আমি দারোয়ানকে বললাম, এই বিল্ডিং এ কি শহীদুল জহির থাকেন?
বয়স্ক দারোয়ান সেই রাত দশটায়, আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, কোন শহীদুল জহির?

এর ঘণ্টাখানেক আগে, বেইলি রোডেই, আরেক আমলা ও নাট্যকার আমাদের প্রিয় শফিক ভাইয়ের বাসায় ব্যাপক খাওয়া-দাওয়া করি আমি ও আমার ছোটবেলার বন্ধু হুমায়ুন। হুমায়ুন ততদিনে ইউনিভার্সিটি পার করে পুলিশে জয়েন করেছে, পুলিশ হয়ে গেছে। তো সেই রাত ছিল কোনো ঈদের রাত। শফিক ভাইকেই তখন জিজ্ঞাসা করি, এখানে শহীদুল জহির থাকেন কোন বিল্ডিং এ?

তো দারোয়ানের প্রশ্নে আমি বলি, ওই যে, যুগ্ম সচিব বা ওই টাইপের কিছু একটা!লেখালেখি করেন।
দারোয়ান হাসতে হাসতে বলেন, ওহ, অকৃতদার শহীদুল জহির?
বললাম, জি।

ছয়তলার দরজায় কড়া নাড়ি, দরজা খোলেন যিনি, তার নাম আব্দুল করিম। তিনি ভূতের গলির বাসিন্দা। ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই তাকে প্রশ্ন করি, আপনাদের দারোয়ান বললেন— অকৃতদার শহীদুল জহির...

আমাদের দুজনকে জনাব জহির চা করে খাওয়ালেন, কফিও বানালেন একবার। প্রায় তিন ঘণ্টা তার বাসায়। কার বাসায়? আব্দুল ওয়াহিদের বাসায়। আব্দুস সাত্তারের বাসায়। আব্দুল আজিজ ব্যাপারির বাসায়। ভূতের গলির মানুষ তারা। না না, আব্দুল ওয়াহিদ বা আবুবকর তো সুহাসিনী গ্রামের লোক। আব্দুল করিমই কি শহীদুল জহির? নাকি শহীদুল জহির আব্দুস সাত্তার? নাকি তিনিই আব্দুল ওয়াহিদ?

অনেক কথা, জমে থাকা অনেক কথা জনাব শহীদুল জহিরের সঙ্গে চলছে আমার। চলছে সিগারেট। বললাম, আপনার গ্রাম স্মৃতি কীভাবে অর্জন, জন্ম তো নিছেন নারিন্দায়, ভূতের গলিতে!
বললেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি এইটে পড়তাম। তখন সিরাজগঞ্জে ছিলাম, ওখানে বাবা-মার আদি বাড়ি।

বললাম, আপনাকে একদিন ফোন করছিলাম মিনিস্ট্রিতে, ফোন ধরলেন যিনি, তাকে বললাম, এখানে কি শহীদুল জহিরকে পাওয়া যাবে? তিনি বললেন, না। শহীদুল জহির বলে এখানে কেউ নেই। তাই ফোনে কথা আর আগায়নি। ফোন কেটে দেওয়ার পর আমার মনে হলো, যিনি ফোন ধরছিলেন সেদিন, আপনিই সেই লোক? মানে আপনিই শহীদুল হক অথবা আপনিই শহীদুল জহির?

বেইলি রোডের বাসায়, স্বয়ং শহীদুল জহিরের সামনে বসা আমি। বললেন, আদতে তো শহীদুল হক হয়তো আমলাতন্ত্রের চাকরি করেন, শহীদুল জহির কি চাকরি করতে পারবেন? আমার দাদার নামের অংশ হচ্ছে জহির আর আমার নামের প্রথমাংশ শহীদুল তো থাকলই। এই আর কি! এভাবেই, শহীদুল জহিরকে পাওয়া গেল।

বললাম, আপনাকে প্রত্যক্ষ কেউ প্রায় দ্যাখেইনি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, টিএসসি, চারুকলা, আজিজ মার্কেট, বাংলা একাডেমি বা শিল্পকলা—প্রায় কোত্থাও না৷ আপনি একা থাকতেই পছন্দ করেন, নাকি? কোথাও আপনি যান না, কারণ কি এর? 

