অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুজ জামানের জন্ম ১৯৬২ সালের ২২ ডিসেম্বর, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার সৈয়দনগর গ্রামে। পড়াশুনা করেছেন ঢাকায়। ১৯৮৫ সাল থেকে প্রবাসী। প্রথমে জাপানে চাকুরিসূত্রে, পরে মেহিকোতে চাকুরিসূত্রে গেলেও অচিরেই সেখানে নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তােলেন। বর্তমানে সন্তান ও স্ত্রীসহ ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ছােটবেলায় বহু ভাষায় অভিজ্ঞ ও সাহিত্যরসিক নানার সাহিত্যপ্রীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। পরে মায়ের সাহিত্যপ্রীতিও তাঁর মনােগঠনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। মূল স্প্যানিশ থেকে তিনি লাতিন আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন লেখকের লেখা অনুবাদ করেছেন। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছর-ই তাঁর প্রথম প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ। তিনি লিখেছেন গল্প-উপন্যাসও। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় ই-মেইলে। প্রশ্নগুলো মেইল করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। তিনি উত্তরও লিখে পাঠান মেইলে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান :
আনিস ভাই, কেমন আছেন? আপনি এখন নিশ্চয়ই মেক্সিকোতে আছেন, আপনার সেই বিশাল বাড়িতে। ঠিক এই মুহূর্তে সেখানকার পরিবেশ কেমন?
আনিসুজ জামান :
ভালো আছি। তবে একটা ছোট্ট সংশোধন করি। আমি এই মুহূর্তে মেক্সিকোতে নেই। আর আপনি যে আমার ‘বিশাল বাড়ি’র কথা বললেন, ‘বিশাল’ শব্দটা আসলে খুবই আপেক্ষিক। কোনো বাড়ি বড় না ছোট, সেটা তার আয়তনে ঠিক হয় না; বরং নির্ভর করে সেখানে যে মানুষটি বাস করেন, তাঁর চাহিদা আর তৃপ্তির ওপর। কারও কাছে তালপাতার ছাউনি দেওয়া একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরই প্রাসাদ হয়ে উঠতে পারে।
স্বকৃত নোমান :
আপনি তো তাত্ত্বিক জায়গায় চলে গেলেন। আমি আসলেই আপনার সেই বিশাল বাড়িটির কথা বলছি, যেটার গল্প আপনার মুখে শুনেছি।
আনিসুজ জামান :
আচ্ছা। তা অবশ্য ঠিক। আপনি যদি বাংলাদেশের অধিকাংশ বাড়ির সঙ্গে আমার সেই বাড়ির তুলনা করেন, তাহলে আমার বাড়িটিকে বড়ই বলতে হবে। যাই হোক, এখন আমি ফ্লোরিডায় আছি। এখানে এই সময়ে প্রচণ্ড গরম। সারা বছরই মূলত চারটি জায়গার মধ্যে ঘুরে বেড়াই—মেক্সিকো, ফ্লোরিডা, সান দিয়েগো আর বাংলাদেশ।
যতটুকু খবর পেয়েছি, মেক্সিকোতেও এখন প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতাও অনেক বেশি। তবে আমি যে শহরে থাকি, সেটি চারদিক পাহাড়ে ঘেরা একটি ছোট্ট খনিশহর। জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর, শান্ত এবং লেখালেখির জন্য আদর্শ। আমার স্টুডিওর সঙ্গে লাগানো বারান্দা থেকে বাম দিকে তাকালে দেখা যায় ‘সিয়েরা দে আগিলা’ পর্বতমালা। সামনে বিস্তীর্ণ ভুট্টাক্ষেত আর চোখজুড়ানো সবুজ। ডান দিকে রয়েছে একটি বড় হ্রদ। এমন পরিবেশে বসে লিখতে পারা আমার কাছে সত্যিই এক ধরনের সৌভাগ্য।
স্বকৃত নোমান :
আপনি বাংলাদেশি বাঙালি। জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন প্রবাস-জীবনে এবং এখনো কাটাচ্ছেন। মেক্সিকো যাওয়ার গল্পটা শুনতে চাই। কীভাবে ঘুরতে ঘুরতে ওই দেশে গিয়ে থিতু হলেন?
আনিসুজ জামান :
সে এক দীর্ঘ গল্প। আমার আত্মজীবনীর জন্য রেখে দিয়েছিলাম। এখানে সংক্ষেপে বলছি।
১৯৮৫ সালে আমি বাংলাদেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। তখন দেশ, চারপাশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসনের দীর্ঘ ছায়া আর ব্যক্তিগত নানা বাস্তবতা মিলিয়ে আমার নিজের কক্ষপথ থেকেই যেন ছিটকে পড়েছিলাম। পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম না। স্কুলজীবনে বরং ভালো ছাত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলাম। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল, শুধু ভালো ছাত্র হলেই কোনো ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না। সামনে কোনো পথ দেখতে পাচ্ছিলাম না।
সংসারের অবস্থাও খুব স্বচ্ছল ছিল না। বাবা-মায়ের বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের দায় ছিল। তার ওপর ব্যক্তিগত আরও কিছু অস্থিরতা ছিল, যেগুলো এই মুহূর্তে আর খুলে বলতে চাই না। সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, অন্তত তখনকার বাংলাদেশে থেকে নিজের জন্য কোনো পথ খুঁজে পাব না।
ঠিক সেই সময় জাপানে ছাত্রভিসায় যাওয়ার সুযোগ এল। বাবা ধার করে কিছু টাকা জোগাড় করেছিলেন। আমিও কিছু ব্যবস্থা করেছিলাম। সেই টাকায় জাপান চলে যাই। তখন ছাত্রভিসায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ ছিল। অনেকেই সেই সুযোগে জাপানে যেতেন। আমিও তাদেরই একজন।
টোকিওর রিক্কিও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নাম নথিভুক্ত ছিল। কিন্তু সেখানে মাত্র দুদিন ক্লাস করার পরই আমাকে গুনমা প্রিফেকচারের কিরিউ শহরে নিশিবা কোগিও নামে একটি কারখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। প্লাস্টিক ডিভিশনে কাজ শুরু করলাম। দিনে কিছুটা সময় কলেজে হাজিরা দিতে হতো, মূলত ভিসার শর্ত বজায় রাখার জন্য। আর রাতভর কারখানায় কাজ করতাম।
ওই কারখানার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অনেক মানুষ সেখানে কাজ করতেন। জাপান সরকার সম্ভবত এ ধরনের কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ সহায়তা দিত। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হতো না। দিনের শিফটে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের অনেকেই ছিলেন মহিলা। আমরা কাজ করতাম রাতের শিফটে।
আমাদের তৈরি করা পার্ট ছিল তখনকার টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসের ক্যালকুলেটরের প্লাস্টিকের অংশ। দিনের শিফটে আমার মেশিনে যে মহিলা কাজ করতেন, তিনি বারো বাক্স পার্ট তৈরি করতেন। আমি রাতের শিফটে নিয়মিত তেরো বাক্স তৈরি করতে শুরু করলাম। পরে বুঝেছিলাম, জাপানে প্রতিযোগিতা ছিল প্রবল। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা পদ, ক্ষমতা কিংবা বেতনের জন্য নয়। কে কত ভালো মান বজায় রেখে বেশি উৎপাদন করতে পারে, প্রতিযোগিতা ছিল সেখানে। দিনের শিফটে যে মহিলা আমার মেশিনে কাজ করতেন, তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেও বারো বাক্সের বেশি তৈরি করতে পারতেন না। আমি রাতের শিফটে তেরো বাক্স তৈরি করছি—এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না।
একদিন রাতে কাজে গিয়ে দেখি, তিনি মেশিনের চারপাশ সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে রেখেছেন। তারপর সুপারভাইজারকে ডেকে এনেছেন। আমাকে দেখেই বললেন, আমি নিশ্চয়ই গুদাম থেকে এক বাক্স পার্ট এনে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছি। কারণ হিসাবমতো এটা সম্ভব নয়। আমি হেসে বললাম, না, তা নয়। সুপারভাইজার বললেন, “তুমি তেরো বাক্স কীভাবে বানাও? প্রতিটি পার্টের একটি নির্দিষ্ট সাইকেল টাইম আছে। হিসাব অনুযায়ী বারো বাক্সের বেশি হওয়ার কথা নয়।”
আমি বললাম, “হয়।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কীভাবে?”
বললাম, “রাতের তাপমাত্রা দিনের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি কম। তাই কুলিং টাইম প্রতি সাইকেলে এক সেকেন্ড কমিয়ে দিয়েছি।”
তিনি প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, “তুমি কী করেছ? জোকেনে হাত দিয়েছ? অপারেটরের পক্ষে এটা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তুমি তো জাপানিও ঠিকমতো পড়তে পারো না। করলে কীভাবে?”
