এতক্ষণ নীরব নিস্তব্ধ ছিল সমগ্র শহর। রাস্তায় রাস্তায় প্রতিরোধ তৈরী করা হয়েছে বলে গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ। খুব ক্বচিৎ একটা সাইকেল-রিক্সা ঝড়ের বেগে ছুটে হয়তো বেরিয়ে গেল, শুধু বাতাস কাটা আর পীচের সঙ্গে চাকা ঘর্ষণের শব্দ, হয়তো রিক্সায় কিছু মালপত্র বোঝাই আছে কিংবা খালি, অথচ কখনো একটা গাড়ির দেখা নেই ৷ মাইল, আধ-মাইল দূরে দূরে ইট, ড্রাম, ওল্টানো গাড়ি ইত্যাদি হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তাতেই রাস্তায় প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। ছায়া ছায়া রাস্তা, বড়ো বড়ো মেহগিনি ও শিশু গাছ রাস্তাগুলোকে আরো নির্জন ও নিবিড় করে তুলেছে। জনমানবের গন্ধ নেই রাস্তায়। মনে হঠাৎ এমনও অবান্তর প্রশ্ন জাগে, অবরোধ টিকবে তো ? দূর থেকে সেই অবরোধ পাহারা দিচ্ছে মুক্তিবাহিনী।...বারুদের মুখে আগুন লাগল বলে! পরিবেশটা তেমনি বিস্ফোরণমুখী।
জাতীয় সঙ্গীত না বাজিয়ে বেতারের তৃতীয় অধিবেশন বন্ধ হয়ে গেছে।
আমি ভয়ার্ত মনে হন্যে হ'য়ে একটা রিক্সা'র কথা ভাবছি। গাড়ি তো পাওয়ার সুযোগ নেই, বাধা ডিঙিয়ে তবু কোনোমতে রিক্সাকে টেনে নিয়ে যাওয়া যাবে।—আমাকে অনেক দূরে, মতিঝিল পেরিয়ে বাসাবে৷ অব্দি যেতে হবে। অদ্দর হেঁটে যাওয়া, কিংবা হেঁটে যেতে ভয় করছে।
লোকগুলো সব মরে গেল না কি এক নিমেষে !
আমি অনবরত চিন্তা করছি হেঁটে যাওয়া যাবে কি না। বন্ধু-বান্ধব সবাই আজ গেল কোথায় ? প্রেস-ক্লাব কি বন্ধ ? সেখানে যাবো কি না আবার দ্রুত ভেবে নিলাম । কয়েক মিনিট। কিন্তু যেন কয়েক লক্ষ সেকেণ্ড ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত । এই ভাবে যেন অনন্ত সময়ের হনন চলল ; রাস্তার নিস্তব্ধতায়, ফুটো ফুটে৷ আকাশে, নিরিবিলি এবং নীরব পত্রগুচ্ছে, 'রাস্তার অন্ধকার লাইটপোস্টে, গির্জার চূড়ার ক্রুশে, রাত্রিপাত হচ্ছে প্রবল বেগে ; রাত্রিযাত হচ্ছে নিষ্ঠুর' এবং চতুর শত্রুর মত নিরবচ্ছিন্ন এক যোগসাজসে । গত দু'দিন কাজের চাপে বাসামুখো হতে পারি নি আমি, অফিসে রাত কাটিয়েছি, আজ একট৷ কিছু ঘটতে চলেছে এরকম ইঙ্গিত বেতার অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে আছে। এখন সেই নানান চিন্তার পর্বত-প্রমাণ এক বোঝা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসামুখো চলছি, সারি সারি ইমারত ফেলে, বন্ধ রেস্তোরাঁ, হ্যাপি মটরিং ছবি, বাসে ওঠার কিউ—হাই কোর্ট ভবনকে মনে হচ্ছে রূপকথার হাজার-দুয়ারী রহস্যময় প্রাসাদ ।
সহসা একটা সাইকেল-রিক্সা দ্রুতবেগে আমাকে কেটে চলে যাচ্ছে দেখে আমি চীৎকার করে তার পেছনে ধাওয়া করলাম। সে আরো বেগে, আরো দ্রুত ছুটল । কিন্তু আমায়-যে তাকে ধরতেই হবে! এভাবে আমাকে পাগলের মত ছুটতে দেখে সে কি ভেবে–হয়তো কিছু না ভেবেই—থামল ৷ খবর : শহরে সৈন্য নেমেছে সাব, সরে পড়ুন, এক্ষুণি এদিকে এসে পড়বে। তাদের আছে কামান, বন্দুক, ট্যাঙ্ক, আরো কত কি...
