জ্ঞানের প্রত্নবিদ্যা : ধারণা ও কৌশলগত গঠন
যখন আমরা কোনো বড়ো বড়ো চিন্তকের বই পড়ি, যেমন লিনিয়াসের গাছের শ্রেণিবিন্যাস বা রিকার্ডোর বাজারের তত্ত্ব, তখন মনে হতে পারে তাদের সব ধারণা যেন একটি পরিকল্পিত বাড়ির মতো। প্রতিটি ইট তার পাশের ইটের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গতভাবে সাজানো এবং কাঠামোটা নিখুঁত। কিন্তু ফুকো বলছেন, যখন আমরা ওই পুরো জ্ঞানশাখার পুরোনো ইতিহাস দেখি, তখন এই ধারণাগুলির উত্থান-পতন, গ্রহণ-বর্জন অতটা সুশৃঙ্খল মনে হয় না। ইতিহাসটা একটি নিখুঁত অঙ্কের সূত্র মেনে চলেনি, মনে হয় ইতিহাসটা যেন সব ধারণা একটি জগাখিচুড়ি অবস্থায় ছিল। আর এই জগাখিচুড়ি কি শুধু বিশৃঙ্খলা? নাকি এর পেছনে এমন একটি গোপন নিয়ম কাজ করছে, যা ঠিক করে দেয় কোন ধারণা কখন প্রকাশিত হবে, কোন ধারণা কার পাশে বসবে, এবং কখন একটি ধারণা বাতিল হবে?
ফুকো বলছেন, আমাদের পণ্ডিতদের ধারণাগুলির অভ্যন্তরীণ যুক্তি, অর্থাৎ কেন একটি ধারণা আরেকটার চেয়ে যৌক্তিকভাবে ভালো, তা বিচার করবার দরকার নেই। আমাদের দেখা উচিত, ধারণাগুলি যে আলোচনার ক্ষেত্র বা ডিসকোর্সের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে এবং ঘুরছে, সেই ক্ষেত্রটি কেমন করে সাজানো। তিনি এই সাজানোর নিয়ম বা ডিসকোর্সের গঠনকে ৩ প্রধান অংশে ভাগ করেছেন।
১. সফলতার রূপ : এটি একটি নির্দিষ্ট আলোচনার মধ্যে বিবৃতি বা কথাগুলি কেমন করে একে অপরের সঙ্গে সাজানো থাকে তা ঠিক করে। এটি শুধু পাতার পর পাতা উলটানো নয়, এটি একটি কথা থেকে অন্য কথায় যাবার বাধ্যবাধকতা। সতেরো শতকের একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী একটি গাছের বর্ণনা লিখছেন। ফুকো বলছেন, আমরা দেখব যে তাঁর বর্ণনা লেখার একটি বাধ্যতামূলক ক্রম তৈরি হয়েছিল। তিনি আর শুধু প্রাচীন বইয়ে লেখা তথ্য কপি করছেন না। এখন নিয়ম হল আগে গাছটিকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তারপর বর্ণনা করতে হবে। শেষে তাকে নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে। এই পর্যবেক্ষণকে বর্ণনা করা শ্রেণিবিন্যাস করা, এই ক্রমটিই হল সফলতার রূপ। যদি একজন বিজ্ঞানী এই ক্রম না মেনে শুধু পুরোনো দিনের মতো গল্প লিখে দেন, তবে তার লেখাটিকে সেই সময়ের ডিসকোর্সের অংশ হিসেবে আর গণ্য করা হবে না। এই নিয়ম পালটে গিয়েছিল বলেই লিনিয়াসের মতো নতুন ধারণা জন্ম নিতে পেরেছিল।
২. সহাবস্থানের রূপ : কে কার পাশে বসে, কে কার সঙ্গে কথা বলে? অর্থাৎ কোনো একটি বিবৃতি একই সময়ে তার চারপাশে থাকা অন্যান্য বিবৃতির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকে। একজন জীববিজ্ঞানী যখন তার ‘ডিসকোর্স’ লেখেন, তখন তিনি অন্য বিজ্ঞানীর পরীক্ষার ফল বা প্রতিষ্ঠিত তথ্য, যেমন আলো সংশ্লেষণ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন বা