আমি বললাম, “জাপানি পড়তে পারি না ঠিকই, কিন্তু এটুকু বুঝি যে এখানে ‘মিজু’ লেখা আছে। অর্থাৎ পানি। আর এই সংখ্যাটাই কুলিং টাইম। দিনের আর রাতের তাপমাত্রা এক নয়। তাই দশ সেকেন্ডের জায়গায় আমি নয় সেকেন্ড করেছি।”
তিনি আবার বললেন, “তুমি জানো এই পার্টে কতগুলো ক্রিটিক্যাল পয়েন্ট আছে? সামান্য এদিক-ওদিক হলেই ভেতরের ইলেকট্রনিক অংশগুলোর সঙ্গে এটা ঠিকমতো অ্যাসেম্বল হবে না।”
আমি অফিস থেকে জোগাড় করা পার্টের ড্রয়িং বের করলাম। তারপর নিজের টাকায় কেনা ভার্নিয়ার ক্যালিপারটা দেখালাম। বললাম, “প্রতি শিফটে না হলেও সপ্তাহে অন্তত তিনবার আমি সব ক্রিটিক্যাল ডাইমেনশন মেপে দেখি। টলারেন্সের বাইরে গেলে সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারব।”
তিনি আমার বানানো কয়েকটি ঠান্ডা পার্ট হাতে নিয়ে একে একে মাপলেন। তারপর আর কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর প্রোডাকশন ম্যানেজারকে ডেকে আনলেন। আমাকে জানানো হলো, পরের সপ্তাহ থেকে আমি আর অপারেটর হিসেবে কাজ করব না। মোল্ড-চেঞ্জ আর টেকনিশিয়ানের কাজ শিখতে হবে।
ঘটনাটা সেখানেই শেষ হয়েছিল। তার কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনা ঘটল। সেটাই শেষ পর্যন্ত আমাকে মেক্সিকোতে নিয়ে গিয়েছিল। ডিসেম্বরের শেষ দিক। সেদিন একটানা ছয়টি মোল্ড বদলাতে হয়েছিল। শরীর ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন শনিবার। মোল্ড-চেঞ্জের কাজ শেখার জন্য আমাকে রাতের শিফট থেকে দিনের শিফটে আনা হয়েছিল। কাজ শুরু করতাম সকাল ছয়টায়। শেষ হওয়ার কথা সন্ধ্যা ছয়টায়। কিন্তু সেদিন বেরোতে বেরোতে রাত প্রায় নয়টা বেজে গেল।
সামনে বড়দিনের ছুটি, তারপর বছরের শেষের উৎসব। কারখানায় উৎপাদনের প্রচণ্ড চাপ। বাইরে বেরিয়ে দেখি কয়েক ফুট বরফ জমে আছে। ঠান্ডায় দস্তানার ভেতরেও হাত জমে আসছিল। প্রতিদিন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কারখানায় যাওয়া-আসার পথে একটি ছোট বার চোখে পড়ত। লাল-নীল নিয়ন আলো জ্বলত আর নিভত। জানতাম ওটা বার। কিন্তু তখন পর্যন্ত এমন কোনো বাঙালিকে চিনতাম না, যে সেখানে কখনো ঢুকেছে।
সেদিন সাহস করে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে ঢুকতেই সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। বারটেন্ডারও যেন একটু থমকে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী খাবে?”
তত দিনে মোটামুটি জাপানি ভাষায় চলাফেরা করার মতো শিখে গিয়েছি। ওরা ইংরেজি বলতে পারত না। তাই তিন মাসের মধ্যেই জাপানি শিখতে হয়েছিল। কাউন্টারের পেছনে তাকিয়ে শুধু একটি বোতলই চিনতে পারলাম—ব্ল্যাক লেবেল। কোথায় যেন নামটা পড়েছিলাম। আমি সেটাই চাইলাম।
বরফ দিয়ে খাওয়ার কথা শুনেছিলাম। কিন্তু সেই প্রচণ্ড শীতের রাতে আর বরফ খাওয়ার ইচ্ছে হলো না। বললাম, “গরম পানি মিশিয়ে দিন।”
বারটেন্ডার কোনো কথা না বলে গরম পানি মিশিয়ে দিলেন। আমার পাশ থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বারটেন্ডারকে জিজ্ঞেস করলেন, “লোকটা কে? আমার মতো করেই হুইস্কি খাচ্ছে?”
তখনও জানতাম না, জাপানে গরম পানি মিশিয়ে হুইস্কি খাওয়ারও একটি প্রচলিত ধরন আছে। আমি ভেবেছিলাম, বুদ্ধিটা বুঝি আমারই।
কিছুক্ষণ পর তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, “তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি।”
আমি বললাম, “না, আমার তো মনে হয় না।”
তিনি বললেন, “আমার স্মৃতিশক্তি এত খারাপ নয়। নিশ্চয়ই কোথাও দেখেছি। তোমার নাম কী?”
আমি নাম বললাম। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কী করো?”
বললাম, “কলেজে পড়ি।”
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আর?”
এবার একটু ইতস্তত করে বললাম, “পার্টটাইম কাজ করি।”
“কোথায়?”
“নিশিবা কোগিও।”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমার নাম নিশিবা।”
বার বন্ধ হলো রাত বারোটার দিকে। সেখান থেকে আমরা আমার থাকার জায়গায় চলে এলাম। জাপানি ধাঁচের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট। তাতামি পাতা মেঝেতেই আমাদের ঘুমাতে হতো। সেখানেই বসে গল্প করতে করতে দুজনে মিলে প্রায় ভোর তিনটা পর্যন্ত সেই ব্ল্যাক লেবেলের বোতল শেষ করলাম। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি শোবার জায়গা করতে গিয়ে দেখি, তাঁর বিশাল মানিব্যাগটা তাতামির ওপর পড়ে আছে।
ভোর হতে না হতেই নিচে নেমে কেয়ারটেকারকে খুঁজে বের করলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি নিশিবার বাড়ি চেনেন কি না। তিনি বললেন, “চিনি।”
আমি বললাম, “নিশিবা তাঁর মানিব্যাগ আমার ঘরে ফেলে গেছেন। আমি ওটা পৌঁছে দিতে চাই।”
তিনি হাত বাড়িয়ে বললেন, “আমাকে দিন। আমি দিয়ে দেব।”
আমি মানিব্যাগটা তাঁর হাতে দিলাম না। কেন দিইনি, আজও বলতে পারব না। জাপানিদের প্রতি অবিশ্বাস ছিল না। হয়তো সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই মনে হয়েছিল, যাঁর জিনিস, তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া উচিত।
কেয়ারটেকার আমাকে বাড়িটা দেখিয়ে দিলেন। বাড়ির সামনে গিয়ে ইন্টারকমের বোতাম টিপলাম। ভেতর থেকে বিরক্ত গলায় ভেসে এল, “এত সকালে কোন গাধা?”
আমি বললাম, “এক গাধাকে খুঁজছি। সে তার মানিব্যাগ আমার ঘরে ফেলে গেছে।”
কিছুক্ষণ পর নিশিবা নিচে নেমে এলেন। আমার হাত থেকে মানিব্যাগটা নিয়ে তিনি একে একে সব নোট গুনতে শুরু করলেন। আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। সব গোনা শেষ করে তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“তুমি বাংলাদেশি, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বাংলাদেশি?”
“হ্যাঁ।”
আরও একবার।
“তুমি সত্যিই বাংলাদেশি?”
এবার আমার মাথার ভেতর রক্ত যেন একটু একটু করে চড়ে উঠছিল। একই প্রশ্ন বারবার কেন? আমি বাংলাদেশি হলাম কি না, তাতে কী আসে যায়? কী ভাবছে? আমি টাকা চুরি করব? ঠিক তখনই তিনি পকেট থেকে দুটো নোট বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, “এটা তোমার জন্য।” আমি বললাম, “কাল রাতে তুমি বললে আমরা বন্ধু। একসঙ্গে বসে পান করলাম। আর এখন আমাকে টিপস দিচ্ছ? তুমি একটা বোকা। বিরাট এক গাধা।”
কথাটা বলে আমি সেখান থেকে চলে এলাম। পরদিন কারখানায় গিয়ে শুনলাম, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আমাকে খুঁজছেন। আমি তাঁর অফিসে ঢুকতেই তিনি বললেন, “গতকাল কী হয়েছিল তোমাদের মধ্যে?”
আমি বললাম, “তেমন কিছু না।”
তিনি শুধু বললেন, “মালিক তোমাকে ডাকছেন।”
নিশিবার অফিসে ঢুকতেই তিনি আমাকে বসতে বললেন। তারপর বললেন, “তোমার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। অপারেটর হিসেবে তুমি ভালো কাজ করেছ। এখন টেকনিশিয়ানের কাজও শিখে ফেলেছ। জাপানি ভাষাটাও খুব অল্প সময়ের মধ্যে শিখে নিয়েছ।” একটু থেমে আবার বললেন, “স্প্যানিশ শিখতেও তোমার বেশি সময় লাগবে না।”
আমি কিছু বললাম না। তিনি বললেন, “আমরা মেক্সিকোতে নতুন একটি প্লাস্টিক ডিভিশন চালু করছি। তোমাকে গোটা কয়েক স্প্যানিশ ক্লাশ দেয়া হবে। তারপর তুমি মেক্সিকো যাবে। ওখানে গিয়ে নতুন কারখানা চালু করবে।”
ওটাই আমার জীবনের সবথেকে বড়ো বাঁক বদল।
স্বকৃত নোমান :
দীর্ঘ গল্প। আচ্ছা, যতটা জানি আপনি লেখালেখিতে যুক্ত হয়েছেন অনেক পরে। লেখালেখির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন? কীসে অনুপ্রাণিত করেছিল? শুরুতে কী ধরনের লেখা লিখতেন? অনুবাদ সাহিত্যের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন—সেই গল্পটা শুনতে চাই।
আনিসুজ জামান :
আসলে লেখালেখির সঙ্গে কি মানুষ অনেক পরে যুক্ত হতে পারে? আমার তো তা মনে হয় না। কেউ হয়তো অনেক পরে লেখা প্রকাশ করে, কেউ হয়তো কোনো দিনই প্রকাশ করে না। কিন্তু যে সত্যিকার অর্থে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হয়, সে যুক্ত হয় অনেক আগেই—জীবনের একেবারে ভোরবেলায়। আমার ক্ষেত্রেও সম্ভবত তাই হয়েছে। আমার নানা গ্রামের মানুষের সামনে কেচ্ছা বলতেন। কখনো হাজার এক রজনী, কখনো অন্য গল্প। সারাদিন মাঠে-ঘাটে কাজ সেরে গ্রামের মানুষ রাতের খাবার খেয়ে তাঁর কাছে এসে বসতেন। তখন টেলিভিশন ছিল না, অন্য কোনো বিনোদনও ছিল না। গল্প শোনাই ছিল তাদের বিনোদন। আমি নানার পাশেই বসে থাকতাম। এখন মনে হয়, লেখালেখির সঙ্গে আমার পরিচয় সম্ভবত সেখান থেকেই।
তবে লেখা প্রকাশ করার গল্পটা অনেক পরে। তখন আমি মেক্সিকোতে। এক বন্ধু আমাকে বারবার লিখতে বলছিল। শেষ পর্যন্ত লেখা বলতে আমি অনুবাদই শুরু করলাম। প্রথমেই হাত দিলাম আলফন্সো রেইয়েসের কবিতায়। অনুবাদ সম্পর্কে তখন আমার প্রায় কোনো ধারণাই ছিল না। কিছু দূর এগিয়ে বুঝলাম, এ কাজ আমার দ্বারা হবে না।
কিছুদিন পর আবার সেই বন্ধুর তাগাদা। এবার হাতে নিলাম বোরহেস। তাঁর ছোটগল্প দিয়েই বলতে গেলে আমার অনুবাদজীবনের শুরু। যতদূর মনে পড়ে, প্রথম অনুবাদ করেছিলাম চাকতি গল্পটি। সংক্ষেপে এটাই আমার অনুবাদজগতে প্রবেশের ইতিহাস।
স্বকৃত নোমান :
চাকরিসূত্রে জাপানে ছিলেন দীর্ঘ সময়। সেই সময় জাপানি সাহিত্যের সঙ্গে কি আপনার পরিচয় ঘটেছিল? নাকি তখনো সাহিত্য-জগতে প্রবেশ করেননি, তেমন খোঁজখবর রাখতেন না?
