উম্মে মুসলিমার গল্প : যে গ্রামে একদা কেউ ফর্সা ছিল না


কৃষ্ণমেঘা গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই কালো। আশেপাশের গ্রামের শিক্ষিতরা অনেকে বলতো ওই গ্রামের মাঝখান দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। রোদের এমন তেজ তাতে নাকি মাথার ওপর সূর্য দেখে বউ-ঝিরা ইলিশের টুকরোয় সর্ষেবাটা মাখিয়ে মাটির শানকিতে করে উঠোনের ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিত। বেলা গড়ালেই মাটিতে পাত পেড়ে তা দিয়ে গুষ্টির পিণ্ডি হতো। কালো কালো বউ শাশুড়িরা কুচকুচে ছেলেপিলের পাতে মাছের পেটি গাদা ভেঙে চার টুকরো করে ভাগ করে দিত। আর বাড়ির মোষের মত মইষাল পুরুষরা একেকজন একেক টুকরো খেয়ে উঠে গেলে বউ-ঝিরা শানকিতে লেগে থাকা সর্ষের দানায় ভাত মাখিয়ে এক হাত জিব বের করে হাতের এপিঠ ওপিঠ চাটতে থাকতো যতক্ষণ না হাত ধোয়ার মত সাফ হয়ে যেত।

‘কৃষ্ণমেঘা’ বলতে কারুর বয়েই গেছে।
‘কনতি আলি’?
‘কনতি আবার, কেষ্টোগা তি।’

যারা একটু আধটু লেখাপড়া জানতো তারা বলতো ‘কেস্টোম্যাগা’। শুনে হেসেই বাঁচে না চার কালো মেয়ের বাপ নালু মণ্ডল।
‘ওরে তুই কোন জজ ব্যালিস্টোরের নাতিরে! কেস্টোম্যাগা না কয়ি ক প্রাণেশ্বরি। খ্যাক খ্যাক…’

তো এই নালু মণ্ডলের চার মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়েছে। বড়টা পরপর দুটো কালো মেয়ের জন্ম দিলে স্বামী খেদিয়ে দিয়েছে। মেজটা তিনবছরে বাচ্চা দিতে পারেনি বলে তাঁর স্বামী তালাক দিয়ে আরও একটা বিয়ে করেছে। সেজটা তুলনামূলকভাবে একটু কম কালো বলে বিয়েটা টিকে গেছে। বলা বাহুল্য নালু মণ্ডলের প্রতিটা জামাই কালো। কালো? তা সে যতই কালো হোক। পুরুষের আবার কালো আর ধলো কী? নালুর জমি জিরাত আছে বলে মেয়েরা ঘন ঘন বাপের বাড়ি আসে। নালুর বউ মেয়ে বলতে পাগল। বড়টা তো সপ্তাহে একবার করে মেয়ে দুটোকে মায়ের জিম্মায় দিয়ে কেস্টোগায়ের উত্তর মাথায় চাচাশ্বশুরের বাড়ির ঢেঁকিঘরে গিয়ে বসে থাকে। ঢেঁকিঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ওর স্বামীর ছাপড়া দেখা যায়। স্বামী ঘাড় থেকে ঝাঁকি দিয়ে যখন লাঙ্গল নামায় তখন ছুটে দিয়ে আঁচল দিয়ে তার ঘাম মুছে দিতে ইচ্ছে হয় ওর। ওর চাচাতো জা বলে, ‘ও বু, একবারডা গিয়ি মিভায়ের পা দুখোন চ্যাইপি ধরোগা দিনি। দুই মেয়ির পরে আল্লা ইবার এট্টা ছেইলি দেবেনে দেইখু।’

নালুর বড় মেয়ে চোখ মুছে বলে, ‘কিডা বুলতি পারেরে বুইন। মেয়ি দুইটো বাপ বাপ কইরি খুন হয়, নাত্তির বেলা আমার দু’চোকির পাতা এক হয় না। মেয়িগের জরমো কি আমার একার দায়? বোলে যে তোর মার প্যাটে খালি মেয়ি, তোর বংশের দোষ। ও মাইজি বউ, তোর মিভাই কি আবার বিয়ি কত্তি চায়?’

‘তা পুরুষ মানষির কতা! কত্তি কতক্ষুণ?’

