দমদম রোড ধরে যেতে যেতে চিড়িয়া মোড় হয়ে বাসটা বাঁদিকে ঘুরতেই একটু দিশেহারা লাগে পলাশের। মনে হয় নিজের পরিচিত এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় এসে পড়ল। পাড়ার পরিচিত অলিগলি, পরিচিত চৌহদ্দির বাইরে বেরোলেই এরকম মনে হয়। মনে হওয়াটা নতুন নয়, সেই ছোটবেলা থেকেই পলাশের এই মনে হওয়া। পরিচিত দোকানপাট, পরিচিত মুখ, এমনকি চেনা সারমেয়ও ওর এই স্থানগত স্বস্তি বা অস্বস্তির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। তবে এই পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েও আজ অব্ধি পলাশ বুঝে উঠতে পারেনি ঠিক কোনটা ওর নিজের পাড়া বা অঞ্চল। পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক জায়গা পাল্টেছে, নতুন নতুন জায়গাগুলোকে নিজের মনে হয়েছে, আবার আগের ফেলে আসা জায়গাটাকেও হারায়নি, অন্তত মানসিকভাবে। সেটাও ওর জীবনে নিজের জায়গা হয়েই রয়ে গেছে চিরকাল। জ্ঞান হবার পর থেকে যে অঞ্চলকে নিজের পাড়া হিসেবে ভেবেছে, সেটাই ছিল পলাশের জীবনের প্রথম ইমোশন। নিজের পরিবার ছাড়িয়ে যদি 'আমাদের' ব্যাপারটা থাকে, তবে সেটা সেই ছোট বয়েসের ফেলা আসা পাড়া। কখনো কখনো বাড়ি থেকেও খানিকটা যেনো বেশি মাত্রাতেই মনের ভেতর জায়গা করে নিয়েছিল পাড়া। কোনো এক পঞ্চমীর ভোরে হাল্কা শিশিরভেজা ঘাসে মায়ের হাত ধরে দুর্গাপুজোর মন্ডপে দাঁড়িয়ে মূর্তির দিকে তাকিয়ে পলাশ প্রথম অনুভব করে— আমাদের পুজো। অতো ভোরে মন্ডপ প্রায় ফাঁকাই। বহুরাতে কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা এনে বড়রা সব বাড়িতে ঘুম, আর ভোরে ঠাকুর দেখার উত্তেজনায় সারারাত প্রায় জেগে মায়ের সঙ্গে মন্ডপে গিয়েছিল পলাশ। সেই থেকে আমাদের পাড়া, আমাদের পুজো, আমাদের ক্লাব, আমাদের মোড়েই জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে পলাশ আজও সব জায়গায় চেনামুখের একটা কম্ফোর্ট জোন খোঁজে, মায়ের ওরকমভাবে চলে যাবার পর আরও বেশি রকম ভাবে খোঁজে। মায়ের মৃত্যুটা পলাশের কাছে সারাজীবন এক ট্রমা হয়েই রয়ে গেছে। স্কুলে গিয়েছিল সেদিন, তারপর পিসি আর পিসেমশায় হেডমাস্টারকে বলে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। কিছুই বুঝতে না পেরে পথে হাঁ করে তাকিয়েছিল পলাশ। জড়িয়ে ধরে ছিল পিসি ওকে। চোখে জল। পিসেমশায় গম্ভীর। বাড়িতে ফিরে শুনেছিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মায়ের অর্ধদগ্ধ শরীর। সেদিন রাতেই মায়ের চলে যাওয়া। