অনুবাদ ও সংযোজনা : ঝরা সৈয়দ
ফ্রান্সিন দ্যু প্লেসি গ্রে'র নাম শুনলেই বোঝা যায়, তার ভেতরে অনেক দেশের, অনেক সংস্কৃতির মিশ্রণ আছে। তার মুখে একদিকে দৃঢ়তা, অন্যদিকে কোমল বিস্ময়ের ছাপ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে থাকে তার কণ্ঠস্বর—গভীর, মাটির কাছাকাছি, আর শব্দের প্রতি এত ভালোবাসা যে তিনি কথা বললে শব্দগুলো যেন একটার সঙ্গে আরেকটা গড়িয়ে পড়ে।
তিনি ১৯৩০ সালে ওয়ারশতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ফরাসি কূটনীতিক বের্ত্রঁ দ্যু প্লেসি। মা তাতিয়ানা ইয়াকোভলেভা ছিলেন বিখ্যাত রুশ সুন্দরী। তাতিয়ানা ছোটবেলায় খুব দরিদ্র অবস্থায় বড় হয়েছেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুশকিন আর লেরমন্তভের কবিতা আবৃত্তি করে তিনি রুটি আর আলু পেতেন।
১৯২৬ সালে যক্ষ্মার কারণে তাতিয়ানা পরিবারসহ প্যারিসে চলে যান। সেখানে রুশ বিপ্লবের কবি মায়াকভস্কি তার প্রেমে পড়েন। পরে তাতিয়ানা যখন দ্যু প্লেসিকে বিয়ে করেন, বলা হয় এতে মায়াকভস্কির হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল।
১৯৪০ সালে, ফ্রান্সিনের বয়স তখন প্রায় দশ। তার বাবা দ্য গলের “ফ্রি ফ্রান্স” আন্দোলনে যোগ দিতে যান। কাসাব্লাঙ্কা থেকে বিমানে রওনা হওয়ার পর জিব্রাল্টারের কাছে বিমানটি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। তিনি মারা যান।
দুই বছর পরে তাতিয়ানা তার শৈশবের বন্ধু আলেকজান্ডার লিবারম্যানকে বিয়ে করেন। ফ্রান্সিনকে নিয়ে তারা নিউ ইয়র্কে চলে আসেন। সংসার চালানোর জন্য তাতিয়ানা টুপি সেলাইয়ের কাজ করতেন। অন্যদিকে লিবারম্যান ধীরে ধীরে শিল্পজগতে প্রতিষ্ঠিত হন। পরে তিনি Vogue ম্যাগাজিনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন এবং শেষে Conde Nast-এর সম্পাদকীয় পরিচালক হন।
ফ্রান্সিন ছোটবেলায় রুশ ও ফরাসি ভাষায় কথা বলতেন। বারো বছর বয়সের আগে তিনি ইংরেজি শেখেননি। সেই বয়সে তিনি বৃত্তি নিয়ে স্পেন্স স্কুলে ভর্তি হন। এক বছরের মধ্যেই স্কুলের বানান প্রতিযোগিতায় জিতে যান।
তিনি ছিলেন চুপচাপ স্বভাবের এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের শিশু। একসময় আংশিক বধিরও হয়ে পড়েছিলেন। তাই তার বেশিরভাগ সময় কাটত বই পড়ে। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি দস্তয়েভস্কি পড়েছেন, পনেরোতে কিয়ার্কেগার্ড। পরে তিনি স্কুল পত্রিকার সম্পাদক হন।
ইংরেজিতে তিনি এত ভালো ছিলেন যে কেউ কেউ সন্দেহ করত—তার পরিবার নাকি শরণার্থী পরিচয় মিথ্যা বলে বৃত্তি নিয়েছে।
ফ্রান্সিন প্রথমে ব্রিন মার কলেজে ভর্তি হন, পরে বার্নার্ড কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ১৯৫২ সালে স্নাতক হওয়ার পর তিনি ধর্মতত্ত্ব পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত নেন, বাবা-মায়ের প্রবল প্রভাব থেকে তাকে বের হয়ে আসতে হবে। তিনি আলাদা ঘর ভাড়া নেন এবং ইউপিআই রেডিও ডেস্কে রাতের শিফটে লেখার কাজ শুরু করেন।
তিনি মনে করেন, লেখক হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল নর্থ ক্যারোলিনার ব্ল্যাক মাউন্টেন কলেজে কাটানো দুটি গ্রীষ্মকাল। সেখানে তিনি অনেক শিল্পী ও লেখকের সংস্পর্শে আসেন—জন কেজ, মার্স কানিংহ্যাম, রবার্ট রাউশেনবার্গ, বেন শান, চার্লস ওলসনসহ আরও অনেকে। তিনি বলেন, “আমি তাদের সঙ্গে মাঠে কাজ করেছি, বাসন ধুয়েছি, তাদের কাছ থেকে বিদ্রোহ শিখেছি।”
এরপর থেকে তার লেখকজীবনে দুইটি বিষয় পাশাপাশি থেকেছে—বিদ্রোহ আর সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক। তিনি একদিকে ছিলেন শক্তিশালী নারীবাদী, অন্যদিকে পরিবারের প্রতিও গভীরভাবে নিবেদিত। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে তিনি সিরিয়াসভাবে লেখা শুরু করেন।
১৯৫৬ সালে তার পরিচয় হয় শিল্পী ক্লিভ গ্রের সঙ্গে। এক বছর পরে তারা বিয়ে করেন। তাদের দুই ছেলে। বিয়ের পর থেকে তারা কানেকটিকাটের কর্নওয়াল ব্রিজের একই বাড়িতে বসবাস করেছেন।
