বড়রাস্তাটা ডানদিকে বাঁক নিয়ে একটু এগিয়েই বাঁদিকে ঘুরে কলোনীর ভেতরে ঢুকে গেছে। ঢুকেই বাঁদিকের প্রথম রাস্তাটা সরু গলি। ব্যাক লেন। তারপরের রাস্তায় ঢুকে গোটাকতক বাড়ির পরেই আমার আস্তানা। রোজকার মত বাঁদিকে ঘুরে গলিতে ঢুকতেই নোংরা চেহারার, ছেঁড়া জামা-কাপড় পরা লোকটার মুখোমুখি হলাম। মুখটা ঠিক চেনা না হলেও আন্দাজে বুঝতে পারি, বড় রাস্তার মোড়ে পানের দোকানের আশেপাশে একেই হাত পাততে দেখেছি। পাতা হাতে কেউ কেউ দুচার পয়সা দিয়েছে, কেউ মদটদ খেয়ে কখনওবা একটা আস্ত একটাকার নোটও দিয়েছে। একদিন ত সিল্কের পাঞ্জাবী ও পাতলা ধুতিপরা পেটমোটা একটা লোক ওর বন্ধুর সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছিল, সেই নোংরা জামাকাপড়-পরা-হাতপাতা-লোকটাকে একটা দশটাকার নোট দেবে বলে। বন্ধুটি ওকে বোঝাচ্ছিল, একসঙ্গে দশটাকা না দিয়ে খুচরো খুচরোভাবে অনেকদিন ধরে দিতে। তাতে নোংরা লোকটার সুবিধেও হবে। আর লোকে ভাববে যে বন্ধুটি দয়ালু ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সিল্কের পাঞ্জাবী পেটমোটা বোধহয় একটু বেশি মদ খেয়ে ফেলেছিল এবং নেশার ঘোরে ভাবল, বন্ধুটি বুঝি ওকে টেক্কা দিয়ে বেশি 'টাকার অঙ্ক কবুল করেছে। ফলে ওর মাথায় বাজির ঝোঁক চেপে গেল। এবং সিল্কের পাঞ্জাবির পকেট থেকে একগোছা একশ টাকার নোট বের করে তড়পাচ্ছিল, ভাবখানা 'তুই বিশ দিবি ত আমি একশ দেব এবং তুই একশ দিবি ত আমি হাজার দেব। নোংরা জামাকাপড়পরা-হাতপাতা লোকটা প্রথমে হাসি হাসি মুখ করে 'ঈশ্বর আপনার ভাল করবেন। আপনাকে আরো দিয়ে রাজা করবেন, আপনার সোনার টুকরো ছেলে হবে' বলে খুব গাইতে শুরু করেও ব্যাপার স্যাপার দেখে চট করে সরে গিয়ে বেশ কিছুটা দূরে একটা ডাস্টবিনের আড়ালে কটা রাস্তার কুকুরের পাশে চুপচাপ বসে রইল। পানের দোকানের এক খদ্দের পানের পিক ফেলতে গিয়ে ওকে দেখে বলল, 'কিরে তুই পালিয়ে এলি যে। যা, এই সুযোগে কিছু হাতিয়ে নে বাবা।’ লোকটা জড়সড় হয়ে বলল, 'না বাবু। মাতালে আমার ভীষণ ভয়। ওদের এখন মাথার ঠিক নেই। তাছাড়া বাবু আমি গরীব মানুষ। একটাকার বেশি সামলাতে পারব না। অতবড় নোট নিয়ে ভাঙাতে গেলে লোকে চোর বলে ঠ্যাঙাবে। তার চেয়ে ওরা চলে যাক। তখন যাব না হয়।’
সিল্কের পাঞ্জাবি তার বন্ধুকে নিয়ে চলে গিয়েছিল আক্ষেপ করে। শালা ভিখিরিগুলো বোকা, ওদের কোনদিন উন্নতি হবে না। একটু পরেই আবার নোংরা হাতপাতা লোকটা দোকানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।
