মাহবুব আলীর গল্প : ক্ষমতা


আজ অনেকদিন পর বেরোল হাশিম। আকাশের সূর্য আর কিছু সময় পেরিয়ে মধ্যভাগে উঠে যাবে। সেই রাস্তা, শপিংমল, বিবিধ দোকানপাট, নৈর্ঋত কোণের উঁচু পান-সিগারেটের টং প্রায় একইরকম আছে। একটু যা এদিক-ওদিক। বাহাদুরবাজার মোড়ের পুব-দক্ষিণ কোনায় মিষ্টির দোকান আর রেস্তোরাঁ। আজও জয়ন্ত ঘোষ বসে আছে। টাইটফিটিং সার্ট। বুকের উপরে বোতাম দুটি খোলা আগের মতোই। কুচকুচে কালো ভুঁড়ির অনেকখানি বেরিয়ে আছে। লুঙ্গির এখানে-ওখানে চিটচিটে ময়লা দাগ। চেহারায় নির্বিকার দৃষ্টি। হাশিম দূর থেকে সব দেখে নেয়। সেই আগে যেমন দু-চোখ চারিদিক ঘুরিয়ে নিয়ে রাস্তার পশ্চিমে দাঁড়ায়। পেছনে বিশাল কসমেটিক্সের দোকান থেকে মন-মাতাল সুবাস বাতাসে মিশতে থাকে। কোনোদিন বিহারি আযম খান পুবদিকের ফুটপাতে বসে। একটি কড়াইয়ে জ্বলে কয়লার আগুন। ভুট্টা পোড়ানো হয়। হাশিম সব দেখে রাখে। তখন তার আঙুলের ফাঁকে গোল্ডলিফ জ্বলত। আশপাশে সতর্ক দৃষ্টি নেচে বেড়াত। তারপর ধীরপায়ে হেঁটে যাওয়া। কাজ আছে। এখন কোনো কাজ নেই। আজ অন্য দিন। পুরোনো অনেক অভ্যেস মুছে গেছে। এখন ঠোঁটে সিগারেট নেই। চোখের কোনায় নেই সেই দিনকাল। সবকিছু তবু মনে পড়ে। ছায়াছবির মতো কত দৃশ্য কত ঘটনা। সত্যি কি মুছে ফেলা যায়? মন শুধু কেমন কেমন করে।

অনেকদিন, দিন নয়...মাস, প্রায় ছয়-সাত মাস পর রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। অবশেষে বাধ্য হলো। অনেক তো দিন পেরিয়ে গেল, আর কেন বসে বসে ভাত গেলা? ভাতের অনেক দাম। মায়ের বুকের দুধের চাইতেও। আহা মা আজ তিন মাস হয় চলে গেছে! মা মরার শোক চোদ্দো বছর। বাবার যাওয়ার কত বছর হলো? হাশিমের যে জনম জনম চলে যায়। কয়েক বছরেই জীবন-অস্তিত্ব আর বেঁচে থাকার তেপান্তর সীমানা কাছে এসে গেল। আহা সেই সত্য হোক! সে একবার ডানে তারপর বাঁয়ে তাকিয়ে রাস্তার মধ্যখানে এসে দাঁড়ায়। কুরিয়ার সার্ভিসের বিশাল কনটেইনার গাড়ি চারপাশ অন্ধকার করে দক্ষিণে এগিয়ে যায়। হাশিমের দু-চোখে আচমকা অদ্ভুত আঁধার। কয়েকটি চেহারা। মানুষের মুখছবি কত কথা বলে। সকল কথা? কথা নয় বাক্যবান। সে একটা সময় ছিল বটে। অনেক ক্ষমতা অনেক দাপট। কোথায় গেল? হাশিম ছোট এক শ্বাস নিয়ে সামনে এগোয়। সময় এগিয়ে যায়। মন পেছনের দিনকালে পড়ে থাকে। হায় মন...পোড়া মন!

‘কি রে হাশিম, কেমন আছিস?’

