দেবাশিস সরকারের গল্প : মরা হাতি লাখ টাকা, বুড়ো হাতি কত?


ভূমিকা
বক্ষ্যমান আখ্যানটির সঙ্গে সংবাদপত্রের রসালো কিছু প্রতিবেদন আচ্ছা করে মেশানো হয়েছে। কারণটা দ্বিবিধ—১. সাহিত্যবস্তুর প্রচলিত প্রকোষ্ঠায়ন, (cellularisation ) যথা—গল্প , কবিতা , প্রবন্ধ এইরূপ বিভাজনকে অস্বীকার করা। এবং ২. বছরের পর বছর, মাসের পর মাস ধরে যত্তসব একঘেয়ে গল্প পড়ে পড়ে আপনাদের চোখে বা জিভে তো চড়া পড়ে গেছে। তাই একটু চোখ/মুখ পাল্টানোর জন্যে এই ব্যবস্থা আর কি!

বাস্তবে সম্ভবপর না হউক, কল্পনায় রমাকান্ত কামার ও বিজয় মালিয়া একত্রে অন্নগ্রহণ করিবে না কেন?
আয়েস করে বসুন , তারপর পড়া শুরু করুন।

এক.
সংবাদ প্রতিবেদন :: হোটেলের রুম থেকে ৬ কোটি টাকার হীরের আংটি হারিয়ে গেল।
প্ল্যাটিনাম আর ৬.১ ক্যারেট হীরের তৈরি আংটিটির বাজার দর ছিল পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা । প্যারিসের হোটেলের ঘরে টেবিলের ওপর সেই বহুমূল্য আংটি রেখে বাইরে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার এক মহিলা টুরিস্ট। ফিরে এসে দেখেন আংটি গায়েব! ভেবেছিলেন হোটেলের কোন কর্মী চুরি করেছে। পুলিশে অভিযোগও করেন মহিলা। ক্ষতিপূরণ হিসেবে লাক্সারি হোটেলে তিনরাত বিনামূল্যে ওই অভিযোগকারিনীকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অবশেষে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের গারবেজ থেকে উদ্ধার হয় এই আংটি! ফেরত দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন হোটেল কর্তৃপক্ষ ।
(লা প্যারিসিয়ান , প্যারিস ০৯/১০/২২)

“বিজনেস টাইকুন রাহুল শর্মা তাঁর প্রেমিকা বলিউড অভিনেত্রী অশিনকে কুড়ি ক্যারেটের হীরের আংটি উপহার দিয়ে বাগদান পর্ব সারলেন। জানা গেছে এই বহুমূল্য আংটির দাম প্রায় ছকোটি টাকা! গ্ল্যামার জগতের একমাত্র আলিয়া ভাট এবং দীপিকা পাড়ুকোনের যথাক্রমে তিন কোটি ও আড়াই কোটি টাকার বিয়ের আংটি আছে।”
(টাইমস অব ইন্ডিয়া ১৪/১১/২১)

দুই.
ভালো করে ঢাকাঢুকি দিয়ে চিরুনির মোটা দাঁড়াগুলো দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে প্রমথ আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “কাকা! একটা পশনোর জবাব দ্যান দেখি! আজ তককো ছ’জনকে পশনোটা কইরেছি, কেউই বইলতে পারে নাই। আমনি বলেন ত দেখি, একজন মাইনষের মাথায় কতগুলন চুল আছে?”

চূড়ান্ত বোকার মতন এ প্রশ্নটি আমাকে করার কী মানে হয় বুঝতে পারলাম না। সস্তার চায়ের ঠেকে এই সমস্ত জামাই ঠকানো প্রশ্ন চলে বোধহয়। নেহাত সাতসকালে আজ ভালোমতন পায়খানা হয়েছে, না হলে এ প্রশ্নেই আমার মটকা গরম হয়ে যেত। এদিকে বাড়িতে ছেলের বোকামো দেখে মনের শান্তি উড়ে গেছে কবেই! এখন রাস্তায় ঘাটে পোঁদ পাকামো ভালো লাগে না। সামনের দেওয়ালে ঝোলানো আয়নায় তাকিয়ে দেখি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে চিরুনি হাতে দাঁত কেলিয়ে হাসছে প্রমথ নামের নাপিতটি। মালটা এতই পোঁদপাকা যে প্রায় আমার সমবয়েসী, এমনকি এক দু বছর বড়ও হতে পারে, তবু খোকা সেজে আমাকে ‘কাকা’ সম্বোধন করে! 

হুঁ! তোর চোদ্দপুরুষের কাকা! কড়া একটা জবাব ঠোঁটের আগায় এসেই গেছিল, বলার আগে ভেবে দেখলাম, এই প্রমথর সঙ্গে ঝামেলা হলে আমাকে তো আবার ছুটতে হবে বাজারের ভেতরে এসি লাগানো, দেওয়াল জোড়া আয়না লাগানো ঝকঝকে ওইসব সেলুনে, যেখানে আবার চল্লিশ টাকায় হবে না, নাকি দশগুণ বেশি টাকা লাগে চুল কাটাতে! ওখানের নাপিতরা ইউনিফর্ম পরে চুল কাটে, মোমের পুতুলের মতন হাবভাব। সস্তার সেলুনের নাপিতরা তো একটু বাচাল হবেই! কী আর করা? স্টেটবাসের টিকিট কেটে কলকাতা যাওয়ার সময় তো আর ভলভো বাসের আরাম খুঁজলে চলবে না। আয়নার ভেতরে প্রমথর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে বিরক্তমুখেই বললাম, “কার এত সময় আছে বাপু যে একমাথা চুলের ভেতরে একটা একটা করে গুনবে? গোনা যায় কখনও? ”

— হ্যা হ্যা! কাকা! যায় যায়! সেই লেগেই ত জিগাস কইরছি! পেত্যেক মাইনষের মাথায় গড়ে নব্বুই হাজার থেকে দেড় লাখ করে চুল আছে।

ঠোঁট উল্টে বললাম, “তা হবে বলচো যখন। মিলিটারি ছাঁট করে দিও না আবার। মন দিয়ে কাটো।”

আমার মাথার চুল উল্টোপানে আঁচড়াতে আঁচড়াতে প্রমথ বলল, “বাঃ! কী ফাইন চুলটা লিয়ে এসেচ্যান গ! মনে লিছে কি পুখুরের জলের ভিতরে তরোয়াল চালাচ্চি! ডেলি শ্যাম্পু করেন নাকি? আগেও দেখেচি, ইরম চুল কেটে খুবেই আরাম!”