ফ্রান্সিন দ্যু প্লেসি গ্রে তিনটি উপন্যাস লিখেছেন—Lovers and Tyrants, World Without End, এবং October Blood। তবে তিনি বেশি পরিচিত তার নন-ফিকশন বইগুলোর জন্য। এর মধ্যে আছে Divine Disobedience, Hawaii: The Sugar-Coated Fortress, Adam and Eve in the City, এবং Soviet Women।
১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তার বই Rage and Fire। এটি ছিল ফ্লবেয়ারের প্রেমিকা লুইজ কোলে-র জীবনী। ফ্রান্সিন বলেন, “ফ্লবেয়ার লুইজ কোলে-র দুই হাজার পৃষ্ঠার চিঠি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। এমনকি গি দ্য মোপাসাঁকে ডেকে এনেছিলেন সেগুলো সরাতে সাহায্য করার জন্য।”
এই ঘটনাই তাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। সেই কারণেই তিনি কোলে-র জীবন নতুন করে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।
ভালোবাসা মানুষকে কত দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে—এই বিষয়টি তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। তার পরের বই At Home with the Marquise de Sade একই ধরনের বিষয় নিয়ে লেখা। এটি মারকুইজ দ্য সাদের জীবনী। সেই নারী দ্য সাদের প্রতি প্রেমে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে শেষ পর্যন্ত নিজের ভদ্রতা ও শালীনতার ধারণাও হারিয়ে ফেলেন।
বিদ্রোহ ও পরিবার। কঠোরতা ও সৌন্দর্য। নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটিলতা। এই বিষয়গুলোই বারবার ফিরে আসে ফ্রান্সিন দ্যু প্লেসি গ্রের লেখায়। তার ব্যক্তিত্বের মতোই তার লেখার জগতও ছিল বিচিত্র, আকর্ষণীয় এবং গভীর।
ফ্রান্সিন দ্যু প্লেসি গ্রে ‘পাঠ্যের প্রলোভন’ শিরোনামে একটি ছোট লেখা লিখেছিলেন। লেখাটিকে পাঠকদের কাছে আরো সহজবোধ করার জন্য কিছু উদাহরণসহ ব্যাখ্যা সংযুক্ত করা হলো।
ফ্রান্সিন দ্যু প্লেসি গ্রে
‘পাঠ্যের প্রলোভন’
-----------------
কয়েক বছর ধরে আমি লেখালেখি শেখাই। কিন্তু আমাকে যখনই ‘Creative Writing’ শেখানোর জন্য ডাকা হয়, আমি একটি শর্ত দিই। কোর্সের নাম থেকে ‘Creative’ শব্দটি বাদ দিতে হবে। কারণ আমার মনে হয়, শব্দটি এত বেশি ব্যবহার হয়েছে যে এর শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি, ‘Creative Writing’ নামটি একটি ভুল ধারণা তৈরি করে। মনে হয় যেন কিছু লেখা অন্য লেখার চেয়ে বেশি ‘সৃজনশীল’। আর কথাসাহিত্যই যেন সবচেয়ে সৃজনশীল লেখা। আমি এটা মানি না।
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান আমার কথা মেনে নেয়, তাহলে আমি কোর্সের সহজ নাম দিই—যেমন ‘পাঠ্যলেখন’।
তারপর আমি চারটি বিষয় নিয়ে কথা বলি :
১. বাক্যকে জীবন্ত করো
২. পাঠকের সঙ্গে বিশ্বাস তৈরি করো
৩. লেখায় শক্তি আনো
৪. জনরার বাঁধা মানো না
আমি খুব ব্যবহারিকভাবে লেখালেখি শেখাই। গল্পের প্লট বা চরিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগেই আমি মন দিই শব্দ, বাক্যের সুর এবং ভাষার শরীরের দিকে। কারণ শেষ পর্যন্ত পাঠক গল্প পড়ে না—সে পড়ে বাক্য। আর সেই বাক্য যদি নিস্তেজ হয়, তাহলে গভীর চিন্তা, বড় আবেগ কিংবা চমৎকার প্লটও পাঠকের মনে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে না। অন্যদিকে, একটি জীবন্ত বাক্য খুব সাধারণ একটি ঘটনাকেও স্মরণীয় করে তুলতে পারে।
তাই ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে ঢোকার আগেই আমি বোর্ডে কয়েকটি বাক্য লিখে রাখি। একটি নিই Vladimir Nabokov-এর Speak, Memory থেকে : “সে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ফিরে তাকাল। তারপর জুঁইফুলের গন্ধে ভরা ছোট স্টেশনের গোধূলিতে নেমে গেল।”
আরেকটি নিই James Agee-এর Let Us Now Praise Famous Men থেকে : “তরুণটির চোখ ছিল গাঢ় তেলের মতো। তরুণীর চোখ ছিল উজ্জ্বল পিতলের মতো দীপ্ত।”
আমি ছাত্রদের জিজ্ঞেস করি, এই দুই বাক্যের মিল কোথায়?
