‘অন্য কারো খোঁয়ারি’ নিয়ে সুহান রিজওয়ান


বাংলাদেশে এই সময়ে যারা কথাসাহিত্যে নিবেদিত রয়েছেন এবং কথাসাহিত্যে দৃষ্টিগ্রাহ্য মাত্রা সংযোজন করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন সুহান রিজওয়ান। তার জন্ম ৯ এপ্রিল, ১৯৮৮, চট্টগ্রামে। বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা নটরডেম কলেজে, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্রপ্রকৌশলে স্নাতক। 

প্রতিশ্রুতিশীল এই কথাসাহিত্যিক কিছুদিন বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগে কাজ করেছেন। এখন আর চাকরি করছেন না, পুরোটা সময় লেখালেখিতেই মনোনিবেশ করেছেন। তার উপন্যাস সমূহের মধ্যে রয়েছে : সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ, গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে, পদতলে চমকায় মাটি, মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত। এবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস ‘অন্য কারও খোঁয়ারি।’ উপন্যাসটি নিয়ে গল্পপাঠ টিমের পক্ষ থেকে তাকে কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়। তিনি উত্তরগুলো লিখে পাঠিয়েছেন।

গল্পপাঠ
আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘অন্য কারো খোঁয়ারি’ নিয়ে আপনার সঙ্গে আলাপের জন্য যখন প্রশ্নগুলো প্রস্তুত করছি, তখন প্রকাশিত হতে যাচ্ছে বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ। প্রকাশের মাত্র এক মাসের মাথায় দ্বিতীয় মুদ্রণ—এটা নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া একটা ঘটনা। আপনার অনুভূতি জানতে আগ্রহী।

সুহান রিজওয়ান
 অনুভূতি তো অবশ্যই ভালো। বই পাঠকের কাছে যাচ্ছে, যে কোনো লেখকের জন্য এটা আনন্দের সংবাদ। আর প্রকাশকের জন্যেও স্বস্তির।

গল্পপাঠ
বলা হচ্ছে ‘অন্য কারো খোঁয়ারি’ উপন্যাসটি কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জীবন কেন্দ্রিক। ইতোপূর্বে আপনি তাজউদ্দীন আহমেদের জীবন কেন্দ্রিক উপন্যাস লিখেছেন ‘সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ।’ জীবন ভিত্তিক উপন্যাস লেখার প্রবণতা আপনার মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই প্রবণতা কেন এবং কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

সুহান রিজওয়ান
প্রথমেই পরিষ্কার করি যে ‘অন্য কারও খোঁয়ারি’ আখতারুজ্জমান ইলিয়াসের জীবনী-কেন্দ্রিক উপন্যাস নয়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের একজন ইলিয়াস, এছাড়া তার লেখাপত্রের বিভিন্ন ব্যাপারেও উপন্যাসটায় নৈবেদ্য আছে—কিন্তু এটা কোনোভাবেই জীবনী-ভিত্তিক কোনো সাহিত্যকর্ম নয়।

হ্যাঁ, বিভিন্ন জায়গায় এরকম একটা তকমা যে দেয়া হচ্ছে বইটাকে—সেটা আমিও লক্ষ করেছি। কিছু ক্ষেত্রে সেটা হয়তো বিজ্ঞাপণী কারণে। তবে, যতগুলো প্রতিক্রিয়া পেয়েছি পাঠকদের কাছ থেকে, তাতে করে মনে হয়েছে যে তারাও উপলদ্ধি করেছেন যে ইলিয়াসের জীবন ধরতে চাওয়ার কোনো প্রচেষ্টা আমি করিনি।

অন্যদিকে ‘সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ’ নিখাদ জীবনী-ভিত্তিক উপন্যাস। সেটায় আমি খুব সচেতনে তাজউদ্দীন আহমদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বছরকে অনুসরণ করতে চেয়েছি।

… এখনও পর্যন্ত আমার প্রকাশিত উপন্যাস পাঁচটি। তার মাঝে জীবনী-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার প্রবণতা নির্দিষ্ট করা যায় কি না, সেটা হয়তো পাঠক বলতে পারবে। তবে আমি মনে করি, আমার লেখালেখির একটা বড় প্রণোদনা হলো ইতিহাসের সাথে বোঝাপড়া। সে কারণেই ইতিহাসের অংশ ছিলেন—এমন চরিত্রদের নিয়ে কাজ করতে আমি ভালোবাসি। আমার ‘পদতলে চমকায় মাটি’ উপন্যাসেও যেমন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বা নূর হোসেন উপস্থিত ছিলেন, আবার ‘মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত’ উপন্যাসে ছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, এডগার অ্যালান পো-র মতো রহস্য লেখকেরা।

গল্পপাঠ
‘অন্য কারো খোঁয়ারি’ উপন্যাসটির পরিকল্পনা কীভাবে মাথায় এসেছিল? লেখার প্রস্তুতি কেমন ছিল? কত দিন লেগেছিল উপন্যাসটি লিখতে?