: বল কি ? সৈন্য নেমেছে? কোথায় ? কতদূরে ? - আমার মাথা গুলিয়ে গেল, এ কি হ'ল, এ যে আমি ভাবতে- তুমি কোনদিকে যাবে ভাই, জলদি আমাকে নিয়ে চল !
: পারব না সাব। আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে, পথে পথে বাধা, আপনাকে নিয়ে যাব কী করে। না, আমি নিতে পারব না - হাঁপাতে হাঁপাতে রিক্সাঅল৷ কথাগুলো বলে ফেলল । বললাম : তুমি যেখানে যাও আমাকে নিয়ে চল, তোমার সঙ্গেই থাকব আমি। বাধা ডিঙিয়ে দু'জনে রিক্সা টেনে নেব । - তোপখানা সড়ক, মতিঝিল, কমলাপুর ছাড়িয়ে বাসাবো... এত সব কথা সংক্ষিপ্ততম সময়েই শেষ হয়েছে। রিক্সাঅলা আমাকে নাছোড়বান্দা দেখে কিংবা করুণাবশতই হোক, তুলে নিল ; তখন আশ্চর্য তেজোদীপ্ত সেই অচেনা রিক্সাঅলার গামছা বাঁধা মাথাটি আমার সামনে এক দৃপ্ত বিজয়ীর মতো উন্নত এবং উদ্যত। কিন্তু কদ্দূর গিয়েই বাধা । আর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে গাড়ির ঘর্ঘর শব্দ রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিল । তক্ষুণি সে রিক্সা ফেলে দৌড় দিল, আমার সঙ্গে একটা কথা বলা কিংবা একবার ফিরেও তাকাল না। নিশ্চল রিক্সা, অপসৃত রিক্সাঅলা, ভৌতিক শহর, সৈন্যগণ, নির্নিমেষে দ্রষ্টব্য অট্টালিকা — প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাজ করল। আমিও দৌড়ে প্রেস ক্লাবের চত্বরে আশ্রয় নিলাম । ভরসা, সেখানে যদি কাউকে পাই ! কিন্তু কোনো সাড়া নেই ৷ কিছুক্ষণ পর অনেক খোঁজাখুঁজিতে চেনা দারোয়ানকে পাওয়া গেল, কিন্তু কোনো খবরই সে দিতে পারল না, শুধু এইটুকু জিজ্ঞেস করল : আপনি কোথায় যাবেন ? এখন তো কেউ নেই । দরজা খুলে দেব ? বরং পালিয়ে যান...। কেউ-ই নেই ! কিন্তু যাব কোথায় ? গাড়ির অর্থাৎ সামরিক ট্রাক ইত্যাদির শব্দ একদম এগিয়ে আসছে, ঐ বুঝি দেখা যায় !
যদি আসেই — এখানে আশ্রয় নিলাম, পরে যা হবার হবে, আপাতত এখান থেকে নড়ছি না—বুকের ভিতর দুরু দুরু কম্পমান একট বল যেন অবিশ্রাম লাফাচ্ছে, অবিরাম একটি নৌক। ঢেউ-এর আঘাতে কাঁপছে, কাঁপছে। আমার কি যেন হয়ে গেল, দারোয়ান দরজা খুলে দিয়ে কি যে বলে গেল কিছুই শুনিনি। আমার সামনে পেছনে একটি মাত্র শব্দ শুনছি—আশ্রয় ।
প্রেস-ক্লাবে সাময়িক আশ্রয় নেয়া ভাল মনে করলাম; রাস্তায়, যে-কোনো সময় কিছু একটা ঘটে যাবে বলে আমার মন বারবার বলছে, তাই তার চেয়ে মাথা গুঁজবার একটু আশ্রয় চাই। আমি অন্ধকার দরজার দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবার আগেই দুটে। মিলি 'টারি' কনভয় শব্দ করে প্রেস ক্লাবমুখে। হয়ে থেমে গেল। আমি একটু মাত্র দেরি না করে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ না করে সোজা দোতালায় উঠে গেলাম। আমি জানলার ফাঁক দিয়ে হেডল। ইটের তীব্র আলোতে রাস্তা দেখলাম । তোপখানা সড়ক।
তোপখানা সড়ক ৷ ধূ ধূ এবং ম্রিয়মাণ ।
কনভয় ইউসিসের সামনে। সমস্ত এলাকাট। অন্ধকার, শুধু ইউসিস আর বি. আই. এস.-এর কয়েকটি আলো ছাড়া ।
খট খট, শব্দে কয়েকজন ক্রুর সৈন্য নামল। হাতে তাদের স্বয়ং- ক্রিয় মেশিনগান । ওরা খানিক ভেবে ইউসিস থেকে একটা তার নিয়ে রাস্তার লাইট-পোস্টের তারের সঙ্গে যোগ করে দিল। সমগ্র রাস্ত। আলোকিত হয়ে গেল ৷
সৈন্যদের গতিবিধি সন্ধানী। প্রেস ক্লাবের দিকেই তাদের দৃষ্টি । তারপর দুটো বড়ো কনভয়। ট্যাঙ্ক ..