উত্তর হলো, দুই বাক্যেরই নিজস্ব সুর আছে। শব্দগুলো এমন নিখুঁতভাবে বসানো যে একটি শব্দ বদলে দিলে পুরো বাক্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু শুধু সুর নয়, এই বাক্যগুলোর ভেতরে আছে নতুনভাবে দেখার ক্ষমতা। “জুঁইফুলের গন্ধে ভরা গোধূলি” কিংবা “গাঢ় তেলের মতো চোখ”—এই ধরনের চিত্র আমরা প্রতিদিন শুনি না। আর এই নতুনত্বই আমাদের টানে।
এর বিপরীতে সস্তা প্রেমের গল্পে আমরা একই ধরনের ক্লিশে বারবার দেখি—“কাঁপতে থাকা ঠোঁট”, “ঝলমলে চোখ”, “চাঁদের মতো মুখ”। এত বেশি ব্যবহারে এসব বাক্যের শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। পাঠক এগুলো পড়ামাত্র বুঝে যায় এরপর কী আসবে। ফলে ভাষা আর কোনো বিস্ময় তৈরি করতে পারে না।
তাই আমি ছাত্রদের বলি, প্রতিটি শব্দকে গুরুত্ব দাও। বহু ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্য থেকে দূরে থাকো। কারণ জীবন্ত বাক্য সবসময় নতুনভাবে দেখে।
আমরা প্রায়ই দেখি, দুজন মানুষ একই ঘটনা লিখছে। কিন্তু একজনের লেখা পড়ে কিছুই অনুভব হয় না, আর অন্যজনের লেখা পড়লে দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এই পার্থক্যের মূল কারণ বাক্যের প্রাণশক্তি। জীবন্ত বাক্য শুধু তথ্য দেয় না; তা অনুভূতি তৈরি করে। পাঠক যেন শুধু পড়ে না, বরং দেখে, শোনে, গন্ধ পায়, স্পর্শ অনুভব করে।
ধরো, একটি বাক্য লেখা হলো : “বৃষ্টি হচ্ছিল।” বাক্যটি ভুল নয়। এটি তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু এতে কোনো দৃশ্য নেই, কোনো আবহ নেই, কোনো অনুভূতি নেই। এখন যদি লেখা হয় : “টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠছিল”—তাহলে সঙ্গে সঙ্গে শব্দ এসে গেল। অথবা যদি বলা হয় : “বৃষ্টির জল নর্দমা উপচে কালো স্রোতের মতো রাস্তায় বয়ে যাচ্ছিল”—তাহলে দৃশ্য তৈরি হলো। এখান থেকেই জীবন্ত বাক্যের শুরু।
সংযোজন :
জীবন্ত বাক্য সাধারণত ‘বলে’ কম, ‘দেখায়’ বেশি। একজন দুর্বল লেখক লিখতে পারে : “লোকটি খুব ভয় পেয়েছিল।” কিন্তু শক্তিশালী লেখক হয়তো লিখবেন : “চায়ের কাপটা তার হাতে কাঁপছিল, আর কাপের ধারে চা উপচে পড়ছিল।” এখানে ‘ভয়’ শব্দটি একবারও ব্যবহার করা হয়নি, কিন্তু পাঠক ভয় অনুভব করছে। অর্থাৎ অনুভূতিকে সরাসরি ঘোষণা না করে দৃশ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে।
এই কারণেই বড় লেখকেরা নির্দিষ্ট জিনিস ব্যবহার করেন। তারা ‘ফুল’ বলেন না, বলেন ‘শিউলি’ বা ‘রজনীগন্ধা’। তারা ‘পাখি’ বলেন না, বলেন ‘শালিক’ বা ‘দোয়েল’। কারণ নির্দিষ্ট শব্দ পাঠকের চোখে স্পষ্ট ছবি তৈরি করে। “একটি গাছ ছিল” বললে যা হয়, “আমগাছের নিচে শুকনো পাতা জমে ছিল” বললে তার চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্য তৈরি হয়।
জীবন্ত বাক্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শব্দের সুর। একটি বাক্যের ভেতরে শব্দ কীভাবে বসছে, কোন শব্দের পরে কোন শব্দ আসছে, তারও শক্তি আছে। কিছু বাক্য পড়লে মনে হয় তা গড়িয়ে যাচ্ছে, কিছু বাক্য পড়লে মনে হয় ধাক্কা দিচ্ছে। “জুঁইফুলের গন্ধে ভরা গোধূলি”—এই বাক্যে শুধু অর্থ নয়, শব্দের ভেতরেও নরম একটি সুর আছে। আবার “চিটচিটে তেলের স্তরে আটকে থাকা থালা”—এই ধরনের বাক্যে শব্দগুলোর মধ্যেই যেন ভারী, নোংরা অনুভূতি তৈরি হয়।
ভালো লেখকেরা শক্তিশালী ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেন। দুর্বল বাক্যে ক্রিয়াগুলোও দুর্বল হয়। যেমন “সে ঘরে ঢুকল”—এটি সাধারণ। কিন্তু “সে দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়ল”—এখানে সঙ্গে সঙ্গে শক্তি তৈরি হয়। ‘হাঁটছিল’ আর ‘টেনে টেনে হাঁটছিল’—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। ক্রিয়াপদ বাক্যে শরীর ও গতি আনে।
Ernest Hemingway-এর লেখার শক্তি এখানেই। তার অনেক বাক্য খুব ছোট, কিন্তু গভীরভাবে জীবন্ত। কারণ সেখানে অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই। তিনি “সে ক্লান্ত ছিল” বলার বদলে লিখতে পারেন : “সে খাটে সোজা হয়ে শুয়ে রইল। নড়ল না।” এখানে ‘ক্লান্ত’ শব্দটি নেই, কিন্তু ক্লান্তি অনুভব করা যাচ্ছে। অর্থাৎ জীবন্ত বাক্য আবেগকে ব্যাখ্যা করে না; তা দৃশ্যের মাধ্যমে অনুভব করায়।
