“দরজা—কী প্রয়োজন? তুমি তো ভেতরেই আছ।“
—হোরহে লুইস বোরহেস, ‘গোলকধাঁধা’
—আপনি কি তাকে হত্যা করেছেন?—জিজ্ঞেস করে কালো গাউন।
—জী। আমিই করেছি।
—কেন?
—একটা দৃষ্টান্তের প্রয়োজন ছিল।
মিকার ব্যবসাটা পাহাড়ঘেরা এক মালভূমিতে। তিনটি পাহাড় থেকে বিশাল বিশাল জলপ্রপাত নেমে আসে। সেখানে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। ওখানে যাবার জন্য কোন টিকিট কেনা যায় না। সকলে সবসময় একটা আমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকে। মোটা কাগজের একটি খাম। সাদামাটা। বন্ধ ত্রিভুজ আকৃতির মুখের ওপর কালো মোমের সিল। ছাপটি এত পুরনো যে সেটি কোন সাম্রাজ্যের তা বোঝার উপায় নেই। পোস্টমাস্টার প্রাপকের কাছে নেবার আগে তিনবার ভাবে।
কারা সেই আমন্ত্রণ পাবে, তা মিকা নিজেই ঠিক করে। কীভাবে করে কেউ জানে না। যারা তাকে সাহায্য করে, তাদের নামও কেউ জানে না। তারা কখনও মুখ দেখায় না। কখনও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে না। তবে একবার আমন্ত্রণ এলে কেউ তা প্রত্যাখ্যান করে না। আমন্ত্রণ গ্রহণ করার পরেই কেবল নির্দেশনা পাঠানো হয়। আমন্ত্রণ গ্রহণের নিয়মটাও আজব, সেটা লেখা থাকে আমন্ত্রণপত্রে; একেক জনের জন্য একেক নিয়ম। কারও নির্দিষ্ট একটা জায়গায় পাথর রেখে আসতে হয়, কারও তাল গাছের মাথায় উঠে সদ্য ঝরা রস খেয়ে হাড়ির গলায় লাল শালু বাঁধতে হয়, কারও পদ্মায় কাগজের নৌকা ভাষাতে হয় আবার কারও হোয়াইট হাউজের সামনের পাথরের স্তম্ভে একটি পুরনো মুদ্রা রাখতে হয়। গ্রহণের পর নির্দিষ্ট লোক এসে মালভূমিতে যাবার সমস্ত ব্যবস্থা করে। আমন্ত্রণ গ্রহণ না করলে কী হয় তা কারও জানা নেই, কারণ আজ পর্যন্ত কেউ সেটা করে নি।
যাত্রা শুরু হয় নক্ষত্র এবং চাঁদের নির্দিষ্ট একটা নির্দিষ্ট মহাযোগে। শেষ ছয় হাজার ফুট পথ পায়ে হেঁটে পাহাড় বেয়ে উঠতে হয়। শুধু মাত্র অল্প কয়েকজন পথপ্রদর্শক সেই পথ চেনে। তারা নিজেদের পিঠে অতিথিদের সব মালপত্র বহন করে। কোনো অতিথি আর হাঁটতে না পারলে, ওরা তাকে বহন করে নিয়ে যায়।। শক্তি আর সহনশীলতার জন্যই তাদেরকে বেছে নেওয়া হয়। আরোহণ শুরুর আগে সবাই নিজেদের রক্ত দিয়ে বাতাসে গোপনীয়তার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয় সকলকে। পথপ্রদর্শকদেরও একই কাজ করতে হয়েছে। এই পথ উঠতে তিন থেকে চার দিন লাগে। বারবার দেখার পরেও অতিথিরা বুঝে উঠতে পারে না ঠিক কোথায় আছে। কারও মনে হয় কিলিমাঞ্জেরোর দেখছে সামনে, কেউ বলে না এটা অন্য কোন অচেনা পাহাড়। প্রতিদিনই ওরা আরোহণ করে এবং অবরোহণ করে, ফলে ওঠে মাত্র পনেরশ থেকে দুহাজার ফুট। শুধুমাত্র গাইডরাই দুদিনে মালভূমিতে পোঁছতে পারে।
ব্যাক-প্যাক জিনিসপত্র নিজ নিজ বিলাসবহুল কুঁড়েতে রেখে শাওয়ার সেরে নাস্তা সেরে সকলে এসে বসেছে মালভূমি কেন্দ্রের বিশাল এক হলে। বসেছে যার যার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা আসনে। প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানই হয় দিনের আলোতে। প্রথম দিনে শো’র শুরুতে পনের মিনিট দেয়া হয় নিজেদের মধ্যে পরিচিত হবার জন্য।
—আমি আনিস, এসেছি বাংলাদেশ থেকে।
—আমি জন এফ, যুক্তরাষ্ট্র।
—আপনার না এখন ইজরাইল সফরের কথা!
—মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে।
—আমিও ক্ষেতে অর্ধেক মই বাকী রেখে চলে এসেছি।
—মানে আপনি কৃষক?
—হ্যাঁ।
—জমি কয় একর।
—একর তো বুঝি না তবে আছে বিঘা খানেক।
—মাত্র!
এক জেলে এসেছে ট্রলার থেকে মাছ ধরা শেষ না করে, শ্রমিক ভুলে গেছে মেশিন বন্ধ করতে, কিন্তু কেউ এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করবে না।
প্রথম ঢোল বাজতেই এক জুটি মঞ্চে এলো। ওরা জানুয়ারি। পুরুষটির নাম আলি। ধীরে ধীরে হেঁটে সে মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার গায়ে ছিল গোড়ালি পর্যন্ত লেগে থাকা কালো প্যান্ট। কোমরে বাঁধা ছিল চওড়া লাল কোমরবন্ধ। উন্মুক্ত বুকে দেখা যাচ্ছিল বহু বছরের অনুশীলনে গড়ে ওঠা প্রশস্ত কাঁধ আর সুঠাম দেহ। দুই বক্ষপেশির মাঝের খাদ ঘন, কালো, যত্নে ছাঁটা লোমে ঢাকা। দুই বাহুতে রুপোর বালা। কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে কালো চুল।
—ওলে!
মালভূমির চারদিক থেকে একসঙ্গে প্রতিধ্বনি ভেসে এল :
—ওলে লে লে লে…
একটি মেয়ে তার দিকে দৌড়ে এলো। তার পরনে ছিল হাতির দাঁতের রঙের রেশমি বিকিনি, তাতে সূক্ষ্ম সোনালি সুতোয় করা নকশা রোদের আলোয় ঝিলমিল করছিল। অলংকারগুলো নড়ছিল, প্রতিটি অঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। পিঠের রেখা, বুকের দৃঢ়তা আর পায়ের সৌন্দর্যকে আড়াল না করেই ওরা পেয়েছিল আপন জীবন। রুপোর একটি কাটায় বাঁধা চুল নেমে এসেছে কোমর পর্যন্ত। আলি গতি না কমিয়েই তাকে কোমর জড়িয়ে তুলে নিলো। সে আলির শরীর বেয়ে উঠে কাঁধের ওপর দাঁড়াল। আলি তিন পা এগোল। এক হাতে তাকে ধরে শূন্যে তুলে দিল। সে দুই হাত জলপ্রপাতের দিকে মেলে দিল। কিছুক্ষণ স্থির রইল। তারপর ধীরে ধীরে আলির হাতকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করল। সকলে হাততালি পর্যন্ত দিতে ভুলে গেছে। শুধু শোনা যাচ্ছে আবহ সঙ্গীত হয়ে ওঠা জলপ্রপাত। এক দমকা হাওয়ায় সুর থেমে গেলে গেলে দুজন একসঙ্গে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানিয়ে মঞ্চ ছেড়ে চলে গেল। দ্বিতীয় জুটি ইতিমধ্যেই প্রবেশ করছিল। ওদের পর এলো মার্চ, চতুর্থ, মে। প্রত্যেকটি জুটির শো আলাদা। একটি সম্পূর্ণ নাটক ধীরে ধীরে প্রতিটি মাসের সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হচ্ছে, আপন মহিমায়, এগিয়ে যাচ্ছে চরম আনন্দের দিকে। ষষ্ঠ জুটি করতালির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। দর্শকরা এতই উত্তেজিত যে আর বসে থাকতে পারছে না। কিন্তু সামান্য নড়াচড়াও করছে না। সকলকে মহড়া দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এ কদিনে।