বাপস, । এইবার সমস্ত গুলিয়ে দেবে। সমস্তই। আমি জানালা ছেড়ে ঘরের ভেতর চললাম, বিপদ ঘনিয়ে আসল ভেবে। চারদিকে বিদ্ঘুটে অন্ধকার', অন্ধকার হাতড়িয়ে চেনা দেয়াল-দরজা ইত্যাদি অনুমান করে বাথরুমের দিকে পৌঁছার আগেই দুনিয়া-কাপানো শব্দ হ'ল গুড়-গুড়-বুম্, বুম বুম্। পলকে একরাশ বাতাস তাড়িয়ে বালি-ইট-প্লাস্টারের গুঁড়োর ঝড় বয়ে গেল, সমস্ত ঘরটি কেঁপে রাত্রির নিস্তব্ধতাকে আরেকবার ভেঙে চুরমার করে আবার শব্দহীনতায় উধাও হয়ে গেল ৷ আর ভয়জড়ানো চোখের ফাঁকে দেখলাম উত্তরের দেয়াল ভেদ করে কামানের গোলা পূব দেয়ালে বাধা খেয়ে ছাদ ফুটো করে চলে গেছে । একটা বিরাট গহ্বর আমার পাশে মূর্তিমান হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল, আমিও চোখ খুলে তাকিয়ে রইলাম আকাশের দিকে। দুই কান রইল নতুন শব্দের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশায়। পায়ের কাছে মেঝে স্তূপ, জঞ্জাল। অন্ধকারে অনুমান করলাম সমস্ত ঘরটির দৃশ্য, বুকের ভেতর একটি একটি পাঁজর নরম হয়ে যাচ্ছে অনবরত, মাথার ভেতর করোটির খাঁজে খাঁজে শির শির করছে বোধ হ'ল। তাড়াতাড়ি আবার গোলাবর্ষণের আগে ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি ভেঙে নীচের তলায় নেমে যাওয়া ঠিক করলাম । নেমে যাচ্ছি। সিঁড়ির হাতল মাঝে মাঝে গেছে উড়ে; অন্ধকারে, ভয়ে ভয়ে, আন্দাজে, নামতে নামতে যেন পাতালে নেমে যাচ্ছি। আমি একা মৃত্যুর রাজ্যে চুপিসারে ঢুকে পড়া একটি প্রাণী নিঃশব্দে ঘোরাঘুরি করছি, আর সেই পুরীর দেয়াল, আসবাবপত্র, দরজা-জানালা, লোহার শিক আমার শরীরে মৃত্যুর নিঃশ্বাস ফেলছে অবিশ্রাম। কাঁপা কাঁপা পায়ে যেন ঠাণ্ডা সাপের স্পর্শ চলছে অবিরাম, অন্ধকারে মৃত্যুর মহড়া শুরু হয়ে গেছে বহুক্ষণ আগেই ৷
নেমে যেতে যেতে নীচের হলঘরে যখন পৌঁছালাম, দেখি খোলা দরজার সামনে সেই দুরন্ত এবং অগ্নিক্ষরা প্ল্যাকার্ডগুলো ভূতের মত নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। যে-সমস্ত ফেস্টুন দু'দিন আগেও ব্যবহৃত হয়েছে, ব্যবহারের পর দরজার সামনে বারান্দায় দেয়ালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, আমার চোখে পড়ল ৷
সেই সমস্ত ফেস্টনের মূর্তিমান বিভীষিকা রাস্তার স্বপ্নালোকে চোখে পড়ল— দু'জন মানুষ একজন আহতকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, নীচে লেখা : আমার ভায়ের তাজা রক্তের বদলা আমি নেবই নেব—আমিও আমার লাশের ছবি দেখলাম । আরো কয়েকটি আছে, আমি সেই সব প্ল্যাকার্ড সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবলাম। সরিয়ে নিলে সৈন্যদের চোখে পড়বে না, তারা এদিকে আসবে না, আমি বাঁচব — আমি বাঁচতে চাই, মৃত্যুর গুহা ছেড়ে