রাতে ঘুমাতে গিয়ে সুলতানাকে বলি, সুলতানা কাল ভোরে একটু ডেকে দিও তো! সুলতানা পাশ ফিরে শুতে শুতে বলে, দেব। কেন, কী বৃত্তান্ত এসব নিয়ে ওর কোনো প্রশ্ন নাই। আমি একা একাই বলি, কাল থেকে ভোরে উঠব, হাঁটাহাঁটি করব। স্বাস্থ্যসচেতন হওয়া দরকার, বয়স বাড়ছে। সুলতানা ঘুমিয়ে পড়েছে ততক্ষণে। অসুস্থ শরীরে সারাদিন খুব খাটনি যায় ওর। সুলতানা খুব ভালো মেয়ে, ওর জন্য আমার জান কবুল। কিন্তু ওর জান বাঁচাতে হলে কলিজা খাওয়ানো দরকার। রোজ খাসির কলিজা এনে খাওয়াচ্ছি। বিপজ্জনক রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত সুলতানাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার বলেছিলেন রক্তশূন্যতা দূর করা খুব জরুরি, রক্তে টইটুম্বুর না হোক অন্তত কিছুটা সুস্থ করতে হলে খাওয়াতে হবে প্রচুর আয়রনযুক্ত খাবার। যার প্রথম ও ভালো সমাধান নিয়মিত কলিজা খাওয়া। সহজলভ্য ও কম দাম গরুর মাংস কিংবা কলিজা, কিন্তু ওর ভয়ানক এলার্জি গো-বিষয়ক সবটায়, তো খাসিই ভরসা। আমি চিরকাল ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র মানে ঔষধ-পথ্য মেনে চলা মানুষ। এমনকি ধারদেনা করে হলেও, সত্যি। কিন্তু গতকাল এমন হলো কেন? এক মাস ধরে কলিজা কিনি, দু’একদিন বাদ যেতে পারে। সুলতানা রান্না করে, খাই আমরা তিনজন। কিন্তু গতকাল কলিজা কেনার সময়েই হঠাৎ এমন গা গুলিয়ে উঠল! একটা ভয় কি আতঙ্ক নাকি আশঙ্কা ভয়াবহ আচ্ছন্ন করে ফেললো আমাকে। সত্যি বলছি, কিছু বলার বা বোঝার আগেই কসাইয়ের পাল্লা গলে কালচে লাল কলিজার টুকরাটা থপ্ করে নেমে গেল আমার খালি থলেতে। বাড়ি ফেরার পর রান্নাঘরের সামনের এক চিলতে পরিসরে থলে থেকে বাজার নামাতে বসলো সুলতানা। শীতের চকচকে ধনেপাতা কাঁচামরিচ সীম বের করার পর একটা এ্যালুমিনিয়ামের থালায় সুলতানা কলিজাটা ঢাললো থপাস্ করে। আমি বেসিনে হাত ধুতে ধুতে তাকালাম একটু আড়চোখে। সত্যি অন্যরকম। ভালো করে কিছু বোঝার আগে ওর রক্তশূন্য ফ্যাকাশে আঙ্গুলগুলোয় ধরা থালাটা ঢুকে পড়ল রান্নাঘরে। রক্তমাখা কালচে কলিজাটা থালার উপর, সুলতানা যাচ্ছে কলিজাটা কাঁপছে থরথর। কম্পমান কলিজাটা আমার চোখে আটকে থাকল বহুক্ষণ। ছুটির দিন বলে অলস সময়টা খবরের কাগজ পড়ে কাটাচ্ছিলাম ঠিকই কিন্তু ক্ষণে ক্ষণেই মনটা হাঁপিয়ে ওঠে কেমন একটা খুঁতখুঁত আর অস্বস্তিতে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি বিষয়টা একটু তদন্ত করা উচিত, ছেড়ে দেয়া চলে না এভাবে।