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল বাবাকে কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি,সেই অর্থে বাবার ওপর কোনো অভিযোগ আনা যায়নি। মায়ের আত্মহত্যা পলাশকে ওলট-পালট করে দিলেও বাবাকে কোনোদিনই দোষী মনে হয়নি ওর। মায়ের মৃত্যুর পর বাবাও কেমন শান্ত হয়ে গেল, শামুকের মতো নিজের মধ্যে ঢুকে গেল। বাড়ি থেকে তেমন বেরোতো না। সুনন্দামাসির বাড়িতেও বন্ধ গেল যাওয়া। সব কিছুই খেয়াল করত পলাশ। তো সেই পরিচিত কম্ফোর্টজোনের মধ্যে থাকতে চাওয়া নতুন কিছু নয়, তবে কম্ফোর্ট জোন না পেলেও যে পলাশের কাজকর্মে অসুবিধে হয়, তেমন কিন্তু নয়। আপাদমস্তক যাকে বলে স্মার্ট লুক এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজে পলাশ যথেষ্ট সড়গড় সর্বত্রই, অন্তত বাইরে থেকে ওর ওই বসবাসজনিত মানসিক আঞ্চলিকতা আর অস্তিত্বহীনতা বোঝার কোনো সিন নেই। ছোটবেলার সেই প্রথম 'আমাদের পাড়া' ছেড়ে আসার সময় চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল। একা বাড়ি ছেড়ে বেরোনো বলতে সেই প্রথম। বাড়ি ছেড়ে হস্টেলে যাওয়া অনেকটা দূরের শহরে। তারপর প্রায় প্রতি বন্ধে বাড়িতে গেলেও 'আমাদের পাড়া'য় আর চিরস্থায়ী বাস হয়নি। আগের মতো পাড়া ব্যাপারটাও আর সেভাবে কাজ করত না বুকে, তবে পরিচিত সবকিছু নিয়েই একটা আপাত কম্ফোর্টজোনকে পাশে রেখেই চলে পলাশের। রিটায়ারমেন্টের পর বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল নিজের কর্মক্ষেত্রে। মন টেঁকেনি বাবার। বাবার স্বাস্থজনিত কারণ দেখিয়ে বদলি নিয়ে ফিরে এসেছে নিজের শহরেই।
শ্যামবাজারমুখী বাসটায় এই অফিসটাইমে যতটা ভিড় হবার কথা ছিল ততোটা হয়নি। জানালার পাশে সিটটা চিড়িয়া মোড়েই পেয়ে গেল, একজন নেমে যাওয়াতে। পাড়া দুর্বলতার মতো ট্রেনে আর বাসে জানালা দুর্বলতাটাও মজ্জাগত এখন। জানালার পাশের সিটের প্রতি অমোঘ এক টান সেই ছোট থেকেই। তবে বেশ বড় হবার পর যখন প্রথম প্লেনে চড়ল,জানালার পাশের সিটটা পেয়ে যাওয়াতে মনে হলো হাতে স্বর্গ এসে ধরা দিল। ভুল ভেঙেছিল টেক-অফ করার খানিক্ষণ পরই। টেক-অফের সময়ই মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল আর সারা শরীর জুড়ে গা গোলানো ভাব, ঠিক যেমনটা ছেলেবেলায় উঁচু নাগরদোলা চড়লে হতো। প্লেনে প্রথমবার উঠেই অনুভব করেছিল এটা ওর কম্ফোর্টজোন নয়। শুধুমাত্র যে উইন্ডোসাইড, তা নয়, আসলে প্লেন ব্যাপারটাই ওর আন-কম্ফোর্টেবল লেগেছিল। তারপর নানা কাজে বহুবার চড়তে হয়েছে প্লেনে, আজও হয়। নানারকম ভয়, উদ্ভট চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে মনে। প্রতিবারই প্লেনে উঠে মনে হয় হঠাৎ যদি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়…! চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্লেন দুর্ঘটনার বিস্তর ইউটিউব-দৃশ্য। দম বন্ধ হয়ে আসে, কথা বলতে পারেনা, ঘুমোতেও পারে না। খুব প্রয়োজন না পড়লে পারতপক্ষে প্লেনে চড়ে না পলাশ। সবরকম যানবাহনের মধ্যে ট্রেনই সব থেকে নিরাপদ লাগে ওর,যাকে বলে সেই প্রিয় কম্ফোর্টজোন।
