবের ভেতরে থাকার বোধ—আপনার উপন্যাস বা গল্পে তিনি তৃপ্তি পাবেন না। আর আপনাকে পড়ার সময় আমি ইতিহাস খুঁজি না, পৃথিবীর কোনো কোণের কম-বেশি সাম্প্রতিক কালের পুনর্বর্ণনা খুঁজি না। ‘বাস্তববাদী’ লেখকের হাতে যে দৃশ্যগুলো জড়, স্থির অনুচ্ছেদ হয়ে যেত, সেগুলো দিয়ে আপনার মতো করে পাঠককে এত ভালো বেঁধে রাখতে পারেন এমন লেখক কমই আছেন। আপনি যদি কোনো ধারার অংশ হন, তাকে কী বলবেন? আপনার বংশতালিকার গাছের শিকড় কোথায়, আর ডালপালা কোনদিকে বাড়ছে?
বোলানিও :
সত্যি বলতে, লেখায় আমার অতটা বিশ্বাস নেই। নিজের লেখায় তো নয়ই। লেখক হওয়া আনন্দের—না, আনন্দ ঠিক শব্দ নয়—এটা এমন একটা কাজ যাতে মাঝে মাঝে মজার মুহূর্ত আসে, কিন্তু আমি এমন অনেক কিছু জানি যা আরও বেশি মজাদার—সাহিত্যের মতোই মজাদার। যেমন ব্যাংক ডাকাতি। বা সিনেমা পরিচালনা। বা জিগোলো হওয়া। বা আবার শিশু হয়ে কমবেশি ধ্বংসাত্মক কোনো ফুটবল দলে খেলা। দুর্ভাগ্যবশত শিশু বড় হয়ে যায়, ব্যাংক ডাকাত মরে যায়, পরিচালকের টাকা ফুরিয়ে যায়, জিগোলো অসুস্থ হয়ে পড়ে—তখন আর কোনো উপায় থাকে না, লিখতেই হয়। আমার কাছে ‘লেখা’ শব্দটা ‘অপেক্ষা’ শব্দটার একদম বিপরীত। অপেক্ষার বদলে লেখা। আসলে আমি হয়তো ভুলই বলছি—লেখাও হয়তো আরেক ধরনের অপেক্ষা, জিনিসকে পিছিয়ে দেওয়া। অন্যরকম ভাবতে চাই। কিন্তু যা বললাম, সম্ভবত ভুলই বলছি।
আমার ক্যাননের ধারণা বলতে গেলে—সেটা সবার মতোই, বলতে লজ্জা লাগছে এতটাই সুস্পষ্ট : ফ্রান্সিসকো দে আলদানা, হোর্হে মানরিকে, সের্বান্তেস, ইন্দিজের ইতিহাসকারেরা, সোর হুয়ানা ইনেস দে লা ক্রুস, ফ্রাই সের্বান্দো তেরেসা দে মিয়ের, পেদ্রো এনরিকেস উরেনিয়া, রুবেন দারিও, আলফোনসো রেইয়েস, বোর্হেস—এরা কয়েকজন মাত্র, এবং স্প্যানিশ ভাষার গণ্ডি না পেরিয়েই বলছি। অবশ্য আমি চাইতাম একটা সাহিত্য-উত্তরাধিকার দাবি করতে, একটা ঐতিহ্য—খুব ছোট্ট একটা, মাত্র দুই বা তিনজন লেখকের, হয়তো একটিমাত্র বইয়ের—এক চমকানো, বিস্মৃতিপ্রবণ ঐতিহ্য। কিন্তু একদিকে নিজের লেখা নিয়ে আমি বেশি বিনয়ী, অন্যদিকে অনেক বেশি পড়েছি এবং অনেক বই আমাকে আনন্দ দিয়েছে—তাই এত হাস্যকর ধারণায় মজে থাকা আর সম্ভব নয়।
--------------------------------------------------------
ষোড়শ শতকের কবি, ছোটগল্পকার ও সৈনিক ফ্রান্সিসকো দে আলদানা (১৫৪০–১৫৭৮) সের্বান্তেসের প্রিয় ছিলেন এবং স্প্যানিশ রেনেসাঁসের একজন অপরিহার্য অংশ ছিলেন।
স্প্যানিশ কবি হোর্হে মানরিকে (১৪৪০–১৪৭৯) স্প্যানিশ সাহিত্য-ইতিহাসের একটি প্রধান নাম। তাঁর "Stanzas about the Death of his Father" বহুবার অনূদিত হয়েছে, ১৮৩৩ সালে লংফেলোর অনুবাদসহ।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রচুর-লেখা কবি সোর হুয়ানা ইনেস দে লা ক্রুস (১৬৫১–১৬৯৫) স্প্যানিশ শাসনাধীন মেক্সিকোয় বাস করতেন। তাঁর লেখা সে সময়ের জন্য খোলাখুলি আমূল পরিবর্তনকামী ছিল। নারীশিক্ষা নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল এবং তিনি নারীবাদের এক আদি পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত।