নালুর বড় মেয়ে মনে মনে বলে ‘খালি পুরুষ মানষিরই বিয়ি করা লাগে? মেয়িমানুষ সারানাত্তির ছটফট করে না?’ মাটির পিড়ে থেকে উঠে পাছার কাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে পা বাড়ানোর সময় বলে যায়, ‘আইজ এককুড়ি দিন পুইজলো। ও মাইজি বো, সইঞ্জির সুমায় তোর ভাসুর যখুন হুকো হাতে তোগের আখা থেকি আগুন নিতি আসপে তখুন এট্টু শুধ করিস তো যে মেয়ি দুইটুর জন্যি হলিউ একবার কেস্টোগায় যাতি ইচ্ছি করে না?’

নালুর বড় মেয়ে হালেমা ধীর পায়ে কৃষ্ণমেঘার দিকে পা বাড়ায়। তার বাপের বাড়ির ডহরে হচেনের দোকানের সামনে যেন রথ দেখা ভিড়। মানুষ গিজ গিজ করছে। হালেমা ভিড় ঠেলে গলা উঁচু করে দেখে কে যেন বেহেস্তি নূর নিয়ে বসে আছে। ধবধবে শাদা গায়ের রঙ, মুখে কালো দাড়ি, দুই গাল লাল, খাড়া নাক, বেগুনি ঠোঁট, চোখে যেন আল্লার দেয়া কাজল, কালো মিশমিশে ভ্রু এমন কালো এ কেস্টোগায় কেউ নেই। নালু মণ্ডল পাশে বসে তাঁর মুখে একবার বিস্কুট আর একবার পানির গ্লাস ধরছে। রূপকুমারের শরীরে বল নেই। কতদিনের না-খাওয়া কে জানে? বিস্কুট পানি খেয়ে একটু চাঙ্গা হলে চারদিক থেকে প্রশ্নবাণে তাকে নাজেহাল করে তোলা হচ্ছিল।

‘হা বাপ বাড়ি কোন দ্যাশে?’
‘কেস্টোগায় তুমার কুনু কুটুম আছে’?

কে একজন বলে উঠলো, ‘দেখলি তো শিক্কিতই মনে হচ্ছে। কেস্টোগা না বুইলি কৃষ্ণমেঘা বুললি হয়তো বুজতি পারবে।’

এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আগন্তুক ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে ছিল। একজন কায়দা করে স্কুল পড়ুয়া কৌতুহলী ছেলেদের বললো তার সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে। শুনে ছেলের দল হেসেই বাঁচে না। ইংরেজি বলতে পারলে ওরা কি স্কুল থেকে এসে ছাগল চরাতে যায়? গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ছলিম মোল্লা শেষ পর্যন্ত সাহস করে জিজ্ঞাসা করে বসে, ‘তুমার নাম কিয়া? মুকাম কনে?’

ফেলু দোকানদার নিজের ভাষাজ্ঞানের পরিচয় প্রকাশের সুযোগ হাতছাড়া করলো না। বলে উঠলো, ‘আপকা ঘর কাহা’?

রূপকুমার এতক্ষণে মুখ খোলে। দুর্বল কণ্ঠে জানায়, ‘মেরা নাম শাবাজ শেখ। কাশ্মির মেরা ঘর।’
‘তা সে দ্যাশ তি এ দ্যাশে কী কামে? কিরাম কইরি আইলি?’

রূপকুমার কিছু বোঝে না। কাজল কালো চোখে যেন রাজ্যের ঘুম। এক বয়স্কা ফিসফিস করে বললো, ‘ও নালু আমার ঠিন ঠ্যাকছে ও মানুষ না, ও জ্বেন’।

হালেমা তড়িঘড়ি করে বলে, ‘ও বাপ, মানুষডা নাজায় মাইরি গিচে, বাড়ি নি গিয়ি এট্টু যত্নআত্মি করলিই তাওনা হয়ি ওটপেনে’।

সবাই একমত হলো। নালু মণ্ডলের তো ভাতের অভাব নেই। তাছাড়া নালুর শালির ছেলে শহরে কলেজে পড়ে। তাকে ডেকে পাঠালেই সে ছররা গুলির মত ইংরেজি ফুটাতে পারবে।

নালু মণ্ডলের কাঁধে ভর দিয়ে শাবাজ শেখ ধীরে ধীরে বাড়ির মধ্যে চলে গেল। তাকে যতক্ষণ দেখা গেল ততক্ষণ মানুষজন নড়লো না। লোকজন যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘নালু চাচা, লোকটাক রোজ বিকালে একবার কইরি দুকানে বসাবা। দ্যাশ গিরামের লোক সব মজা দেকতি আসপে। ফেলু দুকানির তো পুয়াবারো। ইবার ফেলু ইটি মোতপে’ (কৃষ্ণমেঘায় কারো ইটের তৈরি বাড়ি নেই। মাঠে-ঘাটে, ঝোপ-ঝাড়ে বাহ্যি ফিরতে যায় নারী-পুরুষ)।