আনিসুজ জামান :
না, সত্যিকার অর্থে ওইভাবে জাপানি সাহিত্যের সঙ্গে আমার তখন ততটা পরিচয় হয়নি। এমনকি আজও জাপানি সাহিত্যের সঙ্গে আমার পরিচয় খুবই অপ্রতুল। তবে একটা কাজ করেছিলাম। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সেখানে হাইকু ও রেঙ্গাকে কেন্দ্র করে প্রতি শনিবার একটা আড্ডা হতো। আমি নিয়মিত সেই আড্ডায় যোগ দিতাম। জাপানি সাহিত্যের সঙ্গে আমার পরিচয় বলতে গেলে ওইটুকুতেই প্রায় আটকে আছে—তখনও, আজও।
স্বকৃত নোমান :
আপনার নানা ছিলেন বহু ভাষায় অভিজ্ঞ, সাহিত্যপ্রীতি ছিল তাঁর। তার কোনো প্রভাব কি আপনার ওপর পড়েছে?
আনিসুজ জামান :
এটা আগের প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা এসেছে। তবু বলব, হ্যাঁ। মার্কেজের মতোই আমার ওপর নানার প্রভাব প্রচণ্ড। বরং বলব, নানা আমাকে আজ পর্যন্ত প্রায় সম্পূর্ণটাই দখল করে রেখেছেন। আমার অল্পস্বল্প যতটুকু লেখালেখি আছে, তার আনাচে-কানাচে খুঁজলে প্রায় সব জায়গাতেই নানাকে পাওয়া যাবে।
স্বকৃত নোমান :
শুনেছি আপনার মায়েরও ছিল সাহিত্যের প্রতি টান। কেমন ছিল সেই টান? আপনার সাহিত্যপ্রীতির পেছনে মায়ের কি ভূমিকা ছিল?
আনিসুজ জামান :
হ্যাঁ, মায়ের কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আসলে মা না থাকলে আমার এই অস্তিত্বটাই হয়তো এভাবে গড়ে উঠত না। মানুষ একেবারে ছোটবেলা থেকে তার পারিপার্শ্বিকতা নিয়েই বড় হয়। আর অন্তত আমাদের সময়ের সমাজে সেই পারিপার্শ্বিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মা। বাবা তখন সংসার চালানো, আয়-রোজগার—এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। আমার মননটা তৈরি করে দিয়েছেন মা। নানার গল্প শোনার যে আগ্রহের কথা বললাম, মা যদি ছোটবেলায় আমাকে পাশে নিয়ে নানার সামনে বসে না থাকতেন, সেটা কি তৈরি হতো? আমার মনে হয় না।
মায়ের মুখেই শুনেছি, আমি ঠিকমতো কথা বলতে শেখার আগেই তিনি আমাকে অক্ষর চেনাতে শুরু করেছিলেন। আমি ক্লাস ওয়ান বা টু পড়িনি। সরাসরি মহাখালী স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছিলাম। এর পেছনেও ছিলেন মা।
আর সাহিত্যের প্রতি তাঁর নিজের টানটা সম্ভবত এসেছিল তাঁর বাবার কাছ থেকেই। ছোটবেলা থেকেই মা লিখতেন। এখনও লেখেন। তাঁর বয়স এখন চুরাশি। নিজের লেখাগুলো এমনভাবে আগলে রাখেন যে আমাদের প্রকাশ করতেও দেন না। আমার সাহিত্যপ্রীতির পেছনে মায়ের ভূমিকা কতটা—এর চেয়ে বেশি বোধহয় আর বলার প্রয়োজন নেই।
স্বকৃত নোমান :
বিখ্যাত কথাশিল্পী গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখাজোখার সঙ্গে আপনার কীভাবে পরিচয় হয়েছিল?
আনিসুজ জামান :
সালটা এখন আর মনে নেই। তবে মনে আছে, এক জন্মদিনে আমার স্ত্রী আমাকে কলেরাকালের ভালোবাসা বইটি উপহার দিয়েছিলেন। তখন বইটা একনজর দেখেছিলাম, লেখকের নামটাও পড়েছিলাম। কিন্তু ওই পর্যন্তই। মার্কেসকে চিনতাম না, তাঁর লেখার সঙ্গেও কোনো পরিচয় ছিল না। সত্যিকার অর্থে মার্কেসের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রাবন্ধিক, কবি ও অনুবাদক। তিনি বারবার আমাকে মার্কেস অনুবাদ করার জন্য তাগাদা দিতে থাকেন। এর আগেও তাঁর তাগিদেই বোরহেস, আলফন্সো রেইয়েসসহ কিছু লেখকের টুকিটাকি অনুবাদ করেছিলাম। মূলত তিনিই আমাকে মার্কেস পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এ জন্য তাঁর প্রতি আমি আজও কৃতজ্ঞ, সারাজীবনই কৃতজ্ঞ থাকব।
স্বকৃত নোমান :
গার্সিয়া মার্কেজের ‘ওয়ান হান্ড্রেড অব সলিচিউড’ বা ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’ উপন্যাসটি অনুবাদের মধ্য দিয়ে আপনি বাংলা ভাষাভাষী পাঠক-মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এই উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ তো ছিল। আপনার কেন মনে হলো এটি আবার অনুবাদ করা দরকার? এই অনুবাদের বিশেষত্ব কী?
আনিসুজ জামান :
আমি মনে করি, একটি ভালো সাহিত্যকর্মের অনুবাদ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। তার অনেক কারণ আছে। প্রথম কারণ, অনুবাদকের আগে আসে পাঠক। অনুবাদ করতে যাওয়ার আগে আমাদের সেই বইটি পড়তে হয়। আর একেকজনের পাঠরীতি একেক রকম। যে পাঠক কাফকা, বোর্হেস, বেকেট, রুলফো কিংবা অ্যাবসার্ড ও অধিবাস্তবধর্মী সাহিত্য পড়েছেন, তিনি সাধারণত এমন গল্প সহজেই গ্রহণ করেন, যেখানে সব নিয়ম ব্যাখ্যা করা হয় না। গল্পের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর তাঁর দরকার হয় না। তিনি জানেন, কিছু নীরবতা, কিছু ফাঁকও গল্পেরই অংশ।
অন্যদিকে, যাঁদের পাঠাভ্যাস মূলত অন্য ধরনের সাহিত্যিক ঐতিহ্যে গড়ে উঠেছে, তাঁরা প্রায়ই ঘটনাগুলোর আরও স্পষ্ট কারণ, প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা খোঁজেন। সেটাও পাঠের একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি। এ দুটির কোনোটিই অন্যটির চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। এগুলো কেবল ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকে গড়ে ওঠা দুই ধরনের পাঠাভ্যাস। আর এই ভিন্ন পাঠরীতির কারণেই একই সাহিত্যকর্মের অনুবাদও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে উঠতে বাধ্য।
তাছাড়া বাংলায় মার্কেসের যে অনুবাদগুলো আগে ছিল, আমার জানামতে সেগুলো গ্রেগরি রাবাসার ইংরেজি অনুবাদ থেকে করা। আমি অনুবাদ করেছি সরাসরি স্প্যানিশ মূল থেকে। আর সেই স্প্যানিশও শুধু কলম্বিয়ান স্প্যানিশ বা মেক্সিকান স্প্যানিশ বললে পুরোটা বলা হয় না। আমি বলব, ওটা মেক্সিকো-কলম্বিয়া মেশানো গাবোর নিজস্ব স্প্যানিশ। সেই ভাষা বুঝতে এবং অনুবাদ করতে গেলে লেখকের যতটা সম্ভব কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতে হয়। অনুবাদককে যেন কিছু সময়ের জন্য দ্বিতীয় মার্কেস হয়ে উঠতে হয়।
আমি জানি না গ্রেগরি রাবাসা কতবার কলম্বিয়া গিয়েছিলেন, কিংবা পৃথিবীর এত ভাষায় যাঁরা বইটি অনুবাদ করেছেন, তাঁদের মধ্যে কে কতবার কলম্বিয়া বা আরাকাতাকা গিয়েছেন। আমি শুধু আমার কথাটা বলতে পারি। বইটি অনুবাদ করতে আমার পাঁচ বছর লেগেছে। তারপর আরও দুই বছর সম্পাদনা করেছি। মোট সাত বছর এর পেছনে দিয়েছি। এই সময়ের মধ্যে কয়েকবার আরাকাতাকা গিয়েছি, শুধু মার্কেসকে এবং তাঁর পৃথিবীটাকে আরও কাছ থেকে বোঝার জন্য।
বাংলায় আগে হওয়া অনুবাদগুলোর মধ্যে জি এইচ হাবীব ভাইয়ের অনুবাদের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়েছিলাম। পড়েই মনে হয়েছিল, আমার এই চ্যালেঞ্জটা নেওয়া উচিত। মূলত সেখান থেকেই নিঃসঙ্গতার এক শ বছর অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত।
আর আমার অনুবাদের বিশেষত্ব কী—সেটা আমি নিজে বলব না। আমি যেহেতু অনুবাদক, নিজের অনুবাদের বিচারকও নিজে হতে চাই না। সেটা পাঠকের ওপরই ছেড়ে দেব। তাঁরা যদি অন্য অনুবাদগুলোর পাশে আমার অনুবাদটাও রেখে পড়েন, বিশেষত্ব থাকলে তাঁরাই খুঁজে পাবেন। অথবা এভাবেও বলা যায়, এর বিশেষত্ব কী, তার উত্তর হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
স্বকৃত নোমান :
কত দিন লেগেছিল উপন্যাসটি অনুবাদ করতে? অনুবাদের প্রক্রিয়া কেমন ছিল? প্রতিদিন অনুবাদ করতেন, নাকি যখন সময়-সুযোগ পেতেন তখন?