মন্টেরেইতে জন্ম নেওয়া ডোমিনিকান ফ্রিয়ার সের্বান্দো তেরেসা দে মিয়ের (১৭৬৩–১৮২৭) বিপ্লব-পূর্ব মেক্সিকোর একজন বিশিষ্ট ধর্মপ্রচারক ও রাজনীতিক ছিলেন। স্পেনে নির্বাসনে থাকার সময় তিনি তাঁর মূল রচনাগুলো লেখেন এবং মেক্সিকোর স্বাধীনতা আন্দোলনে সহায়তা করেন।
আন্তর্জাতিকভাবে পঠিত প্রথম হিস্পানিক লেখকদের একজন পেদ্রো এনরিকেস উরেনিয়া (১৮৮৪–১৯৪৬) ভাষার সামাজিক পরিবর্তন ঘটানোর শক্তিতে বিশ্বাস রাখতেন। একজন পণ্ডিত এবং ডোমিনিকান প্রেসিডেন্টের পুত্র হিসেবে তিনি বিশ শতকের লাতিন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ছিলেন।
--------------------------------------------------------------------
বুয়োসা :
শুধু স্প্যানিশে লেখা লেখকদের আপনার সাহিত্য-পূর্বপুরুষ বলা কি একটু খেয়ালি মনে হয় না? আপনি কি নিজেকে হিস্পানিক ঐতিহ্যের অংশ মনে করেন, অন্য ভাষার ধারা থেকে আলাদা একটি স্রোতে? লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের একটা বড় অংশ—বিশেষত গদ্য—অন্যান্য ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপে আছে। আমি বলব আপনার ক্ষেত্রে এটা দ্বিগুণ সত্য।
বোলানিও :
ক্যাননকে সীমার মধ্যে রাখতেই স্প্যানিশে লেখা লেখকদের নাম বলেছি। বলাই বাহুল্য, আমি সেই জাতীয়তাবাদী দানবদের একজন নই যারা শুধু নিজের দেশের লেখা পড়েন। ফরাসি সাহিত্যে আমার আগ্রহ আছে—পাস্কালে, যিনি নিজের মৃত্যু আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন, এবং বিষণ্নতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ে, যা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি মহৎ মনে হয়। ফুরিয়ের ইউটোপীয় সরলতায়ও আগ্রহ আছে। আর দরবারি লেখকদের — কেউ ম্যানারিস্ট, কেউ শারীরবিদ — সেই সাধারণত নামহীন সব গদ্যে, যা কোনোভাবে মার্কি দ্য সাদের অন্তহীন গুহাগুলোতে পৌঁছায়। আমেরিকান সাহিত্যেও আগ্রহ আছে, বিশেষত ১৮৮০-র দশকের—টোয়েন ও মেলভিল এবং এমিলি ডিকিনসন ও হুইটম্যানের কবিতায়। কিশোরবেলায় একটা সময় শুধু পো পড়েছি। মোটের উপর পশ্চিমা সাহিত্যে আমার আগ্রহ, এবং তার প্রায় পুরোটার সঙ্গেই আমার মোটামুটি পরিচয় আছে।
---------------------------------------------------------------------
