একটি জাতরি রুচিবোধ তার সংস্কৃতরি পরচিায়ক। সাম্প্রতিক সময়ে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ কথাটি প্রাত্যহিক জীবনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল তর্ক-বিতর্ক তরৈি করছে। রুচির দুর্ভিক্ষের উৎস সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার থাকা সত্ত্বেও আমাদের সাংস্কৃতিক মান কেন নিম্নগামী তা গবেষণার বিষয়। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা লাভ। স্বাধীনতা অর্জনের নেপথ্যে কাজ করেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ। ষাটের দশকে সংঘটিত সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রধান প্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর রচিত সাহিত্যে, কবিতায়, গল্পে, গানে ছড়িয়ে আছে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রকৃতি, নদী, বন, শস্য-শ্যামলা ক্ষেত, কিষাণ-কিষাণী। ‘ছিন্নপত্র’ কবির পূর্ববঙ্গ বাসের অবিস্মরণীয় স্মারক। কবির অধিকাংশ সৃষ্টিশীল সময় কেটেছে বাংলাদেশে। রবীন্দ্রনাথের কালে পূর্ববঙ্গ নামে পরিচিত থাকলেও কবি নিজে পূর্ববঙ্গকে বাংলাদেশ নামে উল্লেখ করতেন। কবিরও প্রিয় ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশ। তাঁর সময়ে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (৩০ আশ্বিন ১৩১২ সালে) ব্রিটিশ সরকার যখন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবটি জনসমক্ষে প্রকাশ করে তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় ‘বঙ্গদর্শন’ নামক পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘আগামী ৩০ আশ্বিন (১৩১২) বাংলাদেশ আইনের দ্বারা বিভক্ত হইবে। কিন্তু ঈশ্বর যে বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করেন নাই তাহাই বিশেষ রূপে স্মরণ ও প্রচার করিবার জন্য সেই দিনকে আমরা বাঙালিকে রাখিবন্ধনের দিন করিয়া পরস্পরের হাতে হরিদ্রাবর্ণের সূত্র বাঁধিয়া দিব। রাখিবন্ধন মন্ত্রটি এই, ‘ভাই ভাই, এক ঠাঁই।’
কলকাতায় রাখিবন্ধন উৎসবে রবীন্দ্রনাথ সর্বসাধারণের সাথে মিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের বহু গণমান্য ব্যক্তির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরোধিতায় কলকাতায় সেদিন সে মিছিলে গাওয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গান, ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে.../ মোদের ততই বাঁধন টুটবে।/ওদের যতই আঁখি রক্ত হবে.../ততই মোদের আঁখি ফুটবে।’ কবি প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তাই আরও লিখেছিলেন, ‘নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম’ কিংবা ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি...’। লিখেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধজননী/রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করনি।’
রবীন্দ্রনাথের জীবনাবসানের ছয় বছর পর জন্ম নেয় দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তিক সাম্প্রদায়িত রাষ্ট্র পাকিস্তান। নবীন রাষ্ট্রে শুরু থেকেই বাঙালিরা সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়। বাঙালি বুদ্ধিজীবী লেখকদের একাংশ তখন ধর্মীয় জাতীয়তার মোহে আচ্ছন্ন এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রধান পুরুষ রবীন্দ্রনাথ। তাই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। তাদের মনোভাব খুব স্পষ্ট করে নিজের মুখে স্বীকার করলেন সৈয়দ আলী আহসান। ১৯৫১ সালে তিনি বলেন, ‘নতুন রাষ্ট্রের স্থিতির প্রয়োজনে আমরা আমাদের সাহিত্যে নতুন জীবন ও ভাবধারার প্রকাশ খুঁজব। সেই সঙ্গে এটাও সত্য যে, আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি।’
