রাশেদ রহমানের গল্প : অসাম্প্রদায়িক মাংস


আমি অকপটে বলছি—আমার মাও বেশ্যা ছিল। আমি বেশ্যার ঘরের মেয়ে বেশ্যা। মা’র একটা সুবিধা ছিল, কান্দাপাড়া বেশ্যাবাড়িতে তার ঘর ছিল। আমার, না বেশ্যাবাড়িতে, না অন্য কোথাও, কোনো ঘর নাই। আমি রাস্তার বেশ্যা। মা’র ঘর যে বলছি, প্রকৃত অর্থে ঘর মা’র না। ঘর ইন্দুমাসির। মা মাসে মাসে ভাড়া গুনতো। হোক ভাড়াঘর, তবুও ঘর তো। পাড়ায় মেলা বেশ্যা, তা ছয়-সাতশ’ তো মাগি-মাসি মিলে হবেই; ঘরও মেলা। আমি বারো-তেরো বয়স নাগাদ পাড়ায়ই ছিলাম, ওখানেই আমার জন্ম, পাড়ার মাগিদের ছিনালি করা দেখতে-দেখতে বড়ো হওয়া, বারো কি তেরো বছর বয়সেই ‘নাতাখোলা’—তবুও পাড়ায় ঠিক কতজন বেশ্যার বাস, সঠিক সংখ্যা আমার জানা নাই। ঘরই বা আছে কতগুলো তাও জানি না। শৈশবে, এটা হয়তো ছয়-সাত বছর বয়সে, আমার একটা প্রিয় খেলা ছিল—পাড়ার ঘর গোনা। কিন্তু ঘর আমি কোনোদিন গুনে শেষ করতে পারি নাই। গুনতে-গুনতে একশ’র কাছাকাছি গেলেই আমার গণনা ভুল হয়ে যেতো। আশি, পঁচাশি নাকি নব্বই—কত গুনলাম, মনে করতে পারতাম না। আবার প্রথম ঘর থেকে গুনতে হতো...।

কিন্তু শৈশবের সেই ঘর গোনার প্রিয় খেলা, এখনো আমি খেলি, এই বাইশ-তেইশ বছর বয়সে এসেও। যদি পঞ্চাশ-ষাট বছর বেঁচে থাকি, তখন, সেই বুড়াকালেও ঘর গোনা খেলার নেশা আমার থাকবে কিনা, কে জানে! দিনে খদ্দের জোটে কদাচিৎ। হঠাৎ কোনোদিন, কেউ হয়তো, বাড়ি খালি; বউ বাচ্চাদের নিয়ে বাবারবাড়ি গেছে, সুযোগ বুঝে আমাকে ঘরে নিয়ে যায়। কেউ দেখে ফেলার ভয় থাকে তো। বউ বাড়িতে নাই, রাস্তার মেয়ে ঘরে তুলেছেÑ এটা জানাজানি হলে কামসারা! মানসম্মান, সাইকেলের চাকার যে রকম পাংচার হয়, সেরকম পাংচার হয়ে যাবে। আমরা রাস্তার মেয়েমানুষ, বেশ্যা, পতিতা, কিন্তু পুরুষ-মানুষের পতিত হওয়া সাজে না। তাই তারা খুব সাবধান। দেখেশুনে কাজ করে। আমি দিনের বেলা অনেকের বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে থাকি, চোখে সুরমা, ঠোঁটে জবাফুলের মতো লাল লিপস্টিক—সেজেগুজেই দাঁড়াই, কিন্তু মানসম্মান পাংচার হওয়ার ভয়ে কেউ আমাকে ঘরে তোলে না। সুতরাং শহরে সন্ধ্যা নামার আগে, দিনের বেলা আমার তেমন কোনো কাজ নাই। স্টেডিয়ামের গ্যালারির নিচে পড়ে-পড়ে ঘুম, না-হয় ঘর গোনা। শহরের আকুরটাকুর, কলেজপাড়া, প্যারাডাইসপাড়া, থানাপাড়া, আদালতপাড়া, বিশ্বাসবেতকা, সাবালিয়া, কোদালিয়া, দেওলা, হাজরাঘাট—একেকদিন একেকপাড়ার ঘর গুনি। জানি, আমার এই ঘর গোনা, কোনোদিনই শেষ হবে না, শেষ হওয়ার নয়ও, তবুও গণনা করে যাই...।

দশ-এগারো বছর যাবত শহরের ছুটা বেশ্যা আমি, আমার মতো আরও অনেকেই আছে এই লাইনে, কাউকে-কাউকে—যেমন, বকুল, বেলি, জুঁই; ফুলের নামে সবার নাম, নামগুলো ছদ্মনামও হতে পারে; ওদের চিনি। কিন্তু দিনের বেলা ওরা কোথায় থাকে, কী করে; আমার মতো শহরের পাড়ায়-পাড়ায় ঘর গোনে নাকি রাস্তার অটোরিকশা গোনো, কীভাবে সময় কাটায়, তা আমি ঠিক জানি না। এই লাইনের কোনো মেয়ের সাথে আমার তেমন একটা বন্ধুত্বও নাই। লাইনের মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করতে আমার ভালোও লাগে না। উৎসাহ পাই না। আমি যেন পুরুষ-পোলারচে’ লাইনের মেয়েদের সামনেই লজ্জা পাই বেশি। নতুন কোনো মেয়ের সাথে পরিচয় হলেই মনে হয়—আরও একটি নতুন মেয়ে জেনে গেলো—সুবর্ণা রাস্তার মেয়ে, সন্ধ্যা নামলেই খদ্দেরের খোঁজে রাস্তায় নামে। তাই, আমি আমার মতো থাকি। লাইনের মেয়েদের এড়িয়ে চলি। একান্তই কাউকে এড়াতে না-পারলে—‘কেমন আছিস ভাই, দিনকাল যাচ্ছে কেমন’—বলে দ্রুত কেটে পড়ি, যেন আমার জন্য কত খদ্দের অপেক্ষা করছে...!