নিকারাগুয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ও সমাদৃত কবি রুবেন দারিও (১৮৬৭–১৯১৬) লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে আধুনিকতা আনার কৃতিত্ব পান।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে মেক্সিকান সংস্কৃতির একটি বিরাট নাম আলফোনসো রেইয়েস (১৮৮৯–১৯৫৯) ছিলেন প্রচুর-লেখা প্রাবন্ধিক, কবি ও কূটনীতিক। তিনি স্পেনে মেক্সিকান দূতাবাসের সচিব, ফ্রান্সে মন্ত্রী এবং ব্রাজিল ও আর্হেন্তিনায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে তিনি মেক্সিকো সিটিতে El Colegio Nacional-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হন। তাঁর প্রধান রচনার মধ্যে আছে The Position of America and Other Essays (১৯৫০) এবং Mexico in a Nutshell and Other Essays (১৯৬৪)।
---------------------------------------------------------------------
বুয়োসা :
শুধু পো পড়েছেন? আমাদের প্রজন্মে একটা ছোঁয়াচে ‘পো-ভাইরাস’ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে মনে হয়— তিনি ছিলেন আমাদের আদর্শ। আপনাকে সেই আক্রান্ত কিশোর হিসেবে সহজেই কল্পনা করতে পারি। কিন্তু আমি আপনাকে একজন কবি হিসেবে ভাবছিলাম, এখন আপনার গদ্যের দিকে যেতে চাই। কাহিনি কি আপনি বেছে নেন, নাকি কাহিনি আপনার পিছু ধাওয়া করে? আপনি কীভাবে বেছে নেন বা কাহিনি কীভাবে আপনাকে বেছে নেয়? আর যদি কোনোটাই না হয়, তাহলে কী হয়? পিনোচেতের মার্কসবাদ-বিষয়ক উপদেষ্টা, অত্যন্ত সম্মানিত চিলির সাহিত্য-সমালোচক যাকে আপনি সেবাস্তিয়ান উরুতিয়া লাক্রোইস নাম দিয়েছেন—একজন পুরোহিত ও ওপাস দেই সদস্য বা মেসমেরিজম চর্চা করা সেই নিরাময়কারী, বা ‘দ্য স্যাভেজ ডিটেক্টিভস’-এর কিশোর কবিরা—আপনার এই সব চরিত্রের ঐতিহাসিক প্রতিরূপ আছে। কেন?
বোলানিও :
হ্যাঁ, কাহিনি এক অদ্ভুত বিষয়। আমি মনে করি—যদিও ব্যতিক্রম অনেক—একটা গল্প একসময় আপনাকে বেছে নেয় এবং আর শান্তি দেয় না। সৌভাগ্যবশত এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়—রূপ ও কাঠামো সবসময় আপনারই থাকে, আর রূপ বা কাঠামো ছাড়া বই হয় না, অন্তত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাই। বলা যাক গল্প ও কাহিনি আসে দৈবাৎ—এগুলো দৈবের জগতের, অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতার জগতের, বা এমন এক জগতের যা সদা টলমল করছে—কেউ কেউ একে বলেন সর্বনাশী। রূপ, অন্যদিকে, বুদ্ধি, চাতুর্য ও নীরবতার মাধ্যমে নেওয়া একটা পছন্দ—ইউলিসিস মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই অস্ত্রগুলোই ব্যবহার করেছিলেন। রূপ খোঁজে কৌশল, গল্প খোঁজে খাড়া কিনারা। অথবা চিলির গ্রামাঞ্চলের একটা রূপক দিয়ে বলি—একটা খারাপ রূপক, দেখবেন : খাড়া কিনারা আমি অপছন্দ করি না, তবে সেটা একটা সেতুর উপর থেকে দেখতেই বেশি ভালোবাসি।
বুয়োসা :
নারী লেখকরা এই প্রশ্নে সবসময় বিরক্ত হন, কিন্তু আপনাকে না করে পারছি না—শুধু এই কারণে যে এত বার জিজ্ঞেস করা হয়েছে বলে এটাকে আমি একটা অনিবার্য, যদিও অপ্রীতিকর, আচার মনে করি। আপনার লেখায় আত্মজীবনীমূলক উপাদান কতটুকু? এটা কতটা আত্মপ্রতিকৃতি?