সাম্প্রদায়িক লেখক বুদ্ধিজীবীগণ শুধু রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেননি, নজরুলেরও মুসলমানীকরণ ঘটিয়ে ছিলেন। নজরুল সাহিত্যে ইসলামী ভাবধারাপুষ্ট অংশটুকু রেখে অবশিষ্ট অংশ তারা বর্জন করলেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বলিষ্ঠ ধারক নজরুলকে খণ্ডিত করলেন তারা।পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী বাঙালিদের উপর প্রথম সাংস্কৃতিক আঘাত হানে বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার হরণ করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে। সেই চেষ্টা রক্তের মূল্যে ব্যর্থ করে দেয় বাঙালিরা। যে বাংলা ভাষাকে ‘হিন্দুর ভাষা’ বলে প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি অপপ্রচার চালিয়েছিল, সেই ভাষার জন্য প্রাণ দেয় মুসলমান ছাত্র-যুবকেরা। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দেয় শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে বাঙালিরা। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর অপতৎপরতা বাঙালিদেরকে নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তীব্রভাবে সচেতন করে তোলে।
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে। ‘হিন্দু কবি’ ও ‘ভারতীয় কবি’র তকমা দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করার আহ্বান জানায় শাসকগোষ্ঠী ও তাদের বাঙালি অনুচর। পাঠ্যপুস্তুক, বেতার ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সঙ্গীত বিসর্জন দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নে বাঙালি শিল্পী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন করার ক্ষেত্রে সরকার নানাভাবে বাধা দেয়। শতবর্ষ উদ্যাপনের আয়োজন মফস্বল শহরগুলোতে শুরু হয়ে গেলেও ঢাকায় কিছুটা দেরিতেই এই প্রস্তুতি আরম্ভ হয়। প্রথমদিকে ঢাকা শহরে তিনটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তবে পরে এই তিনটি কমিটি চার দিনের একটি যৌথ কর্মসূচি প্রণয়ন করে। ২৫শে বৈশাখ দুটি নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ এবং ‘চণ্ডালিকা’ মঞ্চস্থ হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে। এ সময়ে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় রবীন্দ্রনাথের বিরোধীরা অতিমাত্রায় সোচ্চার হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ওপর শাসকগোষ্ঠী ধর্মীয় অজুহাতে যত খড়গহস্ত হয়ে উঠতে থাকে, রবীন্দ্রপ্রেমী উদার ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের রবীন্দ্রচর্চা ততই বাড়তে থাকে। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অন্তরে জায়গা করে নিতে থাকেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বলয় থেকে রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের কবি হয়ে ওঠেন। কবির ভেতরে বাঙালি জাতি একটি উদার সংস্কৃতির জগৎ আবিষ্কার করে। রবীন্দ্রনাথকে পণ্ডিত এবং বুদ্ধিজীবী সমাজের গণ্ডির মধ্য থেকে বের করে নিয়ে এসে বাঙালির প্রতিদিনের প্রতিবাদমুখর কর্মযজ্ঞের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্থাপন করে।
১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় রবীন্দ্রচেতনায় জাগ্রত এক নতুন বাঙালি সমাজের অভ্যুদয় ঘটে। দেশের তিনটি প্রধান সংবাদপত্র একই দিনে প্রথম পৃষ্ঠায় ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক সম্পাদকীয় ছাপার মধ্য দিয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধ করার ডাক দেয় এবং সেই ডাক ১৯৪৭ সালের পর প্রথমবারের মতো বাঙালির ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়। এই প্রতিরোধের অগ্রসৈনিক ছিল রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্মের সংস্কৃতিকর্মীরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক কর্মীরাও সহিংসতা প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলেন। দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে গিয়ে আমীর হোসেন চৌধুরী নামে একজন সংস্কৃতিকর্মী প্রাণ বিসর্জন দেন। এই নতুন মানসিকতার কর্মীদের সাহসী প্রতিরোধের মুখে দাঙ্গা বন্ধ হয়ে যায়। বাঙালি যে মূল্যবোধগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধের মতো এক বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করেছিল তার প্রধানতম ধারা ছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এই চেতনাই আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণভোমরা।হাজার বছরের এই অসাম্প্রদায়িকতার সাধনা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-সৃষ্ট হিন্দু-মুসলিম বিরোধের কারণে, সেই মূঢ়তা ভেদ করে অসাম্প্রদায়িকতা হয়ে উঠল তার মুক্তিযুুদ্ধের হাতিয়ার। বাঙালির সেই অসাম্প্রদায়িকতার পুনর্জাগরণ ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথ তথা সাংস্কৃতকি চতেনাকে অবলম্বন করেই।
