খর্জুনার পোড়ো রেশমকুঠির এই বানুকটি পাঁচ-সাত মাইল দূর থেকেও চোখে পড়ে। চারকোনা প্রকাণ্ড নিরেট থামের গড়ন বানুকটির উচ্চতা কেউ বলে নব্বুই ফুট, কেউ বলে দেড়শো ফুট। নিরক্ষর জনগণের উচ্চতা মাপার জন্য তালগাছ আছে। তাদের হিসেবে বানুকটি দুই তালগাছ উঁচু। বহু বছর আগে এক ভূমিকম্পে বানুকটি ঈষৎ হেলে যায় এবং সামান্য ফাটল ধরে। কিন্তু ধসে পড়ে না। নীচে থেকে মাথা পর্যন্ত লোহার যে হুকগুলি বসানো ছিল, মরচে ধরে মাঝে মাঝে খসে গেছে, তার আর শীর্ষে ওঠা যায় না। উচ্চতার প্রতি পাগলদের মোহ আছে বলে শোনা যায়। কিন্তু এলাকার কোনো পাগলই সে চেষ্টা করেনি। হুকগুলি অটুট থাকার যুগে যে লোকটি বানুকের শীর্ষে উঠে নিজের জয়গান গেয়েছিল, সে এক মাতাল। তার নাম ছিল গুলাই। এক আকাশবিহারিণী দেবীর বিশ্রামস্থল ওই বানুকশীর্ষে উঠে বেয়াদপি করায় কুপিতা দেবী তাকে লাথি মেরে ফেলে দেন। গুলাইয়ের ছেলে ধর্মধ্বজ। ধর্মধ্বজের ছেলে পাহাড়ু। খর্জুনায় তারা মোটে এই তিনপুরুষ। গুলাই যখন টাট্টুঘোড়ার পিঠে জাঁতা চাপিয়ে খর্জুনার হাটে বেচতে এসেছিল, তখনো শিয়রে বানুক নিয়ে রেশমকুঠির ভাঙচুর দশা। তার জাঁতাবওয়া ঘোড়াটা এখানেই ধুঁকতে ধুঁকতে মারা পড়ার পর সে আর দেশে ফেরেনি। যার জন্য ফিরত, সে তার সঙ্গেই ছিল। সে দুলারি। আর তার পেটে তখন ধর্মধ্বজ। কুঠির অটুট একটুকরো দেয়াল ঘেঁসে গুলাই যে ঝোপড়ি বানিয়েছিল, সেখানেই ধর্মধ্বজের আবির্ভাব। আবির্ভাব, কারণ ধর্মধ্বজের রূপ দেখে হোক, কিংবা অনুশোচনাবশে হোক, আকাশবিহারিণী সেই দেবী তার মায়ায় পড়েন। এর ফলে তার মাথায় বালক বয়সেই গজিয়ে ওঠে জটাজুট। হাটের মালিক কুঞ্জবাবুরা তাকে বেদি তৈরি করে দেন। সেই বেদীতে বসে ধর্মধ্বজের মুখ দিয়ে দেবী ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। হাটবারে খুব পয়সা পড়তো। খুঞ্জবাবুদের নিযুক্ত এক ঢুলি ঢ্যাডাং ঢ্যাডাং করে ঢোল আর তার সিকনিঝরা ছেলেটা কাঁসি পিটতো। বেলাশেষে পয়সা কুড়োতে আসতেন কুঞ্জবাবুদের নিযুক্ত হাটোয়ারি বানারিবাবু। দুলারি আনাচে-কানাচে ছোঁক ছোঁক করে শেষে ঝোপড়িতে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো। অন্য সময়ে ধর্মধ্বজ ন্যালাভোলা বালক। তার একটাই প্রিয় ছড়া ছিল : 'কনি কম্বল লোট্টা/খাইলম বেগনভত্তা।।'
আকাশের দেবী তাকে এই ছড়া শিখিয়েছিলেন। আরো বড়ো হয়ে ধর্মধ্বজ এক হাটবারে ভবিষ্যদ্বাণী করে, 'কুঞ্জ সিংয়ের ছেলে রনো সিংয়ের বউয়ের পেট থেকে হাটোয়ারিজির বাচ্চা বেরুবে আর বাচ্চাটা হবে অন্ধ।' খবর রটে ঢিটি পড়লে রণজয় সিং এসে ধর্মধ্বজের জটাজুট উড়িয়ে দেয়। রক্তারক্তি হয়ে পড়ে থাকে হাটতলায় দুলারির ব্যাটা। বেদি উপড়ে রণজয় রোপণ করে পিপলগাছের চারা। ঝোপড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কী আতঙ্কে বানারিবাবুও পালিয়ে গিয়ে ধুলিয়ানে বিড়ির ব্যবসা ফাঁদেন। পরবর্তী যুগে তাঁর কাজলমার্কা বিড়ির খ্যাতি সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ট্রেনের কামরায় ফেরিওয়ালারা সুর ধরে গাইত :
'বনোয়ারির কাজলবিড়ি খেতে ভুলো না।
একটানেতে যেমন তেমন দুই টানেতে তালকানা।।'
এদিকে রনো সিংয়ের বউ নারায়ণী সত্যিই এক অন্ধ বাচ্চা বিয়োয়। রনো সিং অবশ্য তা দেখার আগেই এক দাঙ্গায় খুন হয়েছিল। খর্জুনার মারদাঙ্গা বাঘা বাঘা দারোগারা বন্ধ করতে পারেন নি। চিরকালের বেহায়া কুঞ্জ সিং অন্ধ নাতিকে কোলে করে ঘুরে বেড়াতেন আর বলতেন, 'দ্যাখ, শালারা! ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখ এর মুখ কার মুখ বসানো।'
মা-ব্যাটা মিলে দুলারিয়া নিপাত্তা হয়েছিল। বছর পাঁচেক পরে ধর্মধ্বজ ফির এসে বানুকের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে আর সবাই ভীষণ অবাক হয়ে দ্যাখে, বানুকের শীর্ষে একফালি লাল ধজা উড়ছে পতপ্রতিয়ে। সে ছিল ঘোরতর শুখার বছর। বর্ষার মাসে মাঠে ধুলো উড়িয়ে বইছিল লু হাওয়া। পুকুর দীঘি মাঠের কাঁদরে জল গিয়েছিল শুকিয়ে। বাজপড়া তালগাছে বসে চাতক পাখিটা জল জল করে গলা ভেঙে ফেলেছিল। সারারাত হাটতলায় নেড়ি কুকুরগুলো ডুকরে ডুকরে কাঁদতো। এক হাটবারে হাট লুট হলো। কুঞ্জবাবুদের ধানের গোলা, রাম সিং লক্ষ্মণ সিং পাটোয়ারির আড়ত পর্যন্ত ধুলিসাৎ করে দিয়ে গেল লোকেরা। ধর্মধ্বজ হাততালি দিয়ে হাসতে হাসতে গাইতে লাগল : 'কপনি কম্বল লোট্টা/খাইলম বেগনভত্তা।।'
বেগতিক দেখে কুঞ্জ সিং তাঁর ছেলের পোঁতা পিপলগাছের গোড়া ঘেঁসে আবার বেদি বানিয়ে দিলেন। ঘগা ঢুলি তার ছেলে খগাকে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে ঢোল-কাঁসি বাজাত এল। আকাশের দেবী হলেন প্রসন্না। সাধু ধর্মধ্বজকে সেই বেদিতে এনে বসাতেই ইশান অগ্নি বায়ু ও নৈঋত জুড়ে উঠে আসতে থাকল দুধেল গাইগোরুর মতো ধূসর মেঘপুঞ্জ, তাদের তলপেটগুলি দেখার মতো ছিল। অমর্ত্য স্তনধারা প্রথমে ঝিরিঝিরি পরে ঝরঝর, শেষে ছড়বড় করে পড়তে লাগল। আকাশের দেবীও ফিকফিক করে হাসতে লাগলেন। সেই হাসির ছটায় স্থির বৃষ্টিরেখার ঝরকা মুহুর্মুহু, আর ভেতরে সাধু ধর্মধ্বজ তার দ্বিতীয় প্রজন্মের জটাজুট নেড়ে বেদিতে দাঁড়িয়ে লম্ফঝম্ফ করে চিকুর ছাড়তে লাগল : 'কপনি কম্বল লোট্টা/খাইলম বেগনভত্তা।।'
সেবার খর্জুনার মাছে নাম্না আবাদ হলো। ধানের গুছি বেশি উঁচু হতে সময় পায়নি। পেটে শিশির ঢুকে শিগগির শিগগির কুমারীর গর্ভধারণের মতো পেটে থোড় হয়ে গেল। তবে ফলন তিন-চতুর্থাংশ হয়েছিল। তাতেই কত মারদাঙ্গা, শীষে শীষে জ্বলজ্বলে রক্ত, বিশটা মোকদমা, তেরোখানা এনকুয়েরি, ডেপুটি সাবডেপুটি সার্কেল অফিসার দারোগার যাতায়াত। কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে নবান্নের ধুমও হলো। জামাইদের আনা হলো। বানুকের হাটতলায় বেহুলার পালা, কেষ্টযাত্রা, জিয়াগঞ্জের মধুবালার কেত্তন, শেষ আসরে বীরভূমের মল্লারপুর থেকে ঝুমুর-মেয়েরাও এসেছিল। রাতদুপুরে ওদিকে পাকুড় সেদিকে নিমতিতা থেকে বোর্ডিংবাসী ছাত্ররা লুকিয়ে চলে এসে মেয়েগুলোর সঙ্গে যথেচ্ছ লেপটা-লেপটি করে যায়। তারা দাঁতে কামড়ে তামার পয়সা ফেলা ধরে। এলোকেশী, চাঁপা, তুফানি, কমলারা মাজা দুলোতে দুলোতে রসের গান গাইতে গাইতে কাছে এসে দাঁতে কামড়ে সেই পয়সা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এক পয়সায় অধরে অধর, দু'পয়সায় কোল, এক আনায় তার ডবল। দু'আনা ধরলে তো আসর পার—বানুকের পেছনে; সেখানে একসার সামনের দেয়াল অনেকগুলি খিলানাকার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। কমাস আগেই তো সেই শূন্য দরজা দিয়ে শূন্য মাঠের নিষ্ঠুর লু বাতাস ধুলোমাখা শরীর নিয়ে ছুটে আসতো। ঝাঁপিয়ে পড়তো হাটতলায়। হাটতলা থেকে রাস্তা বরাবর গ্রামের ভেতর। সেই ভয়ঙ্কর কথা ভুলিয়ে দিতে একেকটি ঝুমুরনাচ ক্লান্ত রুগ্ন শরীরও অনেক বেশি।
তো আকাশের দেবী জানেন মানুষ বড়ো পাঁঠা। তার প্রমাণ সাধু ধর্মধ্বজের মুখে। কথায় কথায় সে তার দ্বিতীয় আবির্ভাবের কালে 'অ্যাই পাঁঠা' বলে ডাকতো মানুষজনকে—তা তিনি স্বয়ং কুঞ্জ সিং হোন, কী রাম সিং বা তাঁর ভাই লক্ষ্মণ সিং পাটোয়ারিজিই হোন। এক হাটবারে সাধু ধর্মধ্বজ হঠাৎ চোখ কটমটিয়ে কুঞ্জ সিংকে বলে ওঠে, 'অ্যাই পাঁঠা! আমি বিয়ে কর্ব।' শুনে কুঞ্জ সিং ভীষণ অবাক হয়ে যান। টের পান, এ বাণী দেবীর বাণী নয়। গুলায়ের ব্যাটার কথা। তিনি মুচকি হেসে বলেন, 'ধজা নাকি রে? বিয়ে কর্বি যে বলছিস, কর্লে তো আর সাধু থাকবি না বাপ। জটাখসে যাবে।' পরের হাটবারে তখন দেবী ভবিষ্যদ্বাণী করলেন গুলাইয়ের ব্যাটা ধজা বিয়ে কর্বে। তার কনে আসবে এই বানুকের তলায়। সেই কনে এখন মায়ের কোলে মাই টানছে।...
এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়েছিল। তারপর লোকে সেটা ভুলেই গেল। এক যুগ পরে শীতের সন্ধ্যায় টিপটিপে বৃষ্টির ভেতর বানুকের হাটতলায় ততদিনে গজিয়ে ওঠা সারবন্দি এক ঝাঁক ঝোপড়ির ফাঁকে খিলানকরা কুঠিঘরের একটা দরজার পাশেই তাড়াহুড়ো লকড়ি পুঁতে চট চাপিয়ে আরও একটা ঝোপড়ি হয়ে যায়। লোকটা ছিল বেজায় বুড়ো। কিন্তু তার হাতে ভেল্কি ছিল। তার নাম ছিল তারাজু। সে ছিল এক চর্মকার। খর্জুনার হাটে ভদ্রতর সর্বশ্রেণীর জুতোপরা পায়ের দিকে তাক করে বসে লোহার 'পাঁওঠিতে' হাতুড়ি ঠুকতো। মরা জুতো প্রাণ ফিরে পেত। ফাঁড়ির সেপাইরা এসে তার পাঁওঠিতে বুটসুদ্ধ পা রেখে গোঁফে তা দিত। তারাজু মানুষের মুখ চিনতো না পা-দেখা স্বভাবের দরুন। তাই তার ভয় ও লজ্জাটা ছিল কম। আর তার মেয়ে কসিলা খেলে বেড়াতো আনাচে-কানাচে! আপনমনে এক্কাদোক্কা খেলতো। নিজের সঙ্গে নিজেই খেলতো বানুকের অন্ধিসন্ধি জুড়ে চোরপুলিশ খেলা। হাটবারে সে হাটুরেদের পসরা-ভ্রষ্ট আনাজপাতি কুড়তো। তার মুখে স্বর্গের কোমল মায়া ছিল। হাটুরেরা স্বপ্নাচ্ছন্ন অবস্থায় আবিষ্টভাবে বলাবলি করত, 'মেয়েটি কে গো? আশা হয়, সে একদিন পৃথিবী কিনবে।' আর বেলার শেষে হাটতলা জনশূন্য হয়ে গেলে কসিলা চুল বেঁধে কপালে ফোঁটা দিয়ে আপনমনে খুঁজে বেড়াতো। অন্তত একচিলতে রাংতা কাগজ। তাদের ঝোপড়িকে অসংখ্য রাংতা আর রঙিন কাগজ দিয়ে সে সাজিয়ে তুলেছিল। মুগ্ধ চোখে সেই সাজগুলি দেখতে দেখতে সে খুব দ্রুত বড়ো হয়ে উঠেছিল। সে ভাবতো, তার বড়ো হওয়ার সঙ্গে রঙিনতার কার্য-কারণ সম্পর্ক আছে।
আর সেই বেদীর শিয়রে রনো সিংয়ের পোঁতা পিপলগাছও ততদিনে বৃক্ষ। পতপত শব্দে পাতাগুলি নাড়া দিয়ে সেই বৃক্ষ হাতছানিতে তারাজুর বেটিকে ডাকত। জনহীন দুপুরগুলিতে তখন কসিলা এসে সেই বৃক্ষের লতা হতো। সাধু ধর্মধ্বজ তাকে দুরের দৃষ্টিপাতে পর্যবেক্ষণ করতো। মাঝে মাঝে কসিলা নামতে না পারার ভান করে চিকুর চাড়লে সে বেদিতে চড়ে দুই হাত উঁচু করত। কসিলা বলত, 'সাধু তোর ঘাড় দে, নামি।' ধর্মধ্বজ বলতো, 'উহু, হাতে হাতে আয়। তোকে পাতে পাতে খাই।' এই ভীষণ কথা শুনেও কসিলা খিখি করে খালি হাসত। শেষে পেছনে ঘুরে ধর্মধ্বজ তাকে ঘাড় দিতে। তখন তার ঘাড়ে পা রেখে কমিলা একলাফে নেমেই উধাও হয়ে যেত। ধর্মধ্বজ তাকে তাড়া করত। খিলানকরা সারি সারি দরজার ভেতর মুহূর্তে মুহূর্তে যাতায়াতাকারী কসিলা যেন এক উজ্জ্বল মাকু এবং ধর্মধ্বজ তন্তুবায়। জীর্ণ বানুকের অলীক তাঁতে এইরকম ছিল মায়াময় বস্ত্রবয়নের খেলা, দিনমান।
বহুদিন পরে এক সন্ধ্যায় কুঞ্জ সিংয়ের বৈঠকখানায় পাত্রমিত্র সভাসদপরিবৃত কুঞ্জ সিংয়ের সামনে তারাজু তার মেয়ে কসিলার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ায় এবং হাউমাউ কেঁদে নালিশ রুজু করে, 'হারামি ধজা সাধু আছে না আমার ইয়ে আছে হুজুর। সে আমার বেটির ইজ্জত লিয়েছে।' সে কসিলার পরনের কাপড়ের ছেঁড়া জায়গাগুলি এবং কয়েকটি টাটকা লাল ছোপও লণ্ঠনের আলোর সামনে তুলে ধরে। আর কসিলার চোখ ছিল ভিজে, নীচের ঠোঁট কামড়ানো এবং নাসারন্ধ্র স্ফীত। তারাজু ক্রমশ ক্ষেপে গিয়ে উরুতে থাপ্পড় মেরে গর্জনময় হাহাকার করতে থাকে, 'হুকুম দিন-শালার জান লিয়ে লিই।' কিন্তু সে খুবই বুড়ো। শেষে ক্লান্ত হয়ে ধপাস করে বসে পড়ে। সাদা মাথাটি দু' হাতে আঁকড়ে ধরে এদিক-ওদিক নাড়তে থাকে।
কুঞ্জ সিং বলেন, 'চল তো দেখি।' পাত্রমিত্র সভাসদবৃন্দ তাঁকে গম্ভীর মুখে অনুসরণ করে। সবার আগে তারাজু কসিলার কাঁধ ধরে ঠেলতে ঠেলতে হাঁটে। পেছনে লণ্ঠন আর ছড়ি হাতে থপথপিয়ে হাঁটেন কুঞ্জ সিং। তাঁর পেছনে অমাত্যবর্গ। হাটতলার প্রান্তে বানুকের কাছে সেই বেদিতে ধর্মধ্বজ দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখদুটি লাল। কুঞ্জ সিং লণ্ঠন উঁচু করে তাকে দেখেন। তখন ধর্মধ্বজ বগল বাজতে শুরু করে। তারাজু ভাঙা গলায় চিৎকার করে ক্রমাগত নিজের গোপন অঙ্গটির সঙ্গে সাধুর তুলনা দেয়। তারপর কুঞ্জ সিং বলেন, 'চুপ চুপ। আগে শুনি। বলরে ধজা, তুই আগে বল।'
ধর্মধ্বজ ফের বগল বাজিয়ে বলে, 'কসিলা আমার বউ! কসিলা আমার বউ!'
সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দিকে শিহরণ ঘটে যায়। লোকগুলি ভীষণ চমকে ওঠে। তাদের মনে পড়ে যায় একযুগ আগের সেই ভবিষ্যদ্বাণী। দেবী বলেছিলেন: 'গুলাইয়ের ব্যাটা ধজা বিয়ে কর্বে। তার কনে আসবে এই বানুকের তলায়।'
তারপর ধর্মধ্বজ লাফ দিয়ে বেদি থেকে নেমে বাঘের শিকার ধরার মতো কসিলাকে ধরে। লোকগুলি মুখবিবরে হস্তপ্রহার করতে করতে ধ্বনি দেয়, 'আ বা বা বা বা!' যা কিনা প্রাচীন রণধ্বনি। আর তারাজু তখন ধর্মধ্বজের ঠ্যাং চেপে ধরলে তার সেই হাতে কুঞ্জ সিং ছড়ির বাড়ি মারেন।
পরবর্তী এক হাটবারে বেদিতে এসে আকাশের দেবী ঘোষণা করেন : 'কসিলার পেটে যে বাচ্চা আসবে, তার নাম হবে পাহাড়। কারণ তার গায়ে থাকবে পাহাড়ের জোর।'....