বাসটা শ্যামবাজার মোড় থেকে বিধান সরণি ধরে। এরাস্তায় এলেই পলাশের নানান কথা মনে পড়ে। সে'সব কত পুরোনো গল্প, স্মৃতি। হাতিবাগানে নামলেই হতো আজ কিন্তু পেরিয়ে রূপবাণীতে নামে পলাশ। এই সময়টা ইচ্ছে করেই বেছেছে ও, আসলে অন্য কোনো কাজে এটা হয়তো অসময়,তবে একাজের জন্য এই পড়ন্ত দুপুরই উপযুক্ত। সন্ধের পর আসতেই পারত কিন্তু উত্তর কলকাতার এসব অলিগলিপথ গুলিয়ে যায় পলাশের। বটতলা পুলিশ ফাঁড়ি পেরিয়ে বাঁ দিকের গলিতেই সম্ভবত, নিশ্চিত হতে পারে না পলাশ তবু অনুমানেই এগিয়ে যায় ওই গলিতেই। আবছা মনে আছে, সাবেকি বাড়িটায় ঢোকার মুখেই গেটের বাঁদিকের সিমেন্টের পিলারে লেখা ছিল মল্লিক ভিলা। এ বাড়ির মালিকের নাম ছিল অনাদি মল্লিক। অনাদি মল্লিক চলে গেছেন বহুদিন আগে, পলাশের দাদুর বন্ধু ছিলেন। দাদুর সঙ্গে এখানে আসাটা ঝাপসা মনে থাকলেও বাবার সঙ্গে আসার কথা এখনো সব স্পষ্ট মনে পড়ে । নিঃঝুম পড়ন্ত দুপুরে উত্তরের এই পাড়াগুলো আশ্চর্য রকমের শান্ত। এখনো সেই আদ্দিকালের পাড়াই রয়ে গেছে, সময়ের কিছু ক্ষতচিহ্ন ছাড়া সবই প্রায় এক রকম। অনতিদূরে উত্তরের সব পুরোনো গন্ধকে উপেক্ষা করে উদ্ধত মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এক গগনচুম্বী, ওখানেই ছিল সারকারিনা। আহা, সারকারিনা মানেই সেই ব্লো হট 'সম্রাট ও সুন্দরী', বাইরে পোস্টারে মিস শেফালির লাস্যময় ছবি, পাশে লেখা 'কঠোরভাবে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য', সব মিলিয়ে সে এক শরীরের উত্থান-পতনের দিন। এই পুরোনো পাড়াগুলোর সঙ্গে অতীত এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে, চেষ্টা করলেও ভাবনাগুলো আটকানো যায় না, জোর করেই ঢুকে পড়ে মনে। ভুল হয়নি পলাশের, ঠিক গলিতেই ঢুকেছে। বাড়িটার সামান্য কিছু পরিবর্তন হলেও প্রায় একই রকম । কিছু অনিবার্য সংস্কার হয়েছে যদিও টিঁকিয়ে রাখতে, নইলে হয়তো আরও জরাজীর্ণ অবস্থা হতো। পুরোনো গেটটা নতুন হয়েছে, পাশের পিলারেও কিছু সংস্কারের ছাপ, তবে সেই 'মল্লিক ভিলা' লেখাটা রয়ে গেছে একইভাবে, সময়ের চিহ্ন বহন করে। মাধবীলতা বেয়ে উঠেছে গেটের শেড বেয়ে। চারপাশে এক অদ্ভুত নিঃস্তব্ধতা। উত্তরের এই পাড়াগুলো এই পড়ন্ত দুপুরে আশ্চর্যরকমের শান্ত।
ভেতরে ঢোকে পলাশ। মাঝে বড় বাঁধানো উঠোন। চারপাশে বারোঘর না হলেও কয়েক ঘর তো বটেই, দেখেই বোঝা যায় ভেঙে যাওয়া ক্ষয়িষ্ণু যৌথপরিবারের ছবি। এই দুপুরে কাউকে দেখতে পায় না পলাশ। হয়তো কাজেকর্মে কিংবা ঘুম। ঢুকেই বাঁদিকের অংশে এগোয়, এখনো মনে আছে,ওখানেই আসত বাবার হাত ধরে। আজ একা, তবে হাতের ব্যাগে যে জন্য আসা সেটা নিতে ভোলেনি। একবার ব্যাগে হাত দিয়ে দেখে নেয়। বিষণ্ণ হয়ে ওঠে মন, বাবা বেঁচে থাকা অবস্থায় আসা হয়নি। মাঝে মাঝেই বাবার কথাগুলো আজকাল মনে পড়ে— কবে দিতে যাবি? পলাশ বলতো, 'এই তো বাবা, পরের সপ্তাহেই'...! নানান রকম ব্যস্ততায় সেই পরের সপ্তাহ আর আসেনি। তারপর তো চলেই গেল বাবা। দিব্যি সুস্থ মানুষটা হঠাৎ করেই চলে গেল। শেষ একটা মাস কষ্ট পেয়েছিল বড়ই। অক্সিজেন