আমার বন্ধুবান্ধব নাই, আত্মীয়স্বজন নাই, আমি মধ্যরাতের শহরের রাস্তার মতো নিঃসঙ্গ; তবে শহরের সব পাড়ায়ই রাস্তার ধারে কিছু বকুলবৃক্ষ আছে, প্রাচীন বৃক্ষ, এসব বৃক্ষের বয়স কত, কে লাগিয়েছিল এসব বৃক্ষের চারা; কে জানে; এই বৃক্ষগুলো আমার বন্ধুর মতো, আত্মীয়ের মতো। একসময় নাকি এই শহরের সব রাস্তার দু’ধারে প্রচুর বকুলবৃক্ষ ছিল; ফুল ধরার মৌসুমে, রাতের বেলা শহরবাসী বকুলফুলের সুগন্ধে মাতাল হয়ে যেতো। একবার বকুলবৃক্ষে মড়ক লাগে, কেন মড়ক লাগলো কেউ জানে না; বৃক্ষের ডাক্তার-বদ্যিরা কোনো কূলকিনারা করতে পারলো না। দু’চারটে বাদে রাস্তার দু’ধারের সব বকুলবৃক্ষ মরে গেল। রাস্তার পাশে আর স্নিগ্ধ-শীতল ছায়া নাই, রাতে মনপ্রাণ বিমোহিত করা সুঘ্রাণ নাই। বকুল-শহরটা যেন বেইমান কোনো জাদুকরের কুৎসিত জাদুবলে হঠাৎ প্রেতপুরী বনে গেলো। বকুলবৃক্ষের শোকে শহরবাসী কত যে কান্নাকাটি করেছে, তার কোনো লেখাজোখা নাই। যা-হোক দুর্বিনীত সেই মড়ক থেকে কিছু বৃক্ষ কাকতালীয়ভাবে বেঁচে গেছিল। বৃক্ষগুলো বৃদ্ধ। রোগে-শোকে জরাজীর্ণ। তবুও বেঁচে যে আছে, এটাই তো সুখের। এই বৃক্ষেরাই এখন আমার পরম সুহৃদ। ওরা যেন আমার মা। আমার বাবা কে, জানি না। মা নিজেও বলতে পারে নাই। বাবার খোঁজ জানা থাকলে বলতে পারতাম, এই বকুলবৃক্ষগুলো কোনোটা আমার মা, কোনোটা আমার বাবা। বাবার খোঁজ যেহেতু জানি না, সুতরাং বৃক্ষগুলো, সবাই আমার মা। যেদিন শহরের ঘর গুনতে ভালো না-লাগে, সেদিন শহরের আকুরটাকুর কি প্যাড়াডাইসপাড়া, থানাপাড়া কি সাবালিয়া, কোথাও না কোথাও, কোনো একটি বকুলবৃক্ষের নিচে, শুভ্র-শীতল ছায়ায় বসে, বৃক্ষটির সঙ্গে কথা বলে, যেন মা’র সঙ্গেই কথা বলছি, সারাদিন কাটিয়ে দিই...।

আকুরটাকুর আনসার ব্যাটালিয়ান মোড়ের বকুলতলায়ই বেশি বসি। আমার ঠিকানা স্টেডিয়ামের গ্যালারির নিচে। ছালা-চট বিছিয়ে একটু বসা কি ঘুমানোর মতো জায়গা করে নিয়েছি। খুব বেশি হলে তিনফুট বাই পাঁচফুট জায়গা এখানে। এখানেও আমার হাঁড়ি-চুলা, কাঁথা-বালিশ, মোমবাতি-চার্জার লাইটÑ মানে একটি সংসারে যা-যা লাগে, সব আছে। দিনের কিংবা রাতের যেটুকু সময় থাকে রাস্তায় ঘোরাঘুরির পর, গ্যালারির নিচের এই খুপড়িতেই আমি থাকি। কখনো-সখনো এসে বসি বকুলতলায়। বকুলতলার পশ্চিমপাশে, অনতিদূরেই স্টেডিয়াম, গ্যালারি, আমার ঘুপরিঘর। স্টেডিয়াম আর বকুলতলার মাঝামাঝি ক্রীড়া সংস্থার পুকুর। পুকুরটি দীঘির মতো বিশাল। চার-পাঁচটি শান-বাঁধানো ঘাট আছে পুকুরে। আমি যতো রাতেই ঘুমাইনা কেন, ভোরবেলা উঠে, সবার আগে, এই পুকুরে গোসল করি। বেলা হয়ে গেলে অনেক লোকজন আসে এই পুকুরে গোসল করতে, বেশিরভাগই ভবঘুরে, ভিক্ষুক, বেশ্যা, ট্রাকশ্রমিক, পার্কের বাজারের দোকান-শ্রমিক, হোটেল-শ্রমিক, মুচি-চণ্ডাল-মেথর। ঘাটে লোকজনের ভিড় লেগে গেলে আমি গোসল করে শান্তি পাই না। কোথাও বেশি লোকজন দেখলেই, কে জানে, কেনÑ সুবর্ণার গা ঘিনঘিন করে...।