কোনো এক ছায়া পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করে বসে। সেই স্বরধ্বনি আন্তরিক-অকৃত্রিম কিংবা কৌতূহল-শ্লেষ কিছু বুঝতে পারে না হাশিম। কিংবা কে জানে অনেককিছু জানিয়ে যায়। সে একপলক দৃষ্টি তুলে ধরে। মুন্‌না। তার দু-বছরের জুনিয়র। পার্টির মিটিং-এ, মিটিং-এর বাইরে কোনোদিন ‘বস’অথবা ‘স্যার’ছাড়া কথা বলেনি; আজ কত সহজে ‘তুই-তোকারি’করে গেল।

বাজারে প্রবেশমুখের সবকয়টি গলির সামনে আবর্জনা জমে আছে। নর্দমার ময়লা, বাজারের ভেতরের বর্জ্য, হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগলের রক্ত আর ব্রয়লারের বিষ্ঠা, মাছ বহনকারী পিকআপের ফেলে দেওয়া জল; সব মিলেমিশে একাকার। বোঁটকা দুর্গন্ধে বমি আসে। হাশিম আগের মতো এক ঝটকায় ডানহাত নাকের কাছে আনতে গিয়ে থমকে পড়ে। চোখদুটো কি অকারণ ঝাপসা হয়ে ওঠে? কে জানে...হয়তো অথবা তেমন নয়। সব তার দোষ। কপালের ফের।

উনিশ শ সাতাশি। বছরের শেষদিকে আকস্মিক বন্যা। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, অথচ তেমন বৃষ্টি-বজ্রপাত নেই। কোনোদিন দিনভর ঝিরঝির ঝরছে এই যা। ওতেই শোনা গেল বন্যা। দেশের এখানে-ওখানে বানের পানিতে বাঁধ ভেঙে গেছে। মানুষজনের ঘরদোর ভেসে যায়। তারা আশ্রয় নেয় বাঁধে। সেই বাঁধ ভেসে যায়। জেলা প্রশাসন বিপন্ন মানুষের জন্য আশ্রয় শিবির খুলে ত্রাণ-পুনর্বাসন কাজ শুরু করে। সকল আলোচনার কেন্দ্র...কেউ এমন বন্যা দেখেনি। বৃষ্টি শুধু নয়, ভারত ফারাক্কার গেইট খুলে দিয়েছে; যোগ হয়েছে পাহাড়ি ঢল। হাশিম তখন কী করে? শহরের সবচেয়ে দুর্বল স্কুলের ফোর-ফাইভের ছাত্র। বড়ভাই ঢাকায় চাকরি করে। বাড়িতে বাবা-মা, ছোটবোন আর সে। মোট চারজন মানুষ। লিলিমোড়ের বেশ খানিকটা দূর দক্ষিণে ছোট একটি টেইলরিং দোকান। নিজেদের দোকান নয়, পপুলার ক্লথ স্টোরের মালিক দয়া করে এককোনায় বসতে দিয়েছে। বাদশা মিয়া সেখানে পুরোনো এক মেরিট মেশিন নিয়ে সারাদিন কাজ করে। খট-খটা-খট-খট শব্দে সেলাই হয়। বেডশিট-মশারি-লুঙ্গি আর ছোটখাটো কাজ। হাশিম জানে, বাবা অনেক রাতে ঘরে ফেরে। কোনোদিন চোখে-মুখে ক্লান্তি অথবা হা-হুতাশের খেদ নেই। সকলের তিনবেলা ডালভাত একরকম জুটে যায়। কোনো মাসে বড়ভাই দুই-তিনশ টাকা মনিঅর্ডার করে। দিনকাল মন্দ ছিল না।