আনিসুজ জামান :
আগেই বলেছি, নিঃসঙ্গতার এক শ বছর অনুবাদ করতে আমার পাঁচ বছর লেগেছে। ঢাউস ঢাউস তিনটা খাতায় পুরো অনুবাদটা হাতে লিখেছিলাম। খাতাগুলো এখনও আমার কাছে আছে। আমার অনুবাদের প্রক্রিয়াটা একটু অন্য রকম। কোনো বই অনুবাদ করার আগে আমি কখনো পুরো বইটা পড়ে নিই না। পড়তে পড়তেই অনুবাদ করি, অনুবাদ করতে করতেই এগোই। নিঃসঙ্গতার এক শ বছরও ঠিক এই প্রক্রিয়াতেই অনুবাদ করেছি।
প্রতিদিন অনুবাদ করতাম কি না? নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এর ভেতরে একবার ঢুকে পড়লে প্রতিদিন অনুবাদ না করে কি আর উপায় আছে? শুধু ওই পাঁচ বছর নয়, সম্পাদনার দুই বছর মিলিয়ে সাত বছর পার হওয়ার পরও আরও প্রায় পাঁচ বছর আমার নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এর জ্বর ছিল। যত দিন না পেদ্রো পারামো-তে ঢুকেছি, তত দিন সেই জ্বর আমাকে ছাড়েনি।
তারপর পেদ্রো পারামো অনুবাদ করতে শুরু করলাম। এবার রুলফোর জ্বর এসে আমার ওপর আছড় করল। সেই জ্বর আজও আছে। কোনো প্যারাসিটামলই এখনও কাজ করছে না।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদ করার সময় এই উপন্যাসের কোন চরিত্র আপনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল?
আনিসুজ জামান :
অনুবাদ করার সময় একেকটা চরিত্র একেক সময় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে একটি চরিত্রকে আলাদা করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর একটা টোটাল উপন্যাস। আমি বলব, এটা একটা অনিবার্য উপন্যাস। এর প্রতিটি চরিত্রই অনিবার্য। উপন্যাসটাকে ওভাবেই আসতে হতো। ফলে অনুবাদের সময় একেক মুহূর্তে একেকটা চরিত্র আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আজ এত বছর পর যদি আমাকে একই প্রশ্ন করেন, তাহলে হয়তো উত্তরটা অন্য রকম হবে।
স্বকৃত নোমান :
আচ্ছা, আপনি কি কখনো মার্কেসের সেই কল্পিত জনপদ ‘মাকান্দো’তে গিয়েছেন কখনো? বা এই নামে আদৌ কোনো জনপদ রয়েছে?
আনিসুজ জামান :
আগেই বলেছি, আমি অনেকবারই আরাকাতাকা গিয়েছি। এই তো এ বছরও বোগোতা বইমেলা শেষ করে আবার আরাকাতাকা ঘুরে এলাম। আরাকাতাকা, কার্তাহেনা, সান্তা মার্তা, বাররাঙ্কিয়া—এসব জায়গা এখন আমার আপন ভূমি হয়ে উঠেছে। সুযোগ পেলেই কলম্বিয়ায় গিয়ে ওদিকে ঘুরে আসি। সঙ্গে কালি। কালির প্রতি আমার আকর্ষণের কারণটাও নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আর মাকন্দো নামে সত্যিই কোনো জনপদ ছিল কি না? জনপদ ছিল বলে আমার জানা নেই। মার্কেস তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ছোটবেলায় নানার সঙ্গে ট্রেনে যাতায়াতের সময় একটি কলাবাগানের প্রবেশপথে ‘মাকন্দো’ নামটা তাঁর চোখে পড়েছিল। পরে মায়ের সঙ্গে আরাকাতাকায় পুরোনো বাড়ি বিক্রি করতে যাওয়ার সময় আবার সেই পথ দিয়েই গিয়েছিলেন। নামটা তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল।
মাকন্দো নামের উৎস নিয়ে পরে আরও অনেক কথা বেরিয়েছে। আফ্রিকার সঙ্গে এর যোগসূত্র নিয়েও নানা কথা আছে। কিন্তু মার্কেসের মাকন্দো তো শেষ পর্যন্ত কোনো মানচিত্রের জনপদ নয়। আরাকাতাকায় গেলে অবশ্য এখন মাকন্দো থেকে পালানোর উপায় নেই। একসময় শহরের নামের সঙ্গে মাকন্দো যোগ করার চেষ্টাও হয়েছিল। সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি। কিন্তু ট্রেন স্টেশনের সামনে এখন বিশাল করে ‘মাকন্দো’ লেখা। আরাকাতাকায় দাঁড়িয়ে তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, শহরটার নাম বদলানো হয়নি ঠিকই, কিন্তু মাকন্দো এসে তাকে দখল করে নিয়েছে।
স্বকৃত নোমান :
সমগ্র লাতিন উপন্যাসের মধ্যে আপনি ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’কে কোথায় তথা কোন সারিতে রাখবেন? ঠিক কী কারণে এই উপন্যাস এতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আনিসুজ জামান :
নিঃসঙ্গতার এক শ বছরকে আমি শুধু লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করব না। আমি অন্যভাবে বলব—এটা বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারির একটি উপন্যাস। পেদ্রো পারামো, দন কিহোতে কিংবা নিঃসঙ্গতার এক শ বছর—এগুলোকে এক, দুই, তিন করে কোথাও বসানো আমার কাছে ভুল মনে হয়। বিশ্বসাহিত্যের যত মহারথী আছেন—কাফকা, জেমস জয়েস, ফকনার, দস্তয়েভস্কি, রুলফো যাঁকে যেখান থেকেই নেন—তাঁদের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর সঙ্গে একই সারিতেই আমি এই উপন্যাসটাকে রাখব।
আগেও বলেছি, এটা একটা টোটাল উপন্যাস। এই কথাটা আমি খুব সচেতনভাবেই বলছি। এর আগে এভাবে টোটাল উপন্যাস খুব কমই লেখা হয়েছে। একটা পরিবারের গল্প বলতে গিয়ে এখানে একটা মহাদেশের ইতিহাস ঢুকে পড়েছে। জন্ম, মৃত্যু, প্রেম, যৌনতা, অজাচার, যুদ্ধ, রাজনীতি, ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পুঁজিবাদ, গণহত্যা, স্মৃতি, বিস্মৃতি, নিঃসঙ্গতা—কী নেই এখানে? অথচ কোনোটাই বাইরে থেকে এনে উপন্যাসের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়নি। সবকিছুই বুয়েন্দিয়া পরিবার আর মাকন্দোর জীবন থেকে জন্ম নিচ্ছে।
আমি আরও একটু এগিয়ে বলব, অনেকটা ধর্মগ্রন্থের মতোই এর ভেতরে একটা পৃথিবীর আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আছে। মাকন্দোর জন্ম আছে, বেড়ে ওঠা আছে, সভ্যতা আছে, যুদ্ধ আছে, সমৃদ্ধি আছে, বিপর্যয় আছে, ক্ষয় আছে, এবং শেষ পর্যন্ত তার বিলুপ্তিও আছে।
আর সময়টাও এখানে শুধু সামনে এগোয় না। ঘুরে ফিরে আসে। নাম ফিরে আসে, চরিত্র ফিরে আসে, ভুল ফিরে আসে, নিঃসঙ্গতাও ফিরে আসে। একটা পরিবারের ইতিহাস কখন যে একটা জনপদের ইতিহাস হয়ে যায়, জনপদটা কখন একটা মহাদেশ হয়ে ওঠে, আর কখন সেটা মানুষের ইতিহাস হয়ে যায়—আলাদা করে ধরতে পারবেন না। আমার কাছে নিঃসঙ্গতার এক শ বছর-এর গুরুত্বটা এখানেই।
স্বকৃত নোমান :
‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ বা ‘জাদুবাস্তববাদ’ আপনি প্রথম কার লেখায় আবিষ্কার করেন? গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাসে, নাকি অন্য কোনো লাতিন সাহিত্যিকের গল্প-উপন্যাসে?
আনিসুজ জামান :
জাদুবাস্তববাদ আমি প্রথম আবিষ্কার করি নিঃসঙ্গতার এক শ বছরেই।
স্বকৃত নোমান :
‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ নিয়ে আপনি একাধিক আর্টিকেল লিখেছেন। বলা যেতে পারে এই সাহিত্যতত্ত্ব সম্পর্কে আপনার নিজস্ব বোঝাপড়া রয়েছে। ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ আসলে কী?
আনিসুজ জামান :
আমি মনে করি, জাদুবাস্তববাদের প্রথম সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন আলেহো কার্পেন্তিয়ের, তাঁর এ জগতের রাজত্ব উপন্যাসে। কার্পেন্তিয়ের অবশ্য একে ‘জাদুবাস্তববাদ’ বলেননি। তিনি বলেছিলেন লো রেয়াল মারাবিয়োসো আমেরিকানো—আমেরিকার বিস্ময়কর বাস্তবতা। কিন্তু আমার কাছে জাদুবাস্তববাদ আর কার্পেন্তিয়েরের লো রেয়াল মারাবিয়োসো আমেরিকানো মূলত একই জিনিস।
এর কয়েক বছর পর, ১৯৫৫ সালে, আনহেল ফ্লোরেস তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Magical Realism in Spanish American Fiction-এ ‘ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম’কে লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্য আলোচনার একটি সাহিত্যিক ধারণা হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। আমার পাঠে, কার্পেন্তিয়ের যে বাস্তবতাকে লো রেয়াল মারাবিয়োসো আমেরিকানো নামে দেখেছিলেন, ফ্লোরেসের আলোচনায় সেই একই সাহিত্যিক বাস্তবতা অন্য একটি নামে এবং বৃহত্তর পরিসরে হাজির হয়। এ নিয়ে আমার বিস্তারিত যুক্তি আছে, আমার প্রবন্ধগুলোতে সেটা বলেছিও।
স্বকৃত নোমান :
মার্কেজই কি জাদুবাস্তববাদের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন? নাকি সফলতা আরও অনেকের আছে?