তার সমালোচনা করেন। এই গ্রহণ করাই হল একটি সহাবস্থান। লিনিয়াসের প্রকৃতি বিজ্ঞান শুধু গাছ বা জীব নিয়ে কথা বলত না। এটি সেই সময়ের জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, বা দর্শনের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন জ্ঞানশাখার সঙ্গেও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল, যেমন গণিতে শৃঙ্খলার যে ধারণা ছিল, তা-ই জীববিদ্যার শ্রেণিবিন্যাসকে নিখুঁতভাবে সাজানোর জন্য একটি আদর্শ হিসেবে কাজ করেছে। এই বহিরাগত প্রভাবগুলিই হল সহাবস্থানের রূপ। একটি জ্ঞানক্ষেত্র তার অতীতকে কীভাবে মনে রাখে। রেনেসাঁ যুগের বিজ্ঞানীরা সব ধরনের তথ্য মানে দেখা, শোনা, পৌরাণিক গল্প ইত্যাকার বিষয় একসঙ্গে রাখতেন। কিন্তু লিনিয়াসের সময়ে, কী গ্রহণ করা হবে আর কী বর্জন করা হবে, তার মানদণ্ড অনেক কঠোর হয়ে গেল, ফলে স্মৃতির ক্ষেত্র সংকুচিত হল। এখন আমরা পুরোনো ভুল তত্ত্বগুলিকেও মনে রাখি, যাতে আমরা বুঝতে পারি আমাদের আজকের ধারণাগুলির উৎস কী।
৩. হস্তক্ষেপের প্রক্রিয়া : হস্তক্ষেপের প্রক্রিয়া, অর্থাৎ যেমন করে কথাগুলি পালটে যায়। এটি সেই বৈধ কৌশল, যা ব্যবহার করে একটি বিবৃতির রূপ পরিবর্তন করা যায় বা তার মধ্যে নতুন সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। অর্থাৎ, পুরোনোকে নতুন করে লেখার কৌশল। ক্লাসিক্যাল যুগে বিজ্ঞানীরা গাছের দীর্ঘ বর্ণনাকে পরিবর্তন করে সেগুলিকে সুসংগঠিত ছকের মধ্যে নিয়ে এলেন। এটি একটি বড়ো হস্তক্ষেপ। প্রথমে বিজ্ঞানীরা শুধু গাছের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য, যেমন পাতা, ফুল ইত্যাদি দেখে শ্রেণিবিন্যাস করতেন। কিন্তু পরে বুফন ও জুসিয়ুর মতো বিজ্ঞানীরা সেই কৌশল পালটে গাছের ভেতরকার গঠন বা অঙ্গসংস্থান পর্যন্ত শ্রেণিবিন্যাসকে বিস্তৃত করলেন। এই পরিবর্তনের নিয়মই হল হস্তক্ষেপের প্রক্রিয়া।
ফুকো বলছেন, কথা বলবার ক্রম বা সফলতা, কার পাশে কী থাকবে বা সহাবস্থান, এবং পরিবর্তনের কৌশল বা হস্তক্ষেপ, এই তিনটির মিলিত জালই ধারণাগত গঠনের নিয়ম।
এটি কোনো চিন্তকের মাথায় প্রথম ধারণা আসবার মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া নয়, বা কোনো শাশ্বত, যুক্তিযুক্ত আদর্শ কাঠামোও নয়। এ সেই দৃশ্যমান নিয়মগুলির সমষ্টি, যা বিভিন্ন বই, প্রবন্ধ, এবং আলোচনার মধ্যে গোপনে ক্রিয়াশীল থাকে এবং ঠিক করে দেয়, কোন ধারণা জন্ম নেবে, কেন দুটো ধারণা একসঙ্গে থাকবে, কেন একটি ধারণা বাতিল হবে, বা কেন পুরোনোকে নতুন করে লেখা হবে।
ফুকো এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে জ্ঞান বা চিন্তাভাবনার ইতিহাসকে শুধু শ্রেষ্ঠ ধারণার তালিকা হিসেবে না দেখে, সেই যোগাযোগের নিয়ম হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, যার ফলে বাস্তবে ধারণাগুলি তৈরি হয় এবং কাজ করে।
২.