বন্যায় অনেক মহল্লা ডুবে গেল। কাঞ্চন কলোনির আশপাশ থেকে পানি চলে এলো হঠাৎপাড়া। সেই পানি আর নামে না। মানুষজন হাঁটু পানি মাড়িয়ে চলাচল করে। সেখানে রাস্তার দক্ষিণপ্রান্তে তিনখানা ঘর। একটি টিউবওয়েল সীমানা সংকেত। কামরাঙা গাছ। তিনহাত পর ডোবা। বিবিধ আবর্জনায় সবসময় বিদঘুটে গন্ধ। বাদশা মিয়া ভোর-সকালে দোরগোড়ার বারান্দায় ফযরের নামাজ শেষ করে। মা উনুনে ভাত চড়ায়। তারা চারজন গরমভাত, আলুভর্তা কি ডিমভাজি আর যদি রাতের কিছু বাসি তরকারি থাকে বসে যায় খেতে। ছন্দময় দিনযাপন। আকস্মিক বন্যায় সব বেসুরো হয়ে গেল। একরাতে পশ্চিমের ঘর ধ্বসে সব উদোম। আকাশে মেঘ-রোদের লুকোচুরি। বাহদুর বাজারের রাস্তা জলাবদ্ধ। অনেক ধীরে পানি নেমে যায়। প্রায় দোকানে কোনো ব্যবসা নেই। বাদশা মিয়া কয়েকদিন বারান্দায় আধভাঙা ইটের উপর টেবিলে মেশিন সাজিয়ে বসে থাকে। যদি কোনো কাজ জোটে। কোনো কাজ নেই। হাশিমের স্কুল ত্রাণশিবির। লঙ্গরখানা খোলা হয়েছে। একবেলা দেখে এলো সে। মানুষজনের কান্না বিষাদ চেহারা। চিৎকার হট্টগোল। এরমধ্যে চলে খিচুড়ি রান্না। অবশেষে যে যার মতো গামলা-থালা নিয়ে লাইন। সাহেব মানুষেরা বড় মগে করে তুলে দেয়। মানুষের ক্ষমতা-অক্ষমতা-লজ্জা ধরা দেয় চোখে। কোনো প্রতিক্রিয়া দিগন্তে ভাসে না।

বাদশা মিয়ার বাড়িতে রান্না হয়নি সেদিন। আয়-রোজগার নেই। বাজার বন্ধ। সন্ধে থেকে প্রায় উপোস। এমন কষ্ট-বিপদের উপর আরও বিপদ। একটু রাত হলে দু-জন মানুষের কাঁধে ভর করে ঘরে আসে বাদশা মিয়া। মাথাব্যথা-জ্বরে কাহিল। সেই রাতে কাঁপতে কাঁপতে জ্বর আরও বেশি। হাশিম দেখে। সারাদিন খাওয়া নেই। রাত কেটে গেল তেমন। পরদিন বাবা শুকনো মুখে কোনো অলীক ভরসায় ঘর থেকে বের হয়ে যায়। কারও কোনো কথা শোনে না। এক-আধঘণ্টা পর পুনরায় ফিরে এলো। মাথা টলমল। বাবার জ্বর বেড়েছে। হাশিম দ্বিতীয়বার শিবিরে উপস্থিত। দুপুরের রোদে হাতে ছোট এক গামলা। যদি কিছু খিচুড়ি পাওয়া যায়। সে লাইনে দাঁড়ায়। মানুষ একজন একজন করে সমানে এগোয়। হাশিমের ভাবনা পেছনে পড়ে থাকে। তারপর ঘরে এসে বাবার মুখে সামান্য খাবার তুলে দেয়। জীবনের প্রথম প্রাপ্তি প্রথম সুখ। বাবা পরদিন চলে গেল। আর আশ্চর্য সেদিন চমৎকার উজ্জ্বল সকাল। আকাশদিগন্ত জুড়ে সূর্য পাখা মেলে দিয়েছে। আঙিনার কোনায় কয়েকটি মালতি ঝাড়। সাদা-গোলাপি ফুল। সেখানে খাটিয়া শুয়ে থাকে। সাদা কাপড়ে ঢাকা একজন মানুষ। তার আধখোলা চোখ কি সেই সূর্য দেখতে পায়? হাশিম জানে না। পরিবারে একটি মানুষ চলে গেলে অনেক ভাঙচুর হয়, এতে কারও চোখে অন্ধকার-বিষাদ নামে; পৃথিবীর কারও কিছু যায় আসে না। দিন দিনের মতো চলতে থাকে। মানুষ সকল কাজে কাজের মতো যোগ দেয়। বড়ভাই এসে দাঁড়ায় আঙিনায়। ঢাকায় বিয়ে করেছে জানা গেল। বাবা কি জানত? ভাই কি কাউকে জানিয়েছিল? বাবাকে? বাবা খুব ভালোবাসত তাকে। এবং ভরসাও। মানুষটি বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন হিসেবে বড় আস্থা রাখতে পারে। একদিন পর চলে গেল বড়ভাই। তেমন কোনো কথা বলল না। কীভাবে চলবে এই কয়জনের আহার? হাশিমের পড়ালেখা? মুন্‌নির? কেউ কেউ এভাবেই আপনজনের সকল আশা-প্রত্যাশা-ভরসায় কোনো অর্থ খুঁজে নেয় না। সবকিছু এড়িয়ে সীমারেখা টেনে দেয়। জগৎ এমনই।