সকালে কোষ্ঠসাফ জনিত প্রশান্তি চতুর্গুণ হলো, হাসিমুখেই বললাম, “বেশ বললে! আঁ? ‘কি সুন্দর চুলটা এনেছেন...’। হ্যা! আমি আর আনলাম কোথায়! চুল তো আমার মাথাতেই ছিল।”

প্রমথ শূন্যে দুবার কাঁচি চালিয়ে কচকচ করে খানিকটা বাতাস কেটে নিল, তারপর কাঁচি নামিয়ে কুচ করে কতকগুলো চুল কেটে বলল, “এক একটা লোক এমন চুল লিয়ে ইখেনে আসে না কাকা যে কী বইলব ! মাথায় কনোদিন সাবান দেয় নাই, বকাচদাগুলো চুলে জট লিয়ে কাটাতে চইলে আসে। উয়াদের ভাবটো হচ্ছে কি চুলটা কাটানোর পরে ত শ্যাম্পু কইরতেই হব্যাক, সেই লেগে চুল কাটানোর আগে যদ্দিন শ্যাম্পু না করে থাকা যায়!”

—সে কি গো ! সাবান মাখে না, শ্যাম্পু করে না এরকম লোক আছে নাকি!
—গাদাই! হুই যে লেবার ক্লাসের লোকগুলন! সারাদিন কাজ করে সেঁঝের বেলায় কনো পুখরে যাঁয়ে ঝপাং করে একটা ডুব দিয়ে এলেক! ব্যস! সাবান ,শ্যাম্পু মাখার পোয়সা পাব্যাক কুথায়!

হুঁ! এ ব্যাপারটা আমার অভিজ্ঞতার বাইরে। ঠিকই! শ্যাম্পু তো দূরের কথা, সাবানও ক্রয়সাধ্য নয় এরকম লোক আছে বইকি! সেদিন খবরের কাগজে পড়ছিলাম, ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’ ২০২৫ সালের রিপোর্ট বলছে পৃথিবীর ক্ষুধার্ত ১২৭ টি দেশের মধ্যে ১০৫ নম্বরে রয়েছে ভারত। এই এশিয়া মহাদেশের মধ্যে কেবলমাত্র আফগানিস্তানেই রয়েছে ভারতের চাইতে কিছু বেশি ক্ষুধার্ত মানুষ! সারা বিশ্বে রোজ এক ডলার অর্থাৎ ৮৬ টাকার বেশি খরচ করার সাধ্য নেই ১.২ বিলিয়ন মানুষের। ২.৮ বিলিয়ন মানুষ রোজ দু-ডলারের বেশি খরচ করতে পারে না। আমাদের দেশের সিকিভাগ মানুষ রাতের বেলায় উপোস করতে বাধ্য হয়। তারা শ্যাম্পু, সাবান কিনবে না চাল কিনবে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, “তাতে তোমার কি অসুবিধা হল?”

প্রমথ দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আয়নার সামনে ঝোলানো ৱ্যাকটিতে দু-তিনবার চিরুনির টোকা মেরে জবাব দেয়, “ইখেনে কটা কাঁচি আছে? দুটো। আমার হাতে একটা লিয়ে মোট তিনটে। হল? ইয়ার বেশি একটা নাপিতের কটা কাঁচি থাইকতে পারে? একটা জটপড়া চুল কাটতে দুটো কাঁচির ধার চলে যায়! আবার পাজিয়ে না লিয়ে আসা তককো উ কাঁচিতে ক্যালা সামাইন্য কাগজ কাটাও যাবেক নাই। সেলুন বন্ধ করে চলো, বাজার মোড়ে কাঁচি পাজিয়ে আনি! খদ্দের এসে ফিরে যাক! কাঁচি পাজানোর খরচ যেমন তেমন, আমার এক বেলার রজগারের পঁদ মারা গেল!” গোলাম মুর্শিদের সম্পাদনায় ঢাকার বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বিবর্তমূলক বাংলা অভিধানে’ সংকলিত শব্দসংখ্যা আছে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার । ওই লিস্টে ‘পাজানো’ শব্দটা নেই বোধহয়। তাই ওই সংবিধান বহির্ভূত শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমি সেই মুহূর্তের জিজ্ঞাস্য পরিবেশন করি, “পাজিয়ে আনি মানে?”

—পাজানো মানে—ওই ইয়া—কি বলে—শানানো।
—অ! তা তোমার এই কাঁচি পাজানোর খরচ কি রকম?
—কাঁচি পেছু পনচাশ টাকা। ওই চুদির ভাই লেবারটার চুল কেটে আমি কত পাব? চল্লিশ? তাইলে বুজতে পারচেন পঁদে কি রকম বাঁশটি ঢুকে গেল! বয়েস থাইকলে হাবিব সেলুনের কোর্সটো করে লিথম! ছ’ মাসের টেনিং। হাতে কলমে কলকাতার সেলুনে কাজ শিখাব্যাক ছ’মাস ধরে, থাকা-খাওয়া, টেনিংয়ের খরচা সোব উয়াদের। তেবে হঁ! তিরিশ বছরের বেশি কাউকে লিবেক নাই। টেনিংয়ের খরচ, তারপর চাগরি উয়ারাই দিব্যাক। আমাদের জুয়ান বয়েসে ত ইসব সুযোগ ছিলনি। তাহালে কন শালা ইসব সেলুনে গতর খাটাতে আসত!

—এই সেলুন তোমার নিজের নয়?
—কুথা পাবেন? সেলুন মালিকের। সারাদিনে চুল কেটে যা রজগার তাতে হাফ আমার হাফ উয়ার। মাল মেটেরিয়াল যা লাগে সোব উ দেয় অবশ্য।
—তাহলে আর কি! কাঁচি পাজানোর খরচটা তো ওই দেবে।
—তেমনি একবেলা যে সেলুন আমার বনদো রইল? রজগারটা হবেক কি করে?