বাপবেটা গোসল করে এসে খাবার টেবিলে বসেছি। শশার সালাদ, লেবু, লালশাক ভাজি, অল্প আলুতে কলিজা ভুনা। খেতে বসে ভালোই খাচ্ছিলাম লালশাকে কিন্তু কলিজাভুনাটা পাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে গা গুলিয়ে ওঠে, ঠিক সকালের মতো। সুলতানার রান্না ভালো, খেটেখুটে রান্না করা ওর অভ্যাস, টাটকা টালা জিড়া গুড়া দেবেই দেবে। তবুও কেন এমন হচ্ছে! কলিজা ভুনা তো আমি পছন্দই করি! বেশির ভাগ মানুষই পছন্দ করে। জিন্দাবাহার লেনের হাফিজ দর্জির কথা মনে আছে না! যে কলিজা ভুনার প্রতি রীতিমত আসক্ত ছিলেন। ‘এক্ষণ’ পত্রিকার পরিতোষ সেনের স্মৃতিচিত্রে বহুবছর আগে পড়েছিলাম, পড়ে কিছুটা আসক্তি বেড়েছিল কলিজা ভুনার প্রতি আমারও। হাফিজ দর্জির বানানো কাপড় পরতেন ঢাকার নবাবদের বংশধররা। হাফিজ কোনোদিন গায়ের মাপ নিতেন না। শুধু ব্যক্তির শরীরের গঠনটা কড়া নজরে একবার দেখে নিতেন, এমন গুণী দর্জি যে পরে কাপড়টা সামনে নিয়ে ধ্যানীযোগীর মতো বসে সামান্য দু’একটা আঁকিবুকি করে কেটে ফেলতেন। এভাবেই ঠিকঠাক চমৎকার কোট শেরোয়ানি বানিয়ে ফেলতে পারতেন। সেই হাফিজ দর্জির ফেভারিট খাবার হলো ‘কলিজা কি সালুন’। দোকানের ছোট্ট ছেলে কাল্লু রোজ সকালে ঘি চপচপে পরোটা আর কলিজাভুনা এনে দেয়। হার জিরজিরে হাফিজ মিঞার ওটাই ছিল আরাধ্য খাবার। যে দিন কাল্লু এসে বলতো, ‘কলিজা কি সালুন খতম হো গাইস’। সেদিন সারাদিন মিঞার মাথায় খুন চেপে থাকত। যেন পৃথিবীর সব খাবারের ভান্ডার নিঃশেষ হয়ে গেছে। মিঞা তাহলে খাবে কী! কাল্লু তাকে যতোই বোঝাবার চেষ্টা করে ‘সালুন নাহি হ্যাঁয় তো কেয়া হুঁইস? বিরিয়ানি হ্যাঁইস, শিক্ আউর শামী কবাব হ্যাঁইস্, চাপ্ হ্যাঁইস ইত্যাদি কে শোনে! এসব মিঞার একটাও পছন্দ নয়। তার ‘কালেজা-কি-সালুন্’ চাই-ই। কাল্লুকে হাত পাখার ডাঁট দেখিয়ে বলতেন, নাহিতো তেরি পিঠকা চামড়া উখার দেগা।
অথচ আমার কী হলো! কলিজা কি সালুন দেখার সঙ্গে সঙ্গে অস্বস্তিতে গা গুলিয়ে উঠছে, যা খেয়েছি বেরিয়ে আসার জোগাড়! দেখছি তো, আরিচায় কুত্তার মাংস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিঙে শিয়ালের মাংস! তবে আমার বাড়িতে কীসের কলিজা! এসব কথা সুলতানা কিংবা ছেলেকে বলা যায় না। শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পয়সা দিয়ে কেনা জিনিস ফেলা যায়! একদিনের জন্য হলে না হয় ফেলে দেয়া যায় বা খেয়ে ফেলা যায় চোখ কান বুজে। এ তো ডাক্তারের পরামর্শ, রোজ কলিজা খাওয়াবেন। আরে বাবা রোজ কীভাবে না জেনে শুনে ‘কিসের’ কলিজা খাওয়ানো যায়, কি খাওয়া যায়! মানুষের কলিজা দেখতে কেমন এটা জানা থাকলে না হয় সতর্ক হয়ে কেনা যেত। প্রতিদিন এতো যে অপমৃত্যু হচ্ছে, মর্গে এসে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকছে বেওয়ারিশ লাশ, পোস্টমর্টেমের পর কলিজাগুলো যদি কেজি দরে বিক্রি হয়েই যায় তো কার কী বলার, কে আছে দেখার!