এরশাদ সরকার পতনের তুমুল আন্দোলন চলছে। স্বৈরাচার শাসনের নয় বছরের ভিত্‌ টলায়মান। শহরের এখানে-ওখানে মিছিল আর মিছিল। হাশিম স্কুলে পড়ে না। শেষ বইগুলো ঘরের কোন্‌ তাকে কী অবস্থায় পড়ে আছে নাকি উঁইপোকা কেটে শেষ করে দিয়েছে, দেখার ফুরসত নেই। এরপর বেঁচে থাকার ঘুণপোকা কত রূপে সাজিয়ে দেয় তাকে। কখনো হকার। মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয় দেশ-বিদেশের খবর। সে কেমন আছে, কীভাবে বেঁচে আছে; কেউ কোনোদিন শুধিয়েছে কি? সকালের কাগজ ঘরে ঘরে পৌঁছে হোটেলের কাজ। কোনো ফাঁকে একপলক হঠাৎপাড়া। মুন্‌নি কি স্কুল থেকে ফিরেছে? মায়ের অসুখ কেমন? এইসব দিনরাত্রির বিবিধ রূপান্তর কুশীলব থেকে অনেককিছু শেখা...অনেকখানি জানা। এরই মধ্যে একদিন ককটেল ছুড়ে দেওয়ার কড়কড়ে নোটের কাজ এসে যায়। সে ককটেল মেরেছিল। অনেক শান্তি আসে মনে।

কোনোদিন হোটেল থেকে ফিরে মুন্‌নির খাতার পাতা ছিঁড়ে চিঠি লেখে। অনেক ভেবে ভেবে কথা সাজায়। তারপর কোথায় পাঠাতে হবে? সেই ঠিকানা নেই। অচেনা ঠিকানার খোঁজে কোনো কথা পৌঁছে না। বড়ভাই কত সহজে ভুলে গেছে তাদের। মা বলে, ‘তোর বাইকে পত্র দিছস? নিশ্চয়ই সে আইব।’
‘হ মা বাইজান আইব।’

হাশিম জানে যে মানুষ মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়, সে শুধু যাওয়ার; সে আর ফেরে না। বড়ভাই ফিরবে না। তারপরও এখানে-ওখানে ঠিকানার খোঁজ নেয়। কোথাও পাওয়া যায় না। সে মানুষ নিজের সকল চিহ্ন মুছে দিয়ে চলে গেছে। তার পথরেখাও আজ বিলীন। ঠিকানা কোথায়?

একদিন রাতে তুলে নিল পুলিশ। মাস্তান দমন আইন কার্যকর হয়েছে। শহরের রাস্তায় অলিগলিতে মানুষের ফিসফিস কথাবার্তা। কখনো পুলিশভ্যান আচমকা সড়কের মধ্যখানে থেমে যায়। একে-ওকে তুলে নেয়। দেশে কোনো মাস্তান থাকবে না। সন্ধেরাতে সেও দেখে নিল চোদ্দো শিক। হোটেলের কাজে চকবাজার যেতে এই ঘটনা। কেউ জানল না...কেউ ভাবল না। হাশিম ছোট্ট ঘরের এককোনায় দাঁড়িয়ে ভেবে নিল এও এক পরীক্ষা। ঈশ্বরের পৃথিবী। তখন শুধু ঝুপড়ি ঘরের ছায়ান্ধকারে দু-জন মানুষ কেমন আছে...কেমন থাকবে এই ভাবনা কাতর করে। পাহাড়পুরের কোন্‌ ভদ্রলোকের বাড়ির ডাব চুরির মামলায় চালান হলো সে। তার বয়স ষোলো। কয়েকদিনের জেল। সেই বেহিসেবি দিনগুলো ঘুরিয়ে দিল জীবনের গতিপথ। দেখতে পেল জরদার কৌটোয় বাহারি টেপ আর কারুকাজ গ্রেনেড। আবুল কালাম বলে, ‘শোন্‌ মিছিলের মধ্যখানে মারবি না, সাইডে, বুঝলি? পারবি তো?’
‘খুব পারুম।’
‘আর দেখ কেউ যদি ধরে ফেলে, মারধর হবে...।’
‘আমি কিচ্ছু কমু না। স্যার একডা ফাটব এ্যাকশ ট্যাহা কিন্তু।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ পাবি।’
‘এ্যাহন কিছু দেন। অ্যাডভান্স।’