আনিসুজ জামান :
মার্কেস এর প্রথম সফল প্রয়োগকারী নন। তাঁর অসাধারণত্ব অন্য জায়গায়। তিনি এটাকে এমন এক উচ্চতায়, এমন এক ব্যাপ্তিতে নিয়ে গেছেন যে পরবর্তীকালে জাদুবাস্তববাদের কথা উঠলেই তাঁর নামটা প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে। জাদুবাস্তববাদ নিয়ে আমি বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছি। বিষয়টা সেখানে অনেক বিস্তৃতভাবে বলেছি। এখানে খুব সংক্ষেপে বলি।
আমার কাছে জাদুবাস্তববাদ বাস্তবের সঙ্গে জাদু মিশিয়ে দেওয়া নয়। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা হচ্ছে বিশ্বাসের সংস্কৃতি। যে সমাজ, যে জনপদ বা যে সংস্কৃতি থেকে এই সাহিত্য জন্ম নিচ্ছে, সেই সংস্কৃতির মানুষের বিশ্বাসের ভেতরেই ওই তথাকথিত অলৌকিক বাস্তবতার অস্তিত্ব থাকতে হবে। সেখানে মৃত মানুষ ফিরে এসে বসে থাকতে পারে, কেউ আকাশে উঠে যেতে পারে, বছরের পর বছর বৃষ্টি হতে পারে—কিন্তু লেখক সেগুলোকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করেন না, চরিত্ররাও বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ায় না। কারণ তাদের বিশ্বাসের জগতে ঘটনাটা অসম্ভব নয়। তাদের বাস্তবতারই অংশ।
শুধু একজন লেখক নিজের কল্পনা থেকে একটা অসম্ভব ঘটনা তৈরি করে চরিত্রদের দিয়ে সেটা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলেই সেটা জাদুবাস্তববাদ হয়ে যায় না। তার পেছনে একটা জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, লোকবিশ্বাস, পুরাণ, ধর্ম, কুসংস্কার, মৌখিক কাহিনি—একটা বিশ্বাসের সংস্কৃতি থাকতে হয়। আমার কাছে জাদুবাস্তববাদের মূল জায়গাটা এখানেই—জাদুতে নয়, সেই সংস্কৃতির বাস্তবতায়।
স্বকৃত নোমান :
এ নিয়ে বিস্তারিত বলতে গেলে এই সাক্ষাৎকারের পরিসর ছাড়িয়ে যাবে। আগ্রহী পাঠক এ বিষয়ে আপনার লেখা প্রবন্ধগুলোতে তার বিস্তৃত আলোচনা পাবেন। আমরা আর এই প্রসঙ্গে না যাই। তবে একটা প্রশ্ন আছে। কেউ কেউ বলে থাকেন যে ভারতীয় সাহিত্যে, এমনকি বাংলা সাহিত্যেও জাদুবাস্তববাদের ব্যবহার হয়েছে? এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন? ভারতীয় বা বাংলা ভাষার কোন কোন লেখকের লেখায় জাদুবাস্তববাদ রয়েছে?
আনিসুজ জামান :
ভারতীয় সাহিত্য বা বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তববাদ নিয়ে একেবারেই কিছু পড়িনি, তা বলব না। তবে আমার পড়াশোনা এ ক্ষেত্রে একেবারেই অপর্যাপ্ত। আমার স্বল্প পাঠের মধ্যে শুধু আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যেই জাদুবাস্তবতার স্পষ্ট উপস্থিতি পেয়েছি। আরও অনেকের লেখায় নিশ্চয়ই থাকতে পারে। কারণ জাদুবাস্তবতা লিখবেন বলে কেউ কলম ধরেন না। লিখতে লিখতেই জাদুবাস্তবতা আসে। লেখক যখন কোনো জনপদের বাস্তবতা, তার বিশ্বাস, তার সংস্কৃতি, তার দেখার চোখটাকে সফলভাবে সাহিত্যের বাস্তবতায় নিয়ে আসতে পারেন, তখনই তার ভেতর থেকে জাদুবাস্তবতার জন্ম হতে পারে।
একটা উদাহরণ দিই। একটা মেয়ে তেঁতুলগাছে উঠে বসে আছে। গ্রামের সবাই বলছে, তাকে জিনে ধরেছে। লেখক এই ঘটনাটা বর্ণনা করলেন। এটা জাদুবাস্তবতা নয়। এটা একটা সমাজের বিশ্বাসের বাস্তব বর্ণনা।
এবার ধরুন, ওঝা এল। আগুন জ্বালাল। সেখান থেকে ধোঁয়া উঠল। সেই ধোঁয়ার ভেতর থেকে এক বিশালকায় পুরুষমূর্তি বেরিয়ে এল। সে মেয়েটিকে দুহাতে জড়িয়ে তেঁতুলগাছ থেকে নিচে নামিয়ে দিল। এখানে জাদু এল। কিন্তু বাস্তবতা কোথায়?
মেয়েটি ভালোবাসে মুতাহেরকে। তেঁতুলগাছের ওপর থেকে সে দূরে মুতাহেরক্ আসতে দেখেছে। খবর পেয়ে মুতাজের তার প্রেমিকার কাছে ছুটে আসছে। লেখক কিন্তু বলেননি, মুতাহের এসে গেছে। তিনি শুধু দেখালেন, সেই বিশালকায় পুরুষমূর্তিটি মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে গাছ থেকে নামিয়ে দিল। আর মাটিতে পা দিয়েই মেয়েটি চারপাশের সমস্ত হইচই উপেক্ষা করে ছুটে গিয়ে মুতাহেরকে জড়িয়ে ধরল।
আমার কাছে জাদুবাস্তবতা ঠিক এই জায়গাটায় ঘটে। জাদু আর বাস্তবতা পাশাপাশি থাকে না, একটার ওপর আরেকটা বসানোও থাকে না—দুটো এমনভাবে এক হয়ে যায় যে কোনটা জাদু আর কোনটা বাস্তব, আলাদা করার আর প্রয়োজন থাকে না।
স্বকৃত নোমান :
শহীদুল জহিরের গল্প-উপন্যাসেও অনেকে ম্যাজিক রিয়েলিজম খুঁজে পান। এই বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
আনিসুজ জামান :
এ নিয়ে আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছি। না, শহীদুল জহিরের গল্প-উপন্যাসে আমি কোনো জাদুবাস্তববাদ খুঁজে পাইনি। কেন পাইনি, তার বিস্তারিত আলোচনা ওই প্রবন্ধে করেছি। প্রবন্ধটি ওবায়দ আকাশ সম্পাদিত শালুক-এ প্রকাশিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠককে সেখান থেকেই পড়ে নিতে অনুরোধ করব।
স্বকৃত নোমান :
প্রবন্ধটি আমি পড়েছি। চমৎকার প্রবন্ধ। আচ্ছা, আপনি আদলফো বিয়োয় কাসারেস-এর ‘মোরেলের উদ্ভাবন’ উপন্যাসটি অনুবাদ করেছেন, বাংলাদেশে এটি বেশ পঠিতও হচ্ছে। এই উপন্যাস অনুবাদের নেপথ্যকথা শুনতে আগ্রহী। কীভাবে এই লেখককে আবিষ্কার করলেন, কীভাবে অনুবাদ শুরু করেছিলেন এবং কত দিন লেগেছিল?
আনিসুজ জামান :
আমাদের লাতিন আমেরিকান বন্ধুমহলে আমরা প্রায়ই কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক একত্রিত হই। সেখানেই প্রথম আদলফো বিয়োয় কাসারেসের নামটা আমার কাছে আসে। কলম্বিয়ার রবার্তো লারা, এর্নেস্তো লুমব্রেরাস, এউহেনিও পার্তিদা—এই তিনজনের মধ্যে ঠিক কে প্রথম আমাকে নামটা বলেছিলেন, এখন আর মনে নেই।
তবে মোরেলের উদ্ভাবন হাতে নেওয়ার পেছনে আরেকটা ব্যাপার আমাকে খুব আকর্ষণ করেছিল। বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন বোর্হেস, আর প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদের ছবিটি এঁকেছিলেন বোর্হেসের বোন নোরাহ বোর্হেস। এই দুটো বিষয়ই আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বন্ধুর কথায় বইটা পড়তে শুরু করি। পড়তে পড়তেই অনুবাদের ইচ্ছাটা আসে। আগেই বলেছি, আমি সাধারণত কোনো বই পুরোটা পড়ে তারপর অনুবাদ শুরু করি না। পড়তে পড়তেই অনুবাদের ভেতরে ঢুকে যাই। মোরেলের উদ্ভাবন-এর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। অনুবাদটা শেষ করতে খুব সম্ভবত এক বছরের কাছাকাছি সময় লেগেছিল।
স্বকৃত নোমান :
হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো’ উপন্যাসটি আপনি অনুবাদ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আপনার আগে অনুবাদ করেছেন। আপনার অনুবাদটির বিশেষত্ব কী?
আনিসুজ জামান :
মানবেন্দ্র আমাদের গুরু। এটা দিয়েই আমি শুরু করব। তাঁর হাত ধরেই আমাদের অনেকের লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়। কাজেই মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনুবাদ করার পরও কেন আমাকে পেদ্রো পারামো অনুবাদ করতে হলো, তার পেছনে একটা গল্প আছে।
আমার বন্ধু, পেদ্রো পারামোর রচয়িতা হুয়ান রুলফোর ছেলে পাবলো রুলফো, আমাকে বারবার অনুরোধ করেছিল বইটা বাংলায় অনুবাদ করতে। প্রথমবার আমি মানবেন্দ্রর অনুবাদের কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, বাংলায় তো অনুবাদ আছেই, আমি আবার করব কেন? আমি না করে দিয়েছিলাম।
দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার পর সে আবার একই কথা বলল। আমিও একই উত্তর দিলাম। তখন পাবলো আমাকে জিজ্ঞেস করল, “মানবেন্দ্র কি স্প্যানিশ জানতেন?”