স্টেডিয়ামের পেছনেই লৌহজং নদী। যুগনির উজানে, ধলেশ্বরী নদী থেকে বেরিয়ে এসেছে এই নদী। যুগনি, ধুলেরচর, কাগমারা, হাজরাঘাট, বেড়াডোমা, দিঘুলিয়া হয়ে দক্ষিণ বরাবর দাঁড়াশ সাপের মতো ফণা তুলে চলে গেছে লৌহজং। মির্জাপুরের কাছাকাছি গিয়ে বংশাই নদে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে আত্মসুখ লাভ করেছে। এই যে লৌহজংয়ের উৎপত্তি, দাঁড়াশ সাপের মতো গতি, গন্তব্য; এসবই তেরোবছর আগের, আমার কিশোরীকালের। আমি যখন স্টেডিয়ামের গ্যালারির নিচে নিজের ডেরা বাঁধি, তখন লৌহজং সদ্য-যৌবনপ্রাপ্ত মেয়ের মতোই তেজস্বিনী, স্রোতস্বিনী ছিল; কিন্তু এই বারো-তেরো বছরে, বন্যার কবল থেকে শহর রক্ষার নামে যুগনিতে, নদীর উৎসমুখে ইনলেট স্থাপনের পর থেকেই লৌহজং মরতে শুরু করে। এখন নদীটি ধর্ষিতা নারীর মতো বিধ্বস্ত, বিস্রাস্ত। এটিকে এখন আর নদী বলা চলে না। মৃত খাল বলাই ভালো। নদীতে পানি নাই, স্রোত নাই; নদীর কাছাড়ভরা বিষকাটালির ঝোপ। এই বিষকাটালির ঝোপ অবশ্য আমার জন্য সুবিধা বয়ে এনেছে। ঝোপের ভেতর কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে আমি চটছালা বিছিয়ে বিছানা পেতে রেখেছি। খদ্দের পেলে তাকে নিয়ে বিষকাটালির ঝোপের ভেতর ঢুকে পড়ি। বৃষ্টি যদি বাদ না-সাধে, আর কোনো সমস্যা নাই। বৃষ্টি নামলে খদ্দের মেলে না। যদি বা কদাচিৎ মেলে, তাকে নিয়ে বাধ্য হয়ে আমার খুপড়িতেই ঢুকতে হয়...।

শহরের এই আনসার ব্যাটালিয়ান মোড়ের বকুলতলা ছাড়াও প্যাড়াডাইসপাড়া উকিলাড়ি মোড়, শহরের প্রখ্যাত আইনজীবী, প্রয়াত রমাপদ রায়ের বাড়ি এখানে, তার বড়ো ছেলে শ্যামাপদ রায়ও নামকরা আইনজীবী, বাপ-বেটার নামের কারণেই এই মোড়ের নামকরণ হয়েছে—উকিলবাড়ি মোড়; এখানে মড়কের পরও একটি বকুলবৃক্ষ জীবিত ছিল, এখনো আছে; এই বকুলতলা; থানাপাড়া-বিশ্বাসবেতকা-সাবালিয়ারও কোনো-কোনো মোড়ে বকুলবৃক্ষ আছে; এসব বকুলতলা আমি মাঝে-মধ্যে, শহরের ঘর গুনতে-গুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বসি; কিন্তু আনসার ব্যাটালিয়ান মোড়ের বকুলতলাই আমার সবচে’ প্রিয়। কারণ—এটি আমার ডেরার সবচে’ কাছাকাছি। কারণ আরও বিদ্যমান—আমার খদ্দের বেশিরভাগই আকুরটাকুর, বটতলা, সিএন্ডবি রোড, নিরালা মোড়, মেইন রোড, পার্কবাজার, কাগমারা, বেড়াডোমা এলাকার লোক। প্যাড়াডাইসপাড়া, কলেজপাড়া, আমঘাট রোড, থানাপাড়ারও দু’চারজন খদ্দের আসে কদাচিৎ। যারা আসে, তারা জানে—কখন, কোথায় গেলে সুবর্ণাকে পাওয়া যাবে...।

আনসার ব্যাটালিয়ান মোড়ের পূর্বপাশে, উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি ভাসানী সড়ক পেরুলেই শেখ ফজিলাতুন নেছা কলেজ। তারপর প্রেসক্লাব। কলেজ খোলা থাকলে আমি সাধারণত, খুব জরুরি প্রয়োজন না-হলে এই বকুলতলায় বসি না। সাবালিয়া কি কোদালিয়ার দিকে চলে যাই। কোদালিয়ার দিকে নতুন-নতুন অনেক পাঁচতলা-সাততলা-দশতলা বিল্ডিং উঠছে। সব আধুনিক ডিজাইনের। দেখতে ভারি সুন্দর। বিল্ডিংগুলোর জানালার থাইগ্লাসে চোখ আটকে পড়ে। কোদালিয়ার বিভিন্ন সড়কের ঘর গুনতে ভালো লাগে। ক্লান্তি আসে না। যা-হোক, এরচেয়েও বড় কারণ যেটা, তা হলো—কলেজের মেয়েরা আমাকে দেখে একজন আরেকজনকে বলতে পারুক—‘ওই যে দ্যাখ, সুবর্ণা বকুলতলা দাঁড়িয়ে আছে। খদ্দের খুঁজছে’—এটা শুনতে আমার খুব কষ্ট লাগে, সহ্য হয় না। ভাগ্য ভালো হলে—আমিও তো সুবর্ণা না-হয়ে, রাস্তার মেয়ে না-হয়ে এই কলেজের ছাত্রী হতে পারতাম...!

রাস্তার দু’পাশে কলেজ-বিল্ডিং। সুরম্য ভবন। রাস্তার বাঁ’দিকে, লোকমুখে শুনেছি, একদা হাসপাতাল ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, হাসপাতাল এখন যেখানে আছে, ওখানে স্থানান্তর করা হয়। এই কিছুদিন আগেও এখানে পুরানো হাসপাতাল ভবনের ভগ্নাংশ কিছুটা পড়ে ছিল। কলেজের নতুন বিল্ডিং করার সময় ওই ভগ্নস্তূপ অপসারণ করা হলো—দেখেছি। আমি এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করি। প্রেসক্লাবের সামনে লোকমান চাচার টিস্টল। পান-বিড়ি-সিগারেটও বিক্রি করে। আমি চাচার দোকানের সামনে-পাতা বেঞ্চে বসে চা-সিগারেট খাই। মেয়ে-মানুষ সিগারেট টানছে, গলগল করে ধোঁয়া ছাড়ছে— এটা দেখেই লোকজনে বুঝে ফেলে—এই মেয়ে কে? তাছাড়া প্রেসক্লাব এলাকা, শহীদ স্মৃতি পৌরউদ্যান, নিরালা মোড়, সিডিসি মার্কেটের নিচে যারা টিস্টল চালায়, পান-বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করে, তারা সবাই আমার পরিচিত। কে সুবর্ণাকে না-চেনে? নিরালা মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ—রমজান আলি আর প্রদীপ ঠাকুর তো আমার খদ্দের। লোকমান চাচার দোকানে চা-সিগারেট খাই, এই সুবাদে দু’চারজন সাংবাদিক-লেখকের সাথেও আমার সামান্য পরিচয় ঘটেছে, তাদের সাথে আমার কদাচিৎ টুকটাক কথাবার্তা হয়। এদের একজন সুমিত জহির। লোকমান চাচা বলেছে—এই লোক শুধু সাংবাদিক না, বড়ো লেখক। গল্প-কবিতা-উপন্যাস লেখে। বাজারে তার অনেক বই বিক্রি হয়। খ্যাতিমান লোক। তো, এই জহির ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বেশ চোখে পড়ার মতো। আমাকে কাছাকাছি কোথাও দেখলেই ডেকে কথা বলে। পাশে বসিয়ে চা-সিগারেট খাওয়ায়। এই জহির ভাই, যাকে বলে—নিখাঁদ ভদ্রলোক...।