হাশিম দুই শত টাকা নিয়ে আগে পত্রিকা অফিস। সেখানে একে-ওকে চা আর পেঁয়াজু বড়া খাইয়ে আসে। রহমান, নিউজ এডিটর, চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কি রে হাশিম তুই নাকি পলিটিক্সে নাম লিখিয়েছিস? কোন্‌ দল?’
‘কি যে কন স্যার? আমার আবার পলিটিক্স! প্যাডে নাই ভাত আর সাতমাতারি ফুটানি।’
‘হা হা হা! যা বলেছিস, আ রে, এখানে তারাই তো পলিটিক্স করে, যাদের পেটে ভাত নাই আর যাদের ভাতের চিন্তা নাই। যাক একটা উইলস্‌ এনে দে বাবা। এই নে টাকা।’
‘ট্যাহা লাগব না স্যার।’
‘বলিস কি! না না টাকা রাখ।’

হাশিম একদৌড়ে সিগারেট এনে দেয়। কাউকে খাওয়াতে বড় ভালো লাগে। ধোঁয়া খেতে কেমন? সে তারপর বাইরে গিয়ে নিজের ঠোঁটে সিগারেট ধরায়। প্রথমবার। বেশ উত্তেজনা। চোখে চাপা জল এসে যায়। খুক খুক কাশি। আহ্‌ জীবন! তারপর হেঁটে হেঁটে সেই বারান্দা। বাবা বুঝি খট খট করে মেশিন চালায়। বারান্দার মেঝেয় ছড়িয়ে আছে নীল মশারি। চোখে কি কিছু উড়ে এসে পড়ল? সন্ধে কেমন ঝাপসা হতে থাকে।

আজ অনেকদিন পর বাহাদুর বাজারের রাস্তায়। সেই বারান্দা নেই। সুউঁচু মার্কেট উঠছে। সে কোথায় যাবে? কোথায়? দিনে দিনে কতদিন পেরিয়ে এলো। সোজা রাস্তার পথ ছেড়ে অলিগলি বাঁকা পথ। কয়েকবার জেল খেটে আশপাশে নামডাক হয়েছে। মানুষজন ভয় করে। ভক্তি দেখায়। হাশিম জানে এই হলো ক্ষমতা। তারপরও শান্তি নেই। এরশাদ সরকারের পতন হলো নব্বইয়ে। বিএনপি সরকার। তারপর এই যে দিনকাল চারিদিক শুধু নৌকা আর নৌকা। এই সময়ের দীর্ঘ দিনরাতে ককটেলের পর হাতে এলো কতকিছু। কত রূপান্তর।

মোহনপুর বর্ডার। বনগাঁ গ্রাম। আমিন সরকারের সঙ্গে সকালে মটরসাইকেলে যায়। বিকেল অথবা সন্ধের আগে আগে ফেরা। দশটি বোতল এনে দিলে বসে বসে এক-দেড় হাজার টাকা। কে কাকে ধরে? কোন্‌ মালি কার বাগান পাহারা দেয়? একদিন একজন স্যার এলেন। তখন হঠাৎপাড়ায় তার ঘরে কারেন্ট এসেছে। শো-কেসের উপর রঙিন টেলিভিশন। তিনি রং ঝলমল ছবিতে চোখ রেখে কত কথা বলেন। সারা ঘরে দামি সিগারেটের ধোঁয়া আর ধোঁয়া। মুন্‌নি চা আর বিস্কুট এনে রাখে। মানুষ সরাসরি চোখে তাকায়। বুকের ওপর। সেই দৃষ্টির ভাষা বোঝে হাশিম। এরমধ্যে পিয়ারির সঙ্গে যে একটু ভাব হয়ে গেছে। সে কিছু বলে না। বলতে পারে না। তিনি নাম-ঠিকানা চান। হাশিম কী করে? দিন-দুয়েক পর স্পট দেখিয়ে দিল। এরা এরা কারবার করে। পুলিশ ধরে নিয়ে গেল তাদের। হাশিমের মনে কখনো স্বস্তি কখনো আশঙ্কার টানাপোড়েন। যা ভেবেছিল তাই। এক-দেড় মাস পর দিনদুপুরে চার-পাঁচজন প্রচণ্ড মার দিল। সে তাড়া খেয়ে দৌড়ে মার্কেটের অন্ধকার কোনায় লুকোয়। অন্ধকার কোথায়? তারা সেখান থেকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় ফেলে। তার হাত ভেঙে দিল। চোখ-মুখ-নাক ফুলে ঢোল। নাকের রক্তে ভেসে যায় সারা মুখ। তারা ক্ষান্ত হয় না। শেষে শাসিয়ে দেয়। দেড় মাসের জেল এতটাই লঙ্কাঝালে পরিপূর্ণ!