জীবন্ত বাক্য লেখার জন্য লেখককে মন দিয়ে পৃথিবী দেখতে হয়। শুধু ধারণা দিয়ে জীবন্ত লেখা হয় না। লেখককে লক্ষ্য করতে হয় আলো কীভাবে পড়ে, মানুষের মুখ ক্লান্ত হলে কেমন দেখায়, পুরোনো ঘরের গন্ধ কেমন, ভোরের রাস্তায় কী শব্দ শোনা যায়। যারা ভালো পর্যবেক্ষক, তারা সাধারণত ভালো বাক্য লেখেন। কারণ তারা পৃথিবীকে খুঁটিয়ে দেখেন।
অনেক নতুন লেখক বড় বড় ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু বাক্যের ভেতরে প্রাণ আনতে পারেন না। তারা ‘দুঃখ’, ‘ভালোবাসা’, ‘একাকিত্ব’ এসব শব্দ ব্যবহার করেন, কিন্তু পাঠক সেই অনুভূতিগুলো সত্যি সত্যি অনুভব করে না। কারণ অনুভূতি শুধু নাম বললে কাজ হয় না। তা দৃশ্য, শব্দ, শরীরী ভঙ্গি এবং পরিবেশের মাধ্যমে তৈরি করতে হয়।
ধরো, “সে একা ছিল”—এটি শুধু তথ্য। কিন্তু “খাওয়ার টেবিলে দ্বিতীয় প্লেটটা অনেকক্ষণ খালি পড়ে ছিল”—এই বাক্যে একাকিত্ব অনুভব করা যায়। অর্থাৎ জীবন্ত বাক্য বিমূর্ত অনুভূতিকেও দৃশ্যমান করে তোলে।
তবে জীবন্ত বাক্য মানেই অলংকারপূর্ণ বা কঠিন বাক্য নয়। অনেক সময় খুব সহজ বাক্যও গভীরভাবে জীবন্ত হতে পারে। জীবন্ত বাক্যের জন্য সবসময় জটিলতা দরকার হয় না; দরকার নির্ভুলতা। একজন লেখক যখন সত্যিই ভাষাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি শব্দকে শুধু তথ্য বহনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। তিনি জানেন, একটি সঠিক শব্দ পুরো দৃশ্য বদলে দিতে পারে। ‘বাড়ি’ আর ‘টিনের ছাউনিওয়ালা বাড়ি’—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। ‘খাওয়া’ আর ‘লোভে গোগ্রাসে খাওয়া’—এই দুইয়ের মধ্যেও আলাদা শক্তি আছে।
শেষ পর্যন্ত জীবন্ত বাক্য হলো সেই বাক্য, যা পাঠকের মনে থেকে যায়। বই বন্ধ করার পরও যার ছবি মাথায় ভাসে। যে বাক্য শুধু পড়া হয় না, অনুভব করা হয়। একজন বড় লেখকের শক্তি এখানেই—তিনি আমাদের শুধু গল্প শোনান না, তিনি আমাদের দিয়ে সেই গল্পের ভেতরে বাঁচান।
----------------------
এরপর আমি বলি বিশ্বাসের কথা। একজন ভালো লেখক আর একজন ভালো প্রেমিকের মধ্যে একটি গভীর মিল আছে—দুজনকেই অন্যজনের আগ্রহ ধরে রাখতে হয়। সবকিছু একসঙ্গে বলে দিলে আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়। কিছু জানাতে হয়, কিছু গোপন রাখতে হয়। সেই আংশিক প্রকাশ আর আংশিক গোপনতার মধ্য থেকেই কৌতূহল জন্ম নেয়। আর লেখার শুরুতে এই বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথম কয়েকটি লাইনেই লেখককে পাঠকের মনোযোগ, বিশ্বাস এবং কৌতূহল অর্জন করতে হয়।
আমি উদাহরণ দিই Flannery O'Connor-এর গল্প The Geranium থেকে :
“বুড়ো ডাডলি চেয়ারে বসে দূরের জানালার দিকে তাকাল।
সে জেরেনিয়ামের জন্য অপেক্ষা করছিল।”
এই কয়েকটি লাইনে খুব বেশি তথ্য নেই। আমরা জানি না জেরেনিয়ামটি কী, কেন সে অপেক্ষা করছে, বা এই অপেক্ষার গুরুত্ব কী। কিন্তু ঠিক এই অসম্পূর্ণতাই কৌতূহল তৈরি করে। পাঠক ভাবতে শুরু করে—কী ঘটতে যাচ্ছে? এইভাবেই লেখক পাঠককে ধরে রাখেন। তিনি সব দরজা খুলে দেন না; বরং সামান্য ফাঁক রাখেন, যাতে পাঠক নিজেই ভেতরে ঢুকতে চায়।
সংযোজন :
পাঠকের বিশ্বাস তৈরি করা কথাসাহিত্যের সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি। কারণ পাঠক জানে গল্পটি সত্যি নয়। তবু সে কিছু সময়ের জন্য সেই কল্পিত জগতকে সত্যি বলে মেনে নিতে চায়। একজন কথাসাহিত্যিকের কাজ হলো সেই বিশ্বাস তৈরি করা। এই বিশ্বাস না তৈরি হলে পাঠক গল্পের ভেতরে ঢুকতে পারে না। তখন সে শুধু শব্দ পড়ে, কিন্তু গল্পে বাঁচে না।
এই বিশ্বাস শুধু বাস্তব ঘটনা লিখে তৈরি হয় না। বরং লেখকের ভাষা, বর্ণনা, চরিত্র, পরিবেশ এবং আবেগের সততার মাধ্যমে তৈরি হয়। একজন বড় লেখক এমনভাবে একটি জগৎ নির্মাণ করেন যে পাঠক ধীরে ধীরে সেই জগতের নিয়ম মেনে নিতে শুরু করে।
Gabriel García Márquez এই ব্যাপারটির সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। তার One Hundred Years of Solitude উপন্যাসে আমরা দেখি, এক নারী কাপড় শুকাতে শুকাতে হঠাৎ আকাশে উড়ে গেলেন। বাস্তবে এটি অসম্ভব। কিন্তু আমরা পড়ার সময় সেটিকে অস্বীকার করি না। কারণ মার্কেজ ঘটনাটি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লিখেছেন যেন এটি সেই পৃথিবীর খুব সাধারণ ঘটনা। তিনি পাঠককে চমকে দিতে চান না; বরং এমনভাবে লেখেন যেন এই অলৌকিক ঘটনাও জীবনের স্বাভাবিক নিয়মের অংশ। ফলে পাঠকও ধীরে ধীরে সেটি মেনে নেয়।
মার্কেজ বলেছিলেন, এই কৌশল তিনি শিখেছিলেন তার দাদির কাছ থেকে। তার দাদি অসম্ভব ঘটনাও এমন স্বাভাবিক মুখে বলতেন যে শুনতে শুনতে তা সত্যি বলে মনে হতো। অর্থাৎ, লেখকের নিজের বিশ্বাসই পাঠকের বিশ্বাস তৈরি করে। লেখক যদি দ্বিধাগ্রস্ত হন, পাঠকও দ্বিধায় পড়ে যায়।
Franz Kafka-র The Metamorphosis-এ আমরা এই কৌশলের আরেক রূপ দেখি। গল্পের প্রথম লাইনেই গ্রেগর সামসা ঘুম থেকে উঠে দেখে সে একটি বিশাল পোকায় পরিণত হয়েছে। বাস্তবে মানুষ পোকা হয় না। কিন্তু কাফকা এই ঘটনাটি নিয়ে কোনো নাটকীয় হৈচৈ করেন না। বরং গ্রেগর এখন অফিসে যেতে পারবে কি না, দরজা খুলবে কীভাবে—এসব দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে চিন্তা করছে। অর্থাৎ অসম্ভব ঘটনাকে বাস্তব জীবনের খুব সাধারণ চিন্তার ভেতরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে পাঠকও ঘটনাটিকে ধীরে ধীরে মেনে নেয়।
Leo Tolstoy আবার অন্যভাবে পাঠকের বিশ্বাস তৈরি করেন। তার Anna Karenina পড়লে মনে হয় চরিত্রগুলো সত্যিই বেঁচে আছে। কারণ টলস্টয় মানুষের মনকে অসাধারণ সূক্ষ্মতায় দেখেন। আন্নার ঈর্ষা, ভয়, ভালোবাসা বা অপরাধবোধ এত নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে যে পাঠক তাকে বাস্তব মানুষ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এখানে কোনো জাদু নেই; আছে আবেগের সত্যতা। আর সেই সত্যতাই বিশ্বাস তৈরি করে।
Fyodor Dostoevsky-এর ক্ষেত্রেও একই কথা। তার চরিত্ররা চরম মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে থাকে। তারা দীর্ঘ কথা বলে, অপরাধবোধে কাঁপে, নিজেদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। বাস্তব জীবনে হয়তো মানুষ এত নাটকীয়ভাবে কথা বলে না। তবু আমরা রাসকলনিকভকে বিশ্বাস করি। কারণ তার মানসিক যন্ত্রণা সত্যি মনে হয়। দস্তয়েভস্কি মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে এমনভাবে দেখান যে পাঠক মনে করে—হ্যাঁ, মানুষের ভেতরে এমন ভয়ংকর সংঘাত সত্যিই থাকতে পারে।
Ernest Hemingway খুব অল্প কথায় বিশ্বাস তৈরি করেন। তার চরিত্ররা বেশি কথা বলে না। তিনি আবেগ ব্যাখ্যা করেন না। কিন্তু ছোট ছোট দৃশ্যের মাধ্যমে এমন বাস্তবতা তৈরি করেন যে পাঠক নীরবে বিশ্বাস করতে শুরু করে। The Old Man and the Sea-তে বৃদ্ধ জেলের সমুদ্রযাত্রা আমরা বিশ্বাস করি, কারণ সমুদ্র, মাছ ধরা, শরীরের ক্লান্তি—সব এত নির্ভুলভাবে লেখা।
আবার Toni Morrison-এর Beloved-এ মৃত শিশুর আত্মা ফিরে আসে। এটি অলৌকিক ঘটনা। কিন্তু উপন্যাসটি দাসপ্রথার ভয়ংকর স্মৃতিকে এমন গভীর আবেগ দিয়ে নির্মাণ করে যে সেই ভূতও বাস্তব মনে হয়। এখানে ভূতটি শুধু ভূত নয়; ইতিহাসের দুঃস্বপ্নের প্রতীক। পাঠক ঘটনাটিকে বাস্তব না অবাস্তব হিসেবে নয়, মানসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করে।
আসলে কথাসাহিত্যে পাঠকের বিশ্বাস তৈরি হয় কয়েকভাবে। প্রথমত, লেখককে তার জগতের নিয়ম বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়। মার্কেজের ম্যাকন্ডো বাস্তব পৃথিবীর মতো নয়, কিন্তু তার নিজের নিয়ম আছে। সেই নিয়মে একবার ঢুকে গেলে পাঠক সব মেনে নেয়। দ্বিতীয়ত, আবেগকে সত্যি করতে হয়। টলস্টয় বা দস্তয়েভস্কির চরিত্ররা বাস্তব মনে হয় কারণ তাদের অনুভূতি সত্যি লাগে। তৃতীয়ত, ভাষার ভেতরে দৃঢ়তা থাকতে হয়। কাফকা যদি লিখতেন ‘হয়তো’ গ্রেগর পোকা হয়েছে, তাহলে আমরা বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু তিনি একেবারে নিশ্চিত স্বরে লিখেছেন। ফলে পাঠকও মেনে নেয়।
এই কারণেই বড় কথাসাহিত্যিকরা শুধু গল্প বলেন না; তারা একটি বিশ্বাসের জগৎ তৈরি করেন। পাঠক সেই জগতে প্রবেশ করে এবং কিছু সময়ের জন্য বাস্তব পৃথিবী ভুলে যায়। সেই মুহূর্তেই সাহিত্য সত্যিকারের সফল হয়।
----------------------
এরপর আমি বলি, লেখায় শক্তি থাকতে হবে। অনেক বড় লেখক লেখাকে শরীরের শক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। William H. Gass বলেছেন, দুর্বল ও ভীতু গদ্য লিখো না। Gustave Flaubert বলেছিলেন, ভালো লেখার ভেতরে রক্তের স্পন্দন থাকতে হবে। অর্থাৎ, বাক্য যেন নিস্তেজ না হয়। তার ভেতরে গতি, চাপ, শরীর, আবেগ—কিছু একটা জীবন্ত শক্তি থাকতে হবে।
“লেখায় শক্তি আনো” কথাটির অর্থ আসলে এটাই—বাক্য যেন শুধু তথ্য না দেয়; তা পাঠককে স্পর্শ করে, ধাক্কা দেয়, অথবা অন্তত এমন অনুভূতি তৈরি করে যে শব্দগুলো জীবন্ত। একটি শক্তিশালী বাক্য পড়লে মনে হয় শব্দগুলো শুধু কাগজে বসে নেই; তারা নড়ছে, হাঁটছে, শ্বাস নিচ্ছে।