আনসার ব্যাটালিয়ান মোড়ের বকুলতলা বসলেই মাকে পেয়ে যাই। বলেছি তো আগে, শহরের প্রাচীন বকুলবৃক্ষগুলো সবাই আমার মা। আমি বকুলতলা বসলেই মা তার গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। কত গল্প যে মা জানে! বাবারবাড়ির গল্প, শ্বশুরবাড়ির গল্প। তার শৈশব-কৈশোরের গল্প। আমার জন্ম বেশ্যাবাড়ি হলে হবে কী, মা’র জন্ম তো বেশ্যাবাড়িতে হয় নাই। তাদের ছিল বনেদি পরিবার। তিন ভাইয়ের পর মার জন্ম। কী যে আদর-সোহাগে বড়ো হয়েছে মা, তা ভাষায় বর্ণানাতীত! মা’র গায়ের রঙ ছিল আগুন-রঙা। দেখতে দেবী সরস্বতীর মতো অনিন্দ্যসুন্দর। আমিও তো দেখেছি মাকে। মা’র তখন বয়স হয়েছে। বেশ্যাবাড়িতে খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে-মেটাতে ক্লান্ত, বিপর্যন্ত। তবুও মাকে দেখতে যে কী সুন্দর লাগতো! মা’র মুখের দিকে তাকালে আমিই চোখ ফেরাতে পারতাম না। কিশোরী বয়সেই মা বিরাট এক দুর্ঘটনার শিকার হয়। মরতে-মরতে বেঁচে গেছিল। মা তখন অবুঝ। কেবল বুকে বুনি উঠতে শুরু করেছে। বাড়ির পাশেই নদী। যখন-তখন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মা। ওই যে বুকে বুনি উঠছে, তাতেই আষাঢ়ে নদীর মতোই জোয়ার আসছে শরীরে। একদিন নিদাঘ দুপুর। নদীর কলকল শব্দও কী কারণে যেন নেই সেদিন। মা নদীতে ঝাঁপ দেবে। পরনে হাফপ্যান্ট, বুকে কাঁচলি। বুনি যেন সেদিন হঠাৎ করেই আরও বড়ো হয়ে উঠেছে। কাঁচলির বাধা উপেক্ষা করে ফুঁড়ে বেরুতে চাইছে। মা’র ভেতরে কেমন একটা দিশেহারা দশা। হঠাৎ মা টের পেলো—কে যেন পেছন থেকে তার বুক-মুখ সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরেছে। তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে কাশবনের ভেতর...।

কিছুদিন যেতে না-যেতেই মা হেঁশেলের পোড়ামাটি খায়, বমি করে, নানির বুঝতে বাকি রইলো না—তার মেয়ের পেটে বাচ্চা ধরেছে। কোন্ হারামির পুতে করলো তার মেয়ের এমন সর্বনাশ...!

তখন তো, এখনকার মতো ক্লিনিকে-হাসপাতালে অ্যাবোর্শন করার ব্যবস্থা ছিল না। কবিরাজরা, এই কাজের জন্য তখন মেয়েমানুষ কবিরাজ ছিল, তারা আতিসংগোপনে গাছ-গাছন্ত ব্যবহার করে সন্তানের ভ্রুণ নষ্ট করতো। এটা করতে গিয়ে বিপদ হতো অনেকের। মা’র বিপদ হয়েছিল। মরতে বসেছিল মা...।

আমার কিশোরী মাকে কাশবনের ভেতর নিয়ে গেছিল মা’র চাচাতো ভাই কাদের। কিন্তু মা, কে জানে, কেন—কোনদিনই কাদেরের নাম প্রকাশ করেনি। মা ভালো হওয়ার পর নানা কতদিন মাকে বলেছে—‘মা শরিফা, একবার হারামির পুতের নামডা ক, আমি অরে কাইটা খণ্ডখণ্ড কইরা কুত্তা দিয়া খাওয়ামু...।’

মা কাঁদতে-কাঁদতে বলতো—‘চিনি নাই, বাবা...।’

আমারও কিশোরীকালেই ‘নাতাখোলা’ হয়। কিন্তু আমার পেটে বাচ্চা আসেনি। কীভাবে প্রটেকশন নিতে হয়Ñ ইন্দুমাসি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন মা’র কোনো প্রটেকশন ছিল না...।

চারবছর পর হোগলাপাড়ার খানবাড়িতে মা’র বিয়ে হয়। বলা বাহুল্য, মা যে কিশোরীকালে ভূতের শিকার হয়েছিল, ভূতের শিকার ছাড়া আর কী, মা যেহেতু লোকটিকে চিনে নাই; এই ঘটনা গোপন রাখা হয়েছিল...।

মা’র স্বামী—লোকটা ছিল পাটের কারবারি। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে-ঘুরে পাট কিনতো। তারপর সেই পাট, বড়ো নৌকা বোঝাই হলে, নৌকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ মোকামে যেতো। নারায়ণগঞ্জ গেলে আসতে-আসতে পনেরো-বিশদিন। এইসময় উৎপাত শুরু হতো মা’র ঘরে। ঘরে ঢুকতো মা’র ভাসুর...।