ফুকো আমাদের শেখা জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ধারণা হিসেবে দেখেন না। তিনি একে একটি সুনির্দিষ্ট ও সুবিন্যস্ত আলোচনার ক্ষেত্র বা ‘ডিসকোর্স’ বলেন। এই ডিসকোর্স একটি কাঠামোর মতো, যা ঠিক করে দেয় আমরা কোনো কিছুকে কেমন করে দেখব, কী নিয়ে কথা বলব এবং কী সত্য বলে মনে করব।
ফুকো বলতে চেয়েছেন যে জ্ঞান বা বিজ্ঞান আকাশ থেকে পড়া কোনো চিরন্তন সত্য নয়। আমরা যেটাকে সত্য বা জ্ঞান বলে জানি, তা আসলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে তৈরি হওয়া একটি কৌশল। তার মতে, অর্থনীতি, চিকিৎসা বা সমাজবিজ্ঞান ইত্যাকার বিষয় কেবল কতগুলি তথ্যের সমষ্টি নয়। এগুলি একেকটি ‘ডিসকোর্স’। ‘ডিসকোর্স’কে আপনি একটি চশমার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। আপনি যখন লাল রঙের চশমা পরেন, তখন পুরো পৃথিবী লাল দেখায়। ঠিক তেমনি, একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ে একটি ‘ডিসকোর্স’ ঠিক করে দেয় আমরা কোনো ঘটনাকে কীভাবে দেখব। একশো বছর আগে যখন আমাদের গ্রামে কলেরা বা বসন্ত রোগ হত, তখন মানুষ মনে করত এটি ওলাবিবির’ প্রকোপ, ফলে এই রোগকে বলত ওলা ওঠা। তাদের কাছে সেটাই ছিল ধ্রুব সত্য এবং চিকিৎসার পদ্ধতি ছিল ঝাড়ফুঁক বা পূজা। এটি ছিল সেই সময়ের চিকিৎসাবিদ্যার ‘ডিসকোর্স’। কিন্তু আজকের দিনে সেই একই রোগকে আমরা দেখি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হিসেবে। এখনকার ‘ডিসকোর্স’ আমাদের শেখায় যে এর সমাধান অ্যান্টিবায়োটিক বা টিকা। রোগ কিন্তু একই আছে, কিন্তু আমাদের দেখার ভঙ্গি বদলে গেছে। ফুকো এই বদলে যাওয়া কাঠামোটিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হল, একটি ‘ডিসকোর্স’ থেকে আরেকটি ডিসকোর্স-এ আমরা কীভাবে যাই? বা একটি নির্দিষ্ট সময়ে কেন আমরা একভাবে চিন্তা করি? ফুকো একেই বলেছেন কৌশলগত বিন্যাস। তিনি বলেন, এই কৌশল কোনো একজন বিজ্ঞানী হঠাৎ করে আবিষ্কার করেন না। এটি তৈরি হয় সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব থেকে। যেকোনো সমাজেই জ্ঞানের জগতে কিছু ফাটল বা দ্বান্দ্বিক স্থান থাকে। একই বিষয়ে দুটো ভিন্ন মত বা ব্যাখ্যা পাশাপাশি চলে আসে, কিন্তু দুটো একসঙ্গে সত্য হতে পারে না। তখন সমাজকে বাধ্য হয়ে যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হয়। একে ফুকো বাধ্যতামূলক বিকল্প বলছেন।
আমাদের দেশে মানসিক রোগী বা পাগল নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে দুটো ধারণা পাশাপাশি চলছে। একটি ধারণা বলে, এটি জিনের আছর বা কোনো মন্দ আত্মার প্রভাব। অন্য ধারণা বলে, এটি মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা। এই দুটো ধারণা পরস্পরবিরোধী। আপনি একই সঙ্গে একজন রোগীকে ওঝার কাছে ঝাড়ফুঁক করাতে এবং সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে কাউন্সিলিং করাতে পারেন না, যেকোনো একটি পদ্ধতিকে প্রধান হিসেবে বেছে নিতে হয়। যখন সমাজ বা রাষ্ট্র এই দুটোর মধ্যে সাইকিয়াট্রির পথকে বেছে নেয় এবং তাকেই একমাত্র বৈধ চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখনই তা একটি নতুন কৌশলগত বিন্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফুকো বলছেন, কোনো জ্ঞান একা একা চলতে পারে না। আকাশের তারাগুলি যেমন একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি সমাজের বিভিন্ন জ্ঞানক্ষেত্র, যেমন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কোনো একটি কৌশল টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করে অন্য জ্ঞানক্ষেত্রগুলির সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন। যদি মিল থাকে, তবেই তা টিকে যায়। সতেরো বা আঠারো শতকে জীববিজ্ঞান যখন প্রাণীদের শ্রেণিবিন্যাস করছিল, ঠিক সেই সময়ে অর্থনীতিও মানুষকে ধনী-গরিব বা পেশাজীবী হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করছিল। এই যে সব কিছুকে ছকে ফেলা বা তালিকাভুক্ত করা ছিল সেই সময়ের সব জ্ঞানের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। একে অপরের সঙ্গে মিল ছিল বলেই এই পদ্ধতি টিকে গিয়েছিল।
জ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় তৈরি হয় না, এটি নিয়ন্ত্রিত হয় বাইরের জগৎ দ্বারাও। ফুকো দেখান যে, শেষপর্যন্ত কোন কৌশলটি জয়ী হবে, তা ঠিক করে দেয় তিন প্রধান উপাদান, যথা ক্ষমতা, প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা।
প্রথমত, বাস্তব প্রয়োজন বা উপযোগিতা। যে কৌশলটি সমাজের বা রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধান করতে পারে, তাই টিকে থাকে, যেমন আমাদের দেশে একসময় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলাটা সামাজিকভাবে খুব অস্বস্তিকর ছিল। কিন্তু যখন দেখা গেল অতিরিক্ত জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং গরিবি বাড়াচ্ছে, তখন পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হল। এখানে অর্থনৈতিক প্রয়োজন পুরোনো সামাজিক মূল্যবোধকে সরিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে বাধ্য করল।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার মালিকানা। জ্ঞান কাদের হাতে? আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার কথাই ধরা যাক। এই জ্ঞানের চাবিকাঠি সাধারণ মানুষের হাতে নেই, এটি আছে ডাক্তার, বড়ো বড়ো ওষুধ কোম্পানি এবং স্বাস্থ্য সংস্থার হাতে। এই ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী ঠিক করে দেয় কোনটা সঠিক চিকিৎসা আর কোনটি কুসংস্কার। তারা তাদের স্বার্থের সঙ্গে মানানসই কৌশলকেই সমাজের ওপর প্রয়োগ করে।
তৃতীয়ত, মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ভীতি। সমাজ কোন বিষয়কে নিষিদ্ধ মনে করে আর কোনটিকে কামনা করে, তা জ্ঞানের গতিপথ ঠিক করে দেয়, যেমন যৌনতা বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে যে রাখঢাক, তা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ভীতির ফল। এই ভীতিই নির্ধারণ করে দেয় জনসমক্ষে এ নিয়ে কতটা আলোচনা করা যাবে।