পাহাডুর জন্মের রাতে পৃথিবীর অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল ধজার বউ বিয়োচ্ছে না, বুঝিবা মা বসুমতীরই ছানা বেরুচ্ছে—সেইমতো হুলস্থূল। বড় বৃষ্টি মেঘগর্জন নিয়ে আশ্বিনে সে এক প্রলয়মুহূর্ত। কসিলা যত যন্ত্রণায় কাঁদে, ধজা তত বগল বাজায় আর ছড়া গায় : 'কপনি কম্বল লোট্টা/খাইলম বেগনভত্তা।।'
আর সেই দুর্যোগের ভেতর বুড়ো তারাজু ঝোপড়িতে ঝোপড়িতে ডাকাডাকি করে বেড়ায়। এমন রাতে মানুষের জন্মক্ষণেও সকলের মনে পড়ে যায় জাতপাতের কথা। ধজার জাতের খবর বিশেষ জানা নেই। তবে বৃদ্ধ হাটুরেদের মধ্যে বলাবলি শোনা গেছে, এই ধজা সাধু হয়েছে আর কুঞ্জবাবুরা তাকে খাতির করছেন বটে, পয়সার রাস্তা যেহেতু কুঞ্জবাবুরা সবতাতেই খুঁজে পান—কিন্তু ধজার বাপ গুলাই ছিল পূর্ণিয়া জেলার অস্পৃশ্য, এদিকে কসিলার বাপ চর্মকার। সুতরাং ঝোপড়িবাসিনী অন্যান্য জাতির স্ত্রীলোকেরা তার দেহস্পর্শ করবে না। কলি তো মুখের ওপর বলে দেয়, মড়া হলে তার ঘাঁটতে আপত্তি নেই। কারণ মড়া ফেলাই তার সংসারের কাজ। হাটতলা ঝাড়ু দিয়ে মৃত চুহা, বিল্লি, কুত্তা ফেলে আসে ভাগাড়ে। এজন্য সে কুঞ্জ সিংয়ের বেতনভোগিনী। বুড়ো তারাজু কপাল চাপড়ে বলে, এবার বিড়ি মাংতে এলে সে তার মুখে তার বহুকথিত জিনিসটিই গুঁজে দেবে। কারণ সেটাই তার ধর্মত প্রাপ্য হলো।
তেরো বছর বয়সে মা হওয়া সেই যুগে ডাল ভাত। অগত্যা বুড়ো বাপ নিজের ঝোপড়ি থেকে সাহস দিয়ে বলেছিল, 'চুপসে বৈঠা থাক। আপসে হো যাবে। সময় না হলে কুছু হবেক নাই।' তার কিছুক্ষণ পরে শিশুর ওঁয়া ওঁয়া ক্রন্দনে তারাজু আবার বেরিয়ে পড়লো। শুকনো লকড়ি জ্বালতে হবে। সেঁকাপোড়া করতে হবে। জামাই তো আধপাগলা—সাধু ঢং নিয়ে থাকে।
কিন্তু বেরিয়েই অবাক হয়ে গেল তারাজু। বৃষ্টি থেমে গেছে। ঝড় বন্ধ। আকাশ ঝিকমিকোচ্ছে। আর কালো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বানুকের মাথায় আটকে আছে একফালি চাঁদ। এই প্রথম বানুকের মহিমা দর্শন করল তারাজু। করজোড়ে ভুলুণ্ঠিত হয়ে সেই দিব্যজ্যোতিকে প্রণাম করল। কাদা মেখে গেল তার জরাগ্রস্ত কপাল। তারপর মেয়ে-জামাইয়ের ঝোপড়িতে ঢুকে সে দেখল, লম্পের মিটিমিটি আলোয় তার সাধু জামাই বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে আছে। তার মেয়ে শুকনো লকড়ি ভেঙে কুণ্ড করছে। তারাজু দেখামাত্র দৌড়ে গিয়ে তার ঝোপড়ি থেকে চামড়াকাটা নিয়ান্দখানি নিয়ে এল।...
নাড়িটি ঠিকমতো কাটা হয়নি। পাহাডুর নাভি থেকে ইঞ্চি দুই-আড়াই ঝুলে থাকত। খসে গেলে সেটি তার বালিকা মা কলি ডোমনির চোখ বাঁচিয়ে বহুদূরে পুঁতে রেখে এসেছিল। তার পাহাডুকে অবশ্য সবাই ভালোবাসতে শিখেছিল, আর তাদের মধ্যে কলিও ছিল। কলি তাকে আঁচলে লুকিয়ে রাখা পাটালির কুচি কিংবা একটুকরো বাতাসা দিত। কসিলার আড়ালে তার গালে ঠোনা মেরে আদর করত। আর ডোমনি অনুতাপে বিগলিত হয়ে চুপিচুপি বলত, 'আমারঠিঞে কুনো দুষঘাট লিসনা বাপ-ভগমান আমার হাত-পা বেঁধে দিয়েছে।' আর হাটুরেরা পাহাডুর মায়ের মতোই পাহাডুর মায়ায় বাঁধা ছিল। তাদের আনাজপাতির ভেতর কিংবা কখনো তাদের বগলের ফাঁকে সে হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে মুখ বের করত। দুধের দাঁতে খিট খিট করে হাসতো। হাটুরেরা তার মুখে গুঁজে দিত পরিহাসছলে আলু, পটল, কী পেঁয়াজ এবং পাহাডু তা চমৎকার চিবিয়ে খেয়ে ফেলত। ভিড়ের পায়ের তলা দিয়ে সে ঘুরে বেড়াত। একবার কেউ তাকে অলক্ষ্যে পায়ে চেপে দিলে লোকেরা সেই লোকটিকে প্রায় মেরেই ফেলে। ময়রাবুড়ির টাটের ফাঁকে পাহাডু মুখ বের করলে ময়রাবুড়ি ছুঁসনে ছুঁসনে বলে আর্তনাদ করলেও তাকে একটু ঝুরি অন্তত দিত। আর এইভাবেই বেড়ে উঠছিল পাহাডু, আকাশের দেবী যার কথা আগাম জানিয়ে রেখেছিলেন খর্জুনাকে।
পাহাডুর বয়স ছয়, তখন কুঞ্জ সিংয়ের মৃত্যু হয়। কুঞ্জ সিং হাটবারে বানুকের তলায় প্রতিষ্ঠিত বেদিতে দেবীর কাছে ভর-ওঠা ধর্মধ্বজের মুখ দিয়ে নিজের মৃত্যুর তারিখ জানতে চাইতেন। তিনি মাথা কুটে বলতেন, 'বল মা। অধম সন্তানকে একবার খবরটা দে মা।' দেবী নিরুত্তরা ছিলেন। আর কুঞ্জ সিং অপঘাতেই মারা গেলেন। সেবারই তাঁর একতলা দালানখানি দোতলা হয়েছিল। রটে যায় যে তাঁর অন্ধ নাতি জন্মেঞ্জয় সিং, যিনি তখন পরিণত যুবাপুরুষ এবং সঙ্গীত প্রিয় মানুষ, কুলোকের প্ররোচনায় ধাক্কা মেরে সিঁড়ির মাথা থেকে ঠাকুর্দাকে ফেলে দিয়েছিলেন। কারণ নাকি হাড়কঞ্জুস কুঞ্জ সিং তার সঙ্গীতপ্রিয়তা কুনজরে দেখতেন। সেটা সম্ভবত ঠিক নয়। অন্ধ মানুষেরা এই বিশাল ও রহস্যময় পৃথিবীতে নিজেরাই বড়ো অসহায়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা, সঙ্গীত ও ঘাতকতার মধ্যে অহিনকুল সম্পর্ক।
জন্মেজয় সিং অন্ধ হওয়ার দরুন তার দাদুর রেখে যাওয়া সম্পত্তির তদারকির অসুবিধে হচ্ছিল। তাঁর মা নারায়ণী স্ত্রীলোক হওয়ায় বুঝদারনি ছিলেন না। সে যুগে ভদ্রঘরের স্ত্রীলোকেরা ছিলেন প্রায় পর্দানসীনা। এদিকে নারায়ণী সত্যিই দুর্দান্ত প্রেমিকা ছিলেন। শোনা যায় শ্বশুরের জীবদ্দশাতেই গঙ্গাস্নানের ছলে তিনি গোপনে ধুলিয়ান যেতেন এবং বানারিবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। শ্বশুরের মৃত্যুর পর তাঁর ধুলিয়ানের প্রান্তবাহিনী গঙ্গায় ডুব দেবার বাতিক বেড়ে গিয়েছিল। অথচ তখন তাঁর কালো চুলের রাশি খুঁজলে আকস্মিক দু-একটি সাদা চুল দেখা যায় এবং বুকটা ধড়াস করে ওঠে।
পাহাডুর আট বছর বয়সে বানারিবাবু তাঁর বিখ্যাত কাজলবিড়ির বাণিজ্যস্বত্ব এবং ট্রেডমার্ক পর্যন্ত বেচে দিয়ে খর্জুনায় ফিরে আসেন এবং আবার হাটোয়ারিবাবু হয়ে ওঠেন। তিনি ভীষ্মের মতো চিরকুমার থাকার প্রতিজ্ঞা করে থাকবেন। তবে এ-বনারিবাবু সে-বানারিবাবু নন। ইনি পরাক্রমশালী সিংহ। জীবনে প্রচণ্ড ঘা-পোড় খাওয়া এবং কলঙ্কে কলঙ্কে জেরবার এক দুর্দান্ত মানুষ। কালেক্টর, ডেপুটি, সাবডেপুটি, সিও এবং দারোগাবাবু তাঁর দক্ষিণহস্ত, অথবা তিনিই তাঁদের দক্ষিণহস্ত। খর্জুনায় ফিরেই তিনি অন্ধ জন্মেজয়ের বিয়ে দেন ভাগলপুরে। জমিজমা, হাট, মহাজনী কারবার তাঁরা হাতের ছোঁয়ায় সোনা হয়ে ঝলমলায়। সেই প্রথম খর্জুনার রাস্তায় পিচ পড়ে এবং মোটরগাড়ি আসে। লোকেরা মোটরগাড়ি চেপে প্রথম-প্রথম বমি করে ভাষায়। শেষে জীবনের অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে ভোগদখল করতে থাকে।
সাধুর মারফত দেবীর বেদিতে হাটবারে গড়ে আয় ছিল চৌদ্দ আনা। কোনো কোনো হাটে তিন টাকারও বেশি পড়ত। কুঞ্জবাবুর মৃত্যুর পর কড়িবাবু হাটোয়ারির ন্যালাভোলা চরিত্রের জন্য কসিলা তাতে ভাগ বসাতো। বানোয়ারি সিং এসে বাধা দিয়েছিলেন। কসিলা তর্কাতর্কি করেছিল। শেষে বুক ফেটে কেঁদে ফেলেছিল। সে তার সাধু স্বামীকে হাটবারে বেঁধে রাখার চেষ্টা করত। পারত না। বানারিরর লোকেরা এসে তুলে নিয়ে গিয়ে বেদিতে বসিয়ে দিত ধর্মধ্বজকে। তারা কড়া পাহারা দিত। পাহাড় কিছুদিন সেটা লক্ষ্য করার পর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে করতে আচমকা ছোঁ মেরে পয়সা তুলে নিয়ে পালিয়ে যেত। একদিন তাকে তাড়া করে ধরে ধনেশ পাইক প্রচণ্ড প্রহার করে। কসিলা আহত ছেলেকে নিয়ে বানারিবাবুর কাছে নালিশ করতে যায়। বানারিবাবু তাকে মিটিমিটি হেসে বলেন, 'আয়, তবে আপস করি।'
