বিনোদ দাঁড়িয়ে আছে।
এই পর্যন্ত লিখে দিলীপ রায়ের কলম স্থির হয়ে থাকে।
মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের গল্প এইভাবে শুরু হয়েছে। তারপর কাগজে আর কোন দাগ পড়েনি। লেখা বন্ধ করে তিনি বসে আছেন। প্রথম দুলাইন কেন লেখা হয়েছে, জানা নেই। এর পরের লাইনে কি লেখা হবে, তা-ও জানা নেই। শুধু বোঝা যায়, দিলীপ রায় গল্প লিখতে গিয়ে থেমে গেছেন। গল্পের চরিত্রের নাম বিনোদ। বিনোদকে নিয়ে কিছুতেই গল্প তৈরী করা যাচ্ছে না। তার চরিত্রের গতিপ্রকৃতির খবর বিনোদকে নিয়ে গল্প লেখার দায়িত্ব মৃণাল প্রথম থেকেই জানেন না। বিনোদকে নিয়ে গল্প লেখার দায়িত্ব দিলীপ রায়ের। দিলীপের ওপর নির্ভর করে মৃণাল লিখে যেতে চান। কিন্তু কার কাছ থেকে দিলীপের মারফৎ মৃণাল নিজের কথা বলে যাওয়ার অধিকার পেয়েছেন? এইভাবে কি মৃণালের মানসিকতা থেকে বিনোদের চরিত্র কিছু দূরে সরে দাঁড়াতে পারবে?
আমি নিজেকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করি। জানি আমাকে লিখে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত অবধারিতভাবে বিনোদকে নিয়ে গল্প তৈরী হবে। অথচ গল্পের শুরুতেই কোন কিছু মনোমত হয় না। কতদিন আগে প্রথম দুলাইন লেখা হয়েছিল, তারপর আর কোন শব্দ মাথায় ভেসে আসেনি। গল্প কিভাবে এগোবে, বোঝা যায় নি। লিখতে না পারার জন্য যে কোন অসুবিধা হচ্ছে, তা নয়। প্রতিদিন যেসব কাজ করতে হয়, সেইসব কাজ করে প্রতিদিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লেখা বন্ধ থাকার জন্য চারপাশের কোন কিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। সব কাজ ঠিক ঠিকভাবে এগিয়ে চলেছে। কেবল প্রতিদিন অভ্যাসমাফিক মনে পড়ে, আমার ঘরে আমার কলম আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
তখন সমস্ত কাজ ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা হয়, নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে কাগজ কলমের সঙ্গে বোঝাপড়া সেরে নিতে ইচ্ছা করে শুধু নিজের চিন্তাভাবনা কাগজের ওপর ফুটে উঠতে চায়। অথচ তাদের প্রকাশ করবার জন্য কোন রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না, এলোমেলো রুক্ষুসুক্ষু কিছু শব্দতরঙ্গ বারবার আমাকে ধাক্কা দেয়, তোলপাড় করে।
এই অসহায় অবস্থাকে মৃণাল লেখার ভিতর ব্যবহার করতে চাইছেন। দিলীপ রায়কে তিনি এই সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করাবেন। দিলীপ বিনোদকে অবলম্বন করে কিভাবে গল্প গড়ে তুলতে পারেন, তাই নিয়ে মৃণাল লিখতে শুরু করবেন। কিন্তু এই রকম গল্প লেখার গল্পও তো অনেক লেখা হয়েছে। সেই সব লেখকদেরও কি এমন সংশয়ের মধ্যে পড়তে হয়েছিল? প্রথম থেকেই কি তাঁরা নিজেদের গল্পের ছক সম্বন্ধে সচেতন হয়ে থাকতেন? মৃণাল তো এখনও জানতে পারেননি, তাঁর লেখা তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবে!