এই কারণেই আমি ছাত্রদের সামনে George Orwell-এর একটি বাক্য তুলে ধরি :
“ আমি সেই ঠান্ডা, নোংরা রান্নাঘরে ফিরে এলাম। মেঝেতে আলুর খোসা, হাড় আর মাছের লেজ পড়ে ছিল। সবকিছু তেলে চিটচিটে হয়ে ছিল।”
এই কয়েকটি বাক্য পড়লেই আমরা রান্নাঘরের নোংরা পরিবেশ অনুভব করতে পারি। শুধু দৃশ্য নয়, গন্ধ, চিটচিটে স্পর্শ, বিরান ক্লান্তি—সব যেন শরীরে এসে লাগে। বিশেষ করে “তেলে চিটচিটে হয়ে ছিল” ধরনের পুনরাবৃত্তি আমাদের সেই নোংরা অনুভূতির মধ্যেই আটকে রাখে। এটাই শক্তিশালী লেখার কাজ। তা শুধু বর্ণনা করে না; অনুভব করায়।
সংযোজন :
দুর্বল লেখার একটি বড় লক্ষণ হলো, সেখানে সবকিছু শুধু ‘বলা’ হয়। যেমন, “লোকটি খুব রেগে গিয়েছিল।” এখানে তথ্য আছে, কিন্তু রাগের শক্তি নেই। পাঠক শুধু জানছে, অনুভব করছে না। কিন্তু যদি লেখা হয়, “লোকটি গ্লাসটা টেবিলে এমন জোরে রাখল যে পানি ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল,” তখন রাগটি দৃশ্য হয়ে ওঠে। এখানে লেখক রাগকে ব্যাখ্যা করেননি; একটি কাজ দেখিয়েছেন। আর সেই কাজের মধ্য দিয়েই রাগের শক্তি অনুভূত হচ্ছে।
শক্তিশালী লেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর একটি হলো শক্তিশালী ক্রিয়াপদ। দুর্বল লেখক সাধারণ ক্রিয়াপদের ওপর নির্ভর করেন—‘গেল’, ‘করল’, ‘ছিল’। কিন্তু শক্তিশালী লেখক এমন ক্রিয়া ব্যবহার করেন যা দৃশ্যকে নড়াচড়া করায়। যেমন “সে ঘরে ঢুকল” একটি সাধারণ বাক্য। কিন্তু “সে দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়ল” বললে সঙ্গে সঙ্গে শরীরের গতি এসে যায়। ‘ঠেলে’ আর ‘ঢুকে পড়ল’—এই শব্দগুলোর মধ্যেই শক্তি আছে।
Ernest Hemingway-এর লেখার শক্তি এখানেই। তার বাক্য ছোট, কিন্তু দৃঢ়। তিনি বাড়তি অলংকার ব্যবহার করতেন না। তার ভাষা ছিল পরিষ্কার, শক্ত, সরাসরি। যেমন একটি বাক্য : “সে রোদের মধ্যে দেয়ালের পাশে বসে পড়ল।” বাক্যটি খুব সহজ। কিন্তু “বসে পড়ল” শব্দের মধ্যে শরীরের ক্লান্তি ও ভার অনুভব করা যায়। হেমিংওয়ে আবেগ নিয়ে বড় বড় কথা বলেন না। তিনি ছোট দৃশ্য ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই দৃশ্যের ভেতরে এমন বাস্তবতা থাকে যে পাঠক তা অনুভব করতে বাধ্য হয়।
আবার Gabriel García Márquez-এর লেখার শক্তি আসে তার প্রবল কল্পনা ও ভাষার প্রবাহ থেকে। তার বাক্য অনেক সময় দীর্ঘ হয়, কিন্তু তার ভেতরে গতি থাকে। One Hundred Years of Solitude উপন্যাসের শুরুতেই আমরা পড়ি : “অনেক বছর পরে, যখন সে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াবে…”। এই একটি বাক্যের মধ্যেই ভবিষ্যৎ, মৃত্যু, স্মৃতি—সব একসঙ্গে এসে যায়। পাঠক সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত টান অনুভব করে। মার্কেজের শক্তি হলো, তিনি অসম্ভব ঘটনাকেও এমন দৃঢ়তার সঙ্গে লেখেন যে তা সত্যি বলে মনে হয়।
Fyodor Dostoevsky-এর লেখার শক্তি আবার আসে মানসিক বিস্ফোরণ থেকে। তার চরিত্ররা চুপচাপ থাকে না। তারা অপরাধবোধে ভোগে, তর্ক করে, কাঁপে, চিৎকার করে, নিজেদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ফলে তার বাক্যেও এক ধরনের অস্থির শক্তি থাকে। মনে হয় মানুষের ভেতরের অন্ধকার সরাসরি কাগজে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে Toni Morrison-এর লেখার শক্তি আসে ইতিহাসের ভার এবং শব্দের সুর থেকে। তার বাক্যে শুধু দৃশ্য নয়, বহু মানুষের যন্ত্রণা, স্মৃতি এবং ইতিহাস জমা থাকে। ফলে তার ভাষা পড়লে মনে হয় তা শুধু গল্প বলছে না; বহু পুরোনো ক্ষতও বহন করছে।
শক্তিশালী লেখার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা নির্দিষ্ট হয়। “রাস্তাটি খুব নির্জন ছিল”—এটি দুর্বল বাক্য। কারণ এখানে শুধু ধারণা আছে। কিন্তু যদি লেখা হয়, “রাস্তাটায় শুধু কাগজ উড়ছিল, মানুষের কোনো শব্দ ছিল না,” তখন দৃশ্য তৈরি হয়। পাঠক সেই নির্জনতা দেখতে পায়। আবার “সে খুব ক্ষুধার্ত ছিল” বললে শুধু তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু “সে থালার শেষ ভাতটুকুও আঙুল দিয়ে চেটে খেল” বললে ক্ষুধা শরীরের ভেতর দিয়ে অনুভূত হয়।