মা’র শরীরটা যেন বেওয়ারিশ মাংসের দলা। বেওয়ারিশ মাংস খেতে কারো সম্মতি লাগে না। কিশোরীকালে চাচাতোভাই কাদের মা’র মাংস খেয়েছিল। এখন খায় ভাসুরে। কিন্তু মা একথা তার স্বামীকে বলে না। বলা ভালো—বলার সাহস পায় না। ভাসুর তার পরহেজগার মানুষ, মসজিদের মুয়াজ্জিন; ঘরে স্ত্রী-সন্তান আছে। এরকম একটা লোক নোচ্চা হতে পারে, ছোটভায়ের বউয়ের ঘরে ঢুকতে পারেÑ তা কি বিশ্বাসযোগ্য? মা’র স্বামী কি তা বিশ্বাস করবে? যদি হিতে বিপরীত হয়? স্বামী যদি মনে করে—সে মাঝে-মধ্যেই পনেরো-বিশদিন করে বাড়িতে থাকে না, এই সুযোগে তার বউ ভাসুরকে ঘরে ডেকে আনে। তখন...?

বিয়ের পর তিনবছর কাটলো। অসহ্য ভাসুরের উৎপাত। মা একদিন করলো কী, বাড়ির পাশেই যমুনা নদী, গলায় কলসি বেঁধে একরাতে ভাসুর ঘরে আসার আগেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তারপর, মা কীভাবে বেঁচে গেলো, কীভাবে কান্দাপাড়া এলো, তা সে জানে না...।

আমি মাকে বলি—যেভাবেই হোক কান্দাপাড়া তোমার ঠাঁই হলো, আমাকে জন্ম দিলা, কিন্তু তুমি খুন হলে কেন? তুমি কি কোনদিন আঁচ করতে পারো নাই, কোনো খদ্দের কিংবা পাড়ার কেউ তোমাকে খুন করতে পারে? কোনো কারণে কেউ তোমার ওপর ভীষণ-রকম রুষ্ট ছিল...?

মা বলে—তোকে বলবো একদিন, বাছা...।

একদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। আছরের আজানের পরপরই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি বৃষ্টি নামার আগে-আগে আমার ডেরা থেকে বেরিয়ে এসেছি। সন্ধ্যা উৎরে গেছে সেই কখন। বৃষ্টি ধরে আসার কোনো নামগন্ধও নাই। আমি সিডিসি’র বারান্দায় বসে সিগারেট টানছি। বৃষ্টি না-ছাড়লে বিপদ। খদ্দের জুটবে না। ধারেকাছে লোকজনও তেমন একটা নাই। পাবলিক লাইব্রেরির বারান্দায় বিরসমুখে ক’জন লোক দাঁড়িয়ে আছে। রিকশা খুঁজছে। রিকশাও নাই কোথাও। রিকশাওয়ালারা অদিনের বৃষ্টিতে ভিজতে চাইছে না হয়তো। হঠাৎ কোত্থেকে বৃষ্টিতে ভিজতে-ভিজতে একটি মেয়ে এসে বারান্দায় উঠে আমার পাশে বসলো। ‘সুবর্ণা আপা...!’

মেয়েটিকে চিনলাম। কুসুম। অল্প বয়স। পনেরো-ষোল বছর হবে হয়তো। উকিলবাড়ির মোড়ে বকুলতলায় একদিন ওর সঙ্গে সামান্য কথা হয়েছিল। বললামÑ ‘এই বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়েছিস...?’

ডিউটি করতে হবে না...?

ডিউটি...!

আপা, বাড়িতে মা, ভাইবোন সবাই জানে আমি সিনেমা হলে নাইট ডিউটি করি...।

বৃষ্টি ছাড়ছে না। খদ্দের পাওয়ার আশা নাই। আজ শনিবার। রমজান আলি কিংবা প্রদীপ ঠাকুর কেউ আসবে না। রমজান আলি সোমবার, প্রদীপ ঠাকুর বৃহস্পতিবার রাতে আমাকে হোটেলে তোলে। কেউ ছুটিতে বাড়ি না-গেলে কখনোই এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে না। আজ রাতটা মাঠে মারা যাবে...।

কুসুম পলিথিনে মোড়ানো সিগারেটের প্যাকেট বের করলো। আমাকে দিল একটা, ও নিজে ধরালো একটা। তারপর গল্প শুরু করলো...।

... আপা, বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, পুরুষ-মানুষ কতোটা জানোয়ার হতে পারে—তা আমি হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছি। বাবা শহরে রিকশা চালাতো। একদিন দুপুরে শামসুল হক গেটের নিচে, ফুটপাত ঘেঁষে রিকশা দাঁড় করিয়ে রিকশায় বসেই ভাজি দিয়ে রুটি খাচ্ছিল বাবা। মা প্রত্যেকদিন রুটি-ভাজি টিফিন কেরিয়ারে দিয়ে দিতো। যা-হোক, বাবা রুটি খাচ্ছে, পেছন থেকে একটা ইটবোঝাই ট্রাক এসে বাবার রিকশার ওপর চেপে বসলো। বাবা আর রুটি খাওয়ার সুযোগ পেলো না। স্পটেই মারা গেলো। মা হাঁপানির রোগী। অল্পতেই কাহিল হয়ে পড়ে। আমার ছোট আরও দুটি বোন, একটি ভাই। বাবার রোজগারেই আমাদের সংসার চলতো। তার মৃত্যুতে মা যেন আমাদের নিয়ে অথৈ সাগরে পড়ে গেলো। আমার বয়েস তখন এগারো কি বারো। গাঁয়ের এক দাদি মাকে বললোÑ ‘কুসুমের মাও, কই কী, তুমি যে জলে পড়েছ, খাওন-দাওনেরই তো জো নাই, কুসুমডারে শহরের এক বাসায় কামে লাগাইয়া দিই...।’

মা যেন আসমানের চাঁদ হাতে পেলো। ‘তোমার পরিচিত কেউ আছে, চাচি...?’