ব্যাপারটা আমার কাছে কি রকম অদ্ভুত লাগলো! সেলুনের আবার চুল কাটার কোর্স! জাঙ্গিয়ার বুক পকেটের মতন যে! কলকাতায় থাকা খাওয়া প্লাস ছ মাসের ট্রেনিং দেবে, বিনা পয়সায়? নিঃসন্দেহ হবার জন্য জিজ্ঞেস করলাম সেটি। প্রমথ বলল, “মাগনা লয় । এই কোর্সটার খরচা হচ্ছে দু লাখ টাকা। ছ’মাস টেনিংয়ের জন্য লাগব্যাক নব্বই হাজার টাকা। বাকি এক লাখ দশ হাজার উয়াদের মেসে ছ’মাস থাকা খাওয়ার খরচা। মোট দু’ লাখ টাকা লোনের ব্যবস্থা উয়ারাই কইরে দিব্যাক। হঁ! আপনার জমির দলিল বা গয়না ব্যাঙ্কে বন্ধক দিতে হব্যাক।

—বেশ! জমি বা গয়না বন্ধক রেখে লোনের অবস্থা না হয় হল, এবার ওই লোন শোধ করতে না পারলে তো ওই জমি বা গয়না ব্যাঙ্কের গর্ভে চলে গেল। তাই না ?

প্রমথ বলল, “শোধ করতে লারব্যাক ক্যানে গ! টেনিং শেষে উয়াদের সেলুনেই পনেরো হাজার টাকা ব্যাতনের চাগরি। কনো ঝুট ঝামেলা নাই! মাসে দশ হাজার করে ব্যাঙ্কের লোন শোধ করুক ক্যানে! তা বাদে কাজের পরিবেশটা কিরকম সেটাও দ্যাখেন! সব সময় এসি চলছে! তাছাড়া ওইসব সেলুনে ইরকম জটপড়া চুল লিয়ে কনো মামেগোর ঢুকার মুরোদ নাই! উখেনে সোব খদ্দেরেরই ইরকম ফুরফুরে চুল! কেটেও আরাম!”

আমার খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্যে ওর উচ্ছ্বাসে সামিল হতে পারি না, ভুরু কুঁচকে বলি, “কিন্তু মাসে দশ হাজার করে শোধ করলে তোমার কুড়ি মাস লাগছে শুধু মূল লোনটা শোধ করার জন্যে। এরপর ব্যাঙ্কের সুদ আছে। ধরো, তিনটি বছর ধরে তোমাকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। সম্ভব কখনও?”

প্রমথ গভীর ভাবনার মধ্যে ডুবে গিয়ে দু’চারবার ঘাড় নেড়ে আমার কথা সায় দেয়, বলে, “হঁ! ইটা যে আমি ভাবি নাই তা লয় কাকা! তেবে কিনা জীবনে দাঁড়াতে গেলে তিনটে বছর কষ্ট তো করতেই হব্যাক। তিন বছর বাদে তেমনি মাসে কড়কড়ে পনেরো হাজার টাকা! কাউকেই ভাগ দিবার নাই। কত ফূর্তি করবি কর না!”

তিন তিনটে বছর ধরে শ্রমিক শোষণের কি সুন্দর প্ল্যান ফেঁদেছে কোম্পানিগুলো। লোকটা ব্যাঙ্কের কাছে যেমন জমি বা স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখেছে তেমনই নিজেকেও বন্ধক রেখে ফেলছে।

পনেরো হাজার টাকায় এখনই বা কি হয়! তিন বছর বাদে বাজারে জিনিসপত্রের দাম কি থাকবে কিছুই ভেবে ওঠা যায় না! আমার মধ্যবিত্ত অবস্থানের নিরিখে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মনে পড়ে গেল ১২৭টি গরিব দেশের মধ্যে ১০৫ নম্বর অবস্থানে থাকা দেশের মানুষ মাসে পনেরো হাজারের বেশি কিই বা আর আশা করতে পারে!

আচ্ছা তাও না হয় মানা গেল। মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা মজুরিতে তিন বছর ধরে খাটানোর একটা লেবার পাওয়া গেল। এবার তিন বছর পরে যে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে না তার গ্যারান্টি কি আছে?

মনের এই সন্দেহ প্রমথর কাছে ব্যক্ত করে কী লাভ! পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের শ্রমের শোষণ চলছে অহরহ। আমার বাড়িতেই রোজ সকালে যে কাজের মেয়েটি আসে তাকে কি আমরা দিনের পর দিন ধরে শোষণ করে চলছি না! আমার এই ভাবনার মাঝেই প্রমথ বলে উঠল, “নাপিতের আর একটা নাম ত নিশ্চয়ই জানেন কাকা! নরসুন্দর! মানে নরকে যে সুন্দর করে সাজিয়ে গুজিয়ে এই সেলুনের বাইরে বার করে। তাই ত? কুথাও পড়েছিলম যে মিস্ত্রিগুলন তাজমহল তোয়ের করেছিল তাদের হাতের আঙুলগুলো নাকি ওই সমরাট সাজাহান কেটে লিইছিল। হঃ! আমাদের আঙুল ত আর কেউ কেটে লিচ্ছে নাই। সেই সাজাহানের আমল তো আর নাই, এখন আমাদের সবার সমান ওধিকার। মোদিই বলেন আর টাটা বা আমি! মোদির মাও ভোট দেয় আবার টাটা বা আমার মাগও ভোট দেয়। সবার ভোটেরই একোই দাম! কাউরই ভোট এক পয়সা বেশি দামি লয়! হঁ! ইবার যার কপালে যেরকম কম্ম লেখা আছে সে সেটাই করছে! মোদী, মমতার কপালে আছে দিনরাত শুদু বুকনি মারা আর আমার কপালে লোকের বগল কামানো আর ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে ঘুমানো। সিখেনে শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখলে ত চলবেক নাই! আর যদি দেখিও, কার কি ছিঁড়া যাচ্ছে? বঠে কিনা?”

তিন.
সংবাদ প্রতিবেদন :: ভারতের এমপিদের সম্পত্তি!

সম্প্রতি এ ডি আর (অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস) ভারতের এমপিদের সম্পত্তির একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে আমাদের দেশের ৯৩ শতাংশ সাংসদ কোটিপতি আর কোটিপতি সাংসদদের মধ্যে ১০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক ৪২ শতাংশ! ২০০৯ সালে লোকসভায় কোটিপতি সাংসদ ছিলেন ৫৮%। বিগত চারটি লোকসভা নির্বাচনে কোটিপতি সাংসদের হার ৩৫% বেড়েছে। বিজেপির ২৪০ জন সাংসদ এর মধ্যে ২২৭ জন কোটিপতি! কংগ্রেসের ৯৯ এর মধ্যে ৯২ জন, তৃণমূলের ২৯ জনের মধ্যে ২৭ জনই কোটিপতি!