তবে শক্তিশালী লেখা সবসময় উচ্চস্বরে কথা বলে না। অনেক সময় নীরব বাক্যও গভীরভাবে শক্তিশালী হতে পারে। Anton Chekhov-এর অনেক বাক্য খুব শান্ত, কিন্তু তাদের ভেতরে চাপা আবেগ থাকে। “সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল”—এই ছোট বাক্যও যদি সঠিক জায়গায় আসে, তা গভীর একাকিত্ব বা বিষণ্নতা তৈরি করতে পারে। কারণ শক্তি মানে শুধু জোরে বলা নয়; শক্তি মানে উপস্থিতি। বাক্যটি পড়ার পরে তা পাঠকের মনে থেকে যায় কি না, সেটাই আসল।
শেষে আমি ছাত্রদের বলি—জনরার ভেতরে নিজেকে বন্দি কোরো না। আমি অনেক ছাত্র দেখেছি যারা লেখার কৌশল নিয়ে বড় বড় কথা বলতে পারে, কিন্তু একটি গন্ধ, একটি মুখ বা একটি জায়গাকে জীবন্ত
করে তুলতে পারে না। অনেক লেখালেখির কোর্স এখন শুধু বাজারের জন্য লেখক তৈরি করছে। Flannery O'Connor একসময় বলেছিলেন : “এখন এত মানুষ মোটামুটি দক্ষ গল্প লিখতে পারে যে ছোটগল্প মাধ্যমটাই সেই দক্ষতার চাপে মরে যাচ্ছে।”
অর্থাৎ, কারিগরি দক্ষতা আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। অথচ বড় গদ্য শুধু উপন্যাসে থাকে না। সাংবাদিকতা, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ—এসবের মধ্যেও অসাধারণ সাহিত্য তৈরি হতে পারে।
আমি কথাসাহিত্যকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু আমি এটাও মানি—আমরা কথাসাহিত্যকে বেছে নিই না; কথাসাহিত্যই আমাদের বেছে নেয়। তাই কেউ যদি কথাসাহিত্য লিখতে না-ও পারে, তবু হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ভালো নন-ফিকশনও বড় শিল্প হতে পারে।
W. B. Yeats বলেছিলেন : “গুরুত্বপূর্ণ হলো গায়ক, গান নয়।”
তাই আমি ছাত্রদের বলি—অনেক পড়ো। পাঠককে মুগ্ধ রাখো। আর তোমার লেখা কোন বিভাগে পড়বে, তা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা কোরো না। পৃথিবী একদিন তোমাকে নিজেই কোনো খোপে ভরে দেবে। কিন্তু এখন তোমরা স্বাধীন। ভাষার বিশাল মাঠে দৌড়ে বেড়াও। খেলো। আনন্দ করো।
জনরার জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াও
ক্লাসের শেষ দিনে আমি ছাত্রছাত্রীদের বলি—আমরা একসঙ্গে ভালো সময় কাটিয়েছি, কিন্তু শেষ কথা আমি একটু কঠিনভাবে বলতে চাই। কারণ এই ধরনের লেখালেখির ক্লাস নিয়ে আমার গভীর অস্বস্তি আছে।
আমি অনেক ছাত্রছাত্রী দেখেছি, যারা খুব সহজে ‘ভয়েস’, ‘ন্যারেটিভ কৌশল’ বা ‘গল্পের ভাঙন’ নিয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু তারা সুন্দর গদ্যের সুর বোঝে না। তারা স্পষ্টভাবে কোনো গন্ধ, কোনো স্পর্শ, কোনো মুখ বা কোনো জায়গার চেহারা বর্ণনা করতে পারে না। যেন তারা লেখার প্রাণের চেয়ে লেখার কৌশল বেশি শিখেছে।
আমার ভয় হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক লেখালেখির প্রোগ্রাম এখন খুব দ্রুত এমন একদল নতুন লেখক তৈরি করছে, যারা শুধু ‘creative writer’ নামে পরিচিত হতে চায়। কিন্তু তারা Homer, Thomas Browne বা James Agee-এর লেখা পর্যন্ত পড়ে দেখেনি। আরও খারাপ হলো, তারা ভালো পাঠক হতে শেখার বদলে শুধু গল্প লেখার কারিগরি কৌশল শিখছে। যেন বাজারে বিক্রি হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।
Flannery O'Connor এই সমস্যাটা অনেক আগেই বুঝেছিলেন। ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন : “এখন এমনকি সামান্য প্রতিভা থাকলেও কেউ লেখালেখির ক্লাস থেকে বেরিয়ে ঠিকঠাক গল্প লিখতে পারে। এত বেশি ‘দক্ষ’ গল্প এখন লেখা হচ্ছে যে ছোটগল্প মাধ্যমটাই সেই দক্ষতার চাপে মরে যাচ্ছে।”
এই কথার ভেতরে গভীর ব্যঙ্গ আছে। কারণ ‘দক্ষ’ হওয়া আর সত্যিকারের শিল্পী হওয়া এক জিনিস নয়। অনেক লেখা কারিগরি দিক থেকে ঠিক হতে পারে, কিন্তু তাতে প্রাণ নাও থাকতে পারে।
এই কারণেই আমি ছাত্রদের মনে করিয়ে দিই—বড় গদ্য শুধু উপন্যাসে নেই। সাংবাদিকতা, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি—এসবের মধ্যেও অসাধারণ সাহিত্য তৈরি হতে পারে। অথচ ‘creative writing’ ক্লাসে প্রায়ই এগুলোকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংযোজন :
আসলে “জনরার বাঁধা মানো না” কথাটির মানে হলো, একজন লেখক যেন নিজেকে আগে থেকেই কোনো নির্দিষ্ট ঘরের মধ্যে আটকে না ফেলেন। “আমি শুধু উপন্যাস লিখব”, “আমি শুধু কবি”, “আমি শুধু সাংবাদিক”—এই ধরনের সীমা যেন লেখাকে নিয়ন্ত্রণ না করে।
Francine du Plessix Gray বলতে চেয়েছেন, সাহিত্যকে শুধু ‘উপন্যাস’, ‘গল্প’, ‘স্মৃতিকথা’, ‘প্রবন্ধ’ বা ‘সাংবাদিকতা’—এই আলাদা আলাদা বাক্সে ভরে দেখলে অনেক বড় লেখাকে আমরা বুঝতেই পারব না। কারণ বড় সাহিত্য প্রায়ই এই সীমাগুলো ভেঙে ফেলে।