নালুর বড় মেয়ে হালেমা ভাল-মন্দ রেঁধে যত্ন করে পরিবেশন করলো। নালু মণ্ডল পাশে দুই নাতনি ও ছোট মেয়েকে বসিয়ে শাবাজের পাতে খাবার তুলে দিতে লাগলো। দরজার দুই পাল্লা সরু করে খুলে সেই ফাঁক দিয়ে নালুর পুত্রহীন বউ তৃষিত নয়নে রাজপুত্রের মত ছেলেটিকে যেন স্নেহের দৃষ্টি দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছিল। দীর্ঘদিনের বুভুক্ষু শাবাজ শেখ আদেখলার মত সব চেটেপুটে খেয়ে নিল দেখে হালেমা নিজেই নিজের রান্নার প্রশংসায় বাপকে বললো, ‘ও বাপ নোকটা হাত চাটচে। আর এক মুটু ভাত পাতে দিলি হইতু না?’

সম্প্রতি তালাকপ্রাপ্ত মেজ মেয়ে ছালেমা উঠোনে দাঁড়িয়ে আড়ায় ঝুলানো রোদে শুকনো শাড়ি একবার পেঁচায় একবার খোলে। নালু মেয়েকে ডাকে, ‘ও ছালু, ছেইলিডার শ্যাষ পাতে এট্টু খাজুরির গুড়ির পাটালি দিয়ি যা তো মা ‘

হালেমা ওরফে হালু ছুটে হেঁশেলে ঝুলানো শিকে থেকে পাটালি নামাতে নামাতে যা বুঝার বুঝে ফেলে। বাপ ছালুর সাথেই রাজার ছেলের নিকে দেবে।

কিন্তু হালেমা তো পুতুলনাচের ইতিকথার কুসুম। মনের চেয়ে শরীর বেশি। শাবাজ শেখকে খাইয়ে দাইয়ে চাঙ্গা করে তুলতে ওর দশদিন লেগে গেল। হালেমার মেয়ে দুটোর সাথে শাবাজের খুব ভাব। ও যা বলে কেউ বোঝেনা, কিন্তু পিচ্চি দুটো ঠিক বুঝে নেয় আর খিলখিল করে হাসে। ওরা শাবাজকে ডাকে ‘শাবাস মামু’। হালেমা আশাবাদী হয়ে ওঠে। একরাতে ছোটটা শাবাজের চৌকিতে ঘুমিয়ে গেলে অনেক রাতে হালেমা তাকে আনতে যায়। হালেমার কুসুম শরীর দ্বিধাহীন নিবেদনে বেজে ওঠে। পরদিনই বাড়িতে কাজি ডেকে নালু মণ্ডল ছালেমার সাথে শাবাজের বিয়ে দিয়ে দিল।

***

এরপর থেকে ঘরজামাই শাবাজ শেখ খায়-দায়, ঘরের দেয়ালে ঝুলানো আয়নায় সুচারু করে দাড়ির আগাছা সাফ করে। হালেমার মেয়েদের আরবি পড়ায় আর মাঝে মধ্যে কেষ্টোগায় নালুর কিনে দেয়া সাইকেল নিয়ে চক্কর দেয়। ছালেমা হালেমা প্রায় একসাথে গর্ভবতী হয়। স্বামী খেঁদিয়ে দেয়ার সাড়ে আট মাস পর হালেমা জন্ম দেয় কেষ্টোগার রূপ ও রঙ নিয়ে মা-মুখো নাদুস নুদুস ছেলে। হালেমার স্বামী এসে আহ্লাদিত হয়ে ছেলে মেয়ে বউকে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। ছালেমা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তারও দেড় মাস পর ছালেমা জমজ মেয়ে জন্ম দেয়। মেয়ে তো নয় যেন আকাশের চাঁদ। কৃষ্ণমেঘার আকাশে এই প্রথম শাদা মেঘের আগমন। নালু মণ্ডলের বাড়ি ঘিরে মানুষের ঢল।

‘ও নালু চাচা, জুড়া খাসি মাইরি আমাগের খাওয়াতি হবেনে বোলে’— ছালেমার সই বায়না ধরে।