শীর্ণকায় সুলতানা আমার পাশে শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মায়া লাগে ওর জন্য। কলিজা নিয়ে কেন এতো ভাবছি এটা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমটা কেমন ঠিক ব্যাখ্যা করা যাবে না, সত্যি যাবে না! যেন ঘুমে, যেনবা জেগেই স্বপ্ন দেখছি কিংবা স্বপ্নে জেগে উঠেছি। স্বপ্নটা খুব যে স্পষ্ট তেমনও না। একটা হলুদ জন্ডিস আলোয় চারিদিক ভেসে যাচ্ছে আর আমি কুষ্টিয়া হাউজিং এর নিশান মোড়ে থলে হাতে পথের উপর দাঁড়িয়ে আছি ক্যাবলাকান্ত হয়ে। গরু খাসি জবাই হচ্ছে খুব কাছাকাছি। চামড়া ছেলা সাদা খাসিটাকে দেখাচ্ছে বীভৎস। ওটা ধোয়ানো হচ্ছে পানি ছুঁড়ে ছুঁড়ে। কাটা হচ্ছে রান, ফাঁড়া হচ্ছে পেট। বেরিয়ে আসছে রক্তপানিভেজা কলিজা, গুরদা, ফ্যাপসা। বড় গামলায় ছপাৎ করে ওসব রাখা হচ্ছে। হঠাৎ একটা লোক (যার সারা শরীর কালো পোষাকে আবৃত) ছুটে আসে গামলাটার কাছে। তার বাম হাতে এতক্ষণ যে থলেটা ছিল সেটা উপুর করে দেয় গামলাটার উপর। থলে থেকে লাফ মেরে মেরে পড়তে থাকে মানুষের কলিজা, রক্তে ভেজা টকটকে কোনটা, কোনটা ফ্যাকাশে বিবর্ণ। সব একাকার। এবার পাল্লায় তোলো, মাপো আর খদ্দেরের থলেতে সেঁধিয়ে দাও! আর্তনাদ করতেই ছুটে গেল স্বপ্নটা। আযান হচ্ছে দূরে খুবই আস্তে। হাত মুখ ধুয়ে সুলতানাকে ডাকি দরজাটা আটকাও, বাইরে যাচ্ছি। ভীষণ দুর্বল সুলতানা বিছানা থেকে নামতে নামতে একটা কাপড়ের থলে হাতে বাইরে এসে দাঁড়াই, আলো ফুটছে।
স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ এদিকে বেশি আসে, হাউজিঙে প্রচুর জমি পড়ে আছে প্লট হয়ে, চওড়া রাস্তা, খোলা তেপান্তর। এই কুয়াশা কুয়াশা ভোরে সব নেমে পড়েছে, বলা যায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বাস্থ্য উদ্ধারে। আমিও জোরে পা চালাই মানে আমিও স্বাস্থ্যসচেতন একজন। হাঁটতে হাঁটতে নিশান মোড় ছাড়িয়ে মাংসের দোকানের কাছে এসে দাঁড়াই। এর মধ্যে চলে এসেছে মাংস বোঝাই দুটো ভ্যান, গরু খাসির রান সিনা এদিক ওদিক ঝুলছে ভ্যান উপচে। ভ্যানওয়ালা মাথার মাফলার খুলে নতুন করে পেঁচিয়ে নিচ্ছে ঘাড়মাথা। আমি ভেবেছিলাম এখানেই কোথাও গরু খাসি জবাই হয়, পেট ফাঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো কলিজাটা কিনে বাড়ি ফিরব, ব্যাস আর কোনো ঝামেলা নাই! এখন তো দেখছি সব রেডিমেট। কসাই ভ্যানের পাশে এসে দাঁড়াতেই আমি আস্তে আস্তে দূরে সরতে থাকি। কাল আমায় কলিজা দিয়েছিল ওই কালো মোটা গোঁফওয়ালাই। আজও এগিয়ে আসে সে। চোখ দুটো কেমন লাল জানোয়ার জানোয়ার, কলিজা নিবেন না মাংস? বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে? আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলি, অফিসে যাবো তো তাই সকাল সকাল এলাম। হাফ কিলো খাসির কলিজা দাও। গোঁফওয়ালা গোঁফে তা দেয়। আধ ঘণ্টা পর আসেন। মাংস নামাই, সের-পাথর বাইর করি, তারপর!