জনাব জহির বললেন, আমার সময় কম। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অফিস করি। মাসের পর মাস ভেবে একটি গল্পের কাঠামো দাঁড় করাই। তারপর লিখতে বসি। প্রচুর কাটাকুটি করি। তাছাড়া আমার ওই রকম আড্ডায় পোষায়ও না। তবে এরকম ঘরোয়াভাবে কথাবার্তা ভালো লাগে।

বললাম, আপনার বইয়ের ফ্ল্যাপের ছবিতে গোঁফ দেখেছি। এখন গোঁফ নেই। তিনি একটু হাসলেন।
বললাম, আপনার সব লেখাই আমার একাধিকবার পড়া। আপনার গদ্য বুনন খুব স্বতন্ত্র। এরকম আর পড়িনি বাংলা কথাসাহিত্যে।

আবার চা, আবার সিগারেট। রাত চলে যাচ্ছে রাতের গভীরে। বেইলি রোডে এক সরকারি আবাসনের ছয়তলায় আমরা তিনজন। আমি, হুমায়ুন ও শহীদুল জহির। বাইরে বা অন্যান্য ফ্ল্যাটেও ঈদের গমগমানি শব্দ। আর আমাদের কথাবার্তা চলছে ত্রিশের তিন বাড়ুজ্যকে নিয়ে। মানিক, তারাশংকর ও বিভূতি। কথা চলছিল ইলিয়াসের লেখা, শওকত আলী বা সৈয়দ শামসুল হকের লেখা নিয়ে, ওয়ালী উল্লার লেখা নিয়ে। মাহমুদুল হক বা কায়েস আহমেদের লেখা নিয়ে কথা চলছিল। কথা চলছিল ডুমুর খেকো মানুষ, আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই, আমাদের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের ইতিহাস নিয়ে, মুখের দিকে দেখি—কথা চলতে চলতে কথা যে কোথায় চলে যাচ্ছিল।

হাসান আজিজুল হকের সম্পাদনায় গদ্য কাগজ 'প্রাকৃত' তে প্রথম পড়ি ডুমুর খেকো মানুষ। কথা হয়েই ছিল, সে অনুযায়ী হাসান স্যার দশ কপি প্রাকৃত বিক্রি করতে আমার নামে ভিপিপি যোগে পাঠালেন খুলনায়, আমার তখনকার ঠিকানায়। খুলনায়, সে সময় বন্ধুদের কাছে এক এক কপি প্রাকৃত বিক্রি করলাম। বন্ধুদের যারা ৩৫ টাকা মূল্যের প্রাকৃত এক কপি করে কিনে নিল, তাদের মধ্যে মিলটন মোললা, মাসরুর আরেফিন, সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, কাওসার মাসুম, রশীদ হারুন, সাইমুম রেদোয়ান বা আর কে কে, এখন ঠিক মনে নেই। ৩৫০ টাকা ১০ প্রাকৃত বিক্রি করে রাজশাহীতে সেই টাকা হাসান আজিজুল হক স্যারকে মানি অর্ডার করে আমার পাঠানোর কথা। পাঠাতে পারিনি। চা পুরি সিগারেট খেয়েই শেষ করে ফেলেছি আড্ডার বন্ধুরা মিলে। বন্ধু বলতে তখন মিলটন, মাসরুর, লাভলু...। হাসান স্যারকে চিঠি লিখলাম, স্যারও পালটা চিঠি দিয়ে জানালেন, ঠিক আছে, টাকা পাঠানোর দরকার নেই। আমাকে স্পার্টাকাস দুই পর্বের সিনেমাটির ভিসিডি কিনে দিও। সেই সিনেমার ভিসিডি কিনে কি হাসান আজীজুল হক স্যারকে কিনে পাঠাতে পেরেছি? বহুদিন পরে, ঢাকা চলে আসা জীবনে, টিএসসি ডর্মেটরিতে অবস্থান করা হাসান স্যারকে সামনাসামনি বললাম। স্যার বললেন, বই কিনে দাও, শহীদুল জহিরের বই। আমি প্রথম শহীদুল জহিরের লেখা পড়ি প্রাকৃত প্রথম সংখ্যাতেই, প্রাকৃত পত্রিকার সম্পাদকই হচ্ছেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক।