বোলানিও :
আত্মপ্রতিকৃতি? খুব বেশি নয়। আত্মপ্রতিকৃতির জন্য একটা বিশেষ ধরনের অহংকার দরকার—বারবার নিজের দিকে তাকানোর ইচ্ছা, নিজে কী বা কী ছিলেন তা নিয়ে সুস্পষ্ট আগ্রহ। সাহিত্য আত্মজীবনীতে ভরা, কিছু অত্যন্ত ভালো, কিন্তু আত্মপ্রতিকৃতিগুলো সাধারণত খুব খারাপ হয়—কবিতায় আত্মপ্রতিকৃতিও, যদিও প্রথম দেখায় মনে হয় গদ্যের চেয়ে কবিতা আত্মপ্রতিকৃতির জন্য বেশি উপযুক্ত। আমার লেখা কি আত্মজীবনীমূলক? এক অর্থে না হয়ে পারে কীভাবে? মহাকাব্য সহ প্রতিটি রচনাই কোনো না কোনোভাবে আত্মজীবনীমূলক। ইলিয়াডে আমরা দুটি জোটের, একটি নগরের, দুটি সৈন্যবাহিনীর ভাগ্য দেখি—কিন্তু একই সঙ্গে আকিলিস, প্রিয়াম ও হেক্টরের ভাগ্যও দেখি। এই সব চরিত্র, এই সব একক কণ্ঠস্বর—সবই লেখকের কণ্ঠ ও নিঃসঙ্গতাকে প্রতিফলিত করে।
বুয়োসা :
যখন আমরা তরুণ কবি, কিশোর, একই শহরে—সত্তরের দশকের মেক্সিকো সিটিতে—ছিলাম, তখন আপনি একটি কবি-দলের নেতা ছিলেন—ইনফ্রারিয়ালিস্টরা—যাদের আপনি আপনার উপন্যাস দ্য স্যাভেজ ডিটেক্টিভস-এ পৌরাণিক মর্যাদা দিয়েছেন। ইনফ্রারিয়ালিস্টদের কাছে কবিতার অর্থ কী ছিল, ইনফ্রারিয়ালিস্টদের মেক্সিকো সিটি কেমন ছিল—একটু বলুন।
বোলানিও :
ইনফ্রারিয়ালিজম ছিল এক ধরনের মেক্সিকান ঢঙের দাদাইজম। একসময় অনেক লোক—শুধু কবি নয়, চিত্রকরও, বিশেষত আড্ডাবাজ ও ঝুলে-থাকা লোকজন—নিজেদের ইনফ্রারিয়ালিস্ট মনে করত। আসলে সদস্য ছিলাম মাত্র দুজন—মারিও সান্তিয়াগো আর আমি। আমরা দুজনেই ১৯৭৭ সালে ইউরোপে চলে যাই। একরাতে ফ্রান্সের রোসেইয়োঁতে, পোর্ট-বঁদ্রে রেলস্টেশনে—যেটা পেরপিনিয়াঁর খুব কাছে—কিছু ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আন্দোলনের, যা ছিল তার, পরিসমাপ্তি হয়েছে।
-------------------------------------------------------------------------
বোলানিওর কবি ও পুরনো বন্ধু মারিও সান্তিয়াগো (১৯৫৩–১৯৯৮) বোলানিওর ঘনিষ্ঠ মহলের সদস্য ছিলেন এবং বোলানিও ও অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে সত্তরের দশকের ইনফ্রারিয়ালিজম আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বোলানিও দ্য স্যাভেজ ডিটেক্টিভস*-এ সান্তিয়াগোকে ভিসেরাল রিয়ালিস্ট উলিসেস লিমা চরিত্রে অমর করেছেন।*
---------------------------------------------------------------------------
বুয়োসা :