বুঝি বউনির সময় হাফ কিলোয় তার মেজাজ খিঁচড়ে গেছে।
বিষয়টা নিয়ে আলাপ করা যেতো সহকর্মী নাজমা আলীর সঙ্গে। নাজমার মধ্যে সব বিষয়ে একটা সমাধান যেন তৈরি হয়েই থাকে, প্রশ্ন শোনা মাত্র উত্তর! গতকাল অফিসে চা খেতে খেতে একবার চেষ্টাও করেছিলাম বলার। নাজমা, ডাক্তার আমার বউকে খাসির কলিজা খেতে বলছে। কলিজায় নাকি খুব আয়রন! এইটুকু শুনেই নাজমা খুশি হয়ে গেল। ওর এই গুণের জন্যই ওর সঙ্গে কথা বলে আরাম, এমন একটা মেয়ে বন্ধু কার না কাম্য! কিন্তু এসব এই পোড়াদেশে জো নাই হওয়ার, দুর্ভাগ্য! আমার সন্দেহের কথাটা অবশ্য বলা হয়নি। ও আমার কথা শুনে গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের মাস্টারের ভাষায় বলে, হ্যাঁ কলিজায় আয়রন, থিয়ামিন, রিবোফ্লোবিন ...। আমি বলি, হ্যাঁ হ্যাঁ আয়রনের জন্য খেতে বলছে।
বিষয়টা আমার বন্ধু এডভোকেট ইয়াকুবের সঙ্গে আলাপ করা যেতো অনায়াসে। কিন্তু ও সব বিষয় নিয়ে এতোই হেঁয়ালি আর রসিকতা করে যে শেষ পর্যন্ত আসল বিষয়টা চাপা পড়ে যায় ইয়ার্কির তলে অথচ সে ইচ্ছা করলে বলতে পারে। ডাক্তার মোসাদ্দেকের কাছে যাওয়া যেতো, প্রবল বাকপটু মানুষ। অসুখ বিসুখে উনিই আমাদের প্রথম পছন্দের ডাক্তার। ডাক্তার হলে কী হবে, সজ্জন ব্যক্তি, গল্পকার, সাংঘাতিক রম্য গল্প লেখেন। রোগীদের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে অর্ধেক রোগ সারিয়ে ফেলেন, মাঝে মাঝে চুটকি, দারুণ! হ্যাঁ, রোগীরা এ সুযোগে কত না-হক কথা বলে পয়সা উসুল করে নিতে চায়, নিজের চোখে দেখেছি! আমি গেলেও কথাটা সহজে জিজ্ঞাসা করতে পারতাম। ডাক্তার সাহেব, খাসির কলিজা আর মানুষের কলিজায় পার্থক্য কী অথবা মানুষের কলিজা চেনার সহজ উপায় কী? মানে খাসির কলিজা মনে করে মানুষের কলিজাও তো কিনে আনতে পারি, যেই দিনকাল! এখানেও সমস্যা। ডাক্তারের পাশের বাড়ি আমার শ্যালিকা থাকে, দেখা যাবে ডাক্তার রসিয়ে বউকে বলছে, বুঝেছ, মাহবুব সাহেবের ভায়রা ভাই বাতেন সাহেব এসেছিল অদ্ভুত সমস্যা নিয়ে, কিনা মানুষের কলিজা...। ব্যস, পরদিন ছাদ থেকে ছাদে অথবা ডাক্তার গিন্নি নিজেই চলে গেলেন শ্যালিকার বাড়ি। রাতে শ্যালিকার ফোন, হ্যালো দুলাভাই, আজকাল কলিজা গবেষক হয়ে গেলেন নাকি? ঘটনা কী!