কসিলা নিজের জয় ভেবে চোখ মুছে বলে, 'তাই করুন তাহলে।'
তখন বানারিবাবু বলেন, 'আদ্ধেক তোর। তবে তোকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে।'
খর্জুনা অঞ্চলে এই 'সঙ্গে থাকা' কথাটি অত্যন্ত অশ্লীল। এটি রক্ষিতার প্রতিশব্দ। কিন্তু রাঢ় অঞ্চলে অবশ্য রক্ষিতা রাখা অশালীন ছিল না। সকল সম্পন্ন গৃহস্থের রক্ষিতা থাকা ছিল আভিজাত্যসূচক। কী হিন্দু কী মুসলমান এই সামাজিক প্রথাটি সযত্নে পালন করতেন। এমনকী সাধ্বী স্ত্রীলোকেরা নিজের স্বামীর মতিগতি লক্ষ্য করে নিজেরাই রক্ষিতার ব্যবস্থা করে দিতেন। তবে রক্ষিতা একান্তভাবে বেছে নেওয়া হতো বিধবাদের ভেতর থেকেই, যে বিধবাদের জীবনকে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবার জন্য রাক্ষসীর ক্ষিদে, যাঁরা ভাবতেন, ঈশ্বরের দেওয়া শুধু এই রক্তমাংসের শরীরটারই ভেতর এত বেশি স্বর্গের আয়োজন যে তা আস্বাদের জন্য একটা জন্ম নস্যিমাত্র, আরো আরো জন্ম দরকার এবং জীবন দরকার। আর এ কারণেই কোনো স্ত্রীলোকের স্বামীর মৃত্যু ঘটলে তিনি 'রাঁড়ি' হতেন। তিনি হাহাকার করে বলতেন, 'হায়। এ বয়সেই কেন আমি রাঁড় হলাম—কোন পাপে?' বিধবা রক্ষিতা নির্বাচিত হলে তাঁর প্রথম কাজ ছিল গ্রামের ধাইবুড়ির কাছে যাওয়া। এই ধাইবুড়ি তাঁকে কাপাসের শেকড়বাঁটা খাইয়ে দিতেন এবং তাঁর ডিম্বকোষটি পুড়ে যেত। তবে কথা কী, আমাদের মহান ভারতবর্ষের ঐতিহ্যে যৌনতা কদাপি ঘৃণা ও নিষিদ্ধ বস্তু ছিল না। ঐ ব্যাপারে আমাদের দেবদেবীরাই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন মুহুর্মুহু।
কিন্তু কসিলা বিধবা নয়। সে বানারিবাবুর কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে বলেছিল, 'ও বাবু! ও বানারিবাবু! তুমি কী বলছ। আমি কি রাঁড়ি-আমার কি পুরুষ বেঁচে নেই? ঝাঁটা মারি তোমার কথায়, বানারিবাবু।'
সবাই দেখেছিল, বাজারের পথ দিয়ে হাটতলায় ফিরে চলেছে কসিলা তার বালক-পুত্রকে নিয়ে চোখের জল আঁচলে মুছতে মুছতে। লোকেরা বলাবলি করেছিল, এই হাটবারে দেবী কী বলেন শোনা যাবে।
আর দেবী বলেছিলেন, 'বানুকের মাথা থেকে যেদিন লাল ধজাখানা খসে যাবে সেইদিন ধজার মরণ হবে। আর তার বউ রাঁড়ি হয়ে যাবে।'
কলি কসিলাকে সেই খবর দিলে সে দেবীকে 'আঁটকুড়ি মাগি, তুই রাঁড়ি হ' বলে গাল দিয়েছিল। কিন্তু তার বুক শুকিয়ে গিয়েছিল। সে বনুকশীর্ষে কাপড়ের ফালিটা যখন-তখন লক্ষ্য করত। তার অকিঞ্চিৎকর সংসারেও কাজের অন্ত ছিল না। কাজের ভেতর শিরদাঁড়া ধনুকের মতো করে সে ঝুঁকে থাকত সারাক্ষণ আর হঠাৎ মনে পড়লেই ছিলা ছিংড়ে সোজা হয়ে যেত। তাকাতো বানুকের চূড়ার দিকে। লাল ফালিটা আছে দেখে ফোঁস করে তার স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ত। লাল কাপড়ের ফালিটার সামান্যই টিকে ছিল। ঝড়বৃষ্টিতে আর দিনরাতের স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহেও আশ্চর্য দক্ষতায় কোনো প্রাণীর মতোই সেটা আত্মরক্ষায় চেষ্টা করে এসেছে। কসিলা ভাবতো, কী আশ্চর্য বটে। ওই সামান্য ন্যাতাটুকুই তার স্বামীর আয়ু। তার সাধু স্বামী নিজের আয়ুকে কোন আক্কেলে বানুকের মাথায় মেলাতে গিয়েছিল, সে ভেবেই পেত না। যে বানুকটার কাছে গিয়ে হাত বুলিয়ে দেখতো তার কঠিনতা ও শক্তি। অবাক চোখে চেয়ে সে ভাঙা হুকগুলো দেখত। এও ভেবে পেত না, কীভাবে বানুকের মাথায় তার পুরুষ উঠে গিয়ে নিজের আয়ু লটকেছিল।
লোকেরাও লক্ষ্য রাখত যুগপৎ বানুকশীর্ষে এবং কসিলার প্রতি। তারা মনে মনে হেসে ভাবতো, এই জোয়ান মাগির খুব দেমাগ। রোসো, রোসো—আর কতদিন? ধজার ফালি খসে পড়ল বলে। ইহ সংসারে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আর একটা ভূমিকম্প যদি নাও নয়, তবু ওই দুই তালগাছ উঁচু ইটের থাম তো অমর-অক্ষয় নয়। ওই তো তার গায়ে নোনা ধরে গেছে। ইটগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে গর্ত হয়ে গেছে। ধজা যদি নিজে থেকে নাও খসে বানুকই তাকে নিয়ে খসে পড়বে। নয়তো কবে পাখ-পাখালিই ঠুকরে খসিয়ে দেবে। সাধু ধজার কোনো গ্রাহ্য নেই। সে বগল বাজিয়ে বেড়ায় আর বলে: 'কপনি কম্বল লোট্টা/ খাইলম বেগনভত্তা।।'
বছর ঘুরে এল। বানুকের মাথার ওপর কত শকুন, দাঁড়কাকা, পায়রা, কতরকম পাখ-পাখালি এসে ঘুরে গেল বরাবরকার মতো—কেউ বসার সাহস পেল না। তারা বসলে ধজাটা ঠুকরে খসিয়ে দিত। কিন্তু ধজা পতপত করে ওড়ে। তারা ভাবে না জানি কী ফাঁদ। ভয় পেয়ে দূরে সরে যায়।
তারপর একদিন হাটবারে বানারিবাবুর পাইকরা এসে সাধু ধর্মধ্বজকে খুঁজে পায় না। কসিলা বলে, আঁচলের তলায় লুকিয়ে রেখেছি নাকি? বেদির সামনে মানুতে ভক্তজন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘগা বাজাচ্ছে ঢোল, খগা বাজাচ্ছে কাঁসি। ধজা নেই। পাইকরা খুঁজে বেড়ায়। পাত্তা পায় না। বানারিবাবু খবর পেয়ে এসে কসিলাকে শাসাতে থাকেন আর সেই সময় বানুকের মাথা থেকে চিৎকার ভেসে আসে। চাবুকের মতো সেই চিৎকার শপাং করে এসে আছড়ে পড়ে মানুষজনের ওপর। মানুষজন স্তম্ভিত হয়ে যায়। বানুকের মাথায় দাঁড়িয়ে ধজা লম্ফঝম্ফ করছে তার বাবা গুলাইয়ের মতোই তার হাতে সেই ন্যাতার ফালি। ধজার হাতে ধজা। ধজা চিৎকার করে বলতে থাকে, 'অ্যাই পাঁঠারা! এই দ্যাখ আমি ধজা খসালাম! কপনি কম্বল লোট্টা/খাইলম বেগনভত্তা।।' সে বগল বাজাতে থাকে। লোকেরা রণধ্বনি দেয় মুখে হাত নেড়ে আ বা বা বা বা। ধর্মধ্বজের জটাজুট নড়ে। নীল আকাশের গায়ে তাকে গাঙফড়িঙের মতো দেখায়। তারপর সে দুহাতে শূন্যে তোলে। ন্যাতার ফালিটা উড়ে যেতে থাকে মাঠের দিকে। নিজের পলাতক আয়ুকে পাকড়াও করার জন্য ধর্মধ্বজ আকাশে ঝাঁপ দেয়। সবাই আতঙ্কে চোখ বোজে। তবু অবিকল দেখতে পায় আকাশের দেবী তাকে "লুফে নিচ্ছেন। আর তাকে কোলে নিয়ে সেই দেবী উধাও হয়ে যান ক্রমশ বিন্দু থেকে অণু, অণু থেকে পরমাণু হতে হতে, সময় যেখানে সময়হারা সেখানে। আর—
ক তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকাম
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি
কুতোহায়মাগ্নিঃ।।
বাংলায় রেশমশিল্পের স্বর্ণযুগে রেশমকুঠির চলতি নাম ছিল বানককুঠি। হেঁদিপেঁদি জনগণ শব্দদূষণে পটু, অথবা তাঁদের জীবনের কর্মে ঘর্মে কর্দমে ভাষাও স্যাঁতসেঁতে নোংরা হয়ে যায় এবং বানক হয় বানুক। আর বাংলার যে রেশমবস্ত্র পরে রোমসম্রাট দরকার জেল্লাদার করতেন, ইংরেজ কোম্পানি এসে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। শোনা যায়, খর্জুনার বানুকের ভেতর পাঁচশো গাঁট রেশমি থান, দেড়শোটি রেশমতত্ত্ব উৎপাদক পলুপোকার ডালা, বাইশখানি তাঁত ছাই করা হয়। পলুপোকার খাদ্যের জন্য খজুনার মাঠে যে অজস্র তুঁতখেত ছিল, তাতে নীল চাষের পত্তন না করা পর্যন্ত বন্দুকের গুড়ুমগুড়ুম আওয়াজ হতে থাকে। শুধু তাই নয়, একটি নাটকে লিখিত প্রমাণ তাঁতীদের প্রতি মেজর মনরোর এই সংলাপ : 'টোমরা টাঁটের নিকট যাইলে হামি টোমাদের হাট কাটিয়া ফেলিবে—সাবচান!' মেদুবাবু কম্পাউন্ডার মেজর মনরোর পার্ট করে এমন হিড়িক ফেলে দিয়েছিলেন যে খর্জুনার জেলাবোর্ডের দাতব্য চিকিৎসালয়ে তাঁর চাকরি যাবার দাখিল। রেলের লুপলাইনে সেই পাকুড়, বেলপাহাড়ি, মতিহারি, সাহেবগঞ্জ, ধুলিয়ান, নিমতিতা—আরো কত জায়গা থেকে তাঁকে হায়ার করে নিয়ে যাওয়া হতো। তবে এটা সেদিনকার কথা। খর্জুনার বানককুঠি নীলকুঠিতে পরিণত করেন সত্যিই এক মনরো সায়েব, তিনি সেই মেজর মনরো কিনা বলা কঠিন, যিনি আড়াইশো বিদ্রোহী সিপাহীনেতাকে কামানের নলের মুখে বেঁধে আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন—আর সেটিই ছিল ভারতের প্রথম সিপাহীবিদ্রোহ। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে এই ঘটনা ঘটে।