সুহান রিজওয়ান
উপন্যাসের ভূমিকায় এ নিয়ে বিস্তারিত আছে। এখানে তাই ছোট করেই বলছি। ‘অন্য কারও খোঁয়ারি’ আসলে শুরুতে প্রস্তুত করা হয়েছে চিত্রনাট্য হিসেবে। আমি এবং নির্মাতা সালেহ সোবহান অনীম—দুজনে মিলে ২০২২ সাল থেকে কাহিনিটা নিয়ে কাজ করছিলাম, এবং সেটা চূড়ান্ত করে ফেলে রেখেছিলাম। টুকটাক প্রস্তুতি বলেন, বা গবেষণার কাজ—সব মোটামুটি ওভাবেই করা। অর্থাৎ গল্পটা আমাদের মাথায় অনেকদিন ধরেই আছে।

কাহিনিটা উপন্যাস হিসেবে লেখার কোনো পূর্ব-পরিকল্পনা আমার ছিলো না, তবু ২০২৪ এর শেষ নাগাদ সেই কাজটা শুরু করি। গল্পটা তৈরি থাকায় উপন্যাস হিসেবে লিখতে সময় লেগেছে ১১ মাসের মতো। আর চিত্রনাট্য অনুসরণ করে লেখা শুরু করলেও, উপন্যাস লিখতে বসে স্বাভাবিকভাবেই অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে, বদলে গেছে।

গল্পপাঠ
উপন্যাসটি লিখতে আপনি কি কোনো নোট নিয়েছিলেন? বা মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে গিয়েছিলেন? যেমন ইলিয়াসের জন্মভূমি, বগুড়া, কাৎলাহার বিল...এসব জায়গায় গিয়েছিলেন? এবং উপন্যাসটি লিখতে কোন কোন বইয়ের সাহায্য নিয়েছিলেন?

সুহান রিজওয়ান
যেমনটা বললাম, উপন্যাসের কাহিনির মূল কাঠামোটা একটা চিত্রনাট্য হিসেবে তৈরি করা হয়েছে কয়েক বছর ধরে। সেই সময় টুকটাক কিছু যাত্রা তো হয়েছেই। তবে ঐতিহাসিক চরিত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াস উপন্যাসে যে-টুকু উপস্থিত (পাঠকের জানবেন, উপন্যাসের তিনটা সময়রেখার কেবল একটাই ইলিয়াসকে নিয়ে) সেই বাস্তবতা নির্মাণে আমি মোটাদাগে মূল সাহায্যটা নিয়েছি অগ্রজ লেখকদের কাছ থেকে। যারা ইলিয়াসকে নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লিখেছেন, ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এছাড়া ইলিয়াসের ভিডিও-সাক্ষাৎকার, এবং তার চিঠিপত্রও কাজে দিয়েছে। বিষয়-সংশ্লিষ্ট বইপত্র তো অনেকগুলোই পড়া হয়েছে। তার মাঝে ইলিয়াসের ডায়েরি, দীপন পত্রিকার ইলিয়াস সংখ্যার কথা বিশেষভাবে বলবো।

গল্পপাঠ
ধরুন একজন পাঠক, যে উপন্যাসটি এখনো পড়েনি, সে যদি সংক্ষেপে জানতে চায় এই উপন্যাসটি সম্পর্কে, আপনি কী বলবেন?

সুহান রিজওয়ান
এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। আমি মনে হয় বলবো যে এই উপন্যাস কয়েকজন মানুষের স্বপ্ন তাড়া করার গল্প বলেছে।

গল্পপাঠ
আমরা খেয়াল করছি যে আপনার একটা পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে, যারা পাঠক হিসেবে একটু অগ্রবর্তী। এমন পাঠকগোষ্ঠী থাকে সাধারণত স্বস্তা জনপ্রিয় টাইপের লেখকদের, যাদের লেখা অতি সরল, যাদের লেখার বিষয়বস্তুও কমন। আপনি ব্যতিক্রম ও জটিল সব বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন, একই সঙ্গে আপনার পাঠকও বাড়ছে। এতে আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের পাঠকরা ক্রমশই অগ্রসর হচ্ছে?