সুলতানার সঙ্গে আলোচনা একেবারেই চলে না। বিষয়টা তো সুলতানারই। দেখা গেল আসলে কিছুই না, সর্বৈব সন্দেহ সংশয়। মাঝখান থেকে আমার সন্দেহের কেরামতিতে ওর কলিজা খাওয়ার বারোটা বেজে গেল। সন্দেহ সংশয় থাক, আমার মধ্যেই থাক, সংক্রমণে ক্ষতি বাড়িয়ে কাজ নাই।
বিশ্বাস করেন গত চার দিন কলিজা সংশয় নিয়ে বড় পেরেশানিতে আছি, রাতের ঘুম পর্যন্ত হারাম হয়ে ঘাড় গরম আর ক্ষুধা মন্দা। এটার বিহিত না করে থাকা যায়! শেষ পর্যন্ত আজ একটু সাহস করে ঢুকে পড়েছি হাসপাতালে। দোতলার একেবারে পশ্চিম দিকে অপারেশন থিয়েটার। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষারত দলাদলা মানুষগুলো দেখছি। এই মাত্র এক নবজাতককে কোলে নিল বয়স্ক মহিলা একজন, আবেগে শিশু নিয়ে চলে এসেছে করিডোরে! মহিলা নানি দাদি হতে পারেন। সোনা সোনা বলে ঠোঁটে এক রকম চুক্চুক্ ভালোবাসার শব্দ করছে মনে হলো। কে জানে বড়ো হয়ে এই বাচ্চাকেই হয়ত কলিজা বেচতে হতে পারে, নিদেনপক্ষে খেতে তো হবেই। আমার মেয়েটা আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে শিয়াল কি কুকুর কি বিড়ালের ঝোলে ভাত মেখে খায়নি একথা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে!
বস্তুতঃ আমি দেখছি নিচের মর্গটা। এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যায় মর্গটা। কটকটে হলুদ রঙের পুরাতনী ছাপের মাঝারি বা বড়ো একটা ঘর। ঘরের আকৃতিটা এখান থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। মর্গ ঘরটাকে বড়ো একা দেখাচ্ছে। পুরো হাসপাতালটাকেই আমার বড়ো একা মনে হয়। যদিও হাসপাতালটাকে মর্গ মনে হচ্ছে না। অবশ্য দেয়ালগুলোর দিকে তাকালে কারো মর্গ মর্গ মনে হতে পারে। একবার পা ভাঙা এক প্রতিবেশী মহিলাকে দেখতে এসেছিলাম ওই দিকের একটা কেবিনে। সুলতানাই নিয়ে এসেছিল জোর করে, আহা বহুদিনের প্রতিবেশী না! রোগী কি দেখব, বারবার চোখ আটকে যাচ্ছিল কেবিনের ভিতরের দেয়ালগুলোয়। রোগীনি বিছানায় শুয়ে আছে, বিছানাটা দেয়ালের সঙ্গে লাগানো, এই দেয়ালটার বর্ণনা যদি দিতে চাই ...! আহ্, বমি বমি লাগছে! মর্গের দরজাটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। ছায়ার মতো বন্ধ দরোজা। দিনে মনে হয় লাশ কাটা হয় না। আবার হতেও পারে। আজ হয়তো হচ্ছে না। এখান থেকে ঘরটার যে দুটো দিক দেখা যাচ্ছে, পশ্চিম ও উত্তরের একাংশ, তাতে জানালা নাই। মর্গে সম্ভবত জানালা রাখার নিয়ম নাই। বলা কি যায় বুভুক্ষু বিড়ালগুলো কখন ঢুকে লাশগুলো টেনে হেঁচড়ে ছিঁড়ে খুঁড়ে..., এমনকি কেটে রাখা লাশের কলিজাটাই হয়তো নিয়ে গেল! শুনেছি আগে মর্গ এখানে ছিল না। ছিল শহরের ভিতর কালিশংকরপুর ঢুকতে, যেটাকে সবাই এখন কাটাইখানা মোড় বলে, সেখানে। কাটাইখানা নামটায় আধুনিকতা আছে কিন্তু, সামান্য কাটাকাটি। মর্গ বলার সঙ্গে সঙ্গে পচাগলা লাশের বীভৎস একটা গন্ধ নাকে এসে বাড়ি খায়। মূল ব্যাপারটা হলো কলিজার রফা করে আজ বাড়ি ফিরব, একটা বিষয় বেশি দিন কচলানো আমার স্বভাব নয় একেবারেই।