তো দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য রঙ, গন্ধ প্রভৃতির মতো উচ্চতাকেও ব্যবহার করা হয়। প্রাচীন বাংলার ওইসব বানককুঠিতে দূর-দূরান্তের বানকচাষিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আশি/নব্বই-একশো ফুট পর্যন্ত উঁচু ইটের নিরেট থান তৈরি করা হতো। আধুনিক যুগের বহু কলকারখানার ইটের চিমনির মতো সেগুলির গড়ন। খর্জনাকুঠির সেই উঁচু থামাটিই শেষপর্যন্ত বানুক নামে অভিষিক্ত হয়েছিল। কারণ ওইটিই ছিল বানুকশিল্পের অবশিষ্ট চিহ্ন। স্মৃতিসৌধবৎ দণ্ডায়মান, গম্ভীর, বয়স্ক এক সাক্ষী। একদা তাকে দূর-দূরান্তর থেকে দেখে গ্রামবধূরাও গোপনসুখে শিহরিত হতো, কারণ তাদের পরিশ্রমী ভাতারপুতেরা ওইখানে গিয়েই তঙ্কা লাভ করে। সেই তঙ্কা উদ্বৃত্ত হলে তারা গহনাগাঁটি লাভ করে, শুখা-আকাড়া-মন্বন্তরে কিছু যায় আসে না। কারণ ওইস্কুলে গেলেই দাদন মেলে। সঞ্চিত রেশমগুটি কেনার জন্য খর্জনার কঠি হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ওই সেই হাত। ওই একটি বরাভয়। দিগন্তে ঋজু ও সৌম্যকান্তি ওই এক নগ্ন সাধু। স্পর্ধিত শিবলিঙ্গের মতো শক্তিমান ও পূজ্য।
অতএব বলা যায়, বানুকস্তম্ভটির একটি প্রাচীন ঐতিহ্য ছিল। পরবর্তী যুগে নীলকুঠিরও দফারফা হলে কুঞ্জ সিংয়ের ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা, যিনি নিজেকে মোগল সেনাপতি মান সিংয়ের বংশধর দাবি করতেন, (যে দাবির মধ্যে ঐতিহাসিক সত্যতাও থাকা সম্ভব, কারণ খর্জনার মাঠে মোগল-পাঠানে প্রচণ্ড রক্তারক্তি হয়েছিল), সেই চণ্ড সিং লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে জমিদারি কেনেন এবং বিধ্বস্ত কুঠির খিলানাকৃতি দরজাওয়ালা কয়েকটি ঘর আর স্তম্ভটিও তার অন্তর্ভুক্ত হয়। ওই ঘরগুলি হয়ে ওঠে তাঁর কাছারি। চণ্ডু সিংয়ের ছেলে নন্দু সিং, তার ছেলে কান্তি সিং, তাঁর ছেলে হরি সিং, যিনি কুঞ্জ সিংয়ের বাপ-নারকোলের মালুই হাতে প্রায় ভিক্ষেয় নামতে যাচ্ছিলেন। নিলামের ডুগডুগি বেজে জমিদারির তাবৎ লোপাট, শুধু বসতবাটি আর এই বানুক বাদে। একরাত্রে ধু ধু জ্যোৎস্নায় স্তম্ভের শীর্ষে আকাশবিহারিণী এক দেবী ক্লান্তি দূর করতে বসে থাকার সময় হরি সিংয়ের চোখে পড়ে যান। মানুষের চোখে পড়লে দেবদেবীদের স্পর্শদোষ ঘটে। তাঁরা পড়েন মুশকিলে। হরি সিং তাঁর গড়ন বা চুল দেখে স্ত্রীলোক ভেবেছিলেন। খুব অবাক হয়ে তাড়িখোর মাতাল হয়ে তাড়িখোর হরি সিং চেঁচিয়ে ওঠেন, কোন শালী রে, রাতদুপুরে ঢং কর্তে আমার বানুকে চড়েছে?' তিনি ইট তুলে শাসিয়ে বলেন, 'নাম বলছি মাগি! নৈলে ইটে মাথা চেলিয়ে দেব।' মাতালের হাতের ইট অত উঁচুতে পৌঁছায় না। তখন খাপ্পা হয়ে হরি সিং বলেন, 'থাম তবে। বানুক পেছল করে দিই। তখন পেছল বানুক বেয়ে কী করে নামিস দেখব।' এই বলে তিনি কাপড় ফাঁক করে সত্যি স্তম্ভের গায়ে হিসি করতে গেলে দেবী লজ্জায় জিভ কেটে বলেন, 'ওরে! থাম, থাম। হিসি করিসনে বাছা! তাহলে আর স্বর্গে ঢুকতে দেবে না আমাকে। তুই যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস, সেখানে খুঁড়ে দ্যাখ, টাকা পোঁতা আছে।' আসলে বরাবর আকাশপথে এই বানুকটি দেবীর বিশ্রামস্থল। মনুষ্যদেহ নিঃসৃত জলে লাঞ্ছিত হলে সেই সুন্দর স্থলটি দেবীকে খোয়াতে হয়। তো হরি সিং সেই রাতেই বালকপুত্র কুঞ্জ সিংকে ডেকে আনেন। শাবল দিয়ে দুজনে খোঁড়াখুঁড়ি করে বিস্তর টাকাভর্তি পেতলের ঘড়া পান। আর জমিদারি ফেরানো যায়নি। কিন্তু বড়লোকি ফিরে পেয়েছিলেন। তিনি বানুকটির পুজোও চালু করেছিলেন! কিন্তু চালনো যায়নি। এদেশে জনগণ টিপি-ঢাপি দেখলেই মাথা নোয়ান। বানুকটির সে কারণে সহস্রকোটি প্রণাম প্রাপ্য হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রায়ই তাঁর শীর্ষে শকুন বসে থাকতে দেখা যেত। কুঞ্জবাবু শেষপর্যন্ত একটি শিবমন্দির গড়ে দেন। শকুনের ভয়ে সেটি খানিক দূরে গড়া হয়। মন্দিরের শিবলিঙ্গটি প্রচলিত ধরনে যোনিপট্রে ন্যস্ত। কিন্তু তার দৈর্ঘ্য ঈষৎ বেশি। এমন লম্বাটে, ক্রমশ পরিধি হস্বতর হওয়া শিবলিঙ্গ সচরাচর দেখা যায় না। সম্ভবত কুঞ্জ সিংয়ের মাথায় বানুকটি ঢুকে পড়েছিল বালক বয়সেই। তিনি তার সামনেকার প্রাঙ্গণে হাট পত্তন করেন। তার ফলে বানুকটি তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পায়। কারণ দূর-দূরান্ত থেকে সেটিকে দেখেই লোকেরা বলাবলি করে, 'ওই খর্জনোর হাট! ওরে তোরা আয়, আমরা সবাই হাটে যাই।' আবার ওই সুউচ্চ বানুক হয়ে ওঠে বউঝিদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, রেশমযুগের মতোই। বস্তুত এই বানুক দূর থেকে দেখে বহু হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। ওই তাদের রুজিরোজগারের কেন্দ্রস্থল। খুঁটেকুডুনি ছুঁড়িটা, শাকতোলানি বুড়িটা, মাছধরানি রাঁড়িটাও কোমরে আঁচল জড়িয়ে ডানহাতখানি দোলাতে দোলাতে ছুটতে থাকে বানুকাভিমুখে। কাঁধে বাঁক নিয়ে ছন্দে ছন্দে পা ফেলে দুধারে খেতের গামছা-মশারির বোঁচকা আটকে ট্যাঙস ট্যাঙস হাঁটতে থাকে। মনোহারিওলা রঙ ঝিলিমিলি দ্রব্যসম্ভার মাথায় নিয়ে চেরা গলায় রসের গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলে। এইভাবে চলতে থাকে কামার, কুমোর, হরেক বৃত্তিজীবী। টাট্টুর পিঠে শিলনোড়া, জাঁতা, পাথরের তৈজস চাপিয়ে সাঁওতাল পরগণার পাহাড়ি মুল্লুক থেকে চলে আসে গুলাইয়া। আসে ধামা-কুলো বেতের গোছা নিয়ে পূর্ণিয়া মুল্লুক থেকে কলাবতীরা। লোহার পাঁউটি কাঁধের ঝোলায় ঝুলিয়ে তারাজু কর্মকাররা। ফরাক্কার কাছে বেনীপুরে গঙ্গা পেরিয়ে চলে আসে বলদের পিঠে ছালায় ভরা খন্দ নিয়ে মালদহের ব্যাপারীরা। দৃষ্টি দিগন্তে ধূসল ওই স্তম্ভরেখার দিকে পড়তেই প্রত্যেকে চঞ্চল হয়ে ওঠে। 'ওই বানুক দেখা যায়। ওই তবে খর্জুনোর হাট! চলো, চলো! একটু পা চালিয়ে চলো দিকিনি বাপ।'
সুতরাং ঐতিহ্যবান সুদীর্ঘ সুউচ্চ ওই বানুক, যা গতরজীবী জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, তাকে বিশ্রামস্থল বেছে নিয়ে আকাশবিহারিণী দেবী তার মধ্যে আরোপিত করেছিলেন স্বর্গীয় মহিমা! সেই মহিমার দশা কিন্তু বহুবার করুণ হয়ে পড়ত। রাঁড়ি যুবতী কসিলা যখন তাকে দেখিয়ে তার ঠাকুর্দার জান লিয়েছে, ওকে তুই চিনে রাখ বাছা', তখন বালক পাহাড়ু বানুকটিকে দেখতে দেখতে হঠাৎ চিকুর ছেড়ে বলতো, 'মা! মা! আমি শালার মাথায় মুতে দিয়ে আসি।' আর কসিলা তাতে দুহাতে জড়িয়ে টেনে ধরত, যেন সেই বালক এক দুর্দান্ত পক্ষিরাজ টাট্টু। পাহাড় বানুকটির পবিত্রতা নষ্ট করত তার মূলদেশে নিজের দেহ-নিঃসৃত কঠিন ও তরল পদার্থ দিয়ে। কালক্রমে বানুকটির বিশ হাত দূরে গেলে নাকে কাপড় দিতে হতো। তবে কসিলা মিটিমিটি হাসতো। সে হাসিতে দুঃখও ছিল।...