আমাকে বাসাবে। যেতেই হবে । আবার ভাবলাম, না, যেমন আছে তেমনটি থাক, কাজ নেই ঝামেলা করে, ওরা যদি দেখে ফেলে ? বরং এখানে কেউ নেই ভেবে তারা ঢুকবে না, তা'হলে আমি নিরাপদ। এই ভাবে কতোক্ষণ কেটেছে জানি না, আমি শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অবিশ্রাম গোলার্ধণের শব্দ, পল্টন ময়দানের দিকে দূরে কোথায় - তার পর ভাবলাম কোন, দিকে যাব, কোথায় একট৷ আশ্রয় মিলবে—একটা আশ্রয়, একটু নিভৃত আশ্রয়, যেখানে কোলাহল করা বারণ হয়েছে, মৃত্যুর ডাক এত পৈশাচিক নয়, যেখানে একটু নিঃশব্দে বসে নিজেকে, অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো একান্ত আপন করে ধরা যায়,- সেই একটুকু আশ্রয় । আমি আবার হাতড়ে দেখলাম, কোথায় যাওয়া যায়, আমি আরেকবার উল্টোসিধা ভেবে নিলাম ৷ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেমন ভাবা যায়, চারদিকে গোলাগুলির শব্দে যেমন একজন মানুষ দ্রুত ভাবতে পারে- যার সামান্য একটি গুলি একজনের পক্ষে যথেষ্ট—সেই দুর্লভ ভাবনার মুহূর্তে, দুর্বল- তার অতল স্রোতে ডুবে স্বজন-বান্ধবহীন নিঃসঙ্গ অবস্থায় আমি সঠিক (?) কর্মসূচী তৈরী করতে চেষ্টা করলাম । দশ রকম চিন্তা- ভাবনা নয়, তারপর একটি স্থির ভাবনা লাফিয়ে লাফিয়ে মস্তিষ্কে খেলা শুরু করে দিল : পেছনের দিকে সংলগ্ন বাথরুমে যাও, মাথা! গুঁজে নিজেকে বাচাও । বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনে৷ বড় চিন্তা নয়,
যুদ্ধনীতি, গণহত্যার চার্টার কে মানল কে মানল না সেই ভাবনাও নয়, এমনকি সৈন্যদের বিরুদ্ধে তীব্র রোষও নয়, শুধু নিজেকে বাঁচাও । একটি নির্নিমেষ ভাবনার, একটি স্থিরসিদ্ধান্তের পরও আমি ফেস্টন-প্ল্যাকার্ডগুলে৷ টানতে গেলাম — অমনি গর্জন, তখুনি বুম বুম বুম্ । মাথা নীচু করে দু'কানে হাত দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম মেঝেতে, তারপর সন্তর্পণে প্লেগ রোগে আক্রান্ত ইঁদুরের মতো টেনে টেনে একদম বাথরুমের দরজায় ৷ বাম হাত ও কাঁধের নীচটায় কি যেন জ্বলে উঠল, সেই কথা সম্পূর্ণ ভাবার আগে সব চেয়ে জরুরী কর্মসূচীর মতো যা চোখে পড়ল —দুটো গভীর এবং ব্যাপক গর্ত হাঁ করে আছে পশ্চিম দিকের দেয়ালে, অন্য আরেকটি বাথরুমের খাণিক পুবে। সেই গর্তের ওপারে এক অপার শূন্যতা হা হা করে নিঃশব্দ চীৎকার করছে, আমার পায়ের কাছে, পিঠে সুড়কি-চুন-বালির সাম্রাজ্য আধিপত্য বিস্তার করেছে, বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। হাতে কাঁধে কেমন যেন শির শির করে ঘাম দিচ্ছে, অন্ধকারে সারা দেহে এক তরল স্রোত বয়ে চলেছে। নিম্নমুখী। মাটির দিকে ঘাম-রক্ত অনবরত ছুটছে, এখন মাটিই বেশি রক্তলোভী। সামনে চলছে এক নিঃশব্দ মিছিল, কোনো কথা নেই, প্রতিবাদহীন প্রেস ক্লাব, অন্যদিকে সেক্রেটারিয়েট। চার দেয়াল করোটি বের করে নির্বাক—একেকটি ইট খসে মাটির তলায় জমা পড়েছে—কতোদিনে মহাস্থানগড় ও ময়নামতীতে রূপান্তরিত হবে...।...