আছে...।

ওই দাদি একদিন সকালবেলা আমাকে থানাপাড়ার এক বাসায় রেখে গেলো। থাকা-খাওয়া মালিকের। বেতন যা দেয়, খারাপ না। মাস গেলে টাকাটা বাড়িতে পাঠাইয়া দিই...।

দিন ভালোই চলছিল। কিন্তু কিছুদিন, হবে হয়তো মাস-তিনেক, যেতে না-যেতেই আমি বুঝতে পারলামÑ আমার সর্বনাশ হতে দেরি নাই। বাড়ির রান্নাঘরের পাশেই একটা খুপড়িঘর। রাতে ওই ঘরে আমি থাকি। একাকী। প্রথম-প্রথম আমার খুব ভয় করতো। কিন্তু ক’দিন পর আমার ভয় কেটে যায়। মনে-মনে বলিÑ ভয়ের কী আছে কুসুম? তিনবেলা খেতে পাই, মাস গেলে বেতন পাই, মা এবং ভাইবোনেরা খেতে পাচ্ছে; আমার ভয়ের কী আছে? কিন্তু একরাতে দেখলাম, রাত ১১টার দিকে আমার খুপড়িঘরে আসলো বাড়িওয়ালার বড় ছেলে; দু’দিন পর মধ্যরাতে আসলো বাড়িওয়ালা নিজে। এভাবেই চলতে থাকলো। ছেলেও আসে, ছেলের বাবাও আসে। ততদিনে এলাকা আমার চেনা হয়ে গেছে। আমার মতো আরও অনেক কাজের মেয়ে আছে বাড়িতে-বাড়িতে, তাদের সাথেও পরিচয় হয়েছে। যাদের সাথে একটু বেশি খাতির হয়ে গেছে, এলাকার পুরানো কাজের লোক; তাদের দু’চারজনের কাছে ঘটনা খুলে বললাম। ওরা আমার মুখ চেপে ধরলো। ‘খবরদার কুসুম, এসব কথা কোথাও আর কারও কাছে বলিস না। এটাই নিয়ম, এটাই নিয়তি...।’

ছ’মাসের মাথায় থানাপাড়ার ওই বাড়ির কাজ ছেড়ে দিলাম। দু’তিনদিন পরই আদালপতপাড়ার এক বাড়িতে চাকরি হয়ে গেলো। থানাপাড়ায় থাকতেই যুগিপালের ইয়ারন খালার সাথে পরিচয় হয়েছিল, আমাদের পাশের গ্রামের মানুষ; ওই খালাই আদালতপাড়ার কাজটি জুটিয়ে দিল...।

কিন্তু দ্যাখো, সুবর্ণা আপা; থানাপাড়ার ওই বাড়িতেও আমার ঘরে আসতো ছেলে এবং বাবা; আদালতপাড়ার বাড়িতেও আমার ঘরে আসা শুরু করলো ছেলে ও বাবা। ছেলে আসে রাত সাড়ে ১১টায়, বাবা আসে মধ্যরাতে। তবে, এই দুই বাড়ির ছেলে-বাবার মধ্যে দৃশ্যমান একটা পার্থক্য ছিল। থানাপাড়ার ছেলে-বাবা ছিল মুসলমান, আদালতপাড়ার ছেলে-বাবা হিন্দু। আসলে কী, জানো আপা; আমাদের শরীর তো একটা মাংসের দলা। মোল্লা-পুরুত যাই বলো, আমাদের শরীর খেতে তারা সবাই খুব পছন্দ করে...।

কুসুমের দু’চোখ থেকে অঝোরধারায়, শ্রাবণমাসের বৃষ্টির মতো জল ঝরছিল। আহা! মেয়েটির কী কঠিন জীবন? আমার জন্ম বেশ্যাবাড়ি, বেশ্যাবাড়িতে আমি বড়ো হয়েছি; আমার মা বেশ্যা ছিল, সাধারণ দুঃখকষ্ট আমার কাছে ঘেঁষতে পারে না, কিন্তু কুসুম তো বেশ্যাবাড়ি কিংবা বেশ্যার মেয়ে নয়; সাধারণ গেরস্তঘরের মেয়ে, ও এই দুঃখকষ্ট সহ্য করতে পারছিল না...।

একটু দম নিয়ে কুসুম আবার বলতে লাগলো...।

... আপা, যখন দেখলাম, সববাড়িতে ঘটনা একই, ছেলে ও বাবা—দুজনেই আমাকে খায়, এজন্যে বাড়তি কোনো টাকা-পয়সাও দেয় না; শুধুমাত্র সংসারের কাজের বেতন দিয়ে শরীরও খাবে, এটা আমি মানতে পারছিলাম না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলিÑ শরীরই যদি খেতে দিতে হয়, বিনাপয়সায় দেবো কেন? রাস্তায় নেমে এলাম...।

কিন্তু আপা, তুমি আমারচে’ সিনিয়র, সব জানো—তবুও তোমাকে বলি, রাস্তায়ও কি সুখ আছে? টাকা কি সব পাওয়া যায়? কত হারামির পোলা কাজ শেষ করে টাকা বের করে অর্ধেক। পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেÑ ‘আপা, পকেটে আর, দ্যাখো, একটা কড়িও নাই।’ কত মাগিরপুত যে কাজ শেষে ছুরি বের করে—‘শোন মাগি, আমরা কোথাও কোনো কাজ করে ট্যাকা গুনি না, এখন ফোট...।’ কেউ কেউ তো আবার রিভলবার বের করে বলে—‘কয়টাকা কামিয়েছিস, ঝটপট বের কর। নইলে এখনই গুলি করবো সাওয়ার মধ্যে...।’ ... আর পুলিশের যে কী ব্যবহার, কী বলবো, আপা! এই তো আমাদের মতো রাস্তার মেয়েদের জীবন...!