তাহলে দেখা যায় আকাশের দেবীর সেই পবিত্র বিশ্রামস্তম্ভ কলুষিত করার সাহস দেখিয়েছিল দুজন মানুষ। হরি সিং আর পাহাড়। তবে হরি সিংয়ের মুখের কথায় ভয় পেয়েই দেবী তাকে পোঁতা টাকার হদিস দেন। কিন্তু পাহাড়ু সত্যি সত্যি পবিত্রতা নষ্ট করে ফেললেও দেবী তাকে আমল দেননি। বালক বলেই কি? দেবীরা মায়ের জাত। বাচ্ছাদের মলমূত্র ঘাঁটতে হয়, জানেন। সেই দেবীর স্বামী বা সন্তান ছিল কিনা জানা যায় না। শুধু জানা যায়, তিনি ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন। ধর্মধ্বজ ছিল অচ্ছ্যুৎ বংশ। তবু তার প্রেমে পড়ে দেবী কী কাণ্ডটাই না করেছিলেন! ভাগ্যিস ধর্মধ্বজ নিজের আয়ুকে অবহেলায় উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কসিলাকে নিজের প্রেমিকের জন্য এনে দিয়েছিলেন স্বয়ং দেবীই। এ থেকে বোঝা যায় তাঁকেও রাঢ়ের স্ত্রীলোকের স্বভাবটি পেয়ে বসেছিল। সে যুগে রাঢ়ের সধবারা স্বামীর জন্য নিজেরাই রাঁড়ি সংগ্রহ করে দিতেন। দুঃখের বিষয়, নিরক্ষরা কসিলা দেবী এই ধুর্তামির ব্যাপারটা জানতো না। সে এতটুকু টের পায়নি ওই অমর্ত্যবাসিনী স্ত্রীলাকটি আসলে তার সতীন। এমনকী, হতভাগিনী কসিলা এও জানত না, ওই বানুকশীর্ষ দেবীর প্রিয় বিশ্রামস্থল। বস্তুত সমকালে কোনো ঘটনার তাৎপর্য বোঝা যায় না। দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বানুকের দেবীর মাহাত্ম্য নিয়ে ফৈজুল্লা নামে মালদহের এক গ্রাম্যকবি কবিতা রচনা করে যখন লুপলাইনের ট্রেনে ট্রেনে বিক্রি করে বেড়ান, তখন কসিলা কবে মরেহেজে গেছে।
পাহাডুও বেঁচে নেই। বানুকটি অবশ্যটিকে আছে। হাটতলা কেন্দ্র করে বাজার গজিয়ে গেছে। খর্জুনা হয়ে উঠেছে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় মহাসড়কের ধারে এক বিদ্যুৎ বিভাষিত গ্রাম নগরী। পাঁচশালা যোজনার যুগ এসে গেছে স্বাধীন ভারতে।
তো পাহাড়ুর কথা বলার আগে তার মা কসিলার কথা বলা যাক। ফৈজুল্লা বলে :
'বানাহারিবাবু মহাশয় অতি বদের গোঁড়া।
বুঢ়া হন টুঢ়া হন স্বভাবেতে ছোঁড়া।।
কহেন ওলো কসিলারানী রূপবতী নারী।
কথা ছিল রাঁড়ি হইল হবা আমার রাঁড়ি।।
কন্যা বলেন দূর দূর মুয়ে মারি তোল ঝ্যাঁটা।
ঘরে আমার বাঢ়ন্ত সোনার চাঁদ ব্যাটা।।
বাবু বলেন, শুন শুন ওগো সাধুর নারী।
দুধেভাতে থাকবে ব্যাটা হও আমার রাঁড়ি।।...'
বানারিবাবুর জুলুমে কসিলা তার ছেলেকে নিয়ে বানুকতলা ছেড়ে চলে যায়। সেই সময় বানুকশীর্ষ গম্ভীর গরগর ধ্বনি, আর খর্জুনার লোকেরা সেই প্রথম উড়োজাহাজ দেখতে শুরু করে। তারা প্রথমে ভেবেছিল রুষ্টাদেবীর হুংকার। পরে কাগজপড়া বাবুমশাইরা বলেন, যুদ্ধ বেধেছে! মহাযুদ্ধ! আর হাপু গাওয়া দল হাপু গাইতে বেরুতো বাড়ি বাড়ি। গাল ফুলিয়ে দুই ফুলন্ত গালে পালাক্রমে থাপ্পড় মেরে তারা আওয়াজ দিত : 'হাপুর দুম! হাপুর দুম! ইল্লে হাপু, উল্লে হাপু! হাপুর দুম। হাপুর দুম!'