অর্থাৎ, দেশের দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিয়ে যাঁরা আলোচনা করবেন তাঁদের বেশিরভাগই কোটিপতি সাংসদ। ভারতের অর্ধেক লোক যে রাতের বেলায় পেটে খিদে নিয়ে ঘুমোতে যান, কোটিপতি বলে তাঁরা এদের কষ্ট বোঝেন না নাকি!
(এই সময়, ১৮ জুন, ২০২৪)

চার.
হাতের ম্যাগাজিনটা আমার দিকে এগিয়ে শিউলি বলল, “এটা পড়ো! একটা চমৎকার আর্টিক্যাল আছে আর সেটা তোমাকে নিয়েই!”
—আমাকে নিয়ে? কি নিয়ে?
—ওয়েটিং! যেটা তোমার হ্যাবিট। একজন মানুষ তার আয়ুষ্কালের কতগুলো ঘণ্টা শুধু অপেক্ষা করে করে কাটিয়ে দেয় জানো?

ইনভার্টারের দৌলতে বাড়িতে আলো, পাখা চলছে বটে তবে কেবল টিভি তো বন্ধ, তাই বোধ হয় শিউলির হুঁশ হয়েছে যে এখন আমাকে একটু খোঁচা দেওয়া যেতে পারে।

ঠোঁট উল্টে বললাম, “দূর! তোমার ওইসব মেয়েলি ম্যাগাজিন! শাড়ি গয়না আর ঘর সাজানোর বাইরে কিছু ছাপা হয় নাকি!” শিউলি বলল, “শোনো তাহলে! শুনবে , নাকি এটা পড়েই নেবে?”

বললাম, “নাঃ! বলে নাও, তবে হ্যাঁ! টিভি চালু হয়ে গেলে ‘পরে বলব’ বললে চলবে না! শেষ করতে হবে। তার আগে দাঁড়াও! মুডটা আনার জন্য জম্পেশ করে একটা সিগারেট ধরাই!”

শিউলি গম্ভীরমুখে বলল, “শুভ চাকরিতে জয়েন করার পরে তোমার তো সিগারেটের মাত্রাটা বেশ বেড়ে গেছে! নানারকম বাহানায় একটার পর একটা টেনে যাচ্ছো! বইপত্র, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ এসব পড়েও তো সময় কাটাতে পারো! কোনো চর্চা নেই তোমার? ঢং দেখে গা জ্বলে যায়! আর কারোর ছেলে যেন চাকরি করতে যায় না!”

গায়ের জ্বালা চেপে বিড়বিড় করে বললাম, “যায় । তবে এরকম মজুরগিরি করতে খুব কম ছেলেই যায়!” প্রকাশ্যে বললাম, “কি বলছিলে বলো!”

সুমি বলল, “শুধুমাত্র অপেক্ষা করে করেই তোমার মতন একজন মানুষ তার জীবনের কতগুলো দিন নষ্ট করে জানো?”

বললাম, “অপেক্ষা তো সব জায়গাতেই করতে হয়। রেশনের দোকানে, মুদিখানায়, এমনকি পানগুমটির সামনে সিগারেটের জন্যেও তো অপেক্ষা করতে হয়। আমি যাওয়া মাত্র সঙ্গে সঙ্গে তো কেউ আমার হাতে দিয়ে দেয় না। আবার ডাক্তারখানার সামনে, বাসে বা ট্রেনে কোথাও যেতে—সর্বত্রই অপেক্ষা! তো , কি এমন নতুন কথা লেখা আছে ম্যাগাজিনটায়?

—তুমি যেরকম শুভর জন্যে ঘণ্টা পর ঘণ্টা ধরে রোজ অপেক্ষা কর, সেরকম শুধুমাত্র অপেক্ষা করে করেই একজন মানুষ তার সারা জীবনের কতগুলো ঘন্টা বা দিন নষ্ট করে?

বিরক্ত ভঙ্গিতে বললাম, “তার কোন ঠিক আছে নাকি? আলাদা মানুষ, তাদের সমস্যা আলাদা আলাদা। কাউকে দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হয় কাউকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা! এর কোনো হিসেব হয় নাকি!”

হাতের ম্যাগাজিনটা ভাঁজ করে চায়ের টেবিলের ওপর রেখে হাসিমুখে শিউলি বলল, “বেশ! তুমি করো অপেক্ষা ঘণ্টা পর ঘণ্টা ! তার আগে জানো কি একটা মানুষের জন্যে মোট ক’ঘন্টা বরাদ্দ থাকে?”

শুভ কখন ফেরে না ফেরে সে নিয়ে কোনো টেনশন শিউলির কি একেবারেই থাকে না! না হলে রাত আটটা বাজতে চলল, দুপুর থেকে ছেলের ফোন নেই, সে সময় একজন মা হয়ে মেয়েদের ছেঁদো ম্যাগাজিনে কি ভুলভাল লেখা পড়েছে সে নিয়ে আলোচনা করতে বসে কেউ!

ঠাট্টার সুরে বললাম, “একজন মানুষ ক’ঘন্টা বাঁচবে সেই হিসাবও হয়ে গেছে?”

বোধহয় ঘরের গুমোট ভাবটা কাটানোর জন্য আমার সঙ্গে কোন তর্কে মেতে উঠতে চাইছিল শিউলি । বলল, “হ্যাঁ! তাও আছে। লেখাটা পড়েই নাও না, শুভর তো আসতে দেরি আছে। শোনো, ধরা যাক তুমি ৮০ বছর বাঁচলে। বছরে ৫০ সপ্তাহ ধরে হিসাব করলে ৫০ গুণিতক ৮০ মানে মোট চার হাজার সপ্তাহ তাহলে তোমার আয়ু। হল? এবার ওই চার হাজার সপ্তাহ মানে কত দি—”

শিউলির ফ্লোতে বাধা দিয়ে বলি, “দ্যুৎ! ওই ম্যাগাজিনের হিসাবে গন্ডগোল আছে। পঞ্চাশ নয়, বাহান্ন সপ্তাহে একটা বছর হয়। ছাড়ো ওসব! আটটা দশ বাজে, আমার ফোন তো ধরে না, তোমার ফোন থেকে শুভকে একটা ফোন করো না! কি ব্যাপার, কোন খবর নেই কেন?”

শিউলি বলল, “এখন না। ন'টা পেরোলে করব। এই টেনশন নিয়ে অকারণ অপেক্ষা না করলে তুমি তোমার জীবনের কতগুলো ঘণ্টা অন্যভাবে কাটাতে পারতে, সেটাই জানো না। সেই জন্যেই এই ম্যাগাজিনটা পড়তে বললাম। আবার বলছি, অ্যাভারেজ হিসাব হলো, একজন আশি বছর বয়েসী মানুষ তার জন্যে বরাদ্দ চার হাজার দিনের মধ্যে ২৩৫টা দিন শুধুমাত্র অপেক্ষা করেই কাটিয়ে দেয়, দিতে বাধ্য হয়! তোমার আশি হতে বহু দেরি, তবে তুমি এর মধ্যেই ২৩৫ দিন কেন, এক বছর নষ্ট করে ফেলেছ!”