কপালে যাদের দুঃখ লেখা তা খন্ডাবে কে! বেচারা হাতপাতা লোকটা আরেকদিন, জিনসের প্যান্ট পরা, উঁচু উঁচু বুকঅলা, গেঞ্জিপরা ও ঘাড় অবধি চুল ছাঁটা একটি মেয়ের পাল্লায় পড়ে গেল। মেয়েটি ওর মা বাবার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছিল। হঠাৎ হাতপাতা লোকটার 'দশটা পয়সা দিন মা' শুনে কি হল কে জানে মেয়েটি লোকটিকে কাছে ডেকে বলল, 'এ্যাই শোন, তুমি পিজা খাবে?' লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। অভ্যেসবশত মুখ দিয়ে বেরুল, 'দশটা পয়সা দিন মা, ভগবান আপনার ভাল করবেন।’ শুনে মেয়েটি কাঁধের চুল ঝাঁকিয়ে হেসে বাবাকে বলল, 'বাপী, হাউ কিউট, কি সিম্পল মাইন্ডেড, দেখেছ! মাত্র দশটা পয়সার জন্য কেমন ভগবানের রেসিংস এনে দিচ্ছে। বাপী লোকটাকে একটা চিকেন পিজা আর একটা সফট ড্রিংক দিয়ে দাও। লেট হিম এনজয়!’ মেয়েটির বাবা হা হা করে হেসে বলল, 'তুমিই জিজ্ঞেস কর না।’ বেবী মানে বেশ বাড়ন্ত মেয়েটি লোকটাকে আবার ধরল, 'তুমি কোন পিজা খাবে, চিকেন, না—।’ লোকটা এবার সরতে শুরু করেছে। এবং সরতে সরতে ফের ডাস্টবিনের আড়ালে গিয়ে বসে রইল।
লোকটাকে পরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'ও তো তোমায় সাধছিল। নিলে না কেন? পিজা ত খেতে ভাল। খেলে পারতে।’
না বাবু; দশটা পয়সা পেলেই যথেষ্ট। আবোল তাবোল খাবার খেয়ে লাভ নেই। ওই যে বলল, সফ্ট ড্রিংকস্ মানে যা ফস্ করে খুলে পাইপ লাগিয়ে খায়। বাবু ওর দাম একটাকা ষাট পয়সা। অত পয়সা শুধু শুধু জল খেয়ে নষ্ট করার মানে হয়। তেষ্টায় টিউকলের জলই ভাল। বেশ পরিষ্কার আর ঠান্ডা।
একটু পরে ফিসফিস করে বলছিল, 'তাছাড়া বাবু ওই মেয়েটির দিকে তাকাতে আমার ভীষণ লজ্জা করছিল। ওইটুকুন মেয়ে একটু বেশি বাড়, আর কি পোষাক। মনে হয় যেন সব আঢাকা। আমার ভয় লাগে।’
কেন, ওকে ত সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কেমন তরতাজা। বেশ এট্রাকটিভ। মানে দেখতে ত বেশ ভালই। ওপাশ থেকে কে যেন সিটি দিচ্ছিল জোরে জোরে।
না বাবু। ওই ছোঁড়াগুলো খারাপ। নোংরা গালি দেয়। আমাকে 'শালাবানচোৎ, পাছায় লাথি মারব গ্যারেজে ভিক্ষে করতে এলে' বলে শাসিয়েছে। তাছাড়া আমি সিটি দিলে লোকে খারাপ ভাববে। তখন ভিক্ষে করাটাই মুসকিল হয়ে দাঁড়াবে। আপনিই বলুন, বেশি লোভ করে লাভ কি। আমি যা পাই তাতে আমার ভালই চলে যায়। বরং এর থেকে দুদশ পয়সা ওই ওপাশের ফুটপাতের অন্ধ বুড়িটাকে মাঝে মাঝে দি। ওকে একদিন অর্ধেকটা পাউরুটি আর একমাস চা খাইয়েছি। মজা কি জানেন, বুড়িটা আমায় 'রাজা হও বাবা। সুখে থাক। তোমার বউ রাজরাণী হোক' বলে আশীর্বাদ করেছে।—লোকটা খুক খুক করে হাসছে।
বুড়িটা ভারি সরল। আমাকে রাজা বানাবার মতলব। আপনিই বলুন, রাজা হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সবাই যদি রাজা হবে, তবে প্রজা হবে কে! আমি সেই থেকে বুড়িকে আর পাউরুটি খাওয়াই না।
তোমার ভিক্ষে করে মোটামুটি ভালই চলে কি বল? কিছু জমে টমে?