বিনোদের বিশেষত্ব সম্বন্ধে আমার কিছু জানা নেই। তার কাছে কোন বিশেষ পরিচয়পত্র নেই। মনে রাখবার মত কোনো অভিজ্ঞতাও নেই। বিনোদের কোন চিন্তাভাবনাকে কেন্দ্র করে গল্প লেখা যায়, বুঝতে পারি না। আমিও কি মৃণালের কাছ থেকে এই অসহায়তা ধার করে পেয়েছি? মানুষের চরিত্রের নানাদিক দিয়ে গল্প লেখা হয়েছে, বিনোদের চরিত্রও কি সেই সব গল্পের উপাদান থেকে ধার করে নিতে হবে? আমার নিজের মতামত কি সব সময় অন্য দশজনের মতামত থেকেই তৈরী হবে? আমার কিছু সুখ দুঃখ আছে, প্রতি সুখ দুঃখের কিছু নির্দিষ্ট ছক আছে, এমন কি নির্দিষ্ট সময়ে প্রেমিকার পাশে বসে কখনো কখনো মনে হয়েছে, এইরকম রূপসীর সঙ্গে অন্য কারো তুলনা হয় না। এই ধারণাও কি অন্যান্য প্রেমিকদের আবহমান অনুভূতি থেকে এসেছে? এই ধারণার ওপর সন্দেহও হয়ত অন্যান্য সন্দিগ্ধদের কাছ থেকে পাওয়া। একের পর এক সংশয় সকল সময় আমার সামনে এসে জড়ো হয়, তাদের কাউকে অবহেলা করা যায় না। তারা দুধকলা গেয়ে বড় হয়। আরো বড়। আরো অবিশ্বাস জেগে ওঠে।
মৃণাল দিলীপকে আরো চিন্তা করবার জন্য উৎসাহ দেন। চিন্তা করবার সুযোগে মৃণাল প্রতিটি সন্দেহের বিষয় আরো পরিষ্কারভাবে জানতে পারেন। চিন্তা করবার জন্য মৃণালের সময় লাগে। সময়ের অভাবে লেখাপত্র বন্ধ থাকে। খাতাকলমের ওপর ধূলো জমে। দিলীপ মৃণাল কেউ সেসব ছুঁয়েও দেখে না। খাতাকলমে বিনোদ দাড়িয়ে থাকে। কোন কাজের জন্য কোন দায়িত্বের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অধীর হয়ে ওঠে। বিরক্তি আসে। তাকে ঘিরে কোন ঘটনা ঘটে না। দিলীপ রায়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীনে তাকে থাকতে হয়। গল্প তৈরী করবার জন্য তাকে কোন নিয়ন্ত্রণক্ষমতা দেওয়া হয় না।
বিনোদের কাছ থেকে মৃণাল দূরে সরে গিয়ে গৌতমগোবিন্দদের কাছে চলে যান। সময় চলে যায়। গৌতম গোবিন্দরা অন্তরঙ্গভাবে তাঁর লেখালেখির খবর জিজ্ঞাসা করে। না লিখতে পারার কারণ জানতে চায়। জেনে নিয়ে কি এরা তাঁকে উদ্ধার করবে? মৃণালের কাছে কোন চটজলদি উত্তর নেই। তিনি দু এক কথায় নিজের সমস্যাকে বুঝিয়ে দেন। সময়ের অভাব। শরীরের ওপর অত্যাচার। এইসব। সবাই বুঝে যায়, সহানুভূতি দেখায়। বিনাদ্বিধায় জানায়, না-লেখার সমস্যা এমন কিছু নতুন নয়, সবাইকেই এই সমস্যা ভোগ করতে হয়েছে, তারপর এক সময় এই সমস্যা থেকে তারা মুক্তও হতে পেরেছেন। মৃণালও নিশ্চয়ই একদিন মুক্ত হবেন। বলতে বলতে গৌতমগোবিন্দরা নিজেদের উদাহরণ দেয়, নিজেদের লেখালেখির কথা বলে। নিজের মতামতকে প্রত্যেকে গুরুত্ব দেয়, প্রত্যেকে নিজের মতামত যাচাই করে, একে অন্যের চোখে নিজের কথার সমর্থন খোঁজে। নিজের সঙ্গে অন্যের কথার মিল হচ্ছে কি না, বুঝতে চায়। গৌতম কথা বলে, গোবিন্দরা কথার ভিতর বাধা দেয় ভুল ধরায় মেনে নেয়। বলে-টলে তারা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে হাইচাপা