অনেকক্ষণ বাইরের দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বুকের নীচে কনুই সক্রিয় করে, হাঁটু জোড়া টেনে উঠতে গেলাম । বাঁ হাত নিঃসাড় । এতক্ষণ খেয়ালে আসে নি। দাঁড়ালাম। বাথরুমের দরজার কপাট উড়ে গেছে ; অন্ধকারে আন্দাজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ সারলাম, কতক্ষণ আগে সেরেছিলাম মনে নেই, প্যান্টের যথাস্থানে ভেজা ভেজা লাগছে ৷ এতক্ষণে ভালো করে খবর পেলাম আমি এখনো বেঁচে আছি, শৌচাগারের গন্ধে একাত্মতা অনুভব করলাম, আওার অয়ার প্রায় ভিজে গেছে। ডান হাত বুলিয়ে অনুভব করলাম বাম বাহুর কাপড় উড়ে গেছে, পিঠেও কাপড় নেই। চটচটে রক্তের ধার নীচে নেমে গেছে, কিন্তু মোটা গেঞ্জির কদ্দূর চুঁ বয়েছে এই মুহূর্তে তা খতিয়ে দেখার চেয়ে বেরিয়ে যাওয়া দরকার।
তারপর সেই চিরপরিচিত অথচ নিঃসঙ্গ ঘর ছেড়ে পেছনের উঠোনে দাঁড়ালাম, কিন্তু গাছের নীচে এবং আড়ালে । ততক্ষণে কনভয় এবং ট্যাঙ্ক ঘর্ঘর শব্দে বহুদূর চলে গেছে, আমি অত্যন্ত নরম এবং ভারি গলায় ডাকলাম : কুতুব !
কুতুব, প্রে'স-ক্লাবের অত্যন্ত চেনা একজন দারোয়ান। আমার ডাক শুনে সেই ছায়ান্ধকার দিয়ে ছুটে এল।
আপনার গায়ে রক্ত !
বলল : এঁরা,
: হ্যা, রক্ত। তাই তোমাকে ডাকছি । পারলে ব্যাণ্ডেজ-জাতীয়
একটা কিছু দাও । বাঁধি। কুতুব এক দৌড়ে ছুটে গেল। রেখা পাতার আড়াল ভেদ
এক গ্লাস জল ।
দূরের একটা বাল্ব থেকে আলোর করে পায়ের কাছে আবছা ছড়িয়ে আছে ; কুতুবকে দেখলাম উঠোনের দক্ষিণ প্রান্তে তাদের থাকার ঘরে ঢুকতে। এক, তিন, পাঁচ, সাত মিনিট ..। কুতুব আসে না। কুতুব সেই ঘর থেকে আর বেরোয় না। আমার ভয়; আমাকে এক অসম্ভব দুর্বল-করা ভাবনা চেপে ধরল, আমি কিছু ভাবতে পারার আগে বসে পড়লাম।
ঘটনা একের নিঠে একে জড়ে৷ হ'ল । রক্ত, পূর্বেকার সমস্ত পৃথিবীটা একবার প্রলয় দোলায় আমার সারা শরীরের ওপর দুমড়ে পড়ল । কিন্তু জ্ঞান হারাবার আগে কুতুর এসে আমার কাঁধে হাত রেখে চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দিল। এক আঁজলা জল, হাতে ব্যাণ্ডেজ করে দিল ডেটল দিয়ে, পিঠের ক্ষতেও লাগাল। আমি বসে বসে কুতুবের দিকে তাকালাম, কুতুব তাকাল। আমি তার হাত ধরে দাঁড়ালাম। বা হাত ঝিম ধরা, দুর্বল, অসাড়। কিন্তু পালানোর এই উপযুক্ত সময়, সৈন্যরা আবার আসতে পারে।