জহিরের একেকটা বই যখন প্রকাশ হচ্ছে, তখন আমরা কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ছাত্র। মুখের দিকে দেখি, প্রথম বয়ান...আর আমাদের হাতে তখন বিনয়-উৎপল-শক্তি-সন্দীপন-কমলকুমার-অমিয়ভূষণ বা ওয়ালী উল্লাহ, হাতে তখন শহীদ কাদরী বা আল মাহমুদ, মাহমুদুল হক বা কায়েস আহমেদ বা ইলিয়াস কিম্বা চোখের সামনে, প্রদোষে প্রাকৃতজন, শওকত আলীর। আবুল হাসান, ভৈকম মুহম্মদ বশীর, হাতে অভিজিত সেন, দেবেশ রায়, হাতে সুবিমল মিশ্র বা অনূদিত মার্কেস, বোরহেস, কাফকা, আমোস টুটুওলা, অক্টাভিও পাজ বা গিরিশ কার্নাড। সে এক সময়ই বটে, একবারই আসে। কিছুদিনের মধ্যেই পড়ি সে রাতে পূর্ণিমা ছিল। কবি আবিদ আজাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শিল্পতরু থেকে প্রকাশিত। ওখান থেকে শহীদুল জহিরের প্রথম ছোট্ট উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আগেই বেরিয়েছিল। বইটা আমার কাছে ছিল না। বন্ধু রাইসু দিল একদিন বইটা, ফেরতযোগ্য শর্তে।

কী অদ্ভূত! সে রাতে পূর্ণিমাতে সুহাসিনী গ্রামের মফিজুদ্দিনের ছেলে, কী যেন নাম, সিদ্দিক মাস্টার? আর্ট কলেজে পড়া, সে যখন তার চাচাত বোন, যাকে সে ভালোবাসে, তার প্রতিকৃতি এঁকে নিজেদের কাচারি ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখে, মুক্তিযুদ্ধের সময়, পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল সুহাসিনী গ্রামে ঢুকে পড়ে এবং ওই কাচারি ঘরে অবস্থান নেয়। দেয়ালে ঝুলন্ত কিশোরীর প্রতিকৃতি দেখে সেনাদের লালসা জেগে ওঠে এবং তখন আশেপাশের ভয়ার্ত লোকেদের কাছে সেনারা জানতে চায়, এ লাড়কি ক্যায়া হ্যায়?

পাকিস্তানি সেনাদের থেকে সিদ্দিকের ভালোবাসা কিম্বা কিশোরী মেয়েটি রেহাই পায় না। তার আঁকানো স্কেচই মেয়েটির জীবন ধংস করে দেয়। কী দুর্দান্ত নির্মাণ!

বললাম, ঈদের রাত। আপনার পারিবারিক লোকজন কোথায়?
শহীদুল জহির বললেন, মা-ভাই ওরা সব মগবাজারের বাসায়। কথা হচ্ছিল, কথা শেষ হচ্ছিল না। শেষ হবে কী করে? আমি তো শুধু শহীদুল জহিরের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি না, আড্ডা দিচ্ছি তার চরিত্রদের সঙ্গে, নয়নতারার সঙ্গে, কুলসুমের সঙ্গে, সুবোধ-স্বপ্নার সঙ্গে, ফুলবানু, আকালু টেপির সঙ্গে, বান্দরের দুদ খাওয়া পোলা চান মিয়ার সঙ্গে। নূরজাহানের সঙ্গে। শহীদুল জহিরের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি মানে আদতে আড্ডা দিচ্ছি চরাচরব্যাপ্ত এক লোনলিনেসের সঙ্গে, মানুষের ভেতরে আত্মগোপনে থাকা আরো কিছু মানুষের সঙ্গে। এই আড্ডা শেষ হয় কী করে?

জহির বায়োলজিক্যালি মারা গেছেন ২০০৮ এ। কিন্তু তার সঙ্গে আড্ডা তো শেষ হয়নি এখনো। এতদিনে এটাও টের পাই, চলমান প্রচুর কবি-সাহিত্যিকের চেয়ে শহীদুল জহিরের পাঠকবর্গের সাহিত্য ও জীবনবোধ-বোঝাপড়াই অনেক বেশি প্রণিধানযোগ্য। এটা আমার পর্যবেক্ষণ। কেউ কূটতর্কে উৎসাহী হলে, আমি ভেবে দেখব, তার সঙ্গে আলাপে আমার ইচ্ছে হয় কীনা! আমার ইচ্ছাই তো আমার সর্বেশ্বর। আমার কেন, যে জন্মেছে পৃথিবীতে, তারই।

শহীদুল জহির মারা যাওয়ার পর তার সব বই একত্রে প্রকাশ হলো এবং পরে খণ্ড খণ্ড করেও, এখনো প্রকাশিত হচ্ছে পাঠক সমাবেশ থেকে। এসব গ্রন্থের সম্পাদনা, ভূমিকা লেখা ও সামগ্রিক তত্ত্বাবধান করলেন অধ্যাপক মোহান্মদ আব্দুর রশীদ, শহীদুল জহিরদেরই বন্ধু, নিজেও লেখক-অনুবাদক। মোটামুটি শহীদুল জহির রচনাসমগ্র প্রকাশের পরপরই, যিনি অধ্যাপনা করে অবসরে গেছেন চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ঢাকায় পূর্বাচলে পাওয়া প্লটে বাড়িও বানাচ্ছিলেন, একদিন, ঈদের দুইদিন আগে, যখন শহর অনেকটাই ফাঁকা হয়ে আসছে, সে সময় চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন। রশীদ ভাই চলে গেলেন। আহা, এ কেমন মৃত্যু, এ কেমন বিদায়! পাঠক সমাবেশ এর প্রকাশক জানালেন রশীদ ভাইয়ের এই মর্মান্তিক প্রস্থানের ঘটনা।