একজন সুরে চ্যাঁচাত : 'ইঙোলন্ডে পল্লো বোমা!' বাকিরা দুই গাল চাপড়ে বলত: 'হাপুর দুম! হাপুর দুম।' এই ভাবে 'হিল্লাট্ আসছে দ্যাশে—হাপুর দুম। হাপুর দুম!... হিটলাটেতে ফেললে বোমা—ইল্লে হাপু! উল্লে হাপু!... জার্মানিরা জবর ভারি-হাপুর দুম! হাপুর দুম!... পয়সা ফেলো জলদি করে-হাপুর দুম! হাপুর দুম।'
লোকে খুব মজা পেয়েছিল। কিন্তু সেই মজা তারপর মাঠে মারা পড়লো পর পর দু'বছর অনাবাদ। বানুকের মাথায় শকুন বসতে লাগল রোজ। লু হাওয়া বইতে লাগল সেবারকার মতো। তারপর মন্বন্তরের কালো ছায়া নেমে এল চারদিকে। এই সেই পঞ্চাশের ভয়ঙ্কর মন্বন্তর, পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের—গ্রামের মানুষের নাড়িভুঁড়ি টেনে যে বের করেছিল।
দেবী তাহলে আবার কুপিতা হয়েছিলেন। সবার মনে পড়ল তখন কসিলার কথা। আর মনে পড়ল সাধু ধর্মধ্বজের কথা, যাকে বেদিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করায় গর্জুনার মাঠ গর্ভবতী হয়েছিল। সাধু ধর্মধ্বজের ব্যাটার কথা সখেদে বলাবলি করত তারা। কিন্তু কোথায় সেই পাহাড়? পাহাড় এলে যদি তাকে দেখে দেবীর দয়া হয়। লোকেরা কংকালটি হয়ে শহরগুলিতে অন্নের খোঁজে যায়। দিনশেষে ধুকতে ধুঁকতে কামনা করে, কখন শুনতে পাবে খর্জুনার বানুকতলায় পাহাড় ফিরে এসেছে। তারা মাথা খুঁড়ে বলত, 'আয় বাপ পাহাডু। ফিরে আয়।' তাদের মাথাকোটা প্রার্থনায় দেবী বিচলিত হয়ে ওঠেন। আর অবশষে একদিন খবর হয়, পাহাড়ু ফিরেছে। আর খর্জুনার মানুষ যে-যে শহরে নর্দমার ধার ধুকছিল, একে একে সে সেই শহরে সতেজে উঠে দাঁড়ায়। সাড়া পড়ে যায়, 'খর্জুনা চলো। খর্জুনা ফিরে চলো। পাহাড় এসেছে। ধজার ব্যাটা ফিরে এসেছে।' পাহাডু একা ফিরেছিল। কসিলার মড়া বেনীপুরের আঘাটায় গঙ্গায় ফেলে দিয়ে এসেছিল। মাকে রেখে সে গিয়েছিল ফ্যানটুকু চাইতে এক গেরস্থ বাড়ি। কচুর পাতায় ফ্যান এনে দ্যাখে কসিলা হাঁ করে সিঁঠিয়ে পড়ে আছে বটতলায়। তার মুখে মাছি বসছে। পাহাডু ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, 'মর্লি, মর্লি, মাগো। একটুকুন দেরি কর্তে পার্লিনে! বড়ো বোকা মেয়ে তুই মা!' পাহাড়ুর দেহে তার বাপের মতো দেবী ভর করেন নি। কিন্তু সে তার বাপেরই ব্যাটা। তার দেহে তার বাপ সাধু ধর্মধ্বজের রক্ত। সে কারণে তার ফিরে আসায় দেবী সেবারের মতোই প্রসন্না হলেন। বর্ষা নেমে বৃষ্টি ঝরল। ব্যাঙ ডাকতে লাগল গ্যাঙোর গ্যাঙ! গ্যাঙোর গ্যাঙ! খর্জুনার মাঠে কাড়ান নামাল। মাঠ হলো গর্ভিনী। মন্বন্তরের কালে ছায়া সরে পৃথিবী হলো শস্যশালিনী। নবান্নের রাতে আবার ধুম করে বানুকতলায় গানের আসর বসল। সতেরো বছরের পাহাডু আসরের হট্টগোল থামায়। বাবুদের সিগারেট-পান আর চা এনে দেয়। খর্জুনবাসী তাকে বড়ো ভালোবেসে ফেলেছিল।
আর দেবী বলেছিলেন, 'তার নাম হবে পাহাড়। কারণ তার গায়ে থাকবে পাহাড়ের জোর।' পরের বছর বর্ষার বানুকতলায় মালামোর আসরে পাহাড়ু জানিয়ে দিল, খর্জুনার মাটিতে এক পালোয়ানের আবির্ভাব ঘটেছে। আর দিন মাস, বছর যায়। পাহাডু এলাকা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তের মালামোর আসর থেকে মেডেল, গামছা, পেতলের ঘড়া জিতে আনে। বানুকের খিলানাকৃতি দরজার পাশে সে কাদামাটি ছেনে ছোট্ট ঘর বানিয়েছিল। সেই ঘরে সে গলায় চাঁদির তক্তি পরে শুয়ে থাকত। সে তার শৈশবের কথা ভাবতো। খর্জুনার বহু তরুণ তার অনুরাগী হয়ে উঠেছিল। তারা তার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো চেলাদের মতো। আর বানারিবাবু তখনো বেঁচে। অন্ধ জন্মেজয়ের সম্পত্তির প্রায় তিন চতুর্থাংশ তাঁর করতলগত। নারায়ণীর মৃত্যুর পর বুড়ো বয়সে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে বানারিবাবু বিয়ে করেছিলেন এবং এ-পক্ষে একটি মেয়েও জন্মে ছিল। তার নাম ছিল করুণা! বাপের গরবিনী করুণার বড়ো চ্যাটাং চ্যাটাং কথা ছিল।
আর এদিকে পাহাড়ুর দাপট দিনে দিনে বেড়ে উঠেছিল। তার জন্মের আগে রাস্তার ধারে হাটতলার প্রান্তে গজিয়ে ওঠা একটি বাজারের আঁকুর এতদিনে ডালপালা মেলে প্রকাণ্ড বৃক্ষবৎ। কুলকুল করে লোকজন সেখানে। মোটরগাড়ি, রিকশো, গোরুর গাড়ি, মোষের গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ির ভিড় সারাক্ষণ? গর্জনার মাঠে লুপ-লাইনের হল্ট সেবার পুরো স্টেশন হয়েছে। বাজারে পণ্য আসে, পণ্য চালান যায়। পাহাডুর চেলারা গিয়ে দোকানদারদের বলে, 'পাহাড়ুদা পাঠালো। পঞ্চাশটা টাকা ছাড়ো।' দোকানদার গম্ভীর হলে তারা হাত বাড়িয়ে তার খোঁট ধরে। দোকানি দাঁত বের করে বলে, 'দিচ্ছি বাপ, দিচ্ছি। ফৈজত। করিসনে।’
পাহাড় হয়ে উঠল সন্ত্রাসের প্রতীক। সে চেয়ে পাঠালে টাকা দিতেই হয়। নৈলে নির্মম মার। পুলিশে নালিশ যায়। পুলিশ আসে। ততক্ষণে পাহাড়ু খবর পেয়ে চলে যায় বানারিবাবুর বাড়ি। বানারিবাবু হাটের মালিক। হাটের তোলা তুলতে বা সম্পত্তি নিয়ে মারদাঙ্গায় পাহাডু তাঁর ডান হাত। পাহাড়ুর গায়ে পাহাড়ের জোর। সেই জোরে বানারিবাবুর এত জোর যে রাম সিং-লক্ষণ সিং পাটোয়ারিজিদের বংশধর কেঁচো হয়ে গেছে। বানারিবাবু দিনকে রাত্রি করেন, জলকে করেন স্থল। পাহাড় তাঁর জোর। আর তাঁর তেজি মেয়ে করুণা তাই পাহাডুকেই শুধু ভয় পায়। পাহাডু তার দিকে কেমন চোখে কেন তাকিয়ে থাকে। সে সাহস করে একদিন বলে, 'পাহাড়ুদা, তুমি কী দ্যাখো গো অমন করে? বড্ড ভয় করে আমার!'
পাহাডু শ্বাস ফেলে বলে, 'কিছু দেখি না। তুই আমার ছামু থেকে সরে যা দিকিনি ছুঁড়ি। তু বাবুর বিটি, আর আমি আছি নি-জেতে পুরুষ। আমার ঠিঞে তু আসিস না।' সেবার আমাবস্যার রাতে খর্জুনায় কালীপুজোর ধুম। মাতালেরা গান গেয়ে বেড়াচ্ছে অন্ধকারে :
'পা টলে টলে খালে পড়ে
এতো ভারি মজার পা।।'
আর বানারিবাবুর বাড়ির পুজোটি বিরাট। যথালগ্নে পাঁঠার গলায় কোপ পড়েছে। ঢাকীরা তুমুল ঢাক বাজাচ্ছে। রামু কামার খাঁড়ায়, কপালে রক্ত মেখে তাতা-থৈ নৃত্য করছে। ধাপে দাঁড়িয়ে মেয়েদের সঙ্গে বলিদান দেখছে করুণা। টলতে টলতে পাহাডু গিয়ে তার হাত ধরে বলল, 'করুণা! তু আমার বউ আছিস।'
এমনটি তার বাবা ধর্মধ্বজও বলেছিল। কিন্তু তারাজুর মেয়ে কসিলা আর বানারি সিংয়ের মেয়ে করুণা এক নয়। পাহাডুর জন্ম অস্পৃশ্যজাতির ঔরসে চর্মকারিণীর গর্ভে। তার কী স্পর্ধা! ঢাক বন্ধ হয়ে গেল। হই-চই পড়ে গেল। ছেলেরা পাহাডুকে টানাটানি করে বলল, 'ছিঃ পাহাড়ুদা কী করছ?' চারদিক থেকে 'মার, মার শালাকে' রব উঠল। কিন্তু কেউ মারতে হাত বাড়াল না। পাহাড় গর্জন করে বলল, 'আমার মা বলে গেছে বানারিবাবুর বেটি তোর যেন বউ হয়।'
করুণা আর্তনাদ করছিল। মেয়েরা হুটোপুটি করে পালিয়ে যাচ্ছিল। হুলুস্থুল হট্টগোল চলছিল চারটে উজ্জ্বল হ্যাজাগবাতির তলায়। রাখু কামার রক্তাক্ত খাঁড়া নামিয়ে ঘাড় কাত করে লাল চোখে দেখছিল পাহাডুকে। তার বড়ো ইচ্ছে পাহাডুর গলায় একটা কোপ মারে। কিন্তু তার খাঁড়াটা এত ভারি হয়ে গিয়েছিল যে সে কিছুতেই ওঠাতে পারছিল না।
তারপর ভেতর থেকে বানারিবাবু এসে পড়লেন। ঘরের বারান্দায় বসে ফর্দ মেলাচ্ছিলেন তিনি। ঠাকুরদালানে এসেই এই কাণ্ড দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁকে দেখামাত্র হই-হট্টগোল থেমে গেল। গম্ভীর স্বরে বললেন, 'হাত ছাড় পাহাড়। তুই মাতাল হয়েছিস। কার গায়ে হাত দিয়েছিস, দ্যাখ।'
পাহাডু বলল, 'শালো। তুমি আমার মাকে রাঁড়ি করব বলেছিলে।'
বানারিবাবু এক পা এগিয়ে এসে বললেন, 'এখনো বলছি, হাত ছেড়ে দে পাহাড়ু! নেশার ঘোরে আছিস। কার হাত ধরেছিস ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখ।'
করুণার মা তারারাণীর সেদিন প্রবল জ্বর। মায়ের মন। কী একটা ঘটেছে আঁচ করে, কিংবা জননীর সহজাত বোধে, অথবা ঠাকুরদালানে অন্তত পুজোর ক্ষণে উপস্থিত থাকার নিয়মরক্ষায়-যে জন্য হোক, দেয়াল ধরে টাল সামলে এসে উঁকি মেরেই যা দেখার দেখলেন। আর তখন অন্ধ জন্মেজয় কয়েকবার 'কী হয়েছে' জিজ্ঞাসা করেও জবাব না পেয়ে একধারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর হাতে একটা ছড়ি ছিল। তারারানী সেই ছড়ি কেড়ে নিলে জন্মেজয় শিশুর মতো অস্থির আর্তনাদে বললেন, 'কে? কে? আমি বাড়ি ফিরব কেমন করে? আমার ছড়ি ফেরত দাও!' আর ছড়িটি গিয়ে পড়ল পাহাডুর কপালে। কপাল কেটে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে এল। তবু হাত ছাড়ল না পাহাড়! চিৎকার করে বলল, 'মারছ, মারো! কিন্তু আমাকে মেরে ফেললেও তোমার মেয়ের হাত ছাড়ব না। ওই শালো বানারি আমার মাকে রাঁড়ি কর্বে বলেছিল। আমার মা বলেছিল, বানারিবাবুর মেয়েকে তু বিয়ে কর্বি।'
আবার ছড়ি পড়ল পাহাড়ুর মুখে। আরো রক্ত ঠিকরে পড়ল। তবু হাত ছাড়ল না পাহাড়। করুণার কোমল হাতে যেন দানবের মুঠি। করুণা ধাপে শুয়ে পড়েছে। দানবের নিঃসাড় শরীরে ছড়ির পর ছড়ি এসে পড়তে পড়তে ছড়ি ভেঙে গেল। আর জ্বরাচ্ছন্ন তারারানী তীব্র উত্তেজনার চাপে মূর্ছিত হলেন। তখন পাহাডু করুণার হাত ছাড়ল। তার রক্তাক্ত মুখে আলোয় ঝলক দিল বাঁকা এক হাসি। তারপর সে চারিদিকে ঘুরে মানুষগুলোর মুখ দেখে নিয়ে ফের গর্জন করে বলল, 'হাত তো ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আমার মায়ের বিচার হবে না? ওই বানারি শালা আমার মাকে রাঁড়ি করব বলেছিল!' পাহাডু হাহাকার করে উঠল, 'তার বিচার কর্বি না কোনো শালা? হুঁ কর্বি না। ক্যানে-না আমি ছোটোজাত। আমার ছোটোজাত বাবার মুখে নাকি দেবী বুলি বলতো। সে মাগিই বা কোথায় রইল রে? সে শালীবেটিও তো তখন বিচার করেনি! আজ বানারিকে দেখে লিলম, তুদেরকে দেখে লিলম। এবার চলল পাহাডু সেই হারামজাদিকে দেখতে। সহাস থাকে তো তুরাও দেখবি আয়। ধ্বজার ব্যাটা পাহাড়ু কী করে, দেখবি আয়।'
বলে সে নিজের বুকে দমাদ্দম থাপ্পড় মারল। অমনি যেন মাতালের মাতলামির রস টের পেয়ে লোকেরা মুখবিবরের সামনে হাত নেড়ে রণধ্বনি দিল, 'আ বা বা বাবা বা!'