হয়তো আপনাদের জন্য শেষ হয়েছিল, কিন্তু আমাদের স্মৃতিতে এটা প্রবলভাবে বেঁচে ছিল। আপনারা দুজন ছিলেন সাহিত্যজগতের আতঙ্ক। সেই সময় আমি ছিলাম এক গম্ভীর, সিরিয়াস দলে—আমার জীবন এতটাই এলোমেলো ও আকারহীন ছিল যে আমার কিছু একটা শক্ত আঁকড়ে ধরা দরকার ছিল। কবিতা-পাঠের অনুষ্ঠান ও সংবর্ধনার আনুষ্ঠানিকতা আমার ভালো লাগত—সেই অর্থহীন আচার-অনুষ্ঠানে ভরা অনুষ্ঠানগুলো, যেগুলো আমি কমবেশি মেনে চলতাম। আর আপনারা ছিলেন সেই সমাবেশগুলোর ভাঙচুরকারী। ১৯৭৪ সালে গান্ধী বইয়ের দোকানে আমার প্রথম কবিতা-পাঠের আগে আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম—ঈশ্বরে সত্যিকারের বিশ্বাস ছিল না, কিন্তু কাউকে ডাকা দরকার ছিল—এবং মিনতি করেছিলাম : ইনফ্রারিয়ালিস্টরা যেন না আসে। সামনে পড়তে দাঁড়াতে ভয় করত আমার, কিন্তু লাজুকতার সেই উদ্বেগ কিছুই ছিল না এই আতঙ্কের তুলনায় যে পাঠের মাঝখানে ইনফ্রারা এসে আমাকে বোকা বলে ডাক দেবে। আপনারা ছিলেন সাহিত্যজগতকে বোঝাতে যে যা সত্যিকার গুরুত্বপূর্ণ নয় তাকে এত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত নয়—আর কবিতায় আপনার সেই চিলির প্রবাদকে উল্টে দিয়ে বলতে হয় যে এখানে ঠিক খাড়া কিনারা থেকে ঝাঁপ দেওয়াটাই মূল কথা। তবে বোলানিও ও তাঁর লেখায় ফিরি। আপনি গদ্যে পারদর্শী—আপনার উপন্যাসকে কেউ ‘গীতিধর্মী’ বলবেন এটা কল্পনা করতে পারি না—তবুও আপনি একজন কবিও, সক্রিয় কবি। দুটো কীভাবে মেলান?
বোলানিও :
নিকানোর পার্রা বলেন সেরা উপন্যাসগুলো মাত্রায় লেখা। আর হ্যারোল্ড ব্লুম বলেন বিশ শতকের সেরা কবিতা গদ্যে লেখা। আমি দুজনের সঙ্গেই একমত। কিন্তু অন্যদিকে নিজেকে সক্রিয় কবি মনে করতে কষ্ট হয়। আমার বোঝাপড়া হলো সক্রিয় কবি সে-ই যে কবিতা লেখে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক কবিতাগুলো আপনাকে পাঠিয়েছিলাম, ভয় হচ্ছে সেগুলো ভয়াবহ—যদিও অবশ্যই সৌজন্য ও বিবেচনাবশত আপনি মিথ্যা বলেছেন। জানি না। কবিতায় এমন কিছু একটা আছে। যাই হোক, গুরুত্বপূর্ণ হলো এটা পড়তে থাকা। সেটা লেখার চেয়ে বেশি জরুরি, তাই না? আসলে পড়া সবসময় লেখার চেয়ে বেশি জরুরি।
-------------------------------------------------------------------
১৯১৪ সালে জন্ম নেওয়া চিলির কবি নিকানোর পার্রা বোলানিওর কবিতা ও প্রাথমিক গদ্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। আধুনিকতাবাদী বিবেচিত পার্রার ভাষা অনেক পরের আমেরিকান বিট কবিদের লেখার মতো। বোলানিও তাঁকে "জীবিত সেরা স্প্যানিশ ভাষার কবি" মনে করতেন। তাঁর রচনার একটি সংকলন Anti-poems: How to Look Better & Feel Great ইংরেজিতে পাওয়া যায়।
--------------------------------------------------------------
প্রথম প্রকাশ: BOMB, ব্রুকলিন, শীতকাল ২০০২


0 মন্তব্যসমূহ