তা বাবু, আপনাদের দশজনের দয়ায় বেশ চলে যায়। আমি অবশ্য বাজে খরচ করি না। সিনেমা বায়োস্কোপ ত নয়ই। তবে হ্যাঁ, সামান্য কিছু বাঁচাই। দু দশ টাকা হলে ওই সামনের ব্যাঙ্কে চলে যাই।
ব্যাঙ্কে! অ্যাঁ। অ্যাকাউন্ট আছে নাকি?
তা একটা আছে। অবশ্য কত আছে তার আমি কিছুই জানি না। ওখানে এক দিদিমণি কাজ করে। ফর্সা মতন, চোখে চশমা, ভারি ভালো। একদিন রাস্তায় ওনাকে একা পেয়ে ধরেছিলাম। বললাম, 'দিদিমণি ঘেন্না না করেন ত একটা কথা বলি।’
মেয়েটি বড় ভাল বাবু। বলল, 'বল।’ বললাম, 'আপনি ত ওই ব্যাঙ্কে কাজ করেন। আমার ভেতরে যেতে ভয় হয়। আমার হাতে মাঝে মাঝে কিছু মানে দু চার টাকা জমে, তা আমাদের টাকাপয়সা রাখা ভারি ভয়ের। চোর পকেটমার গুন্ডা বদমাশ চারপাশে লেগেই আছে। তা বলছিলাম কি। ওখানে মাঝে মাঝে যদি দু চার টাকা জমা রাখার বন্দোবস্ত করে দেন।’ শুনে দিদিমণি অবাক হয়ে বলল, 'আমি নেব না এভাবে। তাছাড়া, নিতেও পারব না। বরং তুমি দাঁড়াও। আমি আসছি একটু পরে।’ প্রথমে ভাবলাম, কিছু গণ্ডগোল হল না ত। আমাকে চোর ভেবে নিল নাত। তারপর ওর মিষ্টি শান্ত চেহারার কথা ভেবে মনে হল, না বোধহয়। একটু উকিঝুঁকি দিয়ে দেখলাম। কোটপ্যান্ট পরা একজন লোককে সঙ্গে করে হাতে কিসব কাগজপত্র নিয়ে বাইরে আসছে।
আমাকে বলল, 'ইনিই হচ্ছেন এখানকার ম্যানেজার। ইনিই তোমার অ্যাকাউন্ট খুলে দেবেন। আর এই হচ্ছে সেই লোক', বলে আমাকে দেখিয়ে দিল। ম্যানেজার লোকটি বেশ নাদুশনুদুস হাসিখুসি। আমাকে বলল, 'তোমার নামে অ্যাকাউন্ট এক্ষুণি খুলে দিচ্ছি। এই হচ্ছে ফর্ম, দাঁড়াও ফিল আপ করে দিচ্ছি।’ ওরা কিসব লেখালেখি করে দিল, আমাকে কয়েক জায়গায় টিপছাপ দিতে বলায়, আমি একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, 'বাবু, আমি আমার নাম সই করতে পারি। অনেকদিন আগে আমি ইস্কুলে যেতাম। যদি টিপ-ছাপের বদলে নিজের নাম লিখি?'