আমি বললাম, “আমার জানামতে না।”
তখন সে বলল, “পেদ্রো পারামোর সঠিক ইংরেজি অনুবাদ হয়নি। মানবেন্দ্র যদি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে থাকেন, তাহলে সেই অনুবাদও সঠিক হওয়ার কথা নয়।”
এই কথাটাই আমাকে শেষ পর্যন্ত পেদ্রো পারামো অনুবাদে হাত দিতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তীকালে আমি মানবেন্দ্রর অনুবাদের সঙ্গে আমার অনুবাদ মিলিয়ে দেখেছি। কোথায় কোথায় পার্থক্য হয়েছে, তার কিছুটা আমার বইয়ের ভূমিকাতেও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
এর অর্থ এই নয় যে আমি বলছি মানবেন্দ্রর অনুবাদ খারাপ। একেবারেই তা নয়। আমি শুধু বলব, আমার পেদ্রো পারামোর ভূমিকাটা পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন, মানবেন্দ্রর অনুবাদ থাকার পরও কেন আমার আবার বইটা অনুবাদ করার প্রয়োজন হয়েছিল।
স্বকৃত নোমান :
কলম্বিয়ার সেরা দশটি গল্পের বাংলা অনুবাদ করেছেন আপনি। ‘কলোম্বিয়ার সেরা দশ গল্প : গাবোর দেশে গাবোর পরে’ নামে বইটি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই গল্পগুলো আপনি কীভাবে নির্বাচন করেছিলেন? নিজেই করেছেন, নাকি কারো সহায়তা নিয়েছিলেন? আপনার কি মনে হয়েছে এই দশজনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেউ বাদ পড়েছে?
আনিসুজ জামান :
‘কলম্বিয়ার সেরা দশ গল্প’ কথাটা পরে যোগ করেছেন আমাদের প্রকাশক। আমার বইটির নাম ছিল গাবোর দেশে গাবোর পরে। কলম্বিয়ার সাহিত্য নিয়ে আমার যতটুকু পড়াশোনা, সেখান থেকেই আমার ভালো লাগার গল্পগুলো নির্বাচন করে অনুবাদ করেছি। নির্বাচনটা আমারই। আর একটা বিষয় আমি সচেতনভাবে রেখেছিলাম—আমি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের নিয়েছি। তাঁর আগের প্রজন্মের কাউকে নিইনি। সেই কারণেই বইটির নাম দিয়েছিলাম গাবোর দেশে গাবোর পরে।
আমাদের প্রকাশকের ‘সেরা দশ’ নামে একটি সিরিজ ছিল। সম্ভবত সেই সিরিজের সঙ্গে মিলিয়েই পরে তিনি কলম্বিয়ার সেরা দশ গল্প কথাটা যোগ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ কেউ বাদ পড়েই থাকতে পারেন, কারণ আমার পঠন তো অত বিস্তৃত নয়।
স্বকৃত নোমান :
হুয়ান কার্লোস ওনেত্তির ‘কুয়ো’, মারিও বার্গাস ইয়োসার ‘বিমাতার গুণগান’, আলেহো কার্পেন্তিয়রের ‘এ জগতের রাজত্ব’ আনহেলেস মাস্ত্রেত্তার ‘পরানটাকে উপড়ে নাও’—এসব গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস আপনি অনুবাদ করেছেন। এই যাবৎ আপনি যে কটি বই অনুবাদ করেছেন, কোনটি আপনি সেরা মনে করেন?
আনিসুজ জামান :
এযাবৎ আমি প্রায় একুশটি বই অনুবাদ করেছি। এর মধ্যে অনেকগুলোই প্রকাশ করতে পারিনি, কারণ এখনো অনুবাদের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। এর মধ্যে কোনটাকে সেরা বলব? কোনোটাকেই সেরা বলব না। কোনোটাই আরেকটার চেয়ে কম নয়। প্রত্যেকটাই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। একেকটা বই আমার কাছে একেকভাবে ধরা দিয়েছে। আর সেই ভালো লাগা থেকেই আমি বইগুলো অনুবাদ করেছি।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদ করার পর আপনি কি কোনো এডিটরকে দিয়ে এডিট করিয়ে থাকেন? আসলে সম্পাদনার প্রয়োজন কতটা? ধরুন আপনি একটি গল্প লিখলেন বা কোনো একটি গল্প অনুবাদ করলেন। সেটা এডিটরকে দিয়ে এডিট করাতে হবে কেন? লেখক বা অনুবাদক হিসেবে এডিটের সক্ষমতাও কি আপনি রাখেন না? নাকি এখানে সক্ষমতা বা অক্ষমতার কোনো প্রশ্ন নেই। বিস্তারিত বলবেন প্লিজ।
আনিসুজ জামান :
অনুবাদের পর সম্পাদনা করতে হয় কি না, কিংবা একজন লেখকের নিজের লেখা সম্পাদনার ক্ষমতা আছে কি না—এ নিয়ে অনেক কথা, অনেক তত্ত্ব আছে। আমি সংক্ষেপে বলি।
আমি যখন বাংলা থেকে স্প্যানিশে অনুবাদ করি, তখন অবশ্যই আমার একজন নয়, দুজন-তিনজন এডিটরের প্রয়োজন হয়। কারণ স্প্যানিশ আমার মাতৃভাষা নয়। একই কারণে আমি যখন সরাসরি স্প্যানিশে উপন্যাস লিখি, তখনও এডিটরের প্রয়োজন হয়, যদিও সেখানে একজন বা দুজনই যথেষ্ট।
বাংলা সাহিত্যে, বাংলাদেশে বা কলকাতায়, ভালো এডিটরের এই সংস্কৃতিটা তেমন গড়ে ওঠেনি। অথচ অধিকাংশ বড় সাহিত্যিকের পেছনেই একজন ভালো এডিটর থাকেন। তিনি বন্ধু হতে পারেন, স্ত্রী হতে পারেন, পেশাদার সম্পাদকও হতে পারেন।
একজন ভালো এডিটরের কাজ লেখকের হয়ে লেখা নয়। কোথায় অতিকথন হচ্ছে, কোথায় আরও কাটতে হবে, কোথায় কিছুটা বাড়ানোর প্রয়োজন—এসব লেখকের সামনে তুলে ধরা। শেষ সিদ্ধান্তটা লেখকেরই।
এটা সক্ষমতা বা অক্ষমতার প্রশ্ন নয়। হাঁস পানিতে থাকে, তাই পানি অনুভব করে না; আমরা বাতাসের মধ্যে থাকি, তাই বাতাস অনুভব করি না। লেখকও দীর্ঘ সময় নিজের লেখার ভেতরে থাকতে থাকতে অনেক কিছু আর দেখতে পান না। একজন ভালো এডিটর সেই জায়গাগুলোই তাঁকে দেখিয়ে দেন। তারপর কী রাখবেন, কী বাদ দেবেন—সিদ্ধান্ত লেখকের।
স্বকৃত নোমান :
কোনো কোনো পাঠক বলে থাকেন যে, অনুবাদকে আপনি মৌলিকের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চান বলে আপনার অনুবাদ একটু জটিল। আসলে অনুবাদকে কি মৌলিকের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হয়? আদর্শ অনুবাদ কী? অনুবাদক হিসেবে আপনার মত জানতে চাই।
আনিসুজ জামান :
আদর্শ অনুবাদ বলতে আসলে কিছু নেই। একেকজন অনুবাদক তাঁর পঠন, তাঁর বোঝাপড়া থেকে একেকভাবে অনুবাদ করবেন, আর পাঠক সেটাকে কীভাবে নেবেন, সেটাও পাঠকের ব্যাপার। তবে আমার নিজের অনুবাদের কথা বলতে পারি। বলা হয়, আমি অনুবাদকে মূলের খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতে চাই বলে আমার অনুবাদ একটু জটিল। কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আগেই বলেছি, অনুবাদ করার সময় আমি দ্বিতীয় লেখক হতে চাই—দ্বিতীয় গাবো, দ্বিতীয় রুলফো হতে চাই।
এর অর্থ কী? আমার প্রথম বিশ্বস্ততা মূল লেখক তাঁর পাঠককে কী বলতে চেয়েছেন, তার প্রতি। দ্বিতীয় বিশ্বস্ততা ফর্মের প্রতি। লেখাটি কীভাবে নির্মিত হয়েছে—হাইকুতে, সনেটে, গল্পে বা উপন্যাসে—সেই আকার ও নির্মাণের প্রতি। তৃতীয় বিশ্বস্ততা তার মিউজিক্যালিটির প্রতি। প্রত্যেকটি টেক্সটেরই নিজস্ব একটা সুর থাকে। সেই সুরটা যতটা সম্ভব ধরে রাখার চেষ্টা করি। চতুর্থ বিশ্বস্ততা শব্দের প্রতি। আগের তিনটি বিশ্বস্ততা ঠিক রেখে যদি মূলের শব্দটাকেও ধরে রাখা যায়, রাখি। না গেলে শব্দ ছেড়ে দিই।
একটা উদাহরণ দিই। নিঃসঙ্গতার এক শ বছর নিয়ে এখানকার স্প্যানিশভাষী পাঠকদের সঙ্গে কথা বললে দেখবেন, অনেকেই বইটা শুরু করেছেন কিন্তু শেষ করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় থাকার পরও অনেকে পুরোটা পড়েননি। কারণ মূল নিঃসঙ্গতার এক শ বছরই সহজ পাঠ নয়। একই কথা পেদ্রো পারামোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বাংলাদেশেও নিঃসঙ্গতার এক শ বছর যত মানুষ কিনেছেন, তাঁদের সবাই যে পুরো বইটা পড়েছেন, তা আমার মনে হয় না। এখন মূল বইটাই যদি পাঠকের কাছে জটিল হয়, আমার অনুবাদ সহজ হয়ে যাবে কীভাবে? আমি যদি সেটাকে সহজ করে দিই, তাহলে তো আমি আর সেই বইটা অনুবাদ করছি না।
এখানে পাঠাভ্যাসেরও একটা ব্যাপার আছে। যে পাঠক কাফকা, বোর্হেস, বেকেট, রুলফো কিংবা অ্যাবসার্ড ও অধিবাস্তবধর্মী সাহিত্য পড়েছেন, তিনি এমন লেখা পড়তে অভ্যস্ত, যেখানে সবকিছু ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয় না, যেখানে কিছু নীরবতা, কিছু ফাঁকও লেখার অংশ। অন্যদিকে যাঁদের পাঠাভ্যাস মূলত সরল, ঘটনানির্ভর কাহিনিতে গড়ে উঠেছে, তাঁদের কাছে এই ধরনের লেখা স্বাভাবিকভাবেই জটিল মনে হতে পারে। সেই পাঠকের কাছে আমার অনুবাদও জটিল লাগবে।
অন্য অনুবাদক অন্যভাবে অনুবাদ করবেন। কোনটা আদর্শ, সেই রায় আমি দিতে চাই না। মূল লেখা জটিল হলে আমার অনুবাদও জটিল হবে। মূল লেখা যদি তরতরিয়ে এগিয়ে যায়, আমার অনুবাদও তরতরিয়ে এগিয়ে যাবে। অন্তত আমার চেষ্টা সেটাই। কতটা করতে পেরেছি, সেই বিচার পাঠকের।
স্বকৃত নোমান :
আপনি কি মনে করেন বিদেশি সাহিত্য অনুবাদের জন্য বাংলা ভাষার ওপর ভালো দখল থাকা চাই? বাংলা ভাষার ওপর আপনার ভালো দখল আছে বলে কি আপনি মনে করেন?