আমি ভাবনা-চিন্ত৷ ফেলে, ভাবনা-চিন্তার চেয়ে দ্রুত ছুটতে লাগলাম। ছুটতে ছুটতে কোথায় থামলাম অন্ধকারে বোঝা গেল না। অনুমান, সেগুনবাগিচার কাছাকছি আছি, কোনো গলিতে। সেগুনবাগিচায় আলী রেজা থাকে, শান্তিনগরে সুপ্রকাশ, চামেলিবাগে মালতী আর বায়েজিদ থাকে। আমি কার কাছে যাব ? বাসাবো যাওয়া একান্তই প্রয়োজন। হাসান এখন কোথায় কার সঙ্গে আছে কে জানে ? সেদিকে অবিশ্রাম বৃষ্টির ছাঁচে গোলাবর্ষণ হচ্ছে, কামান কিংবা মর্টারের শব্দ অবিরাম শুনছি ; একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যিখানে আমি অবকাশহীন ভাবনায় ভাসছি—চতুর্দিকে আগুনের হলকা, আকাশটা ফর্সা হয়ে গেছে, পথঘাট পরিষ্কার দ্রষ্টব্য, স্বল্প-পরিচিত গলিও এখন চিনতে আর কষ্ট নেই। দিকে দিকে সৈন্যদের পরিষ্কার করা রাস্তায় আবার অবরোধ তৈরী করা হচ্ছে। ক্ষিপ্রগতিতে । কতক দামাল ছেলে। বড় রাস্তা জনশূন্য ৷
সহসা বাতাসে সন্ত্রাস ছড়িয়ে আবার কনভয়গুলো এগিয়ে আসছে - দৃশ্যমান রাস্তা ফেলে তার আগেই আমি ছুটে গেলাম ৷ এবার গির্জায় : প্রভু যীশু, তুমি যুগে যুগে যেমন দুঃখীদের কোলে তুলে নিয়েছ; তুমি নিজেও একজন অত্যাচারিত, দুঃখী, তুমি আমাকে তুলে নাও প্রভু। ক্রুশের একেবারে কাছে গিয়ে হেলান দিয়ে দাড়ালাম, গিজার দরজায় বিরাট তালা ঝুলছে। হাসান, সুপ্রকাশ, রেজা, মালতী কিংবা কারো কাছে যাওয়া হ'ল না- প্রভু, আমাকে তুলে নাও। আবার ঝড়ের বেগে গোলা ছুটল, ইতিমধ্যে হাতের ব্যাণ্ডেজ চুঁইয়ে গেছে, পিঠের ক্ষতস্থান ঘামে ভেজা দুপুরের ত্বকের মতো থিথিকে হয়ে গেছে, কামানের গর্জনও সেই মুহূর্তে রাষ্ট্র করল নিজেকে, নিলজ্জের মতো। আরো কিছু শব্দ, ধুলো, বালি, ছাই শরীরে মেখে পাগলের মতো একটা ঘরে ঢুকলাম ; বুম্ করে শব্দ হ'ল ছাদে । আমি হাট-করা দরজা বেয়ে ঘরে ঢুকলাম তার আগেই, একটা কাঠের পাটা স্পর্শ করলাম। সেই স্পর্শে হাত বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত শরীরে প্রবেশ করতেই আরামের নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল, স্পর্শটি পরিচিত, একান্ত এবং মনে হ'ল আমার বহু শতাব্দীর পরিচিত বন্ধু। মালতী, জিদ, হাসান, গুণ-এর প্রবল পরাক্রান্ত বন্ধুত্বের কথা মনে পড়ল। আরো নিবিড় করে ওদের বুকে টানলাম, বাইরে লক্ষ-কোটি রাউণ্ড গুলির সুচির ঝড় বইছে, টলছে ঢাকা শহর, বক্ষ, হৃদয়, এবং বাসাবোর একটি কক্ষের একটি কর্কশ কলিং বেল মিষ্টি সুরে অনবরত বাজছে; আমি আস্তে আস্তে ঐ কাঠের বাক্সের আরো কাছে গেলাম, নিবিড় হাত পাতলাম তার গায়ে। কোনো বঞ্চনা নেই, কোনোরকম প্রতিবাদ না করে কাঠের বাক্সটি আমাকে মায়াবী হাতছানি দিয়ে ডাকল, অন্ধকারে সেই আহ্বান সুরভিত হয়ে আমাকে বিহ্বল করে দিল, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীরে ধীরে ঐ কাঠের বাক্সে চিৎপাত শুয়ে পড়লাম। লম্বমান ৷ মসৃণ কাঠের ঠাণ্ডা স্পর্শে মনে হ’ল একটি কফিনে আমি শুয়ে