উদাহরণ হিসেবে Gabriel García Márquez-কে দেখা যায়। আমরা তাকে মূলত ঔপন্যাসিক হিসেবে চিনি। কিন্তু তার সাংবাদিকতাও অসাধারণ সাহিত্য। News of a Kidnapping আসলে সাংবাদিকতামূলক বই। কিন্তু পড়লে মনে হয় উপন্যাস পড়ছি। সেখানে চরিত্র, ভয়, উত্তেজনা, দৃশ্য—সব আছে। আবার The Story of a Shipwrecked Sailor একটি বাস্তব ঘটনা নিয়ে লেখা রিপোর্টাজ। কিন্তু ভাষা ও নির্মাণের শক্তিতে তা সাহিত্যে পরিণত হয়েছে। মার্কেজ নিজেই বলতেন, সাংবাদিকতা তাকে বাস্তবকে দেখতে শিখিয়েছে, আর উপন্যাস তাকে কল্পনা দিয়েছে। অর্থাৎ তিনি জনরার দেয়াল মানেননি।
Truman Capote-এর In Cold Blood আরেকটি বড় উদাহরণ। বইটি একটি সত্যিকারের খুনের ঘটনা নিয়ে। কিন্তু তিনি এটিকে এমনভাবে লিখেছেন যে তা উপন্যাসের মতো পড়ে। তিনি একে বলেছিলেন ‘nonfiction novel’। অর্থাৎ বাস্তব ঘটনা, কিন্তু উপন্যাসের শিল্পে লেখা। আগে মানুষ ভাবত সাংবাদিকতা আর সাহিত্য আলাদা জিনিস। কাপোটি সেই দেয়াল ভেঙেছিলেন।
আবার W. G. Sebald-এর বই পড়লে বোঝাই কঠিন হয়ে যায়—এগুলো উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি নাকি ইতিহাস। তার লেখায় পুরোনো ছবি আছে, বাস্তব ইতিহাস আছে, আবার কল্পনাও আছে। তিনি ইচ্ছে করেই এই সীমাগুলো মুছে দেন। কারণ মানুষের স্মৃতিই তো পুরোপুরি ‘ফিকশন’ বা ‘নন-ফিকশন’ নয়।
Jorge Luis Borges-এর লেখাও জনরার সীমা ভেঙে দেয়। তার অনেক গল্প দেখতে প্রবন্ধের মতো। সেখানে কাল্পনিক বই, ভুয়া লেখক, দার্শনিক আলোচনা—সব মিশে থাকে। Tlön, Uqbar, Orbis Tertius পড়লে মনে হয় এটি একইসঙ্গে গল্প, দর্শন, গ্রন্থপঞ্জি আর স্বপ্ন।
Milan Kundera উপন্যাসের মধ্যে হঠাৎ দার্শনিক আলোচনা শুরু করেন। আবার ব্যক্তিগত স্মৃতিও ঢোকান। ফলে তার উপন্যাস শুধু গল্প থাকে না; তা চিন্তার জায়গাও হয়ে ওঠে।
Virginia Woolf-এর A Room of One’s Own কি প্রবন্ধ, না স্মৃতিকথা, না কল্পকাহিনি? সেখানে বক্তৃতা আছে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে, আবার কাল্পনিক নারী চরিত্রও আছে। উলফ বুঝিয়েছেন, সাহিত্যকে সবসময় এক নামের ভেতরে আটকে রাখা যায় না।
বাংলা সাহিত্যেও এর উদাহরণ আছে। Syed Waliullah-এর কাঁদো নদী কাঁদো শুধু উপন্যাস নয়; সেখানে লোককথা, প্রতীক, মনস্তত্ত্ব—সব মিশে গেছে। আবার Humayun Ahmed কখনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, কখনো আত্মজৈবনিক গদ্য, কখনো রহস্য, কখনো দার্শনিক ভাবনা—সব একসঙ্গে এনেছেন।
আসলে “জনরার বাঁধা মানো না” কথাটির গভীর অর্থ হলো সাহিত্যের প্রাণকে ফর্মের চেয়ে বড় ভাবো। যদি কোনো সত্য প্রকাশ করার জন্য গল্প যথেষ্ট না হয়, তাহলে প্রবন্ধ ঢুকুক। যদি বাস্তব ঘটনা কল্পনার সাহায্য চায়, তাহলে সেটিও আসুক। যদি স্মৃতি আর স্বপ্ন একসঙ্গে মিশে যায়, তাতেও সমস্যা নেই।
কারণ শেষ পর্যন্ত পাঠক সবচেয়ে বেশি আগ্রহী নয় এই প্রশ্নে যে “এটা উপন্যাস না প্রবন্ধ?” পাঠক খোঁজে সত্যিকারের অভিজ্ঞতা, ভাষার শক্তি এবং জীবনের গভীরতা।
আমি কথাসাহিত্যকে খুব ভালোবাসি। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলো আমি সেখান থেকেই পেয়েছি। কিন্তু আমি এটাও মেনে নিয়েছি—আমরা কথাসাহিত্যকে বেছে নিই না; কথাসাহিত্যই আমাদের বেছে নেয়।
আর যদি কোনোদিন কেউ কথাসাহিত্য লিখতে না-ও পারে, তবু হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ সেরা নন-ফিকশন লেখার মধ্যেও কল্পনার শক্তি থাকে। সেখানে শব্দের সুর, উপমা, বিরতি, ভাষার ছন্দ—এসব মিলিয়ে এমন শিল্প তৈরি হতে পারে, যা সাম্প্রতিক বহু উপন্যাসের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে।
W. B. Yeats খুব সুন্দর করে বলেছিলেন : “গুরুত্বপূর্ণ হলো গায়ক, গান নয়।”
তাই বিদায়, প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা। অনেক পড়ো। পাঠককে মুগ্ধ করে রাখো। আর তোমার লেখা কোন ‘ক্যাটাগরি’-তে পড়বে, তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা কোরো না। পৃথিবী খুব দ্রুতই তোমাকে কোনো না কোনো খোপে ভরে ফেলবে। তুমি যদি সেই খোপ থেকে বের হতে চাও, তখন মানুষ অভিযোগ করবে।
কিন্তু এখনো তোমরা মুক্ত। ভাষার বিশাল মাঠে দৌড়াতে, খেলতে, আনন্দ করতে তোমাদের কেউ আটকায়নি। আমরা তোমাদের হিংসা করি। ·
0 মন্তব্যসমূহ