সোফিয়া প্রবেশ করল সপ্তম মাসে। মঞ্চে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে পাশের দরজায় একটু থেমে নিচের ঠোঁটের ডান কোণা কামড়ে ধরল। তার পরনে লাপিস লাসুলি রঙের বিকিনি। রেশম পাহাড়ের গভীর নীল রং শুষে নিয়ে জুলাইয়ের রোদের নিচে শীতল দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসে তখনও আন্দিজের শীতের হিম ।
সে মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। সাড়া হল নিস্তব্ধ। দুই পাহাড়ের মাঝখানে একটি সরু ফাঁক রয়েছে। ও ঢোকার নির্দিষ্ট সময়ের পর এক বিশেষ মুহূর্তে সূর্যের একটি রশ্মি সেই ফাঁক ভেদ করে সোফিয়ার ধনুকের মত বেঁকে যাওয়া দেহের ওপর স্থির দাঁড়িয়ে থাকা অন্য পাহাড় দুটোর মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে ট্রাইপডের ওপর বসানো একটি আতশ কাঁচ ভেদ করে মঞ্চের অন্য প্রান্তে তৈরি করেছে বিশাল এক অগ্নিবলয়। বলয়ের কেন্দ্রে একটি লাল হৃদয়। কয়েক মুহূর্ত পাড় হবার পর সেই ছোট্ট লাল হৃদয় ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হচ্ছে এক স্বল্প বসন পরিণত সুপুরুষে। প্রতিটা দর্শক পাগল হয়ে গেছে। তবে জানে এভাবেই বসে সহ্য করতে হবে বারোমাস।
সোফিয়া ধনুক ভেঙে সামান্য মাথা নত করে। ঠিক তখনই তার সঙ্গী বাৎস্যায়নের নাচের ভঙ্গীতে পাশে এসে দাঁড়ায়। মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একটি দড়ি টানানো। সোফিয়া তরতরিয়ে আর একটি দড়ি বেয়ে ছেলেটার আগেই ওপরে উঠে যায়। খালি পায়ে হেঁটে দড়ির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। এরপর উঠে আসে যিশু। এক হাতেই সে সোফিয়াকে দড়ির ওপর থেকে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। ওখানে শুরু হয় নতুন এক খেলা, দুটি শঙ্খচূড় একে অপরকে আলিঙ্গন করে এক হয়ে দড়ির মত পাক খাচ্ছে, সে পাক নিচের দিকে শুরু হয়ে ওপরের দিকে খুলছে আবার ওপরের দিকে শুরু হয়ে খুলছে পায়ের দিকে। ওদের পায়ের নিচের দড়ি শিউরে উঠছে তিরতির করে, প্রতিক্ষণে। পাথর কাঁটা বাতাস পাহাড় থেকে নেমে এসেছে সাইবেরিয়ার হিংস্রতা নিয়ে। হটাত করেই পাক খুলে যিশু তাকে ওপরের দিকে ছুড়ে দিল। সোফিয়া আকাশে একবার ঘুরল। নিচে নামার সময় তার ডান পা পিছলে গেল। শরীর শূন্যের দিকে কাত হয়ে পড়ল। যিশু দ্রুত বিকিনির ওপরের প্রান্ত ধরে ওর পতন সামলালো। টানটা এত প্রবল ছিল যে বিকিনি ছিঁড়ে যাবার অবস্থা। মালভূমি জুড়ে এক চাপা গুঞ্জন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় সারির চাষা প্রথম সারি এক লাফে পাড় হয়ে রেলিং টপকে মঞ্চে উঠে দু হাত বাড়িয়ে দিল লুফে নেবার জন্য। ততক্ষণে ওপরের ওরা খেলায় ফিরে গিয়ে ঝুলন্ত মইয়ে দোল খেয়ে নিচে নেমে আসছে। যিশু নেমেছে একেবারে আনিসের সামনে। দুজন পুরুষ এখন মুখোমুখি। তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে। হটাত করেই যিশু হেসে উঠে।
—ধন্যবাদ। দরকার ছিল না। তবু ধন্যবাদ।
আনিস গভীর শ্বাস নিলো, সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে আবার নিজের আসনে ফিরে গেল। ঘুরে দাঁড়ানোর আগে সে একবার তাকাল। সোফিয়া তখনও তার দিকে চেয়ে ছিল। ওর নিচের ঠোঁটের ডান কোণা কামড়ে ধরা। সূর্যের শেষ রশ্মিটাও পাহাড়ের আড়ালে মিলিয়ে গেল। চেয়ারগুলো খালি হয়ে গেল। আগামীকাল মঞ্চস্থ হবে বছরের বাকী মাসগুলো।
মঞ্চ থেকে খালি চেয়ারগুলো দেখলে মনে হবে ওগুলোর সংখ্যা অসীম। সারি সারি চেয়ার ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। প্রতিটি সারি আগের সারির হুবহু পুনরাবৃত্তি। যেখান থেকেই তাকানো যাক, শত শত। হয়তো হাজার হাজার। কেউ কোনোদিন গুনে শেষ করতে পারেনি। খালি আসনগুলোর ভেতর দিয়ে বাতাস বইতে শুরু করল। সকলে ডিনারে যাবে। আগে থেকেই ঠিক করা আছে কে কোন টেবিলে বসবে, কোন মেয়ে কোন পুরুষের আতেথিয়তা করবে। সব ঘটছে এক নিখুঁত আচারের মধ্য দিয়ে। শুধুই সামান্য একটু ব্যতিক্রম, সোফিয়া খুঁজতে বেড়িয়েছে আনিসকে, আজ রাতে ওর আর কোন কাজ নেই। আর আনিস মালভূমির কিনারে ঝোপের মাঝ থেকে জোনাকি হাতে নিয়ে একমনে দেখছে। ওপারে জল পড়ার নিরবচ্ছিন্ন ধ্বনি। আলো আধারিতে পেছন থেকে দেখেও ওকে চিনতে পারে সে। আলতো করে চোখ চেপে ধরে ওর। আনিস খুব ধীরে ধীরে চোখের ওপর থেকে ওর হাত সরিয়ে উঠে দাঁড়ায় যেন জানত ও আসবে। যেন ওরই জন্য অপেক্ষা করছিল। হাতের জোনাকিটা ওর চুলের ওপর ছেড়ে দেয়। ঝোপের ভেতর থেকে আরও হাজারো লাখো জোনাকি এসে যোগ দেয় ওটার সঙ্গে। প্রথমে এসে বসতে শুরু করে সোফিয়ার মাথায়, ধীরে ধীরে ঘিরে ধরে ওর সমস্ত দেহ। ছোট্ট প্যান্টি বিকিনি আর দেখা যাচ্ছিল না। এর পর ওগুলো বসতে শুরু করে আনিসের ওপর। কিছুক্ষণ পর ওদের মিলে যাওয়া দু’ঠোঁট ছাড়া এক হওয়া দেহটা আর দেখা যাচ্ছিল না।
অনেকক্ষণ পর দেহটা দুভাগ হয়ে হাত ধরে হেঁটে শিল্পীদের পোশাক রাখার করিডর পার হলো। মেকআপের ঘর পেরিয়ে গেল। বাথরুমগুলোর সামনে দিয়ে এগিয়ে ভবনের একেবারে শেষে মাথার একটি সরু দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। সোফিয়া নম্বর টিপে সেটি খুলে দিল। দরজার ওপাশের ঘরটি ছিল ছোট। একটি কাঠের টেবিল। দুটি চেয়ার। একটি বইয়ের তাক। পাহাড়ের দিকে খোলা একটি জানালা। এর বেশি কিছু নয়।