দেয়, ঠাণ্ডামাথায় সিগারেট ধরায়। কত নিশ্চিন্ত তারা! নিজেরা লেখালেখি করে বলে অন্যের লেখা পত্র নিয়ে আগ্রহ দেখায়। এরা ছাড়া অন্য কেউ তো মৃণালকে লিখবার জন্য মাথার দিব্যি দেয়নি। এদের প্রত্যাশা মাফিক মৃণাল কি লিখবেন? তাহলে কি গৌতমগোবিন্দের কথামত না-লিখতে পারা কোন ব্যক্তিগত সমস্যা নয়? নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লেখা বন্ধ হওয়ার দরকার হয়? মৃণালকেও কি অন্যদের মত না লেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে? অন্যদের সান্ত্বনার কথা শুনতে শুনতে মৃণাল শান্ত হতে পারেন না। দপ করে জ্বলে উঠতে পারেন না।
জ্বলে ওঠা যায় না অফিসে। জীবনধারণের জন্য মৃণালকে প্রতিদিন ছ-সাত ঘণ্টা একটি সরকারী কর্মসংস্থায় যোগদান করতে হয়। রাম-বলরামবাবুদের সঙ্গে মিশে মুখ বুজে বাঁধা কাজ করে যেতে হয়, কাজে ফাঁকি মারবার সুযোগ খুঁজতে হয়। তখন মৃণাল রামবলরামের একজন হয়ে যান। কিছুতেই চেষ্টা করে নিজেকে আলাদা ভাবতে পারেন না। অফিসে থাকাকালীন তাদের কথাবার্তা চালচলন থেকে নিজেকে ছিঁড়ে নিতে পারেন না। মৃণালের উপরওয়ালা সবাইকে সন্দেহের চোষে দেখেন। কে কতখানি কাজে ফাঁকি দেয়, হিসাব কষে দেখান। মৃণালের কাজে সব থেকে বেশি ভুলত্রুটি ধরা পড়ে। কখনো কখনো তাঁর কথাবার্তায় উপরওয়ালার উপর তাচ্ছিল্যের সুর ধরা পড়ে। উপর-ওয়ালার কথাবার্তাতেও একই পরিমাণ তাচ্ছিল্য আসে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না। কাজের ছুতো ধরে দুজনের মধ্যে রেষারেষি শুরু হয়। মৃণালকে প্রতিবার হেরে যেতে হয়। বাঁধাধরা প্রতিদিনের ভিতর কিছু ওলোটপালোট হয়। করণিক রামবলরামবাবুরা উপদেশ দেন, নিজেদের কর্মজীবনের গল্প শোনান। সব কিছু মেনে নিতে বলেন।
মৃণালের রাগের জন্য কারো কিছু যায় আসে না। তিনি এই রকম চাকরী করে সুখ পান না। এইরকম ঝগড়া করে। উপরওয়ালার নীল গাড়ির নম্বর ডব্লিউ এম সি দুই ছয় সাত চার। মাঝে মাঝে মৃণাল ঐ গাড়িকে রাস্তার মাঝখানে চুরমার করে দেন। গাড়ির সাজানো নম্বর নয় ছয় হয়ে যায়, গাড়ির মালিকের বুকে স্টিয়ারিং বিধে যায়। কিন্তু অফিসের কাজ বসে থাকে না। দেরী হয়ে যায়। মৃণাল রাগ তুলে নিয়ে সবকিছু ক্ষমা করে দেন। দুজনকে আবার মিলেমিশে কাজ করতে হয়। পরদিন ডব্লিউ এম সি দুই ছয় সাত চার তাঁকে একটা লিফট দেয়।
জ্বলে ওঠা যায় না রাসবিহারীতে। গাড়ির পর গাড়ি চলে যায়, দোকানের পর দোকান সাজানো থাকে, মানুষের পর মানুষ নিশ্চিন্তে ভিড় করে। ভিড়ের ভিতর তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ভিড় দেখলে তাদের গায়ে জ্বর আসে। হাজার অসুবিধা মেনে নিয়ে তারা ভিড় করে। সারাদিন নির্বিবাদে কাটানোর পরে সন্ধ্যাবেলা রাসবিহারীতে দাঁড়িয়ে সমস্ত ভিড়ের ওপর, সমস্ত শব্দের ওপর ঘৃণা উঠে আসে। ঘৃণার কোন কারণ থাকে না, কোন উদ্দেশ্য থাকে না, হেঁটমুণ্ডে কার্য-কারণের পিছনে সারাদিন কেটেছে। আরো দিন কাটবে। লেখা বন্ধ হয়ে থাকবে। কর্মব্যস্ত মানুষদের ভিড়ে একা অক্ষম দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এই অবস্থার জন্য কাউকে দায়ী করা যাবে না। নিজের পিছনে গোয়েন্দা হয়ে দিলীপ বসুরা দাঁড়িয়ে থাকবে।