দুশো পঁয়ত্রিশ দিন! বাব্বা! এতো দিন! দ্যুৎ! হয় নাকি! কৌতুহলী হলেও সেই মুহূর্তের বিরক্তিটাও উগরে দিয়ে বলি, “আমাদের মতন কাউকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হয় না। এমন কপাল আমার যে ছেলেটা একটা ভালো চাকরি জোটাতে পারল না! রোজ সেই একই ছবি! রাত নটা–সাড়ে নটায় ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ি ফিরবে বেচারা!”

আমার এই ক্ষতে মলম লাগানোর ভঙ্গিতে শিউলি বলে উঠল, “শুধু কি ও–ই গো! প্রত্যেকটি জোয়ান ছেলেরই এই দশা! সকাল নটা থেকে রাত নটা, বারো ঘ– ” মোবাইল বেজে উঠতে ওর কথা ওই ঘ–তে এসেই থেমে গেল । শিউলি ফোন তুলে বলল, “হ্যাঁ বল! এতক্ষণে শেষ হল? আজ বিকেলেও কোথাও যেতে হয়েছিল নাকি?”

বুঝতেই পারছিলাম শুভর ফোন, রোজই একবার টিফিনের সময়ে আর এখন, ছুটি হলে ফোন করার সময় পায় ছেলেটা। তাই কান খাড়াই থাকে। শুনলাম , শিউলি বলছে , “আঁ? পাণ্ডবেশ্বর—সে তো বহুদূর! ওখান থেকে এই এতক্ষণে বেরোবি? সেকি!—তারপর? কিভাবে ফিরবি? এতো রাতে আর বাস আছে নাকি!—ও! আসানসোল থেকে লাস্ট ট্রেন? আঁ?—সেকি! দুর্গাপুর রাত বারোটা—একটা? আমি ভাবতে পারছি না, তোর বাবার সঙ্গে কথা বল!”

আমার হাতে মোবাইলটা তুলে দেওয়ার আগে শিউলি বলল, “এই দ্যাখো! ওকে সন্ধ্যেবেলায় সেই পাণ্ডবেশ্বর না কোথায় যেন যেতে হয়েছিল! এখন কিভাবে ফিরবে, কি করবে আমি কিচ্ছু ভাবতে পারছি না! তুমি একটু বোঝাও ওকে! ”

মোবাইল হাতে নিতে ছেলে ফিসফিস করে বলল, “বাবা! সিকিউরিটির কারণে এসব কথা ফোনে বলার বারণ ছিল, বিকেল পাঁচটায় বেরিয়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে পাণ্ডবেশ্বরে এসেছি। এখানে আমাদের ব্যাঙ্কের একটা এটিএম কাউন্টার আছে। ওই এটিএম মেশিনে ওই পাঁচ লাখ টাকা ঢুকিয়ে কাগজপত্র সই করাতে এই রাত আটটা বাজলো। এখানে এটিএম এর দায়িত্বে যে ভদ্রলোক আছেন তার আসানসোলে বাড়ি, তার বাইকে চেপে আসানসোল স্টেশনে যাচ্ছি। রাত সাড়ে নটার পরে স্টেশনে কোনো লোকাল বা লেট এক্সপ্রেস ট্রেন কি পাবো জানি না। পৌঁছতে মাঝরাত হবে। তোমরা শুয়ে পড়ো। ”

মাথা গরম হয়েই ছিল, জিজ্ঞেস করলাম, “তোদের ব্রাঞ্চের ম্যানেজারটি এতক্ষণে বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়েছে তো? আর তুই একটা বন্ডেড লেবার, তোকে পাঠিয়েছি ওদের পায়ে তেল মালিশ করতে। একবার ফোন করে তোর ওই প্রভুর খোঁজ নে! সে এতক্ষণে বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়েছে! আর তুই হতভাগা চামচা সারারাত আসানসোল স্টেশনেই পড়ে থাক! তোকে আর ফিরতে হবে না। যদি এ ঘরে ফিরতে চাস তাহলে কাল সকাল দশটায় তোদের ব্যাঙ্ক খোলার পরে ওখানে গিয়ে আগে চাকরি থেকে রিজাইন করবি তারপর ঘরে ফিরবি। যথেষ্ট হয়েছে!” 

শুভ বুঝে গেল বাবার মেজাজ এখন চড়ে আছে, তবু বলল, “এখন তোমাকে বোঝানোর বা তোমার সঙ্গে তর্ক করার সময় নেই। আমি আগে ওর সঙ্গে আসানসোল স্টেশনে যাই, ট্রেনে উঠে তোমাকে ফোন করছি।” মোবাইল হ্যান্ডসেটটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে গিয়ে বললাম, “শালার বালের চাকরি! নাও! রাত সাড়ে বারোটা একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো! হুঁ! একটা ভদ্রস্থ চাকরি আজ অব্দি জোগাড় করতে পারল না।”

শিউলি বললো, “মুখ খারাপ করছ কেন? অনেকেই তো দেখি এই ‘আয় পি সি আয়’ ব্যাঙ্কে কাজ করেই রংবেরঙের চারচাকা গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! তাদেরকেও হয়তো চাকরির শুরুতে এরকম রাত বারোটা একটায় ফিরতে হয়েছে! এই কাগজেই তো সেদিন পড়লাম! সেই যে কোন কোম্পানির যেন মালিক, রামমূর্তি না কৃষ্ণমূর্তি কি যেন নাম, সে বলছে, ‘প্রত্যেকটি মানুষকে সপ্তাহে ষাট ঘণ্টা কাজ করতে হবে!’ গোটা দুনিয়ারই তো তাই নিয়ম! তলার দিকের লোকেরাই বেশি পরিশ্রম করে, ওপরের দিকের লোকেরা হয়তো অত খাটে না। চাকরি জীবনে শুরুর থেকেই ও কি পায়ের উপর পা দিয়ে বসে থাকবে এরকম ভেবে রেখেছিলে?”