সুহান রিজওয়ান
আমি বোধহয় প্রশ্নটা ঠিকঠাক বুঝতে পারিনি! জনপ্রিয় লেখার পাঠকদের নিয়ে আমার কোনো বিরাগ নাই। এবং জনপ্রিয় লেখা মানেই গড়পড়তা লেখা, সেই লেখার পাঠক পিছিয়ে থাকা পাঠক―এটাও আমার মনে হয় না। আর মূল জিজ্ঞাসার উত্তরে বলবো, অবশ্যই বাংলাদেশের পাঠক অগ্রসর হচ্ছে। অন্ততঃ তাদের একটা অংশ তো অবশ্যই। তবে এককভাবে কোনো লেখক নয়, এই অগ্রযাত্রার মূল অনুঘটক হচ্ছে সমকাল।

ইন্টারনেটের কল্যাণে দুনিয়া এখন ঘরের মুঠোয়। সবাই না হলেও, পাঠকদের একটা অংশ এখন নিয়মিত বাইরের সাহিত্য পড়ছেন। ওলগা তোকারচুক, মার্গারেট অ্যাটউড, হারুকি মুরাকামি গতকাল যা লিখলেন—এইসব পাঠক সেটা আজই জেনে যাচ্ছেন ইন্টারনেটের কারণে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, এককালে যারা বাংলাদেশে সাহিত্য পড়তেন, তাদের প্রায় শতভাগই ছিলেন বাংলা-মাধ্যমে পড়াশোনা করা মানুষ। বর্তমানে আমাদের দেশের পাঠকদের—যাদের অধিকাংশ সব যুগে সব কালেই তরুণরা—একটা বড় অংশ ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছেন। এই ধারার পাঠকেরাও নিয়মিত বাইরের লেখকদের বই পড়ছেন।

মোট কথা, বিশ্বসাহিত্যের সাথে দেশের পাঠকদের সংযোগ এখন বেড়ে গেছে। খালি বই না, সিনেমা বা গানের ভোক্তাদের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। ফলে, সময়ের প্রয়োজনেই আমাদের স্থানীয় লেখকদের এমন সব বিষয় তুলে আনতে দেখা যাচ্ছে, যা বেশ নতুন ধরনের। বিশেষ করে জনরা বা থ্রিলার সাহিত্যে এই নতুনের স্রোত খুবই শক্তিশালী। পাঠকদের একটা অংশ অবশ্যই অগ্রসর হয়েছে বলে তাই মনে করি।

গল্পপাঠ
উপন্যাসটির নামটা অতি চমৎকার। উপন্যাসের নাম নির্বাচন খুবই জটিল কর্ম। এই নাম আপনি কীভাবে নির্বাচন করেছিলেন? খুব কি ভাবিয়েছিল? নামকরণের পেছনের গল্পটা জানতে চাই।

সুহান রিজওয়ান
ধন্যবাদ। হ্যাঁ, উপন্যাসের নামকরণ নিয়ে অন্যান্যবার খুব সমস্যায় পড়ি, জটিল লাগে। তবে এইবার অবশ্য সেই জটিলতায় পড়তে হয়নি। ইলিয়াসকে কেন্দ্রে রেখে উপন্যাসটার গড়ে ওঠা, ফলে তার গল্পের নাম ‘খোঁয়ারি’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ‘অন্য কারও খোঁয়ারি’। গল্প করার মতো ঘটনা নেই!

গল্পপাঠ
আপনি কি দৈনন্দিন কোনো রুটিন ফলো করেন? আপনি সাধারণত কোন সময়টায় পড়েন এবং লেখেন?

সুহান রিজওয়ান :
চেষ্টা করি নিয়মিত লেখা ও পড়ার রুটিন অনুসরণের। দিনে অন্ততঃ তিন-চার ঘন্টা। কিন্তু খুব একটা লাভ তাতে হয় না। শতকরা সত্তরভাগ দিন যদি রুটিনে থাকতে পারি—সেটাকেই অর্জন বলে মনে হয়! আমার লেখার সময়টা সাধারণত সকাল। মোটামুটি বলা যায় বেলা দশটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত। কাজের শেষের দিকে এসে অবশ্য এই সময়টা বেড়ে যায়—দ্রুত লিখে ফেলতে চাই তখন। এমনকি বিকেল বা সন্ধ্যাতেও লিখি। পড়ার সময় সাধারণত বিকাল, সন্ধ্যা। আর যখন লেখার কোনো প্রকল্পের মাঝে থাকি না, তখন সকালেও পড়ি।

গল্পাঠ :
লেখার জন্য পাঠ জরুরি কিনা? কোনো কোনো লেখক মনে করেন, অতি পাঠ লেখার বিঘ্ন ঘটায়। আপনার কী অভিমত?