আনিসুজ জামান :
অবশ্যই বিদেশি সাহিত্য অনুবাদের জন্য বাংলা ভাষার ওপর ভালো দখল থাকতে হবে। আমার বাংলা ভাষার ওপর ভালো দখল আছে কি না, সেটা আমার অনুবাদই বলবে। আমি নিজে বলব না।
স্বকৃত নোমান :
বাংলা ভাষার উপন্যাসকে স্প্যানিশে অনুবাদের মধ্য দিয়ে আপনি বাংলা সাহিত্যকে স্প্যানিশ পাঠকদের কাছে নিয়ে গেছেন—এটা নিঃসন্দেহে বড় কাজ। প্রশংসনীয় কাজ। আপনি অনুবাদ করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’, মাহমুদুল হকের ‘কালো বরফ’ এবং বাংলাভাষার গল্প নিয়ে ‘নির্বাচিত গল্প।’ এসব অনুবাদ করার জন্য কীসে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছিল? বাংলা ভাষার আরও গুরুত্বপূর্ণ লেখক তো ছিলেন, যাদের বই অনুবাদ করতে পারতেন। অনুবাদের জন্য এদের উপন্যাস নির্বাচনের কারণ?
আনিসুজ জামান :
আপনি বলছেন, বাংলা ভাষার আরও গুরুত্বপূর্ণ লেখক তো ছিলেন। এই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কথাটাতেই আমার একটু আপত্তি আছে। শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, পৃথিবীর প্রায় সব সাহিত্যেই একজন লেখককে আরেকজনের পাশে দাঁড় করিয়ে কে বড়, কে ছোট, কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এই বিচার করার একটা প্রবণতা আছে। আমি সাহিত্যকে সেভাবে দেখি না।
সব লেখা সাহিত্য নয়, সব শিল্পও নিশ্চয়ই সমান নয়। কিন্তু একজন শিল্পীকে আরেকজন শিল্পীর সঙ্গে দাঁড় করিয়ে কে শ্রেষ্ঠ, কে দ্বিতীয়, কে তৃতীয়—এই ক্রম তৈরি করার কোনো অর্থ আমি দেখি না। একজন শিল্পীর কাজ তাঁর নিজস্ব শিল্প সৃষ্টি করা। আর আমরা যারা পাঠক, আমাদের কাজ সেই শিল্পকে উপভোগ করা।
আমার নিজের পাঠ খুবই সংক্ষিপ্ত, খুবই সীমিত। সেই স্বল্প পাঠের মধ্য দিয়ে যে বইগুলো আমাকে টেনেছে, যে বইগুলো আমার ভালো লেগেছে, অনুবাদের জন্য আমি সেগুলোকেই নির্বাচন করেছি। আমি কি অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করতে যাব, কোন লেখক গুরুত্বপূর্ণ আর কোন লেখক গুরুত্বপূর্ণ নন? অন্যের কাছে যিনি গুরুত্বপূর্ণ, আমার কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারেন। আবার আমার কাছে যিনি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যের কাছে তিনি নাও হতে পারেন। তাই নয় কি?
স্বকৃত নোমান :
তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। আচ্ছা, এসব উপন্যাস বা গল্পগুলো অনুবাদ করার জন্য কি আপনাকে লেখক বা তাদের উত্তরাধিকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়েছিল? অনুবাদের জন্য কি সম্মানী পরিশোধ করতে হয়েছিল? সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আনিসুজ জামান :
হ্যাঁ, একটা কথা এখানে বলে রাখি। অনুমোদন নিয়ে আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনার কথা বাদ দিলেও, বাইরের জগতে, অন্তত আমি যে ভাষায় অনুবাদ করছি—স্প্যানিশে—অনুমোদন ছাড়া কিছুই প্রকাশ করা হয় না। এমনকি একটি সাধারণ গল্পও নয়।
আজ পর্যন্ত আমি যত কিছু অনুবাদ করেছি, সবকিছুরই অনুমোদন রয়েছে। হয় লেখকের কাছ থেকে, নয়তো তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে, অথবা যাঁদের কাছে সেই রচনার স্বত্ব রয়েছে তাঁদের কাছ থেকে। এমনকি পদ্মানদীর মাঝি তখন পাবলিক ডোমেইনে চলে গিয়েছিল, অর্থাৎ আইনগতভাবে অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজনও ছিল না। তারপরও আমি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি সুকান্তবাবুর কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে রেখেছি। আর এই অনুমোদন নেওয়ার অভিজ্ঞতা একেকজনের সঙ্গে একেক রকম। সব গল্প তো এখানে বলা যাবে না। তাই সেই প্রসঙ্গে আর না যাই।
স্বকৃত নোমান :
আপনি লাতিন সাহিত্যের যে কটি উপন্যাস অনুবাদ করেছেন, সেগুলোর জন্য কি লেখক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন? সেই প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল?
আনিসুজ জামান :
যে বইগুলো পাবলিক ডোমেইনে চলে যায়নি, সেগুলোর সবগুলোরই অনুমোদন নিয়েছি। আগেই বলেছি, অনেক বই অনুবাদ করে রেখেছি, কিন্তু অনুমোদনের অপেক্ষায় এখনো আমার কাছে পড়ে আছে। এই অভিজ্ঞতা শুরু হয়েছিল নিঃসঙ্গতার এক শ বছর দিয়ে। বইটা অনুবাদ করার পর কারমেন বাল্সেলস এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা আমাকে সরাসরি জানিয়ে দিলেন, এই বইয়ের অনুমোদন আমাকে দেওয়া হবে না। আগে মার্কেসের অন্য বই অনুবাদ করে দেখাতে হবে যে আমি এই কাজের উপযুক্ত, তারপর তাঁরা নিঃসঙ্গতার এক শ বছর নিয়ে ভাববেন।
কিন্তু ততদিনে আমি বইটা অনুবাদ করে ফেলেছি। তখন আসলে জানতামও না যে অনুবাদ শুরু করার আগেই অনুমোদনের জন্য যোগাযোগ করার একটা রীতি আছে। তবে একটা কথা এখানে বলি—একটা বই পড়ার পর অনুবাদ তো প্রথমে মাথার ভেতরেই শুরু হয়ে যায়। সেটা কাগজে লিখে রাখার জন্য কারও অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। অনুমোদনের প্রয়োজন হয় যখন আপনি সেটা প্রকাশ করতে যাবেন।
তাঁরা যখন সরাসরি না করে দিলেন, আমার মাথায় জেদ চেপে গেল। সান দিয়েগো থেকে সোজা বার্সেলোনায় তাঁদের অফিসে চলে গেলাম। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন এজেন্সির পরিচালকদের একটা মিটিং চলছিল। আমি প্রায় অযাচিতভাবেই সেই মিটিংয়ে ঢুকে পড়লাম। গিয়ে বললাম, “আমাকে একটা অঙ্ক বলুন। কত চান?”
তাঁরা শেষ পর্যন্ত খুব মোটা একটা অঙ্ক হাঁকলেন। অঙ্কটা এখানে বলছি না। আমি সেখানেই বসে নিজের চেকবই বের করে চেক লিখে দিলাম এবং অনুমোদনটা নিয়ে এলাম। নিশ্চিতভাবেই এই দরাদরিটা সাধারণত প্রকাশক আর এজেন্টের মধ্যে হওয়ার কথা। কিন্তু আমার প্রকাশক এজেন্টকে চিনতেন না, তাঁর পক্ষে এই প্রক্রিয়ায় যাওয়া সম্ভবও ছিল না। তাই আমাকে নিজেকেই কাজটা করতে হয়েছিল।
আবার সম্পূর্ণ উল্টো অভিজ্ঞতাও হয়েছে। আনহেলেস মাস্ত্রেত্তা যখন শুনলেন আমি তাঁর Arráncame la vida অনুবাদ করতে চাই, তিনি শুধু সঙ্গে সঙ্গে বিনা মূল্যে অনুমোদনই দিলেন না, বাংলা সংস্করণের সঙ্গে ছাপার জন্য আমাকে একটি সাক্ষাৎকারও দিলেন। সেখান থেকেই পরে আমাদের বন্ধুত্ব।
আবার হুয়ান রুলফোর ছেলে পাবলো রুলফো আমার বন্ধু। কিন্তু উত্তরসূরি হওয়া সত্ত্বেও আমাকে পেদ্রো পারামো অনুবাদের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। সেই অধিকার ছিল কারমেন বাল্সেলস এজেন্সির হাতে। ফলে সেখানে আবার আমার প্রকাশক এবং এজেন্সির মাঝখানে থেকে অন্যভাবে দরাদরি করে অনুমোদন নিতে হয়েছে।
তাই অনুমোদন নেওয়ার কোনো একটা গল্প নেই। একেকটি বইয়ের অভিজ্ঞতা একেক রকম। কোনোটা খুব সহজে হয়েছে, কোনোটা পেতে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।
স্বকৃত নোমান :
বাংলাদেশে তো বিস্তর গল্প-উপন্যাস অনুবাদ হয়ে থাকে। লেখককে সম্মানী দেওয়া তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে লেখক বা প্রকাশকের কাছ থেকে অনুমতিও নেওয়া হয় না। লেখক জানেনই না যে তার বইটি বাংলায় অনূদিত হয়েছে। আপনি এই ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখেন?
আনিসুজ জামান :
আসলে আগের প্রশ্নের উত্তরেই এ প্রশ্নের উত্তরটাও লুকিয়ে রয়েছে। আপনি নিজেই ভেবে দেখুন, আমি এটাকে কীভাবে দেখি।
স্বকৃত নোমান :
বুঝতে পেরেছি। শুনেছি আপনি কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসটি স্প্যানিশে অনুবাদ শুরু করেছেন। কত দূর এগুলোনে? কবে নাগাদ উপন্যাসটি প্রকাশিত হবে?