বুঝলাম শিউলি আমাকে স্তোকবাক্য দিয়ে ঠান্ডা করতে চাইছে। বললাম, “তলার দিকের লোকেদের গতরই ওপরের দিকের লোকের বাবুয়ানি করার মশলা। যুগ যুগ ধরে এই শোষণ চলে আসছে। সেই কবে সুকান্ত বলে গেছে, “বড়লোকের ঢাক তৈরি গরিব লোকের চামড়ায়।” এসব আটকানোর জন্যই ট্রেড ইউনিয়ন বলে একটা জিনিস হয়, এইসব প্রাইভেট ব্যাঙ্কে আর—! আমার ছেলেটা গাধা আর ল্যালা বলেই ওকে এভাবে খাটিয়ে নিচ্ছে! ও যদি তখন বলতো যে বিকেল পাঁচটায় পাণ্ডবেশ্বর যাবে না, কারোর সাধ্য ছিল ওর ঘাড় ধরে পাঠানোর? ওর কলিগরা বুঝেই গেছে ওকে যাই বলা হোক না কেন, ও না করবে না তাই এরকম খাটাচ্ছে!”

—তুমি ঘরের মধ্যে বসে আছো বলেই ওসব বুকনি মারতে পারছো! প্রাইভেট ব্যাঙ্কে ওসব মামা বাড়ির আবদার চলে না। স্ট্রেটকাট বলে দেবে, ‘তাহলে কাল থেকে আর এসো না।’ হুঁঃ!”

শিউলির সঙ্গে তর্ক করা বৃথা বুঝে চুপ করে যাই । রাত বারোটা একটা অব্দি ছেলে না আসা পর্যন্ত সময়টা কিভাবে কাটাবো ভাবতে থাকি।

ঘুম থেকে উঠেছিলাম অনেক আগেই, পুত্রের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হল সকাল নটায়। ভাগ্যিস আজ রবিবার ছিল তাই তার একটু কথা বলার সময় আছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রথম যে বাক্যটি শুভ বলল তাতে চমকে উঠলাম! “বাবা! এই খাটনি আর পোষাচ্ছে না। চাকরিটা ছেড়ে দেবো ভাবছি।” 

মনের খুশি চেপে বললাম, “আমার আপত্তি নেই। রোজগারটাই বড় কথা নয়, ভিখিরির সামনে পেতে রাখা চটটাও তো রোজগার করে। তবে সারাটা দিনে কিছু না কিছু তো করবি? নতুন করে কোন পড়াশোনা—”

—পড়াশোনা কাম রোজগার দুটোই! একটা সুযোগ আছে।”
শিউলি বলল, “এই বয়সে দুম করে চাকরি ছেড়ে দিবি! আর যদি কোন চাকরি না পাস? ”

রাগত চোখে শিউলির দিকে তাকালাম। এটা কি একটা জীবন হলো নাকি! শুধু শুভর কেন, বাবা-মা হিসেবে আমাদের জীবনটাই বা কি এমন সমৃদ্ধ! একমাত্র সন্তান রাত কটায় বাড়ি ফিরবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই! বই পড়া, গান শোনা তো দূরের কথা, একটা জোয়ান ছেলে, সিনেমা দেখতে যাবে বা খেলার মাঠে কিংবা টিভিতে কোন খেলা দেখে সময় কাটাবে বা সমমবয়েসি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবে সে সময়টুকুও নেই! এই মিলেনিয়াল প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল! অথচ গান, নাটক, সিনেমা, কবিতা, গল্প–উপন্যাস মিলিয়ে বাঙালির সংস্কৃতির ভাণ্ডারটি তো দস্তুরমত সম্পদশালী! ভোক্তা কই! এরা কখন দেখবে বা পড়বে বা গান শুনবে!

গতকাল রাত একটায় ছেলে ফিরেছে বিধ্বস্ত চেহারায়। ঘুমচোখে উঠে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিয়েছি, কথাবার্তায় হতাশাজনিত ক্ষোভ ছিটকে বেরিয়ে এসে অত রাতে পরিস্থিতি আবার ঘোরালো করে কেন, তাই তক্ষুনি আবার বিছানায় শুয়ে পড়েছি। শিউলিও উঠেছিল তবু বোধহয় রাতে কিছু খায়নি শুভ। এই ধকলটা সামলাতেই তো দুটো দিন লেগে যাবে! শুভ শিউলির দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “না। চাকরি ছাড়ছি না। আমাদের আয়পিসিআয় ব্যাঙ্কেরই একটা ভ্যাকান্সি বেরিয়েছে। এগজিকিউটিভ ক্যাটাগরিতে কিছু অফিসার নেওয়া হবে। ট্রেনিং শেষে স্টার্টিংয়ে চল্লিশ হাজার টাকা স্যালারি। গ্রাজুয়েশনে যেহেতু আমার ফার্স্ট ক্লাস ছিল, আবার কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রির ডিপ্লোমাটাও আছে, আমি ইজিলি পেয়ে যাবো। ব্যাঙ্ক আমাকে ট্রেনিং দেবে, অন জব ট্রেনিং। সন্ধ্যে ছটা পর্যন্ত ব্যাঙ্কের কাজ তারপর তিন ঘন্টার ট্রেনিং ডেলি। কোর্স ফি সাড়ে ছ’লাখ টাকা। অ্যাপ্লাই করলেই আমি ওই চান্সটা—’’

আমি আঁতকে উঠে বললাম, “আঁ? অত টাকা আমি কোথায় পাবো?”

ছেলে হাসিমুখে দুহাত তুলে আমাকে আশ্বস্ত করে জানাল, বাড়ি থেকে টাকা বের করতে হবে না। বছরে আট পার্সেন্ট সুদে ব্যাঙ্ক লোন দেবে। দেড় বছরের ট্রেনিং। ট্রেনিং শেষ হলে বেতন থেকে মাসে পঁচিশ হাজার টাকা করে কেটে নেবে। অনুমান তিন বছরে লোনটা শোধ হয়ে যাবে। এই ডিপ্লোমাটা করা থাকলে শুধু আয়পিসিআয় ব্যাঙ্ক কেন, সারা ভারতের ব্যাঙ্কগুলোর কাছে কর্মী হিসেবে একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়ে যাবে।

আমার সন্দেহপিশাচ মন একটা কু গাইছিল। বললাম, “দেড় বছর ধরে রোজ তিন ঘন্টার ট্রেনিং! তার মানে তোর ছুটি হবে কটায়? রাত বারোটায়?”

শুভর উচ্ছ্বাস একটু বাধাপ্রাপ্ত হয়, বলে, “রাত বারোটা কখনো হয় নাকি? কে অত রাত পর্যন্ত জেগে থেকে আমাদের ট্রেনিং দেবে? কাস্টমারদের বাড়ি যেতে না হলে সন্ধ্যে ছটার মধ্যেই তো কাজকর্ম সব হয়ে যায় । এখন যেমন বেরোচ্ছি তখনও নিশ্চয়ই সেরকমই হবে!”