সুহান রিজওয়ান
উমম… আমার জন্য পাঠ সবসময়ই জরুরি। তবে উপন্যাস লেখার মাঝে সাধারণত যা নিয়ে লিখছি, সেই বিষয়ের সংশ্লিষ্ট বইপত্রই পড়ি। তাতে করে নিজের চিন্তাটা গুছিয়ে আনা যায়। এছাড়া উপন্যাস লেখার সময়টা ভারি ফিকশন এড়িয়ে চলি। নতুন বই পড়তে হলে স্মৃতিকথা বা জনরা ফিকশন পড়ি শুধু।

গল্পপাঠ
উপন্যাস লিখতে লিখতে হঠাৎ আটকে গেলেন। কোনোভাবেই কাহিনি এগুচ্ছে না, চরিত্ররা ঠিকঠাক দাঁড়াচ্ছে না, সংলাপগুলো মনমতো হচ্ছে না। তখন আপনি কী করেন? লেখা থেকে দূরে সরে গিয়ে বিশ্রামে, নাকি লেগেই থাকেন?

সুহান রিজওয়ান
হ্যাঁ, এরকম হয় অনেক সময়। তখন মর্জি মত দুটো কাজই করি। কখনো হয়তো যেন-তেন ভাবে লিখে ফেলি, যেটা পরবর্তীতে এডিট করতে গিয়ে ঠিক করি। আর কখনো হয়তো লেখা ফেলে অন্য কোনো কাজ করি, বইপত্র পড়ি―কয়েকদিন বাদে আবার ফিরে আসি লেখাটায়। সচেতন চেষ্টা থাকে প্রথম কাজটা করার। কারণ অভিজ্ঞতা থেকে জানি, উপন্যাসে একবার বিরতি নিলে সেখানে ফেরা কঠিন।

গল্পপাঠ
কোনো উপন্যাস আপনি কি একবারেই লেখেন, নাকি লেখার পর বার বার এডিট করেন? আপনার লেখার প্রক্রিয়া কী? ‘অন্য কারো খোঁয়ারি’ কতবার এডিট করতে হয়েছিল?

সুহান রিজওয়ান
একবারে তো অবশ্যই উপন্যাস লিখি না। আগের প্রশ্নটায় যেমন বললাম, লেখার যাত্রায় এমন অনেক দিন আসে, যখন আপনি তেমন কিছুই দিতে পারেন না। এখন, কয়েকটা উপন্যাস লিখে ফেলার অভিজ্ঞতায়, চেষ্টা করি ওই দিনগুলোতেও কিছুমিছু লিখে ফেলতে (এবং নোট রাখি যে কোন জিনিসটা মাথায় আছে, কিন্তু লেখায় আনতে পারিনি)। প্রথম খসড়া এভাবেই শেষ করি।

প্রথম খসড়ার পর আমি মূলত তিন ধাপে লেখা পরিমার্জন করি। প্রথম ধাপের এডিট শুরু করি প্রথম খসড়া শেষ হবার সাথে সাথেই। নোটে যে-সব খামতির কথা লিখে রেখেছিলাম, সাথে আর যা যা নতুন ধারণা চিন্তায় আসে বা ভুল ধরা পড়ে, সেগুলো যোগ-বিয়োগ করি এই ধাপে। দ্বিতীয় খসড়াটা এভাবে দাঁড়িয়ে যায়।

এরপর আমি একটা বিরতি নেই। দ্বিতীয় খসড়াটা আমার কাছের কিছু মানুষকে পাঠাই, যাদের পড়ায়-বিচারে আমার আস্থা আছে। তাদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে দেড় দুই মাস সময় লাগে। সেই সময়টা আমি হয়তো পরের কাজের চিন্তা সাজাই, পড়ি, নোট নেই। বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া এলে শুরু করি দ্বিতীয় ধাপের এডিট। এবার বেশ সময় নিয়ে। তারপর লেখা প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে দেই।

শেষ ধাপের এডিট একেবারে প্রুফ দেখার সময়। এই ধাপে আসলে খুব বড় ধরনের বদল করি না। কেবল চেষ্টা করি অদরকারি শব্দ যত পারা যায় কমাতে।

গল্পপাঠ
লেখালেখি পরিশ্রমের কাজ। বিশেষ করে উপন্যাস লেখা। উপন্যাস রচনার সবচেয়ে কঠিন দিক কোনটাকে আপনি চিহ্নিত করবেন?