রশীদ ভাইয়ের মাধ্যমেই একদিন আমার পরিচয় হয় ভি, রামস্বামীর সঙ্গে। ভি রামস্বামী কোলকাতার মানুষ, আদিতে কেরালার। রামস্বামী বা রামা দা'র পৈর্তিক নিবাস কেরালার কিন্তু মাতৃকুল কোলকাতার। বাংলা ফিকশনকে তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করে থাকেন। শহীদুল জহিরকে ইংরেজি ভি রামস্বামী অনুবাদ করেছেন। শহীদুল জহির অনুবাদে রামস্বামীর সঙ্গে সংযুক্ত শাহরোজা নাহরীন, ঢাকার মেয়ে এবং কানাডার একটি ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করছেন এখন। কানাডাতে শাহরোজার গবেষণার বিষয় শহীদুল জহিরই। এ ছাড়াও ঢাকায় আরো দুজন মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, যারা এখানে দুইটা আলাদা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল জহির গবেষণা করে নিজেদের ক্যারিয়ার নির্মাণ করছেন। সম্প্রতি আরো একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হলো, ওর নাম ফাতেমা, শিকাগোতে একটি ইউনিভার্সিটিতে লাইফ এন্ড পলিটিক্যাল রিয়েলিটি নিয়ে কাজ করছেন।

অডিও-ভিজুয়াল ফিকশন হয়েছে জহির বেঁচে থাকতেই কয়েকটা, তার গল্প নিয়ে। টেলিভিশন পর্যায়ে চতুর্থমাত্রা, এই সময় গল্প অবলম্বনে ফুলকুমার, কোথায় পাবো তারে। সিনেমা স্ক্রিনে কাঁটা কামিং সুন পর্যায়ে এখন। আর মঞ্চে নাটক হিসেবে নেমেছে কাঠুরে ও দাঁড়কাক, সে রাতে পূর্ণিমা ছিল, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ে শহীদুল জহির পাঠ্য এখন।

সম্ভবত, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় শহীদুল জহিরের চেয়ে প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক আর কেউ নন। এটা বাংলাদেশ শুধু নয়, বাংলা ভাষাতেই। সে কারণেই, কথিত নাক উঁচু স্বভাবের ভঙ্গিতে কোলকাতার কিছু পাঠক বা লেখক, তারাও শহীদুল জহির পড়ছেন, মজা পাচ্ছেন, বড় লেখকের মান্যতা দিচ্ছেন এবং ইউটিউব ও ফেসবুকে প্রসংসা ছড়াচ্ছেন। সেই ইউটিউব ও ফেসবুকের আশীর্বাদে বাংলাদেশেও শহীদুল জহিরকে এতদিন জানতেন না যারা, তারা হয়তো চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের বয়ান শুনে শহীদুল জহির পড়তে শুরু করেছেন। কী এক দশা, নাহ? ঢাকার লেখক ঢাকার পাঠকের হাতে যাচ্ছেন, ভায়া কলকাতা হয়ে! কী কান্ড!

এদিকে, আমার দেশে, আমাদের বাংলাদেশে, নন-ক্রিয়েটিভ কিন্তু ক্রিয়েটিভদের ব্যাপারে নিদারুণ ঈর্ষাপরায়ণ কেউ কেউ, শহীদুল জহিরকে ছোট করবার প্রয়াসে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। ধুরন্ধর দু একজন, দু'একটা করে বাজে মন্তব্য সোস্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে হয়তো পান্ডিত্য দেখাতে চান। তারপর শহীদুল জহিরের পাঠকবর্গের কাছেই, সোস্যাল মিডিয়ায় রামধোলাই খান। একদম লুংগি খুলে গেল। এ কথা তো ঠিক, আজকের দিনে একটা আনতাবড়ি মন্তব্য করে কেউ পার পাবে না। গুগলে ভূগোল নিহিত আজ, এইটা তো ভুলে গেলে চলবে না মাস্টার মশাই।