আর পাহাড় সড়াৎ করে নাক ঝেড়ে ফেলল। সেই কান্নাজনিত সিকনিতে রক্ত ছিল। আর সে যখন ঠাকুরদালান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটছিল, তখনো তাকে নিরাপদ দূরত্ব থেকে অনুসরণ করছিল আমোদ গেঁড়েরা। মাঝে মাঝে পাহাড়কে আরও তাতিয়ে দিতে তারা 'আবা বাবা'-র রণধ্বনি দিচ্ছিল। মধ্যরাতের বন্ধ বিপণিশ্রেণীর অন্তর্বর্তী গাঢ় অন্ধকার থেকে প্রাণভয়ে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে দূরে পালালো নিশাচর নেড়িকুকুরগুলো, কারণ মানবেতর প্রাণীরা বায়ুমণ্ডলে বিপদসংকেত টের পায়। বাজার ছাড়িয়ে হাটতলা পেরিয়ে খিলানকরা ভাঙা দরজার ভেতর দিয়ে পাহাড় আরো গাঢ় অন্ধকারে মুছে গেলে জনতা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত রণধ্বনি দিতে থাকল। আকাশের দেবী এবং পৃথিবীর এক ছোটোজাতের হুদমুষলো ছোঁড়াকে পরস্পরের দিকে লেলিয়ে দিতে থাকল—'আবাবা বাবা। আবাবা বাবা।'
আর বানুকশীর্ষে কতক্ষণ পরে পাহাডুর ঊরুচাপড়ানো, বগল বাজানো ফত্ ফত্ শব্দ শোনা গেল, যা বাংলার প্রাচীন যুগের যোদ্ধাদের দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বানের ধ্বনি-সংকেত। তার মেঘ-হুঙ্কারে যুগপৎ ক্রোধ, প্রতিহিংসা, অভিমান ও ক্রন্দন ছিল। আর তার শরীরে ঝিকমিক নক্ষত্রপুঞ্জ জ্বলছিল, যেন পৌরাণিক যোদ্ধার সাজে সাজবার জন্য সে দু-হাতে নক্ষত্র ছিঁড়ে ছিঁড়ে গায়ে পরছিল। বুঝতে না পেরে নীচের জনতা ভাবছিল কার্তিকের অমাবস্যা রাত্রির নির্বোধ জোনাকিরা পাহাডুর দেহ ঘিরে জ্বলতে জ্বলতে বানুকের মাথায় পৌঁছে গেছে। তারা পাহাডুকে দেখতে পেয়ে আরো জোরে রণধ্বনি দিল। আর তখনই ইশান কোণে উল্কাপাত ঘটল। দেখামাত্র জনতা চেঁচিয়ে উঠল, 'ওই! ওই দেবী আসছেন! দেবী আসছেন!' দেবী এসে গেলেন, তারা মত্ত হয়ে লম্ফঝম্ফ করে রণধ্বনি দিতে থাকল আবার—'আ বা বাবা! আবাবাবা।'
মালদহের লোক কবি ফৈজুল্লা মুছলমানি পুঁথির ঢঙে লিখেছেন :
'দেবী বলেন শুন শুন ধর্মধ্বজের ব্যাটা।
সম্পর্কেতে তুমি দেখি মোর হও ব্যাটা।।
ওরে বাছা তোঁহার সঙ্গে না করিব জঙ্গ।
যে-যাহার ঠিঞে মাণিক আয় করি ভঙ্গ।।
পাহাড় হাঁক মারে ওরে যাস কুথায় মাগি।
তোঁমার লেগ্যে বাবজান মোর হৈছিল বৈবাগী।।
অভাগিনী মাতাজান পাইলো কত কষ্ট।
তোঁহার সঙ্গে জঙ্গ হবে বাত কহি পষ্ট।।
এই বইল্যে পাহাডুমদ্দ দু হস্ত বাড়াঞ।
তরাসো পাইল দেবী দূরে সইরে্য যাঞ।।
পালাবি কুথায় বেটি এই বইল্যে বাপা।
শূন্যের মাঝারে মা বইল্যে দিলে লাফা।।'...
চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে ফরাক্কার দিকে যেতে হরিমাটি-মাধুনিয়ার পর বায়ুকোণের আকাশে একটি নিরেট ধূসর স্পর্ধা চোখে পড়ে। বাসযাত্রীরা চাপাস্বরে বলে ওঠে, 'ওই দেখা যায় খর্জুনোর বানুক।' তারা কপালে ও বুকে হাত ঠেকায়। বাস খর্জুনার বাজারে গিয়ে থামলে কেউ কেউ গিয়ে দৌড়ে বানুকটির গোড়ায় পয়সা ও প্রণাম রেখে আসে। বানুকটি আরো কয়েক ডিগ্রি হেলে গেছে। খর্জুনা নারায়ণী উচ্চবিদ্যালয়ের পণ্ডিতমশায় চক্রধারী চক্রবর্তী রোজ দু'বেলা নিকটবর্তী বোডিং থেকে গাড়ু হাতে কানে পৈতে গুঁজে বেরিয়ে বানুকের পেছন যান এবং ফেরার সময় গোড়া থেকে একখানি করে ইট খসিয়ে আনেন। বোর্ডিংঘর থেকে রান্নাঘরে যাবার পথে খানিকটা জলকাদা পড়ে। ইটগুলি সেই তিরিশ ফুট জলকাদার ওপর চমৎকার একফালি সোলিং রচনা করেছে। তবে বোঝা যায় বানুকটি আর 'জাগ্রত' নয়। তার মাথার ফাটলে কচি পিপলতরু উঠেছে। মাথাটি শকুনের বিষ্ঠায় কলঙ্কিত। কাকেরাও অকুতোভয়ে হাড়গোড় বয়ে এনে রাখে। সুতরাং বোঝা যায়, আকাশের দেবী বানুকটিকে পরিত্যাগ করেছেন। আর একটি বলার বিষয় যে, ওই পিপুলতরুটি সাধুর সেই ধজার মতোই বানুকটির আয়ুর ধজা। অবশেষে হতভাগ্য বাহুক নিজের আয়ুকেই নিজের মাথায় স্থাপন করেছে।...·
লেখক পরিচিতি : প্রখ্যাত কথাশিল্পী সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মুর্শিদাবাদ খোশবাসপুর গ্রামে ১৯৩০ সালে অক্টোবর মাসে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে বাড়ি থেকে পলাতক কিশোরের জীবন অতিবাহিত করেছেন। রাঢ় বাংলার লোকনাট্য ‘আলকাপের’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাচ-গান-অভিনয়ে অংশ নিয়ে জেলায় জেলায় ঘুরেছেন৷ তিনি ছিলেন আলকাপ দলের ওস্তাদ বা গুরু। নাচ-গানের প্রশিক্ষক। নিজে আলকাপের আসরে বসে হ্যাজাগের (পেট্রোম্যাক্স) আলোয় দর্শকের সামনে বাঁশের বাঁশি বাজাতেন। নিজের দল নিয়ে ঘুরেছেন সারা পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, এমনকি বিহার-ঝাড়খন্ডেও। তাই পরবর্তী জীবনে কলকাতায় বাস করলেও নিজেকে কলকাতায় প্রবাসী ভাবতেই ভালোবাসতেন। সুযোগ পেলেই বার বার মুর্শিদাবাদের গ্রামে পালিয়ে যেতেন। সেই পলাতক কিশোর তার চরিত্রের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। ঘুরতেন সেই রাখাল বালকের মাঠে, হিজলের বিলে, ঘাসবন ও উলুখড়ের জঙ্গলে, পাখির ঠোঁটে খড়কুটো আর হট্টিটির নীলাভ ডিম—সেই মায়াময় আদিম স্যাঁতসেতে জগতে। তিনি প্রায় ১৫০টি উপন্যাস এবং ৩০০টি ছোটগল্প রচনা করেছেন। প্রয়াত হন ২০১২ সালে ৪ঠা সেপ্টেম্বর। গল্পটি দেজ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্প বই থেকে নেওয়া। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর একটি।


0 মন্তব্যসমূহ