ফিরে আসা। ফিরে আসতে হয় মৃণালের পাশে। দিলীপের পাশে। বিনোদের পাশে। যে কোন জায়গায় খেয়ালখুশিমত দাঁড়ানো যায় না, তাই আমাদের বিনোদকে রাস্তার পাশে দাঁড়াতে হয়েছে। তার চারপাশে আরো অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ভিড় আছে, শব্দ আছে। এখানের বাড়ি ঘরের চেহারা চেনা, চেনা দোকানপাট। এই চেনা রাস্তার নাম রাসবিহারী। এখানে বিনোদকে দাড় করানোর পিছনে নিশ্চয়ই কোন যুক্তি আছে। হয়ত বাসের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে না থেকে সে তো হেঁটে চলে যেতে পারত। হয়ত ওর প্রেমিকা আসবে। এলে দিলীপ ছাড়া আর কারো অসুবিধা নেই। কিন্তু দিলীপকে কে বলেছে যে বিনোদের প্রেমিকা এখানে আসবে? তবে কোন জরুরী দরকারে এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কি দরকার? বিশ্বাস-যোগ্য কোন যুক্তি দেখাতে হবে, অকারণে কেউ নিশ্চয়ই এই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে না। এইভাবে যে কোন কার্যকারণের ছিদ্র ধরে বিনা আয়াসে গল্পের শরীরে ঢুকে যাওয়া যায়। তারপর বেলুন ফুলে-ফেঁপে উঠবে। পাতার পর পাতায় ছড়িয়ে থাকবে বিনোদ চরিত্রের বিশেষ কোন অভিজ্ঞতার বর্ণনা। পাঠকের উপভোগ্য গল্প সমালোচকের উপভোগ্য খোরাক। ভোগ্যপণ্য তৈরীর জন্য চাই প্রস্তুতি। চাই কল্পনাশক্তি। চাই বাস্তববোধ। চাই আশ্লেষণ, বিশ্লেষণ। চাই মুক্ত বায়ু, পরমায়ু। চাই যথাযথ পরিবেশ। চাই উপযুক্ত শব্দ। কিন্তু এই পরিবেশ তো অভ্যস্ত পরিবেশ। এই পরিবেশে তো শব্দেরা বারবার উপযুক্তভাবে উচ্ছিষ্ট হয়েছে। এখন কিভাবে তাদের প্রয়োগ করা যায়?
অপেক্ষা করতে করতে বিনোদের বিরক্তি আসে। রাগ হয়। ভিড়ের ভিতর একভাবে দাঁড়িয়ে শাস্তি পেতে হচ্ছে। শেষ বারের মত গল্প তৈরীর চেষ্টা করতে হবে। বিনোদ রেগে উঠবে। নিজের ইচ্ছামত গল্প গড়বে। তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দিলীপের রাগ হয়। মৃণালের। বিনোদের দিকে তাকিয়ে। নিজের দিকে তাকিয়ে। লেখা যায় না। বিনোদের মধ্যে কতখানি রাগ ঢোকানো যায়? রাগের সময় নিজেকে কিরকম লাগে, কোন কোন ইচ্ছা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, কতখানি উত্তেজনা জড়ো হয়, বুঝতে পারি না। আমার সন্দেহ হয় লিখবার সময় এই সব অনুভূতি খাঁটি হতে পারবে কি না। কিভাবে আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা কাগজের ওপর নিখুঁত চেহারা নেবে, জানি না। আমি অনেকদিন রাগ টের পাইনি। বিনোদের রাগ প্রকাশ পায় না, ভোঁতা রাগ কুরে কুরে খায়, কার ওপর রাগ নিয়ে বিনোদ দাঁড়িয়ে থাকে?