অনেকানেক কবি আছেন বাংলা কবিতায়। তারপরও একজন একক কবি হিসেবে জীবননানন্দ একটা স্পেস নিয়ে আছেন বাংলা কবিতায়, এটা মানেন? ঠিক সেই স্তর থেকেই, অনেকানেক বড় কথাসাহিত্যিক আছেন বাংলা সাহিত্যে, তার মধ্যে শহীদুল জহির একটা একক স্পেস অর্জন করে ফেলেছেন। যারা পড়েছেন, তারা জানেন। যারা পড়েননি বা যারা সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশ-হুমায়ুন-মিলন পড়ে পড়ে আপ্লুত, তারা হয়তো বুঝতে সমস্যায় পড়তে পারেন কিছুটা। সমস্যা কেটে যাবে, পড়লে, শহীদুল জহিরকে পড়লে। এখন কথা হচ্ছে, শহীদুল জহিরকে পাঠ করে রস আস্বাদন করতে পাঠকের একটা প্রস্তুতি হয়তো লাগে। সেই প্রস্তুতি হচ্ছে সমকালীন অপরাপর কথাসাহিত্যিকদের লেখা আগে পড়ে আসা, তারপর শহীদুল জহিরকে ধরা।

১৯৭১ বা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া-দুই প্রকার লোকগোষ্ঠির বসবাসেই বাংলাদেশের চেহারা প্রভিতাত হয়। শহীদুল জহির পরিস্কার মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালির পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। ফলত, শহীদুল জহির যতখানিই নতুন দিগন্তের কত্থক হয়ে উঠুন না কেন, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে নিতে পারেন না যারা, রাজাকারগিরি করেছেন যারা বা রাজাকারগিরির পক্ষে ঝুঁকে থাকতে চান যারা, শহীদুল জহিরের ব্যাপারে তাদের এলার্জি ফুটে ওঠে। হয়তো সেই এলার্জি সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। এতে করে প্রয়াত শহীদুল জহিরের নতুন নতুন পাঠক বাড়তে থাকে, জীবিত এলার্জিওয়ালাদের এলার্জি বাড়তে থাকে। সময় আয়না হয়ে সব কিছু পরিস্কার করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা করতে না পেরে যাদের মন ১৯৭১ থেকেই ভীষণ বেজার, যদিও গোটা জনগোষ্ঠির বড় অংশ নয় তারা, তাদের পক্ষেই কেউ কেউ শহীদুল জহিরকে আক্রমণ করে শান্তি পায়। যদিও, জহিরের লেখার ক্ষমতার অর্ধেকও অর্জনে নেই তাদের। কৃটিসিজম করতে না পেরে আক্রমণ করতে ভালোবাসা। এও এক ভালোবাসা বটে, এতে পাঠক বেড়ে যায়। পাঠক নিজের মতো করে ধরে নিতে পারে, কে চোখের কোণে পিচুটি জমানো অধ্যাপক আর কে সৃজনশীল লেখক বা শিল্পী? তাই না? সেই জন্যেই তো 'সমারুঢ়' তে কবি বললেন, বরং নিজেই তুমি লেখো নাকো একটি কবিতা! লিখে প্রমাণ দাও, তুমি কিছু পারো। নইলে, আবারও প্রমাণ হয়, যিনি গল্প-কবিতা-উপন্যাস লিখতে পারেনই না এবং চেষ্টা করেও ভয়ানকভাবে ব্যর্থ, তিনিই বঙ্গদেশে সাহিত্য সমালোচক। যিনি ক্যানভাসে কীভাবে কোডিং করতে হয়, জানেনই না, তিনি চিত্রসমালোচক। যিনি সিনেমার সনালোচক, তিনি সিনেমা কীভাবে নির্মিত হয়, সেটাই জানেন না! গান শোনেন কীনা, কেউ জানে না, সেই লোকই হয়তো বলবেন, লালন বা রবীন্দ্রনাথের গান ততটা ভালো কিছু নয়। কেন না, একজন ব্রাম্ম আরেকজন জাতপাতহীন। আবার ব্রাম্ম যে সনাতন থেকে এগিয়ে আসা একটি ধাপ, সেইটাও অনেকের কাছেই খুব পরিস্কার নয়। হয়তো বলবে, হিন্দু।

একুশ শতকেও, এখনো হিন্দু-মুসলমান দিয়ে মানুষ মাপা হবে, এই দেশে? ধর্মগত বিশ্বাস অবিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষের সৃজনশীলতা পরিমাপ হবে? ইটস ট্র‍্যাজেডি।
এসব ট্র‍্যাজেডি থেকে কি আমরা বেরিয়ে আসতে পারব? ·