আমিও রাস্তার মেয়ে, কিন্তু পাড়ায় আমার একটা ঘর ছিল। ঘর করে দিয়েছিল ইন্দুমাসি। কিন্তু ওই ঘর এবং পাড়ায় আমি থাকি নাই। গোপনে ঘর ছেড়ে, পাড়া ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। ইন্দুমাসি আমাকে খুঁজে বের করেছিল। বেশি টাকার প্রলোভন দেখিয়েছে, গুণ্ডা ও পুলিশের ভয় দেখিয়েছে, কিন্তু আমি আর পাড়ায় ফিরে যাই নাই...

মা পাড়ার বাসিন্দা ছিল, আমার জন্ম পাড়ায়, পাড়ায়ই ‘নাতাখোলা’ হয়েছিলÑ কিন্তু আমি থাকলাম না কেন, ইন্দুমাসির চেষ্টাতদ্বির ও ভীতিপ্রদর্শন—সবকিছু উপেক্ষা করলাম, পাড়ায় ফিরে গেলাম না কেন, এই প্রশ্ন কিন্তু উঠতেই পারে...।

আমার ‘নাতাখোলা’ হওয়ার পর ইন্দুমাসি আমাকে আলাদা ঘর করে দিল, মার তখনো ঘর ছিল। আমি যুবতী হয়ে উঠছি, কিন্তু আমার চোখে মা তখনো যুবতী। আমার ঘরে মেলা খদ্দের আসে কিন্তু বয়স কম বলে ইন্দুমাসি সব খদ্দেরকে অ্যালাও করে না। মা’র ঘরেই খদ্দেরের ভিড় লেগে থাকে। কোনো-কোনো খদ্দের, মা’র ঘরে, রাত ১২টার পর থেকে সারারাতের জন্য চুক্তি করে। বড়ো ব্যবসায়ী, সরকারি ঠিকাদার, পুলিশ অফিসার, ট্রাক মালিক, দলের নেতাÑ সারারাতের খদ্দেররা এই ধরনের লোক। মার ঘরে খদ্দের থাকে, ইন্দুমাসি আমার ঘরে এসে, আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে...।

একরাতে মা খুন হয়ে গেলো। বিছানায় পড়ে আছে তার গলাকাটা লাশ। লাশের পাশে পড়ে আছে রক্তাক্ত চাপাতি, যা দিয়ে কসাইরা গরু জবাই করে। ইন্দুমাসি কোনোভাবেই মনে করতে পারলো না—ওই রাতে মার ঘরে কে ছিল? কোনো ব্যবসায়ী-ঠিকাদার নাকি কোনো পুলিশ অফিসার কি ট্রাক মালিক? নাকি টাকাওয়ালা অন্য কেউ কিংবা পাড়ার কোনো গুণ্ডা-বদমাইশ...?

ওই রাতে মা’র ঘরে নিশ্চয়ই কোনো কসাই ছিল। না-হলে গরুকাটার চাপাতি আসলো কোত্থেকে...?

আনসার ব্যাটালিয়ান মোড়ে বকুলতলায় মাকে আমি অনেকদিন জিজ্ঞেস করেছিÑ মা তুমি কেন খুন হলে? কে তোমাকে খুন করলো...?

মা বলতো—তোকে একদিন বলবো, বাছা। কিন্তু ওই বলাটুকুই সার। মা কোনোদিনই আমার প্রশ্নের উত্তর দিল না। তবে ইন্দুমাসি আমাকে একদিন কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছিল...।

মাসির ইঙ্গিত শুনেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—আমি পাড়ায় থাকবো না। কাদের মামা যদি পাড়ায় এসে মাকে খুন করতে পারে, আমাকেও খুন করতে দ্বিধা করবে না। এত অল্প বয়সে আমার মরার সাধ নাই...।

একটা খটকা লাগতো আমার মনে, কাদের মামা মাকে অল্পবয়সে রেপ করেছিল। কিন্তু মা তো তার নাম প্রকাশ করে নাই। তাহলে, এই, এতদিন পরে কাদের মামা মাকে খুন করতে যাবে কেন...?

ইন্দুমাসিকে একদিন প্রশ্নটা করলাম। মাসি বললো—‘তোর মা পাড়ায় আসার পর কাদের লোকটাকে মাঝে-মধ্যে এখানে আসতে দেখেছি। কিন্তু শরিফা লোকটাকে ঘরে ঢুকতে দিত না...।’

এই আক্রোশে...?
হতে পারে। এটা আমার অনুমান...।
কসাইদের গরুকাটার চাপাতি...?
হয়তো কিনে এনেছিল। দুনিয়ার মানুষ যে কত বিচিত্র-রকমের হয়, তার ঠিকঠিকানা নাইরে সুবর্ণা...।
কাদের মামা লোকটা সত্যি-সত্যিই কসাই। চাপাতি হাতে আমার ঘরেও ঢুকতে চাইতে পারে। সুতরাং পাড়া ছেড়ে পালানোই মঙ্গল...।

পাড়া থেকে সেই যে পালিয়ে এসে রাস্তায় নেমেছি, রাস্তায়ই আছি। ইন্দুমাসির শত প্রলোভন, ভয়ভীতি প্রদর্শন—সজ্ঞানে উপেক্ষা করেছি। কোনদিন খদ্দের জোটে, কোনোদিন জোটে না। পুলিশের দাবড়ানিও আছে। তারপরও খুব খারাপ আছি, তা বলবো না। ক’দিনেরই বা জীবন! দম ফুরালেই ফুস। জীবন কেটে যাচ্ছে। কেটে যাবে। কুসুম যেমন সেদিন বললো—কোনো-কোনো খদ্দের প্রতারণা করে, ছিনতাইকারীর শিকার হতে হয়; আমিও কখনো-সখনো এ-ধরনের উৎকট সমস্যার মুখোমুখি হই। কিন্তু পাত্তা দিই না। মনে রাখি না। মনে করি—রাস্তার মেয়েদের অত সুখ-সুবিধার প্রয়োজনটাই বা কী? তবে সত্যি বলতে কি, আমরাও তো মানুষ। মাঝে-সাঝে কারও সঙ্গে দুটো ভালোমন্দ, সুখ-দুখের কথা বলতে ইচ্ছা করে। খদ্দের তো খদ্দেরই। কাজ শেষে রুমাল কি গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে কেটে পড়ে। বকুল, বেলি, জুঁই কি কুসুমের কথা জানি না, তবে আমার ভাগ্য কিছুটা প্রসন্ন। আমি জহিরভাইকে পেয়েছি। তার সঙ্গে মাঝে-মধ্যে দু’চারটে কথা বলার সুযোগ পাই। লোকটি আমার খদ্দের না, তারপরও সময় পেলে আমার সঙ্গে বসে গল্প করে...।