‘হা নালু, নাতনিগের নাম ঠিক কইরিচু? নাম থোও চাঁদ তারা। না’লি পরে থোও হিরা মণি’ বয়োজ্যেষ্ঠা পাঁচির মা লাঠি ভর দিয়ে এসে জমজদের দেখে নাম রেখে গেল। কোনো কোনো পোয়াতি বউ জমজদের হাত নিজের কপালে ছোঁয়ালো যাতে একটা ফর্সা সন্তান জন্ম দিতে পারে। শাবাজ শেখ বেশ বাংলা শিখে গেছে। সে বললো—মেরা দোনো বেটিকো নাম হোবে শোলা আউর আলা। গ্রামের লোক হেসে বাঁচে না— এ আবার কী নাম? তারচে ভালো শলোক আর আলোক। কেষ্টোগার বদনাম ঘুচলো এতদিনে। শলোক আলোকও কেউ ডাকবে না একদিন। কৃষ্ণমেঘাকে যেমন কেষ্টোগা তেমনি শব্দ সংকোচন করে লোকে ডাকবে শলো আর অলো।

***

ভালোমন্দ খেয়ে পরে শাবাজ শেখের চেহারা আরও খোলতাই হতে থাকে। সে সাইকেল নিয়ে টো টো করে দূরের পাড়ায়ও চলে যায়। কুটুম হিসেবে হালেমার বাড়িতেও যায়। শাবাজকে দেখে হালেমার গা ঘেমে ওঠে, হাতের তালু গরম হয়, পায়ের পাতা মাটিতে রাখতে পারে না। ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন সারাক্ষণ ঘিরে রাখে। নিজেদের ঘর থেকে তারা লাড়ু-মুড়কি-মুরগির ডিম সেদ্ধ এনে বাচ্চাদের হাত দিয়ে সামনে রেখে আড়াল থেকে রাজকুমার দেখে। চিড়ে মুড়ি আম কলার ফলার আর পড়শিদের আনা খাবার খেয়ে শাবাজ হালেমার ছেলের গাল টিপে দিয়ে বিদায় নেয়। চলে গেলে হালেমার স্বামী পিড়ের ওপর হাঁটু উঁচু করে বসে ঘাড়ের গামছায় আঙুল জড়িয়ে শরীরে ঝাঁকি দিয়ে নাকের লোম টেনে তুলতে থাকে আর বলে, ‘ওই রাঙা মুইলু আবার আলি পরে আল্লার কিরি উর পুঙ্গায় নাংলা নড়ি যদি আমি না ভরি তে আমি কুকুরির গোস্তো খাই’।

একদিন মেম্বরের পাড়ায় জুম্মার নামাজ পড়ে মসজিদের বারান্দায় বসে শাবাজ এমন সুরেলা গলায় সুরা ইয়াসিন পড়তে থাকে যে পড়া শেষে মেম্বর তাকে হাত ধরে বাড়ির ভেতর নিয়ে যায়। কেষ্টোগায় এসে এই প্রথম শাবাজ পোলাও আর কোরমা খেলো। পরিবেশন করলো মেম্বরের একমাত্র মেয়ে নাজেরা খাতুন। বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও ভালো পাত্রের অভাবে তার বিয়ে হচ্ছিল না। মেম্বরের ভাষ্য। লোকে অবশ্য অন্য কথা বলে। শহরের ডাক্তারখানা থেকে মেয়ের ভ্রুণ খালাস করে এনেছিল মেম্বর নিজে। বাড়ির বাঁধা কামলাকে রাত পোহালে কেউ খুঁজে পায়নি।

‘তুমার জো রাজপুরুষ নালুর ভাত খায়? কী দিয়ি খাতি দেয় উরা তুমাক?’

শাবাজ মেম্বরের কথার মধ্যে শুধু নালু আর ভাত শব্দটাই বুঝতে পারে। সে উত্তর না দিয়ে হাত ধুতে উঠলে মেম্বরের মেয়ে আচমন করিয়ে দেয়।

গোপনে মেম্বর নালুর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসে। ছালেমা বাপের পা ধরে কাঁদতে থাকে, ‘ও বাপ, তুমি আমার শলো অলোর আব্বাকে আইনি দ্যাও। আমার মেয়িরা তাক না দেইকি থাকতি পারবে না। আমার এতো বড় সব্বোনাশ কিডা কইরলো গো!’