ফুকো দেখিয়েছেন যে, আমরা চারপাশে যে নিয়ম-কানুন, চিকিৎসা ব্যবস্থা বা শিক্ষা ব্যবস্থা দেখি, এগুলি কোনো চিরকালীন সত্য নয়। এগুলি ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময়ে, সমাজের ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর প্রয়োজনে এবং অন্য জ্ঞানক্ষেত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৈরি করা একটি কৌশলগত বিন্যাস।
ইন্টারনেট আসবার পর সমাজে একটি নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদল মনে করে ইন্টারনেট অবাধ স্বাধীনতার জায়গা, যেখানে যা খুশি বলা যাবে। অন্যদল, বিশেষ করে রাষ্ট্র মনে করে ইন্টারনেট বিশৃঙ্খলার উৎস, তাই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে একে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই দুটো ধারণা একসঙ্গে চলতে পারে না। ফুকোর ভাষায়, এখানে একটি বাধ্যতামূলক বিকল্প তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রকে ঠিক করতে হয়েছে সে কি অবাধ স্বাধীনতাকে বৈধ’ বলবে, নাকি নিয়ন্ত্রণকে বৈধ বলবে? এখানে প্রযুক্তি, রাজনীতি ও আইন, এই তিনটি ডিসকোর্স একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। রাজনীতির মাঠে যাতে অস্থিরতা না তৈরি হয়, সেজন্য আইনের ক্ষেত্রটি ব্যবহার করা হচ্ছে প্রযুক্তির মুখ বন্ধ করবার জন্য।
ফুকো বলছেন, ক্ষমতা ঠিক করে দেয় কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা। ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা দেখি, রাষ্ট্র একটি কৌশল নিয়েছে যেখানে সরকারের ডিসকোর্সের বাইরের অনেক কিছুকেই গুজব বা অপপ্রচার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যিনি ক্ষমতা হাতে রাখেন, তিনি ঠিক করে দিচ্ছেন ফেইসবুকে করা কোন পোস্ট মতামত আর কোনটা অপরাধ। এখানে নিরাপত্তার ধারণা একটি কৌশলগত বিন্যাস হিসেবে কাজ করছে, যা নেটিজেনদের মনে একপ্রকার ভয়, মানে জেল বা মামলার ভয় তৈরি করে, যাতে মানুষ নিজেই নিজের কথা বা জ্ঞানকে সেন্সর করে ফেলে। কেবল নিরাপত্তার জন্য নয়, এটি এমন একটি কৌশল যা ঠিক করে দেয় সমাজে কোন কথাটি বলা বৈধ আর কোনটি অবৈধ। ফুকোর মতে, এই সবকিছুর মূলেই আছে ক্ষমতা। সমাজ বা রাষ্ট্র যখন কোনো নিয়ম চালু করে, তখন তারা কেবল নিয়মই চালু করে না, তারা আমাদের চিন্তা করবার পদ্ধতিটিই বদলে দিতে চায়। তারা চায় আমরা যেন তাদের তৈরি করা লেন্স দিয়েই পৃথিবীকে দেখি।
জ্ঞান মানেই এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে প্রতিনিয়ত পুরোনো ধারণার সঙ্গে নতুন ধারণার যুদ্ধ চলে। আর এই যুদ্ধে সেই ধারণাই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সবথেকে ভালো খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তাই ফুকোর মতে, কৌশলগত গঠন আসলে সত্য উদঘাটনের কোনো নিছক পদ্ধতি নয়, এটি ক্ষমতা চর্চার একটি যথার্থ অস্ত্র। ·
লেখক পরিচিতি : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য কবি, চিত্রী ও গল্পকার। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৭টি। ঢাকায় বসবাস করছেন।


0 মন্তব্যসমূহ