সুহান রিজওয়ান
উপন্যাস লেখা টেস্ট ম্যাচের মতো, টি-টোয়েন্টির মতো এটা দিনে দিনে শেষ করে ফেলা যায় না। ঔপন্যাসিকের জন্যে কঠিন দিক হলো নিয়মানুবর্তিতা। প্রতিভার চাইতে অনেক বেশি জরুরি গুণ এখানে ঘাড়ত্যাড়ামি, লেগে থাকা। কারণ দীর্ঘ এই রচনার মাঝে এমন বহু জায়গা আসে, যা লিখতে হয়তো খুব নীরস; এমন বহু দিন, বহু মুহূর্ত আসে—যেদিন লিখতে ইচ্ছে করে না। একান্ত ঘাড়ত্যাড়া না হলে এটা অতিক্রম করা খুব কঠিন।

গল্পপাঠ :
আপনি একজন ভালো পাঠকও। সাম্প্রতিক কালে পড়া একটি গল্পের বই বা উপন্যাসের কথা বলুন, যেটি আপনার মনে রেখাপাত করে গেছে।

সুহান রিজওয়ান
চট করে মনে পড়ছে ‘দ্যা বরোড’ নামের একটা বইয়ের কথা। লেখকের নাম চান-হো কেই। উপন্যাসটা মূলত হংকং-এর একজন পুলিশ ডিটেকটিভের কয়েকটা কেস ফাইল। জনরা ফিকশন হলেও এর ভাষা, বর্ণনা, আঙ্গিক—সবই খুব ভালো লেগেছে।

গল্পপাঠ
বাংলাদেশের কথাসাহিত্য সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? নতুন কোনো কাজ কি আদৌ হচ্ছে? নাকি আমরা এখনো গতশতকের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি?

সুহান রিজওয়ান
এটাও আগে মনে হয় একটু উল্লেখ করে গেছি। আরেকটু ব্যাখ্যা দিয়ে বলি। প্যারিস রিভিউর সাক্ষাৎকারে সালমান রুশদী বলেছিলেন, জেন অস্টেনের উপন্যাসের যে চরিত্ররা—তাদের পক্ষে দুনিয়াজোড়া, এমনকি লন্ডনেও কী চলছে—সেটা না জেনেই জীবন পার করে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু আধুনিক একজন ব্যক্তির পক্ষে সেটা অসম্ভব। এখন তার মনোজগতে গোটা বিশ্বই গুরুত্বপূর্ণ।

খেয়াল করে দেখুন, রুশদী কিন্তু এই সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন প্রায় ২০ বছর আগে, যখন ইন্টারনেট মানুষের হাতে তেমন করে আসেইনি! সে তুলনায় এখন তো চব্বিশ ঘন্টাই সোশাল মিডিয়া আর ব্রেকিং নিউজ-ময়। মানুষও তাই হাইপার-অ্যাকটিভ। হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ শুরু হবার কিছুক্ষণের ভেতরেই তাই ঢাকার রাস্তায় তেলের জন্য লাইন শুরু হয়ে যাচ্ছে।

সাহিত্য যেহেতু মনোজগত নিয়েই কাজ করে, কাজেই বাংলাদেশের সাহিত্যেও নানা ধরনের নতুন প্রসঙ্গ যোগ হচ্ছে নিয়ত। শুধু মৌলিক চাহিদা-পূরণ, সামাজিক ইস্যু নিয়ে অবস্থান আর স্থানিক সমস্যার বাইরেও লেখকরা আজকাল লিখছেন নতুন দিনের কিছু সমস্যা নিয়ে। অনেকের লেখাতেই দেখেছি ডিস্টোপিয়া বা যৌন-বৈচিত্র্যের মতো প্রসঙ্গ উঠে আসতে। বিশেষত জনরা সাহিত্যে যারা কাজ করছেন, তাদের কাজগুলো খুবই আকর্ষণীয় সব সমস্যার কথা বলছে।

গল্পপাঠ
এখন কী লিখছেন? ভবিষ্যতে কী লেখার ইচ্ছে?

সুহান রিজওয়ান
 আপাতত একটা গল্প সংকলনের কাজ করছি। এটা শেষ হলেই একটা থ্রিলার ঘরানার উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা আছে। ·

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