ম্যানেজারবাবু খুশি হয়ে বলল, 'আরে, কেন হবে না, শুধু খেয়াল রেখো, তুমি এখন যেভাবে নাম সই করবে, পরে টাকা তোলার সময় কিন্তু একইভাবে লিখতে হবে। তাছাড়া তোমার একটা পাশবুক হবে। ওতে সব জমাখরচের হিসেব থাকবে।’ আমি বললাম, 'না বাবু, আমার কোন স্থায়ী আস্তানা নেই। কখনও পাইপের ভেতর, কখনও বাড়ির বারান্দায় যেখানে জায়গা পাই শুয়ে পড়ি। আমি এপাড়ার আশেপাশের মধ্যেই থাকি। পাশবই আপনার কাছেই থাকুক। আমি শুধু দিদিমনির হাতে যা জমবে, দিয়ে দেব। দিদিমণিই রেখে দেবে।’ ওদের মধ্যে কিসব কথা হল। সব আমার মনে নেই। আমার পাশবই হয়ে গেল। আমিও দুচার টাকা জমলে দিদিমণির কাছে রেখে আসি।
তুমি টাকা জমাও কেন? তোমার তো কেউ নেই বলেছ।
না বাবু, কেউই নেই। আমি কারুর সঙ্গে বেশী ভাব জমাতেও চাই না। ঝাড়া হাত পা হয়ে থাকতেই বেশ লাগে। এ এলাকায় মোটামুটি সেট হয়ে গেছি। লোকে মোটামুটিরকম মুখ চিনে গেছে। ঝুটঝামেলা বা কোন ঘ্যানর ঘ্যানর নেই। ইচ্ছে হয় করলাম, না হয় ওপাশে গিয়ে একটু গড়িয়ে নি। তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে মোটা জমাদারনীকে কিছু কিছু টাকা ধার দি। নামেই ধার—
তুমি জমাদারনীকে ধার দাও কেন? ও রোজগার করে না? নাকি—
না বাবু সেসব কিছু নয়। জমাদারনী রোজগার করে। ওর অনেক বাঁধা বাড়ি আছে। হলে কি হবে। ওর মরদটা পালিয়েছে যে। মাগীর কাঁধে একগাদা পুষ্যি। আর তাছাড়া ওর সাথে আমার অন্য কোন সম্পর্ক হতেই পারে না। আমি ভিখিরী হলেও ঠিক অতটা খারাপ নই। বিশেষ করে মেয়েছেলের ব্যাপারে। কিছু মনে করবেন না যেন, আসলে আপনি কথাটা তুললেন বলেই বলা। বেচারা অবশ্য অন্ধ বুড়িটার মত আমায় কোন আশীর্বাদ করার চেষ্টা করেনি
তা জমাদারনী নিশ্চয়ই তোমার পয়সা ফেরৎ দিয়ে উঠতে পারেনি। অতগুলো পুষ্যি ঘরে!