—বেশ! তার মানে মাসে মাত্র পনেরো হাজার টাকা বেতনে আরও বছর চারেক ধরে তোকে বারো ঘণ্টা ধরে খাটানোর পথে কোন বাধা থাকছে না। এবার—

বাধা দিয়ে শিউলি বলল, “বারো ঘন্টা খাটছে কোথায়! সন্ধ্যে ছটার পর থেকে তো ট্রেনিং নিচ্ছে! বরং বাইরে যেতে হবে না এটা তো ভালো হলো। বেতনটা তেমনি মাসে পনেরো হাজার টাকা করে বাড়ছে সেটা দেখো!”

আমি হাত তুলে বললাম, “ট্রেনিংটা শেষ হওয়ার পরে, মানে এক্সিকিউটিভ ক্যাটাগরিতে প্রমোশনের পরে, প্রত্যেক মাসে তোর বেতন থেকে লোন শোধের জন্য কত টাকা করে কাটা হবে?”

শুভ উত্তর দিল, “পঁচিশ হাজার টাকা করে কাটবে, তিন বছরেই লোনটা শোধ হয়ে যাবে, তারপরের মাস থেকে চল্লিশ হাজার টাকা করে বেতন পাবো। তিনটে বছর একটু কষ্ট করতে হবে।”

পুঁজির অন্যতম শর্তই হলো ছলে বলে কৌশলে শ্রমিককে শোষণ করতে হবে। এটা জানা ছিল তবে সামান্য সেলুন থেকে বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থার শোষণপদ্ধতির সাদৃশ্য দেখে বেশ অবাক হলাম! বললাম, “তিনটে বছর কেন, ট্রেনিং পিরিয়ডের দেড় বছর ধরলে মোট সাড়ে চার-পাঁচ বছর ধরে চোখ মুখ বুজে তুই এখন পনেরো হাজার টাকা মজুরিতে বারো ঘন্টা করে খেটে যাবি ওই প্রত্যাশায়! বাঃ! সুন্দর প্ল্যান!”

শুভ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মানে?”
শিউলি ফুঁসে উঠল, “তুমি কি কোনদিন কিছুতে ভালো দেখতে পাও না? না খাটিয়ে ওর হাতে প্রত্যেক মাসে চল্লিশ হাজার টাকা করে তুলে দেবে! তোমার ছেলে কি লাটসাহেবের বাচ্চা নাকি?”

আমি বললাম, “গাধার সামনে গাজর ঝুলিয়ে কিরকমভাবে তাকে দিয়ে বোঝা বওয়ানো হয় দেখেছো? ও! দেখবে আর কোথায়? এখন তো গাধা নেইও! তাছাড়া তোমাদের তো কেউই আর সুকুমার রায় পড়োনি! যাকগে – তিনটে বছর পরে লোনটা শোধ হয়ে যাওয়ার পরে যদি বলে, ‘কাল থেকে তুমি এসো না!’ তখন? চোখের সামনে গাজর ঝুলিয়ে কোম্পানি তার ধান্দাবাজি হাসিল করে নিচ্ছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে এটাতে।”

শুভ বলল, “সে তো যে কোন দিনই বলতে পারে ! প্রাইভেট ব্যাঙ্কের চাকরি, গ্যারান্টি কে দেবে? যদি খুঁত ধরতে বসো তাহলে তো ঘরের মধ্যে বসে থাকলেই হয়! সমস্ত কিছুকেই সন্দেহ করা উচিত। তাহলে তুমি কি বলছো, এই অফারটা নেব না?”

শিউলি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, ও জানে আমি কি বলতে পারি তাই মনে মনে পাল্টা যুক্তি সাজাচ্ছিল।

নাঃ! কী বলব! দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ ডিয়ার লটারির টিকিট কিনে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখে, ওদিকে অনুব্রতর কালো টাকা সাদা হয়! হতভাগ্য মানুষ ভাগ্য ফেরানোর মরিয়া চেষ্টায় একটা না একটা ফাঁদে আটকা পড়ে। এই প্রজন্মের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাও সেরকম একটা ভদ্রস্থ রোজগারের আশায় পতঙ্গের মতোই স্বেচ্ছায় মাকড়সার ফাঁদে গিয়ে আটকা পড়ছে! এই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে করতে চার পাঁচ বছরের বেশি আর টানতে পারবে না, হয় নিজে থেকেই চাকরি ছেড়ে দেবে নয়তো কোম্পানির ক্রমবর্ধমান কাজের চাপ আর টানতে পারবে না, কোম্পানিই ছাঁটাই করে দেবে।

শিউলি বলল, “বল! তোমার কী মতামত শুনি!”

কি বলবো! বললাম, “দিনের পর দিন ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত এই পরিশ্রম টানতে পারবি? গতর যতদিন ততদিনই! তার আগে তো শিরদাঁড়া ঝুঁকে যাবে, চোখের তলায় কালি, তোবড়ানো গাল...”, আরো কী কী সব বললাম ছেলে কোনোটাই শুনতে চাইল না। তিক্ত হাসির সঙ্গে বলল, “তুমি কি ভেবে রেখেছিলে? এসি গাড়ি চেপে আমি অফিস থেকে ফিরব, মাস গেলে দেড় লাখ টাকা মাইনে নিয়ে এসে বাড়িতে ঢোকাবো, চকচকে কামানো গাল, দামি পোশাক ফুঁড়ে বিদেশি পারফিউমের ভুরভুরে গন্ধ বেরোবে? হ্যাঃ! আমার মতন মিডিওকারদের জন্যে ওই লাইফ নয়! নামী কলেজ থেকে এম টেক অথবা এমবিএ করতে পারলে ওইরকম জীবন হতো! সে যোগ্যতা কোথায় আমার! হ্যাঃ! ওয়েলফেয়ার স্টেট! জনগণের কল্যাণ করার বদলে গভমেন্ট এই দেশের জনগণের পেছনে কর্পোরেটকে লেলিয়ে দিয়েছে। তারা আমাদের চুষে খাচ্ছে। তুমি আমার খাটনি দেখছো! ওদিকে আমার থেকে কম বেতনে অ্যামাজনের গোডাউনে যারা কাজ করে, সেদিনের টার্গেট কমপ্লিট না করে তারা এক গ্লাস জল খেতে পায় না, এমনকি পেচ্ছাপ পেলেও তাদের চেপে বসে থাকতে হয়, পেচ্ছাপ করার পারমিশন নেই! হুঁঃ! এই কর্পোরেট ক’বছর বাদে আমাদের ছিবড়ে করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে! ”

শিউলি ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেকে সান্ত্বনা যোগায়, “ছাড়! বাবা ছাড়! আজকাল কেইবা আর ভালো আছে! কালকেই তো তোর বাবাকে বলছিলাম, কি একটা কোম্পানিতে বলেছে, ডেলি দশ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। তার মানে যাতায়াত মিলিয়ে ডেলি বারো ঘণ্টা তো বটেই! কী করবি! যা যুগ পড়েছে! আজকে ছুটির দিনটা ভালো ভাবে কাটা দেখি! যা! একটু বাজারে যা। ভালো মাছ না পেলে মুরগিই নিয়ে আয় না হয়!”