‘শুয়োরের বাচ্চা, আর ধরিয়ে দিবি? তুই নিজে কারবার করিস, আমরা তো বলি না; আর ধরিয়ে দিবি? পুলিশ তোর বাপ হয়? মাদারচোদ্‌।’
‘আমি জানি না রে...সত্যি আমি জানি না। আমি বলি নাই। মারিস না রে ভাই মারিস না।’

কে শোনে কার কথা। হাশিম দু-হাতে মাথা বাঁচিয়ে মার খেলো। তারপর কে যে কখন হাসপাতালে ফেলে রেখে গেছে বলতে পারে না। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ড। তারই বারান্দার এককোনায় পড়ে ছিল। রাত দশটায় ছুটে এলো মুন্‌নি। কে খবর দিয়েছে? সে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘বাই...ও বাই ব্যথা? আমি কত্‌দিন কইছি বাই, এসব করিস না।’
‘কান্দিস না রে বইন।’

মুন্‌নি তাকে জড়িয়ে কাঁদে। হাশিমের দৃষ্টি অন্ধকার। সে কিছু দেখে না। সে কোথাও কোনো কথা বলেনি। কে তার নাম লাগিয়েছে? তার খুব ইচ্ছে হয়, একবার জিজ্ঞেস করে; মা কি জানতে পেরেছে? কোনো কান্নাকাটি যেন না করে, কিন্তু বলতে পারল না; কোত্থেকে বিকট অন্ধকার চারপাশ ঘিরে ধরে। সে ডুবে যায়, মাটির নিচে, আরও নিচে আরও গভীরে।

এরপর সত্যি সত্যি অনেক কাজ করল সে। তিনমাস পেরিয়ে গেছে। হাসপাতালে তিন-চারদিন থেকে রেহাই। নিজের ঘরে এলো। মা কোনোমতো উঠে দাঁড়াতে পারে। একটু একটু হেঁটে যায়। মুন্‌নি রান্না করে। হাশিম যত টাকা জমিয়ে রেখেছিল সব শেষ। সাধের টেলিভিশন চলে গেল। তারপর একদিন রাস্তায়। বুকের সবটুকু জুড়ে আগুন জ্বলে। সময় আর সুযোগের অপেক্ষা। কোনোদিন ঘরের দুয়ারে মোটরসাইকেল আসে। এক-দুইজন মানুষ। সাদামাটা পোশাক। কথায় অন্যরকম ধার। তারা চলে যায়। হাশিম সন্ধেয় কথামতো জিপে ওঠে। মাথায় হেলমেট। কে চিনে রাখে? কোথায় কোথায় আগুন লাগায়, সে জানে; একটু কি কমে আসে বুকের আগ্নেয়গিরি উদগীরণ? সে জানে, অথবা জানে না, কখনো অচেনা তৃপ্তির বাতাস ঢেউ বয়ে যায়। এরমধ্যে একদিন বড়ভাই ভাবীকে নিয়ে চলে এলো। চাকরি চলে গেছে। তারা তিনটি ঘরের একটি দখল নেয়। মায়ের জন্য ডাক্তার ডাকে। এতদিন ভুল চিকিৎসা হয়েছে। হাশিম এই অভিযোগ-লাঞ্ছনায় কোনোদিন কোনঠাসা ষষ্টিতলার মোড়ে গিয়ে আড্ডা দেয়। হিট্টু-রাকিব-মুনতাসির আসে। চা-শিঙাড়া-সামুচা চলে। সিগারেটের ধোঁয়ায় বাতাস ভারী হয়। হাশিমের কোনো কাজ নেই। বড় মন্দা সময়। এমনই এক সন্ধেয় শোনা গেল এরশাদ-হিরু-মার্শাল বেরিয়েছে। নেপথ্যে বড় বড় মানুষ থাকলে কেউ কিছু করতে পারে না। জেলের উঁচু দেয়াল আটকাতে পারলেও দরজা খুব সহজে খুলে যায়। একদিন-দুইদিন, তিনদিনের দিন হাশিম আটকে গেল। পাহাড়পুরে কয়েকজন শক্তভাবে পেঁচিয়ে ধরে তাকে। তখন মসজিদে মাগরিবের আযান শেষ হয়েছে। বাতাসে বাতাবিলেবু ফুলের সুবাস। তারপর কী যে হলো, কে কে মারল, কোথায় কোথায় প্রচণ্ড ব্যথা, কিছু মনে নেই; জ্ঞান ফিরে এলে দেখে ডানহাতের কবজি একটু দূরে পড়ে আছে। হাড়ের রং হলদে-সাদা। লোমওঠা এক ঘেয়ো কুকুর টুকটুক দৃষ্টি তুলে কাটা হাতের রক্ত চেটে নেয়। অথবা মাংস। হাশিম পঙ্গু হয়ে গেল। একদা তার কিছু ক্ষমতা ছিল। নিজেকে বুঝতে পারেনি সে।