আনিসুজ জামান :
খোয়াবনামা খুব সামান্য অংশই অনুবাদ করেছি। তবে পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটা আমি আর অনুবাদ করব না। বরং কোনোদিন সময় পেলে চিলেকোঠার সেপাই অনুবাদ করব। কারণ আগেই বলেছি, আমার যেটা ভালো লাগে, সেটাকেই তো অনুবাদ করি। খোয়াবনামার পরে চিলেকোঠার সেপাই আমার আরও বেশি ভালো লাগতে শুরু করেছে। এছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই।
স্বকৃত নোমান :
‘কাঠুরে কথন’ এবং ‘বেতুল’ আপনার ছোটগল্পের বই। অর্থাৎ পাশাপাশি আপনি ছোটগল্পও লিখছেন। কোনটাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন—অনুবাদে নাকি মৌলিক লেখায়?
আনিসুজ জামান :
শুধু ছোটগল্পই নয়, আমি উপন্যাসও লিখি। এর মধ্যে স্প্যানিশে লেখা আমার একটি উপন্যাস এখানে প্রকাশিত হয়েছে, আর দুটি উপন্যাস প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এখন আমি প্রতিদিন আট-নয় ঘণ্টা লেখালেখি করি। গল্পের কথা আলাদা, কিন্তু আমার উপন্যাসগুলো সাধারণত মাথার ভেতরে লেখা হতে থাকে দশ-পনেরো বছর, কখনো তারও আগে থেকে। ফলে যখন লিখতে বসি, কী লিখব, কতটা লিখব, কীভাবে লিখব—তার অনেকটাই আমার জানা থাকে।
একটানা একই কাজও করি না। কয়েক ঘণ্টা নিজের উপন্যাস লিখি, তারপর সেখান থেকে উঠে অনুবাদে চলে যাই। কিছুক্ষণ অনুবাদ করি, আবার নিজের লেখায় ফিরে আসি। তারপর হয়তো আবার অনুবাদ। একই দিনের মধ্যে এভাবেই মৌলিক লেখা আর অনুবাদের মধ্যে আমার যাতায়াত চলতে থাকে।
আর আপনি যদি আমার গল্প বা উপন্যাস পড়েন, দেখবেন, যে সময়ে যে লেখককে আমি অনুবাদ করছি, তাঁর প্রভাব কোনো না কোনোভাবে আমার মৌলিক লেখার ভেতরেও ঢুকে পড়ছে। সেটা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত, এবং আমার কাছে খুবই স্বাভাবিক।
স্বকৃত নোমান :
অনুবাদক হিসেবে আপনি যতটা পরিচিতি এবং সাফল্য পেয়েছেন, গল্পকার হিসেবে ততটা পাননি—একথা নিশ্চয়ই আপনি মেনে নেবেন। এ নিয়ে আপনার মধ্যে কি কোনো হতাশাবোধ কাজ করে?
আনিসুজ জামান :
আপনার কাছে হয়তো তাই মনে হয়েছে, তবে আমি কথাটা মেনে নিচ্ছি না যে গল্পকার হিসেবে আমি ততটা সাফল্য পাইনি। সাফল্য বলতে অন্যরা কী বোঝেন, আমি ঠিক জানি না। আমি যতটুকু বুঝি, আমার লেখা পড়ে যদি কেউ আমাকে ভালোবাসেন, সেটাই আমার সাফল্য। সেই ভালোবাসা আমি আমার মৌলিক লেখার জন্য যেমন পেয়েছি, অনুবাদের জন্যও তেমনি পেয়েছি।
বাংলাদেশে বা কলকাতায় আমার খুব বেশি যাওয়া হয় না। ফলে সেখানকার পাঠকদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগও আমার কম। সেই তুলনায় মেক্সিকো বা কলম্বিয়ায় পাঠকদের অনেক বেশি কাছে যেতে পেরেছি, তাঁদের ভালোবাসাও অনেক বেশি সরাসরি পেয়েছি। আমার কাছে সেটাই লেখার সাফল্য।
গত কয়েক বছর ধরেই এখানকার বিভিন্ন পাঠচক্র ও সাহিত্যিক আয়োজনে নিয়মিত ডাক পাই। সবগুলোতে যেতেও পারি না, অনেকগুলো ফিরিয়ে দিতে হয়। এই তো আগামী ২৭ অক্টোবর মেক্সিকোর ইউএনএএম (UNAM) থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছি। সেখানে আমার সাহিত্য ও চিন্তাভাবনা নিয়ে কথা বলব। আলোচনায় আমার অনুবাদ করা পদ্মানদীর মাঝি, হাজার বছর ধরে এবং কালো বরফ থাকবে, কিন্তু প্রথম পর্বটাই থাকবে আমার নিজের স্প্যানিশে লেখা উপন্যাস Princesa negra de dos estambres নিয়ে।
তাই গল্পকার হিসেবে সাফল্য পাইনি—কথাটা আমি মেনে নিচ্ছি না। আমি যে পাঠকের ভালোবাসা চেয়েছি, সেটা পেয়েছি। আমার কাছে সাফল্য এটুকুই।
আর হতাশাবোধ? আসলে আমার জীবনে হতাশাবোধের কোনো জায়গা নেই। শুধু সাহিত্যেই নয়, কোনো কিছুতেই আমি হতাশাবোধ করি না।
স্বকৃত নোমান :
আপনার কি মনে হয় প্রবাসে না থেকে দেশে থাকলে মৌলিক লেখালেখিতে আপনি আরও ভালো করতেন?
আনিসুজ জামান :
যেহেতু ব্যাপারটা ঘটেনি, সেহেতু কী হলে কী হতো, সেটা আসলে জানার কোনো উপায় নেই। দেশে থাকলে আমি লেখালেখিই করতাম কি না, সেটাও তো বলা যায় না। তাই না? সবটাই অনিশ্চিত।
স্বকৃত নোমান :
আপনি একজন ব্যবসায়ী। প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয় ব্যবসার পেছনে। সেক্ষেত্রে লেখালেখি কখন করেন? দিনের কোন সময়টায়? ব্যবসা ও লেখালেখি কীভাবে সমন্বয় করে থাকেন?
আনিসুজ জামান :
আপনি আমাকে ব্যবসায়ী বলছেন, অনেক ধন্যবাদ। তবে সেই অর্থে আমি কখনোই নিজেকে ব্যবসায়ী মনে করিনি। ওটা ছিল আমার পেশা, বলতে পারেন আমি চাকরি করতাম। যখন নিঃসঙ্গতার এক শ বছর অনুবাদ করেছি, তখন ভোর চারটায় উঠতাম। এক ঘণ্টা গলা সাধতাম, তারপর ব্যায়াম করতাম। এরপর দুই ঘণ্টা পেশার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে লিখতে বসতাম। লেখালেখি শেষ করে আবার আরও দুই ঘণ্টা কাজ করতাম। এভাবেই দীর্ঘদিন দুটোকে পাশাপাশি চালিয়েছি।
এখন অবশ্য লেখার জন্য অনেক কিছুই ত্যাগ করেছি। গলফ খেলা ছেড়েছি, টেবিল টেনিস ছেড়েছি, গান ছেড়েছি। এমনকি চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছি। এই সবকিছুই ছেড়েছি শুধু লেখার জন্য, লেখাকে আরও বেশি সময় দেওয়ার জন্য। এখন আমার সময়ের সবচেয়ে বড় অংশটাই লেখালেখির।
স্বকৃত নোমান :
বাংলাদেশ থেকে যেসব অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর জন্য এবং স্প্যানিশে যেসব অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে—সেগুলোর জন্য প্রকাশকরা কি নিয়মিত সম্মানী দিচ্ছে আপনাকে? কোথা থেকে সম্মানী বেশি পাচ্ছেন?
আনিসুজ জামান :
দুঃখিত, এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে আমি অপারগ। তবে এটুকু বলতে পারি, বাংলাদেশের বাইরে আমার যত বই প্রকাশিত হয়েছে, প্রত্যেকটির সম্মানী প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমার অ্যাকাউন্টে এসে জমা হয়।
স্বকৃত নোমান :
আগামী দিনে কী নিয়ে কাজ করবেন? অর্থাৎ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আনিসুজ জামান :
সবসময়ই তো কাজ করছি। এখন উল্কাপাত নামে একটি উপন্যাস লিখছি, স্প্যানিশে। অন্যদিকে এলেনা গার্রোর আগামী দিনের স্মৃতি স্প্যানিশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করছি। বাংলা থেকে স্প্যানিশে পাঁচ পুরুষ অনুবাদ কেবল শেষ করলাম। আর একটি কাজ আগামী বছরের মধ্যে শেষ করতেই হবে—La maestra y el Nobel। গাবোর জন্মশতবর্ষ সামনে, সেই শতবর্ষকে সামনে রেখেই বইটির বাংলা অনুবাদ শেষ করতে চাই।
এরপর হয়তো কাঁদো নদী কাঁদো ধরব। তবে সেটার অনুমোদন কতটুকু পাওয়া যাবে, কীভাবে পাওয়া যাবে, এখন সেই অপেক্ষায় আছি। এর মধ্যেই গত দুদিনে দুটো গল্প লিখেছি। এভাবেই তো চলছে।
আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা? আমি আসলে ভবিষ্যতে বাঁচি না, আমি আজকের দিনে বাঁচি। এখন কী করছি, সেটা বলতে পারি। ভবিষ্যৎ নিজেই ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করবে। আমার চাওয়া শুধু এটুকুই—যতদিন বেঁচে থাকি, যেন এই লেখালেখি নিয়েই বেঁচে থাকতে পারি।
স্বকৃত নোমান :
দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য গল্পপাঠের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
আনিসুজ জামান :
আমার মতো নগণ্য একজন মানুষের এত দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়া কি ঠিক হলো? তবে আপনাদের ব্যাপার আপনারাই ঠিক করবেন। আর পাঠক পড়বেন কি পড়বেন না, সেটাও পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি। আপনাকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। গল্পপাঠ এবং সারা বিশ্বের সমস্ত পাঠককুলকে আমার শুভেচ্ছা। সকলে ভালো থাকবেন। ·


0 মন্তব্যসমূহ