‘পা ছাড় ছালে। যার মা-বাপের পরিচয় নি, যার জম্মের ঠিক নি, সে আবার এট্টা মানুষ! যেকেনে ভাল খাবে সেকেনে চইলি যাবে। উর কুনু ময়া-মহব্বত আচে? তোর মেয়িগের রাজার ছেইলির সাতে বিয়ি হবে দেকপি’।

কেষ্টোগার খুকা টাউট এসব দেখেশুনে হিন্দি জানে এরকম এক লোককে বর্ডারের গ্রাম থেকে পয়সাপাতি খরচ করে নিয়ে এলো। শলাপরামর্শ করে শাবাজকে ডেকে এক হোটেলে পেট ভরে খাইয়ে হিন্দি জানা শওকত আলিকে দিয়ে বলালো, ‘তুম কাশ্মিরমে কেয়া খতরনাক কাম করা থা? তোমাকে এ মুল্লুকে আসতে হলো কেন?’

শাবাজ শওকত আলির পা চেপে ধরে। বলে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী তার ঘনিষ্ট বন্ধুকে গুলি করে মেরে ফেললে সে তাদের অস্ত্র ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। পুলিশ তাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে সে জঙ্গলে অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পালিয়ে আসে। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে চোরাপথে বর্ডার পার হয়ে শেষপর্যন্ত বাংলাদেশে।

শাবাজ শেখ সত্যি বলুক বা বানানো কথা বলুক তাতে খুকা টাউটের কিছুই যায় আসে না। সে চাচ্ছিল রাজার হালে থাকা আর দফায় দফায় বিয়ে করা ওই বিদেশিকে হুমকিতে রাখা। তার মাথায় অন্য খেলাও কাজ করছিল। নিঃসন্তান ধানের মজুতদার টাকার কুমির করিম মৃধা যখন তিন বিয়ে করার পরেও সন্তান জন্ম দিতে পারছিল না তখন খুকা টাউটের সহযোগিতায় তার ছোট বউয়ের ঘরে শাবাজ শেখকে ঢুকিয়ে দেয়। ছোটবউ সন্তানসম্ভবা হলে খুকাকে টাকাপয়সা দিয়ে শাবাজ শেখকে নিয়ে জন্মের মত কৃষ্ণমেঘার পশ্চিমে বিলাইপুর থানার শেষ গ্রাম সুলভপুরে পাঠিয়ে দেয়।

খুকা তার নাম পাল্টিয়ে নাম রাখে মালিক মোহাম্মদ হাশর আলি। অথবা ওটাই ওর আসল নাম, ডাকনাম খুকা। ও অঞ্চলে সবাই তাকে হাশর ম্যানেজার নামেই চেনে। শাবাজ শেখের নাম দেয় হুজুর কেবলা সৈয়দ সাবাসুল্লাহ শেখ। প্রথমে দোচালা টিনের বেড়া দেয়া তিন কামরার বাড়ির সামনে সাইনবোর্ডে লিখে দেয় ‘নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য আল্লাহর কুদরত’। তারপরে আর খুকা টাউটকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিনে দিনে মুরিদান ও সন্তানলাভ করা সন্তুষ্ট পুরুষদের অঢেল দান দাক্ষিণ্যে পাঁচ বিঘা জমির ওপর পুকুরসহ তিনতলা ‘কেবলাশ্রম’ গড়ে ওঠে। নুরানি চেহারার হুজুর কেবলার কালো দাড়িতে শাদা মেঘের ছিটেফোঁটা। ততদিনে কৃষ্ণমেঘা গ্রামসহ আশেপাশের অনেক গ্রামে হুজুর কেবলার কালো দাড়িতে এখানে ওখানে রূপালি রেখার মত শাদা মানুষের দেখা মিলতে লাগলো। সে বছর হাশর ম্যানেজার হুজুর কেবলার জন্মদিন সামনে রেখে মুরিদানদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়েছিল—‘হুজুর কেবলা সৈয়দ সাবাসুল্লাহ শেখ আপনাদের আরও খিদমত করতে চান। হুজুর সামনের ইলেকশনে আপনাদের মূল্যবান রায় উমিদ করেন। এই ইন্তেজামে আগামীকাল বাদ জোহর এক মেজবানের আয়োজন করা হইয়াছে...।’·


লেখক পরিচিতি : উম্মে মুসলিমা প্রধানত কথাসাহিত্যিক। পাশাপাশি লিখছেন কবিতা ও প্রবন্ধ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশুনা করেছেন। চুয়াডাংগা জেলার আলমডাংগা উপজেলায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ মিলিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৫টির বেশি। বসবাস ঢাকায়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