আছি। তারপর নিবিড় এক অনুভ‚তির মতো কফিনের ঢাকনি মৃদু সঙ্গীতের তালে তালে বন্ধ হয়ে গেল, নাকে লাগল হাজার বছরের প্রাচীন কোনো এক কাঠবাক্সের সুগন্ধ । গোলাপ আর চন্দনের মধুর সুগন্ধ অতিক্রম করে গেল পূর্বের গন্ধকে, যেমন এক বাগান থেকে অন্য ফুলের বাগানে প্রবেশ করলে হয়, আবার প্রাচীনকালের কোনো এক অজানা-অনাম৷ গন্ধ সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিতে লাগল—চারদিকে আর গোলা-বারুদ, যুদ্ধ, হত্যা, ধর্ষণের কোনো চিত্র নেই এবং শব্দও নেই। আছে অনুচ্চকিত মধুর শব্দ করা এক সঙ্গীত, মধুরতম সমাপ্তি-সঙ্গীত গাইছে পৃথিবী : বালক বয়সের জয়ের আনন্দের মতো সমস্ত শরীর-মন পুলকিত, কৈশোরের স্বপ্নের মতো একটি একটি কুঁড়ি ফুল ফে।টাতে ব্যস্ত, যৌবনের স্পর্শের মতো বিভোর এক ঘুম সমস্ত চৈতন্যকে প্লাবিত করে দিচ্ছে—একটি একটি মালতী তাকে চুমুতে চুমুতে খল খল করে ছুটে চলছে, একটি বকনদী গ্রাম চোখের সুমুখে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে বুকে লুটিয়ে পড়ছে, ইছামতি নদীর স্বচ্ছ স্রোত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ধুয়ে দিচ্ছে সমস্ত ম্লানিমা । সেই মধুরতম সঙ্গীতের আবহে কয়েক শো সৈনিক সেই ঘরে ঢুকে সামরিক কায়দায় অভিনন্দন জানিয়ে সাদা কফিনটি কাঁধে তুলে নিল।
সেই সাদা কফিনের মিছিল চলছে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ধরে ৷ রাস্তার দু'পাশের সারিবদ্ধ অট্টালিকা-ইমারত আধুনিক স্থপতিবিদ্যায় নবরূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে, কখনো তিন দেয়ালে, আবার সমস্ত দেয়াল জুড়ে যেন বায়ুপ্রবাহের সুবিধানু যায়ী অসংখ্য ছোটো বড়ো ছিদ্র, কখনো চুড়োগুলো মসৃণ না হয়ে থ্যাবড়া, কোথাও শুধু কয়েকটি স্তম্ভ দণ্ডায়মান, ছাদহীন অট্টালিকা জ্যোৎস্না-রৌদ্রের অপরূপ স্বপ্নখেলায় বিভোর, কিছুক্ষণ পূর্বেকার মারমুখো মেশিনগান এবং কামানের মুখগুলো সাদা কফিনের সম্মানার্থে অবনত, সৈন্যরা অভিবাদন জানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দু'পাশের অসংখ্য গাছ লাল লাল থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়া ছড়াচ্ছে। একটি ধবধবে রাত্রির নিস্তব্ধতা বেয়ে ভেসে চলছে একটি সাদা কফিন ৷ ·
[লেখকের বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে]
লেখক পরিচিতি : বিপ্রদাশ বড়ুয়ার জন্ম চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইছামতি গ্রামে, ১৯৪০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি শিশু একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন এবং সহকারী পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন।


0 মন্তব্যসমূহ