সামনে সাদা কাগজ পড়ে আছে, প্রতিপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লেখা শেষ করবার জেদ চলে যায়। নিঃশ্বাস ফেলে সিগারেট ধরাতে হয়। সিগারেটের পর সিগারেট শেষ হয়। দিনের পর দিন। সিগারেট ধরে থাকতে থাকতে আঙ্গুলের ফাঁকে ঘা হয়ে যায়। চা খেতে যেতে কাপের কিনারায় ঠোঁটের দাগ ফুটে ওঠে। বালিশে মরা তুলো গিজগিজ করে। কলমে আঙ্গুলের ছাপ বসে গেছে। বইপত্রে ধূলো পড়ে। ক্ষয়ে যায়। এখান থেকে মৃণাল বেরিয়ে আসতে পারেন না। দিলীপ পারেন না। এখান থেকে অনেক দূরে রাসবিহারীতে বিনোদ দাঁড়িয়ে থাকেন।
এরপরের পর্যায়ে বিনোদকে নড়েচড়ে উঠতে দেখা যায়, কারো ওপর ভরসা না করে সে নিজেই সক্রিয় ভূমিকায় অংশ গ্রহণ করে। কতক্ষণ আর সে অন্যের হাতের পুতুল হয়ে থাকবে? নিজের দায়িত্বে সে পরবর্তী অংশ তৈরী করে।
নির্দেশমত রাসবিহারী ফাঁকা হয়ে যায়। সুনসান রাস্তা। গাড়ি-ঘোড়া তুলে নেওয়া হয়। সকল মানুষ শূন্যে অদৃশ্য। সকল শব্দ বন্ধ করা হয়। চারদিকে কেবল উঁচু উঁচু বাড়ি খার বাড়িদের উঁচুতে সন্ধ্যাবেলার আকাশ, সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় রাসবিহারীর ব্যস্ততা উধাও হয়ে গেছে। একা বিনোদ ফুটপাথে। রাস্তায় দাঁড়ানো বিপজ্জনক, যে কোন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এতক্ষণে চোখে পড়ে, দূর থেকে নির্দিষ্ট নীল গাড়ি এই দিকে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে। বিনোদ নিঃশ্বাস বন্ধ করে, মোড় ঘুরতেই প্রচণ্ড গতিতে রাস্তা ফুড়ে কালো ভ্যান উঠে আসে। প্রচণ্ড গতি। প্রচণ্ড দুই গাড়ি মুখোমুখি হয়। কেউ সামলাতে পারে না। দুই গাড়ি দুই গাড়ির আঘাতে। ঢুকে যায়। শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে যায়। সারা আকাশ কালো হয়ে ওঠে। কাক ডাকে! এত কাক কোথায় ছিল? এত ভিড়? শব্দ? রাসবিহারীতে আবার ভিড় হয়ে গেছে। সকলে ফিরে এসেছে, গাড়িঘোড়া ভিড়ের জন্য অন্য রাস্তায় ঘুরে যাচ্ছে, দৌড়াদৌড়ি করছে কিছু মানুষ। শব্দ। বিনোদের চারদিকে ভিড়। দুটো চাকা গড়াগড়ি খাচ্ছে, কিছু ধোঁয়া ওড়ে। রাস্তা জুড়ে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। নম্বর প্লেট ছিটকে। ভিড়ের চাপ বিনোদের ওপর এসে পড়েছে। এগিয়ে যেতে হচ্ছে, আরো এগিয়ে যেতে যেতে আমার মনে পড়ল। ·
[রচনাকাল : ১৯৮০]

0 মন্তব্যসমূহ