ওর কথা বাদ দিন বাবু। আমার কাছে আরো একজন মাঝে মাঝে আসে। ওই যে খবরের কাগজের হকার। ভোর ভোর কাগজ বিলি করে ফেরার পথে কখনও সখনও গল্প করে যায়। বেচারাকে একলপ্তে কিছু টাকা দিতে পারলাম না। পারলে ওর একটা দোকান হয়ে যেত। অবশ্য না হয়ে ভালই হয়েছে। ভয় ছিল, শেষমেষ না ওই হোলসেলের এজেন্টের মত হয়ে যায়। মানে, হয়ে যেত আর কি। দুটো কাঁচা টাকা হাতে এলে, নিজেকে যারা গরীব বলে মনে করতে চায় না। গরীব না ভাবলেই ওই গ্যারেজের ছোকরাগুলোর মত' মদ খেয়ে খিস্তিখেউর করবে, শিস্ দেবে। বা ওই যে বাবুর মত, যে আমাকে দেবার জন্য শ-শ টাকার গোছা নিয়ে তড়পাচ্ছিল।
সে-ত তোমার বোকামীর কথা।
না বাবু। চারপাশে যা অবস্থা। সামলে চলাই দায়। আমাদের অবস্থা এমনিতেই বেশ ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে দিন-কে-দিন। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। ওই যে লোকটা, দেখছেন ওই যে রোগাপটকা মতন, নাকে চশমা, সুতির প্যান্টজামা পরা, গণেশবাবু ওর নাম। দারুণ মাথা লেখাপড়ার। কিন্তু কি একটা চাকরী করে—এদিক আনতে ওদিক কুলোয় না। একদিন আমায় জিজ্ঞেস করছিল, চাকরি ছেড়ে ভিক্ষে করলে রোজগার বাড়বে কি! তা আমি বললাম, ভিক্ষে অনেকটা নিজের ব্যবসার মত। তবে হ্যাঁ, যে ভিক্ষে দেবে সে দু চারটে খিস্তিখেউর করবেই, তাতে কিন্তু কিছু মনে করা চলবে না। তবে হ্যাঁ নিজেই নিজের অধীন। ইচ্ছে হলে সকালে খেপ মারলেন। ইচ্ছে নেই মারলেন না।
তোমার কাছে ভিক্ষে করার পরামর্শ। পাকা সরকারি চাকরি ছেড়ে দেবার কথা ভাবছে নাকি?
না, ঠিক তা নয়। তবে বলেছিলাম কি, একটু দূরে একটা নতুন সপিং সেন্টার খোলা হয়েছে, সেখানে না হয় সন্ধেবেলা পার্টটাইম ভিক্ষে করতে পার। সরকারি চাকরি বলে কথা।
লেখাপড়া জানা লোককে ভিক্ষে করতে বলছ?
কেন বলব না বাবু। পার্টটাইম চাকরী করলে দোষ নেই। অফিস ছুটির পর ছেলেমেয়ে পড়ানোর টেম্পোরারি চাকরি করতে পারেন অথচ ভিক্ষে করার বেলায় লজ্জার একশেষ। আমরা কাউকে জোর করছি না ভিক্ষে দেবার জন্য। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি মানে ভিক্ষে চেয়ে যাচ্ছি, আপনাদের মর্জি, দিন চাই না দিন।
সবাই যদি ভিক্ষে করে তবে ভিক্ষে দেবে কে?
শুনে লোকটা খুব গম্ভীর হয়ে গেল।
বাবু, আপনি ভিক্ষে করাটাকে অন্য চোখে দেখছেন। এটাও একটা প্রফেশন, অন্য প্রফেশনের মত এবং ব্যবসাও। অন্য সব ব্যবসার মত। আর কোয়ালিফিকেশন—নিশ্চয়ই দরকার হয়। আপনার ধারণা, অভাবে পড়লেই লোকে বুঝি ভিক্ষে করে বা এ প্রফেশনে আসে। কিন্তু আপনি চট করে ভিক্ষুক হতে পারবেন না। শত চেষ্টা করলেও নয়। আপনিই বলুন, যার ডাক্তারী লাইনে ঝোঁক সে কি করে ইঞ্জিনিয়ার হবে। শত চেষ্টা করলেও হবে না। আর প্রত্যেক লাইনের যেমন আলাদা আইসা ট্রেনিং দরকার, প্র্যাকটিশ দরকার—আমাদের প্রফেশনেও তাই।
............!
কিন্তু বাবু, যে জন্য আপনার অপেক্ষায় এতক্ষণ ধরে—
আহা তাই ত, তোমার প্রচুর লস্ হয়ে গেল ভাই।
না, তা হয়নি। এখন মুড নেই। তাছাড়া সবে সন্ধে হচ্ছে হচ্ছে ভাব, এসময় রিয়েল খদ্দের আসা সুরু হয়নি।
বেশ, তা কি জন্যে এসেছ? একা, না সঙ্গে আরো কেউ আছে?