আমি গম্ভীরমুখে ছেলের কথাগুলো ভাবছিলাম । কল্যাণকামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল রাস্তাঘাট, শান্তি-শৃঙ্খলা, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের যুবশক্তির সামনে রোজগারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। কী নিপুণভাবে কর্পোরেট পুরো ব্যবস্থাটাকেই গিলে নিল! পঞ্চাশ-ষাট লক্ষ টাকা ফেললেই ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে! পাস করে বেরোতে মোট এক এক কোটি! আমাদের মতন মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক যুবতীদের কী হবে! তারা টোটো চালাবে না হয় গিগ শ্রমিক হবে! লক্ষ্য ছিল একটা গোটা প্রজন্মকে ডেলিভারি বয় বানানোর অথবা শপিং মলের কাউন্টারে বসানোর। লক্ষ্য ছিল আদিবাসীদের জমিতে রিসর্ট বানিয়ে সেইসব রিসর্টে আদিবাসীদেরই ওয়েটার বানানোর। লক্ষ্য ছিল, এডুকেশনটাকে ইন্ডাস্ট্রি বানানোর। প্রাইমারি থেকে পিএইচডি অব্দি এই ইন্ডাস্ট্রিতেই এখন প্রচুর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ! লক্ষ্য ছিল মহামারীর আতঙ্ক রটিয়ে ডিসটিলড ওয়াটার মেশানো ভ্যাকসিন বিক্রি করার। গভমেন্টের সহায়তায় কর্পোরেট সে কাজে সফল।

ঘরের মধ্যে দমবন্ধ করা নীরবতায় বসে বসে আমি যখন এই সমস্ত ভাবছি, শিউলি শুভও থমথমে মুখে বসে আছে। ওরাও কি আমার মতই ভাবছে! ছেলে অবসন্ন গলায় বলল, “বাবা! বেশি ভেবো না। মানুষের গড় আয়ু আশি বছর ধরলে ইনডিপেনডেন্সের পরে মাত্র একটা প্রজন্ম পৃথিবীতে কাটিয়ে গেছে। তোমরাও যাবার মুখে। আশি বছর তো বহু দেরি, আমরা অতদিন বাঁচবো না। রোজই তো একটু একটু করে আয়ু নিংড়ে ফেলে দিচ্ছি! কতদিন রাতে ঘুমের মধ্যে কোনো স্বপ্ন দেখিনি! জানো মা?”

শিউলি মুখে আঁচল গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠলো। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজলাম । আমার চোখের সামনে স্বপ্নহীন, ছিবড়ে হয়ে যাওয়া একটা প্রজন্ম বসে আছে, বেশিক্ষণ তাকানো যায় না।

পাঁচ.
পর্যটক বওয়া হাতির বার্ধক্য!

শিকারের কাজে বা যে কোনো ট্যুরিস্ট স্পটে জঙ্গল সাফারিতে হাতিদের ব্যবহার করা হয় বহু যুগ আগে থেকেই। কেউ কোনদিন খোঁজ রাখার প্রয়োজন মনে করেনি যে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া হাতিদের কি অবস্থা হয়! সম্প্রতি থাইল্যান্ডের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা (WFFT) এই সমস্ত হাতিগুলির জন্যে একটি অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। ইনস্টাগ্রামে তাঁদের পোস্ট করা ছবিতে ধরা পড়েছে পাই লিন এর মতন বুড়ো হাতিদের কি অবস্থা হয়! ভগ্নস্বাস্থ্য এবং ক্রমাগত ওজন বওয়ার ফলে হাতিগুলির মেরুদণ্ডের মাঝখানটা ঢুকে গেছে! বয়সের কারণে বা রোগে ভুগে নয়, পাই লিন টানা পঁচিশ বছর ধরে পর্যটক বয়ে বয়ে মেরুদন্ডের শক্তিই হারিয়ে ফেলেছে।

হাতির শরীরের গঠনটি এমন সে তারা শুঁড়ে করে ভারী জিনিস তুলতে পারে তবে পিঠে ওজন বইতে পারে না। ঘোড়ার মতন ভারবহনের ক্ষমতা নেই হাতির । মানুষের মতোই হাতিরও মেরুদন্ডের কশেরুকা ওপরের দিকে থাকে।

তবুও বেশি লাভের আশায় এক একটা হাতির পিঠে একসঙ্গে ছ’জনকেও ওঠানো হয়! এর সঙ্গে আছে হাতির পিঠে লোকগুলির বসবার আসনের ওজন। শুধু তাই নয়, পর্যাপ্ত পুষ্টি আর সেরকম বিশ্রামও যথাযথ পেত না পাই লিন বা অন্যান্য হাতিগুলি। সেই কারণেই অশক্ত শরীরে ভার বইতে বইতে হাতিগুলির মেরুদণ্ড বেঁকে গিয়েছে বলে জানিয়েছে ডাব্লু এফ এফ টি। এরকম টানা আড়াই দশক চাকরি করার পরে মেরুদন্ড বাঁকিয়ে ফেলা ২৪টি হাতি WFFT’র অভয়ারণ্যে রাখা আছে। হাতিগুলি দৌড়ানো তো দূর চলাফেরা করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে!”

এন ডি টিভি (মারাঠি)
১১ই মার্চ ‘ ২০২৩

শুভদের জন্য কোন অভয়ারণ্য এদেশের সরকার এখনও তৈরি করেনি। ·


লেখক পরিচিতি : দেবাশিস সরকারের জন্ম ১৯৬১ সালে। নানা পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তার গল্প প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকাশিত গল্প সংকলন দুটি : 'হিপোক্রাতেসের বাঙালি বাচ্চা' এবং 'ঈপ্সিতা কখন আসবে।’ বসবাস করছেন কলকাতায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