শহীদ স্মৃতি পৌরউদ্যানের উত্তর-পূর্ব কোণে একটা ঝোপড়া জারুলগাছ। শহরের বিভিন্ন মোড়ে প্রাচীন কিছু বকুলবৃক্ষ থাকলেও জারুলগাছ কোথাও তেমন চোখেই পড়ে না। উদ্যানের এই গাছটি আমার খুবই প্রিয়। গাছের নিচে সিমেন্টের বেঞ্চ-পাতা। এই বেঞ্চে বসেই আমরা গল্প করি। জহিরভাই একদিন বিহারের পাটালিপুত্রের এক গণিকার গল্প শোনালো। আমাদের মতো বেশ্যাদেরই নাকি বইপুস্তকের ভাষায় ‘গণিকা’ বলা হয়। ওই গণিকার নাম—বিভাবতী। তার নাকি এক অল্প বয়েসি খদ্দের ছিল। খদ্দেরটি কবি—অরুণেশ ঘোষ। বিভাবতী তার ওই কবি-খদ্দেরকে পুত্রবৎ স্নেহ করতো। একদিন হঠাৎ বিভাবতী নিখোঁজ হয়ে গেলো। অরুণেশ পাটালিপুত্র শহর চষে বেড়ালো। নাই, কোথাও নাই। বিভাবতীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। অরুণেশ শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো। কলিকাতার সোনাগাছি, দেশের আরও কোথায়-কোথায় বেশ্যাবাড়ি আছে, সবখানে খুঁজতে-খুঁজতে শেষমেষ আমাদের কান্দাপাড়া এসে বিভাবতীকে খুঁজে পেলো। তাকে জড়িয়ে ধরে বললো—‘মা, আমি তোমার ছেলে, অরুণ; আমাকে ফেলে কেন তুমি এতদূর চলে এসেছ...?’

জহিরভাই লেখক। অতীব স্বজ্জন মানুষ। তবে তার সাহস আছে। রাস্তার মেয়ের সঙ্গে গল্প করে। আমরা পাশাপাশি বসে গল্প করি। আমার একটা আঙ্গুল পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখলো না কোনোদিন। একদিন বললো—‘সুবর্ণা, তোমাকে একটা কথা বলি...।’
বললাম, ‘বলো, কী বলবে...।’
জহিরভাই বললো—একটি শব্দ আছে—‘অসাম্প্রদায়িক’—শব্দটির অর্থ জানো...?

জীবনে এই প্রথম শব্দটি তোমার মুখে শুনলাম। আমি অশিক্ষিত, মূর্খ মানুষ। ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দের অর্থ জানবো কীভাবে? কঠিন শব্দ...।
‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দের অর্থ যার ‘জাতভেদ’ নাই...।
কিন্তু আমাকে হঠাৎ এই জ্ঞান দিচ্ছ কেন, জহিরভাই...।
হঠাৎই মনে পড়লো, তোমাকে বলি—তোমাদের শরীরটা না একশভাগ অসাম্প্রদায়িক...।
মানে...?

মানেটা খুব সহজ, সুবর্ণা। মুসলমান রমজান আলি, হিন্দু প্রদীপ ঠাকুর—দু’জনেই তোমার খদ্দের। রমজান পাঁঠার মাংস খায় না, প্রদীপ গরুর মাংস খায় না। পাঁঠার মাংসের গন্ধ নাকে গেলে রমজান বমি করে, গরুর মাংসের ঘ্রাণ পেলে প্রদীপ বমি করে। কিন্তু তোমার শরীরের মাংস দু’জনের কাছেই লোভনীয়, সুস্বাদু; অতি প্রিয়। তাহলে, তোমাদের শরীরটা কি অসাম্প্রদায়িক নয়...?

পাদটীকা :
জহিরভাইর কথা শুনে আমার চোখে জল এসে গেলো। জহিরভাই যা বললো—এই কথা জীবনে কখনোই আমার মনে পড়ে নাই। মনে পড়ার কথাও না। কারণ শব্দটাই আমার অজানা ছিল। অর্থ জানা তো দূরের কথা। পাড়ার কি রাস্তার কোনো মেয়েরও কখনোই এ-কথা মনে হবে না যে—তাদের শরীরটা অসাম্প্রদায়িক, বেশ্যার শরীরের কোনো জাতভেদ নাই। সব ধর্মের মানুষের কাছেই সমান সুস্বাদু...। ·


লেখক পরিচিতি : রাশেদ রহমানের জন্ম ৫ নভেম্বর, ১৯৬৭, টাঙ্গাইলের রসুলপুর গ্রামে। পেশায় সরকারি চাকরিজীবী। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, আগুনঘেরা নদী, সুন্দর পাপ ও বিলাসভূমি, একদিন শুকনাে নদীতে, অন্ধকারে বৃষ্টির গান, ঈশ্বরের চোখে জল, জাদুর আয়না, দেশে আর্মি নামলে যে গল্পের জন্ম হয়, তৌরাতের সাপ, শত্রু কিংবা শত্রুসম্পত্তি, গণিকাপ্রণাম, আধেক মানুষ, বিষলক্ষার ছুরি, ছিনতাইকারীর চোখ প্রভৃতি। বসবাস করেন টাঙ্গাইলে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