সরাসরি নেই, তবে আছে।
সে আবার কিরকম ব্যাপার।
সে বুঝবেন না। আসলে আপনার সঙ্গে একটা জরুরী বিষয় আলোচনা করতে এসেছি। এ পরামর্শ আমাদের সবাইকেই জড়িয়ে। আমাদের কম্যুনিটি—
তোমাদের কম্যুনিটি। কোন জাতপাতের ব্যাপার নাকি!
হ্যাঁ, আমাদের কম্যুনিটি মানে আমরা মানে, আমি, জমাদারনী, খবরের কাগজের হকার, সরকারি অফিসের এল ডি সি গণেশবাবু ইত্যাদি মিলেই এই কম্যুনিটি। স্কীল্ড আর সেমি-স্কীলড ওয়ার্কারের মত আমাদের কম্যুনিটিতেও এসব আছে। আমি বা আমার মত যারা হোলটাইমার মানে ভিক্ষেটাকে প্রফেশন হিসেবে নেবার জন্য ট্রেনিং নিচ্ছে তারা হল সেমিস্কীলড, আর যারা নেব নেব ভাবছে তারা হল আনস্কীল্ড।
দারুণ ব্যাপার। আমি ত এসব কিছুই জানতাম না।
বাবু, আপনি যদি কখনো ফুলটাইম বিজিনেস্ করেন তবে বুঝবেন। এখন ত আপনি চাকরি করেন, অন্যের। আপনার মালিক কিন্তু এসব বোঝে, আসলটি আমরা জানি। কারণ আপনার মালিকও হোলটাইমার আমাদের মত।
তা তোমাদের প্রবলেমটা কি?
হ্যাঁ, আমরা কয়েকদিন ধরে মহাদুশ্চিন্তায় কাটাচ্ছি। কোন সমাধান পাচ্ছি না। ভাবলাম আপনার সঙ্গে একটু আলোচনা করলে হয়ত কোন রাস্তা পাব। আপনি-
আমি!
হ্যাঁ বাবু। ভেতরে আর যাব না। বাইরেই ঠিক আছে। আপনাকে ব্যাপারটা খুলেই বলি। আপনি নিশ্চয়ই রোজ টিভির প্রোগ্রাম দেখেন বা রেডিও। এই এতবড় কাণ্ড ঘটে গেল চারপাশে।
তোমাদের নিয়ে কিছু বলেছে নাকি?
বাবু, চিন্তার কথা ওখানেই। ব্যাপারটা এত বেশি পাব্লিসিটি (প্রয়ে যাচ্ছে, সেটাও দুশ্চিন্তার কারণ। সত্যি বলতে কি আমরা ঠিকঠিক আর পারিসিটি চাই না। সত্যি বলছি। জমাদারনীরও বক্তব্য, ওদের প্রফেশনে যেন ভিড় না বাড়ে। হকারও তাই বলেছে। লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক গণেশবাবু অবশ্য অন্যরকম। ইদানিং সরকারি অফিসে লোকজন নেয়া বন্ধ আছে। তবে চালু হতে কতক্ষণ। আপনি ত জানেন, যে কোন প্রফেশনেই লোক বেশি হলে সে প্রফেশনের দাম পড়ে যায়। দাম কমা অর্থে-
রোজগার কমে যায়; এই তো।
ঠিক বলেছেন। তবে আমাদের ক্ষেত্রে আমরা চাই কম্যুনিটি কন্ট্রোলিং। মানে আমরা গরীবরা, মানে আমি, জমাদারনী, হকার, এলডিসি গনেশবাবুরা মিলেই এই কম্যুনিটি। একে ত আমাদের শতকে ঝামেলা, তার ওপর-
তার ওপর কি?
আপনি শোনেন নি? রেডিও, টিভিতে? কাগজেও ত লিখেছে।
কি?
প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী? প্রধানমন্ত্রী কি করেছে?