রবীন্দ্রনাথ যে সকল প্রকার অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন, রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনায় প্রাগ্রসর ছিলেন, তা ক্রমশ সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হতে থাকে। আর এভাবেই বাংলাদেশের এবং বাঙালির কবির হয়ে উঠতে থাকেন রবীন্দ্রনাথ বিতর্কের বেড়াজাল ভেদ করে। যারা বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সংস্কৃতির ক্ষেত্র বিকাশে নিরলস চেষ্টা করেছেন, তাদের বাতিঘর ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্র-বিরোধিতা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের কবি, বাঙালির কবি হয়ে উঠেছেন; মমতার একটি জায়গা, নির্ভরতার ক্ষেত্র, সান্ত্বনার স্থল হিসেবে বাঙালি সকল সংকটে রবীন্দ্রনাথকেই বেছে নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির অনুভব, চেতনায় এবং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যান। শুধু বাঙালির নন, বিশ্বমানবেরও সুখ ও দুঃখ ভাষা পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মে।
রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর পরে পূর্বপাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মনে বাঙালিত্বের চেতনা এবং তাঁর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গভীরভাবে প্রোথিত হতে শুরু করে। এই কাজটি গতি পায় প্রধানত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের উদ্যোগে, যদিও এর বীজটি রোপিত হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে বুলবুল ললতিকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যেমন প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন করার উদ্দেশ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করেছিলেন, ছায়ানটও তেমনি বর্ষা, শরৎ এবং পৌষ উৎসবের মতো অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের কিছু উৎসবের আয়োজন করতে শুরু করে। তবে এর মধ্যে যে-অনুষ্ঠানটি সারা দেশের বাঙালির চিত্তকে উদ্বেলিত করে ষাটের দশক থেকেই মাতিয়ে রেখেছে, সেটা হচ্ছে পহেলা বৈশাখের আয়োজন, যা একটি সর্বজনীন চেতনা নিয়ে গত ছয় দশকে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ এখন বাঙালির অন্যতম প্রধান অসাম্প্রদায়িক উৎসবের মধ্যে একটি। অন্যটি হচ্ছে বাঙালির প্রতিরোধের প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন।
১৯৫৪ সালে ঢাকার কার্জন হলে সাহিত্য সম্মেলনের যে অনুষ্ঠান হয়, তাতে সন্জীদা খাতুন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি পরিবেশন করেন। এ ছাড়া জহির রায়হান পরিচালিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছায়াছবিতে অজিত রায়ের দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি স্থান পায় এবং প্রতিবাদী এই ছবিটির ব্যাপক জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে এই গানটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হতে থাকে আগামী দিনের জাতীয় সংগীত হিসেবে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অনুষঙ্গ হিসেবে যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সৃষ্টি হয়েছিল সারা দেশে, তার অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ ছিল রাবীন্দ্রিক কাঠামোয় গড়া এবং ‘আমার সোনার বাংলা’ যে আমাদের প্রাণের সঙ্গীত, সেই আবেগে সিক্ত ছিল দেশ। ষাটের দশকে যে মানবতাবাদীদর্শন ও মুক্তচিন্তায় বাঙালির নবজন্মলাভ, তা রবীন্দ্রচর্চা থেকেই পাওয়া বলে মুক্তিযুদ্ধের মতো এক বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা তখন সম্ভব হয়েছিল। বাঙালির সেই মুক্তচিন্তায় যোগ দিয়েছিলেন রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাব্রতী মানুষ এবং অন্যান্য পেশাজীবী মানুষেরাও। সেই সাথে রূপ নিতে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শিক কাঠামোগুলো। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের যে ক’জন নেপথ্য-নায়ক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিকর্মীগণও ছিলেন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ তাদের মধ্য দিয়ে উপস্থিত ছিলেন। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনও বাংলাদেশ সৃষ্টি করার রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে এগিয়ে যেতে থাকে।এর পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা লাভ।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের টালমাটাল দিনগুলোর পরিস্থিতি সামাল দিতে পাকিস্তান সরকার একে একে নতি স্বীকার করে। রবীন্দ্রসংগীতের উপর নিষেধাজ্ঞাও এই সময় কোনো প্রজ্ঞাপন জারি না করেই প্রত্যাহার করা হয়। কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাও তুলে নেয়া হয় এবং মামলার সকল বন্দিদের মুক্ত করে দেওয়া হয়। মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ঘোষণা করেন যে, ‘.. দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখিয়া যিনি বিশ্বকবি হইয়াছেন। আমরা এই ব্যবস্থা মানি না; আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়িবই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাহিবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এ দেশে গীত হইবেই।’ যদিও মনে মনে তিনি স্বাধীন বাংলার জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি যে গৃহীত হবে, তা এর মধ্যেই নির্ধারণ করে ফেলেছিলেন। রাজনৈতিক কারণেই তিনি তাঁর ভাষণে এর চেয়ে বেশিদূর অগ্রসর হননি। কিন্তু ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ (যা ১৯৭০ সালের ঘূর্ণি-জলোচ্ছ্বাসের পরে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মঞ্চ হিসেবে গঠিত হয়েছিল) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল সকল ছাত্র সংগঠনের সব অনুষ্ঠানেই ‘আমার সোনার বাংলা’ তখন জাতীয় সংগীতের মতো ভাবগাম্ভীর্য এবং সম্মানের সঙ্গেই গাওয়া হত।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বিশ্বকবির লেখা সাহিত্যের চরণ প্রায়শই উচ্চারণ করতেন। তাঁর বক্তৃতা, বিবৃতি আলোচনায় এমনভাবে পঙ্ক্তিগুলো উদ্ধৃত করতেন যে তাতে মনে হতো তিনি বিশ্বকবিকে বাঙালির রক্তপ্রবাহ জ্ঞান করছেন। বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্র চেতনাকে আত্মস্থ করেছিলেন তাঁর সুদীর্ঘ কারাভোগের কালে। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব জেলে বঙ্গবন্ধুকে অন্য সামগ্রীর সঙ্গে রবীন্দ্র রচনাবলী দিতে বিস্মৃত হতেন না। বঙ্গবন্ধু জেল-জীবনে রবীন্দ্রনাথের বহু গান, কবিতার চরণ মুখস্থ করেছিলেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অন্তরে গেঁথে যাওয়া কবির পঙ্ক্তিগুলো অবিরল আওড়ে যেতেন সভা-সমিতি কিংবা আলোচনা সভায়। হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়ন করেছিলেন বলেই তিনি এই ব-দ্বীপের জনমানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন।১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় স্বায়ত্তশাসনের আকাক্সক্ষায় দেশ উন্মাতাল হয়ে ওঠে এবং বঙ্গবন্ধুর ঝটিকা সফরে সারা বাংলা চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই সবখানেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা কিংবা গানের চরণ উচ্চারণ করে মানুষজনের মনে দেশপ্রেমের ঝঙ্কার তুলতেন।
একাত্তরের মার্চে বাঙালির উপর নেমে-আসা হত্যা-নির্যাতন আর ধ্বংসের বিভীষিকার চিত্র তুলে ধরতে শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলেন। পাকিস্থানের বর্বর সেনাবাহিনী রবীন্দ্রনাথের নিষ্প্রাণ ছবিকে গুলিবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথের গান যেমন মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল, ইংরেজ বিতাড়নের আন্দোলনের সময়ও রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম-মিছিলে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের পথে-প্রান্তরে মুক্তিযুদ্ধের উদ্বুদ্ধ করতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অন্যান্য দেশপ্রেমমূলক গান, কবিতার সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, কবিতা, নাটিকা প্রচার করা হতো। দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’, ‘আমি ভয় করবো না, ভয় করবো না’, ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, ততই বাঁধন টুটবে’ রবীন্দ্রনাথের ইত্যাদি গানও প্রেরণা সঙ্গীত হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় গাওয়া হতো।
মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের মুক্তিসেনারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে অস্ত্র দিয়েই শুধু মোকাবিলা করেনি, তাদের মুখে ছিল কবিতা, গানের উদ্বুদ্ধকারী কলি বা পঙ্ক্তি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি-সাহিত্যিক শিল্পীরাও যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি করে। রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে আরও কবি-সাহিত্যিকের গান, কবিতা শিল্পীরা গেয়েছিলেন এবং আবৃত্তি করেছিলেন। দেশকে ভালোবেসে তখন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কিংবা শিল্পীদের পরিবেশনায় সীমান্ত এলাকায় এবং বিদেশে কনসার্টে প্রধান গান হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাওয়া হতো। এতে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতনে তেমনি সমগ্র বাঙালি জাতি চেতনায় ধারণ করে রাখতো রবীন্দ্রনাথের এসব গানসহ আরও অনেক গান।
মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে এই গান গৃহীত হয়েছে। বিশ্বকবির আর একটি গান ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়। উপমহাদেশে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের প্রভাব কত সুদৃঢ় তা দুই দেশে একই কবির গান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানিদের সঙ্গে এদেশের দেশপ্রেমহীন কিছু ব্যক্তি রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিরোধিতা করলেও তা জনগণের প্রতিরোধের মুখে নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়নে রবীন্দ্রনাথ সশরীরেই আন্দোলন-মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন স্বরচিত কবিতা ও গানের ডালি নিয়ে। উপমহাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব প্রচণ্ড ছিলো এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথ সশরীরে ছিলেন না। কিন্তু আত্মিকভাবে, মানসিকভাবে বাঙালির একান্ত স্বজন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আদর্শ, ধ্যান-ধারণা, দেশপ্রেমমূলক দীক্ষা বঙ্গবন্ধু নিজের মধ্যে গভীরভাবে ধারণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ষাটের দশকে যে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল এর নেপথ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল সুগভীর। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে যে চারটি মূলনীতি গৃহীত হয়েছিল, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শনের ঐক্য লক্ষণীয়।
পাকিস্তান শাসনামলে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নানা অপচেষ্টা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের নাম মুছে ফেলতে পারেনি। হুমায়ূন আজাদ যথার্থই বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ, যাঁকে বাতিলের চেষ্টা করে আসছে নষ্টরা পবিত্র পাকিস্তানের কাল থেকে; পেরে ওঠেনি। এমনই প্রতিভা ওই কবির তাকে বেতার থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয় জুড়ে বাজেন; তাঁকে পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয়ের কাব্যগ্রন্থে মুদ্রিত হয়ে যান; তাঁকে মাটি থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি আকাশ হয়ে ওঠেন; জীবন থেকে তাঁকে নির্বাসিত করা হলে তিনি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন জাতির স্বপ্নলোকে।’
শুধু মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নয়, পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নেও রবীন্দ্রনাথ অন্যতম প্রেরণা। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির আসাম্প্রদায়িক ও উদার মানবতাবাদী ধারা বিকাশের পথটি কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। এই সংকট অতিক্রমের জন্যও রবীন্দ্রনাথ পরম আশ্রয়। মুক্তিযুদ্ধে যেমন সাংস্কৃতিক জাগরণ শক্তি যুগিয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি বাস্তবায়নেও সংস্কৃতিচর্চার বিকল্প নেই। বাঙালির সাংস্কৃতিক ভূগোলে রবীন্দ্রনাথ এক বিকল্পহীন নাম। মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথ তাই অবচ্ছিদ্য। ·

0 মন্তব্যসমূহ