মিকা টেবিলের ওপারে বসে ছিল। সে অপেক্ষা করছিল। সে চোখ তুলে তাকাল। প্রথমে সোফিয়ার দিকে। ওর নিচের ঠোঁটের ডান কোণা কামড়ে ধরা। তারপর আনিসের দিকে। সে কোনো প্রশ্ন করল না।
—আমি ওকে বিয়ে করতে চাই,—বলল সোফিয়া।
মিকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব সামান্য হাসল।
—আজকের রাত তোমার।
সোফিয়া মাথা নিচু করল।
—ধন্যবাদ।
দুজন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সোফিয়া আনিসের হাত ছাড়ল না। একই করিডর ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা শিল্পীদের বিশ্রামের জায়গায় পৌঁছল। সোফিয়া একটি ছোট তাঁবুর পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে আরেক তরুণী নিজের অল্প কিছু জিনিস গুছিয়ে রাখছিল। সোফিয়া নিচু স্বরে তার সঙ্গে কথা বলল। মেয়েটি হেসে উঠল। তারপর একটি কম্বল আর ছোট কাপড়ের ব্যাগ তুলে নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করেই বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে সে সোফিয়াকে আলিঙ্গন করল। সফিয়া প্রবেশমুখের পর্দাটা ফেলে আটকে দিয়ে আনিসের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
দ্বিতীয় দিনের বিকেলে আনিস আবার প্রথম সারির আসনে বসেছিল। ঢোল বাজতেই সোফিয়া মঞ্চে উঠল। তার পাশে হাঁটছিল যিশু। আজ ওরা রৌদ্রতপ্ত কাঠফাটা আগস্ট। প্রদর্শনী শুরু হলো। আনিস এক মুহূর্তের জন্যও তার দৃষ্টি সরাল না। অভিনয়ের মাঝামাঝি সে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে রেলিং টপকে মঞ্চে উঠে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর্যন্ত কেউ অবাক হলো না। দর্শকেরা ভেবেছিল এটাও প্রদর্শনীরই অংশ। আনিস সোজা সোফিয়ার কাছে গিয়ে পৌঁছে তার হাত ধরে ফেলল। যিশু অন্য হাতটি ধরে রেখেছিল। কিছুক্ষণ তিনজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সোফিয়ার নিচের ঠোঁটের ডান কোণা কামড়ে ধরা। আনিস আস্তে করে সফিয়াকে নিজের দিকে টেনে নিলো। যিশু কোনো জোর প্রয়োগ করল না। সে শুধু অভিনয়ের ভঙ্গিটা ধরে রাখার চেষ্টা করল। সোফিয়া যিশুর হাত ছাড়িয়ে মঞ্চ থেকে নেমে আনিসের সঙ্গে হাড়তে শুরু করল। হটাত করে পেছনের সারি থেকে একজন চিৎকার করে উঠল—
—ওকে নিয়ে যাচ্ছে!
ভঙ্গুর ক্রিস্টাল-নীরবতা ভেঙে গেল মুহূর্তে, দশদিক ভোরে দেওয়া চিৎকার আর শীষ।
—ধর, ধর, ওকে নিয়ে যাচ্ছে!
—মেয়েটাকে নিয়ে যাচ্ছে!