কি না করেছে বলুন! আস্তে বলি, কেউ শুনে ফেলতে পারে। যখনই কোন নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়, তখনই দেখি তার প্রথম কাজ হয় আমাদের ধরে টান মারা। কতবার যে এ কান্ড হল। কিছু হলেই আমাদের গরীবদের ওপর ঝাল ঝাড়া। আমি এর কোন মাখামুণ্ডু বুঝি না।
কেন? কি বলেছে প্রধানমন্ত্রী? কই তেমন তো
বাবু, জানিনা সামনে কি হবে। তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গরিবী দূর করতে হবে। মানে গরিবী ত আমাদের কোয়ালিফিকেশন আর সে জন্যই আমরা গরীব, সেই গরীবিই যদি, নাঃ বাবু এটা গরীবদের ওপর বড্ড বাড়াবাড়ি জুলুম।
না না সেকি! তোমার বোধহয় বুঝতে ভুল হয়েছে।
না বাবু তা হবে কেন। বিশ্বাস করুন, আমরা কারো কোন ক্ষতি করিনি। করার ক্ষমতাও নেই। তবু খামাখা আমাদের পেছনে লাগা কেন বাবু। আমাদের কোন কিছুর দরকার নেই। আপনিই বলুন, গরীবি যদি না থাকে আমাদের লাইনের কি হবে। আমরা কোথায় যাবো! আর ব্যাপারটা যদি একবার সরকারি নথিপত্রে লেখা হয়ে যায়। তাহলে ত জোর জবরদস্তি করে আমাদের ভাগাবে। সরকারি হুকুম একবার বেরোলেই সর্বনাশ। নড়াবার কোন উপায়ই থাকবে না। সেজন্যই বলছিলাম কি, আপনি যদি দুকলম লেখেন এ ব্যাপারে-
আমি কি লিখব তোমাদের জন্য? আর লিখলেই কি কোন সমাধান হবে?
হবে, নিশ্চয়ই হবে। আপনি যদি একটা গল্প মানে স্টোরি খাড়া করেন খবরের। কাগজে। ওটাকে বারকয়েক নাড়াচাড়া করবেন। আর গল্পটা হবে এইরকম যে, বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাওয়া গেছে, গরীবরা আর নেই। তারপর যেমন আপনারা করেন। কদিন পর- খালি ফুটপাত, পাইপের ভেতর বস্তী ইত্যাদির ছবি ছাপাবেন, নিচে ক্যাপসান 'গরীব আর নেই'। প্রথমে লোকে মানতে চাইবে না, কারণ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে আমরা আছি, অথচ কাগজে লিখছে, নেই। কিন্তু কিছুদিন লেখালেখি করে এ নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনাও হবে। তর্কাতর্কি হবে। সব ব্যাপারেই তো এইরকম হয় দেখছি। আর একবার যদি সরকারি হিসেবে লিখে দেওয়া হয় যে, আমরা মানে গরীবরা
আর নেই, আমাদের আর পায় কে।
মানে তোমাদের বাঁচাবার জন্যে মিথ্যে কথা বলতে বলছ।
ওভাবে ভাবছেন কেন। বিজিনেশ, বিজিনেশ ভাবুন। তাছাড়া আপনাদের প্রধানমন্ত্রীর মাথা থেকে গরীবদের গায়েব করার চিন্তাটা হঠাতে হবে। কারণ আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাজে কোন বাগড়া দিইনি। উনি ওর দেশ সামলান। যা প্রাণে চায় করুন। আমাদের কোন মাথাব্যথা নেই।
লোকটা চলে গেল। হয়ত একটু পরে পিজার দোকানের সামনে দাঁড়াবে। অথচ সফট ড্রিংক বা পিজা খেতে চাইবে না। ·
[গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘অব্যয় সাম্প্রতিক’, মার্চ ১৯৮৫ সংখ্যায়]

0 মন্তব্যসমূহ