হাশিম আজ অনেকদিন পর বাজারে এসেছে। মা মারা গেছে তিন মাস হয়। মা মরার শোক চোদ্দো বছর। বাবার সাত। হাশিমের কোনো শোক নেই। একসময় স্কুলে পড়ত। ছাত্র সে খারাপ ছিল না। রেজাল্ট ভালো করত। বাদশা মিয়া আদরে আদরে কত কথা বলে। হাশিম বড় হলে অনেক বড় কাজ করবে। কোনো অফিসার। কত মানুষ তার কাছে কাজ নিয়ে যাবে। অনেক ক্ষমতা। আজ হাশিম হেঁটে হেঁটে নিমনগর-বালুবাড়ি চলে আসে। বাসস্ট্যান্ডে ভিড়। সাত মিনিট পর পর লোকাল বাস। সে কাউণ্টারের সামনে দাঁড়ানো একটিতে ওঠে। এদিক-ওদিক মানুষ বসে আছে। চিপা পরিসর। নিজেকে কোনোমতো গলিয়ে নিতে পারে সে। তার ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে কোনো শোক নেই। চোখের অতলান্ত গহিনে কোনো শুকনো কান্না চাপা পড়ে থাকে কিনা কে জানে। সে একজনের সামনে দাঁড়ায়। নিজের ডানহাতের কনুই বামহাতে তুলে ধরে। কোনো আবদার নেই, কোনো শব্দ; চোখের চাহনিতে লেখা থাকে বেদনার কাহিনি। সেই যাত্রী কি প্যান্টের পেছন পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে আনে? হাশিম জানে বেঁচে থাকার মতো মধুর সুখ কিংবা আনন্দ আর নেই। তার চোখে কী কী ছবি ভেসে আসে? ভেসে ভেসে যায়। আহ্‌ জীবন!

তার দু-চোখ ঝাপসা হয়ে পড়ে সহসা। ·


লেখক পরিচিতি : মাহবুব আলী। রাজশাহি ইউনিভার্সিটি থেকে রাস্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন স্থানীয় এক দৈনিকে সম্পাদকীয় ও সাহিত্য বিভাগ পরিচালনা। বিভিন্ন পায়োনিয়ার উন্নয়ন সংস্থায় ডকুমেন্টেশন, সম্পাদনা, গণযোগাযোগ উপকরণ উন্নয়ন ও প্রকাশনা, প্রতিবেদন, প্রকল্প প্রস্তাবনা, পলিসি ম্যানুয়াল প্রণয়ন, গবেষণা ও কনসাল্‌টেন্সি। শেষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক প্রভাষক। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯টি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