কমে যাচ্ছিল শরীরে, শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল, ইনহেলার আর নেবুলাইজারেও কাজ হচ্ছিল না। পলাশ,ঝুমা আর আয়া মিলে পালা করে চব্বিশ ঘন্টাই পাশে থাকত। বুঝতে পারছিল ফুরিয়ে আসছে সময়। ঝুমা প্রায়ই বলত- 'বাবা কিন্তু বেশিদিন নেই, তুমি কিন্তু একবার যাও সময় করে'। আসা হয়নি। আসলে পলাশ বুঝেও বুঝতে চাইছিল না যে বাবা চলে যাবে এতো দ্রুত। সব যুক্তি-বুদ্ধি বলছিল সময় ফুরিয়েছে, কিন্তু মানতে পারছিল না পলাশ। আস্তে আস্তে সেন্সগুলো চলে যাচ্ছিল, চিনতেও অসুবিধে হচ্ছিল তবু তারমধ্যেও একদিন জড়ানো, অস্পষ্ট স্বরে বলেছিল, কাছে গিয়ে শুনেছিল পলাশ— 'কবে যাবি ওই বাড়িতে'…! প্রশ্ন শুনে বিব্রত পলাশ উত্তর দিয়েছিল,'এই সপ্তাহেই বাবা,এবার ঠিক যাব'। আস্তে আস্তে চোখ বুজে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ছিল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল পলাশ। পরদিনই শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় নার্সিংহোমে ভর্তি করা হলো বাবাকে, তারপর দু'দিন। দাহ করে ফেরার সময় ঝুমা ঠান্ডা গলায় শুধু বলেছিল— 'বাবা থাকা অবস্থায় গেলেই না…' ! চুপ করে ছিল পলাশ। উত্তর খুঁজে পায়নি। এই না-যাওয়াটা যে ইচ্ছাকৃত নয়, কীভাবে বোঝাবে! ঝুমা যে বোঝেনি তা নয়, কিন্তু কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। বাবা চলে যাবার আড়াই মাসের মাথায় আজ এসেছে পলাশ। ব্যাগের মধ্যে সেই ছোট্ট প্যাকেট, সাদাকালো কিছু ছবি। প্যাকেটটা প্লাস্টিকে মোড়ানো। বাবা বেশ কিছুকাল আগে হাতে দিয়ে বলেছিল, সুনন্দাকে ছবিগুলো দিয়ে আসিস। ওরই ছবি সব। মোড়ানো প্যাকেটের ছবিগুলো দেখার আগ্রহ যে হয়নি একদম, তা নয় কিন্তু ঝুমার প্রবল আপত্তিতেই আর খোলেনি সেই প্যাকেট। বাবাও কিছু বলেনি এ নিয়ে, হয়তো বাবাও চায়নি পলাশ খুলুক প্যাকেটটা।
এই নিঝুম দুপুরে এভাবে প্রায় অপরিচিত বাড়িতে ঢুকে পড়া, একটু সঙ্কোচ মেশানো ভয় ভয় লাগছে পলাশের। উঠোনে কিছু কাপড় কেচে মেলে দেওয়া। আধভেজানো দরজায় কড়া নাড়ে পলাশ, সাড়া না পেয়ে একটু জোরেই নাড়ে। এক মাঝবয়েসি মহিলা বেরিয়ে আসে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে। একটু অপ্রতিভ গলায় পলাশ বলে— 'সুনন্দা মল্লিক কি এ বাড়িতে থাকেন?'
—আপনার নাম কি জানতে পারি?
—পলাশ, পলাশ ব্যানার্জী
—একটু অপেক্ষা করুন, এই বলে সেই মাঝবয়েসি ভেতরে চলে গেল, মিনিট খানেক বাদেই এসে বলল- 'ভেতরে আসুন'।
বড় বড় কড়িকাঠের পুরোনো বাড়ি, অনেকদিন পর এসে বেশ অন্যরকম লাগছে পলাশের। প্রায় চল্লিশ বছর পর এ বাড়িতে আসা। একটা পুরোনো বার্মা টিকের সোফায় বসে পলাশ। অযত্নে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সোফাটা ঘরের সঙ্গে মানানসই। মিনিটখানেকের মধ্যেই বয়স্কা যিনি ঢুকলেন, বয়েস আনুমানিক সত্তরের ওপর।
—তুমি দীনেশের ছেলে তো…!