মর্গের দরজাটার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি বুক ঢিপঢিপ নিয়ে। কী করা যায় ভাবছি। সন্ধ্যা শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। একটু আগেও দেখতে পাচ্ছিলাম বাম দিকের ডোবার পানির তিরতির কাঁপন। এখন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মর্গের সামনের রাস্তাটা ইট বিছানো এবড়োখেবড়ো। কঠিন হয়ে যাচ্ছে মশার উপদ্রুব সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা। ডোমকে কী বলব! কীভাবে বলব! ডোম লোকটা মালটাল টেনে এসে থাকলে তো আরেক ক্যাচাল! খুন-খারাবি কেসের আসামী ভাবতে পারে কিংবা বলা যায় না লাশ গুম করার ফন্দি নিয়ে এসেছি এমন ভাবাও অমূলক নয়। কী জানি, ইতর শ্রেণীর গালাগালসহ গলা ধাক্কা খাওয়ারও যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা চালাব বোঝাতে। বলব, দেখ জীবনে অনেক গরু খাসির কলিজা দেখেছি খেয়েছি কিন্তু কখনো মানুষের কলিজা দেখিনি। শুধু একটিবার দেখব। তোমরা তো ওসব কাটাছেঁড়া কর, শুধু একবার দেখব। আমার বউটার গায়ে রক্ত নাই, তাকে কলিজা খেতে বলেছে ডাক্তার। প্রত্যেক দিন কলিজা কিনতে যাই কিন্তু কীসের কলিজা খাসির কলিজা বলে চালিয়ে দিচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। আর একটা কথা, মানে আমাকে ভুল বুঝ না, তোমরা পোস্টমর্টেমের পর কলিজাগুলো বাইরে বিক্রি টিক্রি করে দাও না তো! ডোম রূপলাল কি শ্যামলাল কি হরলাল চোখ দুটো মার্বেলের মতো গোল করে বলে উঠতে পারে, আচ্ছা, এই কথা! খলিলউল্লাহর বংশধরের প্রবেশ ঘটেছে এই শহরে, মানুষের কাঁচা কলিজা খাওয়ার মতলবে! পুলিশকে খবর দিতে হয়! অবশ্য সে বাংলায় কথা নাও বলতে পারে। ডোমরা কী একটা ভাষায় যেন কথা বলে! হ্যাঁ, ভোজপুরী ভাষাতেই হয়তো বলবে।
একে মশার উপদ্রব তদুপরি খলিলউল্লাহ্ জটিলতায় ভয় এলো বেগে, মানে কাঁপন, প্রস্থানেই সাঙ্গ হলো অভিযান।
শেষ চেষ্টা বলে একটা ব্যাপার থাকে সকলেরই। গতকাল মর্গে ব্যাপারটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ করে ফেলেছিলাম, বিপদে পরিনি এই যথেষ্ট। আজ দুপুরে অফিসে বসে ঠিক করেছি সুলতানার ডাক্তার আবু হাসমতের কাছেই যাবো। তিনিই পথ্য দিয়েছেন তিনিই দেবেন সমাধান।
বিকালে ডাক্তারখানায় এসে হতবাক, বাপরে এত রোগী! একটা বসার জায়গা পর্যন্ত নাই। এ্যাসিসটেন্ট ছেলেটার আমাকে নিয়ে খুবই মাথা ব্যথা। বারবার জিজ্ঞাসা করছে, সিরিয়াল দিছেন? কত নাম্বার? ও আসলে দুটো পয়সা কামানোর ধান্দায় ঘুরঘুর করছে। পয়সা দিলেই ও সিরিয়ালের সামনের দিকে আমায় ঢুকিয়ে দেবে পুটুস করে!