হাজার হাজার মানুষ একই সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
ওরা হাঁটতেই থাকল, আনিসের মুঠোয় সোফিয়ার হাত। ওরা এগিয়ে গেল মালভূমির কিনারে। প্রত্যেকটা চোখ গেঁথে ছিল ওদের পিঠে, মাজায়, কোমরে, বিশেষ করে সোফিয়ার নিতম্বে।
তাঁবুগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ডোরাকাটা পিঠের হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ওগুলোর ঘাড়ে ছিল ঘন লোম। একটু দূরে কয়েকটি কোলাবাস বানর গাছ থেকে নেমে এসে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল। তাদের একজন হঠাৎ সোজা হয়ে আরেকটি মেয়ে কোলাবাসের হাত ধরে ওদের নকল করে কোমর দুলিয়ে হাঁটতে শুরু করল, আনিস আর সোফিয়ার পেছন পেছন। হল রুমে হাসির রোল উঠল। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে গেছে চেয়ারের ওপর। যিশু একা চেষ্টা করছে শো চালিয়ে নেয়ার। মঞ্চের পাশ থেকে সেপ্টেম্বরের মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করছে যোগ দেবে কিনা। কিন্তু সকল দর্শক ওদের দিকে পেছন দিয়ে আছে। ওদের এই উল্লাসের মগ্নতায় বাগড়া দেবার ক্ষমতা কারও নেই।
সোফিয়া নিজের তাঁবুর পর্দা তুলে ধরলে দুজন ভেতরে ঢুকল। পর্দাটা আবার নেমে এলো। তারা একে অপরকে এমন তাড়নায় জড়িয়ে ধরল, যেন বহুদিন ধরে এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল। একবার চুমু খেল। তারপর আরেকবার। তৃতীয়টি ছিল অন্তহীন। তৃতীয় চুমুটি যেন শেষই হচ্ছিল না। দাঁড়িয়ে রইল অন্তহীন। কেউ আলাদা হতে চাইছিল না। হঠাৎ সোফিয়া চোখ খুলল। সে আনিসের বুকে একটি হাত রেখে বলল:
—একটু অপেক্ষা করো।
আনিস বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
—শো এখনও শেষ হয়নি।
তাঁবুর তেরপলের ফাঁকফোকর দিয়ে একে একে কিছু চোখ দেখা দিতে শুরু করল। তাঁবুটা ঘিরে শুরু হয়েছে ফিসফিসানি। ওরা ছোট ছোট ফাঁক দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছিল। কেউ জোড়ে কথা বলছিল না। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। সোফিয়া পর্দার দিকে তাকাল। তারপর আবার আনিসের দিকে।
—আমাকে ফিরতে হবে।
সোফিয়া তাঁবুর পর্দা তুলে ধরল। হাওয়ার এক ঝাপটা হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সে বাইরে পা রাখল। আনিসও তার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
—দাঁড়াও, যেও না।
—আমাকে ফিরতেই হবে।
আনিস তার হাত ধরে ফেলল।
—না।
সোফিয়া মাথা নিচু করল।
দূর থেকে মিকাকে দেখা যাচ্ছিল। ধীর পায়ে এদিকে এগুচ্ছে। লোকজন দুভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সম্ভ্রমে। তার ডান হাত বাম হাতের চেয়ে স্পষ্টই অনেক লম্বা। দাঁড়াল ওদের কয়েক কদম সামনে।
আনিস এক পা সামনে এগিয়ে গেল।
—মিকা, আমি সোফিয়াকে নিয়ে যাচ্ছি। যত টাকা লাগে আমি দেব, আমার জমি বাড়িঘর সব বিক্রি করে দেব। ওর জন্য ঘোর সংসার সব ছাড়ব। ওকে ভিক্ষা চাইছি।
মিকা কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে তার ডান হাত তুলল। পিপিকের (PPK) হাতল শক্ত করে চেপে ধরল।
গুলিটার কোনো তাড়া ছিল না। ·

0 মন্তব্যসমূহ