একটু অবাক হয়েই মাথা নাড়ে পলাশ।
বয়েসের ভারে কিছুটা নুব্জ হলেও গলায় পুরোনো কলকাতার ঝাঁঝ রয়ে গেছে। অশক্ত কিন্তু রাশভারি চলাফেরা।
– পনি আমায় চিনতে পারলেন একবারে, এতোদিন পর? বাবার খবর তো শুনেছেন…!
–হ্যঁ,শুনেছি। তোমার মুখশ্রী দেখে তোমাকে চিনলাম, অবিকল বসানো মুখ দীনেশের। কিন্তু তুমি তো বড় হবার পর আর আসোনি, তা এতোদিন পর….! অবশ্য না আসার কারণ তো আছেই। তোমার মা কিন্তু আমার বাল্যবন্ধু,আমি আর জুঁই দুজনেই তোমার বাবার ছাত্রী ছিলাম স্কুলে, জুঁই পরে অবশ্য পাত্রী হয়ে গেল। চুপ করে শোনে পলাশ, নিশ্চুপে শোনে। এসবই ওর জানা,সব কিছুই। মায়ের সঙ্গে বাবার তর্কাতর্কির সময়ের কথোপকথনগুলো এখনো কিছু কিছু কানে ভাসে। বাবার এবাড়িতে যাতায়াত, সুনন্দামাসির সঙ্গে থিয়েটার দেখা এসব নিয়ে অশান্তি। আজ আর এসব শুনতে ইচ্ছে করে না পলাশের। পুরোনো ছবির প্যাকেটটা ওনার হাতে দিয়ে সামান্য কিছু কথা বলে প্রায় নিঝুম রঙচটা বাড়িটা থেকে পলাশ বেরিয়ে এলো, কাজের সেই মহিলাটির সঙ্গে সুনন্দামাসিও ধীরে ধীরে এলেন গেট অব্ধি,পলাশের হাতটা ধরে বললেন— জুঁই আমায় ভুল বুঝে চলেই গেল, তুমিও কি সত্যিটা জানবে না? চুপ করে দাঁড়ায় পলাশ, শুধু বলে— আসব, তোমাকে নিয়ে যাব আমাদের বাড়িতে, এখানে নয়, বাড়িতেই শুনব। কখন যে আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছে, খেয়াল হয়নি।
বিকেলে গঙ্গার হাওয়াটা কলকাতা শহরটাকে শীতল করে দেয়। একটু পর সন্ধে নামবে শহর কলকাতায়, সারকারিনা গুঁড়িয়ে মাটি ফুঁড়ে ওঠা আকাশচুম্বী বাড়িটা কেমন ঝাপসা হয়ে যায় আজ এই মুহূর্তে আর পলাশ স্পষ্ট দেখতে পায় কলকাতার আকাশে একঝাঁক পায়রা উড়ছে, সেই পায়রাগুলোর সঙ্গে ছেড়া কাগজের মতো হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নেমে আসছে অসংখ্য সাদাকালো ছবি আর এদিকে সারকারিনার সেই মাটির নীচ থেকে উঠে আসা স্টেজে তালে তালে পা ফেলছেন মিস শেফালি…! সন্ধে নামছে কলকাতায়, একটা সময় আবার ফিরে আসছে, তবে নতুনভাবে। বাবার চলে যাবার পর যে কম্ফোর্টজোনের বাইরে চলে গিয়েছিল পলাশ, আবার যেনো একটা কম্ফোর্টজোনের আশ্রয়ে ফিরছে জীবন। পেছন ফিরে তাকায় পলাশ, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অশক্ত সুনন্দামাসি। ফিরে আসতেই হবে এখানে আবার পলাশকে। বাড়িতে নিয়ে যাবে সুনন্দামাসিকে, সব কথা শুনবে, অলক্ষ্যে মাও শুনতে পাবে। অনেকদিন পর আজ একটু হাল্কা লাগে পলাশের । হাতিবাগানের মোড় থেকে শোভাবাজার মেট্রোর অটো ধরে পলাশ, আর গুনগুন করে গেয়ে ওঠে বাবার সেই প্রিয় গানটা - আজ যেমন করে গাইছে আকাশ…! ·

0 মন্তব্যসমূহ