ঘণ্টা তিনেক বাইরে থেকে বেরিয়ে এসে দেখি রোগী পাতলা হয়ে এসেছে। আর কাছে আসছে না এ্যাসিসটেন্ট ছেলেটা। এক মহিলা বহুক্ষণ বারান্দায় বসে পানি খেয়ে চলেছে। ওর স্বামীটা আমার পাশে চেয়ারে বসে নিশ্চিন্ত মনে ঢুলছে, কতকাল ঘুমায়নি, আহা! এখন রাত প্রায় ন’টা। এত রাতে আলট্রাসনোগ্রাম হবে! ওসব পরীক্ষা তো শুনেছি সকালে হয়। কী জানি আমার ধারণা ভুল হতে পারে। সুলতানার একবার আলট্রাসনোগ্রাম করতে হয়েছিল, গিয়েছিলাম সকালেই। পানি খেয়ে খেয়ে শেষে ওর কী অবস্থা! ওর কাপড় ভিজে গিয়েছিল সনো রুমে নেয়ার আগেই।
শেষ রোগীটা ঢুকলো, ও বেরুলেই আমি ঢুকবো। এই ডাক্তারের কাছে মোট তিনবার এসেছি। প্রত্যেকবারই সুলতানাকে নিয়ে। তবুও কোনো হৃদ্যতা হয়নি। এখন তাকে কীভাবে বলবো ডাক্তার সাহেব কী বিপদে ফেলছেন, কলিজা নিয়া তো বড়ো ক্যাচালে পড়ে গেছি, ঘুম হারাম! কলিজাটা কিসের কী করে বুঝবো...। হ্যাঁ সিজিওফ্রেনিক রোগী ভাবতে পারেন আমাকে কিন্তু প্রশ্নটা মৌলিক। অন্ততঃ প্রশ্নটা প্রকাশ করার মধ্যে মৌলিকত্ব আছে, আপনারা তো সব চেপে যান। আমি চাপতে পারলাম না। ডাক্তার আবু হাসমত আমাকে চিনতেও পারেন, নাও চিনতে পারেন। মুড ভালো থাকলে অবশ্য না চিনলেও চেনার ভান করবেন। কষ্ট করে একটা মিষ্টি হাসি ঠোঁটের কোণে ধরে রেখে শুনবেন এবং কিছু সুধাবেন। অবশ্য টাকা আগমনের সম্ভবনা না থাকলে কী রকম ব্যবহার করবেন সেটা আগাম বলা যাচ্ছে না। শতকরা ৮০ ভাগ আশঙ্কা সিজিওফ্রেনিক ভাবা আর বিশভাগ সম্ভাবনা কোনো কিছুই না ভাবা। মানে আমাকে নিয়ে কিছু ভাবার প্রয়োজনই বোধ করবেন না তিনি।
চেম্বারে ঢুকবো কিনা ইতস্ততঃ করতে করতে শেষে ঢুকেই পড়লাম। ডাক্তার হাসি হাসি মুখ নিয়ে বললেন, তারপর, আপনার মিসেস কেমন আছে? আমি অমায়িক ভঙ্গিতে বলি, জ্বি ভালো আছে। আমি বুঝতে চেষ্টা করি ডাক্তার কী পরিমাণ ক্লান্ত। এবং আমি নিজেও কতটা ক্লান্ত, এ অবস্থায় ডাক্তার আমাকে কতটা গুরুত্ব দেবেন। কয়েক মুহূর্ত আমি নিজেও আমার সন্দেহটা নিয়ে মানে সন্দেহের যৌক্তিকতা নিয়ে বেশ সন্দেহে পড়ে যাই। ভাবনায় পড়ে যাই এখানে আসার ঔচিত্য নিয়ে। সারাদেশের মানুষ বিনা বাক্য ব্যয়ে কলিজা খাচ্ছে তাদের কোনো সমস্যা নাই, সংশয় সন্দেহ প্রশ্ন নাই, তো তুমি আব্দুল বাতেনের এতো সমস্যা কী জন্য! আমি চেয়ারে নড়েচড়ে আরাম করে বসি যেন বহুক্ষণ একপায়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম, এই মাত্র বসতে পেলাম। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলি, সুলতানাকে মানে আমার স্ত্রীকে কাল একটু নিয়ে আসবো, ওর হাঁটুতে নাকি প্রায়ই ব্যথা করে। আপনি কি কাল রোগী দেখবেন? ডাক্তার হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়েন, মানে তিনি কাল রোগী দেখবেন। ডাক্তারের মুখ উজ্জ্বল। খুব একটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে না তাঁকে। ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়েছেন, সিস্টার দাঁড়িয়ে আছে তাঁর বাইরে যাবার দরোজা খুলে। আমি একদমে বলি, ডাক্তার সাহেব, আরেকটা কথা, আমার স্ত্রীকে তো রোজ খাসির কলিজা খেতে বলেছেন কিন্তু একটা সমস্যা, মানে খাসির কলিজা আর মানুষের কলিজার মধ্যে পার্থক্য কী করে বুঝবো? মানে বোঝার কোনো সহজ উপায় আছে কি? আপনি তো অপারেশন করেন, তো মানুষের কলিজা দেখতে কেমন যদি একটু বলতেন, মানে বিশেষ গঠন রঙ ... এই আর কি!
ডাক্তার অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন! ·


0 মন্তব্যসমূহ